A Short Story By Rui Zink Translated By Rita Ray

বাংলা English

রুইয়ের এই গল্পটা “উম রোমান্স” ২০১২ সালে দৈনিক সংবাদপত্র “দিয়ারিউ দ্য নোতীসিয়াশ”-এ বেরিয়েছিল। এই গল্পে আমি কোন টীকা দিইনি, সব টীকাই রুইয়ের দেওয়া।


 
Rui Zink
Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc. 

ভালবাসার ব্যাপারস্যাপার

রুই জ়িঙ্ক

পাঠক, আপনার হাতে কি একটু সময় আছে? আমার মত কি আপনিও ট্রেনটা মিস করেছেন আর এখন পরেরটার অপেক্ষায় বসে আছেন? তাহলে চলুন আপনাকে একটা গল্প বলি। সত্যি বলছি, তাতে আপনার লাভই হবে। আপনার পড়া সব গল্পগুলোর মধ্যে এটা সবচেয়ে সুন্দর হবে। মানে হয়ত সবচেয়ে সুন্দর নয়। হয়ত সুন্দরই হবে না। কিন্তু, পাঠক, আপনার এটাকে সুন্দর লাগবে, আর আপনি এটাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন, হৃদয়ের ভেতরে, যেমন আমি আমার হৃদয়ে করে এটাকে বয়ে বেড়াচ্ছি।     

এই ঘটনাটা মোবাইল আসার আগের যুগের। খুব আগে নয়, কিন্তু একটু আগের মত আগে। যদি খুব ভুল না করে থাকি তো আশির দশকের। একটা সিনেমাহলের পাশের একটা রেস্টুরেন্টে, বুধ কিংবা বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলায়, শোয়ের আগে আরিশ্তিদের সঙ্গে আমার ডিনার করার কথা, কিন্তু সে সাধারণত যতটা দেরি করে তার চেয়ে বেশিই দেরি করছিল। সময় কাটানোর জন্যে আমি চারিদিকটা তাকিয়ে দেখছিলাম, আর শেষটায় পাশের টেবিলের জোড়াটার দিকে আমার নজরটা আটকে গেল, আগাম সম্ভোগের প্রত্যাশায় দুজনেই বেশ নার্ভাস যেটা, আমার কাছে, প্রণয়ঘটিত সব দেখাসাক্ষাতের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মুহূর্ত: যে রাতে প্রায় নিশ্চিতভাবে। যে রাতে।    

তাছাড়া, ওটা যে একটা রোম্যান্টিক ডিনার এটা বোঝার জন্যে আমার অভিজ্ঞ চোখের দরকার ছিল না। পুরুষ আর মহিলা, দুজনেরই বয়েস তিরিশের একটু বেশি। মহিলাটি সুন্দরী, সাদাসিধে, সভ্যভদ্র। পুরুষটি আলুভাতে মার্কা। বিশ বছরের একটু বেশিই হবে ফেরোমোন আবিষ্কার হয়েছে, কিন্তু একজন লেখকের তো যা দেখছে সেটা জানার জন্যে বিজ্ঞানের[1] দরকার হয় না। সুস্পষ্ট মানসিক চাপ মানেই অবধারিত ভাবে প্রণয়ঘটিত ব্যাপার। ভাল করে সাজগোজ করা, বিশেষ করে মহিলাটি। রোম্যান্টিক ডিনার। নিঃসন্দেহে সেকালের প্রোগ্রাম: ডিনার —> সিনেমা —> চুমু। আমার সঠিক ডায়াগনোসিস কেবল একটা সন্দেহেরই অবকাশ রাখে: যদি, অগ্রহণযোগ্য কোন অনবধানতার কারণে, শেষ হুইসিলটা বাজার আগে ওরা ব্যাপারটাকে আরও একটা রাউন্ডের (আরও একটা দৌড়, আরও একটা লড়াই) জন্যে পিছিয়ে দেয়।   

ওরা নীচুস্বরে কথা বলছিল, যেমনটা এসব ক্ষেত্রে করে। সৌভাগ্যবশত, দেখার জন্যে চোখ আর ভাবনাচিন্তা করার জন্যে মাথা ছাড়াও আমার মত মনোযোগী পর্যবেক্ষণকারীদের ঈশ্বরের দান হিসেবে সোনার কানও থাকে।    

“দুঃখিত, কারলিনা”, পুরুষটি বলল। “কিন্তু আমার মনে হয় যে আমাদের আর…”

চমকে উঠলাম। লোকটা এই কথাটা খুব গম্ভীর ভাবে বলল, তার গলাটা পিদের জেলের কুঠরিগুলোর ভেতরটা যেমন হত, তার চেয়েও বেশি বদ্ধ, আঁটসাঁট। ওইসব গলার মত যেটা একটা লোক করে যখন তার ভীষণ ভাবে গুরররুতর কিছু বলার থাকে[2]।     

কারলিনা কেঁপে উঠল। একজন মহিলা কি করতে পারে যখন সে এরকম একটা কথা শোনে? “দুঃখিত, আমার মনে হয় যে আমাদের আর…”

গর্দভটা কি ওটা আর অন্য কোন ভাবে বলতে পারত না? দুঃখিত, সোনা, আমাদের মধ্যে যা ছিল সেটা শেষ হয়ে গেছে। এটা বলার জন্যে অন্য কোন জায়গাও কি আর ছিল না?

সৌভাগ্যবশত (এসব ব্যাপারে মহিলারা অবিশ্বাস্য), কারলিনা এক মুহূর্তের জন্যেও যদি সমতা হারিয়ে থেকে থাকে তো শিগগিরি আবার সেটা ফিরে পেল:

“তুমি ঠিক কি বলতে চাইছ, আর্তুর?”

এবারে পুরুষটির ঢোক গিলবার পালা। গলা ঝাড়বার। মাথা চুলকোবার। ইত্যাদি।  

“মানে…”                              

এই আর্তুরের (আর সত্যিই ওর মুখটা আর্তুরের মত, বেচারা) জানা উচিত ছিল যে ব্যাপারটা কঠিন হবে। আর আমি আমার প্রশিক্ষিত চোখ নিয়ে হতাশ হলাম। ভেবেছিলাম যে ওরা এখনও সেই রাত্রেই রয়েছে আর, ওরা কিনা, যা দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যেই সেই ধূসর পর্দাটা পড়ার পর্যায়ে চলে গেছে যেটা, আজ হোক কাল হোক, প্রেমের ব্যাপারে নেমে আসবেই। কিন্তু তৎক্ষণাৎ নিজেকে আবার সামলিয়ে নিলাম আর্তুরের উভয়সঙ্কটটা বুঝতে পেরে: বোঝাই যাচ্ছে সে কারলিনাকে প্রত্যাখ্যান করতে চায় না, বরং সে ওকে ভালবাসে (সেটা তো খালি, বা এমনকি জামা-পরা চোখেও দেখাই যাচ্ছে), ও তাকে কামনা করে (মানে সেটা বললে কমই বলা হয়), তার জন্যে এক্কেবারে পাগল (পাগল বলে পাগল!)। সমস্যাটা হল যে। সমস্যাটা…  

মানে সমস্যাটা তাহলে কি?

আর্তুরকে ঘন্টিটা বাঁচিয়ে দিল, কারণ খাবার এসে গেল। কারলিনার জন্যে কান্নেল্লোনি। আর্তুরের জন্যে লাসান্যিয়া। পছন্দটা মানানসই বলে আমার মনে হল।      

“কারলিনা, ব্যাপারটা যতটা খারাপ আমি তার চেয়ে বেশি খারাপ আর সেটাকে করতে চাই না…”

তারপর আর্তুর তার কাঁটায় খানিকটা লাসান্যিয়া তুলল। কাঁটায় করে এই খাবার তোলাটার একটা ভাল দিক আর একটা খারাপ দিক আছে। ভাল দিকটা হল যে একটু সময় কাটানোর কৌশল হিসেবে এটা বেশ কার্যকর, বাধ্যতামূলক ব্যাখ্যাটা দেবার ব্যাপারটা একটু পিছিয়ে দেবার জন্যে যেটা, খারাপ ভাবে ব্যাখ্যা করলে, ও আরও বেশি কুঁকড়ে যেতে বাধ্য হবে। খারাপ দিকটা হল যে কথা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে মুখটা আটকে রাখার সময় এটা নয়। এমনসব কথা, যেগুলো মধুর, স্নেহময়, সহানুভূতিশীল হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর, ঘটনাক্রমে, বোধগম্যও, যদি না এই সম্মানীয় ভদ্রলোকের পক্ষে সেটা খুব অসুবিধের হয়। কথা বা চুমু। একটা নরম চুমু, ঠোঁটে, টেবিল আর গেলাস আর প্লেটগুলোর ওপর দিয়ে দেওয়া।                 

এক লহমায়, জিজ্ঞেস করবেন না কি করে, কারণ একজন জাদুকর তো আর তার রহস্যগুলো কখন প্রকাশ করে না, সবকিছু জেনে গেলাম। দুমাস হল ওরা দেখা করছে, আর এই দেখা করাটা ক্রমশই বাড়ছে। কারলিনার ক্ষেত্রে এর অর্থ প্রচুর কৌশল আর কষ্ট করে সবরকমের ব্যবস্থাপনা করা, কারণ ওর ছোট ছোট দুটো বাচ্চা আছে। তখনও না এসেছে কম্পিউটারের যুগ, না ইন্টারনেটের না ফেসবুকের, কিন্তু তখনই ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে ডিভোর্সটা একটা ফ্যাশান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সম্পর্কে বিভিন্ন থিয়োরি ছিল: দুবছরের সঙ্কট, পাঁচ বছরের সঙ্কট, সঙ্কট… আমার ধারণা, বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা বিশ্লেষণ প্রমাণ করতে পারত সঙ্কটটা চিরকালীন। ধ্বংস করাটা বরাবরই গড়ার চেয়ে বেশি সহজ ছিল। কিছু করার চেয়ে সমালোচনা করাটা। কিংবা “তোমাকে চিরটাকাল ভালবাসব” — এই সাদাসিধে শপথটা ঠিকঠাক পালন করার চেয়ে কথাটা রাখতে না পারা। কারলিন্দার বহু আকর্ষণীয়তার একটা হল ওর স্পষ্টভাষিতা। কয়েকবার ও নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আর্তুরকে বেরনোর জন্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এইভাবে, খোলাখুলিভাবে ওর প্রতি নিজের আগ্রহটা দেখিয়েছে। এর থেকে বেশি স্পষ্টভাষী হতে হলে নিজের ডেন্টাল ফ্লসটা ওর নাকেমুখে ঘষে দিতে হত। কেবল ওই কালে ডেন্টাল ফ্লসটা ছিল নিছকই একটা সুতো যা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা হত।    

ওরা এর মধ্যেই একটা সিনেমা দেখেছে। বেড়াতে গেছে। রাত্রে বাইরে খেয়েছে। আরেকটা সিনেমা দেখেছে। আবার রাত্রে বাইরে খেয়েছে। নাটক দেখেছে। ওই সময়ে লোকে নাটক দেখতে যেত, আমি জানি, ব্যাপারটা বিশ্বাস করা কঠিন। পাঠক, আপনি কি জানেন আশির দশকে একজন পুরুষ আর একজন মহিলার “রাত্রে বাইরে খেতে যাবার” অর্থ কি ছিল? “দুপুরে বাইরে খাওয়া” আর “রাত্রে বাইরে খাওয়া”-র মধ্যে আকাশপাতাল তফাত ছিল (এখনও আছে কিনা জানি না, আজকাল এত কম বেরোই)। হাল্কা চালে কেউ কেউ রাত্রে বাইরে খেতে যেত না, না স্যার! দুজনে মিলে রাত্রে বাইরে খাওয়া, বিশেষ করে সেটা যদি বারবার হয়, একটা কথা দেওয়ার ইঙ্গিত।     

অবশ্য, ভাল করে ভেবে দেখলে, প্রায় সর্বদাই কারলিন্দা উদ্যোগটা নিত। ডিভোর্স হয়ে যাওয়া মহিলা, বুঝতেই পারছেন। খেলা থেকে বেরিয়ে যাওয়া মহিলা আবার খেলায় ফিরতে চাইছে। এর থেকে সঙ্গত আর তো কিছু হতে পারে না। সে খেলায় ফিরতে চাইছিল, আর খেলাও তার কাছে ফিরতে চাইছিল। আর নয়ই বা কেন? তার তো সম্পূর্ণ অধিকার আছে। তার বয়েস কম, সে সুন্দরী, বুদ্ধিমতী। আর সেটা যদি না-ও হত – তাহলেও তার পুরো অধিকার থাকত। খেলাটা খেলা। সমস্যাটা হল যে, দেখে যা মনে হচ্ছে, খেলার জন্যে সে একজন ভুল সঙ্গীকে বেছেছে। এই আর্তুরটা… মারধর না খেলে ও শুধরোবে না।   

আমার একটা থিয়োরি আছে: মহিলারাই সর্বদা পুরুষদের বেছে নেয়। আমার অন্য সব থিয়োরিও আছে, আর এইটা যে আমারই সে বিষয়ে আমি ঠিক নিশ্চিত নই, কিন্তু সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল কথাটার মধ্যে যুক্তি আছে। পুরুষেরা মহিলাদের সিডিউস করে? কবে থেকে? আমি স্বীকার করছি যে একজন মহিলাকে একজন পুরুষ “বেছে নিচ্ছে” সেটা আমি কখন দেখিনি, না নিজের জীবনে, না যেসব জীবন পড়েছি সেগুলোতেও (আর যেগুলো লিখেছি সেগুলোতে তো নয়ই)। উল্টোটা অবশ্যই দেখেছি, আর সেটা এতবার যে বেশ ভয় পাইয়ে দেয়। এই কেসটা আরও একটা বাস্তব উদাহরণ মাত্র। কিন্তু আমার, বলাই বাহুল্য, ব্যাপারটা সন্দেহজনক লাগছে। দেখে তার চোখে যে কেবল সৌন্দর্যই থাকে তা নয়, জীবনের মানেটাও থাকে।        

ওই গবেটটার চেয়ে কয়েক দাগ ওপরে হয়েও কারলিনা আর্তুরকে চায়। ও তাকে বেছেছিল। আর, আমি যখন আরিশ্তিদের জন্যে অপেক্ষা করছি তখন আমার সামনেই ও বুঝতে পারছে ও ভুল করে ফেলেছে এটা ভেবে যে আর্তুরও ওকে বেছেছিল।   

হিসেবের ভুল না বিচারের ভুল?

ওর আমন্ত্রণগুলো যেমন। আর্তুর তো একবার এড়িয়েই গিয়েছিল। “উম… কাল একটা জরুরি মিটিং আছে।”

কিন্তু খুব একটাও এড়ানোর চেষ্টা করেনি। কারলিনা ভেবেছিল: হয় লোকটা লাজুক কিংবা দর বাড়াচ্ছে। তার এমনকি মজাও লেগেছিল: একটা ধেড়ে লোক একটা কমবয়েসি মেয়ের মত ন্যাকামি করছে। ব্যাপারটা বেশ মিষ্টিও বটে।    

তাছাড়া লোকটা নিজেকে নির্দোষ বলে দাবীও করতে পারে না। এই তো গত সপ্তাহেই কে বলেছিল: “কারলিনা, কাল গুলবেনকিয়ান ব্যালে? আমার কাছে দুটো টিকিট আছে।”[3] (ওর পক্ষে সম্ভব হয়নি, ওর ভীষণ দুঃখ হয়েছিল কারণ ও ভীষণ ভাবে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু একদিনের মধ্যে বেবিসিটার জোগাড় করে উঠতে পারেনি।)

ভালই হয়েছে। আস্ত একটা দেবদূতের মুখোশ খুলে পড়ে গেছে। বিশেষত কারণ…

সে অপরূপ সুন্দরী। তার জন্যে মরে যাওয়াও যায়।

তাহলে ওই হতভাগাটা মরেনি কেন? ওর সমস্যাটা কি?

শান্ত হন, পাঠক, আসছি সে কথায়। যার তাড়া আছে সে গিয়ে টিভি দেখুক।

ওরা বহু বছর ধরে একে অন্যকে সামান্য চিনত। সামান্যই। কলেজে পড়ার সময় থেকেই দেখা হলে হাসত – কিন্তু দূর থেকে। আর্তুরের লজ্জা, যেটা সে প্রেমে গদগদ হলে পাহাড়প্রমাণ অপদার্থতায় বদলে যেত, কারলিন্দারও লজ্জা, যদিও তেকনিকুতে মেয়েরা ওই ধরণের বাধার সামনে খুব একটা পড়ত না। দুজনেই একই দলীয় ক্লাবের সভ্য ছিল, সত্তরের দশকে ওরা একই পার্টিতে যেত, এমনকি তখনও আর্তুরের কারলিন্দাকে “খুব মিষ্টি” বলে মনে হত। কিন্তু তখন একটা হাড্ডির পেছনে তিরিশটা কুকুর দৌড়চ্ছিল, স্নো ওয়াইট আর সত্তরটা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। (ইয়ার্কি মারছি, ওই যুগে তখনও কম্পিউটার সাইন্স বিষয়টা পড়ানোই হত না।) আর্তুর যখন ভাবছে খাপ থেকে বন্দুকটা কি করে টেনে বার করবে, তখন অন্য আরেকজন ট্রিগারটা টেনে ফেলেছে। আর বোঝাই যাচ্ছিল যে, ওই বয়ফ্রেন্ড যদি গর্দভ না হয় তো ওই প্রেমটা জগতের শেষ দিন পর্যন্ত চলবে।              

কারলিন্দার বয়ফ্রেন্ড আর যা-ই হোক গর্দভ ছিল না। প্রমাণ? সে তো মেয়েটাকে বঁড়শিতে গেঁথে তুলেছিল, তাই না?

তারপর, ঠিক যা যা হয়ে থাকে তা-ই হল। কারলিনা আর তার বয়ফ্রেন্ড শেষ অবধি একসঙ্গে থাকতে শুরু করল আর একসময়ে তাদের বিয়েটাও হয়ে গেল। তারা বিয়ে করল ভীষণ রকম পোর্তুগিজ় সব কারণে: নিষ্ক্রিয়তা আর বাস্তব বোধ। একদিকে বাবামাদের প্রভাব, যারা ওদের রীতিসিদ্ধ ঘরগেরস্থালির জিনিশপত্র আর উপহারস্বরূপ টাকা দিয়েছিল উৎকোচ হিসেবে। আর ওরা এটা বুঝতেও অক্ষম ছিল যে    “পরিবার আর মাসিপিসিদের আনন্দ দেওয়া”-টা কোন কারণ নয় গির্জায় গিয়ে এইসব আবোলতাবোল বলার, যেমন “ভাল ও মন্দের জন্যে, দারিদ্র্যে আর ঐশ্বর্যে, যতদিন না মৃত্যু আমাদের বিচ্ছিন্ন করে”। এর চেয়েও বেশি কেবল “চিরদিনের ভালবাসা”-ই হতে পারে। ভগবান! যার চিরদিনের ভালবাসার দরকার সে যেন একটা কুকুর পোষে।

লোকেদের সমস্যার সঙ্গে একটা খুব অদ্ভুত সম্পর্ক আছে: তারা বিশ্বাস করে যে, অসুখগুলোর মত এগুলোও নিজে নিজে সেরে যায় যায় যদি আমরা “সময়কে সময় দিই”। সমস্যাটা হল: সবসময় সেটা হয় না।

তারপর ওদের একটা বাচ্চা হল, তার আগেই অবশ্য কিছু কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। বিশেষ করে স্বামীটির দিক দিয়ে। যা হয়ে থাকে। আমি জানি, পাঠক, বিশ্বাস করাটা কঠিন, কিন্তু ওই যুগে প্রায় সবসময়েই স্বামীই আগে সতর্কতা আলগা করত।        

আর, এক্সট্রা টাইমেই যতরকম গোলমাল হয়। একদিন স্বামী সন্দেহজনক রকম দেরি করে বাড়ি ফিরল। কারলিনা জেগে ছিল আর মদের ঘোরে প্রচণ্ড ক্ষেপেও ছিল। বিশ্রি রকম তর্কাতর্কি হল, স্বামী অন্য মহিলাকে ছেড়ে দেবে বলে কথা দিল। কারলিনা তাকে জোরে একটা থাপ্পড় মারল, স্বামীও তাকে একটা থাপ্পড় মারল আর, বোকা দুটো “শান্তিস্থাপন” করল বসার ঘরের সোফাতে। আট মাস পরে, কারলিনা যখন পূর্ণগর্ভা, স্বামীর একজন নতুন প্রেমিকা দৃশ্যে প্রবেশ করল, সে আগেরগুলোর চেয়ে বেশি অদম্য আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। “তোমার স্ত্রী নয়ত আমি, বেছে নাও।” প্রেমিকার বয়েসটা ছিল আরও কম, কারলিনাকে দেখে মনে হত থপথপিয়ে একটা হাঁস চলেছে। স্বামী ভালই বেছেছিল।  

এখন, ওই প্রাক্তন স্বামী বছর দুই হল খেলার বাইরে, আর এইখানে আর্তুর দুজনের অন্তরঙ্গ ডিনারে। আর কারলিনাও দুজনের ওই অন্তরঙ্গ ডিনারটায়। সুন্দরী আর বাঞ্ছিতা, আমি আর আমার দোসর ঈশ্বর তার সাক্ষী। ওদের হঠাৎ দেখা হয়ে গিয়েছিল রুয়া গারেতে, খুব হেসেছিল ওরা, আবার দেখা করাটা স্থির করে নার্ভাস আর খুশি হয়েছিল। আর, পরমাশ্চর্যের কথা এই যে, তারা দেখা করেওছিল। আর আর্তুরকে চমকে দিয়ে কারলিন্দা অবশেষে ওর দিকে তাকিয়ে দেখল; ওর দিকে, যে কিনা আসলে বরাবর ওখানেই ছিল। অনেকদিন ধরে ও রয়েছে, পরিবর্তদের বেঞ্চে, একটা টেবিলল্যাম্পের মত, একটা অ্যাশট্রের মত, একটা ল্যাম্পশেডের মত।         

আর্তুরকে এখন অন্যরকম বলে মনে হয়। আরও গম্ভীর, আরও বদলে যাওয়া, খোশমেজাজ। কোন কোম্পানির ম্যানেজার বলে মনে হয়, যদিও (ও বুঝিয়ে বলেছে) সে সিইর[4] ঘোষিত খনিটাকে শোষণ করার জন্যে তৈরি কোন একটা ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্টের সহকারীর সহকারী মাত্র। কৌশলে কারলিন্দা জানতে সক্ষম হয়েছিল যে না, সে “কারুর সঙ্গে” নেই। হ্যাঁ, সে-ও একটা খারাপ হয়ে যাওয়া সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছে আর এখন পাখির মত মুক্ত। ওই খাঁচায় বন্দী পাখিগুলোর কোনটা নয়। অন্যগুলো। ওই যেগুলোকে গুলতি দিয়ে মাটিতে ফেলা যায়। অন্যগুলো। যখন সে বলল যে সে মুক্ত তখন তার মুখটা ছিল রাস্তার ধারে লাগানো দশটা পোস্টারের সমান। কিন্তু তাসত্ত্বেও, এই এতগুলো সপ্তাহ ধরে দেখা করার মধ্যে সে কখনই ঠোঁটে ঠোঁট রাখার জন্যে এগিয়ে আসেনি যেটা কিনা, হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা লোককথা অনুযায়ী, জীবন বাঁচায়।    

আর এখন ওরা এখানে বসে আছে, এই ছোট্ট ইটালিয়ান রেস্টুরেন্টটায়, নীচু গলায় (সোত্তো ভচে) কথা বলতে বলতে আর একে অন্যের সঙ্গে একটু বাড়াবাড়ি রকমের ভদ্র ব্যবহার ও আহাম্মুকেপণা করতে করতে। এই দুজনের ভদ্রতার জন্যে একটা সুইডিশ রেস্টুরেন্ট অনেক বেশি উপযুক্ত হত, কিন্তু সবাই জানে যে বাস্তবের বোধটা কখনই বিশাল কিছু ছিল না। কি মুশকিল! মেয়েটা মুক্ত, প্রস্তুত – আর ছেলেটাকে চায়। ছেলেটাও তাকে চায়। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?       

সমস্যাটা হল। হায়, সমস্যাটা। সমস্যাটা। হায়।

“কি বলতে চাও, আর্তুর?”

“কিছু মনে করো না। কিন্তু… আমাদের মধ্যে কিছু হতে পারে না।”

আর কারলিনা, অবুঝ বা চালাক বা মরিয়া, না বোঝার ভান করে:

“তোমার এ কথার মানে কি, আর্তুর?”

কাঁপতে থাকা নীচের ঠোঁটটা জানান দিচ্ছে যে ও বুঝেছে, খুব ভাল করে বুঝেছে আর্তুর ওই কথাটা বলে ঠিক কি বোঝাতে চেয়েছে।

আর্তুর মুখটা একটু বিকৃত করল। লাসান্যিয়া-টার দিকে তাকাল, কিন্তু লাসান্যিয়া-টা ওকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো না। কারলিনাকে ওর যা বলার আছে সেটা বলা কঠিন।

যে জিনিশটা বলা কঠিন সেটা সর্বদা বলা কঠিন। শ্রেণীবিন্যাসের একটা তালিকা আছে, বা অন্তত থাকত। মহিলারা সেটা খুব ভাল করে জানে।   

বিবাহবিচ্ছিন্ন মহিলাদের দর কমে যায় ক) যখন তাদের ছেলেমেয়ে থাকে, খ) সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। কোন একরকম ভাবে, ব্যাপারটা কিছুটা উচ্চমানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সেই সব স্পোর্টসম্যানদের মত যারা বড় বড় ক্লাবগুলোতে জ্বলজ্বল করে কিন্তু, তারপর, তিরিশ পুরোলেই তাদের বাজারদর পড়ে যায় আর শেষটায় তাদের থার্ড ডিভিশানের টিমগুলোতে খেলতে হয় – বা এমনকি স্পোর্টিঙেও। সময়কে যদি সময় দেওয়া হয় তো যে কোন পুরুষ একজন মহলার সম্বন্ধে বলতে পারে: “ও তো হাতের পাঁচ।”

(আমার যেমন অ্যাঞ্জেলিনা জোলির দিকে নজর আছে। আর কটা বছর যাক, দেখব কেমন আমার কোলের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ে! আমি আপনার সঙ্গে কুড়ি ইউরো বাজি ধরছি, পাঠক। ওঃ, আপনার ডলার পছন্দ। পাঠক হলেও আপনি কিন্তু বেশ ভালই বিচক্ষণ, প্রিয় পাঠক।)       

সময়, পুরুষদের হাতে সময় থাকে – জগতের সব সময়। কিন্তু মহিলাদের তো বুঝেশুনে চলতে হয়: সময়টা যে ওদের বিরুদ্ধে। সময় আর ছেলেপুলে – যেগুলো কিনা সাধারণ তালিকাভুক্ত হবার পক্ষে একজন সাইক্লিস্ট ডোপিং করে ধরা পড়ে যাওয়ার চেয়েও খারাপ। সাউন্ড অফ মিউজ়িকের গাঁজাখুরি গল্পটা চলে যায় কারণ যার সাতটা বাচ্চা ছিল সে হল ওই ক্যাবলাকান্ত ক্যাপ্টেন ফন ট্রাপ! যদি জুলি অ্যান্ড্র্যিউজ় সাতটা বামনের বিধবা মা হত তো কোনদিন পার পেত না, জগতের সব ডো রে মি ফা সল দিয়েও নয়। আমার কথাটা শুনুন, পাঠক, আমি এত দেশবিদেশ ঘুরেছি আর আমার স্মৃতিশক্তি ডাম্বোর চেয়েও বেশি উঁচুতে ওড়ে।      

আর্তুর: “আমার মনে হয় আমাদের জন্যে ভাল…”

পাথর হয়ে গিয়ে কারলিনা আর্তুরের দিকে তাকিয়েই রইল। আর্তুর প্রায় ক্ষেপে যাচ্ছিল। কারলিনা অন্তত ওর চোখদুটো যদি সরাত, এক মুহূর্তের জন্যে হলেও। ওর চ্যাঁচাতে ইচ্ছে করছিল: “ওই দ্যাখো, তোমার পেছনে, একটা পাখি! একটা প্লেন! সুপারম্যান!” কিংবা: একজন পুরুষ যে দুটি শিশুর মা একজন সুন্দরী প্রেমে গদগদ মহিলাকে দেখে ঘাবড়ে যায় না!  

কিন্তু ওই আর্তুর চেঁচিয়ে কিছুই বলল না। কেবল তার কথাটা শেষ করল:

“জানো… আমার মনে হয়… আমার মনে হয় আমাদের ভাল বন্ধু হয়েই থাকাটা অনেক ভাল… খারাপ প্রেমিক হওয়ার চেয়ে।”   

বেশ, পুরোটাই তো উগরে দিয়েছ। এবারে মাসিমণির কোলে গিয়ে বসতেই পার, আর্তুর, আইস্ক্রিমটা এবার চাইতেই পার, কাপটা এবার বাড়ি নিয়ে যেতে পার।

কারলিনা ছুরিকাঁটা নামিয়ে রাখে, আর সেটাতে শব্দ হয় – প্লেটের কিনারে স্টেনলেস স্টিলের ঠোকা লেগে। আর্তুর নীচুস্বরে, জাহির না করে কথা বলেছিল, কিন্তু কারলিনা একেবারে নিশ্চিত ছিল যে সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই কিনা জানি না, কিন্তু আমি অন্তত ছিলাম। দুজনেরই কান লাল হয়ে গেছে। “খারাপ প্রেমিক? এসব কি উল্টোপাল্টা বকছ, আর্তুর? পাগলের মত কথা বল না তো! এসব কে বলেছে? আমরা তো কেবল দুই বন্ধু একসঙ্গে ডিনার করছি, আর তো কিছু নয়। এরকম বোকামো কর না, আর্তুর।”     

আর্তুরের আশঙ্কা ছিল যে কারলিনা এটাই বলবে, ওর পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে দেবে, ধাপ্পা দেবে, ভান করবে যেন বুঝতে পারছে না ওরা খেলছে, একটা খেলা খেলছে। আশঙ্কা করছিল আর, একই সঙ্গে, এটা চাইছিলও। কারণ, ভাল করে ভেবে দেখলে, কারলিনা এটা করলে বরং ভালই হবে। যদি সে না বোঝার ভান করে তাহলে সেটা পিঠে ছুরি মারা হবে আর তাতে ওর পিঠটান দেওয়াটা সহজ হয়ে যাবে। যদি কারলিনা ন্যাকা সাজে তাহলে আর্তুরের (কারলিনার নীচতাকে নিয়ে) বিরক্ত হবার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে আর, এইভাবে, ওর শাস্তিস্বরূপ পালিয়ে যাওয়াটা ‘পুরোপুরি ন্যায্য’ হবে।        

কিন্তু ওর দুর্ভাগ্য, কারলিনা কেবল কাঁধ দুটো ঝাঁকাল, ব্যথিত হয়ে। যথেষ্ট চতুর, সে ফিসফিস করে বলল:

“বাচ্চাদের জন্যে?”

আর্তুর বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। না, না, ওর সম্পর্কে কারলিন্দা এটা ভাবতে পারল কি করে? না। অবশ্যই না!

“ন-ন্না। ক-কি করে এটা তুমি বলতে পারলে?”

আমরা যখন সব মনোযোগের কেন্দ্রে থাকি, আমরা সবাই দক্ষ সাক্ষাৎকার প্রার্থীতে বদলে যাই, মারিয়া এলিজ়া আর জুজ়ে রুদরিগশ দুশ সান্তুশের ক্লোন। একটু সময় হাতে পাওয়ার জন্যে প্রতিদ্বন্দীর দিকে বলটা ঠেলে দেওয়ার মত আর কিছু হয় না।   

“ক-কি করে এটা তুমি বলতে পারলে, কারলিনা?”

কারলিনা মাথাটা নীচু করল:

“যেন মনে হচ্ছে আমার কুষ্ঠ হয়েছে…”

কুষ্ঠ নয়, খোকা, আর্তুর ভাবল, না চাইতেও। ভাগ্যিস কথাটা ও বলেনি, কেবল ভেবেছে। ক্যালকুলেটারটা টেনে নিয়ে সে, হ্যাঁ, হিসেব করতে বসল কি কি কারণে সে নিজেকে এমন এক মহিলার সঙ্গে “জড়াতে” চায় না যাকে সে গোপনে পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে কামনা করেছে।   

১। সে কথা দিতে চায় না;  

২। সে কারলিন্দাকে/নিজেকে আঘাত দিতে চায় না;

৩। সে প্রেমে পড়তে চায় না;  

৪। সে যেমন আছে “ভালই” আছে (মাঝেসাঝে প্রয়োজন মাফিক ফ্লার্ট করা কিন্তু এমন কারুর সঙ্গে নয় যাকে সে এতটা “সম্মান করে”);  

৫। সে কারলিনাকে হারাতে চায় না, ওকে তার বড় বেশি ভাল লাগে, আর ওর সঙ্গে জড়িয়ে পড়া মানে ওকে হারানোর পথে অর্ধেক এগিয়ে যাওয়া;

৬। সে আবার ঈর্ষা অনুভব করতে চায় না বা সেইসব ভয়ানক জিনিশপত্রের মধ্যে দিয়ে যেতে চায় না যেগুলো, রমণীয় ভাবে, প্রেম ও আবেগকে সাজিয়ে তোলে যখন ওই দুটো জিনিশ একসঙ্গে পোড়ে;    

৭। চায় না, চায় না, চায় না…

কারণগুলোর ক্রমবিন্যাস একটু এলোমেলো, কিন্তু ফলটা সর্বদাই এক। চলবে না। চলতে পারত, অন্য কোন সময়ে, অন্য কোন কালে হলে চলে যেতে পারত, কিন্তু এখন চলবে না। চলবে না চলবে না চলবে না চলবে না।   

আর এই ডিনারটার, ও স্থির করল, সেটাই হওয়া উচিত। ব্যাপারটাকে শেষ করে দেওয়ার একটা মার্জিত ও সৌহার্দপূর্ণ উপায়। ব্যাপারটা বড্ড বেশি দূর অবধি গড়ানোর আগে একটা মার্জিত ও সৌহার্দপূর্ণ উপায়।    

“কিন্তু তুমি তো জানো যে আমার তোমাকে খুব ভাল লাগে, কারলিনা… আমি তোমার বন্ধু হয়ে থাকতে চাই… যদি তুমি অনুমতি দাও।”  

এইসব সময়ে কি বলা যেতে পারে? পাঠক, আপনার যদি জানা থাকে তো ২১৪ নং এক্সটেনশানে আমায় ফোন করবেন, সাধারণ অফিস টাইমের মধ্যে। সবচেয়ে ভাল পরামর্শের জন্যে পুরস্কার দেওয়া হবে।  

খেলাটা খুব সুন্দর। কিন্তু খেলাটা তো একটা শৃঙ্খলও। স্বাধীনতা স্বাধীনতা খেলছি ভেবে আমরা কিন্তু আসলে বাধ্য থাকি সীমিত সংখ্যক কিছু বিকল্প বেছে নিতে।    

আর ওদের কি হল, আমাদের সেই জুড়ির? মানে, ওদের কথাই যদি হয়, তো কিছুই হল না। কারলিনা আর আর্তুর কোনদিনই কারলিনা-আর্তুর হয়ে উঠতে পারেনি। ওরা ডিনারটা শেষ করল শান্ত শীতল ভাবে, মানে ওই পরিস্থিতিতে যতটা শান্ত শীতল ভাবে করা সম্ভব আর কি। আর্তুর বিলটা মেটাতে চেয়েছিল (ওটুকু তো ওর করাই উচিত) কিন্তু কারলিনা আধা-আধা দেবার জন্যে জোর করল। ওই যুগে তখনও মোবাইল আসেনি, কিন্তু এই ধারণাটা তৈরিই হয়ে গিয়েছিল যে পুরুষকে “ডিনারের বিলটা মেটাতে” হবে না, বিশেষ করে যদি তার অন্তর্নিহিত অর্থটা হয় যে এটা দিয়ে সে বিছানার নৈকট্যটা আরও কয়েক সেন্টিমিটার কিনে নিতে পারবে। সেক্ষেত্রে, কারলিনার ব্যাপারটা বোধহয় ঠিক এর উল্টো। ধারণাটা হল, ঠিক এই ক্ষেত্রে, আর্তুরকে ডিনারের বিলটা মেটাতে দিলে ওই অসভ্য অভদ্র লোকটা ঘোষিত শয্যার থেকে কাপুরুষের মত পালিয়ে যাওয়াটা কিনে নিত।           

কারলিনা অবশ্য বলে দিতেই পারত: “চিন্তা কর না, হাঁদাগঙ্গারাম, আমাকে কোন কথা-টথা দিতে হবে না। আমি কেবল একবারটির জন্যে হলেও তোমার সঙ্গে শুতে চাই। কত দিন হল, জানো, আমি একা একা ঘুমোই?”

কিন্তু আর্তুর জানত – আর এ ব্যাপারে আমি মনে করি যে ও এক্কেবারে ঠিক – যে মহিলারা সবসময়েই মিথ্যে বলে। তারা এই বলে শুরু করে যে ব্যাপারটা নিছকই সেক্স আর তারপর আমাদের ঝামেলায় ফেলে: “কমরেড, পবিত্র চুক্তিটাতে আমরা সই করে ফেলেছি, এখন আমরা এক যতক্ষণ না এর উল্টো কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।”  

কারণ মহিলারা জানে যে, কোন উদ্দেশ্য ছাড়া হলেও, যৌনসহবাস সর্বদাই কোন না কোন ভাবে একটা পবিত্র মন্দিরের প্রবেশদ্বার। আধাআধি বখরাতে তীর্থযাত্রার প্রথম পদক্ষেপ। কোন কোন নির্বোধ মহিলা এটা ভুলে যায়। কিন্তু এটা অন্তত আর্তুর ভাল ভাবে আন্দাজ করতে পেরেছিল, এমনকি তার ঘোর অজ্ঞতার মধ্যেও: যে বেশির ভাগ সময়েই, “ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড” দিয়ে কোন লাভই হয় না। বিশেষ করে যখন প্রেমের সম্ভাবনাটা বিশাল তখন তো কিছুতেই নয়। আমি এটা খুব একটা খুশিমনে বলছি না। বরং এর উল্টোটা হলেই আমি খুশি হতাম।[5]  

কারলিনা আর আর্তুর একে অন্যের কাছ থেকে বিদায় নিল, “এরই মধ্যে কোন একদিন” দেখা করবে বলে ঠিক করে।   

তার পর কুড়িটা বছর প্রায় কেটে গেছে। ব্যাপারটা খুবই দুঃখের কিন্তু মারাত্মক নয় অবশ্যই। দুজনের কেউই বুক ফেটে মরে যায়নি। কারলিনার কপালে শেষমেশ একটা বোকাহাবা জুটেছিল আর, সেই বোকাহাবাটার পরে আরও একটা বোকাহাবা, আরও একটা বোকাহাবা। এদের মধ্যে একজনের সঙ্গে, যাকে ও বেশ কিছুদিন হল ডিভোর্স করেছে, ওর আরেকটা ছেলেও হয়েছিল, যে এরই মধ্যে একদিন কলেজে ঢুকবে। ও যেমন সুন্দরী ছিল ওর কোন রকম সমস্যাই হয়নি। কেবল নিজের চাহিদার মাপকাঠিটা ওকে আরও একটু নামাতে হয়েছিল। আর্তুরও শেষটা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়ে চিরদিনের মত সুখী হয়েছিল।     

বাস্তবিকই ব্যাপারটা দুঃখের কিন্তু মারাত্মক নয়। প্রেমের গল্পগুলো হল বাচ্চা কচ্ছপদের মত, বেশির ভাগই সমুদ্রের তীরে মরে যায়, জলে নামা পর্যন্ত টেঁকেও না। আর এটার তো আবার একটা মজার দিকও আছে: সেটা হল আর্তুর আর কারলিনা একে অন্যকে একটা চুমুও খেয়ে উঠতে পারেনি শেষ পর্যন্ত।[6]   


[1]পিটার কার্লসেন আর আডলফ বুটেডনান্ট এই আবিষ্কারটা করেছিলেন (উইকিপিডিয়া দ্রঃ)।

[2]পিদ কি সেটা পাঠক জানেন না? আমার এক্ষণ বোঝানোর সময় নেই, কিন্তু কোথায় ছিল সেটা বলতে পারি: শিয়াদুতে রুয়া আন্তনিউ মারিয়া কার্দজ়ুর যে জায়গাটায় এখন ওই সুন্দর ফ্ল্যাটবাড়িটা আছে, সেইখানে।  

[3]হ্যাঁ, পাঠক, চাইলে বিশ্বাস করতে পারেন, এককালে ফুন্দাসাঁও গুলবেনকিয়ানের একটা ব্যালে কোম্পানি ছিল (১৯৬৫-২০০৫)। 

[4]“ইউরোপিয়ান সোশ্যাল ফান্ডজ়”। সময়টা বেশ ছিল। কেবল তারাই টাকা কামাতে পারেনি যারা চায়নি।  

[5]হ্যাঁ, হ্যাঁ, বন্ধুরা আমায় জিজ্ঞেস করে: রুই, তুই যখন প্রেমের গল্প লিখিস, কেন খালি ভেঙে যাওয়া প্রেমের গল্প লিখিস? আমি তার কোন জবাব দিই না কিন্তু হয়ত আমার বলা উচিত: কারণ এটা আমার জীবনের গল্প। আমার এটাই বলার আছে, আর একজন মানুষের তো, সে যত গল্পই বানাক না কেন, কেবল নিজের গল্পই বলার থাকে। গল্পগুলো জীবনের হিসেবনিকেশ করার কাজে লাগে, আর মানুষ নিজের হিসেবটা করবে না তো আর কারটা করবে? সেটা কি ভাল দেখায়? না, দেখায় না। কিন্তু ব্যাপারটা এরকমই, এরকমই হতে হয়, এরকম ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।    

[6]পাঠক, আপনি কি এই গল্পটা পড়ে খুশি নন? আপনি কি রক্তগঙ্গা দেখতে চেয়েছিলেন? বিষয়টা খুবই দুঃখের, সবাই আজকাল রক্ত দেখতে চায়! ঠিক আছে, আপনাকে রক্ত দেখাচ্ছি। আরিশ্তিদের কথা মনে আছে? আমার সেই বন্ধু যার জন্যে আমি অপেক্ষা করছিলাম? বেশ, তাহলে শুনুন, সে আসলে দেরি করেনি। সে রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়িচাপা পড়েছিল। আর, আমার যদি খুব একটা ভুল না হয়ে থাকে, ওকে চাপা দিয়েছিল একজন পাঠক যে খুব তাড়ায় ছিল পাশের ওই হতচ্ছাড়া হলটায় একটা সিনেমা দেখবে বলে ঠিক সময়ে পৌঁছনোর জন্যে। এবার খুশি তো?     

ঋতা রায়
 ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।   

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.