মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (৯ম পর্ব) 

বাংলা English
Rui Zink
Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over. 
Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.

Cover Picture of O amante e sempre o ultimo a saber

মেরুভল্লুকের প্রেম

১০

উড়ালপুল

গুমোট গরমটা, শহরটাকে ওপর থেকে অদৃশ্য একটা ঢেউয়ের মত ঘিরে ধরে, তার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছে। ঘন আর্দ্রতা। শরীরে শরীর সেঁটে রয়েছে। একমাত্র সম্ভাব্য উপায় হল ধীরলয়ে হাতপা নাড়া। গোটা শহরটাই মনে হচ্ছে যেন স্লো-মোশানে নড়াচড়া করছে, জিলেটিনের পুডিঙের মত যেটা একইসঙ্গে বহুমুখী আর একক। এটাই তো একটা শহরকে নির্ধারণ করে, তাই না? এমন একটা জেলি যেটা সর্বদাই যে সূক্ষ্ম বা রহস্যময় তা কিন্তু নয়, আবার সর্বদাই সূক্ষ্ম আর রহস্যময়, আর সেটা ঐক্য আর বহুত্বের মধ্যিখানে দুলতে থাকে। রাস্তার পিচটাও মনে হচ্ছে যেন স্লো-মোশানে চলেছে। পিছলাতে থাকা শহর তওকিও, পিছলাতে থাকা মানুষ, গাড়ি, যানবাহন, সাঁকো আর ইমারতে তৈরি। যে শহরে এত লোকজনের বাস সে শহর এতটা নিঃশব্দ কি করে হতে পারে?      

ওরা একটা উড়ালপুলের তলা দিয়ে চলে গেল, তারপর আরেকটা উড়ালপুলের তলা দিয়ে, তারপর একটা উড়ালপুলের তলাকার আরেকটা উড়ালপুলের তলা দিয়ে, তারপর একটার ওপর দিয়ে আরেকটা বিভিন্ন দিকে চলে যাওয়া কতগুলো উড়ালপুলের বিশৃঙ্খল-শৃঙ্খলাবদ্ধ একটা স্তরের তলা দিয়ে।     

(কিন্তু সর্বদাই খুব সম্মান দিয়ে।)  

উড়ালপুলগুলো, রাজপথটাকে উঁচু করে দিয়ে রাস্তাটাকে নিচু করে দিয়েছে, যার ফলে মাঝেমাঝে মনে হচ্ছে যেন তারা মাটির তলা দিয়ে হাঁটছে, শহরটার নিচে অন্য একটা শহর। একটা রেলব্রিজ দিয়ে একটা বুলেট ট্রেন, সাইলেন্সার লাগানো একটা বন্দুক থেকে ছোঁড়া একটা গুলির মত নিঃশব্দে, শাদা একটা অ্যানাকোন্ডার মত অসীম, কিওতওর দিকে সবেগে ছুটে গেল।       

ওরা প্রায় লুকনো একটা সমাধিক্ষেত্রে এসে পৌঁছল, চওড়া একটা রাজপথের ঠিক পেছনে। কেউ ওটাকে খেয়ালও করবে না। খুবই ছোট্ট একটা সমাধিস্থান, একটা বাস্কেটবল কোর্টের অর্ধেক সাইজের। খাড়া দাঁড়িয়ে থাকা সমাধি-প্রস্তরগুলো, লম্বায় এক মিটারও হবে না, নিখুঁত রেক্ট্যাঙ্গল তৈরি করে ওই ছোট্ট পরিসরটাতে মিনিয়েচার বহুতল সমন্বিত মিনিয়েচার একটা নিউ ইয়র্কের ভাব এনে দিয়েছে।    

তানো তার হাতদুটোকে যুক্ত করল, মাথা ঝুঁকিয়ে, চোখদুটোকে বন্ধ করে, ওই প্যারালেলোপিপেডগুলোর একটার সামনে দাঁড়িয়ে।

তিরিয়েজ়া তার হাতদুটোকে ভাঁজ করে বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে রাখল:  

– তানো, আমাকে আরো একবার বলুন আমরা এখানে কেন এসেছি।

তানো হাত দুটোকে বিযুক্ত করল। হাতে হাতে তালি মারল। উত্তর দিল।   

– আমরা এখানে এসেছি কারণ তিরিয়েজ়া আমার সঙ্গে আসবেন বলে স্থির করেছিলেন।

– হ্যাঁ, কিন্তু আমরা এখানে কেন এসেছি?

– কারণ আমার বাবামাকে সম্মান জানানোটা আমার কর্তব্য।

– আপনি সত্যিই এতে বিশ্বাস করেন, তানো?

– না। – গুমোট ভাব। ৯০% আর্দ্রতা। কোন হাওয়া নেই। ওরা জলের মধ্যে থাকলে এর চেয়ে খুব বেশি আলাদা কিছু হত না। – কিন্তু ওঁরা হলে বিশ্বাস করতেন, যদি বেঁচে থাকতেন।

– আপনার বাবামা এখানে আছেন?

– যে শহরে আমার জন্ম সেটা এখান থেকে ছশো কিলোমিটার।

– তাহলে…  

– কিন্তু অন্য যে কোন জায়গায় ওঁদের জন্যে যা করতে পারি সেটা এখানেও করতে পারি।

– বুঝেছি। যা করার প্রয়োজন সেটা তাহলে করুন, আর তারপর আমায় এমন কোন জায়গায় নিয়ে চলুন যেখানে এই গরমটা থেকে আমরা পালাতে পারি। কারণ সাঁতার যদি কাটতেই হয় তাহলে আমার একটা সত্যিকারের সুইমিং পুলই পছন্দ।

*

অভিজাত সব বুটিক আর দিনরাত খোলা মুদির দোকানগুলোর মধ্যে দিয়ে আবার বড় রাস্তায় পড়ে ওরা – একটা সাততলায় – একটা ভাল আর শান্তিপূর্ণ ক্যাফে খুঁজে পেল। তওকিও, লম্বালম্বি ভাবে বেড়ে ওঠা একটা শহর। কি কারণে, এমন একটা নগরে যেখানে সবাই সাইনবোর্ড পড়তে পারে, দোকানগুলোকে সব একতলাতেই হতে হবে?  

ওই ক্যাফেটাতে ধূমপান করা চলে। তওকিওতে রাস্তাতেই ধূমপান করা যায় না। তানোর সিগারেটে সুখটান দেবার ইচ্ছে জাগল, কিন্তু সে সিগারেট সঙ্গে করে আনেনি। সে এটাকে সফরকালীন আত্মসংযমের অঙ্গ বলেই ধরে নিয়েছিল। 

তানো গলাটা ঝাড়ল। খেজুরে আলাপের সময় শেষ। সঠিক সময়ের আগেও নয় আবার পরেও নয়, সে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল:

– সত্যি বলতে কি, তিরিয়েজ়া যতটা মনে করেন যে আমি ওঁর ছেলের বিষয়ে জানি, আমি ঠিক অতটাও জানি না…

– ও।  

– কিন্তু এটা বলতে পারি যে, আমার মতে, আপনার ছেলে খারাপ ছেলে ছিল না।   

হয়ত দোষটা তার নয়, কেবল একটা তৈরি হওয়া বদভ্যেস, তামাকের মত, কিন্তু তিরিয়েজ়ার একটা প্রায় অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আছে সবচেয়ে নির্দোষ শব্দগুলোতেও একটা দ্ব্যর্থবোধক সুর আরোপ করার, যেটাতে উগ্রতার সম্ভাবনা থাকে:

– আপনার তাই মনে হয়, তানো? ধন্যবাদ।  

– কিন্তু ওর কিছু কিছু সমস্যা ছিল।  

– আমি কি সেটা জানি না? আমি তো ওর মা।   

– আমি জানি। কিন্তু, যদি অনুমতি দেন তো…

– অনুমতি দিলাম, তানো, দিলাম। আপনি যদি নিজেকে অনুমতি দেন তো আমিই বা কেন আপনাকে সেটা দেব না?  

তানো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ক্যাফের জানলা দিয়ে তলাকার, পাশের, ওপরকার উড়ালপুলগুলোকে দেখা যাচ্ছিল।  

– ব্যাপারটা নিশ্চয়ই সহজ ন্যাসপাতি[1] হয়নি…  

– মিষ্টি।  

– মানে?

– মিষ্টি ন্যাসপাতি। মিষ্টি ন্যাসপাতি বলা হয়ে থাকে।

– মিষ্টি ন্যাসপাতি। বটেই তো। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই মিষ্টি ন্যাসপাতি হয়নি, ম্যাডামের মত একজনের একমাত্র সন্তান হওয়াটা। 

– আপনি ঠিক কি বলতে চাইছেন, তানো?   

– এমন একজন…

– বুঝে গেছি। আমার মত একজন? নিষ্ঠুর, যে সবকিছু নিজের হাতের মুঠোয় রাখতে চায়, নিজের স্বার্থ ছাড়া বোঝে না, কঠিন হৃদয়?    

– আমি বলতে যাচ্ছিলাম এমন একজন যার এত ক্ষমতা, এত…

– আপনার যেরকম মনে হয় আমার ঠিক অতটা ক্ষমতাও নেই, তানো। যদি থাকত তাহলে আমরা এখন এখানে বসে থাকতাম না, এটা আমি আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি। 

– এত দৃঢ়চেতা। এমন কেউ যিনি খুব ভাল করে জানেন তিনি কি চান।

– আপনার মনে হয় যে আমি কি চাই সেটা আমি জানি, তানো?

– আমার মনে হয় আপনি বরাবরই জানতেন। জানতেন না?

– হুঁ। সেটা সত্যি। ছোটবেলা থেকেই আমি সবসময়ে জানতাম আমি কি চাই। কিছুটা অন্তত। কিছু একটা করতে চাইতাম আর সেটা করে ফেলতে পারার জন্যে নিজেকে জোর করতাম। এটা কি আমাকে একজন খারাপ মানুষ করে তোলে, তানো?

– আমি সেটা বলছি না।

– আমাকে বাবা আর মা দুই-ই হতে হয়েছিল, জানেন তো?

– আপনার স্বামী…

– খারাপ লোক ছিলেন না। কিন্তু বির্নার্দুর জন্মের সময়ে তাঁর তো প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে ছিল। অন্য এক মহিলার সঙ্গে জড়িয়েও পড়েছিলেন, বেচারা। আর তারপর তো মারাই গেলেন। অবশ্য তার ফলে বিশেষ কিছু হেরফের হয়নি। ব্যাপারটাতে কেবল আইনি শিলমোহর পড়ে গিয়েছিল।   

– আমি সেটা…

– তাহলে কি বলতে চান, তানো? বলুন।  

– আমি…  

– এটা বলতেই হবে যে আপনি আমাকে বেশ চমকে দিয়েছেন।  

– ম-মানে?  

– আপনাকে তো বরাবর মুখচোরা লাজুক গোবেচারা বলেই জানতাম। কিন্তু নিজের দেশে এসে চব্বিশ ঘণ্টা যেতে যেতেই তো দিব্বি মুখে বুলি ফুটেছে। কি বলতে চান, তানো? জানতে পারা যায় কি? ভয় পাবেন না। মন খুলে কথা বলতে পারেন।    

– আমি কেবল এটাই বলার চেষ্টা করছি যে সবাই তো আর ম্যাডামের মত হতে পারে না। জীবনে সে কি চায় সেটা তো আর সবাই জানে না।      

– আপনি বোধহয় এবার আমাকে বির্নার্দুর কথা বলছেন। তাই না? আমাকে বির্নার্দুর কথা বলছেন? 

– আপনার ছেলের জীবনে কোন লক্ষ্য ছিল না, ম্যাডাম।   

– তিরিয়েজ়া।

– তিরিয়েজ়া। আমি কেবল চেষ্টা করেছিলাম ওকে একটা…

চেষ্টা? বেশ, তবে জেনে রাখুন, ওকে যা-ই দেবার চেষ্টা করে থাকুন না কেন, সেটা ওকে দিতে পারেননি।

– আমি কিন্তু ওকে কোনভাবেই নিজের মত করে চালানোর চেষ্টা করিনি। আমি কেবল…

– আপনি কেবল ওর আধ্যাত্মিক উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাই না?

– আমি তো ওর পেছনে ছুটিনি। ও-ই আমায় খুঁজে নিয়েছিল…  

– আর আপনি, ওর ভাগ্যটা পড়ার বদলে – তোমার অনেক ধনসম্পত্তি হবে আর নিজের স্বপ্নের রাজকন্যাকে খুঁজে পাবে – ওকে বলেছিলেন তোমার যখন ধনসম্পত্তি আছেই, তোমার মা যখন এত ধনী, তুমি জাপানে যাবে আর…

– আমি কারুর ভাগ্য পড়ি না। আমি কেবল কারাতে শে…  

– ওইসব মেকি বিনয় ছাড়ুন তো। আপনি ভাগ্য পড়েন আর তার চেয়েও বেশি আরো কিছু করেন। ওঃ, আপনার ওইসব প্রাচ্য সংযমের ঢং দিয়ে আমাকে কখন ভোলাতে পারেননি। আমি কচি খুকিটি নই, তানো। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলোকে যেসব আলতুফালতু কথা বলেন সেসব আমার জানা আছে। শস্তা, খেলো দর্শন। ব্যক্তিগতভাবে, আর এটা বলব না যে যা বলছি সেটা আপনাকে আঘাত দেবার জন্যে বলছি না, কারণ আপনাকে আঘাত দেবার জন্যেই বলছি, আমার কাছে আপনি সেপূলভেদার চেয়ে কম ধাপ্পাবাজ নন।   

– তাহলে আপনি আপনার ছেলেকে আমার ক্লাসে আসতে বারণ করেননি কেন?  

তিরিয়েজ়া নিশ্চল নিঃস্পন্দ হয়ে গেল।  

– বির্নার্দুর ব্যাপারে যা ঘটল তার পরেই কেবল আমি আপনার বিষয়ে খোঁজখবর করতে বলেছিলাম!

– তার আগেই আমার বিষয়ে খোঁজখবর নেননি কেন? যখন আপনি আপনার ছেলেকে সাহায্য করতে পারতেন? ও যাতে আমার ক্ষতিকর প্রভাবটা এড়াতে পারে?   

উঁচু গলায় কথা বলতে অভ্যস্ত নয় যে মহিলা সেই তিরিয়েজ়া দাঁতে দাঁত ঘষল:

– আমি। আমার। ছেলেকে। সাহায্য। করার। চেষ্টা। করছি।  

তানো বুঝল যে সে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। হয়ত সমাধিস্থান থেকে ঘুরে আসার সঙ্গেসঙ্গেই এই আলোচনা করাটা ভাল হয়নি ঠিক। তার বাবামা, বেঁচে থাকলেও, এটা পছন্দ করতেন না।     

অন্য দিকে আবার, হয়তবা খুশিই হতেন, এটা বিবেচনা করে যে সে এমন একটা কিছু করছে যেটাকে পিতার ক্ষমতার নিয়ে একটা বিবাহোত্তর তর্কাতর্কি বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তাঁদের প্রজন্মের কাছে, দিশাহীন, লক্ষ্যহীন, সন্তানহীন মধ্যবয়স্ক একজন পুরুষের চেয়ে সবকিছুই ভাল।       

তিরিয়েজ়া তখন তানোকে এমন একটা কথা বলল যেটা, অন্যায্য হলেও, এই আলোচনার বিষ্যবস্তুর সাপেক্ষে খুব একটা অন্যায্য নয়:

– স্রেফ কৌতূহলের বশে প্রশ্নটা করছি, তানো। অন্যদের ছেলেদের ক্লাস নিতে যে কেউ পারে। নিন্দে করতে বা শেখাতেও। কিন্তু আপনি কি কখন কারুর বাবা হয়েছেন?

– আমি…

– নাকি পুরোটাই কেবল নাটক?

তানো জবাব দিল না। কারণ, জবাব দিলে, সেটা হত হ্যাঁ, পুরোটাই কেবল নাটক। কাবুকি, আর সেটাও খুব একটা ভাল মানের নয়।   

আট মাস আগে

স্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে, “ইউকিও” ট্যাঙ্কের ভেতরে শরীরের যেটুকু পড়ে রয়েছে সেটার দিকে তাকায় – কিছুই না, বলতে গেলে কিছুই না। বিদেশী তরুণের কিছু কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। কিছুটা সময় ধরে ভাবা হয়েছিল যে, তত্ত্বগত ভাবে, একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে ব্রেনের বৈদ্যুতিক তরঙ্গগুলোকে চালু রাখাটাই যথেষ্ট হবে। ওটা ছিল একটা তত্ত্ব মাত্র – একটা ভুল তত্ত্ব। আসলে মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের মধ্যেকার যোগটাই, যেটাকে আমরা (এর চেয়ে ভাল কোন শব্দের অভাবে) “আত্মা”, “ব্যক্তিত্ব”, “ব্যক্তি” ও আরো সব ভাল ভাল বা বিশ্রি সব নামে ডাকি, সেটাকে এক করে রাখে। কিন্তু হৃদয়টা নিজে সেই আসল অঙ্গটা নয়। বৃক্কগুলোও নয়, ফুসফুস জোড়া বা ত্বক বা হনুগুলোও নয়। সেটা হল অন্য কিছু একটা। সেই অন্য কিছু একটার যে কি নাম, সেটাই হল প্রশ্ন।        

মানুষ নামের ওই ব্যক্তিকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় যেটা ওরা বার করতে পেরেছিল সেটা হল তাকে ধ্বংস করে ফেলা। একটা বদ্ধ প্রকোষ্ঠে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে তরলে পরিণত করে।    

বির্নার্দু আর কোন শরীর নয় – কেবল একটা শরীরের স্মৃতি। তবুও সে এখনও আছে। যতক্ষণ ওরা ওকে এইভাবে রেখে দিতে পারবে।    

প্রশ্নটা হল: ও কি আবার একজন ব্যক্তি হতে পারবে?  

১১

একেক সময়ে নিজেকে প্রশ্ন করি

একটা দৈত্যাকার জ়েপেলিন, ধূসর একটা মেঘের মত ভীতিপ্রদ, ইমারতগুলোর মধ্যে দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। তার গায়ে কাতাকানায় লেখা আছে, তিরিয়েজ়া বুঝতে পারেনি, কিন্তু তার নিচে ইংরেজিতে আছে:

ইজ়জ়ি জাপানীজ়জ়ি খাওস ইন তওকিও

কোন সিনেমা? কোন শো? তানোও জানে না। কিন্তু কোন কিশোরকে জিজ্ঞেস করলেই তৎক্ষণাৎ জবাবটা পাওয়া যাবে: “মেটাল, ম্যাডাম। পৃথিবীর সেরা মেটাল। একটা অস্ট্রেলিয়ান ব্যান্ড। কিন্তু আপনার কপাল খারাপ, বেশ কয়েক মাস আগেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।”  

– একেক সময়ে নিজেকে প্রশ্ন করি… – তিরিয়েজ়া বলে।  

তানোর এই “একেক সময়ে নিজেকে প্রশ্ন করি”-র সুরটা ভাল লাগল না। এ তো নতুন কিছু নয়। তিরিয়েজ়ার গলায় এমন সুর খুব কমই আছে যেটা ওকে সতর্ক করে দেয় না।  

– হ্যাঁ?   

– জাপানে বির্নার্দুর কিসে এতটা বিতৃষ্ণা হল?

– যে ও একেবারে…? – তানো মুখে নিস্পৃহ একটা ভাব আনল। – জানি না।   

তিরিয়েজ়া তানোর নিস্পৃহ মুখটা দেখে সন্তুষ্ট হল না:

– আপনি জানেন না, তানো? আর আমিই কি জানি?  

তানো দৃঢ়ভাবে মুখের নিস্পৃহ ভাবটা বজায় রাখল:

– জানি না।  

তিরিয়েজ়ার গলায় কিছুটা ক্লান্তির আভাস পাওয়া গেল। বা হয়ত ক্লান্তি নয়:

– ঘটনাচক্রে আমি সেটা জানি। জাপান নয়। তওকিও ছিল ওই শাকের আঁটি। ও এখানে এমন একটা কিছুর খোঁজে এসেছিল, সেটা যে ও এখানে পাবে না তা যার ঘটে সামান্যতম বুদ্ধি আছে সে-ই বুঝতে পারত।     

– অন্তত তওকিওতে নয় – তানো বলল।  

– না, তওকিওতে নয়। তওকিও হল গেলাসে অ্যাসিড নিয়ে, তার সঙ্গে বিভ্রম তৈরি করা ছত্রাক ্মিশিয়ে নেওয়া বিকারগ্রস্ত নিউ ইয়র্ক আর প্যারিস আর লান্ডান আর বার্লিন।  

তানো বোকা সাজল:   

অ্যাসিড?  

– উফ! বোকা সাজবেন না, তানো। আপনি তো সত্তরের দশকে ছিলেন, তাই না?

– তাহলে জাপানের কোন দোষ নেই – তানো বলল, প্রায় নির্বোধ একটা স্বস্তি নিয়ে, আর সঙ্গেসঙ্গেই এই নির্বোধ স্বস্তির জন্যে নিজেকে দোষ দিল।

– না, জাপানের কোন দোষ নেই। বরং, জাপান হল একমাত্র সম্ভাব্য পরিত্রাণ।  

– মাপ করবেন, এটা ঠিক বুঝলাম না।

– ভাল করে ভেবে দেখলে, অন্য কোন জায়গায়, মৃত্যুর পরে, ওকে আবার বাঁচিয়ে তোলার কোন আশা থাকত?

তানো ইতস্তত করল:  

– জেরুজ়ালেম?  

তিরিয়েজ়া হেসেই ফেলল প্রায়:

– কথাটা এবারে বেশ ভাল বলেছেন, তানো। সাবাস! একজন শিনতোও-বৌদ্ধের পক্ষে নিউ টেস্টামেন্টটা আপনি বেশ ভালই জানেন।

তানো বিনয়ের ভাব দেখাল:

– তিরিশ বছরেরও ওপর আমি একটা ক্যাথলিক দেশে বাস করছি…

– কিন্তু জেরুজ়ালেম তো বহুকাল আগের ঘটনা আর, যদি খুব ভুল না করি তো, ঘটনাটা একজনের বেলাতেই ঘটেছিল। না, তওকিও-ই এখন ফ্যাশান।   

– দোষ কারুরই নয়।  

– না। জাপানের নয়। কিন্তু আমার। আর আপনার…

– আমি জানি। আমারও।

তিরিয়েজ়ার কপালটা কুঁচকে গেল:

– তানো, বলুন তো দেখি, আপনার মাথায় কি ভূত চেপেছিল যে আপনি আমার ছেলের মাথায় এইসব উল্টোপাল্টা ধারণা ঢুকিয়েছিলেন?

– আমি…  

– জানি জানি আপনি কি বলবেন। কাউকে না কাউকে তো ওগুলোকে ঢোকাতেই হত, তাই না? কাউকে না কাউকে তো পুরুষালী কর্তৃত্বের একটা আদর্শ হিসেবে দেখাতে হত।   

– আমি ঠিক এই কথাটা বলতে যাচ্ছিলাম না।  

– তাহলে কি বলতে যাচ্ছিলেন, তানো?  

– বলতে যাচ্ছিলাম যে…

– হ্যাঁ?

– এটা আমার কাজ। এটাই আমার কাছ থেকে আশা করা হয়।   

– ছাত্রদের মাথায় উল্টোপাল্টা ধারণা ঢোকানো?

– সত্যিসত্যি খেলা করা। কারাতের গুরুর ভান করা।

– সামরিক মেজাজ আর জীবনের চূড়ান্ত অর্থের এই ছাইভস্মটাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা?

– মানে…     

– বুঝে গেছি, তানো। আপনার কাছে জীবন হল একটা মুখোশ পরে নিরবিচ্ছিন্ন একটা অভিনয়। বিশাল বড় একটা কার্নিভাল।   

– আমি…

– বোঝাতে যাবেন না। বোঝানোতে ব্যাপারটা কেবল নষ্ট হয়ে যায়।

– আমি…  

– কিচ্ছু বলতে যাবেন না, তানো। বোঝাতে যাবেন না। কিচ্ছু বলতে যাবেন না। 

– আমি…

– কিছু না বলাই ভাল।

– আমি…

– তানো, দোহাই আপনার। কিচ্ছু না বলতে আমায় কতবার আপনাকে বলতে হবে?

সাত মাস আগে

ইউকিও কি করে তানোর অস্তিত্বের কথা জানতে পারল? ব্যাপারটা মোটেই সহজ হয়নি। কঠিনও হয়নি। আমাদের সবারই একজন গুরুর দরকার হয়, বিশেষ করে আমাদের পরিবারে যদি কোন “অভাব” থাকে। মরিয়া হয়ে গেলে দৈত্যদানো পেলেও চলে যায়। সহায়সম্বহীন ছেলেরা সবচেয়ে খারাপ দানোগুলোর পাল্লায় পড়ে। আর অসহায় ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অসহায় ছেলেগুলো হল সেই অসহায় ছেলেগুলো যাদের এর মধ্যেই বিচারবিবেচনা করার বয়েস হয়ে গেছে। দুর্বলেরা শক্তিশালী হবার ভান করে, শক্তিশালীরা দুর্বল হবার ভান করে। এটাই রীতি।   

“নাদু, আমাকে তোমার সেনসেইয়ের কথা বল।”

নীরবতা।

“নাদু।”

ইউকিও অপেক্ষা করে।

“নাদু… ”

অবশেষে, বির্নার্দু, গোমড়া একটা গলায়:

“বলার আছেটা কি?”

অল্পবয়েসি ছেলেপুলে সব। সবাই অন্যরকম, সবাই একইরকম।

“জানি না, নাদু। কি বলার আছে বলে তোমার মনে হয়? ”   

নীরবতা। ইউকিও ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকে। আর, আরো একবার, একটা কণ্ঠস্বর। ইউকিও সত্যিসত্যি সেটাকে শুনতে পায় না, কেবল কম্পিউটারের স্ক্রিনে সেটাকে পড়তে পারে, কিন্তু ওর এতটাই অভ্যেস হয়ে গেছে যে ও সুরগুলোকে বুঝতে পারে, আর ও দিব্বি দিয়ে বলতে পারে যে এই মুহূর্তের গলাটা প্রায় বোজা, ভাঙা ভাঙা:

“উনি… উনি আমায় একটা পথ দেখিয়েছিলেন।”

ইউকিও বির্নার্দুকে চটাতে চেষ্টা করে:

“যে পথটা তোমায় এইখানে নিয়ে এসেছে। বেশ ভাল পথ, এতে কোন সন্দেহই থাকতে পারে না।”

বির্নার্দু বিরক্ত হয়:  

“দোষটা তো ওঁর নয়!”

এতখানি বিশ্বস্ততা।

“নয়?”

“না, উনি কেবল…”

ইউকিও জানে, কারণ খুব বেশিদিন তো হয়নি ও নিজেও একজন অল্পবয়েসি ছেলে ছিল, আর ছেলেরা এখানেই মেয়েদের থেকে আলাদা হয়। ছেলেদের গুরুর দরকার হয়। মেয়েদের কেবল পুজো করার জন্যে কাউকে দরকার হয়। বির্নার্দুকে খোঁচাখুঁচি না করতে হলেই ইউকিওর ভাল লাগত। কিন্তু এটাই তো ওর কাজ:

“তুমি সবকিছুর জন্যে তোমার মাকে দোষ দাও। কিন্তু তোমার কাছে তোমার সেনসেইয়ের সাত খুন মাপ…”

কয়েক মুহূর্তের জন্যে পর্দায় কেবল শূন্য দেখা গেল। যেন বির্নার্দুর ঠিক করে শ্বাস নিতে পারছে না। ইউকিওর কল্পনায় ওর মুখটা রাগে লাল হয়ে গেছে, যুতসই কোন কথা খুঁজে না পেয়ে সে প্রচণ্ড ক্ষেপে গেছে। আর সত্যিই ওর কিছু বলার নেই। আছে খালি শূন্য:

000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000

000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000

ইউকিও বুঝতে পারে যে আজকের মত বেচারা ছেলেটাকে রেহাই দেওয়া উচিত।

“ঠিকই বলেছ, নাদু। উনি তোমাকে সাহায্য করেছিলেন।”

ওঃ, নতুন করে সংযোগ তৈরি হল:

“উনি… উনি আমার খেয়াল রাখতেন।”

“কখন কখন একটা শব্দই যথেষ্ট মনে হয়, তাই না?”

“উনি আমায় সামলে উঠতে সাহায্য করেছিলেন। বা, চেষ্টা করেছিলেন অন্তত…”

“তোমার ভাগ্য ভাল, নাদু। সবাই একজন ভাল সেনসেইকে নিজের সেনসেই হিসেবে পেয়েছে বলে জাঁক দেখাতে পারে না।”

১২

ক্যাফে দোওতর[2]

বিকেলটা যে তপ্ত আর্দ্রতার আক্যিউরিয়ামে পরিণত হয়েছিল সেটা ধরে ওরা আরো কিছুটা গেল। আরো কয়েক ঘণ্টা পরে হয়ত গরম কিছুটা কমবে। কিন্তু এখন নয়। সেটা এক্ষুণি হবে না।

শেষে ওরা আরেকবার বসল, এবার দোওতর বলে একটা চেনের ক্যাফেতে, ঠিক এরকমই, এইভাবেই লেখা, প্রথম “ও”-টার জায়গায় (ডিজ়াইনারের কায়দা) কফির একটা বীজ। তানো সিগারেট কিনে তিরিয়েজ়ার দিকে একটা এগিয়ে দিল, সেটা ও নিতে কোন আপত্তি করল না। শান্তির পাইপ[3], এখন ফিল্টার দেওয়া।    

– আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?

– বলেই তো দিয়েছি। যা খুশি, তানো… যা ইচ্ছে জিজ্ঞেস করতে পারেন।  

– আপনি কেন চেয়েছিলেন যে আমি আসি?   

– আমি কেন চেয়েছিলাম আপনি যেন আসেন? আরে…

– সত্যি করে বলুন তো। কেন চেয়েছিলেন যে আমি আসি?    

– ভেবেছিলাম যে আপনাকে আনলে আপনি আমায় বুঝতে সাহায্য করবেন।

– কী?  

– আপনার মত ভাঁড়ের মধ্যে আমার ছেলে কী দেখেছিল।

তানো বিশ্বাস না করার ভান করল:

– আপনার ছেলে যে আমাকে শ্রদ্ধা করত আপনি সেটাকে হিংসে করেন?

– যত সব বাজে কথা! আমার ছেলে আমাকে শ্রদ্ধা করত।

– তাহলে আপনার ছেলের আমার প্রতি যে টানটা ছিল তাতে আপনার অসুবিধেটা কোথায়? 

তিরিয়েজ়া এমন ভাবে হাসল যেন ওর জীবনের সবচেয়ে অর্থহীন কথাটা ও শুনল। পরিমাণ মত বিশ্বাসজনক। 

– একেবারেই নেই। আমার কেবল কৌতূহল হচ্ছিল।

– আর সেটা মিটেছে?  

– স্বীকার করছি যে এখন অবধি আপনার আকর্ষণশক্তির কোন ঝলক দেখতে পাইনি।

– ও।  

– কিন্তু আমি খুব ধৈর্যশীলা।

তানো নিজের সতর্কতাটা শিথিল করল। এইমাত্র শুরু করলেও এরমধ্যেই ও ক্লান্ত বোধ করছে। ও যে খেলতে ভালবাসে না তা কিন্তু নয়। বরং বিষয়টা অনেক বেশি অযোগ্যতার। খেলাধুলোয় কোনদিনই ও বিশেষ পটু ছিল না।     

– স্বীকার করুন, ম্যাডাম।  

– দয়া করে তিরিয়েজ়া বলে ডাকবেন। আমি তো পরিষ্কার করে বলেই দিয়েছি।  

– আপনি আমায় সাহায্যের জন্যে নিয়ে আসেননি। বোঝার জন্যেও নয়।

তিরিয়েজ়া ওর দিকে সোজাসুজি তাকাল:

– আপনি সেটা মনে করেন না?

এবারে আর তানো চোখ সরিয়ে নিল না:

– আপনি আমাকে নিয়ে এসেছেন শাস্তি দেবার জন্যে। ঠিক বলেছি, তাই না?

তিরিয়েজ়া হেসে ফেলল:

– আপনার মাথায় কি সত্যিই এটাই ঘুরছে? কি রোমাঞ্চকর!

তানো জ্বলন্ত সিগারেটটা ছাইদানে রাখল:

– আপনি আমায় উত্তরটা দেননি।

তিরিয়েজ়া হাসি থামিয়ে দিল।  

– আপনাকে কি বলি বলুন তো, সেনসেই? আমার ছেলে তার প্রাণটা হারিয়েছে বোকার মত আত্মহত্যা করার বোকার মত সফল একটা চেষ্টায়, আর আপনি, আপনার ভুলগুলোর খেসারত কিভাবে দেবেন সেটা না ভেবে, একমাত্র যে জিনিশটার কথা ভাবছেন সেটা হল আপনাকে শাস্তি দেওয়া ছাড়া আমার জীবনে আর কোন কাজ নেই।    

– আমি…   

– খুবই করুণ ব্যাপারস্যাপার!

– আমি…

– খুবই করুণ! তা-ও যদি বলতেন আমি নিজেই নিজেকে শাস্তি দেবার জন্যে…  

*

তানো আর কি-ই বা বলতে পারত? ও ক্লান্ত, বড়ই ক্লান্ত। আর না, সেটা জেটল্যাগের জন্যে নয়। এটা এমন একটা ক্লান্তি যেটা বেশ কয়েক মাস ধরে চলছে, যখন থেকে জানতে পারল যে, যে কোন মুহূর্তে, এই মহিলা তাকে এই সফরটার জন্যে, এই বোকাবোকা… বিশেষ কাজটার জন্যে ডেকে পাঠাতে পারেন। সে সাইকেলে করে যাওয়া এক তরুণী মায়ের দিকে তাকাল, হ্যান্ডেলের ওপরে বাস্কেটটায় বাচ্চাকে নিয়ে, সামনের দিকে প্যাডেল চালিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে মোবাইলে উত্তেজিত ভাবে কথা বলছে। সিগারেটটা উল্টো দিক দিয়ে ধরে ঠোঁট দুটোকে প্রায় পুড়িয়ে ফেলে সেসিগারে যখন, সেকথা বলছে।  কে জানতে পারল যে, যে ক করবেন।  ব্যাপারস্যাপার আরো জটিল করে তুলল। এটা একেবারেই ভালভাবে এগোচ্ছে না।      

– আপনার সমস্যাটা কি জানেন, তিরিয়েজ়া?

– জানি না, তানো, তবে ধরে নিচ্ছি যে সেটা আপনি আমায় এবার বলবেন। 

– আমার মনে হয় না সেটার কোন প্রয়োজন আছে।

না, ওর সমস্যাটা যে কী সেটা বলার কোন প্রয়োজন নেই। তানো চারিপাশে তাকিয়ে দেখল, যেন সে সাহায্য চাইছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাথা ঠাণ্ডা কর, তানো। মাথা ঠাণ্ডা কর। জল ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করল:

– আমি যেটা বলছি সেটা হল বির্নার্দু… বির্নার্দুর সমস্যাটা হয়ত ছিল বাবাকে ছাড়া বেড়ে ওঠা। আমি মনস্তাত্ত্বিক নই, কিন্তু…

তিরিয়েজ়া ফেটে পড়তে পারত। পড়ল না। তার চেয়েও খারাপ কিছু হল:

– বাবাকে ছাড়া বেড়ে ওঠা? আর যদি, তার বদলে, ও বাবার সঙ্গে বেড়ে উঠত, কিন্তু যে বাবা ভয়ঙ্কর, এমন একজন বাবা যে ওকে পায়ের তলায় দলত পিষত, ওকে ছোট করত, যার কাছে তার ছেলে কখনই কোন ঠিক কাজ করেনি, আপনি এ বিষয়ে কি বলবেন? এমন একজন বাবা যে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে একজন দুর্বলচিত্তকে দেখতে পায়, যার হাতে তার কারখানা তুলে দিতে পারবে না, কারণ সেই হতভাগা ছেলেটা তৎক্ষণাৎ সব টাকা শ্রমিকদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেবে আর, এইভাবে, কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দেবে।        

– আমি… আমি কারখানার কথা বলিনি…

– ওঃ, তানো! দোহাই আপনার, ওটা একটা রূপক মাত্র। দয়া করে একটু কল্পনা ব্যবহার করুন। আপনিই তো বাবার গল্প, অনুপস্থিত বাবার মিথটা টেনে আনলেন, আর আমি কেবল অন্য আরেকটা মিথ, উপস্থিত বাবারটা দিয়ে, শোধবোধ করলাম। তাহলে অনেক বেশি নাটক-নভেলের মত হত, তাই না? “আহা, বেচারা ছেলেটা! ওর বাবা ওকে বড্ড হেনস্থা করেছে, তাই তো ও এরকম হয়ে গেছে…”। সত্যিটা অনেক বেশি তুচ্ছ, তানো।     

– তাই?  

– তাই। নগ্ন সত্যিটা খুবই সহজ সরল: নিজেদের জীবনটা শেষ করে দেবার জন্যে ছেলেদের বাবার কোন সাহায্য লাগে না।   

এইখানে তানো, নিজের মুখের রাশ টানতে পারার আগেই, খুব নিষ্ঠুর হয়ে পড়ল:

– তার জন্যে একজন মা-ই যথেষ্ট?

তানোকে অবাক করে দিয়ে তিরিয়েজ়া কেবল সামান্য কেঁপে উঠল, যেন তার হাড়ের কাঠামোয় ভূমিকম্পরোধী কোন প্রযুক্তি গাঁথা রয়েছে, আর সে, অন্তত কথাবার্তায়, আহত হয়েছে বলে প্রকাশ করল না:  

– এটা অন্তত যদি সত্যি হত…    

তানো মহিলাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। ওর পেটে সে যেন তার মানসিক ৎসুকিটার[4] ভারী, আলোহীন, নেতিবাচক শক্তিটাকে প্রায় দেখতে পাচ্ছিল: “একটা ছেলেকে ধ্বংস করতে একজন মা-ই যথেষ্ট?” এটা একটা অবিচার। তানো কথাটা বলে ফেলেই সেটা বুঝতে পেরেছিল। সেটা ন্যায্য হলেও অন্যায্যই হত। কিছু কিছু জিনিশ, বলা হলেই, এমন একটা ভার ধারণ করে ফেলে (গাড়ির মাথায় লাগানো লাউডস্পিকারের মত) তাদের অর্থটা এমন ভাবে বাড়িয়ে তোলে যে তাদের সেই অর্থটাই শেষ পর্যন্ত বিকৃত হয়ে যায়।       সবকিছু সত্ত্বেও, একটা গাধামো করে ফেলা আর, তারপর থেকেই, গাধার তকমাটা পেয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা তফাত আছে। কিংবা কোন একটা সময়ে আমাদের ছোট্ট একটা পাশবিকতা করে ফেলা আর পাশবিক হওয়া-র মধ্যে। এমন সব সাজা আছে যেগুলো কাউকে দেওয়া হয়না, এমনকি সেই কেউ সেগুলো পাওয়ার যোগ্যও যদি হয়। 

হ্যাঁ, তানো ওই মহিলাকে ওই ঘায়ের জোরে টলে যেতে দেখেছিল, ধরাশায়ী হয়েই গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু মহিলা ধরাশায়ী হয়নি।   

সে সামলে নিয়েছে। অবিশ্বাস্য, কিন্তু সে সামলে নিয়েছে। সামলে নেওয়ার ক্ষমতার জন্যে না চাইলেও তানোর ওই মহিলাকে শ্রদ্ধা করতেই হবে। সমস্যাটা হল। সমস্যাটা হল: ওকে সেটা বলা যাবে না। ওকে যদি সে বলে – “আপনাকে ঠাণ্ডা আর নিষ্ঠুর বলে মনে করি, কিন্তু এটা আমাকে মানতেই হবে যে আপনার সাহস আছে” – তাহলে কম্ম শেষ।    

তানো কিছুই বলল না। যেটা ওর জানা উচিত সেটা যদি ও জানত, ওর যদি কিছু জানা থাকত তাহলে ও কিছু বলত। ওরকম অভদ্র হওয়ার জন্যে ক্ষমাভিক্ষা। মহিলার সাহসের জন্যে প্রশংসা। খুব বেশি কিছু তো নয়। তাহলেও কিছুই না বলার চেয়ে সেটা তো অন্তত ভাল হত। আর, নিশ্চিত নয় বটে, তবে শান্তির ওই কথাগুলো বলে যুদ্ধের কথাগুলোকে হয়ত নরম করে তুলে ও ওর কয়েকটা মাথাব্যথাকে এড়িয়ে ফেলতে পারত, ওই যেগুলো খুবই যন্ত্রণাদায়ক। এইভাবেই, বেচারা তানো, কাণ্ডজ্ঞানহীন তানো, নিজের জন্যে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলল।        


[1]pêra fácil/pêra doce – আসল প্রবচনটা হল “পেরা দোস” বা মিষ্টি ন্যাসপাতি, এর অর্থ খুব সহজ কাজ, “ছেলের হাতের মোয়া”। তানো জাপানী, বিদেশী, পোর্তুগালে বছর তিরিশ কাটানোর পরেও মাঝেমাঝে তার পোর্তুগিজ় বলতে ভুল হয়ে যায়, তাই সে বলে “পেরা ফাসিল” বা সহজ ন্যাসপাতি।

[2]Doutor – ডাক্তার।  

[3]আনুষ্ঠানিক পাইপ হল বিশেষ এক ধরণের পাইপ যা দিয়ে বেশ কিছু সংস্কৃতিতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে প্রার্থনা করা হয়, কোন শপথ নেবার জন্যে বা সন্ধি করার জন্যে। ইউরোপীয়রা একে অনেক সময়ে “শান্তির পাইপ” বলে থাকে যদিও এই পাইপ টেনে সন্ধিপ্রস্তাবে সীলমোহর দেওয়াটা এই আনুষ্ঠানিক পাইপের একমাত্র কাজ নয়।  

[4]Tsuki – কারাতেতে ঘুষি।  

RITA RAY
  ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।     

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.