আমি তো কেবল একটা পোনি চেয়েছিলাম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদক ঋতা রায়

বাংলা English
Rui Zink
 Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.  

অনুবাদকের কথা

১৯৭৪ সালের পঁচিশে এপ্রিল লিশবোয়ায় একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পোর্তুগালের আটচল্লিশ বছর ব্যাপী (৬ই মে, ১৯২৬ – ২৫শে এপ্রিল, ১৯৭৪) একনায়কতন্ত্রী শাসনের অবসান ঘটে। ২০১৪ সালে এই এপ্রিল অভ্যুত্থান বা কার্নেশান অভ্যুত্থানের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে রুই জ়িঙ্ক জতাএল – জুর্নাল দাশ লেত্রাশ, আর্তেশ ই ইদাইয়াশ নামের এক পাক্ষিকের আমন্ত্রণে এই লেখাটি লিখেছিলেন। লেখাটি বেরিয়েছিল ২০১৪ সালের সতেরোই এপ্রিল।

আমি তো কেবল একটা পোনি চেয়েছিলাম

আরে ভাই, পঁচিশে এপ্রিল যখন হল তখন আমার তেরো পুরবে পুরবে করছে। লোকে বলে যে ১৯৭৪ সালে পোর্তুগাল মোটেই ধনী দেশ ছিল না, আর আমিও জানি যে দেশটা ধনী ছিল না, কিন্তু সেই ১৯৭৪ সালে সে বেশ একটা বড়লোক-বড়লোক ভাব দেখাল আমাকে একটা বিপ্লব উপহার দিয়ে, যখন কিনা আমি একটা পোনি ঘোড়া বা একটা সাইকেল বা সিনেমা ইম্পেরিউতে চারটে ফিল্ম দেখার সামান্য একটা পাস পেলেই খুশি হয়ে যেতাম। একে তো আমার বাবামার বিশেষ টাকাকড়ি ছিল না, তার ওপর আবার তাঁরা ছিলেন বেজায় কিপটে, মানে একেবারে রাজযোটক যাকে বলে, আর তাঁদের কোন ইচ্ছেই ছিল না আমার তেরো বছরের জন্মদিনে ভাল কিছু দেওয়ার – যেটা এমন একটা বয়েস যখন অনেক সংস্কৃতিতেই একজন কিশোরকে প্রাপ্তবয়স্কদের দুনিয়াতে দীক্ষা দেওয়া হয়, সে তখনও একজন “পুরুষমানুষ” না হয়ে উঠলেও একজন “ছোট্ট পুরুষ” তো বটে। আমার মায়ের ছিল ক্লাস নেবার ছুতো, আমার বাবা ছিলেন অ্যাফ্রিকায়, আর আমি যে পোনি বা সাইকেল কিছুই পাব না, এমনকি ইম্পেরিউতে চারবার ঢোকবার পাস পর্যন্ত না, সেটা মেনেই নিয়েছিলাম।

সৌভাগ্যবশত, আমি তখন একা একা ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছি আর শস্তার সিনেমাহলগুলোতে প্রায়ই যেতাম। ওইসময়টায় লিশবোয়ায় ওরকম হল প্রচুর ছিল, শুধু বাইশাতেই তো চারটে ছিল: কুলীসিউরটা, আনিমাতগ্রাফু, উলীম্পিয়া, সালাঁও লিশবোয়া। ইন্টারভালে সিট রাখার জন্যেলোকে সিটের পেছনে থুতু দিয়ে টিকিটটা আটকে রাখত কিংবা একটা বোঁটকা গন্ধওয়ালা রুমাল সিটের হাতলে বেঁধে রাখত (যাতে কেউ চুরি না করে সেইজন্যে বোঁটকা গন্ধ হলে ভাল হত)। আমি ছ’বছর বয়েস থেকে একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম, লিশবোয়া তখন এরকমই ছিল, অন্তত পেনা অঞ্চলে তো বটেই, রুসিউর ঠিক ওপর দিয়ে, যেখান থেকে পালাসিউ দা ইন্দিপেন্দেন্সিয়ার চিমনিগুলো দেখা যেত, যেটা ছিল মুসিদাদ পুর্তুগেজ়ার[1] আড্ডাখানা, তার খয়েরি হাফপ্যান্ট আর হাত লম্বা করে অভিবাদন নিয়ে।আর ভাই, লিশবোয়া? সেটা ছিল খুব পুরনো একটা ফিল্ম: জেলেনিরা খালি পায়ে পাথর-বসানো পথ বেয়ে উঠে যেত, আমরা কাইশ দু সুদ্রেতে[2] কাঁকড়া ধরতাম, কারখানার শ্রমিকেরা শিস দিতে দিতে পাশ দিয়ে চলে যেত, আর ছুরিকাঁচি-ধারওয়ালা, আর বেন্তুবাবু (গালেগু কয়লাওয়ালা) সবসময়ে দোকান খুলে রাখত উনুনের জন্যেযদি তেলের দরকার পড়ে, আর ছুঁচসুতো-বোতামের দোকান ছিল, ওষুধের দোকান ছিল, রুয়া গাশপার ত্রিগুরচীজ়ের দোকানগুলো ছিল, রুয়া মার্তিঁ ভাশে আমালিয়ার[3] বাড়ি ছিল, মঠ ছিল। যুদ্ধটা ছিল অনেক দূরে আর সেটা তখনও আমার সমস্যা হয়ে ওঠেনি, পালাব না যুদ্ধে যাব সেটা ভাবার জন্যে তখনও আরও পাঁচ বছর বাকি ছিল[4]

একটা খুব সুন্দর ছোটবেলা ছিল:সময়ে থেমে থাকা, স্ফটিকের একটা রাতে স্ফটিকে বদলে গিয়ে। আজও যখন বিশ বা তিরিশের দশকের কোন ইটালিয়ান বা ফরাসি ফিল্ম দেখি তখন বলি: “ওই দেখ, আমার ছোটবেলা”। ইন্টারেস্টিং কিছুএকটা ছিল, সময়ের বাইরে পড়ে থাকা একটা দেশে ছোট একটা ছেলে হওয়ার মধ্যে। কিছুটা বালক অবস্থায় গ্রামে থাকার মত। তেরো বছর বয়েসে, অবশ্য একজন কিশোরের অন্য কিছুর দরকার হতে শুরু করে, ভাই, নইলে সে গুটিয়ে যায়। আর এই অন্য কিছুটাই আমার দেশ আমাকে দিয়েছিল।

একদিন সকালে,আচমকা ঘুমটা ভেঙে গিয়ে ঘুমের ঘোরে আমার প্রথমেন্দ্রিয়কে আমায় বলতে শুনলাম যে আমি উঠতে দেরি করেছি (কেউ কেউ এটাকে ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলে কিন্তু আমার কাছে ওটাই প্রথম)।আর মা বাড়ি থেকে বেরলনা, বলল যে আজ স্কুল নেই, রেডিওতে বলেছে, কি হচ্ছে সেটা ঠিক ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু রাস্তায় সৈন্যরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।আমি সঙ্গে সঙ্গে জামাকাপড় পালটিয়ে মায়ের আপত্তি না শুনেই, সাবধানে থাকব কথা দিয়ে (মানে মিথ্যে কথা বলে), রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম।পালাসিউদা ইন্দিপেন্দেন্সিয়ার চিমনিগুলোরও পরের সিঁড়িগুলো থেকে রুসিউর গোলমালটা দেখা যাচ্ছিল।হলফ করে বলতে পারব না যে অত সকালেই কোন শাইমিত[5]ছিল কিনা।কয়েক ঘণ্টা পরে অবশ্যই ছিল – আমি নিজেই তো একটাতে চড়েছিলাম।কিন্তু সকালে? আমার স্মৃতি যে জিনিশপত্র বানাচ্ছে না সেটার গ্যারান্টি আমি দিতে পারব না।(স্মৃতিগুলোর এরকম করার একটা বাতিক আছে।)তেরাই রুদুপাসুর দিকে এগোচ্ছিলাম যখন অনেকগুলো গুলির আওয়াজ হল।রুয়াদুওরুর একটা দোকানে আশ্রয় নিলাম।আমার মনে হয় গুলিগুলো সাধারণ নাগরিকদের রক্ষা করার জন্যেই বেশি ছিল।তখনও জানতাম না যে চারজন ঠিক ওই জায়গাটাতেই মারা পড়বে যেখানে এখন একটা বহুতল।পরের কটা দিন মোচ্ছব চলল।এরপর আর কখনও এত এত লোককে, এত অনেকজনকে এত এত খুশি হতে দেখিনি।

পিদের[6] লোকজনকে তাড়া করে খুঁজে বের করার মধ্যেও মজা ছিল, কারণ এতদিন ধরে যারা ভয়টাকে চালাচ্ছিল তাদের দিকেই ভয়কেনিজের নাকটাকে তাক করতে দেখাটা সবসময়েই মজার। আর সে বছরের পয়লা মে কি চমৎকারই না হয়েছিল, মায়ের হাত ধরে আলমিরান্ত রাইশ দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে, এই আমি যার কিনা মায়ের হাত ধরে হাঁটার আর বয়েস ছিল না, কিন্তু ওই দিনটাতে মাকে আমার হাতটা ধরতে দিয়েছিলাম। আমার জীবনের তিনটে সব থেকে বেশি ধর্মীয় মুহূর্তের ওটা ছিল প্রথমটা – আর বাবা হিসেবে নয়, ছেলে হিসেবে একমাত্র। আমি আজও আমার দেশের কাছে কৃতজ্ঞ: একটা বিপ্লব, তেরো বছর বয়েসে, সত্যিই একটা যাচ্ছেতাই রকমের ভাল একটা উপহার। অনেক অনেক ধন্যবাদ, ভাই। ওইদিনটায় তুমি খুব ভাল ছিলে।   

     আমরা সবাই ছিলাম।


[1]Organização Nacional Mocidade Portuguesa (পোর্তুগিজ়়যুবা ও কিশোরদেররাষ্ট্রীয়সংগঠন),সাধারণতলোকেযেটাকেMocidade Portuguesaবলত,কমবয়েসিছেলেদেরজন্যেশ্তাদুনোভুর (পোর্তুগালেরএকনায়কতন্ত্রীশাসনব্যবস্থা)একটিসংগঠনেরনাম।

[2]লিশবোয়ায়তাইজুনদীরওপরেফেরিঘাটগুলোরমধ্যেএকটা।

[3]বিখ্যাতফাদু-গায়িকাআমালিয়ারুদরিগশ।

[4]পোর্তুগিজ়ঔপনিবেশিকযুদ্ধ (১৯৬১-১৯৭৪); অ্যাফ্রিকায়পোর্তুগালেরতিনটিউপনিবেশ, আঙ্গলা, মুসাম্বিক ও গিনে-বিসাউতেস্বাধীনতারযুদ্ধ।আঠেরোবছরহলেইপ্রত্যেকপোর্তুগিজ়ছেলেরএইযুদ্ধেযোগদেওয়াটাবাধ্যতামূলকছিল। অনেকেইসেটাএড়াতেইউরোপেরঅন্যকোনদেশেপালিয়েযেত।

[5]পোর্তুগালেতৈরিহাল্কাসামরিকসাঁজোয়াগাড়িযাপোর্তুগিজ়ঔপনিবেশিকযুদ্ধেব্যবহৃতহয়েছিল।

[6]PIDE –শ্তাদুনোভুরগুপ্তরাজনৈতিকপুলিশ, হিটলারেরগেস্টাপোরমত।

Rita Ray
ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।    

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *