মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (প্রথম পর্ব)

বাংলা English

অনুবাদকের কথা


গত সংখ্যায় শেষ হয়েছে ভাল ফ্যাসিস্ট হবার সহজ উপায়-এর প্রথম খণ্ড। এই সংখ্যাতে দ্বিতীয় খণ্ড শুরু করব বলেছিলাম, কিন্তু রুই সদ্য কোভিড (বুস্টারের পরেও) থেকে সেরে ওঠার ফলে এই মুহূর্তে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এমনিতেও ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থবেরনর পর থেকে নতুন কিছু ওঁকে লিখতে বলাটা বেশ ঝকমারির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাও ভাল ফ্যাসিস্ট একটা সময়ে শেষ করেছেন; এখন আবার মাস কয়েক ধরে “আমি রিটায়ার করেছি”-র ধুয়ো তুলতে শুরু করেছেন। তাই ২০১১ সালে প্রকাশিত উ আমান্ত এ উ ঊলতিমু আ সাবের (আক্ষরিক অর্থে – প্রেমিক সবচেয়ে শেষে জানতে পারে) উপন্যাসটি অনুবাদ করা স্থির করলাম। রুইয়ের এই উপন্যাস ওঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় দুটির মধ্যে একটি (অন্যটি ২০০৪ সালে প্রকাশিত দাদিভা দিভিনা বা “দৈবী দান”)। আমান্ত এখনও অবধি কোন ভাষায় অনূদিত হয়নি, আমার মতে এটি রুইয়ের সবচেয়ে অবহেলিত রচনা। অনেকটাই কল্পবিজ্ঞান, আবার ঠিক কল্পবিজ্ঞানও নয়। ২০০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর নিজের গ্রাফিক নভেল রেই-এর গল্পই কিছুটা ভেঙেচুরে এই উপন্যাস তৈরি হয়েছে। রেই আর আমান্ত – দুয়েরই মূলে রুইয়ের অসম্ভব জাপান-প্রেম। এই দুটি বই-ই লেখার আগে বৃত্তি নিয়ে বেশ কিছুদিন তিনি জাপানে কাটিয়েছেন। এই উপন্যাসকে তিনি প্রেমকাহিনী বলছেন বটে, আমার অবশ্য গোড়া থেকেই এটাকে বাৎসল্য স্নেহের (বা তার অভাবের) কাহিনী বলে মনে হয়ে এসেছে। এই বই বেরবার মাস খানেক আগে রুই প্রথমবার কলকাতায় আসেন, যাদবপুরের ইংরেজি বিভাগে একটি ক্রিয়েটিভ রাইটং ওয়ার্কশপ করানর জন্যে। সেখানে  তিনি ভাবী লেখকদের বলেন কল্পনা নয়, নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতার ওপরে ভিত্তি করেই লিখতে হবে। তাঁর প্রতিটি রচনায় এটা তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে থাকেন। আমাকে তো ওঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবন সবেরই গল্প বলে থাকেন, আর এতগুলো বছর ধরে ওঁকে দেখছিও, তাই চেনা ঘটনাগুলোকে বইয়ের পাতায় পড়ে অবাক হই না। তেমনি এই বইয়ের বাৎসল্য রসও তাঁর জীবনের অঙ্গ। আর হ্যাঁ, উনি কিন্তু ক্যারাটের ব্ল্যাক বেল্ট। এই উপন্যাসে রুই প্রচুর জাপানী শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেগুলো সুন্দর করে আমায় বুঝিয়ে দেবার জন্যে অভিজিৎদাকে (অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জি) অসংখ্য ধন্যবাদ। রুই একদমই পাদটীকা পছন্দ করেন না, আমি আবার পাদটীকা ছাড়া অনুবাদ করতেও পারি না, পড়তেও পারি না। তাই বাধ্য হয়ে আমার পাদটীকা দেওয়াটা উনি মেনে নিয়েছেন। এই অনুবাদেরও সব টীকা আমারই দেওয়া, আজকাল অনেক ক্ষেত্রে রুই সেগুলো আমায় লিখতে সাহায্য করেন। আর ওঁর সঙ্গে আলোচনা করেই এই অনুবাদের নাম দিলাম “মেরুভল্লুকের প্রেম”।   

মেরুভল্লুকের প্রেম

রুই জ়িঙ্ক

অনুবাদ: ঋতা রায়
Rui Zink
 Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc. 
Cover Page of O amante e sempre o ultimo a saber (মেরুভল্লুকের প্রেম)

অনেকদিন আগে জাপানে এক সুখী দম্পতি গ্রামে
বাস করত, তারা ছিল দাম্পত্য ধর্মের আদর্শ;  
তারা দুজনে, আর তাদের নয়নের মণি, ছোট্ট একটা মেয়ে।
মানুষ এরই মধ্যে তাদের মন থেকে এই মানুষগুলোর নাম
মুছে ফেলেছে; যদি ভাবা যায় যে কতশত বছর পার হয়ে গেছে,
তাহলে এতে অবাক হবার কিছু নেই।  
ভেন্সেস্লাউ মুরায়েশ[1]

বস্তুর একমাত্র অন্তরতম অর্থ
হল তাদের কোনো অন্তরতম অর্থ নেই।
আলব্যার্তু কায়াইরু[2]

হ্যালো হ্যালো মাইক টেস্টিং

একটু দেরি করেই আবিষ্কার করেছি যে আমার সব বই-ই আসলে প্রেমের গল্প। কেবল আগাছাগুলো এত ভাল করে লুকোন ছিল যে আমি নিজেই সেটা খেয়াল করিনি। কখন কখন দুটো মানুষের মধ্যে প্রেম, আবার কখন একজন মানুষ আর একটা আইডিয়ার মধ্যে প্রেম। ইদালিনা[3] “একটা সঙ্গীতহীন নাচের” প্রেমে পড়ে। স্যাম স্পিনোজ়া[4] তার থেকে কয়েক (খুব বেশী নয়, মাত্র দুশো) বছরের বড় এক মহিলার প্রেমে পড়ে, গ্রেগ[5] অ্যাঞ্জেলিনা জোলির মত দেখতে এক মহিলার জন্যে প্রায়-নরকবাসের হাত থেকে বেঁচে যায়। প্রেম বাতাসে ঘুরে বেড়ায় আর প্রেম, কোন এক কবির কথায়, সাগরেও আছে। প্রেম পরিত্রাণ করে না, কখনই না, কিন্তু কারুর কাছে কি এর চেয়ে ভাল কোন আইডিয়া আছে?  

এরকম রোমহর্ষক একটা আবিষ্কার আমাকে এইভাবে ভাবতে বাধ্য করল: তাহলে সবচেয়ে ভাল ভালবাসার ধরণ ঠিক কোনটা হবে? মানুষের জীবনে ঠিকঠাক আদর্শের অভাব আছে বলে সেটাকে প্রকৃতির ভেতরে খোঁজাটাই স্থির করলাম। বলাই বাহুল্য, টেলিভিশানের সাহায্যে, ওডিসি চ্যানেল, ন্যাশনাল জোগ্রাফিক, পাণ্ডা চ্যানেল, এইসব আরকি। আজকালকার দিনে টেলিভিশান ছাড়া প্রকৃতির কাছে পৌঁছন যায় নাকি! সঙ্গেসঙ্গে তিনটে রোল মডেল আমার চোখে পড়ল: প্রেয়িং ম্যান্টিসের প্রেম; মরালের প্রেম; মেরুভল্লুকের প্রেম।  

কিছুক্ষণ খুব খুঁটিয়ে ভেবে দেখার পর বুঝতে পারলাম যে এগুলোর সবকটাই আমার ঠিক বলে মনে হচ্ছে, তবে প্রতিটারই নিজস্ব কিছু সুবিধে-অসুবিধে আছে।

প্রেয়িং ম্যান্টিসের রোম্যান্সে, স্ত্রীটি তার পুরুষ সঙ্গীকে সহবাস শেষ হলেই খেয়ে ফেলে। খুবই স্বাভাবিক সেটা, সবাই জানে গর্ভাবস্থায় খিদে বেড়ে যায়। আর ব্যাপারটা আরও বেশী খারাপ হত যদি সে সহবাসের আগেই পুরুষটিকে খেয়ে ফেলত।    

মরাল সারা জীবনের জন্যে জোড় বাঁধে। ব্যাপারটা খুবই সুন্দর। কিছু কিছু জুটির কথা মনে পড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে বোহেমীয় রাতগুলোতে যাদের চোখে পড়ে, বিশুদ্ধ প্রেমে এক্কেবারে বুঁদ হয়ে নিজেদের একটা বুদ্বুদে বাস করছে, জগৎটা ওদের, ওরাই জগৎটা। ভাল লাগে, কিন্তু যেহেতু এরকম অভিজ্ঞতা আমার কখন হয়নি তাই এক্ষেত্রে নিজেকে মনে হয় যেন শোকেসের ওপারে দাঁড়িয়ে আছি, হিংসেয় জ্বলেপুড়ে যেতে যেতে।  

বেশ, স্বীকার করছি। যেটা আমার হৃদয়, সত্যিসত্যিই, গভীরভাবে স্পর্শ করে, সেটা হল মেরুভল্লুকের প্রেম। কোন কোমলতা নেই, ক্ষণস্থায়ী – অন্তত মুখোমুখি ব্যাপারটা। মেরুভল্লুক ও মেরুভল্লুকী খুব স্বল্প সময়ের জন্যে প্রেম আর সহবাস করে, তারপর সঙ্গেসঙ্গে দূরে সরে যায়, যে যার নিজের পথ ধরে, চিরদিনের জন্যে, স্ত্রীটি হয়ত একটা শাবক নিয়ে, পুরুষটি আবার নিজের পথচলা শুরু করে দেয়, হিমবাহ ধরে, কোথাও না থেকে কোথাও নায়ের দিকে। আমাদের ভাল্লুক কি নিঃসঙ্গ আর দুঃখী হয়ে চলে যায়? হয়ত। আমার ভাবতে ভাল লাগে যে সে পরিপূর্ণ হৃদয়-মন নিয়ে যায়, আর ওই ক্ষণেকের দেখাটাকে স্মৃতির তীব্রতা পূরণ করে দেয়। যতদূর জানি, কোন আলজ়াইমারে ভোগা ভালুক হয় না।     

[লিসবন, সব বিপদের বছরে]  

[আদবকায়দা]

礼儀を重んずること

0

কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল

ওরা পোর্তুগাল-জাপান বাণিজ্য ও বন্ধুত্ব পরিষদে ভাষণটার সম্পাদনা করছিল, যেটা কিনা শেষমেশ, কিছুটা আকস্মিক ভাবেই, তিরেজ়া ভি. এফ.-এর বিদায়ের ঘোষণা হয়েও দাঁড়াল:  

“এটা একটা মিথ যে টোকিওর মেট্রো সবসময়ে ভর্তি থাকে, উপচে পড়া ভিড়ে, লোকেরা একে অন্যকে ঠেলাঠেলি করে কামরাগুলোর ভেতরে ঢোকাতে থাকে, যতক্ষণ না একটা প্রায় ফেটে পড়ার উপক্রম স্যুটকেসে (জঘন্য স্যুটকেসগুলো সবসময়েই ফেটে পড়ার মত হয়ে থাকে) ঠেসে ঢোকান জামাকাপড়ের চেয়েও বেশী চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যায়, যেগুলোকে, অবুঝের মত, আমরা জোর করে ক্যাবিনে নিয়ে যেতে চাই। কেউ নিশ্চয়ই ওই পরিবহণ মাধ্যমটাকে কোন রক সঙ্গীতের অনুষ্ঠান বলে ভুল করে, বা ওই ধরণের একটা ধর্মীয় তীর্থযাত্রা যেগুলোর শেষটা খুব খারাপ হয়, যাতে একটা সমষ্টি আতঙ্কের চোটে কিংবা, স্রেফ ট্রেন ধরবার তাড়ায়, অন্ধ ও অমানবিক দানবের থাবায় নিষ্পেষিত নিষ্প্রাণ সব দেহে পরিণত হয়। এর চেয়ে ভুল আর কিছু হতে পারে না। সরকারি, বেসরকারি আর লোকাল ট্রেন – এই তিন ধরণের লাইনের সংযোগে অসংখ্য শুঁড়ের তৈরি জালের মত টোকিওর বিশাল মেট্রো ব্যবস্থা বলতে গেলে কখনই তার দৈনিক কুড়ি লক্ষ যাত্রীদের বিপদে ফেলে না। এটা সত্যিই একটা আর্ট। ইন্ডাস্ট্রিও বটে, আর, যেটা মনে হতে পারে তার ঠিক উল্টোটা, অন্যের স্পেসের সম্মান করাও কিন্তু। প্রত্যেকের একান্ততাটাকে সম্মান করেও একটা গন্তব্যকে কি করে ভাগ করে নেওয়া যায় সে বিষয়ে একটা প্রাজ্ঞ ও সুখকর বোধশক্তি।”       

(অস্পষ্ট হাততালি।)

“এই জন্যে বলছি: আমাদের জাপানের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমাদের, বিশেষ করে, মনে করতে শিখতে হবে। কারণ স্মৃতি ছাড়া তো ভবিষ্যৎ গঠন করা যায় না। স্মৃতি ছাড়া, ভবিষ্যৎ গঠন করার কথা ভাবলে, আমরা কেবল অতীতের ভুলগুলোই বারবার করে চলব যেগুলো ছাড়া, অবশ্যই, আমরা ভাল থাকতে পারতাম। যেটা আমরা ভুলে গেছি, সেটাকে মনে করতে আমাদের শিখতে হবে। যে গুণগুলো আমাদের ছিল আর যেগুলোকে আমরা, রোজকার কাজের চাপে, হারিয়ে ফেলেছি – সেই গল্পটার মত যেটাতে সেই হতভাগিনী মা স্নান করানর পর নোংরা জলে সঙ্গে বাচ্চাটাকেও বাইরে ফেলে দেন। আমাদের অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে যে আমাদের মধ্যে যা ঘুমিয়ে আছে, সেটাকে কিন্তু আবার করে (আশা রাখতে হবে) জাগিয়ে তোলা যাবে। আর আমি আশা রাখি, আমি একজন আশাবাদী নারী। আমাদের দেশটাকে নতুন করে আমাদের জায়গায় পরিণত করতে হবে। আমার আমার আমার আমার আমার জায়গার বদলে।    

“কি কারণে আমি জাপানকে, যেটা কিনা এতটা দূরের একটা দেশ, পোর্তুগালের সঙ্গে তুলনা করছি? কারণ আমরা যা ভাবি তার চেয়ে অনেক বেশী মিল আমাদের মধ্যে আছে। এই দুটো দেশই মহাদেশের একেবারে এক প্রান্তে। বলা যেতে পারে দুটো দ্বীপপুঞ্জ, যেহেতু পোর্তুগাল এমন একটা দৈত্যের প্রতিবেশী হওয়াটা কখনই ভালভাবে মেনে নেয়নি যেটা জঞ্জালের মত একটা ভাষা বলে। বা ওরকম অনেকগুলো ভাষা বলে।”    

(মাঝারি ধরণের হাসি।)  

“আর জাপান তো… সে ঠিক কি? আমি আপনাদের বলব জাপান ঠিক কি: জাপান এমন একটা দেশ যেটা ভবিষ্যৎ-ভবিষ্যৎ খেলে। তুলনায় পোর্তুগালকে দেখে, বারেবারেই, মনে হয়, বহুদিন আগে ফেলে দেওয়া একটা ভাঙা খেলনা বলব না, কিন্তু এমন একটা দেশ যেটা ভুলভাবে অতীতের কাছে বন্দী। তাহলে আমি কি ভাবছি? আমি যেটা ভাবছি সেটা খুব সহজ। আমি এমন একজন নারী যার সব কাজ আর চিন্তা সহজ সরল। জীবনটা তো আমাদের সাহায্য ছাড়া এমনিতেই যথেষ্ট জটিল। আমি মনে করি একই দিকে গিয়ে মিললে আমাদের দুজনেরই লাভ হবে: একটা মিলিত বর্তমান গঠন করা, যাতে সংস্কৃতি আর প্রযুক্তি হাত ধরাধরি করে চলবে, উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকবে না।”

(প্রেক্ষাগৃহে ইতস্তত ভাব, গুঞ্জন, কয়েকটা হাততালি, “উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকা”-র মত একটা পেছনপানে তাকানর একটা কথার ব্যাখ্যা কিভাবে করবে তাই নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে।)   

“লক্ষণগুলোকে ভুল বোঝার একটা প্রবণতা আমাদের আছে। আমি কেবল মনে করিয়ে দিচ্ছি: ভাবনা আলোকিত করে, অমূলক ভাবনা অন্ধকার করে দেয়। লক্ষণগুলোকে পড়তে পারাটা জরুরি। একটা নতুন জগৎকে পরিকল্পনা করার জন্যে লক্ষণগুলোকে পড়া জরুরি।”

(মাঝারি রকমের হাততালি।)

“হ্যাঁ, আমাদের জাপানের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা যখন ছবিতে একজন মহিলাকে দেখি রাস্তায় নাকমুখ ঢেকে মাস্ক পরে যেতে, সাধারণ মানুষ ভাবে যে ওই মহিলা মাস্ক পরেছে পরিবেশ-দূষণের কারণে, প্রতিকূল পরিবেশে নিজের সুরক্ষার জন্যে। একেবারে ভুল: এই মহিলা যে মাস্কটা পরে আছেন সেটা, জাপানে, প্রায় সর্বদাই অন্যদের সুরক্ষার জন্যে। তিনি মুখে আর মনে মাস্ক পরে আছেন কারণ তিনি অসুস্থ, নিজেকে দুর্বল বলে মনে করেন, তাসত্ত্বেও তিনি কাজ করতে চান, জনসাধারণের কাজে আসতে চান, আর সেসবই তিনি করতে চান অন্য কাউকে সংক্রমিত না করে। যেটা আমরা, পাশ্চাত্যবাসীরা, স্বার্থপরতা বলে মনে করেছিলাম, আসলে পরার্থপরতা।”   

(ন্যায্য পরিমাণে হাততালি।)

“আর জাপানেরও আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমি কেবল আমাদের কনভেন্টগুলোর চমৎকার সব মিষ্টির কথা বলছি না, যা কিনা হাজার হাজার বছরের জ্ঞানের ফল। আমরা এমন একটা যুগে বাস করি যেটা ধর্মকে হেয় করে, কিন্তু আপনাদের একটা সত্যিকথা বলছি: জীবনের মধুর সব মুহূর্তের কথা যদি ওঠে তো বলব, কনভেন্টের ফ্রায়ার আর নানেরা তার সবটাই জানতেন।”

(মনখোলা হাসি।)  

“আমি কিছু ব্যবহারিক দিকের কথাও বলছি যেখানে আমাদের জীবনযাপনের ধরণের অর্থনীতির বিজ্ঞানে কিছু একটা যোগ করার আছে। কেউ কেউ বলে যে জীবন সামঞ্জস্যপূর্ণ। বৃত্তের মত। অতটাও ঠিক নয়। এই “জীবনবৃত্ত” কথাটা বহুব্যবহারে জীর্ণ, তবে সেটা খুব একটা ভুলও নয়। জীবনটা সর্পিল। অন্যভাবে বলতে গেলে: আমরা চাই বা না চাই, আমরা সর্বদাই অকুস্থলে ফিরে ফিরে যাই, তবে ঠিক অকুস্থলেও নয়।”  

(কম মনখোলা হাসি।)  

“আর এইজন্যেই আমি এখানে আরও একবার এসেছি, আপনাদের কাছে, এই কথাটা আপনাদের বলার জন্যে: আমি অবশেষে রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি।”

(বিস্ময়ের গুঞ্জন।)

“না, দয়া করে, আশাভঙ্গের এই ভাবটা দেখাবেন না। আমি জানি যে আসলে আপনাদের মধ্যে অনেকেই আশ্বস্ত হয়েছেন।”

(হাসিগুলো খুব একটা প্রত্যয়ের নয়।)

“কিন্তু এখনই কেন বিদায় নেবার কথা বলছি? তাহলে আপনাদের এমন একটা কথা বলি, যদি সেটা আপনাদের পক্ষে সান্ত্বনার হয়, যেটা আমার যৌবনে (সে এতই দীর্ঘ দিন আগে যা, দুর্ভাগ্যক্রমে, আমার মানতে খুব কষ্ট হয়) বলা হত, গ্রীষ্মের প্রেমিকদের রেলস্টেশানে বিদায় জানাবার সময়ে: এটা বিদায় নয়, আবার দেখা হবে।  

“আবার দেখা হবে তাহলে। আর এটা কোন প্রতিজ্ঞা নয়। এটা প্রতিজ্ঞার চেয়েও বেশী কিছু। এটা একটা হুমকি।”  

(হাসি, উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি।)

নির্দেশক অপারেটারকে বললেন:

– দেখছ? শেখ। এই মহিলা একজন শিল্পী। সত্যিকারের একজন রাজনৈতিক জীব।

– কিন্তু উনি তো এক্ষুণি বললেন যে ছেড়ে দেবেন…

– ইয়ার্কি মারছ? উনি এসব ছাড়া বাঁচবেন ভেবেছ? ২:১ বাজি ধরে বলতে পারি, আট-ন’মাসের মধ্যেই উনি প্রার্থী হবেন।

– সত্যিই?

– কেবল এবারে প্রেসিডেন্টের পদে।  

– পোর্তুগালের?  

– পাগল নাকি? ওতে তো যিশুর মায়েরও কোন আগ্রহ নেই।

– ইউরোপিয়ান কমিশানের প্রেসিডেন্টের পদে?

– এক্কেবারে তাই।  

– তোমার তাই মনে হয়?   

– আর উনি সফল হলেও আমি অবাক হব না। ওঁর প্রজন্মের একজন মহিলা হয়ে উনি যেখানে পৌঁছেছেন সেখানে পৌঁছতে হলে একসঙ্গে বিশটা গুণ্ডা মাস্তান হওয়ার চেয়ে ঈগল, বাঘ, সিংহ, সাপ হওয়া দরকার। আর খানকি তো বটেই।   

কুড়িবার সুইমিং পুল

মহিলা যে এখনও চটপটে আছেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই। আর তাঁর একটা রুটিন আছে: রোজ সকালে কুড়িবার করে সুইমিং পুলটার এপার-ওপার করা। রোদ-বৃষ্টি যা-ই হোক না কেন – সুইমিং পুলটার ওপরটা ঢাকা আর মহিলার ডুপ্লেক্সটা যে বিল্ডিঙে জিমটাও সেটাতেই। তিনি সাঁতারটা অহমিকার বশে কাটেন না, শৃঙ্খলার জন্যে কাটেন। একটা স্বাস্থ্যে ভরা শরীর বজায় রাখা ওঁর নিয়মের মধ্যে পড়ে: ওঁকে মনসংযোগে, অসুখবিসুখ রোধ করতে, আরও দক্ষ হতে সাহায্য করে। এই মহিলা নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করেন, “একটা মন্দিরের মত” করে নয়, বরং একটা যন্ত্রের মত যেটার, ক্ষয় রোধ করার জন্যে, নিয়মিতভাবে সেটাকে মেইনটেনেন্সে পাঠান দরকার।   

তাসত্ত্বেও, জল তাঁর এখনকার জীবনে অনেকটাই মনের খুশির মত। কিছু সময়ের জন্যে নিজেকে জলের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারেন, বাইরের গোটা জগতের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারেন। জল হল বিদ্যুৎ, জীবাণু আর অন্যান্য মিথষ্ক্রিয়ার একটা চমৎকার বাহক। আর, পুলের এপার ওপার করতে করতে তাঁর হাতের প্রতিটা স্ট্রোক তাঁকে তাঁর গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে দেয়, তাঁর শুরুর জায়গাটা থেকে খুব বেশী দূরে না নিয়ে গিয়েই। ব্যাপারটা কিছুটা নদীর মধ্যে তীর থেকে তীরে সাঁতরে যাবার মত। ভুল দিকে গেলে অর্থহীন, কিন্তু, যা-ই হোক না কেন, ব্যাপারটা অদ্ভুতরকম সান্ত্বনাদায়ক। যান্ত্রিকও। যান্ত্রিক ব্যাপারটা ভাল, বর্তমান পরিস্থিতিতে।     

কয়েক মাস আগে সবরকম কার্যকরী দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া সত্ত্বেও উনি কিন্তু কাজ করে চলেছেন। হ্যাঁ, এমনকি জিমেও। জলে থাকার সময়েই কেবল উনি প্রায় পুরোপুরি নিজেকে বিযুক্ত করে রাখেন। প্রায়। কিন্তু, ট্রেডমিলে কোন নির্দিষ্ট দিকে না হাঁটতে হাঁটতে উনি সময়টাকে ফাইল পড়ে কাজে লাগান; আর হেডফোনটা কোনোরকম লঘুসঙ্গীত প্রচার করে না, কেবল মুদ্রার বাজারের প্রভাতকালীন ক্রমবিকাশের হালহকিকত। পিলাটেজ় করতে করতে গোপন নথিপত্র পড়েন না কেবল এইজন্যে যে ফোলান বলটা হিংসুটে আর সেটা করতে দেয় না।       

মহিলা আর নবীনা নন – তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি মেদবিরহিতা, ঊনিশ শতকের সাহিত্যিকদের কথানুসারে। যেটা কোন তরুণীর ক্ষেত্রে অসুবিধের কারণ হতে পারত – বুক ও পাছার অভাব – ওঁর ক্ষেত্রে সেটা এখন, পঞ্চাশের ঘরে, একটা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় পরিণত হয়েছে। এটাতে পর্যন্ত মহিলা চতুর।    

তাসত্ত্বেও, যেমন জিগোলো তেমনি ব্যবসায়ীর দল সহজাত ভাবে তাঁর থেকে স্বাস্থ্যকর দূরত্ব বজায় রাখে। আর সেটা শুধু এইজন্যে নয় যে তিনি আর বাঞ্ছনীয় তরুণীদের (সীমিত) খোপের অংশ নন। এর জন্যেও নয় যে তাঁর মুখটা পর্দার সৌজন্যে চেনা হওয়ার ফলে সবাই আগে থেকে সতর্ক হয়ে পড়ে।   হ্যাঁ কিন্তু এগুলোই সব নয়। এটা বিশেষ করে এইজন্যে যে ওঁকে বিরক্ত করলে ফল ভাল হবে না বলে আগে থেকেই বোঝা যায়। কাছাকাছি ওঁর কোন দেহরক্ষী থাকবে কিনা – বা ক্যামেরায় সব রেকর্ড করা হচ্ছে কিনা – সে বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া ছাড়াও।  

এমনকি তরুণ বয়েসেও তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল লৌহমানবী হওয়ার, স্টিলের একটা ম্যাগনোলিয়া হওয়ার, ব্রোঞ্জ়ের একটা মূর্তি হওয়ার, সঙ্কর ধাতুর মত শীতল হওয়ার। এটা জানা আছে যে তাঁর স্বামী – বয়েসে অনেকটাই বড় – বহু বছর আগে মারা গেছেন। এটাও জানা আছে যে, “রাষ্ট্রের কাজে” নিজেকে নিয়োজিত করার আগেই উনি বিত্তশালিনী ছিলেন। একজন খুনীর মহত্ব প্রকাশ করার একটা ফিল্ম[6] এই লাইনটাকে অমর করে দিয়েছে: “প্রথমে অর্থ উপার্জন কর, তারপর ক্ষমতা, তারপর নারী”। তো নারী তিনি নিজে, তাই প্রবাদটার মধ্যে ফ্যাক্টরগুলোর ক্রমটা প্রথম থেকেই খানিকটা উল্টে গিয়েছিল। টাকা ক্ষমতা নারী?  ঠিকঠাক লাগছে না।    

যদি কেউ এই নাগরিক কে[7]-র ব্যাপারে সামান্যতম অনুসন্ধানও করে তো দেখবে সে এমন কাউকে খুঁজে বার করতে পারবে না যাকে তিনি সত্যিই পছন্দ করেন – এমন কোন স্নেহ বা মায়ামমতা যেটাকে একটা ফাঁক বা তাঁর বর্মে একটা খুঁত বলে মনে হতে পারে। এক সেকেন্ড। আমরা একটু রিওয়াইন্ড করি। ওঃ হ্যাঁ, ওঁর একটা ছেলে ছিল বলে মনে হচ্ছে। একটা অদৃশ্য ছেলে। যা-ই হোক, বড় হয়ে গিয়েছিল। গুজব ছিল যে সে তাইল্যান্ডের ওদিকে কোথাও একটা ধরা পড়েছিল, বা ওই ধরণের কিছু একটা।    

ধরা পড়েছিল…?

কিছু না, ও কিছু না।

মুখটা বন্ধ কর, মহিলা কিন্তু শুনে ফেলবে।

কিচ্ছু শুনতে পাবে না।

পাবে।  

আমরা ফিসফিস করে কথা বলছি।

কে জানে ভাই। ওই জাপানী প্রবাদটার কথা মনে আছে: স্যুপটা ভাল হয়েছে কিনা সেটা যে খায় সে-ই জানে, যে সেটাকে বানায় সে নয়। আমি যতদূর জানি, এই মহিলার শোনার ক্ষমতা সুপারম্যানের মত। তুমি ভাবতেও পারবে না মহিলা তার শত্রু আর বিরোধীদের নিয়ে কি করেছে সেই নিয়ে কি কি বলা হয়ে থাকে।     

কিন্তু যেটা উনি সবচেয়ে বেশী ভালবাসেন (ভালবাসাটা বোধহয় সঠিক শব্দ নয়) তা হল: সাঁতার কাটতে। ঈষদুষ্ণ জলে ঝাঁপ দিয়ে একধার থেকে অন্যধারে নিজের হাত আর পায়ের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া। জলের ভেতরে থাকাটা ওঁকে আরাম দেয় – আর ওঁকে সতর্কও করে তোলে। এখানে ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা একজন ফরাসি দার্শনিকের কথা উদ্ধৃত করলে সুবিধে হবে। যেমন বাশলার[8]: জল সবকিছুর মায়ের মত, গর্ভজল, জন্মের আগে যে জলে আমরা সাঁতরে বেড়াই, যে জলে গোটা মানবজাতি ডুবে থাকে যতক্ষণ না জরায়ুর সরু মুখটা বেয়ে পিছলে নীচে নেমে সদা-হতাশাব্যঞ্জক বাইরের জগতে এসে পড়ছে।     

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আমাদের শরীরটা সময়ের আগের এই সময়টাকে মনে রাখে। ওই সময় যেখানে, শেষ আট সপ্তাহে অন্তত (আট, অনন্তের শুভ সংখ্যা), আমরা স্বপ্ন দেখে থাকি, ভেবে থাকি, বাঁচতে থাকি; চোখ বুজে সাঁতরাতে সাঁতরাতে? হয়ত। কিন্তু যা কিছু দেখতে ইন্টারেস্টিং সেই সবকিছু চোখ বুজে দেখতে দেখতে। আমাদের মায়ের ভেতরে থাকাকালীনই আমরা স্বশাসিত। স্বাধীন জীব, একটা ব্রহ্মাণ্ডের ভেতরে আরেকটা ব্রহ্মাণ্ড, কেবল একটা নাড়ী দিয়ে যুক্ত।      

(এই সংযোগটা যে শিগগিরি ভেঙে যাবে সেটা আগেভাগেই আঁচ করতে করতে।)

হোকুসাইয়ের ঢেউ[9]

ফ্ল্যাটটা পর্যাপ্ত পরিমাণে বড়, প্রাইভেট লিফট সরাসরি লিভিংরুমে গিয়ে খুলে যায়, একটা বিশাল মসৃণ দেওয়ালে এইটুকুনি একটা একরঙা ছবি, বারান্দার সামনে, ভারসাম্য রাখার জন্যে অন্য দেওয়ালগুলো তূলনামূলক ভাবে চেনা চিত্রকরদের সিল্কস্ক্রিন প্রিন্টে ভর্তি, পুরোন আর আধুনিকে মেশান আসবাবগুলো সুরুচির পরিচায়ক। প্রাচ্যের একটা রাইটিং ডেস্ক, সত্যিকারের জেড বসান। এখানে ইকেয়ার[10] প্রবেশ নিষেধ, কেবল কেনজ়ো[11] আর মিয়াকে[12]! – আসবাব, ছবি, ফ্রেম, ফুলদানী সব যেন চিৎকার করে বলছে। কিংবা না, চিৎকার করছে না, কারণ সভ্যভদ্র লোকেরা চিৎকার করে না। চিৎকার হল তাদের জন্যে যাদের ক্ষমতা নেই, যাদের জগৎটাকে ডিঙি মেরে দেখার জন্যে চোখটাকে পায়ের আঙুলে ভর করে দাঁড়াতে হয়। যেসব মানুষের (বা আসবাবের) সত্যিকারের ক্ষমতা আছে কেবল সেটুকু বলেই ক্ষান্ত দেয় (আর সেটা নীচু গলায়, কেবল তাদের জন্যে যাদের সোনালী সব কানে সোনালী প্যাভিলিয়ান[13] আছে) যেটুকু তাদের বলার আছে।       

লিভিংরুম পার হয়ে গিয়ে দুটো লম্বা ক্রিম রঙের “এল” আকারের সোফা, একটা আধখোলা স্লাইডিং দরজা দিয়ে ঢুকে আরেকটু এলোমেলো একটা স্টাডিতে ঢোকা যায়, এলোমেলো থাকাটা তো একটা স্টাডির স্টাডি হওয়ার প্রাথমিক শর্ত: ভারি টেবিল, কাঁচ দিয়ে ঢাকা, একধারে কাগজের স্তূপ, দেওয়ালের গায়ে লাগান ছাদ অবধি বই, টেবিলটার তিন-চতুর্থাংশ ভেতরে ট্যারচা ভাবে, একটা আর্গোনোমিক কিবোর্ডের সমকোণে, রুচিসম্মত কালো একটা কম্পিউটারের স্ক্রিন রাখা।   

সবচেয়ে গাঢ় রঙের দেওয়ালটার মাঝখানে, একটা স্টাইলাইজ় করা ঢেউয়ের প্রিন্টের নীচে, এফেক্টটা তৈরি করার জন্যে একটা পেডেস্টালের ওপরে, নিজস্ব আলো-লাগান একটা অ্যাক্যিউয়ারিয়াম, যেন সযত্নে রাখা একটা রত্ন। কিন্তু তাতে কোনই রত্ন রাখা নেই, কেবল দুটো মাছ, ছোট্ট ছোট্ট, সুন্দর, কমলা রঙের। চলন্ত রত্ন, কেউ কেউ বলবে। নিয়ন্ত্রিত প্রকৃতি, কিন্তু অবিরাম চলনে। ইন্টিরিয়ার ডিজ়াইনার এখানে কিছুটা রসবোধ দেখিয়েছেন: ঢেউয়ের তলায় অ্যাকুয়ারিয়াম। ফ্রেমে বাঁধান প্রিন্টটার ভিসুভিয়াসের ধারে পম্পেইয়ের হওয়াটাই কেবল বাকি ছিল। তা সেটা নয়। তবে প্রায় তাই-ই।   

গৃহকর্ত্রী বসে বসে একটা নথির পাতা ওল্টাচ্ছেন, নাকের ডগায় রিডিং গ্লাস ঝুলিয়ে।  

ওঃ কি করে বোঝা গেল যে উনিই গৃহকর্ত্রী? – যে কেউ প্রশ্ন করতে পারে। তার উত্তর? কারণ তা-ই। কারণ এমন অনেক মানুষ আছে যাদের মধ্যে, জন্ম থেকেই, কর্তৃত্বের লক্ষণ দেখা যায়। কিংবা, জন্ম থেকে না হলেও, যারা তাদের এই অর্জিত বৈশিষ্ট্যটাকে এতটাই কাজে লাগিয়ে থাকে যে এমন একদিন আসে যখন সেটা (অর্জিত বৈশিষ্ট্যটা) নিজেকে স্বাভাবিক স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যতে বদলে ফেলে তাদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের (অবিচ্ছেদ্য) অঙ্গ হয়ে পড়ে, যেন হাড়ে মধ্যে বসান নকল হাত বা পা। বইয়ে লেখা থাকে: চর্চিত আর প্রকৃতিজর মধ্যে তফাতটা কি? সামান্যই। একটার জায়গায় আরেকটা অনায়াসে চলতে পারে, যদি যথেষ্ট ঐকান্তিক ভাবে সেটার চর্চা করা হয়। ঠিক যেমন জাহাজডুবি হওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ যেটা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, প্রবালে পরিণত হয়ে যায় যেগুলোকে ঘিরে জলের তলার জীবন বেড়ে উঠতে থাকে। চর্চিত প্রাকৃতিক হিসেবে চলে – আর তার উল্টোটাও ঘটে। অর্জিত সহজাত হিসেবে চলে – আর তার উল্টোটা।           

বাটলার, কারণ এটা এমন একটা গৃহস্থালী যেটা একজন বাটলার পাবার উপযুক্ত, এসে স্টাডির দরজায় ঘা দেয়। কোন উত্তর আসে না। আর, যেহেতু কোন উত্তর আসে না (উত্তরের অভাবটাই উত্তর হওয়াতে), বাটলার ঘরে ঢোকে, হাতে একটা খাম নিয়ে।

– এটা আপনার জন্যে এসেছে, ম্যাডাম। জাপান থেকে।

ম্যাডাম খামটা খুললেন, খাম খোলার একটা ছুরি দিয়ে, খুব সুন্দর (ছুরি), হাতলটা কারুকার্য করা (ছুরি), ফলাটা চকচক করছে (ছুরি, ছুরি, কাগজ কাটার মন্দ ছুরি)।  

বাটলার সাহস করে শব্দের অভাবে তৈরি শূন্যতাটাকে ভরিয়ে তোলে:

– চিঠিটার যে কোন প্রেরক নেই সেটা লক্ষ না করে পারিনি, ম্যাডাম…

বাটলার এটাও লক্ষ না করে পারেনি যে, ফ্যাক্স আর ই-মেইলের যুগে চিঠি পাঠানটার মধ্যে কেমন একটা খাপছাড়া ব্যাপার আছে। কেউ একটা ব্যাপারটায় মানমর্যাদার ছোঁয়া দিতে চায় – কিংবা চায় যে বার্তাটা দেরিতে পৌঁছক, এটা জেনেই যে সেটা, আর যা-ই হোক, ভালভাবে গ্রাহ্য হবে না।  

কিন্তু এই বাটলার, যে, বলাই বাহুল্য, বাটলারের জায়গায় আসলে একজন ব্যক্তিগত সহকারী, এই শব্দটাই তো এখন বেশী চলে, টেলকোট পরা কোন বুড়োহাবড়া নয়, যার পেটে কোন কথা থাকে না, বরং শার্ট-টাই পরা একজন তরুণ যার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ আছে, আর জানে কখন চুপ করে থাকতে হয়, যেটা বহু দূর যেতে পারার প্রাথমিক শর্ত।       

নবীন, চালাকচতুর, যেমনি চালাকচতুর তেমনি উচ্চাভিলাষী। আর নবীন। এটা কি আগেই বলা হয়েছে যে নবীন সহকারীটি নবীন? হ্যাঁ, এই নবীন আর তাসত্ত্বেও এখনই স্বার্থচিন্তায় পরিপক্ক সহকারীটি অনেক দূর যাবে, যদি তার নিয়োগকর্ত্রী ইচ্ছা করেন, অদূর ভবিষ্যতে, প্রয়োজনীয় ধাক্কাটি দিতে।       

মহিলা যতক্ষণ চিঠিটা পড়ছেন, সে তার দৃষ্টিটাকে, জ়েপেলিনের মত, অন্যদিকে ঘোরাল, বিচক্ষণতার লক্ষণ হিসেবে – এক্ষেত্রে অ্যাকুয়ারিয়ামের ওপরে ফ্রেমে বাঁধান একটা প্রিন্টের দিকে, যেটা ওই বাড়িতে রাখা একমাত্র কপি, যতদূর ওকে বোঝান হয়েছে, ওই ডুপ্লেক্সের দেওয়ালে বাস করা সবকটা মৌলিক বা, অন্ততপক্ষে, নম্বর দেওয়া সিল্কস্ক্রিন প্রিন্টের মাঝখানে। যে সেটাকে চেনে তার কাছে, বলাই বাহুল্য, ছবিটা খুবই পরিচিত। খুব চেনা যেমন, তেমনি খুব না-চেনাও সর্বদাই খুব আপেক্ষিক। একটা বাড়তে থাকা স্টাইলাইজ়ড ঢেউ, বিরাট আর ভয়ঙ্কর, জেলেদের একটা নৌকোর ওপরে। মন দিয়ে না দেখলে প্রায় অদৃশ্য নৌকোটাকে বলতে গেলে বোঝাই যায় না। নৌকোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঢেউটাই গুরুত্বপূর্ণ। ঢেউটাই সব, ঢেউটাই সব।

ঢেউটাই সব।         

আসন্ন বিপদের অনুভূতিটা ঢেউটার কাছ থেকে আসছে, ক্রমশ ফুলেফেঁপে ওঠা ঢেউ, সফেন ঢেউটা, সর্পিল ভাবে, নিজের ওপরেই তার পাক খুলছে। দেওয়ালে ঝোলানর মত ছবি ওটা নয়। আমরা যে একেবারে খাদের ধারে বাস করি, চোখের নিমেষে আমাদের জীবনটা ওলোটপালোট হয়ে যেতে পারে, তছনছ হয়ে যেতে পারে, টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে, একটা সুনামি এসে বাচ্চাদের কাগজ ছেঁড়ার মত করে সেটাকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে দিতে পারে – যে প্রিন্টের এরকম একটা বার্তা, সেটাকে দেওয়ালে টাঙানর অর্থ কি? এই ছবিটা দিয়ে কোন পোস্টকার্ড বানানর আকর্ষণটাই বা কি?     

মহিলা বোঝেন।

খুবই অদ্ভুত, বেশ কয়েক মাস ধরে উনি এই খবরটার অপেক্ষায় ছিলেন আর, যে উত্তরটা পাবার আশঙ্কা তিনি করছিলেন সেটা এখন এসে যাওয়াতে, যেটা তিনি আশা করেছিলেন সেটা নয় বরং যেটা (ভাল করে ভেবে দেখলে) আসারই ছিল, ওঁর অনুভূতিটা যে ঠিক কি সেটা মহিলা বুঝতে পারছেন না। একটা কথা মানতেই হবে: এটাই, সবকিছু সত্ত্বেও, সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পরিণাম। গল্পের শেষ, দাঁড়ি, আহাম্মকের মত আর কোন কল্পনা নয়। দোষ তো কিছুটা ওঁরই। কল্পবিজ্ঞানের ওই কথাবার্তায় তিনি মূর্খের মত আশা রেখেছিলেন, যদিও তাঁর একটা অংশ স্পষ্ট জানতে বাকি রাখেনি। যে ওটা হতে পারে না: যে মৃতদের আবার বাঁচিয়ে তোলা যায় না। এমনকি যে দেশ ভবিষ্যৎবিদ্যায় পারদর্শী সেই জাপানেও না।    

সহকারীটি যদি আর একটুখানিও বিচক্ষণ হত তো দেখত, ওই মুহূর্তে, মহিলা সামান্য একটু টলে গেছেন, এমন একজন মুষ্টিযোদ্ধার মত একটা প্রতারণাপূর্ণ ঘুষির আঘাতে যার ঘিলুটা একটু নড়ে গিয়ে থাকলেও সে এখনও দাঁড়িয়ে আছে, তার পাদুটো দুর্বল হয়ে পড়েনি।    

আর এবার?, মহিলা নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেন। তিনি স্বস্তি পাওয়ার আশা করেছিলেন, একটা হারানর অনুভূতি কিন্তু, তার সঙ্গে একটা দরজাও বন্ধ হয়ে যাওয়া, যেমন কিডন্যাপ করা বাচ্চাদের বাবামারা অনুভব করে থাকে যখন অবশেষে দেহটা খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি আশা করেছিলেন যে তিনি এমন কোন একটা আবেগ অনুভব করবেন যেটা, ওই আর কি, এরকম একটা পরিস্থিতিতে অনুভূত আবেগগুলোর ক্যাটালগের সঙ্গে মিলে যাবে। আশা করেছিলেন যে কাঁদবেন, সমস্যাটা হল যে তিনি এত দীর্ঘ দিন ধরে নিজেকে ট্রেনিং দিয়েছেন নারীসুলভ এই শারিরবৃত্তীয় অনুপুঙ্খটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যে তিনি কিছু কিছু পুরুষের মত হয়ে পড়েছেন: কাঁদতে না পারা, এমনকি যখন উপলক্ষ্য এই ক্ষমতাটা দাবী করে তখনও।

সহকারী মহিলার দিকে তাকাল। তার মনে হল যে তিনি কোন একটা শব্দ বিড়বিড়িয়ে বললেন, যত না তার উদ্দেশে তার বেশী নিজেরই উদ্দেশে। ও সেটাকে বুঝতে পারল না যতক্ষণ না তিনি সেটাকে আবার বললেন:

– না।

না, প্রিয় ভদ্রমহোদয়গণ, আমি দুঃখিত, কিন্তু আমি মেনে নিচ্ছি না। মেরি-গো-রাউন্ডের মত গতবছরটা কেটেছে। প্রথমে: ছেলেকে হারান। তারপর: জানতে পারা যে একটা সম্ভাবনা আছে, হালফ্যাশানের ধর্ম, মানে প্রযুক্তিতে একটা অলৌকিক ব্যাপার আছে। আর, বোকার মত আশা করে যাওয়া।  

– না।

এখন আবার নতুন করে আশা হারানর জন্যে? এইভাবে, একটা শুকনো চিঠি দিয়ে, তার ওপরে সেটা আবার একজন অধস্তন কর্মাচারীর লেখা?

– না।   

না, আমি এইভাবে খেলি না। তিনি গালাগাল দিতে অভ্যস্ত হলে বলতেন: খানকির বাচ্চা সব। কিন্তু যেহেতু তিনি অভ্যস্ত নন, তাই আর সেটা বললেন না। কিন্তু তাঁর মনে যেটা চলছিল সেটার তরজমা করলে মোটামুটি এটাই দাঁড়ায়। মানে যদি তাঁর মন বলে কোন বস্তু থেকে থাকে – এর বিরুদ্ধে অনেক মতামত আছে, কিন্তু সেই নিয়ে এখন কারুর কোন আগ্রহ নেই।

সহকারীটি এই মহিলাকে ঠিক পছন্দ করে না। কেউ কি তাঁকে পছন্দ করতে পারে? তাসত্ত্বেও সে তাঁকে সম্মান করতে শিখে গেছে। তাঁর শক্তিকে, তাঁর চরিত্রকে, তাঁর অনম্যতাকে। অবশেষে আজকাল, সব সামাজিক বৃত্তেই, “নেতৃত্বে” মহিলাদের থাকাটা স্বাভাবিক হওয়া শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু ইনি এমন একটা স্থান/কালের অক্ষে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যেখানে/যখন সেটা খুব সহজ হয়ে ওঠেনি।    

সবাই আড়ালে আবডালে তাঁর বিষয়ে অনেক গুজব শুনেছে: আর তাঁর হৃদয়হীনতার যথোপযুক্ত খ্যাতি। তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আর বিরোধীদের পুরুষত্ব কেড়ে নিয়েছেন – কিংবদন্তী অনুসারে কয়েকজনের তো আক্ষরিক অর্থে। হতভাগা পুরুষের দল, তাঁর ক্ষমতাটাকে খাটো করে দেখেছিল, ভেবেছিল এ বোধহয় কোন ললিতলবঙ্গলতা, সামান্য ভয়েই হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়বে আর রান্নাঘরে আশ্রয় নেবে, নার্ভাস হয়ে চকলেট খুঁজবে, যেটা ডায়েট তাকে খেতে দেবে না তন্বী দেহলতা বজায় রাখার জন্যে। বা ওই ধরণের কিছু একটা। বরাবর তো ওই ভেবেই তারা রসাতলে গেল। বলাই বাহুল্য, এটা তো বলারও কোন প্রয়োজন পড়ে না যে উনি বিরোধীদের চেয়ে নিজের কমরেডদের প্রতি বেশী নির্দয় নিষ্করুণ হতেন। একজন বিরোধী হল এমন কেউ যে অন্য একটা দলের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত আর যার সঙ্গে অমুক সময় অন্তর অন্তর ভোট দিতে বা আলাপআলোচনা করতে যেতে হয়। কিন্তু দলের একজন সঙ্গী আরও অনেক খারাপ কিছু একটা: তার সঙ্গে তো রোজ ওঠাবসা করতে হয় আর, বেশির ভাগ সময়েই, সে আমাদের সবচেয়ে খারাপ শত্রু। সে আমাদের বিছানায় ঘুমোয়, কি জ্বালা, একজন স্বামীর মত, কি জ্বালা। কেবল বিয়েতে, অন্তত কিছুটা সময়ের পরে, স্বামী আমাদের সঙ্গে, মানে ওই আর কি, আর সহবাস করতে চায় না।      

সহকারীটি এই মহিলার সঙ্গে কখন প্রতারণা করতে চায় না, প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে গোপন কথা বিক্রি করে। বাধ্য হলে সে অবশ্য সেটা করবে, কি জ্বালা, মানুষ তো আর পরমুখাপেক্ষী হয়ে এই দুনিয়ায় বাঁচে না; কিন্তু ও সেটাকে যতটা সম্ভব শোভনতার সীমা লঙ্ঘন না করে এড়িয়ে চলবে।    সেটা এইজন্যেও যে তিনি এখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজেকে অনেকটাই সরিয়ে নিয়েছেন, একজন অকুতোভয় মহিলা যিনি, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত, অর্ধেক পৃথিবীকে পায়ের ওপর খাড়া করে রাখতেন, তিনি আজ একজন সাধারণ একজন সাংসদ মাত্র (শাসকদলের সদস্য)। মানুষের পক্ষে যতখানি বিশ্বস্ত হওয়া সম্ভব, সে ঠিক ততটাই আর সে জানে যে মহিলাও তাকে, কিছুটা অন্তত, বিশ্বাস করেন।        

সহকারীটি ঢেউয়ের প্রিন্টটার নীচে ছোট অ্যাক্যিউয়ারিয়ামটার মধ্যে ছোট মাছগুলোর দিকে তাকাল। দেখে মনে হয় ওগুলো বেট্টা স্প্লেন্ডেন্স, সেই চমৎকার সায়ামিজ় লড়াকু মাছ। শান্তিপ্রিয়, কিন্তু একই অ্যাক্যিউয়ারিয়ামে এদের দুটো রাখলে আমৃত্যু লড়াই করে যাবে। বোকার মত, কিন্তু ব্যাপারটা এরকমই: এরা এমন মাছ যারা নিজেরাই নিজেদের ভীষণ অপছন্দ করে। বলা হয়ে থাকে (কিন্তু সহকারীটি এতে আর অতটা বিশ্বাস করে না) যে অ্যাক্যিউয়ারিয়ামের কাঁচে নিজেদের প্রতিফলন দেখে ওরা নিজেদের প্রতিবিম্বের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। সহকারীটি জানে যে, যদিও ওই ছোট দুটো মাছকে দেখে বেট্টা বলে মনে হয়, ওগুলো কিন্তু তা নয়। প্রমাণ? ওরা দুজন দুজনকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে না। অন্যদিকে আবার… ওরা হয়ত বেট্টা স্প্লেন্ডেন্স কিন্তু ওরা সেটা জানে না। কিংবা হয়ত মহিলা অসম্ভব কাজটা করে ফেলেছেন: ওদের পোষ মানিয়ে ফেলেছেন।   

লড়াকু মাছেদের পোষ মানান? সহকারীটি হাসল: এইটা অবশ্যই কিংবদন্তী হওয়ার পথে আরও এক পা এগিয়ে যাওয়া।

মহিলা মাথাটা নাড়ালেন, তাঁর নাকের পাটাগুলো ফুলে উঠল, উনি যে কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এটা তারই লক্ষণ। সহকারীটি লক্ষ করেনি, সে অন্যমনস্ক ছিল, কিংবা হয়ত লক্ষ করেছে, যে তিনি তাঁর আবেগের দিকটা থেকে সরে গিয়েছেন। এই ওঁকে দেখে হতোদ্যম মনে হচ্ছিল, ভবিতব্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত। পরমুহূর্তেই, পরের এই মুহূর্তটাতে, ভাবনাচিন্তা বদলে ফেলেছেন।    

মহিলা ওই সহকারীটির দিকে তাকালেন যে, যথাসম্ভব, বিশ্বাসযোগ্য:

– ওই জাপানীটাকে ফোন করুন।  

সহকারীটি ঠিক বুঝল না:

জাপানীকে…?   

– নাম্বারটা আমার ডায়েরিতে আছে – মহিলা মাঝখান থেকে বলে উঠলেন। কিন্তু সঙ্গেসঙ্গেই ভেবে দেখলেন। – না, বাদ দিন, কি বোকা বোকা, আমি নিজেই ফোন করব।

সহকারীটি মনে মনে সজাগ হয়ে উঠল। আরে আরে আরে! অনেক মাসের মধ্যে এই প্রথম সে ওঁকে “কি বোকা বোকা”-র মত এতটা মেয়েলি কোন কিছু বলতে শুনল।     

তার চেয়েও বেশী: ইতস্তত করতে দেখল।

তার চেয়েও বেশী: একটা ভুল স্বীকার করতে শুনল।   

– আগে বরং আমায় ট্র্যাভেল এজেন্সির লাইনটা ধরিয়ে দিন – তিনি বললেন।  

– এখন?

– গতকাল।


[1]Wenceslau de Moraes (১৮৫৪-১৯২৯) – পোর্তুগিজ় লেখক, প্রাচ্যের, বিশেষ করে জাপানী, সংস্কৃতি ওঁকে খুবই প্রভাবিত করেছিল।

[2]পোর্তুগিজ় কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার (১৮৮৮-১৯৩৫) তিনটি প্রধান অন্যনামের একটি; কায়াইরু (১৮৮৯-১৯১৫) বাকি দুই অন্যনাম ও পেসোয়ার গুরু। এই পংক্তি দুটি তাঁর মেষপালক  কাব্যগ্রন্থের পাঁচ নম্বর কবিতা থেকে নেওয়া।   

[3]লেখকের, এবং পোর্তুগালের, প্রথম গ্রাফিক নভেল আর্ত সুপ্রেমা-র (১৯৯৭) কেন্দ্রীয় চরিত্র।   

[4]লেখকের ২০০৪ সালের উপন্যাস দাদিভা দিভিনা-র কেন্দ্রীয় চরিত্র।    

[5]লেখকের ২০০৮ সালের উপন্যাস দেশ্তিনু তুরীশ্তিকু-র(বাংলায় বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা) প্রধান চরিত্র।

[6]“In this country, you gotta make the money first. Then when you get the money, you get the power. Then when you get the power, then you get the women.” ১৯৮৩ সালের ফিল্ম “স্কারফেস”-এর সংলাপ।  

[7]Cidadão Quem (বাংলায় নাগরিক কে) ব্রেজ়িলের একটা রকব্যান্ড। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পোর্তু আলেগ্রেতে তৈরি এই ব্যান্ডের নামটা অর্সন ওয়েলসের নির্দেশিত ফিল্ম সিটিজ়েন কেন-এর থেকে অনুপ্রাণিত।     

[8]Gaston Bachelard (১৮৮৪-১৯৬২) – ফরাসী দার্শনিক, ১৯৪২ সালে প্রকাশিত একটি বই জল ও স্বপ্ন নিয়ে (L’Eau et les Rêves : Essai sur l’imagination de la matière)।

[9]বিখ্যাত জাপানী শিল্পী কাৎসুশিকা হোকুসাইয়ের (১৭৬০-১৮৪৯) ১৮৩১ সালের একটি বিখ্যাত উডব্লক প্রিন্ট The Great Wave off Kanagawa বা The Great Wave বা The Wave, মূল জাপানীতে যার নাম “কানাগাওয়ার বিশাল ঢেউয়ের নীচে”।    

[10]IKEA – ১৯৪৩ সালে একজন সুইডিশ কিশোরের স্থাপিত শস্তায় আসবাব ও গৃহস্থালীর অন্যান্য সরঞ্জাম নিজস্ব ডিজ়াইনে তৈরি করে বিক্রি করার একটি বহুজাতিক সংস্থা যার সদর দপ্তর হল্যান্ডে।

[11]Kenzo – ফ্রান্সে বসবাসকারী জাপানী ফ্যাশান ডিজ়াইনার কেনজ়ো তাকাদার (১৯৩৯-২০২০) তৈরি সুগন্ধী, জামাকাপড় ও ত্বক পরিচর্যার জিনিসের একটি সুপার-লাক্সারি ব্র্যান্ড।  

[12]Miyake – ইসে মিয়াকে (১৯৩৮) একজন জাপানী ফ্যাশান ডিজ়াইনার। তিনিও কেনজ়োর মত তাঁর মহার্ঘ সুগন্ধী ও জামাকাপড়ের জন্যে পরিচিত।    

[13]এখানে খেলাটা হল “সোনা” আর “প্যাভিলিয়ান” এই শব্দ দুটোকে নিয়ে। সোনা মহার্ঘ, অন্যদিকে পোর্তুগিজ়ে প্যাভিলিয়ান বলতে কানের একটি অংশকেও বোঝায়; আবার লেখকের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত জাপানী লেখক ইউকিও মিশিমার (১৯২৫-১৯৭০) ১৯৫৬ সালের বিখ্যাত উপন্যাস কিনকাকু-জি-র প্রতি। কিন্=সোনা, কাকু=শিবির বা প্রকোষ্ঠ, যাকে প্যাভিলিয়ান বলা চলে, জি=মন্দির, অর্থাৎ সোনার প্যাভিলিয়ান-ওয়ালা মন্দির। ফরাসী, ইংরিজি ও ব্রেজ়িলে এর অনুবাদ এই নামে (ইংরিজিতেন Temple of the Golden Pavilion) হলেও পোর্তুগালে (O Templo Dourado) এবং এখানে (স্বর্ণমন্দির, অনুঃ অভিজিৎ মুখার্জি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা, ২০২১) “সোনার মন্দির” নামেই প্রকাশিত।

ক্রমশ…

Rita Ray
 ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।   

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *