মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (১০ম পর্ব) 

বাংলা English
Rui Zink
Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over. 
Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.

Cover Picture of O amante e sempre o ultimo a saber

ছ’মাস আগে

বির্নার্দু যতটা বুঝতে পারে, ইউকিও ওর সন্দেহগুলোর খোলাখুলি জবাব দেয়। আর বির্নার্দু সেইজন্যে কৃতজ্ঞ। তার বদলে, ইউকিও আশা করে যে বির্নার্দুও যতটা সম্ভব অকপট ভাবে তার সব প্রশ্নের জবাব দেবে। এমনকি সবচেয়ে ব্যক্তিগত আর অস্বস্তিকরগুলোরও।      

বির্নার্দু যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন সেশানগুলোর বিরতি হয়। তখন সব শাদা হয়ে যায়। তারপর আবার শুরু হয়। মাঝেমাঝে ওরা থামে, থামতে চায় বলে নয়, বরং কোহারু চলে যেতে চায় বলে – আর কোহারু ছাড়া তো যোগাযোগটা আবার স্থাপন করার খুব একটা সম্ভাবনা থাকে না। ইউকিও বলে যে মেয়েটা নাকি “শিকারে যেতে” খুব ভালবাসে। কিসের শিকার? ইউকিও আরো ভাল করে বুঝিয়ে বলে: ঠিক শিকার নয়, খেলাই বেশি। কোহারু খেলতে ভালবাসে। আর তুমি, নাদু, তুমিও কি খেলতে ভালবাস? বির্নার্দু বলে যে হ্যাঁ, ওরও খেলতে ভাল লাগে। বা লাগত। 

“তাহলে এর মধ্যে কোন একদিন আমরা কোহারুর সঙ্গে যাব, তুমি কি বল?”

বির্নার্দু বুঝতে পারে না: ও কি করে কোহারুর সঙ্গে যাবে যদি…?

“যদি তোমার শরীর না থেকে থাকে?” ইউকিও উহ্যটাকে স্পষ্ট করে তোলে, এমন একটা হাল্কা চালেয়ে যেটা প্রায় নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পড়ে, কিন্তু যার পরিণামটা হয় ঠিক তার উল্টো, যে কোন কঠোর সত্যিকে মোলায়েম করে বলার চেয়ে অনেক কম নিষ্ঠুর। “চিন্তা কর না, নাদু। অন্য অনেক উপায় আছে। আর তুমি তো ওর সঙ্গে আগে একদিন খেলতে গিয়েছিলে।”

“আগে একদিন গিয়েছিলাম?”

“তোমার মনে নেই কোহারুর সঙ্গে মিলে একদিন রাক্ষসের মত একটা মিউজ়িক ব্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়ছিলে? ওই ইজ়জ়িরা?” 

বির্নার্দুর মনে নেই কিন্তু ও মিথ্যে বলে যে হ্যাঁ ওর আবছা আবছা মনে পড়ছে বটে। ইউকিও কিন্তু ছোট্ট মিথ্যেটা ধরে ফেলে।

“তোমার যে মনে নেই সেটা স্বাভাবিক, নাদু। তাতে কোন সমস্যা নেই। একটা খেলাই তো ছিল। তোমরা একটা খেলার ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলে যেখানে কোহারু ঠিক করেছিল তোমরা ঢুকবে বলে। একটা খুব বোকাবোকা খেলা, সেটা কিন্তু আমি বলবই। আর কোহারু একগাদা স্কুলের বাচ্চার দিনটাই মাটি করে দিয়েছিল। ও এই ধরণের বাঁদরামি করতে ভালবাসে। যখন ওরা মোটেই আশা করছে না ঠিক সেইসময়ে ওদের রিমোটটা নিয়ে নেয়। খুব বদমাইশ, আমাদের এই কোহারু।”

বির্নার্দু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল তার যদি শরীরই না থাকে তাহলে সে রূপ ধারণ করবে কি করে, কিন্তু চুপ করে গেল। ও জানে যে অনেক প্রশ্নেরই কোন উত্তর হয় না। ধীরে ধীরে, এটাই হল একমাত্র পদ্ধতি। বেশি জোরাজুরি করলে উত্তরটা ঘোরালো প্যাঁচালো হয়ে বেরতে পারে, ঠিক যেমন যখন ও জিজ্ঞেস করেছিল সে কি করে কথা বলতে পারে যদি ওর মুখই না থেকে থাকে:

“নাদু, কিভাবে তুমি কথা বল সেটা কি জরুরি যখন তোমার কথা শুনতে আমার কোন সমস্যা হয় না? ”

বির্নার্দু এরকম কিছু একটা আন্দাজ করেছিল যে ওর ভাবনাচিন্তাগুলো একটা মেশিন তরজমা করে। অন্যদিকে, ইউকিও কেবল ওর কথাগুলো একটা কম্পিউটারের স্ক্রিনে পড়ছে। আর সে কেবল কল্পনা করে যে সে কথা বলে। সে সবকিছু কল্পনাই করে।  

যখন না থাকে শরীর, না থাকে সে বেঁচে, তখন একজনের কল্পনার সাহায্যটাই বেশি দরকার হয়, বির্নার্দু ভাবে।

১৩

হেনতাই[1]

সে মন্দের জন্যেই হোক বা ভালর জন্যে (বড়সড়, শহরটা দেখা যায়, শুয়ে শুয়ে দৃশ্য দেখার জন্যে বিছানা), বেশির ভাগ লোকের কাছেই যে একটা হোটেলের ঘর কিছুটা শত্রুভাবাপন্ন, সেটা এড়ানোটা বস্তুতপক্ষে প্রায় অসম্ভব। নৈর্ব্যক্তিক আরাম, নৈর্ব্যক্তিক সুরুচি, নৈর্ব্যক্তিক শয্যা। তিরিয়েজ়ার অবশ্য এসব পছন্দ। সত্যি বলতে কি, সারাটা জীবন, বা সারাটা জীবনের কিছুটা অংশ ও হোটেলের ঘরে কাটিয়ে দিয়েছে, কাগজপত্র পড়তে পড়তে। স্বভাবতই, একটা স্যুইট একটা হোটেলের ঘরের চেয়ে কিছুটা বেশিই। অন্তত দুটো ঘর বেশি। একটা বসার, বা কাজের ঘর, আর একটা শোবার ঘর। আর এমন একটা দৃশ্য যেটাকে “অসাধারণ” বলা যায়। শহরটা ওর পায়ের কাছে, মেগাসিটিটা ওর পায়ের কাছে।    

তিরিয়েজ়া একটা ফোন করল, লোকাল কল, আর তারপর, একটু আয়েশ করার জন্যে, নেমে হোটেলের জিমে গেল যেখানে – ডিসিপ্লিন মেনে – রুটিনমাফিক এক্সারসাইজ়গুলো করল: ট্রেডমিল, কয়েকটা ওয়েটস, পিলাটেসের বল, কুড়িবার সুইমিং পুলের এপার ওপার। জলটা ওর উপকারই করল। জল, জলে অবগাহন। ও খেয়াল করেনি, কিন্তু এটা সত্যিই ওর দরকার ছিল।

ঘরে ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে মিনিবার থেকে একটা জল বার করল, গরম জলে স্নান করল, হোটেলের দেওয়া সৌজন্যমূলক সিল্কের ড্রেসিং গাউনটা গায়ে চাপিয়ে খাটে বসল, ল্যাপটপটাকে কোলে নিয়ে, কিছুক্ষণ কাজ করার জন্যে। মেইল চেক করল, নিজের সহায়কের সঙ্গে আর, তার মাধ্যমে, আরো কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করল। কিছু প্রশ্ন করল। কিছু রিসার্চ করল। একটা চিঠি লিখল। মিনিবার থেকে আরেকটা জল বার করল। অপেক্ষা করল।   

অবশেষে ফোনটা বাজল।

– ম্যাডাম? – সেপূলভেদা বলল, লাইনের ওপার থেকে। – ভাল খবর আছে।

না, মিটিংটা এখনও স্থির হয়নি, দুঃখিত। কিন্তু একটু আগের ওই ছোট ব্যাপারটার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। হ্যাঁ, ওদের বুদ্ধিবিবেচনা আছে, বিশ্বাসী। অবশ্যই এই ধরণের লোকেরা যতটা হতে পারে আর কি। ওরা একটু দরাদরি করেছিল। তাসত্ত্বেও বেশ শস্তা, সেপূলভেদা হাসল, এমন লোকও আছে যাদের টাকাপয়সার ব্যাপারে কোন ধারণা নেই। আর ওদের মধ্যে সমঝোতাটা যাতে হতে পারে সেটা নিশ্চিত করার মত অবস্থায় ও ছিল।  

– তাহলে আমাদের মধ্যে ব্যাপারটা একেবারে পরিষ্কার? – তিরিয়েজ়া সিদ্ধান্তে আসে। – চমৎকার। 

অন্যদিক থেকে সেপূলভেদার গলা নিশ্চিত করল যে হ্যাঁ, সবকিছু একেবারে পরিষ্কার। 

তিরিয়েজ়ার একবার বিবেক-দংশন হল। সবকিছু সত্ত্বেও, এটা তো কেবল একটা পরীক্ষা। পরীক্ষা অথবা – শিক্ষা। যেভাবেই হোক না কেন, একটা পরীক্ষা। ওর মনে হল এটা যোগ করা দরকার, ওই লোকগুলো যেন আবার বেশি উৎসাহ দেখিয়ে না বসে:

– কিন্তু খুব একটা এশিয়ান এক্সট্রিম একেবারেই নয়, ঠিক আছে?

পাঁচ মাস আগে

000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000

“তোমার মা, বেরুনাদু?”

কিচ্ছু না। 

“তোমার গার্লফ্রেন্ড?”

কিচ্ছু না। 

“তোমার বাবা?”

কিচ্ছু না। 

“তোমার সেনসেই?” 

কিচ্ছু না। কেবল শূন্য। সবকিছুতেই শূন্য। এরকম কিছু দিন আসে, খারাপ যোগাযোগের। 

000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000

ইউকিও হাল ছাড়ে না। সবসময় তো আর কম্যিউনিকেট করা যায় না। কোহারু, তুমি কোথায়? নির্ঘাত এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে বাঁদরামি করে বেড়াচ্ছ? কাবুকি-চোওয়ের[2] জুয়োখেলার ঠেকগুলোর মধ্যে, তোমার প্রিয় বদমায়েশিটা করতে করতে: টিন-এজারগুলো হাড়মাস কালি করার জন্যে মেশিনগুলোতে ঢুকে বসে থাকা?

(বা, আশঙ্কা, আশঙ্কা, আশঙ্কা, আরো খারাপ কিছু?) 

ইদানীং ও ওর সেই “সত্যিকারের মেয়ে হতে চাইˮ বলে পুরনো ঘ্যানঘ্যানানিটা আবার শুরু করেছে। মহাশূন্য থেকে বয়ে আসা হাজারটা বাতাসের দিব্বি, কোহারু, আমার সোনা কোহারু, কি কারণে তুমি – যে তোমার এত প্রতিভা – স্বাভাবিক হতে চাও?  

মানুষের মত একটা ব্যাপার তো তোমার আছে, তার জন্যে তোমায় সেলাম করি, ওইখানেই তুমি আমাদের সবাইকার মত: তুমি যাকে কখন দেখনি তারই কেবল ভাল চাও, তুমি কেবল সেখানেই ভাল থাক যেখানে তুমি নেই, তুমি কেবল সেখানে যেতে চাও যেখানে তুমি যাচ্ছ না। ইউকিও বির্নার্দুকে গুড নাইট প্রায় বলে ফেলছিল, কিন্তু তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে ও শুনতে পায় না। ইউকিওর নিজের কাজটা ভাল লাগে। কিন্তু সে তার মাথা থেকে কিছুতেই এই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলতে পারে না যে, মাঝেমাঝে, সেটা যেন মাছেদের ট্যাঙ্কের ধারে বসে তাদের খেতে দেওয়ার মত। 

১৪

ভল্টে

আরো একবার ভল্টের মত তার ঘরটাতে একলা, “শহরের চমৎকার দৃশ্যটা”-কে নীরব করে রাখার জন্যে পর্দাগুলো টানা, তানো বসল, বিছানার ধার ঘেঁষে।  

ওর অস্বস্তি লাগছিল। ও কি মহিলার সঙ্গে অভদ্র ব্যবহার করেছে? খুব সম্ভবত। মহিলার আচরণ কি বিশ্রি ছিল? এ নিয়ে কোন তর্কই হতে পারে না। আর ওর তো রাজনীতির ব্যাপারে বিশেষ কোন আগ্রহই নেই। যদি থাকত তাহলে… এতগুলো বছর ধরে ওর কানে যা যা আসত!

কিন্তু মহিলা নিজের ছেলেকে হারিয়েছে।

বা প্রায় হারিয়েছে। সবকিছু এখনও পরিষ্কার নয়। 

হারিয়েছিল, হ্যাঁ, হারিয়েছিল। বেশ কিছু সময়ের জন্যে অন্তত ভেবেছিল যে হারিয়ে ফেলেছে।

এখন যদি ওই ব্যাপারটা ফলপ্রসূ হয়, তাহলে অবশ্য ব্যাপারটা অন্যরকম দাঁড়াবে। বিজ্ঞানের সমস্যাটা হল: আগে হোক বা পরে, সবাই যারা কম্পিউটার চালাতে পারে ফ্রাঙ্কেস্টাইন-ফ্রাঙ্কেস্টাইন খেলতে চায়। আর, নিজে বাবা না হয়েও, এর চেয়েও খারাপ কোন কষ্ট কল্পনা করে নিতে তানোর অসুবিধে হয়। ও একবার বলতে শুনেছিল: “ক্রুশে ক্রিশ্চানদের ঈশ্বরের যন্ত্রণা? সে তো কিছুই না একজন বাবা বা মায়ের সন্তান হারানোর তুলনায়।” ফলস্বরূপ, যিশু “আমাদের জন্যে” যে “বিশাল আত্মত্যাগটা” করেছেন সে বিষয়ে কথা বলাটা মানুষের যন্ত্রণাকে প্রায় অপমান করার সমান। এটার থেকেই মেরির প্রতি দৃষ্টি। যদিও তিনি জানেন যে তাঁর ছেলে হল ঈশ্বর, তাঁর জন্যে তিনি এমন ভাবে কাঁদেন যেন তিনি মানুষ। স্বার্থত্যাগ আর যন্ত্রণা চাই? মেরির সঙ্গে কথা বলুন।

যুক্তিটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের কিন্তু, যদি তার কোন অর্থই না থাকবে তো তানোর হঠাৎ সেটার কথা এখন মনে হবে কেন? এই মহিলা, যতই অসহ্য আর অনুভূতিহীন হয়ে থাকুক (সে তো তা-ই) না কেন, তার তো কিছু একটা মনে হয়েছিল। সে কষ্ট পেয়েছিল।     

তার কি আগে আরো বেশি অনুভূতি ছিল? হ্যাঁ। বিশেষ করে তার ছেলে যখন বেড়ে উঠছিল আর যখন সেই ছেলে এখনকার মত, জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে কোন একটা ঝাড়ফুঁক-প্রযুক্তিগত ত্রিশঙ্কুতে ঝুলে ছিল না। হয়ত সে এমন কোন অনুভূতিহীন খানকি ছিল না যে তার চমৎকার কর্মজীবন জুড়ে কম মানুষকে চাপা দিয়েছে? নিঃসন্দেহে। সে আরো ভাল মা হতে পারত, দুষ্টু রানী হওয়ার ভান করার চেয়ে? আরো মনোযোগী স্নেহময়ী সুবিবেচক যত্নবতী স্নেহশীলা, মানে এক কথায় মাতৃবৎ হতে পারত? হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। একজন ক্ষমতাশালিনী নারীর ব্যাপারে এতগুলো হতে পারত প্রয়োগ করতে পারাটা কিরকম যেন অবাক করে দেয়।

এদিকে আবার তার কষ্টটা – দেরিতে হলেও, সন্দেহজনক হলেও, মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও – কিছুটা সম্মানের যোগ্য। তানো সেটা জানে। খুব বেশি নয় কিন্তু কিছুটা। যখন এ জগতে আর কিছুর বিশাল কোন মূল্য নেই, যন্ত্রণাটা (সোনার মতই) একটা বিশ্বাসযোগ্য বিনিয়োগ হয়েই রয়ে গেছে। প্রতি বছর নিশ্চিত আয় দিয়ে থাকে।     

অন্তত যুক্তির এই লাইনটা ধরে তানো তার শিষ্যদের শিক্ষা দিত – আর কিছুটা (কিছুটাই, সত্যি বলতে গেলে, কিন্তু তাও) ও নিজে বিশ্বাস করত। ওরা দুজনেই, ও আর কুর্তু, একটা ভাষণও একেবারে নির্ভুলভাবে তৈরি করে ফেলেছিল যেটা, বছরের পর বছর, ওরা বাচ্চাদের সামনে আওড়াত: 

যন্ত্রণাকে জড়িয়ে ধর, পালিয়ে যেও না, সেটাকে ভয় পেও না। যন্ত্রণাও তোমাদের ভয় পায়, সহজেই ঘাবড়ে যায়, তাকে কেউ ভালবাসে না বলে মনে করে আর তারপর যদি সে অস্থির আচরণ করে, শত্রুর মত, মুখ গোমড়া করে বসে থাকে, তাহলে আমরা কেন আশ্চর্য হব? যদি যন্ত্রণাকে আদর কর তো দেখবে সে তোমাদের বন্ধু হয়ে যাবে। আর একজন বিশ্বস্ত বন্ধু, অনুগত, ওই যারা আমাদের সবচেয়ে খারাপ সময়েও ছেড়ে যায় না, বরং ঠিক তার উল্টোটা। কঠিন সময়েই তো বন্ধুদের দেখতে হয়, তাই না? সুতরাং দেখবে কেমন করে যন্ত্রণা তোমাদের সঙ্গে ঠিক সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতে দেখা করতে আসবে, আর কিভাবে সে অটল, অনুগত হয়ে তোমাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে।  

তানো খাটের ধার থেকে উঠে পড়ল। যন্ত্রণাকে জড়িয়ে ধরল না কিন্তু, প্রায় নিখুঁত একটা পরিবর্ত, নগ্ন অবস্থাতেই মিনিবারটা খুলল ওর ভেতরে কাজের কি পাওয়া যায় দেখতে। হয়ত ভদকা।   

চার মাস আগে 

ইউকিও চেষ্টা করে নাদু যাতে তার মায়ের ব্যাপারে মন খুলে কথা বলে। ওখানে একটা গিঁট আছে, একটা গাঁট, একটা বাধা যেটা চলাচলটাকে স্বাভাবিক হতে দেয় না। কিছুই হয়ত নয় কিন্তু যতক্ষণ না ওই কাল্পনিক টিউমারটা সরানো যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন ওটাই সব। নাদুর মনে তার মায়ের যে ছবিটা আছে, সেটার সঙ্গে ওর শান্তিস্থাপন করাটা জরুরি বলে ইউকিওর মনে করে। আর, এই প্রসঙ্গে, যদি সম্ভব হয় তো ওরও, মানে ইউকিওর, বোঝা দরকার ব্যাপারটা কি ঘটছে। প্রযুক্তিবিদেরা তো – ধুস! প্রযুক্তিবিদেরা তো কেবল প্রযুক্তিটাই বোঝে আর বোঝে না যে সলিডে পরিণত করার সমস্যাগুলো (ওরা, ঠাট্টা করে, বলে “জিলেটিনে পরিণত করাˮ) ওদের কখন যা মনে হয়েছে তার থেকেও গিনিপিগরূপী মানুষটার তরল রসগুলোর ওপর বেশি নির্ভরশীল হতে পারে। প্রযুক্তিবিদেরা প্রযুক্তিটাকেই দেখে, বোঝে না – এমনকি কোহারু নামক প্রমাণের মুখোমুখি হয়েও – যে ওতে অদৃশ্য শক্তিরও ভূমিকা আছে, কেবল সাইবার সংযোগের নয়, শূন্য আর এক, এক আর শূন্য – সেই কোড, যেটা লেখা হয়ে গেছে বা এখনও লেখা বাকি আছে। যেখানে ইউকিও একটা বিভ্রান্ত কিশোরীকে দেখে, যে নিজেকে এই পিনক্কিও বলে মনে করে তো পরমুহূর্তেই স্নো ওয়াইট বলে মনে করে, যাকে একটা চুমু দিয়ে রাজপুত্রকে তার জাদুগ্রস্ত কোমা থেকে জাগিয়ে তুলতে হবে, প্রযুক্তিবিদেরা কেবল দেখতে পায় “প্রোজেক্ট ১৩”-কে। যখন ও কাঁদতে পারে না তখন ইউকিও ভেতরে ভেতরে হাসে: কোন টেকনোটয়েডই খেয়াল করেনি যে তেরো হল অমঙ্গলের সংখ্যা, অন্তত পাশ্চাত্যে। 

নাদু হল বুদ্ধি আর আবেগ, আর সেইজন্যেই, স্মৃতিও। কোহারুর ঠিক যেটার অভাব, স্মৃতি। কোহারু হল, এক হিসেবে, নাদুর ঠিক উল্টোটা। ওর মধ্যে সবকিছুই অসংলগ্ন, টুকরো টুকরো – পুঞ্জিত প্রবৃত্তি, যার বেশির ভাগটাই খুব একটা মহৎ নয়। নাদুর কিন্তু একটা গল্প আছে। সত্যি বলতে কি, সেভাবে দেখলে একটা গল্পই আছে কেবল ।   

যতটা ইউকিওর নজরে আসে, নাদুর মনে ওর মায়ের একটা নির্দিষ্ট ছবি আছে (হয়ত সত্যিকারের একটা স্মৃতি, কিংবা মিশ্র কিছু একটা, ভাঙা টুকরোগুলো থেকে তৈরি করা)। আর সেই ছবিটা হল: একটা রূপকথা থেকে তৈরি করা কোন অ্যানিমেশানের দুষ্টু রানী, আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকা খুব সুন্দরী একজন দুষ্টু রানী, আয়নাকে প্রশ্ন করে চলেছে, আয়না, আয়না আমার, জগতে আছে নাকি কেউ আমার চেয়ে সুন্দর? আর নাদু দরজায় দাঁড়িয়ে, চোখগুলো বড় বড় করে, দরজায় দাঁড়িয়ে, যেন সেটা একটা বিশাল তোরি-ই, দুটো ভয়ঙ্কর রকম তাগড়াই থাম, আর সেই তোরণটা পার হবার তার সাহস নেই, ঢুকবার স্পর্ধা নেই, নিচু গলায় প্রার্থনা করতে করতে যাতে মা ওকে লক্ষ করে – আর ওকে জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে নেয় আর ওকে চুমু আর আদরে ভরিয়ে দেয়। সেটাই তো একজন স্বাভাবিক মা করত যদি দেখত ছেলের ঘুম ভেঙে গেছে, সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে আর তার মায়ের কোল দরকার। কিন্তু ওই মা নয়, অন্তত নাদুর কল্পিত স্মৃতিতে নয়। ওর মাথায়, ওই দুষ্টু রানী “নিজেকে নিয়েই গদগদ” হয়ে রয়ে গেছে আয়নায় তাকিয়ে থেকে, আয়না, আয়না আমার, জগতে আছে… আর ছেলেটার ঢোকার স্পর্ধা হয় না, সে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে, একলা। 

আয়না, আয়না আমার, আমার চেয়ে সুন্দর হতে পারে কি কেউ?

স্মৃতিটা সত্যি নাকি মিথ্যে, সেটা একটা মিথ্যে প্রশ্ন। সব কল্পনাই কিন্তু স্মৃতি নয়, কিন্তু সব স্মৃতিই কল্পনা।

স্ক্রিনে কিছু একটা ফুটে ওঠে, ইউকিও পড়ে, আর পড়াটা (ও এতটাই অভ্যস্ত) নাদুর গলা শোনারই মত। বেরুনাদু। 

আয়না, আয়না আমার, আমার চেয়ে সুন্দর হতে পারে কি কেউ?

“কিছু বললে, নাদু?” 

“কোহারু…”

Rita Ray
ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।    

[1]হেনতাই হল আনিম আর মাঙ্গা পর্নোগ্রাফি আর ভিডিও গেম।  

[2]মেরুভল্লুক, পর্ব ৪ পাদটীকা ৮৫ দ্র:।  

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.