ভাল ফ্যাসিস্ট হবার সহজ উপায় (পর্ব ১২)

বাংলা English
Rui Zink
Rui Zink
  Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.   
Manual Do Bom Fascista
Manual Do Bom Fascista

চতুর্থ পর্ব

প্রশ্ন করতে তো কোন দোষ নেই

“কিসের জন্যে আমাদের ট্যাক্সগুলো এখানে বসে বসে খাচ্ছ?

রক্তচোষার দল! বেরিয়ে যাও আমাদের দেশ থেকে, অপদার্থ, পাঙ্কাল,   

হারামির দল! যাও গিয়ে নর্দমা সাফ কর! আগাছা ওপড়াও

আর পোড়ো জমি সাফ কর, কাজ কর, মল, মোবাইল আর কেবল

টিভি ছাড়া আর তো কিছু চাই না তোমাদের, আর বেকারভাতা

নিয়ে জীবন কাটাতে চাও, যাও, যাও, আমাদের দেশ থেকে বেরিয়ে

যাও, কমোড সাফ কর, ওই একটা কাজেই তো তোমরা লাগো,

তোমাদের হাতে যদি কাজ না থাকে তার কারণ তোমরা কোন কাজেই

লাগ না, যারা কাজে লাগে তাদের হাতে সর্বদা কাজ থাকে, তা যদি

বাসন ধোওয়াও হয়, ভাতাখোর কমিউনিস্টের দল, বেরিয়ে যাও আমাদের  

দেশ থেকে জঘন্য সব পরগাছার দল!! অনেক সময় ফালতু নষ্ট

করেছ! অনেক দেরি হয়ে গেছে! যত শালা অপদার্থ অকম্মার ঢেঁকি

বামপন্থী কমিউনিস্টি শুয়োরের বাচ্চা, বেরোও আমাদের দেশ থেকে,

এইসব পরগাছার দল বেশি বেড়ে যাবার আগেই সবকটা হারামজাদাকে

ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে হবে।” 

[য – এসব জিনিশ কেউ বানিয়ে বলে না]  

একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কি

কোন গুরুতর

যৌন সমস্যা আছে?

হয়ত। কথা দিতে পারছি না। আর যদি থাকেও – নিরপেক্ষ ভাবে বলতে হলে – সেটা সর্বদাই হয় না, প্রায় সর্বদা শুধু হয়। আর দোষটা তো ওর নয়। ওটা শুধু কম মেলামেশা করার ফল, অস্বস্তিকর ভীরুতা, শব্দভাণ্ডারের অপ্রতুলতা (কিংবা মোনোমানিয়া, যেটা প্রায় একই ব্যাপার), আর খুব কম অভিজ্ঞতা।

     এটা বুঝতে হবে যে, ওর বয়েস যাই হোক না কেন, একজন ভাল ফ্যাসিস্ট সর্বদাই এক ধরণের একটা দুষ্টচক্রে আটকা পড়ে থাকা একজন বয়ঃসন্ধিক্ষণের কিশোর: অভিজ্ঞতার অভাবের জন্যে তার সাহসের অভাব, আবার সাহসের অভাবের জন্যে তার অভিজ্ঞতা হয় না।

     একজন ভাল ফ্যাসিস্টের প্রেমের জীবন নিয়ে কোন সিনেমা হতে পারে না। কিকরে হবে, যদি তার কোনরকম বড়সড় অ্যাডভেঞ্চার না হয়ে থাকে? একটু বেশিরকম পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে বেশির ভাগ সময়েই সে একটা আপাতবিরোধী পুরুষত্বহীনতার অবস্থায় পড়ে থাকে। আর এটা ততটাই বেশি ফ্রাস্ট্রেটিং যতটা একজন সত্যিকারের পুরুষ সদা-তৈরি থাকলে হয়, সর্বদাই ডেফকন ৪[1]-এর এরেজি মোনুমেন্তুম আএরে পেরেন্নিউস[2] ফাংশান নিয়ে, নিউক্লিয়ার মিসাইলের সিস্টেমটার মত, যখন সেটা সর্বোচ্চ সতর্কতার সিগনালটা দেয়। 

     তাসত্ত্বেও, হৃদয়ের গভীরে ও ঠিকই জানে যে সবসময়ে ওর কামনা জাগে না। আর এটাও হয়ত যে সবসময়ে কামনা থাকাটা ঠিক মানবিকও নয়। কেবল ও এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। এ কথা ঠিক যে ও ঘন্টার পর ঘণ্টা ছেলেদের সঙ্গে এ বার সে বার ঘুরে বেড়াতে পারে, কিন্তু সে কি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সঙ্গম  করে যেতে পারবে? কটা জনতা, স্টিং ছাড়া – যে নাকি তান্ত্রিক সঙ্গম করে, অবশ্য সে তো বেশ বুড়োও হয়েছে – সদা-তৈরি থাকতে পারবে?

     এইসব শাঁখের করাতের মধ্যিখানে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, অর্থাৎ অনলাইন পর্নো দেখতে দেখতে যৌনতা কি হতে পারে সে বিষয়ে তার কল্পনাশক্তিটাকে পুষ্ট করতে থাকে। কেবল ওইসব সিনেমায় তো খুব একটা কথাবার্তা থাকে না – আর, যে মুহূর্ত থেকে জামাকাপড় খোলা হতে থাকে, সেটা শেষ হয়ে যায়।  

     তাই তার প্রেমিকা যদি জোটেও, একজন ভাল ফ্যাসিস্ট জানে না তার আশেপাশে সে কি করবে বা বলবে। ওরা নিরর্থক আর গতানুগতিক কথাবার্তা বিনিময় করে। ওই ছেলেদের আড্ডায় যেমনটা হয়ে থাকে আর কি, কেবল সেটা আরও খারাপ – কোনরকম আনন্দ বা ভাললাগা থাকে না, কেবলই কুণ্ঠা থাকে।  

     তারপর একজন ভাল ফ্যাসিস্ট এমন একটা জিনিশ আবিষ্কার করে যেটা ওকে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়: যে মেয়েটার দিকে ও এগোচ্ছে (আর যে, কেন কে জানে, তাকে পছন্দ করে) সেও একটা অদ্ভুত কামনা প্রকাশ করে ফেলে! প্রথম থেকেই তার প্যান্টের চেনে হাত দিতে মেয়েটা ভয় পায় না। আর ও যেসব জিনিশ বড়দের সিনেমায় দেখেছে, সেসব করতেও ওর আপত্তি আছে বলে মনে হয় না। এমনকি ও হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গীতেও রাজি – যে অবস্থানটা সবচেয়ে অসম্মানজনক, একজন ভাল ফ্যাসিস্টের অবস্থান সম্পর্কিত মেনুতে – আর তাতে সে বেশ মজাও পায়। শেষমেশ ও ওই অন্যদের মতই! (সিনেমার মেয়েগুলোর মত)  

     এটা একজন ভাল ফ্যাসিস্টের সবচেয়ে ভাল করে লুকিয়ে রাখা গোপন কথাগুলোর একটা: যেসব নারীদের ও কামনা করে কিন্তু তারা ওকে অবজ্ঞা করে আর তাদের ও পেতে পারে না, এটা অবমাননাকর তো বটেই, কিন্তু আরও বেশি অবমাননাকর হল যখন কেউ ওকে পছন্দ করে ফেলে। কারণ তখনই ওর সন্দেহ হতে থাকে (আর সেটা একটা যন্ত্রণাদায়ক যন্ত্রণা, ওঃ, বড়ই যন্ত্রণাদায়ক) যে এই মেয়েটা যদি তার সঙ্গে যেসব জিনিশ স্বেচ্ছায় হাসিমুখে করছে (তাকে সে পছন্দ করে বলে) সেসব অশ্লীল আর নিন্দনীয় জিনিশ তো সে (মানে মেয়েটা) আবার কখনও (হয়ত) অন্য কারুর সঙ্গেও করবে (যদি সে ওই অন্য কাউকেও পছন্দ করে বসে)।

     অথবা, হয়ত, এর আগেই করেছে – মেয়েগুলো তো আজকাল আর কুমারী অবস্থায় বিয়ের বেদীতে ওঠে না!

     আর একদিন হয়ত অন্য আরেকজনের সঙ্গে আবার করবে, বিয়েটা ভাঙতে শুরু করলে। (অবশ্য, ভাল করে ভেবে দেখলে, এখনই তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।)  

     আর এটা, একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কাছে, অসহ্য।

     এখানেই একজন ভাল ফ্যাসিস্ট বুঝতে পারে, সে যে সিনেমাগুলো দেখে (কলমিস্ত্রি, রুটিওয়ালা, পোস্টাপিসের পিয়ন, কোম্পানির ম্যানেজারের সঙ্গে) সেগুলোর বাস্তবতার সঙ্গে যে সত্যিকারের সিনেমায় ও আছে বলে মনে করে, সেটার বাস্তবতার কোন তফাত নেই।  

     আর ভাল ফ্যাসিস্ট খুব কষ্ট পায়। এই ব্যথাটা খুব তীক্ষ্ণ, অস্তিত্ব-সম্পর্কিত, যেটার জন্যে ও একেবারে তৈরি নয়। 

     কিংবা সেই শিকারির মত, যে আবিষ্কার করে সে শিকারটা ধরতে পেরেছে কারণ সে নিজেই সেই শিকারটা। যে ভালুকটাকে কেউ শান্তিতে শীতঘুম দিতে দেয় না, তার মত। সমুদ্রে একটা হলুদ-কানওয়ালা-কাছিমের গতি দেখে অবাক-হয়ে-যাওয়া একটা জেলিফিশের থামিয়ে দেওয়া চিৎকারের মত। অত্যাবশ্যক কটুস্বাদ আর কটু অত্যাবশ্যকতার মত। যে অব্যবহৃত ন্যাপকিনটার খেয়াল হয় যে শালিকপনা করে নিজের যৌবনটা নষ্ট করেছে, তার চেয়েও নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করা শালিকটার মত। আবহাওয়ার টায়ার ফেঁসে গেছে বলে অসময়ে সেটার পরিবর্তনের মত।   

     শেষমেশ সব মেয়েই কিন্তু এক!

     ওরা কি চায় আমি সেটা জানি!”

পাঠ ৬৫

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট অত্যাচার পছন্দ করে?

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট মনে করে যে একটা অত্যাচারের পরিস্থিতিতে, নৈতিক দায়িত্বটা অত্যাচারীর ওপরে নয়, বরং অত্যাচারিতের ওপরে পড়ে। যখন জাইর বলসোনারো[3] দিলমার[4] ত্রাস কর্নেল উস্ত্রা-র প্রশংসা করেছিলেন তখন কি তিনি নিজের পক্ষ বেছে নিচ্ছিলেন? হ্যাঁ, কিন্তু তাঁর ওপর সুবিচার করতে হলে এটাও বলতে হয় যে ব্যাপারটা একেবারে পরিষ্কার, শাদা-কালো: লোকটার মাথায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি দিলমা একজন ভীতু, দুর্বল, “চরিত্রহীন” মহিলা। [য – এসব জিনিশ কেউ বানিয়ে বলে না] তার প্রমাণ? যখন ওঁর ওপর অত্যাচার করা হত তখন ওই মহিলা এতই ভীতু ছিলেন যে সাহসী জল্লাদ আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতেন, যদিও তাদের হাতে পিস্তল ছাড়া আর কিছু থাকত না, তাও যদি ওই ঘরটায় জনা দশেক থাকত, কিন্তু উনি যখন হাতকড়া পরা থাকতেন তখন জেরা করার জন্যে কখনই চার-পাঁচজনের বেশি ওই ঘরে কেউ থাকত না। কি ভীতু মহিলা রে বাবা!

     হেহেহে, কর্ণেল উশ্ত্রা ছিল দিলমার ত্রাস! ঠিক যেমন পিদ ছিল কমুনিস্টিগুলোর ত্রাস!”    

     প্রমাণিত প্রমাণ এটাই যে, ঠিকমত ব্যবহার করতে পারলে আর ঠিকঠিক লোকেদের ক্ষেত্রে, সন্ত্রাসটা ভাল। বলা যেতে পারে যে সন্ত্রাস হল একটা অস্ত্র – আর সেই অস্ত্রের মান নির্ভর করে যে হাত সেটাকে ব্যবহার করছে তার দৃঢ়তার ওপরে। অত্যাচারিত হওয়াটা সহজ, সেটা যে কেউ পারে। কিন্তু অত্যাচার করাটা? অত্যাচার করার জন্যে প্রয়োজন দৃঢ়তা, পৌরুষ আর সাহস।  

পাঠ ৬৬

একজন ভাল ফ্যাসিস্টের ময়দা নিয়ে সমস্যাটা কোথা থেকে এল?

আজকাল যদি আম্পারু ময়দা থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছ, এই কথাটা কম শোনা যায় (ভাল ফ্যাসিস্ট অমর হলেও ভাল ফ্যাসিস্টেরা বুড়োও হয়, মারাও যায়) তো ছবির মত এই কথাটা “আমার সঙ্গে ময়দা করা (বাংলায় পেঁয়াজি) চলবে না” এখনও ব্যবহার হয়।

     এবার এই প্রশ্নটা ওঠে: ভাল ফ্যাসিস্ট ময়দা নিয়ে এত ভাবে কেন?

     সবচেয়ে বড় যে বিশ্বকোষটা আজকাল পাওয়া যায়, সেটা অনুযায়ী ময়দা হল শ্বেতসারে সমৃদ্ধ জলমুক্ত একটা চূর্ণ, যা খাদ্যসামগ্রী হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, এই দ্রব্যটিকে সাধারণত গমের মত খাদ্যশস্য বা শ্বেতসারে সমৃদ্ধ অন্য কোন উদ্ভিজ্জ অংশ, যেমন ট্যাপিওকার মূল, চূর্ণ করে উৎপন্ন করা হয় [য – এসব জিনিশ কেউ বানিয়ে বলে না]।

     আর আম্পারু ময়দা ছিল ষাট আর সত্তরের দশকের খুব জনপ্রিয় একটা ব্র্যান্ড, আর ফ্রি গিফট হিসেবে সেটার প্যাকেটের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া থাকত, এটা ছিল পুরুষবিদ্বেষীদের (যেসব মানুষ পুরুষোচিত পুরুষদের প্রচণ্ড অপছন্দ করে) একটা কৌশল, যাতে বাড়ির গিন্নিরা লুকিয়েচুরিয়ে তাদের স্বামীদের গাড়ি চালাতে পারে যখন তারা অফিসে গাছ কাটার জন্যে থাকে।

     অবশ্য ফ্রি গিফট হিসেবে আম্পারু ময়দা-র প্যাকেটের ভেতর বাড়ির গিন্নিদের যে ড্রাইভিং লাইসেন্সটা দেওয়া হত, যেটা ওদের বিশ্রি ভাবে গাড়ি চালানর অনুমতি দিত, সেটা কিন্তু সবকিছু সত্ত্বেও এই ব্যাপারটার চেয়ে কম খারাপ ছিল – সেটা হল যে সময়টায় তাদের স্বামীরা ব্যাঙ্কে বসে নতুন গ্রাহকদের জন্যে সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলে, সেই সময়টায় বাড়ির গিন্নিরা একঘেয়েমির চোটে ক্লান্ত হয়ে অপেক্ষা করবে  কখন একজন কলের মিস্ত্রি, পিয়ন, ছুরিকাঁচি শান দেওয়ার লোক, ছুতোর, কশাই, ধর্মীয় প্যাম্ফলেট বিলি করার লোক বা এমনকি একজন ঝালাইয়ের মিস্ত্রি এসে যে বাড়ির ওরা গিন্নি সেই বাড়ির দরজায় এসে কড়া নাড়বে আর ওরা তাদের সঙ্গে পাগলের মত সঙ্গম করবে।

     অন্যদিকে আবার গাড়ি নিয়ে খেলা করার মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।  

     ঘটনা সেটাই। এইসব উভয়সঙ্কট কখনই সহজ হয় না।

পাঠ ৬৭

ভাল ফ্যাসিস্টের তার মায়ের সঙ্গে ঝামেলাটা কি নিয়ে?

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট নিজের জন্মের সময়ে তার মায়ের কুমারীত্ব নষ্ট করেছে আর এখন সেই দায়টা আর লজ্জাটা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আর অবশ্যই এক ফোঁটা গর্ব, মা যদি তার জন্মের সময়ে তাঁর কুমারীত্ব হারিয়ে থাকেন, তাহলে জন্মানর সঙ্গে সঙ্গে সেও তার কৌমার্য হারিয়েছে।

     অন্য মহিলারা সাধ্বী হবার ভান করে কিন্তু ওর মা সত্যিই একজন সাধ্বী।

     আর এই অন্য মহিলাদের সে কি চোখে দেখে? কারণ ওর মা ওকে শিখিয়েছেন যে ওরা সবাই কেবল ওর নীচে নিজেদের রাখতে চায়, এমনকি যখন তারা ওকে প্রলুদ্ধ করার সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করে ওকে প্রায় অবজ্ঞাই করে:

     এমন ভান করছে, বাবা, যেন ওদের কোন আগ্রহই নেই ওরাই সবচেয়ে খারাপ

     এভাবেই একজন ভাল ফ্যাসিস্ট বেড়ে ওঠে এই মনোরম ভুল ধারণাটা নিয়ে যে ওরা ওকে এড়িয়ে চলছে না, বরং ও-ই ওদের পাত্তা দিচ্ছে না। একজন মা সবসময়েই জীবনের সম্বন্ধে অনেক কিছু জানেন। আর একজন ভাল ফ্যাসিস্টের মা, তিনি তো আবার সবজান্তা। তিনি তো এত যত্ন করে এই জন্যে ছেলেকে মানুষ করেননি যে প্রথম যে মুখে মুখে চোপা করা, নাক-উঁচু মেয়ে, বা এমনকি, স্কার্টের পেছনটা ওর ডানা ধরে ভুল পথে তাঁর খোকাকে টেনে নিয়ে যাবার জন্যে আসবে তাকেই ট্রেতে করে নিজের ছেলেকে তুলে দেবেন, যদিও খোকার বয়েস এখন বেয়াল্লিশ তবুও তার বন্ধুদের সঙ্গে মিলে বাঁদরামি করার এখনও অনেক সময় পড়ে আছে!

     আর যখন একদিন এমন আসে যখন সেই ভাল ফ্যাসিস্ট কোন নিষ্পাপ ইচ্ছের কথা তার মাকে বলে, যেমন:

     একটা মেয়ে মাঝেমাঝে দোকানে আসে

     অমনি মা উত্তরে বলেন, তাঁর বজ্রনির্ঘোষের মত কোমল গলায়:

     ওর থেকে পালা, বাবা, একটা অসতী, সেজেগুজে পাছা দুলিয়ে সবার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অভিনয় করছে ওই মেয়েটা তোর জন্যে নয়, বাবা, তুই এই ছেনাল মাগীগুলোর পক্ষে বড্ড ভাল

          যে, ওরা কেবলই পুরুষমানুষদের বিপথে নিয়ে যেতে চায়”   

পাঠ ৬৮

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কেন প্রচ্ছন্ন হুমকি দেয়?

কারণ ও মনে করে যে হুমকিটা যদি প্রচ্ছন্ন থাকে, বা ও যদি হুমকিটার মুখে একটা ওড়না দিয়ে রাখে, তাহলে ওটা গোপন থাকবে।

     আর একজন ভাল ফ্যাসিস্ট নিজেকে লুকিয়ে রাখতে খুব ভালবাসে, সত্যিই খুব ভালবাসে।

     সবাইকার মত একজন ভাল ফ্যাসিস্টেরও খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু আকাশকুসুম চিন্তা আছে, কিন্তু যাকে দরকার তাকে পেটানর সময়টা যখন আসে তখন নামহীন সাহসটাই তার বেশি পছন্দের। সেখানে ঠিকমত ছদ্মবেশ ধরে ভাল ফ্যাসিস্ট মনে করে যেটা সে ভাবছে ওদের মুখের ওপরে ঠিক সেটা বলার তার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। কোন ভয় ছাড়াই!

     কিন্তু ওদের বলবেটা কি? আরে, সত্যিগুলো। সত্যিকারের সত্যিগুলো। যেগুলো ওরা শুনতে ভালবাসে না কিন্তু এবার সেগুলো ওদের শুনতেই হবে।

     ছদ্মবেশে, ভাল ফ্যাসিস্ট সুপারম্যান হয়ে যায়: সত্যিই তার আর কাউকে ভয় হয় না! এমনকি কি একটা (কি আশ্চর্য!) কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ভয়ও না। ওর কাছে, ঠিক করে ছদ্মবেশটা ধরতে পারলে, কেউ আর ওকে ঘাঁটাতে আসবে না। প্রবাদে তো বলেই: মুখ না দেখালেই ভয়ের কিছু নেই

     রাজা বা প্রজা যে-ই হোক না কেন, পোর্তুগিজ় বা ভিনদেশি, অসৎ বা বিকিয়ে যাওয়া, জীবিত বা মৃত: সবাইকেই ভাল ফ্যাসিস্ট মুখোশটা পরা থাকলে সত্যিটা বলে।

     যার খুশি কষ্ট হোক আর ভয় না থাকুক, আমার কোনই ভয় নেই! ওটা কি একটা পাখি? নাকি উড়োজাহাজ? ট্রল? না, ওটা একজন ভাল ফ্যাসিস্ট, পরিণামের কোন ভয় না করে, ও এই ছোটলোকগুলোর সম্বন্ধে যা ভাবে তা-ই বলছে। ঠিকমত মুখোশ পরে আর অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে।

     আর সত্যিই তো, সুপারম্যানকে সুপারম্যান কে বানায়, মুখোশটা ছাড়া? যে মুখোশটা ও পরে ভাল করে শত্রুদের মোকাবিলা করার জন্যে।

পাঠ ৬৯                         

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কি ভবিষ্যতকে ভয় পায়?

কিন্তু এই জলবায়ু পরিবর্তনের মত মেয়েলি ব্যাপারস্যাপারকে নয়। পেঙ্গুইনদের গরম লাগছে? আমরা দুঃখিত। সবাই জানে বরফ রোদে গলে যায়, এটা জানার জন্যে উত্তরমেরুতে যাবার কোন দরকার নেই।

     একজন ভাল ফ্যাসিস্ট সেই ভবিষ্যৎটাকে ভয় পায় যেখানে শ্বেতাঙ্গ ক্রিশ্চান বিষমকামী পুরুষেরা পুরুষবিদ্বেষের শিকার হবে। পুরুষবিদ্বেষ হল নারীবিদ্বেষের অন্য পিঠ। কেবল সেটা আরো বেশি গুরুতর। ভাল ফ্যাসিস্ট একটা সত্যিকারের ডিস্টোপিক ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, আর সেটাতে লোকেদের সত্যিই আগ্রহ হবে: শ্বেতাঙ্গ আলফা পুরুষের মারাত্মক ভাবে আহত হবার মর্মন্তুদ নাটক।  

     আর ভাল ফ্যাসিস্ট দেখতে পায় যে শ্বেতাঙ্গ ক্রিশ্চান বিষমকামী পুরুষকে ঘেটোতে পাঠান হয়েছে। হয়ত বা কন্সেন্ট্রেশান ক্যাম্পেও। ওর ভোট দেওয়াটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাড়িতে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে আর স্ত্রী অনুমতি দিলে তবেই বেরতে পারছে। রোজ রাস্তায় বেরোলেই ওকে লেসবিয়ান আর গে বলে অপমান করা হচ্ছে। আর ও যে গোপনে বিষমকামী এটা আবিষ্কার করার পর কেবল সেই অপরাধেই ওর চাকরিটা গেছে।

     ভাল ফ্যাসিস্টের এটাই আশঙ্কা যে একদিন কোন বেচারা শ্বেতাঙ্গ ক্রিশ্চান বিষমকামী পুরুষ সারাটা জীবন অপদস্থ হবে এই কথাটা সবাই জেনে যাবার পর যে সে যখন অল্পবয়েসি একজন সহায়ক ছিল তখন সে ডিম্বাণু উৎপাদক ব্ল্যাক হাউসে হাঁটু গেড়ে বসে রাষ্ট্রপত্নীকে মুখমেহন করিয়েছে। আর বর্ণসঙ্কর আর কমিউনিস্টরা যে তাকে বাইশু আলেন্তাইজুর নকল তুলোর ক্ষেতে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ভাঙ আর গাঁজার পাতা, মে্থাম্ফেটামিন আর মারিজুয়ানা তোলার কাজ করতে বাধ্য করে দাসের মত ব্যবহার করছে এটাও সে কল্পনায় দেখছে।  

     ভাল ফ্যাসিস্টের এটাও আশঙ্কা যে, সে এইসব অত্যাচারের ব্যাপারে নালিশ করলে, থানার পুলিশেরা হাসবে, কাঁধ ঝাঁকাবে, স্তন চুলকাবে, যাতে ওই নব্য-প্রবাদটার সুবিচার করতে পারে: স্ত্রী আর স্বামীর মধ্যে নিও না পক্ষ[5]

পাঠ ৭০

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কি ভোট দেয়?

অবশ্যই দেয়, কারণ সে তো নির্বাচিতও হয়ে থাকে। কিন্তু ভোটটা সে চুপচাপই দেয়, ভানটা করে যেন সে ভোটটা দিতেই চায় না।

     রাজনীতি হল ভাল ফ্যাসিস্টের পর্নোগ্রাফি: এমন একটা কিছু যেটা সে সর্বদা দেখছে আর করছে, কেবল খুব সাবধানে, লুকিয়েচুরিয়ে। এইজন্যেই সে তার ঘরে আর অফিসে তালা লাগান শুরু করেছে কারণ এর আগে বেশ কয়েকবার সে হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়েছিল প্রায়।

     যেহেতু একজন ভাল ফ্যাসিস্ট রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় না, তাই সেটা করতে গিয়ে ধরা পড়াটা তার কাছে একেবারেই কাম্য নয়।

     তাই সে যদি সংসদের সদস্য, বা এমনকি, মন্ত্রীও হয়ে যায়, তাহলেও সে জোর দিয়ে এটাই বলে চলে যে সে রাজনীতি করছে না, রাজনীতিটাকে সে খুব ঘেন্না করে, রাজনীতিকদের সে সহ্যই করতে পারে না। আর ঠিক করে যদি জোরটা দেওয়া যায় তো সবসময়েই কেউ না কেউ তো বিশ্বাস করবেই। এটা অনেক বছর ধরে চলতে পারে – কর্তাদের ক্ষেত্রে তো গোটা জীবনটাই লেগে যায়। পোর্তুগালে যে রাজনীতিকরা রাজনীতি করে না তারা রাজনীতিতে অনেকদূর যায়।

     আর, যদি লুকিয়েচুরিয়ে ভোট দেওয়াটা জটিল হয়ে পড়ে, তাহলে স্বীকার করতেই হবে যে হাতেনাতে ধরা না পড়ার জন্যে প্রার্থনা করতে করতে বাক্সে ব্যালটটা ফেলতে যাওয়াটার মধ্যেও একটা অ্যাডভেঞ্চারের ব্যাপার আছে। ওহো না: অ্যাডভেঞ্চারের জ্য সে কোয়া আছে। ছ্যাঁচড়ামিটা, কেন জানা নেই, সর্বদাই ফরাসিতে বেশি খোলতাই হয়।  

     তাছাড়া, ভাল ফ্যাসিস্ট যদি ভোট দিতে গিয়ে ধরা পড়ে তো তার শেষ অবলম্বন হিসেবে একটা অছিলা তো থাকেই:

     তুমি যা ভাবছ তা নয়, তনি! গিয়েছিলাম বটে, কিন্তু ব্যালটে আজেবাজে কথা লিখে ভোটটা নষ্ট      করে এসেছি আমার মনে হল যে ওদের কটা সত্যি কথা বললে ব্যাপারটা বেশ মজার হবে, সব       শালা জাহান্নমে যাক! ওদের জন্যে ছোট্ট একটা চমকও রেখে এসেছি কেবিনটায় ঘাপটি মেরে        বসেছিলাম, হেহেহে, আমার ব্যালটটা খোলার সময়ে ওদের মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছিল!”

     যত্ত সব বাজে কথা! একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কখনই ব্যালটে আজেবাজে কথা লিখে ভোটটা নষ্ট করে না, ও খালি অন্যদের ভোটগুলো নষ্ট করতে চায়।

 ক্রমশ…


[1]DEFCON – defense readiness condition (DEFCON) হল যুক্তরাষ্ট্রের সশত্র বাহিনীর ব্যবহৃত সতর্ক করার একটা সিস্টেম। এর মধ্যে চার নম্বর স্তর হল “স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তৈরি থাকা”। 

[2]Eregi/Exegi monumentum aere perennius – ব্রোঞ্জ়ের চেয়েও মজবুত একটা কীর্তি তৈরি করেছি। ল্যাটিন কবি হোরাসিওর একটি ওডের প্রথম লাইন, যাতে তিনি নিজে আর তাঁর কাব্যকে যে অমর হবে সেই কথা বলছেন।  

[3]Jair Bolsonaro  – ২০১৯ থেকে ব্রেজ়িলের নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রী শাসক।

[4]Dilma Rousseff – ২০১১ থেকে ২০১৬ অবধি ব্রেজ়িলের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৬৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর স্বৈরতন্ত্রী শাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় বাম রাজনীতি করার জন্যে ১৯৭০ থেকে প্রায় তিন বছর জেলে বন্দী হয়ে কাটান। জেলে তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার করা হয়।     

[5]আসল প্রবচনটা হল Entre marido e mulher, não metas o colher, যার আক্ষরিক অর্থ “স্বামী আর স্ত্রীর মধ্যে চামচ ঢুকিও না।” লেখক রসিকতা করে সেটাকে একটু উল্টে দিয়েছেন – Entre mulher e marido, não tomes o partido।

Rita Ray
  ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।  

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *