১৯৮৪: প্রলোভন দূর করবার একটা মানচিত্র

বাংলা English
ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংক্স্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।

রুই জ়িঙ্ক

আমরা ঠিক যতটা গর্দভ তার বেশি না হওয়াই ভাল। সব সাই-ফাই-ই আসলে রাজনৈতিক কাহিনী, আর সব ইউটোপিয়া ও ডিস্টোপিয়া যে সময়ে লেখা হয়েছিল তখনকার বর্তমান সময়ের  কথাই বিশেষ করে বলে: চোখ দুটো বেশ ওপরে কিন্তু পা দুটো বেশ ভাল করে বাস্তবে ডুবে আছে,  সেই বাস্তব যেটাতে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে। ঘটনা এটাই যে অনেকে গলা পর্যন্ত (বা, লেখকদের ক্ষেত্রে, চোখের পাতা পর্যন্ত) বাস্তবের পাঁকে ডুবে আছে, আমাদের কারুর আবার কেবল গোড়ালি পর্যন্ত ডোবা। এর ফলে অবশ্য তাদের কামনাটা (এই শব্দটা যদি “মন” থেকে না এসে থাকলেও তার বেশ কাছাকাছিই থাকে) একটু বেশি দূর অবধিই দেখার।       

অরওয়েলের উপন্যাসটা দৃশ্যমান বাস্তবকে নিয়ে – এটা বাস্তবতার একটা সমালোচনা, আর সেই হিসেবে সেটাকে ঠিক নিখুঁত ভাবে অন্য কোন যুগে নিয়ে যাওয়া যায় না। যায় না, যাওয়া উচিত নয়, যদি যেত তো ওটা একটা খুব খারাপ উপন্যাস হত। কেউ যদি এই লেখাটা আজকালকার যুগের ওপর অবিকল প্রয়োগ করতে চায় তো সে সেই ভুলটাই করবে যেটা বাইবেল পড়ে তার আক্ষরিক অর্থটা কেউ ভক্তিভরে আজকের যুগের ওপর চাপাতে চায় – যেমন  ব্যভিচারিণীকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা বা ক্রীতদাসেরা কাজে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করলে তাদের শাস্তি দেওয়া। ভগবান!         

তাসত্ত্বেও বলতেই হবে যে অতিমারী আর লকডাউনদের গলায় গলায় ভাব। উন্মুক্ত রাষ্ট্ররা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সব বন্দর আর বিমানবন্দর বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, আর সেটা দেখে জগতের সব উত্তর কোরিয়ারা ব্যঙ্গের হাসি হাসে, যেন তারা এটাই বলতে চায়: “আমরা তো আগেই বলেছিলাম”। অতিমারীদের সঙ্গে সালাজ়ারদের* গলায় গলায় ভাব, ছোঁয়াচে রোগদের সঙ্গে অন্য  কোন যুগের পিউরিটানদের বন্ধুত্ব, এমনও লোকজন আছে হয়ত যারা বলতে শুরু করেছে “কোন এক দেবতা নরবলি চাইছে”। “আমি ওখানকার কিছু হেরেটিকদের চিনি যাদের উচিত শাস্তি পাওয়া দরকার”। এই মুহূর্তে বিদেশ থেকে যারা আসছে তারা শুধু ইমিগ্র্যান্ট, রেফিউজি, টেররিস্ট বা “আমাদের থেকে আলাদা এমন সব সংস্কৃতির” লোক নয়। এখন তারা (আসলে এই ধুয়োটা বহু প্রাচীন) “রোগও নিয়ে আসতে পারে”।    

অরওয়েল তাঁর নিজের সময় নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন। আর তাঁর একটা সুনির্দিষ্ট শত্রু ছিল: স্ট্যালিনিজম সোভিয়েত ইউটোপিয়াকে প্রহসনে পরিণত করেছিল যে স্ট্যালিনিজম। তাছাড়া “ইনফ্লুয়েন্স” (বা চাইলে উৎসও বলতে পারি) হিসেবে তাঁর হাতে ছিল ১৯২৪ সালে লেখা ইয়েভগেনি জ়ামিয়াতিনের উপন্যাস “মী” (আমরা)। অরওয়েল এমন একটা আবেগ নিয়ে লিখেছিলেন যা কেবল একজন “প্রাক্তনেরই” থাকতে পারে। এমন একটা সিস্টেম যেটা কিনা শব্দগুলোকেই তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়, তার এই সুনির্দিষ্ট, জীবন্ত উদাহরণটা দেওয়ার পর অরওয়েলের এটা বোঝার সৌভাগ্য হয়েছিল যে একটা উপন্যাস শুধুমাত্র একটা প্যাম্ফলেট হয়ে  থাকতে পারে না, আর কেবল প্রতারিত স্বামীর উন্মত্ত ক্রোধ ভাল শিল্প সৃষ্টি করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। আর তাই তিনি ভৌগোলিক সূত্রগুলোকে বাদ দিয়ে কিছু একটা বিশ্বজনীন সৃষ্টি করার জন্য  যেটা প্রয়োজন সেটাই করলেন: ঘটনাস্থলটাকে স্থানীয় করে দিলেন। দেশটার নাম ওশানিয়া কিন্তু যে  শহরটায় বেচারা উইন্সটান স্মিথ (= জ়ে সিল্ভা**) ঘুরে বেড়ায় সেটা, জয়েসের ডাবলিনের মতই, তাঁর অতি প্রিয় লান্ডান।      

যখন আমরা একটা ডিস্টোপিয়া পড়ি তখন এটা মাথায় রাখা উচিত যে সেই বইটা কোন ইচ্ছার কথা বলে না: লেখক ওটা চান না। ওটা বরং ভূত তাড়ানর জন্য লেখা: বইটা লিখে  লেখক আশা (প্রার্থনা) করেন যাতে ওটা না ঘটে। হয়ত সব ভাল উপন্যাসই তাই – লিখতে  লিখতে লেখক একটা প্রার্থনা, একটা জপের মন্ত্র বিড়বিড় করে আউড়ে যান। সাধারণ মানুষের করা আরাধনা সেটা, কিন্তু কোনমতেই অশুভ শক্তির আরাধনা নয়: তবে এই আরাধনা অশুভ  শক্তির বিরুদ্ধে তো বটেই। ভবিষ্যতের উদ্দেশে এই বার্তাটা দেওয়া: এখানে যে নির্দেশগুলো দেওয়া আছে সেগুলো আতঙ্কের কোন দৃশ্যাবলী তৈরি করার জন্য নয়, বরং সেগুলোকে খুলে টুকরো টুকরো করে ফেলার জন্য। নাইন্টিন এইটি-ফোর এখনও জীবন্ত আর সৌভাগ্যবান কারণ দেখা জিনিশকে  নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই উপন্যাসে এমন একটা কাঠামো তৈরি হয়ে যায় যেটাতে আরো দূর অবধি দেখার জন্য যথেষ্ট ফাঁকফোকর আছে। মাকিয়াভেল্লির রাজপুরুষ-এর মত এটা একটা মানচিত্র যেটা পাঠককে থেকে থেকেই বাধা হয়ে দাঁড়ান আলঙ্কারিক প্রলোভনগুলোকে দূরে সরাতে সাহায্য করে। এই উপন্যাস কোন ভবিষ্যদ্বাণী করে না কারণ “পবিত্র” গ্রন্থ ছাড়া কোন বই-ই ভবিষ্যৎ পড়ে ফেলার উচ্চাশা রাখে না। এই উপন্যাস বলে এমন এক সম্ভাবনার কথা যা জগতের  মতই সুপ্রাচীন: আমাদের কৌশলে বশে আনা যায় আর যারা তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে তারাই আমাদের দুঃখের কারণ। এই বই প্রকাশের ষোল বছর পর মারশাল ম্যাকলুহান বলবেন “মাধ্যমই বার্তা” (the medium is the message)। অরওয়েল আন্তর্জালের কথা আগাম ভেবে যাননি – আমি যতদূর জানি জন ব্রানারই সেই লেখক যিনি তার সবচেয়ে কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন। কিন্তু অরওয়েলের বইটা একটা দরকারি হাতিয়ার (কাফকা, এরাসমুস, প্রিমো লেভি প্রভৃতির লেখার মত) চোখ বিশাল বড় করে খুলে সেইখানে ঢোকার জন্য যে বস্তুটাকে আমরা ভবিষ্যৎ বলি আর যেটা, সঠিকভাবে বলতে গেলে, আর এক মিনিটের মধ্যেই শুরু হবে।    

মানে মোটামুটি ওইরকম সময়েই।   

(মূল পর্তুগিজ লেখাটির প্রকাশ ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১ তারিখের J/L (জতা-এল) দ্বিপাক্ষিক পত্রিকায়।
* আন্তনিউ অলিভাইরা সালাজ়ার – ১৯২৮ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত পর্তুগালের স্বৈরতন্ত্রী শাসক।
** পর্তুগালের “কমন ম্যান”।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *