A Short Story By Afonso Cruz Translated By Rita Ray

বাংলা English

AFONSO CRUZ
আফন্সু ক্রুশের জন্ম ১৯৭১ সালে মধ্য পোর্তুগালের অ্যাটলান্টিক তীরবর্তী শহর ফিগাইরা দা ফশে। তিনি একাধারে লেখক, শিল্পী ও “দ্য সোকড ল্যাম্ব” ব্যান্ডের সদস্য। এখনও অবধি তিরিশটিরও বেশি বই লিখেছেন, যার মধ্যে, নাটক, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, কিশোল গল্প ও ফোটো-টেক্সট আছে। ওঁর লেখা কুড়িটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং তিনি বেশ কয়েকটি পুরস্কারও পেয়েছেন।   ওঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে আছে উশ লিভ্রুশ ক্য দ্যভুরারাঁও উ মেউ পাই, আ বুনেকা দ্য কোকোশকা, উ পিন্তর দ্যবাইশু দু লাভা-লইসাশ, জেজ়ুশ ক্রিশ্তু বেবিয়া সিরভাইজা ও নেঁই তোদাশ আশ বালাইয়াশ ভুয়াঁও। এই গল্পটি “আ কেদা দ্য উম আঞ্জু” ২০১২ সালে দৈনিক সংবাদপত্র “দিয়ারিউ দ্য নোতীসিয়াশ”-এর সঙ্গে ক্রোড়পত্র হিসেবে বেরিয়েছিল।   

এক দেবদূতের পতন

আফন্সু ক্রুশ
অনুবাদ: ঋতা রায়

সপ্তম

এই সপ্তম বৃত্তে আলোটা খুব তীব্র। ঢোকার মুখে আমাকে যে কানাওয়ালা বেতের টুপিটা দেওয়া হয়েছিল, একটা কালো ফিতে লাগানো, সেটা পরে নিলাম। এবার আশপাশের দৃশ্যটা, আরামকেদারাগুলো, দেবদূতদের, ভগবানকে, অসীমের অন্য সব বাসিন্দাদের ভাল করে দেখতে পাচ্ছি। কখন ভাবিনি যে স্বর্গে আরামকেদারা থাকবে, এমন একটা আসবাব যেটা মহাপাপগুলোর মধ্যে একটার খুব বন্ধু। আলোর জন্যে চোখদুটোকে ঢেকে ফেলি। বড্ড বাড়াবাড়ি, বড্ড বেশি আলো, একটা বোতাম থাকা উচিত ছিল নামিয়ে দেবার জন্যে, ছায়া দেবার জন্যে, যেমন অগাস্টের দুপুরে আমরা জানলার ব্লাইন্ড নামাই। ব্লাইন্ড লাগানো স্বর্গটাকে কল্পনা করতাম। আশা করি এতখানি উজ্জ্বল একটা দিনের হাত থেকে স্বস্তি দেওয়ার জন্যে একটা রাত থাকবে।       

গরাদগুলোকে শক্তপোক্ত বলে মনে হচ্ছে, নীল রঙ করা, যেটা আকাশের সঙ্গে ভাল মানায়। কিন্তু আমায় নালিশ করতে হবে। আমার স্বামী কোথায়? আমার সামনে একজন দেবদূত এসে উদয় হয়, পুরো শাদা পোষাক পরা। তার মুখটা স্পর্শ করার জন্যে হাতটা তুলেই ফেলেছি প্রায়, এত নবীন, এত সুন্দর, এত আলোয় ভরা। তার বদলে, আমার মুখ দিয়ে একটা কাঠখোট্টা প্রশ্ন বেরিয়ে আসে: আমার স্বামী কোথায়? দেবদূত জানে না কি বলবে। ওকে বলি যে আমার স্বামী ভাল লোক নন, তিনি স্বর্গে যাবার মত মানুষ নন বলে ওরা মনে করতেই পারে, তাতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সত্যিটা হল আমি যদি স্বর্গে যাই, আমি যদি তার যোগ্য হই, তাহলে আমার সঙ্গে আমার স্বামীকেও থাকতে হবে। আমরা যাদের ভালবাসি তাদের থেকে আলাদা হয়ে আমাদের অনন্তকাল কাটাতে হবে, এটা কোন দেশী কথা? দেবদূত আমাকে শান্ত হতে বলল, কিন্তু আমি এই ধরণের কিছু মেনে নিতে পারি না। ওদের খুব আলো আছে, কিন্তু আমরা যাদের ভালবাসি তাদের ওরা ভুলে যায়! আমার স্বামী খারাপ হতে পারেন, কিন্তু আমরা যদি এরকম লোকেদের ভালবাসি তাহলে আমাদের কি করা উচিত? অনন্তকাল তাদের ছেড়ে থাকা? এটা ছাতার মাথা কি রকমের স্বর্গ? দেবদূত কাঁধ ঝাঁকাল। কখন ভাবিনি যে দেবদূতেরা কাঁধ ঝাঁকাবে, অবশ্য এটাও কখন ভাবিনি যে ওদের কাঁধ থাকতে পারে।             

পরপর শাদা বিছানা আসতে থাকে। শাদা আমার ভাল লাগে, এটা স্বাস্থ্যবিধির লক্ষণ। একটা
লোক আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর তার গোঁফ আছে। এটা আরেকটা জিনিশ যেটা আমি দেখব ভাবিনি। এসব চুলদাড়ি কিসের জন্যে? আমাদের কি এগুলো কাটতে হবে না কি এগুলো আর বাড়বেই না? বলাটা কঠিন। মনে হয় এখনও একটা দিন কাটেনি, কিন্তু কে এরকম একটা জিনিশের ব্যাপারে নিশ্চিত করতে পারে? সময়টা এখানে নিশ্চয়ই অন্যরকম ভাবে চলে। হয়ত অনন্তকাল কেটে গেছে। সময় খুব আপেক্ষিক আর সেটা যে কি তা আমি খুব ভাল করে জানি। আমার একজন কাকা ছিলেন যিনি কথা বলার জন্যে একবার মুখ খুললে মনে হত আর কখনই তিনি চুপ করবেন না, মনে হত যেন অনন্তকাল কেটে গেছে। টেবিলের ওপরে একটা ফুলদানী আছে আর অনেকগুলো দেবদূত। ওদের বলি যে আমার স্বামী এখানে নেই, যে তিনি যদি এখানে থাকার পক্ষে যথেষ্ট ভাল না হয়ে থাকেন তো আমি নরকে যাওয়াই পছন্দ করব। অন্তত আমরা দুজনে একসঙ্গে তো থাকব। ওরা আমাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু আমি হাল ছাড়ব না। ওরা আমাকে জাপটে ধরে একটা ঘরে নিয়ে যায়। আমাকে খাটে বসিয়ে মিষ্টি গলায় আমার সঙ্গে কথা বলে। আমাকে শুইয়ে দেয়, আমার জন্যে এক গেলাস জল নিয়ে আসে আর আমার, কয়েক মিনিটের মধ্যেই, ঘুমোতে ইচ্ছে করে। রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠি (তাহলে স্বর্গেও রাত আছে) আর একটা আলো জ্বালানোর চেষ্টা করি কিন্তু সেটা থেকে খালি অন্ধকারই বেরয়। আমাকে নরকে পৌঁছতে হবে, আমি ভাবি, আমাকে নরকে পৌঁছতে হবে।

ষষ্ঠ

আমি ষষ্ঠ বৃত্তে আছি আর নরকের দিকে আমার যাত্রা শুরু করেছি। অনেক কিছু মনে পড়তে শুরু করে, মনে রাখার ছোটখাট জিনিশ, সমুদ্রের ধারে যাওয়া। আমি কিরকম সমুদ্রের ধারে যেতে ভালবাসতাম, বালি ভালবাসতাম, সূর্যের আমার শরীর গলিয়ে দেওয়াটা ভালবাসতাম। আমার স্বামী ভালবাসতেন না। যখন আমি জলের ধার অবধি হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম, উনি তখন বিয়ার খেতে খেতে আর খেলার কাগজ পড়তে পড়তে তোয়ালের ওপর শুয়ে থাকতেন। তারপর – যেহেতু আমি কখন সাঁতার কাটতে শিখিনি, একমাত্র জিনিশ যেটা আমি পারতাম তা হল একদম নীচে চলে যাওয়া – নীচু হয়ে বালিতে বসতাম, যাতে ঢেউগুলো আমার বুক, মুখ, চুল ভিজিয়ে দেয়। তারপর উঠে দাঁড়ালে সবকিছু ঝাপসা দেখতাম, হাত দিয়ে চোখ কচলাতাম, সেগুলো জ্বালা করতে থাকত আর বালিতে ভর্তি হয়ে থাকত, আর আমি ঘুরে দেখতাম আমার স্বামী আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কিনা। মনে হয় কখনই সেটা করতেন না, কিন্তু আমি কখন নিশ্চিত হতে পারিনি, কারণ যদিও তিনি আমি ফিরলে সবসময়েই অন্য কোন একটা দিকে তাকিয়ে থাকতেন, কিন্তু আমি যখন স্নান করার জন্যে পেছন ফিরে থাকতাম তখন যে উনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন না এ ব্যাপারে কোন কিছুই আমাকে নিশ্চিত করতে পারেনি। হয়ত উনি লজ্জার চোটে ভান করতেন। মনে আছে আমার আঙুলগুলো সব জলে থাকার জন্যে কুঁচকে আছে, দেখে মনে হচ্ছে যেন শুকনো প্লাম, আর  সেগুলোকে আমার স্বামীকে দেখাতে ইচ্ছে হল। হাতদুটোকে লম্বা করে বাড়িয়ে ধরে দৌড়ে তাঁর কাছে গেলাম আর আমার আঙুলের কুঁকড়ে থাকা ডগাগুলোকে দেখালাম। আমার স্বামী কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন আমি যেন ওঁকে শান্তিতে থাকতে দিই। উনি ঠিকই বলতেন, আমি বরাবরই খুব ছেলেমানুষ ছিলাম। আমার এত বুড়ো বাচ্চা হওয়াটা সহজ নয়। অনেকবার আমি নাচতে চাই আর আমার পাগুলো কেবলই কাঁপে, আমি যা চাই তার সঙ্গে ওরা একমত হয় না আর তাতে আমি খুব দুঃখ পাই। আমি আমার পাদুটোকে অপমান করি আর ওদের বলি যে ওরা বুড়ি হয়ে গেছে, জীবনটাকে ওরা আর উপভোগ করতে জানে না, আর তাই, কিভাবে সুখী হতে হয় সেটা ওদের দেখানোর জন্যে, আমি সত্যিসত্যি নাচি, কিন্তু পাদুটোকে না নাড়িয়ে, কেবল হাতদুটোকে দুলিয়ে দুলিয়ে। আর যখন সেগুলোও ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আমি কেবল কল্পনা দিয়ে নাচি আর তখন আমি বড় বড় লাফ দিই আর, ওই সময়ে, আমায় কেউ বকে না, এমনকি আমার স্বামীও না, যিনি খেলার কাগজটা পড়তেই থাকেন।     

পঞ্চম

আমার পিঠটা খুব চুলকোচ্ছে। কি অদ্ভুত কাণ্ড, মানে পিঠটা কি করে চুলকোতে পারে? স্বর্গে তো পিঠ থাকারই কথা নয়, আমরা যদি সেখানে হাত না নিয়েই পৌঁছাই। করার মত আমার বড্ড বেশি নালিশ জমা হতে শুরু করে। জগৎটা যে ত্রুটিহীন নয়, সেটা বোঝা যায়, কিন্তু এরকম স্বর্গ তো মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আমার বোধহয় দেবদূতদের অনুরোধ করা উচিত আমার পিঠটা চুলকে দেবার জন্যে, কিন্তু ওদের একজনকেও তো দেখতে পাচ্ছি না। বলা হয়ে থাকে দেবদূতদের পিঠ হয় না, যেটা পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত। হয়ত আমারও নেই আর আমার যে চুলকুনিটা হচ্ছে সেটা ওই লোকগুলোর মত, সৈন্য আর ওই ধরণের সব লোক, গ্যাংগ্রিন যাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে সেইজন্যে করাত দিয়ে পা কেটে ফেলার পরও যাদের পায়ে ব্যথা হয়। শরীরের এমন একটা অংশ যেটা আমাদের আর নেই সেখানে চুলকুনি হওয়াটা বিশাল একটা নরকযন্ত্রণা। সেটা হল টাকার ব্যাগ না নিয়েই বাজার করতে যাওয়ার মত।  

সেটাই তো, আমি নিশ্চিত যে আমার কোন পিঠ নেই। যদি কেউ আমার কাছে এসে আমায় ছোঁয়, তার হাত আমার শরীরে না লেগে বরং নিশ্চিত ভাবে আমার আত্মায় এসে লাগবে। যদি আমার কাঁধে একটা থাপ্পড় মারা হয় তাহলে সেটা আমার হৃদয়ে এসে লাগবে। এসবই খুব গভীর ব্যাপারস্যাপার, কোন কিছুই ওপর-ওপর নয়, শোকেস আর মলের মত। গলাটা চুলকোনোর চেষ্টা করলে কথাগুলোকে চুলকোতে শুরু করি আর আমার গলাটা ফ্যাঁশফ্যাঁশে হয়ে যায়।      

আমার পায়ের পাতাদুটোর চামড়া কুঁকড়ে গেছে। ওটা বোধহয় আমার ধারণা মাত্র। যেন আমি অনেকক্ষণ ধরে বাথটাবে শুয়ে ছিলাম, ওই যেমন আমি যখন সমুদ্রের ধারে যেতাম আর আমার স্বামী আমার দিকে না তাকানোর ভান করতেন। আমার সবসময়েই বাথটাব থেকে বেরতে খুব ভয় করে, যদি পা পিছলে পড়ে ফিমারের মাথাটা ভেঙে যায় আর আমাকে সেরে ওঠার জন্যে বিছানায় লম্বা হয়ে পড়ে থাকতে হয়, মাসের পর মাস ধরে, হাঁচতেও না পেরে, নইলে হাড়টা ঠিকমত জুড়বেই না। আর যে আমার কিনা অ্যালার্জি হয়, বিশেষ করে বসন্তকালে। ফুলের রেণুগুলো আমার নাকের বারোটা বাজিয়ে দেয়। কি অবস্থা: ফুলেদের জন্যে আমার পায়ের হাড় জুড়তে পারবে না। উতলা হলে চলবে না, আমার পাটাকে দরকার না-ও হতে পারে, হাঁটার আর ওড়ার অন্য কোন উপায় আছে নিশ্চয়ই। আমার এক বন্ধু ছিল যে বলত সে নাকি কল্পনা দিয়ে বেড়িয়ে বেড়ায়। আমার কল্পনাটার একটু বয়েস হয়ে গেছে, যেন সেটা বড্ড বেশিক্ষণ বাথটাবে পড়ে ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় ওটা এখনও কাছেপিঠে ঘুরে বেড়ানোর পক্ষে, এক ভাবনা থেকে আরেক ভাবনায় উড়ে যাওয়ার জন্যে যথেষ্ট।           

হ্যাঁ, মাথাটা বেশ ভালই কাজ করছে। আমার অতীতের জায়গাগুলো থেকে খুব তাড়াতাড়ি ঘুরে আসি, ঠিক যেন একটা সবুজ মাঠে দৌড়চ্ছি। আমার বেড়াল ভ্যান গগকে দেখতে পাই, যার লোমগুলো খুব বড়বড়, আর আমার জন্তুজানোয়ারের লোমে অ্যালার্জি আছে, কেবল ফুলের রেণুতেই নয়, তাই ওকে ধরি না, কিন্তু ওর ওপরে আমার চোখটা বুলাই, যেটা গায়ে হাত বোলানোর মত একই কাজ করে, আর ও ঘুড়ঘুড় করে আর আমার দৃষ্টিটাকে এমনভাবে অনুভব করে যেন সেটা আমার আঙুল। আমি ভ্যান গগকে খুব ভালবাসি, ওর পাগুলো বেঁটে বেঁটে আর ল্যাজটা লম্বা। একটা কুকুরের জন্যে ওর একটা কান নেই। ও ইঁদুর আর পায়রা শিকার করে আর মাঝেমাঝে আমাদের ঢাকা বারান্দাটা পালক আর মরা জানোয়ারে ভরে থাকে। ও খুব ভাল শিকারী আর আমি ওকে এটাই বলি, কারণ ব্যাপারটা খুবই দুঃখের হয় যখন আমরা কোন ভাল কাজ করি আর কেউ সেটা খেয়াল করে না। আমি সবসময়েই মাঝখানে পড়ে কথা বলায় ওস্তাদ ছিলাম, কিন্তু আমার মা আর আমার বাবা কখনই সেটা খেয়াল করেনি, আর ওরা বলত যে আমায় রান্না করতে আর একজন নারী হতে আর খাটতে শিখতে হবে। আমি সেটাই করেছিলাম, কিন্তু নারী হবার চেয়ে বা ডিম ভাজার চেয়ে আমি কথা বলাতেই বেশি ভাল ছিলাম। কুসুমগুলো খুব কমই ফ্রাইং প্যান থেকে আস্ত বেরত। কখন কখন আমার স্বামী আমাকে ডিম ফ্রাই করে দিতে বলতেন আর আমি কড়াইশুঁটি দিয়ে ভাত রান্না করতাম। উনি খুব বিরক্ত হতেন, কিন্তু কুসুমটা ফাটিয়ে ফেলার চেয়ে তো ওটাই ভাল ছিল।          

চতুর্থ   

প্রথমবার যখন আমি আর আমার স্বামী সহবাস করেছিলাম সেটা ছিল একটা ক্যারাভানের মধ্যে যেটাকে উনি সেকেন্ড হ্যান্ড কিনেছিলেন, ওটাকে দেখতে ছিল পুরো শাদার ওপরে নীল সিগাল। ওগুলো সত্যিকারের সিগাল ছিল না, ওগুলো ছিল স্টিকার আর তারা উড়তে পারত না, যদিও তাদের ডানাগুলো মেলা ছিল। ক্যারাভানে একটা টেবিল ছিল যেটা বসার ঘরের আর নীল-লাল কাপড়ের কাজ করত। আমার স্বামী – যিনি ওই নীল সিগাল লাগানো ক্যারাভানটা কেনার সময়ে তখনও আমার স্বামী হননি – আমাকে একটা চড় মেরেছিলেন কারণ আমি মুখ দিয়ে কয়েকটা জিনিশ করতে চাইছিলাম না। বেশ হয়েছিল, আমি খুব বোকা ছিলাম, একটা বাচ্চার মত ছিলাম আর উনি ছিলেন একজন খুব বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মানুষ যিনি জাহাজে করে অনেক ঘুরেছিলেন আর জগৎটাকে দেখেছিলেন। ওই বিকেলের পর আমি অনেক বেশি নারী হয়ে উঠেছিলাম। ব্যালেরিনাদের চুলে লাগানো ফুলগুলো আর আনকোরা নতুন লম্বা সব গাউন নিয়ে স্বপ্ন দেখলাম। খালি পা মেয়েরা যারা নিজেদের ভেতরেই দৌড়ে বেড়াত আর চিরদিনের জন্যে অদৃশ্য হয়ে যেত, আমি তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখলাম। ওই সময়ে, স্বপ্নে অনেক কিছু দেখতাম আর, আমার স্বপ্নগুলোতে, সবসময়েই মৌমাছির মত ফুলের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে বেড়ানো জন্তুজানোয়ার থাকত, আর থাকত দরজিরা যারা ইয়েলো ফিভারে মরে যেত, আর ঈজিপ্টের পিরামিডগুলোর স্থপতিরা থাকত যেগুলো সোপস্টোন দিয়ে তৈরি হত।        

একবার একটা শাদা পোষাক পরেছিলাম, ক্যারাভ্যানটার মত, আর শেষমেশ জামাটাকে নোংরা করে ফেলেছিলাম, শাদা তো অনেক দাগ-ছোপ আকর্ষণ করে। সেটা ছিল সেইদিন যেদিন আমি বিয়ে করলাম। শাদা স্বামীদেরও আকর্ষণ করে আর দাগগুলো হল পাখিদের মত, আমাদের চারিপাশে উড়ে বেড়ায় আর কাচা কাপড়ে গিয়ে বসে।    

আমি খুব দ্রুত নরকের দিকে নেমে যাচ্ছি। আমার গালগুলো, সারা মুখটা যে গরমে তেতে উঠছে সেটা আমি অনুভব করতে পারছি। আগে আমি ঘড়ির দিকে না তাকিয়েই সময় দেখতে পারতাম আর কখনই দুয়েক মিনিটের বেশি ভুল করতাম না।   

তৃতীয়

আমার স্বামী ছিলেন এমন একজন পুরুষ যিনি, জীবনের একটা সময়ে এসে, বছরগুলোকে জমা করতে শুরু করলেন। সেগুলোকে বাঁচার বদলে জমা করতে লাগলেন। তিনি অনেকদিন বেঁচেছিলেন, কিন্তু সে বিষয়ে তাঁর কোন ধারণা ছিল না। আমার স্বামী এতটাই বুড়ো ছিলেন যে তিনি আর বুড়ো হতেন না, কেবল পচতে থাকতেন। আমি ওঁকে খুব ভালবাসতাম আর অনন্তকাল ধরে ওঁকে আমার পাশে না নিয়ে আমার পক্ষে অনন্তকাল বাঁচা সম্ভব নয়। আঁকা ছবিগুলো কাঁচি দিয়ে কাটা যায়। মনকে কথা দিয়ে কাটা যায়। আমি সর্বদাই এটা খুব ভাল ভাবে করতে পারতাম, ওটা তো নখ কাটার মত। আমি সর্বদাই এতে খুব ভাল ছিলাম। কেউ কেউ আছে যারা খুব ভাল করে লাইনের ওপর দিয়ে লাফাতে পারে, আবার এমনও কেউ কেউ আছে যারা দুহাত দিয়েই কফিটা নাড়তে পারে – কখনও বাঁ হাত দিয়ে, কখন ডান হাত দিয়ে – আর অন্যরা আবার একই সঙ্গে হিসেব করতে আর নাচতে পারে। আমি ভাল কথা কাটতে পারি। সবাই যে যার গুণ নিয়ে জন্মায় আর আমারটা হল নখ কাটার মত করে কথা দিয়ে কাটা, একেবারে বুঁচিয়ে।        

যখন বয়েসটা কম ছিল আমি স্যান্ডেল পরতাম আর নখে রঙ লাগাতাম। যখন আমাদের বয়েস কম থাকে তখন আমরা অসীম থাকি আর, বুড়ো হওয়ার বদলে আমরা বাড়তে থাকি। তারপরেই আর কি আমরা, বাড়তে থাকার বদলে, বুড়ো হতে শুরু করি। তখন আমরা চিরটাকাল টিকে থাকাটা ছেড়ে দিই আর দাদু-দিদা হতে আর ফুল পছন্দ করতে আর খুব আস্তে আস্তে চলতে আর খুব কষ্ট করে নীচু হতে শুরু করি। যেটা কিনা খুবই দুঃখের, কারণ ফুল যেহেতু আমাদের আরও ভাল লাগতে থাকে, সেগুলোকে তুলে সেগুলোকে চেস্ট অফ ড্রয়ার্স আর বসার ঘরের টেবিলের ওপরে ফুলদানিতে জল দিয়ে রাখার বিশাল একটা প্রবণতাও আমাদের থাকে। সবকিছু সুগন্ধে ভরে থাকে, সবকিছু ফুলে ছেয়ে থাকে আর রঙে ভরে থাকে। অতিথিদের খুব পছন্দ হয় আর তারা প্রশংসা করে। আমি প্রশংসা করার জন্যে ধন্যবাদ দিই আর বলি: দেখুন, মিসেস গুশমান, এটা কিন্তু কোমরের পক্ষে ক্ষতিকারক।    

দ্বিতীয়

কেবল পুরুষদেরই চুল পড়ে না, বা হেমন্তে গাছেদের, মেয়েদেরও পড়ে, আর আমার এখন খুব একটা বাকি নেই। ইদানীং, যখনই আয়নাতে নিজেকে দেখি মাথার ঢালটা দেখতে পাই।     

চোখ দুটোকে রগড়ানোর সময়ে আসলে যা রগড়াচ্ছি তা হল অনেকগুলো শতাব্দী জোড়া দৃষ্টি। কারণ একজন মানুষের তো কেবল তার নিজের অতীত থাকে না, তার সব আত্মীয়ের, সব বন্ধুর অতীতগুলো আর যেসব গল্প সে পড়েছে বা শুনেছে সেগুলোও থাকে। তাই না? যখন আমরা চোখ কচলাই, তখন অনেকগুলো শতাব্দীকে আমরা রগড়াই।         

একদিন, আমার স্বামী ঘুম থেকে ওঠার পর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না, মুখ দিয়ে কেবল ফোন কেটে যাওয়ার আওয়াজটা বেরতে লাগল। মুখ খুললেই যন্ত্রের একটা আওয়াজ বেরচ্ছিল। ওঁকে একটা চুমু খেলাম, সেটা উনি বুঝলেনও না, কিন্তু ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল, আর আমার যখন ওঁর জন্যে মনকেমন করত, যখন উনি অনেকদিন বাইরে থাকতেন, আমি রিসিভারটা তুলে অপেক্ষা করতাম যতক্ষণ না ফোন কেটে যাওয়ার আওয়াজটা শুনতে পাই।    

আমি আমার স্বামীকে বলতাম আমার কথাগুলো একেবারে অস্থিমজ্জার গা ঘেঁষেই থাকে। ওঁকে বলতাম যে ব্যাপারটা নখ কাটার মত। মাঝেমাঝে সেইসব কথাগুলো, যেগুলোকে আমার চারপাশে দেখতাম সেগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখাতাম। উনি ভীষণ বিরক্ত হতাম যখন আমি এটা করতাম। ব্যাপারটা হল আমি সবসময়েই কয়েকটা কথাকে দেখতে আর শুনতে পেতাম যেগুলো বাড়ির সব হল আর ঘরে থাকে। একটা ঘরে ঢুকলেই আমি খুব পুরনো সব কথা শুনতে পাই যেগুলোকে এক বছর বা এক সপ্তাহ বা আরও কম সময়ের আগে বলা হয়েছে। এমন সব কথা বলা হয়ে থাকে যেগুলো কখনই আর মুছে যায় না।      

প্রথম   

যখন আমার বয়েস অল্প ছিল তখন ভেবেছিলাম যে শেষগুলোকে নতুন করে শুরু করা দিয়ে বদলে ফেলা উচিত যাতে অনেক জিনিশকে পুঁতে না ফেলতে হয়। তারপর, যখন বুড়ো হলাম, ভাবলাম যে পোঁতায় হয়ত আরও বেশি সময় দেওয়া উচিত। এটা ডালিয়া আর ডেইজ়ির ব্যাপারে কাজে দেয়। আমরা বীজ পুঁতি আর সেটা সূর্যের দিকে বেড়ে ওঠে। আলোহীন দেহদের নিজেদের দেখানোর আর আকাশ ফুঁড়ে বেড়ে ওঠার বাসনা থাকে যেন তারা সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। আমরা কিছু পুঁতলে সেগুলো বেড়ে ওঠে, দেখা দেয়, মোটা হয়, সবুজ হয়ে ওঠে। এটা একটা ভাল কসরত আর এমন কিছু যেটাকে আমি প্রায়ই করতাম: নিজেকে বাগানে পুঁতে ফেলা। আমার এটা করাকে আমার স্বামী ভীষণ অপছন্দ করতেন, কিন্তু সেটা আমাকে বাঁচার ইচ্ছেটা দিত আর আমি মাটি থেকে বেরিয়ে আসতাম ডালিয়া আর ডেইজ়িগুলোর মত, পাপড়ি আর রঙে ভরা। ঢুকতাম শাদায় কালোয় আর বেরতাম সুখের মত। তারপর অনেকটা সময় কাটাতাম জামাকাপড় পরিষ্কার করতে করতে আর, তিনবার, আমার গায়ে পোকা হয়েছিল। একটা খবরের কাগজ জ্বালিয়ে সেগুলোকে আমায় ধরতে হয়েছিল আর খবর পোড়ানোটা আমার খুব অপছন্দের। লোকে বলে যে ওসব নাকি কোন কাজের নয়, কিন্তু আমার মনে হয় যে ওগুলো খুব জরুরি, কারণ ওগুলো আমাদের জানায় আমাদের জীবন অতলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর ভুল লোকেদের ভোট দিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই, কারণ গণতন্ত্র তো এই কাজেই লাগে, যতদূর আমাকে বোঝানো হয়েছে।     

আমি পুরোপুরি নগ্ন আর নিজেকে আমার খুব কমবয়েসি বলে মনে হচ্ছে। নরকের কাছাকাছি হওয়াটা ত্বকের পক্ষে খুব উপকারী। গাড়ির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি আর সেটা আমাদের কিছু একটা বলে…

উপসংহার – বা একতলা     

আমার মামাতো বোন, এমা দ্য জেজ়ুশ, স্বর্গ নামের বৃদ্ধাশ্রম – যার মাঝখানের একটা বিল্ডিঙের সাততলায় ও থাকত – তার জানলা থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল, ওখানে সম্প্রতি সে থাকতে এসেছিল, তার স্বামী মারা যাবার ঠিক পরেই। আমার সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম যখন ওর স্বামী বহুদিন ভোগার পরে মারা গিয়েছিল। ব্যাপারটা খুবই দুঃখের কিন্তু এ নিয়ে ভণ্ডামী করার কিছু নেই।      

সবসময়েই শুনে এসেছি যে সময় খুব আপেক্ষিক। আমার এক মামার কথা মনে পড়ছে যিনি, একবার মুখ খুললে, মনে হত যেন আর কখনই তিনি চুপ করবেন না, সেইসব ভাষণ মনে হত যেন অনন্তকাল ধরে চলছে। আশা করি আমার মামাতো বোনের পড়াটা ওর চোখের সামনে ওর সারাটা জীবন মেলে ধরেছে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে, যেমনটা এইসব ক্ষেত্রে ঘটে বলে শুনে আসছি, এমনভাবে ঠিক যেন ও সেটা আবার কাটাচ্ছে। বা অন্তত যেসব জিনিশ ওর খুব প্রিয় ছিল সেগুলোর কয়েকটা ওকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। আমার মনে হয় বিরাশিটা বছর সাতটা তলা পড়ার মধ্যে ঠিকঠাক এঁটে যায়।       

স্বর্গ বৃদ্ধাশ্রমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

ঋতা রায়
ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংক্স্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.