মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (তৃতীয় পর্ব)

বাংলা English
Rui Zink
 Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.  
Cover Page of O amante e sempre o ultimo a saber

মেরুভল্লুকের প্রেম

কথা দেওয়া ছিল

তানো আর কুর্তু, পাড়ার ক্যাফেটাতে। বহু বছরের বন্ধু। কুর্তু কারাতের চতুর্থ ও কেনদোওর[1] দ্বিতীয় দান[2] আর, তার কদম-ছাঁট করা মাথা নিয়ে, তাকে সত্যিকারের একজন জ়েন গুরুর মত দেখতে লাগে। সে – মাঝবয়েসী একজন লোকের পক্ষে যতটা সম্ভব – সিরিয়াস, সামরিক, দৃঢ়চেতা। তাকে পাশ থেকে দেখলে অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ-এর (১৯৭৯) খ্যাপা কর্নেল কুর্টজ়ের কথা মনে পড়ে যায়, যদিও এই দুজনের মধ্যে সামরিক ভাবটা ছাড়া আর কোন মিল নেই। আর, অবশ্যই, ওই আদুড় মাথা। আর, হ্যাঁ, প্রায় একই শুনতে নাম দুটো। কুর্তু কিন্তু পাগল নয়। সে যদি কিছু হয়েই থাকে তো তা হল যথেষ্ট বিচক্ষণ। তাই সে বন্ধুকে জোর করল না। তার যখন মনে হবে তখনই সে তার মনের কথাগুলো ওগরাবে। জোর করে ওর পেট থেকে কথা বের করা? তাতে কেবল ওর পেটটাকেই কষ্ট দেওয়া হবে।     

অবশেষে, তানোর কথা বলার সময় এল।  

– মহিলা চায় যে আ্মি তকিও যাই।  

কুর্তু ভান করল যেন সে গতকালই জন্মেছে:

– সে তো ভাল, তাই না? কতদিন হল জাপান যাস না? দশ বছর?

তানো ত্রেমোসুর[3] পিরিচে তার দৃষ্টিটা নিবদ্ধ করল।  

– তারও বেশি।  

 কুর্তু শিস দিল:

– সত্যি বলছিস?

তানো এশীয় চোখ[4] নিয়ে কুর্তুর দিকে তাকাল:

– আমি ইয়ার্কি মারতে যাব কেন?

– এশিয়ানদের মত চোখ করে এই চালাকিটা যখন করিস আমার জঘন্য লাগে – কুর্তু বলে, একটা ত্রেমোসু মুখে পুরে।

তানো তার এশীয় চোখগুলোকে নড়ায় না।

কুর্তু দীর্ঘশ্বাস ফেলে:

– জানিসই তো আমার ওপর এটা কাজ করে না।

তানো এশীয় চোখগুলোকে শিথিল করে:

– আমি জানি।  

ওরা আরও গোটাকয়েক ত্রেমোসু খায়, আরও এক ঢোক ইম্পেরিয়াল[5] খায়। আরো দুটো ইম্পেরিয়াল দেবার জন্যে কুর্তু ইশারা করে। বেয়ারা, যে কিনা আসলে বেয়ারা নয়, ওই ক্যাফের মালিক, আরও দুটো নিয়ে আসে। ভাল করে ড্র[6] করা।

ওটা শহরের একটা অনির্দিষ্ট এলাকা, এমন একটা পাড়া যেখানে লোকে কেবল রাতে ঘুমোতে আসে। তাসত্ত্বেও, জীবন যেহেতু নিজেই ম্যানেজ করে নিতে ওস্তাদ, বছরগুলো গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কতগুলো মোড়ের ক্যাফের উদয় হয়েছে, আগাছার মত, যেটার মধ্যে কোন জীবনই নেই সেটাকে জীবন ধার দিয়ে। কুচ্ছিত দেখতে সব ক্যাফে, এমন সব টাইল লাগানো যে মনে হয় ওটা আসলে একটা বাথরুম আর কাউন্টারগুলো অ্যাল্যিউমিনিয়ামের; কিন্তু এই কুচ্ছিত সব ক্যাফে হল যেখানে লোকে একে অন্যকে চেনে, সেইসব ক্যাফে যেগুলো, এক ধরণের একটা প্রতিবেশীসুলভ মেজাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে, তা সে ভাল হোক বা মন্দ।   

কুর্তু আরও একবার চেষ্টা করল:

– সত্যিসত্যিই মহিলা চায় যে তুই ওর সঙ্গে তকিউ যাস?

তানো কিছু বলে না। ও জানে যে প্রশ্নটা আসলে কোন প্রশ্ন নয়।

– আর এই সবকিছু ওই ছোঁড়াটার জন্যে?

তানো কিছু বলে না। ও জানে এই প্রশ্নটাও আসলে কোন প্রশ্ন নয়।

– কি ঝামেলা, ভাই! ছোঁড়াটা উন্মাদ ছিল। তোর কোন দোষ ছিল না। বোকামি করিস না, তানো। গোড়া থেকেই ছোঁড়াটা উন্মাদ ছিল, বুঝেছিস?    

তানো কিছু বলে না। বলার মত বিশেষ কিছু তো নেই, তাই না?

– দোষ যদি কারুর থেকে থাকে তো সে ওই মহিলার – কুর্তু বলে চলে। – ও-ই ছেলেটাকে নষ্ট করেছে। মহিলা খুব চালাকচতুর, চৌকস, খুব ইয়ে হতে পারে, কিন্তু আসলে… কে জানে, ওই ফরাসি সাইকো-অ্যানালিস্টদের মত। অন্যদের সমস্যাগুলোর চমৎকার সমাধান করে, কিন্তু মা হিসেবে সব যাচ্ছেতাই।    

– আমিই তো ওর মাথায় আলোর সন্ধানে যাবার আইডিয়াটা ঢুকিয়েছিলাম।

– তোর আর করারই বা কি ছিল? এসব কথা বলা, সেটা তো তোর কাজেরই অঙ্গ। সাঁতারের কোচদের মত। আমরা বলি জল ভাল। সেটা আমাদের বন্ধু ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর সেটা কি আমাদের দোষ হবে যদি, কোন গর্দভ আমাদের কথাটা অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিয়ে একটা বরফ-জমা লেকের ভেতর ঢুকে গিয়ে হাইপোথার্মিতে মরে যায়?  

– আমি বলেছিলাম যে ওকে উৎসে যেতে হবে।  

– তো?

– আমি বলেছিলাম যে ওকে উৎসে গিয়ে জল খেতে হবে।

– কেবল এইটুকুই?

তানো আরও দুটো ইম্পেরিয়াল দেবার জন্যে ইশারা করে।

– মানে… ও যে জাপানটাকে গিয়ে দেখেছিল আমি হয়ত তার থেকে সামান্য একটু আলাদা একটা জাপানের ছবি এঁকেছিলাম।  

– ওঃ।

– সেই। ওঃ।  

– তুই ওকে উঠতে থাকা সূর্যের সাম্রাজ্যের গল্পটা খাইয়েছিলি।

– সেই।   

জ়েনের™ স্বদেশ আর চায়ের অনুষ্ঠানের™ আর আদবকায়দার™ আর বুদোওর™ মর্মের স্বদেশ।

– সেই।  

কুর্তু শিস দিল, তারপর হাসল। কুর্তু কিন্তু তানোর মত নয়, ও প্রায় প্রতি বছরই জাপান যায় কেনদোওর কোন একটা ট্রেনিং কোর্স করার জন্যে:  

– আর আমি বাজি রেখে বলতে পারি যে উদয় হতে থাকা সূর্যের সাম্রাজ্য™-এর দেখা ও পেয়েছিল সেটা ওর কল্পনার উদয় হতে থাকা সূর্যের সাম্রাজ্য™-এর থেকে অনেকটাই আলাদা। অন্যদিকে আবার যে আদবকায়দা সে দেখল, সেটা ছিল মেড ইন তাইওয়ান।       

তানো ওর বিয়ারটা এক ঢোক খেল। পকেট থেকে পুর্তুগেশ সুয়াভ-এর[7] প্যাকেটটা বের করল, প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট টেনে বার করল, সিগারেটটা ধরাল। ক্যাফের মালিক কিছু বলল না।[8] বাঁধা খদ্দের, বিশেষ অধিকার।     

– সেই।  

তানো প্রায় হেসেই ফেলেছিল, যদিও বিষয়টা সঙ্গিন। আর ঝামেলা হতে পারে।

– ব্যাপারটা সিরিয়াস। ঝামেলা হতে পারে। জানিসই তো, আমার ওখানে যেতে খুব ভাল লাগে, কিন্তু এ-ও জানি খরচাপাতি কতখানি হয়।

তানোর এখন এক কথায় উত্তর দেবার পর্ব চলছে, ফাটা রেকর্ডের মত, যে সময়ে ফাটা রেকর্ডেরা সবসময়ে একই স্বর বারবার শোনাত:

– সেই।  

– আর এটাও খুব ভাল করে জানি – কুর্তু শেষ করে – আমার ঠিক কতটা সময় লেগেছিল আমি যা চাই সেটাকে খুঁজে বার করতে। প্রথমবার তো বাচ্চা ছেলের মত কেঁদেওছিলাম। আমি রেড রাইডিং হুডের মত জ়েনের খোঁজে গিয়েছিলাম…

এবার তানোর বলার পালা:

– আর যেটা খুঁজে পেয়েছিলি সেটা হল দুষ্টু নেকড়েতে ভর্তি একটা জঙ্গল।

– আরও খারাপ। একটা শোকেস ভর্তি নরম ফুলোফুলো দুষ্টু নেকড়ে…

– ছোট্ট মিষ্টি সব নেকড়েছানা…

– মিত্তি মিত্তি নেকড়েছানা। বুয়ে কাওয়াই[9]

কাওয়াই। মানেটা প্রায় এরকমই দাঁড়ায়…

কুর্তু একটা মিষ্টি বেড়ালছানাকে দেখে মোহিত একজন জাপানি কিশোরীর সাঙ্ঘাতিক একটা নকল করল:

উউউউউঃ, কি মিত্তি!…

– কিন্তু এর তরজমা হয় না।

– বিশ্বাস কর! কাওয়াই। মানিং কাওয়াই। – “মানিং”-টা কুর্তুর যোগ করা যার, অর্ধেক পোর্তুগিজ়ের মত, পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ একজন অ্যাফ্রিকান ছিল, কিংবা ছিল বলে তার মনে হয় (যার ফলে ব্যাপারটা একই দাঁড়ায়)।     

– সেই – তানো সায় দেয়।  

কুর্তু ওর ইম্পেরিয়াল থেকে এক ঢোক খায়।

– জাপান বাচ্চা ছেলেদের জন্যে নয়।

তানো আরও একটা ত্রেমোসু চিবোয়। কুর্তু অসহিষ্ণুতার ভান করে:

– কি ভেবেছিল ও? যে রাস্তার এধার থেকে ওধারে সামুরাইদের ঘুরে বেড়াতে দেখবে? যে সবাই বুদোওর আদি-অন্তহীন পুরুষানুক্রমিক নিয়ম অনুযায়ী চলবে?  

– সেই – তানো সায় দেয়।

– মাথায় রক্ত চড়ে যায়। এমন সব ছেলেপুলে আছে যাদের সবকিছুই আছে।

– সেই – তানো সায় দেয়।

– আবার কিছু নেইও।

– সেই – তানো সায় দেয়।

– ব্যাপারটাকে এইভাবে দেখা যেতে পারে।  

– সেই – তানো সায় দেয়।

– বেচারা বড়লোক বাচ্চা সব।

– সেই – তানো সায় দেয়।

– তাতে কিন্তু এটা প্রমাণ হয় না যে তাদের জীবনটা বেচারা গরীব বাচ্চাদের জীবনের চেয়ে কম খারাপ…   

তানো ইম্পেরিয়ালগুলোর দিকে তাকায়, যেগুলোর ফেনা ছাড়া আর কিছুই পড়ে নেই। একজন কবি, যাঁর কবিতার ব্যাপারে রুচি খুব খারাপ (কিন্তু তাসত্ত্বেও শব্দের ব্যাপারে তিনি চৌকস) বলতে পারতেন: যে গেলাসগুলো এককালে সোনালী অ্যাম্বারের গর্বিত মিনার ছিল, এখন তারা পরিত্যক্ত ফেনার কৃত্রিম অবশেষের বেশি আর কিছুই নয়। একজন কম গৌণ কবি আরও প্রাচীন কিছু পংক্তি উদ্ধৃত করেই সন্তুষ্ট থাকতেন: ব্যাবিলনের মধ্যে দিয়ে, নিজেকে দেখতে পেলাম/যেখানে বসে কাঁদলাম/সিওনকে মনে করে/সেই কত কিছু ওখানে কাটিয়েছি।[10]

– সেই – তানো সায় দেয়।

– একটু গর্দভ হওয়াটাও দরকার। কল্পনা করে দেখ কেউ একজন এই ভেবে লিশবোয়ায় এসেছে যে, রাস্তায় সবাই কালো শাল[11] জড়িয়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে ফাদু[12] গুনগুন করে।   

– সেই – তানো সায় দেয়।

– তুই কি এইভাবেই এখানে এসে পড়েছিলি? না তো, তাই না?

তানোকে এক মুহূর্তের জন্যে ইতস্তত করতে দেখা গেল। এক সেকেন্ডের জন্যে ও দেখতে পেল কার্নেশান ফুল, সোনালি চুল, সুখী সব মুখ, হাতের মুঠি উঁচিয়ে ধরা।[13] তারপর সায় দিল:

– না। এরকম হয়নি।   

ওরা খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে বসে জাহাজ[14] যেতে দেখে। ক্যাফের মালিকের মাথায় ওদের জন্যে আরও দুটো ইম্পেরিয়াল নিয়ে আসার কথা আসে, তারপর না আনাটাই ঠিক মনে হয়। সে বরং একটা অ্যাশট্রে নিয়ে আসে, প্রয়োজনের চেয়ে দেরিতেই। কার ছাই ধরে রাখার জন্যে, সিগারেটটার না কথাবার্তার?  

অবশেষে কুর্তু বলল:

– সুতরাং তুই যাচ্ছিস।

তানো আরও একটা জাহাজকে চলে যেতে দেখে, হয়ত বা দুটোও, খালি গেলাসগুলোর পেছন দিয়ে, কাউন্টারের অ্যাল্যিউমিনিয়ামটা পেছনদিকের টালির ওপর দিয়ে, সূর্যাস্তটাকে তৈরি করতে করতে।     

– আমার কি আর অন্য কোন উপায় আছে?   

কুর্তুও একটা জাহাজকে যেতে দেখে। ও খুব ভাল বন্ধু। একজন ভাল বন্ধু কক্ষণও নিজের বন্ধুকে একা একা জাহাজ যেতে দেখতে দেয় না। কুর্তু ব্যাপারটার একটা ভাল দিক বার করার চেষ্টা করে:  

– যাই হোক, এই ঘোরাটা বেশ ইন্টারেস্টিং হবে হয়ত। আর খরচাপাতি তো সব ওই মহিলাই করছে, তাই না?   

তানো ব্যাপারটার ভাল দিকটা দেখতে পেল:

– হ্যাঁ। খরচাপাতি সব ও-ই করছে।   

কুর্তু একটা খালি ইম্পেরিয়াল তুলে ধরল।

– দারুণ। আমাদের টাকাপয়সার অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। জানিসই তো, মার্শাল হোক বা না-ই হোক, আর্টগুলো হল জাহাজডুবি হওয়ার পর প্রথম যে লোকটাকে জলে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়, আর্থিক সঙ্কটের সামান্য একটা আঁচ পাওয়া গেলেই…

– সেই।  

তারপর কুর্তু সেটাকে (খালি ইম্পেরিয়ালটাকে) টেবিলে রেখে দিল:  

– তোকে কিন্তু খুব সজাগ থাকতে হবে। এই মহিলা খুব ডেঞ্জারাস।

– সেই।

– দেখিস, তোকেই যেন আবার শেষমেশ এই ঘোরার সব খরচ দিতে হয়। ইন্টারেস্ট সুদ্ধু।

তানো কাঁপলও না। যেটার অবশ্য কোন মানে না-ও থাকতে পারে। কুর্তু ওর না-বলা কথাগুলো সব বুঝে গেল। তার পুরো পুবদেশীয় নির্লিপ্ততা দিয়ে তানো সবাইকে ধোঁকা দিতে পারে – নিজের বন্ধুকে ছাড়া। কুর্তু জানে তার বন্ধুর মাথায় কি ঘুরছে। ওদের দেখে বহু পুরনো কোন দম্পতি বলে মনে হয়: আমায় এমন কিছু একটা বল যেটা আমি জানি না।  

তাসত্ত্বেও, কুর্তু বন্ধুকে শান্ত করবে ঠিক করল:

– ছেলেটা অন্ততপক্ষে ভাল ছাত্র ছিল নিশ্চয়ই?

তানো কি জবাব দেবে ভেবে পেল না। কিন্তু বলেই ফেলল:

– ওর… খুব উৎসাহ ছিল।

কুর্তু সায় দিল।  

– বড় বেশি উৎসাহ – তানো যোগ করল । – খানিকটা হাতের বাইরে।

কুর্তু সায় দিল:

– অবাক হবার কিছু নেই। ওইরকম মা যার।   

– চিন্তা করিস না – তানো বলল। – আমি কমোডো ড্র্যাগনের চেয়েও বেশি সজাগ থাকব।

কুর্তু সায় দিল। কমোডো ড্র্যাগনটা ভাল জিনিশ।   

নৈশ উড়ান

তিরেজ়া ভাল করে হেলান দিয়ে বসল। আরাম পেল? শারীরিক ভাবে অন্তত। এর জন্যে বেশ কিছু কারণ আছে অবশ্য: এই শ্রেণীর ধারণাটা, দীর্ঘ এই উড়ানগুলোতে, কেবল পর্দা টানা বা বেশি ভাল খাবারদাবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তিনমহলা প্রাসাদ বনাম প্লেনের বাকি বারোআনায় মধ্যযুগীয় অন্ধকূপের কল্পনার কাছাকাছি যায়। সোফাটার সঙ্গে একটা রিমোটও আছে, সেটা যেমন নিজের ইচ্ছেমত ভিডিও (তালিকায় গোটা দশেকের বেশিই ফিল্ম আছে) দেখার জন্যে তেমনি সোফাটাকে বেশ সরেস বিছানায় পরিণত করার জন্যেও বটে। এইটা আর পানীয়ের পরিষেবাটা। কিন্তু প্রশ্নটাকে একটু অন্যভাবে করা দরকার ছিল। তিরেজ়া ভাল করে হেলান দিয়ে বসল, আরাম পেল কি? অন্যদের মাথার মধ্যে, হয়ত।      

যে ওকে প্লেনে ঢোকার সময়ে চিনতে পেরেছিল আর, এখন, ম্যাডামের মত বিনা আয়াসে বিশেষ সুযোগসুবিধে না পাওয়ার জন্যে হিংসে ও ক্ষোভে জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে, তার মাথাতে তো বটেই। আর, হয়তবা তানোরটাতেও, সেটা এখন যেখানেই থাকুক না কেন – করিডর বেয়ে, খাবার আর ডিউটি-ফ্রি বিলি করার মাঝখান দিয়ে গড়াতে গড়াতে?     

ওখানে যে মাথাটার একমাত্র গুরুত্ব আছে সেই মাথাটাতে অবশ্য নয়। তিরেজ়ার মাথাতে নয়। ওর নিন্দুকদের এটা যতই ধাক্কা দিক না কেন, ঠিক এই মুহূর্তে, এগারো হাজার মিটার উঁচুতে ঘণ্টায় আটশ কিলোমিটার বেগে উড়ে যেতে যেতে, সাইবেরীয় স্টেপের ওপরে কোথাও একটা, নিজের সবরকম শক্তি ও আকর্ষণের ব্যাপারে তিরেজ়া মানসিক ভাবে গর্ব বোধ করছিল না, সে বরং বির্নার্দুর কথা ভাবছিল। সেই ছেলে যার অস্তিত্বের ব্যাপারে সর্বদাই একটা সতর্কতামূলক গোপনীয়তা ছিল; বির্নার্দুর ব্যাপারে ঠিক কোনোরকম গোপনীয়তা না থাকলেও মনে হত যেন গোপন কিছু। লুকনোর মত কোন লজ্জা। মনুষ্যরূপী অস্বস্তি।                

এমন একটা সময় সত্যিই ছিল যখন গসিপ ম্যাগাজ়িনগুলো ওখানে কিছু একটা গড়বড় আছে বলে মনে করত: শ্রীমতী এক্সের অবৈধ জীবন। প্রথামাফিক ছোটখাট একটা স্ক্যান্ডাল, যেমন গর্ভপাতবিরোধী কোন সরকারের পরিবারকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রীর নিজের গর্ভপাত করানো, কিংবা তাঁর গোপন প্রেমিক প্রাশিয়ান অ্যাম্বাসাডারেরও প্রেমিক। কিংবা সে হয়ত অবিবাহিত অবস্থায় মা হয়েছিল, আর তাকে গর্ভবতী করেছিল তার মাসির বোনের মেয়ের সৎবাবা…

তারপর ওই রঙিন পত্রিকাগুলো খুব দুঃখ পেল, বিবর্ণ হয়ে গেল, সব রঙ হারিয়ে ফেলল। কোন গল্পই ছিল না। বা, বলা যেতে পারে যে ছিল কিন্তু সেটা মৃত্যুর মত একটা মামুলি গল্প ছিল: ওর থেকে বেশ ভালরকম বড় একজন লোকের সঙ্গে বিয়ে (হাই), সম্ভ্রান্ত একজন আইনজীবী যার আগের পক্ষের প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেপুলে ছিল (হাই), এই দেরিতে হওয়া ছানাটা জন্মানোর সামান্য কিছুদিন পরেই শান্তিপূর্ণ বিচ্ছেদ (হাই), আর লোকটার (হয়ত দৈব শাস্তি, কিংবা মহিলার দেওয়া বিষের কারণে, এসব বিষয়ে বেশি কিছু না বলাই ভাল) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবল আনন্দে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের একটা যন্ত্রণাদায়ক (এবং নিষ্ফল) চিকিৎসা চলাকালীন মরে যাওয়া। হাই, হাই, হাই।          

মজার কথা হল, কেন সেটা জানা নেই, ঠিক এই ছেলেটার কথা, বিপথে চলে যাওয়া এই ছেলেটার কথাই তিরেজ়া এখন ভাবছিল, ছেলেটার কথা, ছেলেটার কথা, ছেলেটার কথা। বাইরে থেকে দেখে কেউ বলতে পারবে না। এয়ারহোস্টেস কেবল একজন উদ্যোগপতি মহিলাকে দেখতে পাচ্ছে, যেমন আজকাল দেখতে পাওয়াটা মোটেই বিরল নয়, এমনকি লম্বা এই উড়ানগুলোতেও, আরাম করে বিজ়নেস ক্লাসের সোফায় হেলান দিয়ে বসা একজন উদ্যোগপতি মহিলা, পরের দিনের একটা কঠিন মিটিঙের জন্যে শক্তিসঞ্চয় করছেন। কিন্তু না, আমরা সাক্ষী আছি: যেটার কথা তিরেজ়া সত্যিই ভাবছিল সেটা ওই বির্নার্দুই।

দুজনের মধ্যে শেষ কথাবার্তাটা ঠিক কেমন ছিল? স্বাভাবিক পরিস্থিতি হলে তিরেজ়ার সেটা মনে করতে পারার কথাও হত না। এক বছরেরও বেশি কেটে গেছে। না, ওর মনে আছে। একটু বেশি করেই আছে।   

œ

বিশেষ করে নিজের নিষ্ঠুরতার কথাটা মনে আছে।

তুমি[15] জাপান যাচ্ছ?

মা, আপনি তো জানেনই যে আমি যাচ্ছি।

আর কোন টাকা দিয়ে, সেটা জানা যায় কি?  

আপনার, মা।

আর আশা করা যেতে পারে যে পরে সেটা তুমি আমায় ফেরত দিয়ে দেবে, ঠিক তো?  

মায়ের কি সত্যিই দরকার যে টাকাটা আমি তাঁকে ফেরত দিই?  

প্রশ্নটা সেটা নয়।

আমি জানি।

নয় তো, তাই না?

আমি জানি, মা।  

আর কি করতে, জানা যায় কি?

কে দোজোতে একটা কোর্স করব

তুমি ঠিক জানো যে তুমি তাইল্যান্ডে যাচ্ছ না, আগের বারের মত?  

না, মা…

দেখো, আমাকে কোন ঝামেলায় জড়িও না যেন।

না, মা।

œ

এটা কি সম্ভব? এটা কি সম্ভব যে ও এতবার মা বলেছিল?

মা মা মা মা মা মা।

œ

বির্নার্দু: একটা মাথাব্যথা, ছোট থেকেই। দুর্বল। নিজের মধ্যেই ডুবে আছে। একজন বলিষ্ঠ মানুষ কি একটা দুর্বল ছেলের জন্মদাত্রী হতে পারে? পারে পারে। সে নিজেই তো তার জ্যান্ত প্রমাণ। জ্যান্ত রক্তমাংসের জ্যান্ত প্রমাণ।   

দুর্বল হলেও, মন্দের ভাল, বির্নার্দুর ব্যঙ্গ করতে একটুও অসুবিধে হয়নি:

মায়ের নিশ্চয়ই বলতে ইচ্ছে করছে: ‘নিজেকে’ ঝামেলায় জড়িও না, সোনা আমার।  

কিন্তু নিজের “স্লিপ অফ দ্য টাং”-টাকে স্বীকার করে নিয়ে নিজেকে অক্ষম দেখানোটাই যেন কেবল বাকি ছিল:

আমি তো সেটাই বলেছি। আমি কি সেটাই বলিনি?

সত্যিই তাই। নিজেকে অক্ষম দেখানোটা ওর কম্ম নয়। জ্ঞানী বাঁদরেরা যে যার নিজের গিলটি করা ডালে[16]।   

না, মা। বলেননি।

বেশ। নিশ্চয়ই খুব ভাল করে জানা আছে যে আমি কি বলতে চেয়েছিলাম।

আর ব্যস। তারপরেই আবার পোষ-মানা অবস্থায় ফিরে গিয়েছিল।

হ্যাঁ, মা। ভাল করেই জানি।

আমি কি এটাই বলিনি?

হ্যাঁ, মা। আপনি এটাই বলেছিলেন।   

আশা করি। এটা কোনোরকম বিতর্ক তৈরি করার সময় নয়। আমি প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছি। এটা নিশ্চয়ই বুঝেছ, বোঝনি?    

হ্যাঁ।  

কি হ্যাঁ?

বুঝেছি।

এখনই আমার আরও ঝামেলা নেওয়াটাই কেবল বাকি আছে।

হ্যাঁ, মা। ভাল করেই জানি, মা। আপনি ঠিকই বলেছেন, মা। আপনি সবসময়েই ঠিক বলেন, মা।   

œ

বাইরে, বনধের ব্যাপারে আগাম কোনোরকম সতর্কবার্তা না জানিয়েই, পুব দিকে যাওয়া উড়ানগুলোতে টাইমজ়োনের জাদুর কল্যাণে, দিনটা নিজেকে সরিয়ে নিল আর রাত পুরোপুরি নেমে এল। ওরা, আক্ষরিক অর্থে, ভবিষ্যতের দিকে উড়ে যাচ্ছিল।

ঠিক আছে, বির্নার্দু। তোমার টিকিটের টাকাটা আমি দেব আর সঙ্গে খরচপত্র চালানোর জন্যে আরও কিছু টাকা।  

ধন্যবাদ, মা।  

আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না। কেবল আশা করব যেন টাকাটা কোন কাজে লাগে। তোমাকে এবার নিজেকে দাঁড় করাতে হবে। বয়েস কত হল, কুড়ি?     

বাইশ, মা।  

তিরেজ়ার মনে পড়ল সে হেসে ফেলেছিল, আর বির্নার্দুর মুখের কাছে নিজের হাতটাও নিয়ে গিয়েছিল।

মজা করছিলাম। তোমার বয়েসটা আমি জানি না ভেবেছ?

নাকি ভুল? এটার (মুখে হাত বোলানোর) কথাটা তার আর মনে নেই। কথাগুলো মনে আছে। স্নেহের ভাবভঙ্গীগুলো মনে নেই। সে যদি বির্নার্দুর মুখে নিজের হাতটা রেখে থাকে তো তার ছেলে সেই হাতটা হয়ত সরিয়ে দেয়নি, কিন্তু তার মধ্যে একটা অস্বস্তি হয়ত লক্ষ করা গিয়েছিল (একজন নিরপেক্ষ দর্শক থাকলে লক্ষ করত)। আর তিরেজ়া শেষ পর্যন্ত হাতটা সরিয়ে নিয়েছিল।

তাহলে তুমি ওখানে কি করবে ঠিক করেছ?  

একটা ট্রেনিং, মা। তকিওতে একটা সত্যিকারের দোজোতে। আর তারপর হয়ত একটা মন্দিরে কয়েক সপ্তাহ থাকব, মেডিটেশান করার জন্যে।   

তোমার যতসব উদ্ভট খেয়াল, বির্নার্দু। তোমার মাথায় কে এসব ঢুকিয়ে চলেছে? “মেডিটেশান”, “ট্রেনিং”…

আমার সেনসেই[17] বলেছেন

যতসব ছাইভস্ম! যাই হোক, ড্রাগের থেকে ভাল হলেই হল।  


[1]কেনদোও, যার আক্ষরিক “তরবারির পথ”, একটা আধুনিক জাপানি মার্সাল আর্ট যাতে বাঁশের তৈরি তরোয়াল (শিনাই) ও বর্ম (বোওগু) ব্যবহার করা হয়ে থাকে।    

[2]কারাতে, কেনদোওর মত জাপানি মার্শাল আর্টে “গি” পরার পর কোমরে বিভিন্ন রঙের কাপড়ের বেল্ট বাঁধা হয়ে থাকে; এই রঙগুলো নির্ভর করে দক্ষতার ওপর। একেবারে নতুন শিক্ষার্থীরা শাদা বেল্ট বাঁধে; শাদার পর আসে হলুদ, কমলা, নীল, লাল, খয়েরি ও সবশেষে কালো। শাদা থেকে খয়েরি বেল্টধারীদের কিউ বলা হয়ে থাকে। কালো বেল্টধারীরা (অর্থাৎ যাদের সাধারণত ব্ল্যাকবেল্ট বলা হয়ে থাকে) হল দান; দানেদের মধ্যেও দক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগ আছে – প্রথম থেকে দশম, তাদের সবাইকার বেল্টকে সাধারণভাবে “ব্ল্যাকবেল্ট” বলা হলেও এদের মধ্যেও রঙের তারতম্য থাকে। রুই নিজে কারাতের দ্বিতীয় দান। 

[3]Tremoço – লুপিন বা লুপিনি বিনস হলুদ রঙের শিমজাতীয় বীজ। চাষের কাজে এই বীজের কোন ব্যবহার নেই এবং পোর্তুগালে নুনজলে ভিজিয়ে রাখা এই বীজ বিয়ারের সঙ্গে চাট হিসেবে খাওয়া হয়।     

[4]olhos orientais বা oriental eyes – চিনে বা জাপানি জ্ঞানী বা দুর্বৃত্তের পাশ্চাত্যরহস্যময় চোখ। এককালের পশ্চিমের লৌকিক সংস্কৃতিতে চিনে ও জাপানীদের সরু তেরছা চোখ জ্ঞানী, হিসেবী, নিষ্ঠুর, ভয় দেখাচ্ছে বলে মনে হত।

[5]Imperial – ড্রাফট বিয়ার, প্রেশারে রাখা বিয়ার, সরু লম্বা গেলাসে করে পরিবেশন করা হয়।.

[6]এই বিয়ার একটা পাম্পের মাধ্যমে কলের সাহায্যে টেনে বা “ড্র” করে  গেলাসে ঢালা হয়।  

[7]Português Suave – পোর্তুগালের সিগারেটের জনপ্রিয় একটা ব্র্যান্ড। ১৯২৯ সালে, স্বৈরতন্ত্রী শাসনের একেবারে গোড়ার দিকে এই ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠা হয়। গত শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে এই ব্র্যান্ড খুবই জনপ্রিয় ছিল। সুয়াভের অর্থ স্মুদ লাইট বা মাইল্ড। ২০০১ সালে এই ব্র্যান্ডের নাম পাল্টে শুধুমাত্র “পুর্তুগেশ” করে দেওয়া হয় তামাক-বিরোধী আইনগুলোকে মেনে চলার জন্যে কারণ ওইসব আইন অনুযায়ী কোন ব্র্যান্ডের নামে স্মুদ, লাইট আর মাইল্ড থাকলে সেই ব্র্যান্ডের সিগারেট বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অবশ্য এই উপন্যাস লেখা হয়েছিল ২০১১ সালে, যার দশ বছর আগেই এই ব্র্যান্ডের নাম বদলে দেওয়া হয়েছিল।    

[8]পোর্তুগালে ক্যাফে, বার বা রেস্টুরেন্টে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ।  

[9]Bué de Kawai – অ্যাঙ্গোলার কথ্য ভাষায় “বুয়ে” মানে “খুব”; সত্তরের দশকের শেষাশেষি অ্যাঙ্গোলা ও মোজ়াম্বিকের স্বাধীনতার পর গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ওই দেশ দুটি থেকে প্রচুর মানুষ পোর্তুগালে পালিয়ে আসেন, তাঁদের সঙ্গে আসে ওই দেশ দুটিতে ব্যবহৃত কথ্য পোর্তুগিজ়ও। এইভাবেই অ্যাঙ্গোলার “বুয়ে” এবং মোজ়াম্বিকের “মানিং” (এর অর্থও “খুব) পোর্তুগালের কথ্য ভাষায় ঢুকে পড়ে। কাওয়াই! = “কিউট”; জাপানি কিশোরীরা যখন কোন কিছুকে খুব সুন্দর, মিষ্টি, নরম, অবিশ্বাস্য বলে মনে করে তখন হাসতে হাসতে হাততালি দিয়ে ওরা চেঁচিয়ে বলে: “কাওয়াই!”  

[10]পোর্তুগালের মহাকবি লুইশ দ্য কাময়েঁশের কবিতা “রিদন্দীল্যিয়াশ দ্য বাবেল ই সিয়াঁও”-এর প্রথম স্তবক এটি –

Sôbolos rios que vão

Por Babilónia, m’achei

Onde sentado chorei

As lembranças de Sião

E quanto nela passei

রুই প্রথম পংক্তিটি বাদ দিয়েছেন, Sôbolos rios que vão, যার অর্থ “যেসব নদী বয়ে চলেছে (ব্যাবিলনের মধ্যে দিয়ে) তাদের ওপরে”। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে সিওন বা জ়িওন জ়েরুজ়ালেম ও সমগ্র ইজ়রায়েলভূমির সমার্থক।

[11]আগেকার দিনে ফাদিশ্তা বা যেসব গায়িকারা ফাদু গাইতেন তাদের কালো পোষাকের ওপরে কালো শাল জড়ানো থাকত।  

[12]Fado বা ফাদু – উনিশ শতক থেকে পোর্তুগালে প্রচলিত এক বিশেষ ধরণের গান যা বর্তমানে ইউনেস্কোর ইনটাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজের অন্তর্গত। ফাদিশ্তা, অর্থাৎ ফাদুর গায়ক বা গায়িকার সঙ্গে সঙ্গত করেন দুজন গিটারবাদক – একজন বাজান ক্ল্যাসিকাল গিটার আর অন্যজন বাজান বারো তার বিশিষ্ট পোর্তুগিজ় গিটার।     

[13]প্রতি বছর পঁচিশে এপ্রিলে কার্নেশন অভ্যুত্থানকে মনে রেখে যে উৎসব হয় তানোর চোখের সামনে যেন তারই দৃশ্য ভেসে উঠছে।    

[14]জাহাজ দেখা – গভীর ভাবে চিন্তা করা। যখন কেউ খেই হারিয়ে ফেলে বা কি বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে Quando alguém perde algo তখন তাকে পোর্তুগিজ়ে বলা হয় যে সে “জাহাজ যেতে দেখছে”। খুব সম্ভবত এর উৎস হল – যে সফরে যায় সে জাহাজে থাকে; সে অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরয়, আরও ভাল কিছুর আশায় হয়ত। যারা যায় না, ডাঙায় থেকে যায়, তারা সেই জাহাজটাকে দেখতেই থাকে (স্থির হয়ে, দাঁড়িয়ে থেকে)। “অন্যেরা সফল হবে – তুই খালি জাহাজই দেখে যাবি।”   

[15]এখানে রুই “você” ব্যবহার করেছেন, যেটা পোর্তুগালে (ব্রেজ়িলে অবশ্য খুব ফর্মাল জায়গা ছাড়া সবাই সবাইকে ভসে-ই বলে, ওখানে আর আলাদা করে “তু” নেই) বাংলার তুমি আর আপনি-র মাঝামাঝি একটা ব্যাপার, অর্থাৎ পোর্তুগালে “ভসে”-র মাধ্যমে “তুমি”-র চেয়ে বেশি কিন্তু “আপনি”-র চেয়ে কম সম্মান দেখানো হয়ে থাকে। স্কুলকলেজে শিক্ষকশিক্ষিকারা ছাত্রছাত্রীদের, এমনকি প্রাইমারি বা প্রি-প্রাইমারি স্কুলেও, “ভসে” বলে থাকেন। অভিজাত পরিবারে বাবামায়েরা ছেলেমেয়েদের “ভসে” বলেন, যেমন তিরেজ়া এখানে তার ছেলে বির্নার্দুকে বলছে। “ভসে”-র সঙ্গে ক্রিয়াপদের তৃতীয়পুরুষের একবচন ব্যবহৃত হয়। উত্তরে বির্নার্দু ব্যবহার করছে “মাঁই” আর তৃতীয়পুরুষের একবচন – যেমন, “তোমাকে টাকাটা ফেরত দেওয়াটা কি সত্যিই দরকার?” বলার বদলে সে বলে, “মায়ের কি সত্যিই দরকার যে টাকাটা আমি তাঁকে ফেরত দিই?” তিরেজ়াও কিন্তু তৃতীয়পুরুষের একবচন ব্যবহার করছে, আক্ষরিক অনুবাদ করলে ব্যাপারটা দাঁড়াত “দেখবেন, আমাকে কোন ঝামেলায় জড়াবেন না যেন।”বাংলায় সেটা অদ্ভুত লাগবে বলে আমি সেটা করিনি।   

[16]আসল প্রবচনটা হল “cada macaco no seu galho”, অর্থাৎ “বাঁদরেরা যে যার নিজের ডালে”। বাংলায় এর সমতুল্য “বন্যেরা বনে সুন্দর” বা, পরিস্থিতি বিশেষে, “নিজের চরকায় তেল দাও”। রুই মূল প্রবচনটাকে নিজের প্রয়োজনে একটু বদলে নিয়েছেন।    

[17]চিনে ও জাপানি ভাষায় সম্মান জানানোর জন্যে “সেনসেই” শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ হল “আরেক ব্যক্তির আগে জন্মানো এক ব্যক্তি” বা “যিনি আগে আসেন”। সাধারণত এটিকে কারুর নামের পরে ব্যবহার করা হয় আর তার অর্থ “শিক্ষক”।      

Rita Ray
  ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।    

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *