Folk Tale translated by Taniya Das

বাংলা English

একটি স্বপ্ন

একদা এক বৃদ্ধ পৃথিবীর বুকে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে এক কৃষকের বাড়িতে উপস্থিত হন। গৃহস্বামীর কাছে রাতের আশ্রয় চাইলে কৃষক বৃদ্ধকে আপ্যায়ন করে বলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই, আমি অত্যন্ত খুশি হবো, শুধু একটাই অনুরোধ,  আপনি আমাকে সারা রাত ধরে গল্প শোনাবেন তো?”

  বৃদ্ধ বললেন, “বেশ ঠিক আছে! আমি তোমাকে গল্প শোনাবো,  শুধু তুমি আমাকে এখানে একটু বিশ্রাম নিতে দাও।”

  কৃষক অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, “আসুন, আসুন, ভিতরে আসুন।”

  বৃদ্ধ মানুষটি কুঁড়ে ঘরে প্রবেশ করে উনুনের ওপর রাখা বেঞ্চটিতে শুয়ে পড়লেন।

  কিছুক্ষণ পর কৃষক বৃদ্ধকে ডেকে বলেন,

  “হে সম্মানীয় অতিথি আপনি প্রস্তুত হয়ে নিন। আমরা এখন রাতের আহারে বসব। আর এবার আপনি কিন্তু আমাকে একটা গল্প শোনাবেন।”

   বৃদ্ধ বললেন, “শোনো হে, একটু অপেক্ষা করো। আমি বরং তোমাকে কাল সকালে একটা গল্প বলবো।”

  “বেশ আপনার যা ইচ্ছে” – এই বলে তারা উভয়েই ঘুমোতে চলে গেলো।

  বৃদ্ধ লোকটি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখলো-

  একটা ছবির সামনে দুটো মোমবাতি জ্বলছে এবং দুটি পাখি ঘরময় উড়ে বেড়াচ্ছে। তৃষ্ণার্ত হয়ে বৃদ্ধ শয্যা ছেড়ে উঠতেই দেখেন  মেঝেতে কতগুলি গোসাপ ছুটে বেড়াচ্ছে। এরপর জলপান করতে গিয়ে টেবিলের কাছে গিয়ে দেখলেন আরেক কাণ্ড – অনেকগুলো ব্যাঙ ওই টেবিলের  ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে  আর ব্যাঙেদের লাফালাফিতে টেবিলটা থরথর করে কেঁপেই চলেছে। 

এর পরে  হঠাৎ গৃহস্বামীর জ্যেষ্ঠ পুত্রের দিকে চোখ পড়তেই বৃদ্ধ অবাক হয়ে দেখলেন তাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এক বৃহদাকার সাপ শুয়ে আছে। এবং দ্বিতীয় পুত্রের স্ত্রীর দিকে লক্ষ করতেই দেখতে পেলেন একটি বিড়াল তার ওপর বসে কৃষকের দ্বিতীয় পুত্রের দিকে তাকিয়ে আলস্য ভরে হাই তুলছে।  তারপর তৃতীয় পুত্রের দিকে চোখ পড়া মাত্রই বৃদ্ধ হাঁ হয়ে  দেখলেন তাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এক যুবা পুরুষ শুয়ে রয়েছেন।

  এই সমস্ত ঘটনা দেখে বৃদ্ধ যৎপরোনাস্তি অবাক ও হতভম্ব হয়ে গেলেন।

তাই তিনি কুঁড়েঘর ছেড়ে বেরিয়ে ভুট্টার পাঁজার ওপর গিয়ে শুয়ে পড়লেন। হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ স্বর তাঁর কানে গেল।  কেউ চিৎকার করে বলছে “বোন! বোন! আমাকে নিয়ে আসো।”

 সেখান থেকে উঠে বেড়ার নীচে শুতেই তিনি আবার শুনতে পেলেন কেউ ডেকে বলছে – “আমাকে এখান থেকে বার করে আবার আটকে দাও।”

 শেষমেষ  বৃদ্ধ লোকটি সেখান থেকেও উঠে গিয়ে একটি বড়ো পাত্রের ওপর শুয়ে পড়লেন। কিন্তু আবারও  শুনতে পেলেন কেউ যেন  চিৎকার করে বলছে, “আমি কড়িকাঠে ঝুলছি! আমি কড়িকাঠের ওপর পড়ে যাচ্ছি।”

  এরপর বৃদ্ধ পুনরায় কুটিরের ভিতর ফিরে গেলেন। গৃহস্বামীর নিদ্রা ভঙ্গ হলে তিনি যথারীতি শান্তভাবে বৃদ্ধকে বললেন  “এবার তো আপনি আমাকে একটা গল্প শোনান।”

  কিন্তু বৃদ্ধ প্রত্যুত্তরে বলেন, “আমি তোমাকে গল্প না বলে একটা সত্যি ঘটনা বলবো। তুমি জানো আমি এইমাত্র কি স্বপ্ন দেখলাম? আমি নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে দেখলাম একটা ছবির সামনে দুটো মোমবাতি জ্বলছে এবং দুটি পাখি কুঁড়ে ঘরের ভিতরে উড়ে বেড়াচ্ছে।”

 -গৃহস্বামী বললেন, “ওই দুটো আসলে আমার দুই দেবদূত।”

-বৃদ্ধ বলে চললেন, “আমি আরও দেখলাম আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও তার স্ত্রীর মাঝে একটি বৃহদাকার সাপ শুয়ে আছে।”

-কৃষক বললেন “এর কারণ তারা সর্বদাই পরস্পরের সাথে কলহে লিপ্ত থাকে।”

-“এরপর যখন আপনার দ্বিতীয় পুত্রের দিকে আমার চোখ পড়লো আমি দেখলাম তার স্ত্রীর ওপর একটি বিড়াল বসে আছে এবং সেটি আপনার পুত্রের দিকে তাকিয়ে আলস্যভরে হাই তুলছে।”

-“এর অর্থ হলো তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে বন্ধুত্ব নেই এবং তার স্ত্রী তার কাছ থেকে মুক্তি চায়।”

-“আপনার তৃতীয় পুত্রের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাদের মাঝে এক যুবা পুরুষ শুয়ে রয়েছেন।”

-কৃষক বৃদ্ধকে বললেন, “উনি কোনো যুবা পুরুষ নন, উনি আসলে একজন দেবদূত। আর সেই জন্যই ওরা স্বামী- স্ত্রী অত্যন্ত সুখী ও প্রেমময় জীবন যাপন করে।”

-“তাহলে হে গৃহস্বামী, আমি ঘুমাতে গিয়ে ঘরময় গোসাপের ছুটোছুটি আর জলপান করতে গিয়ে টেবিলে ব্যাঙগুলিকে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠতে দেখলাম কেন?”

-কৃষক উত্তরে বললেন – “কারণ আমার পুত্রবধূরা কৃষক পরিবারের সদস্য হওয়া স্বত্তেও কাঠের যন্ত্রটির যথেষ্ট পরিচর্যা করে না তৎস্বত্তেও আমি তাদের কিছু বলি না; কিন্তু তারা যখন একত্রিত হয়ে পানীয় নিয়ে টেবিলে বসে তখনও তারা প্রার্থনা করে না।”

-“তারপর আমি ঘর থেকে বেরিয়ে ভুট্টা স্তুপের ওপর শুতে গিয়ে শুনলাম কেউ একজন চেঁচিয়ে বলছে ‘বোন! বোন! আমাকে নিয়ে যাও।”

-“এর অর্থ আমার পুত্রেরা কখনোই বুরূশটিকে যথার্থ জায়গায় রাখে না এবং কারোর মঙ্গল কামনা করে না।”

-“এরপর সেখান থেকেও উঠে গিয়ে আমি বেড়ার নীচে গিয়ে শুলাম। সেখানে শুনলাম কেউ চিৎকার করে বলছে ‘আমাকে এখান থেকে বার করে আবার আটকে দাও।”

-“এর অর্থ বেড়ার লাঠিটা উল্টো করে লাগানো হয়েছে।”

-বৃদ্ধ বললেন,  “আমি সেখান থেকে উঠে বড়ো পাত্রটির নীচে শুতে গিয়ে পুনরায় একটি চিৎকার শুনতে পেলাম, কেউ বলছে -‘আমি কড়িকাঠে ঝুলছি! আমি কড়িকাঠের ওপর পড়ে যাচ্ছি! ‘”

-গৃহস্বামী উত্তর দিলেন – “কিছুই না, এর অর্থ হলো আমার মৃত্যুর সাথে সাথে আমার এই গৃহের সম্পূর্ণ পতন হবে।”

ঋণস্বীকার : Russian Folk Tales/ The Dream wikisource.org 

Taniya Das
তানিয়া দাস। বেথুন কলেজের বাংলা বিভাগের ছাত্রী। বর্তমানে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠরতা। 
লেখার প্রথম প্রকাশ তর্কিত তর্জনী পত্রিকায়।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *