মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (৭ম পর্ব)  

বাংলা English
Rui Zink
  Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.   
Cover Picture of O amante e sempre o ultimo a saber

মেরুভল্লুকের প্রেম

এক বছর আগে

…………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. …………………………………………………………………………………………….. ……………………………………………………………………………………………..

সে কাটতে থাকল

মন্দের ভাল যে সুশির রেস্টুরেন্টটা ভদ্রস্থ গোছের ছিল। দু মিটারেরও কম চওড়া একটা স্পেস ক্যাপসুলের চেয়ে বেশি কিছু নয়: টানা একটা কাউন্টার, চারটে বেঞ্চ, আর সুশির ওস্তাদ মাছটাকে কাটছে, গ্লাভস না-পরা হাত দিয়ে, খদ্দেরদের সামনে। তানো লোকটাকে বলেছিল যে তারা ওর পছন্দটাকেই মেনে নেবে: ও-ই ঠিক করুক তাদের কি খাওয়াবে। খুশি হয়ে প্রবল আগ্রহ নিয়ে সুশি-ওস্তাদ তাদের দুজনের সামনে খাবার সাজিয়ে দিতে লাগল, ফিলেগুলোকে কেটে কেটে সেগুলোকে, প্রায় গভীর প্রেমে, ভিনিগার দেওয়া ভাতের ছোট ছোট গোল্লাগুলোর ওপরে শোয়াতে শোয়াতে, বিছানাটাকে একটু ঝালঝাল করার জন্যে সামান্য একটু ওয়াসাবি যোগ করতে না ভুলে গিয়ে।     

তিরিয়েজ়া একটা মিষ্টিহীন সাকে খাচ্ছিল। তানো খাচ্ছিল একটা সাপ্পোরো[1]। সুশি-ওস্তাদ তার একমাত্র খদ্দেরদের নিয়ে খুশি ছিল। মহিলা বিদেশী হলেও দেখে বোঝা যায় যে ভাল জিনিশের কদর করতে জানে। এর ফলে তার পেশা নিয়ে আত্মসম্মানটা এক ধাক্কায় বেড়ে গিয়েছিল। যখন সে খদ্দেরদের শুকনো টুনার একটা টুকরো আর একটা চকচক করতে থাকা তাজা ম্যাকারেলের তফাত না করতে পারার জন্যে ধরে ফেলে তখন সে খুব মুষড়ে পড়ে। এরকম ভাবেই তো কাজের মজাটা আসে। আর খেতে দেখাটা। খেতে দেখাটাও একটা কাজ, একজন সুশি-ওস্তাদের কাছে কাজ। হয়ত তার কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন সুশি-ওস্তাদের কাছে এটা জানাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে তার গ্রাহক তার তৈরি খাবারের যোগ্য কিনা – আর, এই প্রাথমিক শর্তটা পূরণ হলে, খাবারটা গ্রাহকের উপযুক্ত কিনা।          

তিরিয়েজ়াকে দেখে খুব শান্ত মনে হচ্ছিল।   

– আপনি কখন ফুগু[2] খাননি, তানো?

– অপ্রয়োজনীয় ভাবে জীবনের ঝুঁকি নেওয়াটা আমার কখনই ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়নি।

– আর প্রয়োজনীয় ভাবে? আপনি কি অস্কার ওয়াইল্ডের ওই কথাটা শোনেননি? “আমি কেবল আমার সেই ভুলগুলোর জন্যে অনুতপ্ত যেগুলো করার দুঃসাহস আমার কখন হয়নি”?   

ওহো, কি আশ্চর্য (মহিলার জন্যে, যদি তানো তাকে বলত), যে সে পাকেচক্রে হলেও অস্কার ওয়াইল্ড পড়েছে, কিন্তু একটা শামুকের সুশি খাওয়ার সুযোগ নিয়ে সে উত্তরটা দিল না। খানিকটা সময় নিয়েই তারপর ও বলল:

– আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি, তিরিয়েজ়া-সান?

– যতগুলো চান, তানো – তিরিয়েজ়া বলল, সে-ও একটা (অক্টোপাসের) সুশি মুখে তুলতে তুলতে।   

– আপনার আপ্তসহায়ক?   

তিরিয়েজ়া কাঁধও ঝাঁকাল না হাসলও না। কেবল আঙুল দিয়ে আরও একটা তোওরোওর[3] কেক তুলে নিল, যেটা বলতে গেলে টুনার সবচেয়ে ভাল অংশটার ভাল অংশ। সুশি-ওস্তাদের বুকটা ভরে গেল।  হাত দিয়ে যে সুশি খাওয়া যায়, এটাও এমনকি ওই পশ্চিমী মহিলা জানে। এরকম হলেই তো কাজের মজাটা আসে। কিন্তু ওই দেকাসেগিকে[4] দেখে তার খুব একটা আহামরি কিছু মনে হচ্ছে না।   

– আপনাকে কি বলি বলুন তো, তানো? আপনি যে আমার ছেলেকে মার্শাল আর্ট শেখাতেন সেটা বুঝিয়ে বলার চেয়ে এটা বলা সবসময়েই অনেক বেশি সোজা, তাই না?   

তানো উত্তরটা ভেবে দেখল। কথাটায় যুক্তি আছে…

– কিন্তু এতে যদি আপনার আত্মসম্মানে ঘা লেগে থাকে তো চিন্তা করবেন না। আর যা-ই হোক, আপনি যে আমার সহকারী সেটা ও ভাববে না।   

তানো চমকে উঠে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

– আমি? আপনার…?!  

তিরিয়েজ়া এমন ভাবে তানোর দিকে তাকাল যেন ওই বেচারা হাবাগোবা লোকটা সত্যিই একটা বেচারা হাবাগোবা লোক।  

– আমি বলতে যাচ্ছিলাম আমার বডিগার্ড…

তানো নিজের চোখ দুটো নীচু করল।

– ওঃ!  

– আমার বিশ্বস্ত, ও মারাত্মক, সামুরাই।

তানোর হাত থেকে চপস্টিকগুলো পড়েই যাচ্ছিল প্রায়।

– ও। তাই।

তানো কিভাবে ঠিক বুঝে ওঠার আগেই তিরিয়েজ়া তাকে বুঝিয়ে দিল যে সে তার গেলাসে আরও একটু সাকে চায়।   

তানো ঢেলে দিল।  

– ওই লোকটা…

– সেপূলভেদা।

– বলল যে সে আপনার কাছে ঋণী।   

– কিছুই আপনার চোখকান এড়ায় না, তানো।

– আপনার কাছে ঋণী… আমার মত?

– না, তানো। অদ্ভুত ধারণা! ওর ব্যাপারটা একেবারেই অন্য। – এবার কোন ফিলেটা খাবে সেটা তিরিয়েজ়া ভাল করে ভেবে দেখল। এবি[5] না উনাগি[6]? – ও আমারই দয়ায় আধাসরকারী দায়িত্ব পেয়ে তোওকিও এসেছে।

– আধা দায়িত্ব?…

– এক কথায়, নিয়মমাফিক খুব বিশাল কোন দায়িত্ব নেই কিন্তু সরকারের কাছ থেকে একটা ভাতা পায়।     

তানো তার পোর্তুগালকে চেনে:

– ওঃ। বুঝেছি। তাহলেও, যদি অনুমতি দেন তো বলি, ওকে দেখে মনে হয় না যে ও আপনাকে খুব একটা পছন্দ করে।   

তিরিয়েজ়া নিজের আগ্রহটা দেখাল:

– আর কি দেখে আপনার এটা মনে হল, তানো?   

তানো তার মুখে প্রাচ্যদেশীয় দুর্বোধ্য ভাবটা আনল। ওই যেটাকে কুর্তু এত অপছন্দ করে, বা বলা ভাল, হিংসে করে:

– শরীরী ভাষা।

– মানে কারাতেতে দক্ষ হওয়া ছাড়াও আপনি শরীরী ভাষারও বিশেষজ্ঞ?

তানো জীবনের সবচেয়ে সহজ ভাবটা মুখে আনল:

– মানুষ কথা বলে। শরীর কথা বলে। মানুষ জিভ দিয়ে মিথ্যে বলতে শেখে। শরীর দিয়ে মিথ্যে বলাটা তার চেয়ে কঠিন।

তিরিয়েজ়ার কথাটা যুক্তিযুক্ত মনে হল:

– বেশ। আপনি ঠিকই বুঝেছেন। ও আমাকে পছন্দ করে না। – তিরিয়েজ়া তাজা লুয়ের[7] একটা টুকরো মুখে পুরল। – কিন্তু তাসত্ত্বেও আমি যা করতে বলব ও তা-ই করবে।

তানোর তাতে কোন সন্দেহই নেই:

– নিঃসন্দেহে।

– কিন্তু, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন – তিরিয়েজ়া বলল। – বলাই বাহুল্য, আপনি ঠিক ধরেছেন মানেই কিন্তু সেটা ঠিক নয়।

তানো বুঝল না:

– বুঝলাম না।   

– বুঝবেন বুঝবেন। এই লোকটা আমায় এত অপছন্দ কেন করে বলে আপনার মনে হয়?

– জানি না।  

– চেষ্টা করে দেখুন।

– কি জানি! রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দিতা?   

– ঠিক আছে, তানো, চাইলে ব্যঙ্গ করতেই পারেন। আমি কিছু মনে করব না।

– আমি ব্যঙ্গ করতে ছাই না।  

– ব্যঙ্গটাকে তো আর চেপে রাখতে পারছেন না। যদি না অবশ্য জাপানীদের ব্যঙ্গ করাটা একদম বারণ হয়ে থাকে।

– আমি যতদূর জানি…

– কিংবা কারাতের গুরুদের।

– না।  

– তাহলে কি ভাবছেন সেটা বলতে পারেন।    

– আর আমি ঠিক কি ভাবছি?  

– “আপনার মত এমন মনোহারিণী একজন মানুষেরও শত্রু আছে? হা ঈশ্বর, এটা কি করে সম্ভব?”  

ওস্তাদ তার সামনে যে সাশিমিটা এনে রেখেছে তানো তাতেই মন দিল। উড়ুক্কু মাছ, এখনও তাদের পাখা আছে, এখন পাখাবিহীন। আর, যখন সে দেখল যে এবারে তাকে কিছু বলতেই হবে, আক্ষরিক ভাবে উত্তর দিল:   

– আমি কখনই হা ঈশ্বর বলতাম না। আমরা ঠিক এইভাবে চলি না।  

– আমরা “জাপানীরা” না আমরা “কারাতের গুরুরা”?

– জাপানী ক্রিশ্চানও আছে, জানেন তো?

– খুবই কম, যতদূর জানি।

– হ্যাঁ, কিন্তু…  

তিরিয়েজ়া এই সুযোগে তানোকে দেখিয়ে দিল যে, অন্তত কিছু কিছু ব্যাপারে, সে তার চেয়ে জাপানকে একটু বেশিই চেনে:

– কখন নাগাসাকি গেছেন, তানো?

প্রশ্নটায় বেশ একটা প্যাঁচ আছে। সে কি পরমাণবিক বোমাটার কথা বলতে চলেছে?

– না – তানো স্বীকার করল।  

– বেশ কয়েক বছর আগে আমি নাগাসাকি গিয়েছিলাম। সরকারি কাজে। শান্তির জন্যে একটা অনুষ্ঠান, এইসব আরকি। বিরক্তিকর। বেশ ভাল একটা শহর, কিন্তু বড়ই একঘেয়ে, রসকষহীন।

– পুরো জাপানটা তো আর তোওকিও নয় – তানো মন্তব্য করল।

– তো নাগাসাকিতে এক পাদ্রীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, খুব বুড়ো, খুব মজার, সাঙ্ঘাতিক মাতাল। জাপানে পঞ্চাশ বছর ধরে আছে। আমাদের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।   

বন্ধুত্ব? তিরিয়েজ়া তানো মুখের একটা সন্দেহের ছায়া সরে যেতে দেখল, সে দয়াপরবশ হয়ে বুঝিয়ে বলল:  

– যে অল্প কয়েকজন আমাকে পছন্দ করে তার মধ্যে পাদ্রীরা সর্বদাই পড়ে, জানেন তো? আমি একটা কনভেন্টে পড়েছি সেইজন্যেই হয়ত।   

– তিরিয়েজ়া-সান কনভেন্টে পড়েছেন?    

– না, পড়িনি। কিন্তু বিষয়টা এখন সেটা নয়। তো একটা সময়ে পাদ্রী আমাকে বললেন: “জাপানীরা একটা চমৎকার জাত। পরিশ্রমী। সবকিছুতে নিজেদের মানিয়ে নেয়, সবকিছু বোঝে, পশ্চিমের যা কিছু দেওয়ার ছিল তা সবকিছু ওরা আঁকড়ে ধরেছে আর সেগুলোকেই আবার করেছে – আরও ভাল করে। সে পাঁচশো বছর আগে পোর্তুগিজ় বন্দুকই হোক বা পঞ্চাশ বছর আগে মার্কিন গাড়িই হোক। কিন্তু ওরা খ্রিস্টধর্মকে মেনে নেয়নি। একদমই নয়, খ্রিস্টধর্মকে ওরা নিজেদের মধ্যে একেবারেই ঢুকতে দেয়নি।” আর তারপর পাদ্রী হেসে ফেলেছিলেন: “জানি না আমরা এখানে ঠিক কি করছি।”

– ওঁর কথাগুলো আপনার পুরো মুখস্থ আছে?

– কি আর বলি বলুন? আমার একটা চমৎকার স্মৃতিশক্তি আছে।

– “আমরা”?

– আমরা বলতে পাদ্রী চার্চকেই বুঝিয়েছিলেন। রোমান ক্যাথলিক চার্চ।

– অবশ্যই। আমার মাথাটা, সত্যি!

– দেখলেন তো, তানো? আপনি চাইলেই ব্যঙ্গ করতে পারেন।

– ধন্যবাদ। মনে হয়।

– আমাকে ধন্যবাদ দিতে পারেন। এটা একটা প্রশংসা।   

– তাহলে ধন্যবাদ।

তিরিয়েজ়া সুশি-ওস্তাদের কাছে বিলটা চাইল। তানো নিজের ভাগের টাকাটা দেওয়ার জন্যে কোনোরকম উচ্চবাচ্য করার চেষ্টাও করল না, এটা জেনেই যে সেটা সম্পূর্ণ অর্থহীন হবে। অপদস্থ করার খেলাটা একেবারে শেষ অবধি টানার জন্যেই।   

তিরিয়েজ়া হাসল:  

– তাহলে ওর পেশাটা কি বলে আপনার মনে হয়?

– সেপূলভেদা?

– হ্যাঁ।

– ডিপ্লোম্যাট?

– কোল্ড।

– ব্যবসাদার নয়?

– ওয়ার্ম।  

– তাহলে ব্যবসাদারই।  

– আমি হলে বলতাম একজন মধ্যস্থতাকারী। একজন দালাল।

– বা তা-ই।  

– কিন্তু লোকেদের বেলায় তাদের পেশাটাই কেবল গুরুত্বপূর্ণ নয়।  

– মানে?  

– যে পেশাটা ওরা নিজের বলে মনে করে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।  

– ওঃ। হ্যাঁ। হয়ত তাই।

– যেমন তানো মনে করেন যে তিনি কারাতের গুরু…

তানো কাঁধ দুটো ঝাঁকাল:  

– ওটাই আমার রুজিরুটি।

– না। আমি বলছি আপনি বিশ্বাস করেন যে আপনি এক ধরণের “আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক”।   

– বুঝতে পারছি না।

– অবশ্যই বুঝতে পারছেন।

তানো যতটা পারল, তানো আক্রমণটা এড়ানোর চেষ্টা করল:  

– আমরা কি ওই ভদ্রলোককে নিয়ে কথা বলছিলাম না? সেপূলভেদা?

– হ্যাঁ। ওর কি পেশা সেটা কি তানো আন্দাজ করার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছেন? নিজের যেটা পেশা বলে ও মনে করে?  

– হ্যাঁ। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি।

– একজন গুরুর তুলনায় আপনি বড্ড সহজে হাল ছেড়ে দেন, তানো।

– খেলা আমার বড় একটা আসে না।

– সাধারণত যারা বলে যে তাদের খেলা খুব একটা আসে না তারাই কিন্তু শেষমেশ আশ্চর্যজনক ভাবে খেলায় খুব ভাল হয় বলে দেখা যায়।    

– তাহলে, তানো, ও নিজেকে কি মনে করে বলে আপনার মনে হয়?  

– জানি না।

– চেষ্টা করবেন না?

– না, করব না।

– একজন লেখক।  

– ও।  

– সেই। ও।

– লেখক বলে তো খুব একটা মনে হচ্ছিল না।

– লেখকদের কিরকম দেখতে হয় বলে আপনি মনে করেন?

– ঠিক বলেছেন। জানি না।

– কিন্তু ধরেছেন ঠিকই। সেপূলভেদা লেখক নয়। শুধুই একজন ছিঁচকে চোর। আর সেটা ও বিলক্ষণ জানে। কেবল, এটা খুব জরুরি, আর সেটা মজারও বটে, ও কিছুটা হলেও নিজেকে লেখক বলে মনে করাটা ছাড়তে পারে না।     

– ও তাহলে কি?  

– একজন ধাপ্পাবাজ।  

তানো জানে যে সে তোলপাড় হওয়া জলে নামতে চলেছে। সমস্যা হল লঞ্চটাকে পিছিয়ে নেওয়ার পক্ষে বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে।

– তাহলে ওকে ধাপ্পাবাজ বলে ধরিয়ে দেননি কেন?

তিরিয়েজ়া মুখে একটা ক্ষমাসুন্দর ভাব আনল। উদ্দেশ্যমূলক ভাবে ক্ষমাসুন্দর:

– কারণ, কখন কখন, এমনকি ধাপ্পাবাজেরাও কাজে আসে।

আপনার মত, তানো। আমি সেটা বলব না কিন্তু আপনি জানেন যে আমি সেটা বলতেই পারতাম।

আমি জানি।  

আর আপনি জানেন যে আমি সেটা বলতে পারতাম কারণ, পাকেচক্রে, আমি ঠিক এটাই মনে করি।    

আচমকা তানোর খুব অস্বস্তি লাগতে শুরু করল।

– ও। আর এখানে ও কিভাবে এসে পড়ল?

– এই পোস্টিংটা পেতে আমি ওকে সাহায্য করেছি।

– তাহলে… তাহলে তো ওর আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

– হতে পারে না। এটা মানুষের স্বভাব। ও যে একটা ধাপ্পাবাজ সেটা ও জানে যে আমি জানি। আর এটা কেউই ক্ষমা করতে পারে না। কেউ আমাদের অপমান করলে আমরা সেটাকে ক্ষমা করে দিতে পারি, কিন্তু আমরা ভেতরে ভেতরে কি দিয়ে তৈরি সেটা কেউ জেনে গেলে আমরা তাকে ক্ষমা করতে পারি না।     

তানো অবাক হল:

– কিন্তু ও কি করে জানল যে আপনি ওকে পছন্দ করেন না?

তিরিয়েজ়া হাসল।  

– ও নিজে আমাকে সেটা বলতে শুনেছে। আমার নিজের কথাগুলো আমার এখনও মনে আছে। শুনতে চান?  

– ভাল স্মৃতিশক্তি।  

– আপনাকে তো বলেইছি। অর্ধেকটা জীবন ভাষণ মুখস্থ করে কাটিয়ে দিলে এইটাই হয়।

– বলুন তাহলে দেখি।

খেলাচ্ছলে কিনা জানা নেই, তিরিয়েজ়া সিজ়ারের মত ভাবভঙ্গী করে বলতে লাগল:

– “এইসব ষাঁড়ের গোবর শিল্পীদের দাম কানাকড়িও নয়। তর্জনগর্জন করে। বিদ্রোহ করার ভান করে। ভীষণ রকম ক্ষমতা-বিরোধী, ভীষন ভাবে মুক্তচিন্তার পক্ষে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ওদের দিকে একটা হাড় ছুঁড়ে দিলেই হল। একটা হাড়ই যথেষ্ট, খুব একটা বড় না হলেও চলবে, অমনি ছুটে ছুটে চলে এসে লাফিয়ে আমাদের কোলে উঠে পড়বে, জিভটা বার করে, লেজ নাড়তে নাড়তে, খুশিতে পাগল হয়ে।”  

– ও। আচ্ছা। এটা বেশ অস্বস্তিকর। কিন্তু ও এটা শুনতে পেল কি করে?

– কি বলি বলুন তো? আমি জানতাম না যে ইন্টারকমটা চালু আছে।

– সত্যিই জানতেন না?

তিরিয়েজ়া সাকের গেলাসটা তুলে ধরল, যেন চিয়ার্স বলবে:

– আপনার কি মত, তানো?

– জানি না কেন, আমার মনে হয় না যে আপনি খুব বেশি ভুল করেন।   

– রাজনৈতিক ভুল করি না, এটা সত্যি। কিন্তু, জানেন, একটা ভুলই যথেষ্ট সারা জীবন ধরে সেটাকে নিয়ে আফসোস করার জন্যে।

– “আমি কেবল আমার সেই ভুলগুলোর জন্যে অনুতপ্ত যেগুলো করার দুঃসাহস আমার কখন হয়নি” – তার কি হল?

– যে লোকটা এই কথা বলেছিল তাকে এর জন্যে প্রচুর দাম দিতে হয়েছিল। আর সেইজন্যে সে অনুতাপও করেছিল।   

এগারো মাস আগে

 …………………………………………………………………………………………………… …………………………………………………………………………………………………… …………………………………………………………………………………………………… …………………………………………………………………………………………………… …………………………………………………………………………………………………… …………………………………………………………………………………………………… …………………………………………………………………………………………………… …………………………………………. _______ _____ _____ ___ _____ _____ ___ ___ ___ ____ __ __ _______ _________ __________ ______________________________ _______ _________________________________________________________ _________________________________________________________ ______________ 00000000000000000000000000000000000000000000100000 000000011000000000000000000000000000000000000000000 00000000000000000000000000000000000000000000000000 00000000000000000000000000000000000000000000000000 000000000000000000111111111111111111111111111111111111111110000 000000000000000000000000000000001010101010101010101010 101010101010101101010101010101010101010101010101111010101001 010101010000000010101010101010000000000000000000000000100 00000000000000000101101010101101010110101010101010101000 000111110101010101010101010101010101010101010101010101010101 0101010100000000001101010101010110101

“সুপ্রভাত। বেরানুদু? সুপ্রভাত। স্বাগতম। ভাল ভাবে ফিরে আসার জন্যে শুভেচ্ছা।”

10101010101010101010101010101010101010101010000000000111111110101001010101010101010101010101010101010101010101010101010 10101010101

“কোহারু, একটু ভাল হও তো। এখানে এসে একটু সাহায্য কর, বুঝেছ?”

6

একটা চৌমাথার ধারে  

ওরা নিজেদের এমন একটা চৌমাথায় দেখতে পেল যেটা একই সঙ্গে মাটিতে আর আকাশে; উড়ালপুলের পরের পর ধাপগুলো গামলায় জ্যান্ত ঈলমাছের মত জড়ামড়ি করছে, আবার পাক খুলছে। শহরের একেবারে কেন্দ্রে হাইওয়েটাকে প্রলম্বিত করতে থাকা সিমেন্টের নিরেট ব্যবহারিক টুকরো বই তারা আর কিছু নয়। তাসত্ত্বেও, বক্র রেখাগুলো বিস্ময়কর ভাবে সমন্বয়পূর্ণ, যেন এই পরিপূর্ণ কদর্যতার মধ্যেও তাদের পক্ষে খানিকটা সৌন্দর্য খোঁজাটা খুবই স্বাভাবিক। তিরিয়েজ়ার কাছে ফর্মের ওই নিরবিচ্ছিন্ন সন্ধানটা সর্বদাই খুব অদ্ভুত বলে মনে হয় আর সর্বদাই তাকে বিস্মিত করে। তানোর অবশ্য সেরকম কিছু মনে হয় না:

– আর তিরিয়েজ়া-সান এখন কোথায় যেতে চান?

তানো যতদূর দেখতে পেল, তিরিয়েজ়ার ওপর অ্যালকোহল কোনরকম প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয় না। কিন্তু, বলাই বাহুল্য, যা হয় আর যেটা মনে হয় দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিশ।   

– আমরা সময়টার সদ্ব্যবহার করি চলুন, তানো। আমরা আর কি করতে পারি?

– এইভাবে?

– এইভাবে, মানে?

– এইভাবে, যেন এতে কোন কিছুই জড়িত নেই?

– তানো, অনেক কিছু এতে জড়িত বলেই কিন্তু আমাদের শান্ত থাকতে হবে, বুঝেছেন? আমরা হোটেলে গিয়ে দাঁত দিয়ে নখ কাটলে কি কোন সুরাহা হবে? নাকি আপনি একটা হাসপাতালে গিয়ে ওয়েটিং রুমের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পায়চারি করাটা পছন্দ করবেন?

– মানে…  

– আপনি যদি চান তো আমরা ওই গানটায় যেমন বলে সেটাও করতে পারি। কি যেন বলে? হয়ত প্রার্থনা করা।[8] হ্যাঁ, ঠিক তাই। হয়ত প্রার্থনা করা।   

ভাল করে ভেবে দেখলে মনে হবে যে অ্যালকোহলটা সত্যিই মহিলার কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলেছে বোধহয়।   

– ঠিক আছে। তিরিয়েজ়া-সান তাহলে ঠিক করবেন।

– শুদ্ধু তিরিয়েজ়া। আমার এই উপকারটা করুন “গুরু” তানো।   

তানো গুরুর দুপাশে উদ্ধৃতি চিহ্নগুলোকে যেন দেখতে পাচ্ছিল।  

– মানে?

– আমাদের বিকেলটা ফাঁকা আছে। আপনি আমার গাইডের কাজটা করুন।

– আমি? তিরিয়েজ়া-সান, বহু বছর হল…

– আরে, তানো। শহরটা নিশ্চয়ই এতটাও বদলে যায়নি, তাই না?

তানো বুঝতে পারল না তিরিয়েজ়া তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে কি করছে না। তার তো জানা উচিত, জানা দরকার, যে এমন কোন শহর যদি থেকে থাকে যেটা প্রতি ঋতুতে নিজেকে নতুন করে তৈরি করে তোলে তো সেই শহরটা হল তোওকিও।    

– হ্যাঁ, কিন্তু জায়গাগুলোর নাম নিশ্চয়ই আপনার এখনও মনে আছে, তাই না?  

নামগুলো?  

– আমি আপনাকে একটা সাহায্য করছি, তানো। একটা ছোট্ট ধাক্কা। গিনজ়া[9], আকিহাবারা[10], ওমোতেসানদোও[11]

œ

হ্যাঁ। যে শহরের নাম আগে এদো[12] ছিল সেখানকার নামগুলো সব বস্তুত, বাস্তবিকই, আসলে, সত্যিসত্যিই, বলতে গেলে একই আছে। মহল্লার নামগুলো: আসাকুসাউ, শিনজুকু, শিবুইয়া, গিনজ়া, ইকেবুকুরো, উয়েনো, আকাসাকা, রোপ্পনগি… তোওকিও অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের ফিল্মগুলোর প্রধান মহাকাশযানগুলোর মত: আসটেরিক্সের মত একটা কাঠামো যার ডগাগুলো হল কাঁচ আর ধাতুর বল, যেগুলোর ভেতরে শহরের আসল জীবনটা আছে। কোন কেন্দ্র নেই, কেবল বিকেন্দ্রিত সব কেন্দ্রীয় অংশ আছে। কিংবা বলা যেতে পারে যে কেন্দ্র আছে বটে, তবে সে জায়গাটা নিষিদ্ধ: সম্রাটের প্রাসাদের বাগানগুলো। বাকিটা? প্রধান যে রাজপথগুলো ওখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে। কোথায় ছড়িয়ে পড়ে? ঠিক তাই। অ্যাসটেরিক্সের চৌহদ্দিতে।    

অর্থাৎ, কেন্দ্রগুলোতে।  

œ

তানো মহিলার অবিচল ভাব দেখে অবাক হয়ে গেছে। ছেলেটা, কে জানে কোথায়, একটা চেম্বারে পড়ে রয়েছে, তাকে ইলেক্ট্রোড দিয়ে স্টিম্যিউলেট করা হচ্ছে, সে বলতে গেলে সাড়াই দিচ্ছে না, সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনা হল সে মরে গেছে; সবচেয়ে ভাল সম্ভাবনা হল সে ইনডিউসড কোমাতে পড়ে রয়েছে। আর এই মহিলা – কিনা – ট্যুরিস্টের মত বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে?    

কিন্তু প্যানকেকের সবসময়ে দুটো দিক থাকে। মহিলার নিজস্ব একটা কারণ আছে। কিন্তু ছিঁচকাঁদুনের মত একটা ওয়েটিং রুমে হাঁটু গেড়ে বসেই বা কি লাভ, বুক ধুকপুক করতে করতে, ফাঁসির দড়িটাকে গিলে যেন সেটা গলায় আটকে গেছে, নার্ভাস হয়ে হাতদুটো ঘষতে ঘষতে, চোখদুটোকে রক্ত-রাঙা করে, জান্তব যন্ত্রণায় শূন্য চোখে তাকিয়ে? তাতে তফাতটা কি হবে? বসে প্রার্থনা করাটা ভাল, যদি আমাদের এসবে বিশ্বাস থাকে। যদি কেউ সেটা না করে তাহলে তাকে প্রার্থনা করার অন্য কোন উপায় বার করতে হবে। হাঁটা, ঘুরে বেড়ানো, উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে এদিক সেদিক যাওয়া একটা সম্ভাব্য বিকল্প। এমনকি জুয়া খেলাও। অর্থহীন ভাবে হেঁটে বেড়ানো, অর্থের সন্ধানে। শুনে মনে হতে পারে বোকাবোকা (আর, হয়তবা, সত্যিই বোকাবোকা) কিন্তু তারও একটা মানে আছে।     

আরও আছে। মহিলা তো ট্যুরিস্টদের মত ঘুরতে চায় না – সে চায় উদ্ভট প্রাণীটাকে তার প্রাকৃতিক বাসস্থানে দেখতে। তানো জানে যে মহিলা, অন্তত কিছুটা হলেও, ওকে শত্রু হিসেবে দেখে। সুতরাং ওকে ওর নিজের এলাকায় নিরীক্ষণ করাটা একটা ভাল কৌশল। লিশবোয়ায় ওর বিদেশী হবার সুবিধেটা আছে। সেখানে ও এমনকি রহস্যময় প্রাচ্যদেশীয়র অভিনয়টাও করতে পারে। এখানে ওর কোনরকম ধাপ্পাবাজি চলবে না। আর কে একটা (মুসাশি[13]? ক্লজ়ভিটস[14]?) বলেছিল না যে “ট্যুরিজ়ম হল অন্য উপায়ে যুদ্ধটাকে চালিয়ে যাওয়া”?     

বহুদিন ধরে তানো ভাবত যে তিরিশ বছর ধরে এমন একটা অন্য দেশে থাকা, যেটা ঠিক এগারো হাজার দুশো কিলোমিটার দূরে (পৃথিবীটাকে অর্ধেক পাক দিয়ে দেওয়া যায়), পরিবর্তনাতীত একটা বিষয় বদলাতে পারে না: সে জাপানী, জাপানী হয়ে জন্মেছে, জাপানী হয়েই মরবে।

এখন বুঝেছে যে উল্টোটাও ঘটতে পারে: এতদিন ধরে এমন একটা দেশে থাকার ফলে, যেখানে কষ্টভোগ একটা কাবুকি নাটকের চেয়েও বেশি নাটকীয়তা দাবী করে, সে নাটুকেপনায় অভ্যস্থ হয়ে গেছে। সেইজন্যে ওকে এখন ওর মনটাকে ঝাঁকিয়ে সেটার থেকে ধুলোবালি পরিষ্কার করতে হচ্ছে, বিষয়গুলোকে গোছাতে হচ্ছে। বিষয়গুলো হল: মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধরণের যন্ত্রণা, শোক, আসন্ন ক্ষতির আতঙ্ক, কোন অলৌকিক ঘটনা ঘটার নির্মম আশা নিয়ে বাঁচতে শিখে যায়।   

আর, এটা না বললে অন্যায় হবে, তানো হাস্যকর অসঙ্গতিটার প্রতি অন্ধ হবার মত অন্ধ নয়: যে ও ওই মহিলার আচরণে অবাক হচ্ছে কেবল… সে জাপানী নয় বলে।

তানো কখন বাবা হয়নি। বাবা হওয়া কি সেটা ও কল্পনা করার চেষ্টা করতে পারে – আমাদের মাথার ওপরে ঝুলতে থাকা চিরকালীন ডামোক্লিসের তরোয়াল, রাতের পর রাত জাগা, প্রথমবার একা বেরলে দুশ্চিন্তা, কৈশোরে ফোন করার কথা থাকলেও ফোন না করা, প্রথম গুরুতর বিপর্যয়ের পরে হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করা। ও চেষ্টা করে দেখতে পারে – কিন্তু কোন লাভ হবে না। কিংবা, কল্পনা করতে যদি সক্ষমও হয়, অনুভব করতে সক্ষম হবে না।

যতটা ওকে জানতে দেওয়া হয়েছে, ওই মহিলা সত্যিসত্যিই নিজের ছেলের ভাগ্য নিয়ে চিন্তিত। কতটা? সেটা আবার একটা অন্য বিষয়।     

সব মহিলাদেরই যে সেই বিখ্যাত “মাতৃসুলভ সহজাত প্রবৃত্তি” থাকে এটা বিশ্বাস করার মত অত সাদাসিধেও ও নয়। থাকে না। এর কি আছে? মুখ দেখে তো অবশ্যই বোঝার কোন উপায় নেই। এটা তো মানতেই হবে যে মহিলা মুখোশ ব্যবহার করার ব্যাপারে তুখোড়, দুটো জগতেরই সবচেয়ে ভালটাকে (বা খারাপটাকে) মিলিয়ে মিশিয়ে: ভান করার পুরুষালী কলার সঙ্গে নারীসুলভ লুকনোর বিজ্ঞানটাকে যোগ করে। তার আচারব্যবহার দেখে কি কিছু বোঝা যায়? হ্যাঁ, হয়ত – তারই মত একজন উচ্চস্তরের খেলোয়াড়ের পক্ষে… যে কথাটা অবশ্য তানোর ক্ষেত্রে একেবারেই খাটে না। ও-ই সবচেয়ে আগে এই কথাটা মানবে: এই মহিলার সঙ্গে থাকার চেষ্টা করাটা হল এমন কারুর সঙ্গে পোকার খেলার মত যে তাসের চারটে প্যাকের রঙই মনে রাখতে পারে।

– যদি আমার কথা শোনেন – তানো বলল – তো আমরা শিনজুকু[15] যেতে পারি। গাড়ি করে যেতে চান না মেট্রোতে?     

– আপনার যেমন ইচ্ছে, তানো। আজ আমি আপনার শুনে চলব।  

ওরা ট্যাক্সি করে গেল। পরিতাপের বিষয়, কারণ তোওকিওর মেট্রোটা এই গ্রহের সবচেয়ে অতি-অত্যাশ্চর্য আল্ট্রাসোনিক মেট্রো। আর, শহুরে উপকথাকে মিথ্যে প্রমাণ করে, তানো যদি জাপানী না-ও জানত (বা পড়তে ভুলে গিয়ে থাকত), স্টেশানগুলোর নাম ইংরেজিতেও লেখা আছে। অনেক ট্যুরিস্টের জন্যে এটা বেশ সুবিধাজনক। অন্যদের কাছে এটা আবার এক্সোটিক ভাবের পক্ষে কিছুটা হানিকর, যে কারণে তোওকিওতে পাশ্চাত্যবাসীরা – এই বিষয় নিয়ে এতগুলো পশ্চিমী সিনেমা এই কথাটা বেমালুম “ভুলে” যায়।           

ওই সমষ্টিবাচক জায়গাটাতে প্রতিটা ব্যক্তি যে মানসিক একান্ততা তৈরি করে নেয় সেটাকে প্রশংসা করার সুযোগটাও ওরা হারাল। কেউ ঘুমোয়, বা ঘুমনোর ভান করে, কিন্তু কখনই (পরমাশ্চর্য!) ঠিক স্টেশানে নামতে ভোলে না, অন্যরা মাঙ্গা পড়ে, মোবাইলে গেম খেলে, ব্রিফকেস আঁকড়ে ধরে পত্রিকার পাতা ওল্টায়। আর তিরিয়েজ়াকে এই ভয়টা পেতে হত না (যদি ও ভয়টা পেত) যে মানুষের একটা বিশাল সমুদ্র ওকে গিলে ফেলবে। হ্যাঁ, এটা ঘটতে পারে – কিন্তু কেবল অফিসের সময়তেই। শুক্রবারে, শিনজুকুর ইন্টারফেসটা পরিণত হয় এমন একটা আনন্দোচ্ছল মানব তাল যেটা নিয়ন আলোগুলোর মধ্যে মজা খুঁজে ফেরে বা, ঝাঁক বেঁধে কাজ থেকে বেরনোর সময়ে, কম আনন্দোচ্ছল ভাবে বৃত্তের পরিধির পথ ধরে। এছাড়া, মেট্রো হল মেলার মের-গো-রাউন্ডে বুড়ির মাথার পাকা চুলের মতই মনোরম। কিন্তু, বলাই বাহুল্য, তিরিয়েজ়া-সানও মেরি পপিন্স নয় আর তানোও ঝুলকালি মাখা চালে নাচতে থাকা চিমনি-সাফাইকারী নয়।           

œ

শাদা, ড্রাইভারের গ্লাভগুলো। সিটে মাথা রাখার জায়গাগুলো এম্ব্রয়ডারি করা একটা কাপড় দিয়ে ঢাকা। পুরো ট্যাক্সিটাই মনে হয় যেন শাদা গ্লাভস পরে আছে, যেগুলো ধপধপে শাদা এম্ব্রয়ডারির ওপরে ধপধপে শাদা এম্ব্রয়ডারি করা।    

কিন্তু তিরিয়েজ়ার চশমাটা – কালো। চোখ যদি “মনের জানলা” হয়, তাহলে কালো চশমা হল, উম, পর্দা।

তানো গলাটা ঝাড়ল।  

– আমি কি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি, তিরিয়েজ়া-সান?

– যা যা প্রশ্ন করতে চান করতে পারেন, তানো। যা যা প্রশ্ন করতে চান।

– আপনার ছেলে বেঁচে আছে কিনা সেটা অন্তত জানেন কি?

মাম্মা, মাম্মা, আমি আদ দে থবিতা এতেথি দেথবে দেথবে?  

এখন নয়, বির্নার্দু, মাকে একটা জরুরি কাগজ পড়ে শেষ করতে হবে।

– মাপ করবেন, তানো। প্রশ্নটা যেন কি ছিল?

তানো রাস্তার দিকে তাকানোর ইচ্ছেটা জোর করে চাপল:

– হয়ত প্রশ্নটা করা আমার উচিত হয়নি।

তিরিয়েজ়া চশমাটাকে নাকের ওপর নামিয়ে নিয়ে তানোকে তার চোখগুলোকে দেখতে দিল:

– কিন্তু করেছেন তো, তানো। আর, যদি করেই থাকেন তো আরও একবার সেটাকে করতে পারেন।

তানোর অস্বস্তি লাগল। কিন্তু যেহেতু সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, অস্বস্তি হওয়াটা আর ততটাও অস্বস্তিকর নয়।

– চলুন, তানো, একটু সাহস দেখান। এত পুরুষালী হতে হবে না।

তানো আঘাতটাকে স্বীকার করল না। কিন্তু প্রশ্নটা আরেকবার করল:

– আপনার ছেলে এখনও বেঁচে আছে কিনা সে বিষয়ে আপনার কোন ধারণা আছে?

না, মা, আমি বেঁচে নেই। তুমি খুব ভাল করে জানো যে আমি বেঁচে নেই। আপনি মাকে এমন একটা প্রশ্ন কেন করছেন, সেনসেই? এটা বলবেন না যেন কি ঘটেছে আপনি সেটা জানেন না।   

তিরিয়েজ়া তানোর দিকে এমন করে তাকাল যেন সে একটা হেরিং মাছ, তা-ও আবার খুব একটা তাজা নয়:

– উল্টোটা ভেবে কোন লাভ আছে কি?

কি বলবে সেটা ভাবার আগেই তানো বলে ফেলল:

– আপনি খুব কঠিন, তিরিয়েজ়া-সান।   

– আমার পেশায় ওটা একটা গুণ। আপনারটায় নয়, তানো?

– না। আবশ্যক ভাবে নয়।

– নয়?

– আবশ্যক ভাবে নয়।

তিরিয়েজ়া হাসল, কোনোরকম দয়ামায়া ছাড়াই।

– ও। বুঝে গেছি। প্রাচ্যের বিজ্ঞতা।

তানো কিছু বলল না।

– লড়াই না করে লড়া আর ওইসব যত ফালতু ব্যাপারস্যাপার।   

তানো কিছু বলল না। তিরিয়েজ়া ধমক দিল:

– আপনাকে তো আমার বেশ ধূর্ত মনে হচ্ছে, তানো।  

তানো কোমা থেকে জেগে উঠে লড়াইয়ে নামল। বেশ সাহসী পুরুষ এই তানো:

– কিন্তু আপনার পেশায়, আপনার কথা মত, তিরিয়েজ়া-সান, নিষ্ঠুর হওয়াটা প্রয়োজন। ঠিক কিনা?  

তিরিয়েজ়া মেনে নিল:

– একদম ঠিক, তানো। আর একটা কথা জানেন কি?

তানো বুক পেতে দিল:

– কি বলুন?  

তিরিয়েজ়ার তরোয়ালটা আঘাত হেনে চিরে দিল, ঠিক পাঁজরগুলোর মাঝখানে:  

– আপনার চেষ্টা করে দেখা উচিত। এর মধ্যেই কোন এক দিন। হয়ত আপনার ভাল লেগে যাবে?

তানো উত্তর দিল না। তারপর ভাবল, নিজেরই মনে: সুযোগ পেলে নয় কেন? যদি সুযোগ হয় আর আমি যদি পারি।  

তানো পুরোপুরি সহজসরল নয়: নিষ্ঠুর হওয়ার জন্যে কয়েকটা গুণের প্রয়োজন। সেটা যে কেউ পারে না। প্রতিভা, দক্ষতা, উৎসাহ, ঝোঁক থাকা দরকার।   

সুতরাং নির্মম হতে গেলে…  


[1]জাপানের সবচেয়ে পুরনো ব্র্যান্ডের বিয়ার হল সাপ্পোরো। এটা প্রথম তৈরি হয় ১৮৭৬ সালে, তোকিও উত্তরে সাপ্পোরোতে।

[2]মেরুভল্লুকের প্রেম, চতুর্থ পর্ব, টীকা ১০ দ্রঃ।  

[3]ব্লুফিন টুনা মাছের পেটের সবচেয়ে মোটা ও চর্বিযুক্ত অংশ।   

[4]পরিযায়ী। ব্রেজ়িলে এই শব্দটা ব্যবহার করা হয় সেইসব জাপানী বংশোদ্ভূত ব্রেজ়িলীয়দের বোঝাতে যারা জাপানী নাগরিকত্বের সুবিধা নিয়ে পরিযায়ী হয়ে জাপানে চলে যায় স্বল্প মেয়াদের কাজ করতে।  

[5]ওদোরি এবি বা নাচতে থাকা কুচো চিংড়ি এক ধরণের সাশিমি। এই পদ জ্যান্ত কুচো চিংড়ি দিয়ে তৈরি হয় এবং খাওরার সময়েও তারা তাদের পা আর শুঁড়গুলো নাড়তে পারে। 

[6]ঈল মাছ।

[7]জাপানী সী বেস, এক ধরণের সামুদ্রিক মাছ।  

[8]পোর্তুগিজ় গায়ক, গীতিকার ও সুরকার পেদ্রু আব্রুন্যিয়োজ়ার (১৯৬০) গানের কথা –

Há bombas em Belfast e em Beirute                      বেলফাস্ট আর বেইরুটে বোমা
É preciso afinar o azimute                                                দিকটা ঠিক করে ধরতে হবে

E eu e tu o que é que temos que fazer                  আর তোমার আমার কি করা উচিৎ

(Talvez foder)                                                    (হয়ত চোদা)
(Talvez foder)                                                    (হয়ত চোদা)

[9]গিনজ়া হল তোওকিওর কেন্দ্রে চু-ও ওয়ার্ডের একটা ডিসট্রিক্ট, যেখানে নামীদামী ব্র্যান্ডের দোকান ও বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফে আছে।     

[10]মেরুভল্লুক চতুর্থ পর্ব, টীকা ২৯ দ্রঃ।    

[11]তোওকিওর শিবুইয়াতে ওমোতেসানদোও মেইজি মন্দিরে ঢোকার মুখ থেকে আরম্ভ করে আওয়ামা-দোওরি অবধি চলে যাওয়া জাপানী এলম গাছের সারি দেওয়া একটা অ্যাভেন্যিউ যেটাতে সারিসারি বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের বড় বড় চেন আছে।

[12]তোকিওর পুরনো নাম। ১৮৬৮ সালে এদোর নাম হয়ে যায় তোওকিও যার অর্থ “পুবের রাজধানী”।  

[13]মিয়ামোতো মুসাশি (১৫৮৪-১৬৪৫) – তরোয়াল চালানোয় পটু এক জাপানী দার্শনিক ও রোওনিন, অর্থাৎ প্রভুহীন একজন সামুরাই। জাপানে তাঁকে কেন্-সেই বা অত্যন্ত দক্ষ তরোয়ালচালক বলে মনে করা হয়। তরোয়ালচালনার শিল্প সম্পর্কে তাঁর ধ্যানধারণা ও তাঁর জীবনদর্শন নিয়ে তিনি গোরিন্-নো-শোদোক্কোওদো নামের দুটি বই লিখেছিলেন।  

[14]Carl von Clausewitz (১৭৮০–১৮৩১) ছিলেন প্রাশিয়ার একজন জেনারেল ও সামরিক তাত্ত্বিক যিনি যুদ্ধের “নৈতিক” (আধুনিক পরিভাষায় মন্সতাত্ত্বিক) ও রাজনৈতিক দিকগুলির ওপরে জোর দিয়েছিলেন।

[15]মেরুভল্লুক ষষ্ঠ পর্ব টীকা ১৮ দ্রঃ।  

Rita ray
  ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।     

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.