মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (ষষ্ঠ পর্ব)

বাংলা English
Rui Zink
  Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.   
Cover Picture of O amante e sempre o ultimo a saber

জ়়্যাপ রিমোট

প্রথাগত বাথটাব আসলে একটা ওয়াশিং মেশিনের চেয়েও ছোট একটা কুঠরি যার মধ্যে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে রাখতে হয়, হাঁটুগুলো মুড়ে বুকের ওপর ধরে। কিন্তু ওখানে, একটা আধুনিক পাঁচতারাতে, বাথটাবটা “পশ্চিমী” ধাঁচের, আরামের, বড়সড়, ইচ্ছে করলে শরীরটাকে টানটান করে শোওয়া যায়। ইউরোপীয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত তানো বাথটাবে লম্বা হল। এইভাবে সে গরম জলে ডুবে পড়ে রইল, চোখের ওপর তোয়ালে চাপা দিয়ে, জেগে জেগে এক ধরণের ঘুমের মধ্যে, এই আশায় যে জেটল্যাগের ফলে তার শরীরে যে বিভ্রান্তিটা দেখা দিয়েছে গরম সেটাকে কমিয়ে দিতে পারবে।            

তারপর, খানিকটা ধাতস্থ হয়ে, হোটেলের কিমোনো আর চটি গলিয়ে, বড়সড় খাটটার ধার ঘেঁষে বসল আর, রিমোটটা হাতে নিয়ে, চ্যানেল ঘোরাতে লাগল।   

মেয়ে আর ছেলে, হাসিহাসি মুখ করে একটা স্যুপ চেখে দেখছে যেটা, ওদের মুখে ফুটে ওঠা উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছে, সেটা ভিনিগার মেশানো ভাতের ওপরে ছড়ানো অমৃত আর মধুর চেয়েও উপাদেয়।   

জ়়্যাপ।

মেয়ে আর ছেলে, হাসিহাসি মুখ করে সুগির[1] সবুজ ডালপালার মধ্যে দিয়ে একটা ও্ন্ সেনের[2] বুদবুদ উঠতে থাকা জলে ঝাঁপ দিচ্ছে। তানো মাথা নাড়ল: ওর দেশের লোকেরা উষ্ণ প্রস্রবণে স্নান করতে বড্ড ভালবাসে।  

জ়়্যাপ।

মেয়ে আর ছেলে, হাসিহাসি মুখ করে, কিশোর প্রতিভাদের একটা প্রতিযোগিতার উপস্থাপনা করছে। চারটে মেয়ে দিয়ে তৈরি একটা মেয়েদের ব্যান্ড, তারপর চারটে ছেলে দিয়ে তৈরি একটা ছেলেদের ব্যান্ড। এইভাবে পরপর চলেছে। গ্রীনরুম ভর্তি অসংখ্য ছেলেদের/মেয়েদের ব্যান্ড খ্যাতির মেরি-গো-রাইন্ডে তাদের পালা আসার অপেক্ষায়।    

জ়়্যাপ।

মেয়ে আর ছেলে, হাসিহাসি মুখ করে, নুডল চাখতে গিয়ে চরম বিস্ময়ে আবিষ্কার করছে নুডলটা কতখানি মনোরম ও সুস্বাদু। ও ইচি!   

জ়়্যাপ।

মুখোশ পরা একটা লোক, গাঁট্টাগোঁট্টা, আরেকটা চড়া রঙের পোষাকের সঙ্গে তর্কাতর্কি করছে হাসি চাপতে না পারা একটা ছেলে আর মাইক্রোফোন হাতে একটা মেয়ের সামনে।

জ়়্যাপ।

রঙচঙে প্রতিযোগিতা। সুখী সব প্রতিযোগী, সুখী সঞ্চালক, সুখী দর্শক।  

জ়়্যাপ।

বেড়ালছানা আর ভালুকছানার সরলীকৃত মুখ দিয়ে ভরা একটা ছোট্ট গোলাপী ঘর, বিনুনি-বাঁধা একটা মেয়ে ললিপপ হাতে, বিপুল উৎসাহ নিয়ে, আর মাত্র দুদিন পরেই তকিওতে চেনা বিশ্বের সবচেয়ে অসাধারণ রক ব্যান্ডের আসার কথা বলছে।     

জ়়্যাপ।

এক পুরুষ আর এক মহিলা, খোশমেজাজে, আন্তর্জাতিক সঙ্কটের বিষয়ে আলোচনা করছে। 

জ়়্যাপ।  

সংবাদের উপস্থাপক, শান্ত স্বরে, পৃথিবী থেকে মাত্র দশ হাজার আলোক-বর্ষ দূরে একটা নতুন কৃষ্ণগহ্বরের আবির্ভাবের খবর শোনাচ্ছে।

জ়়্যাপ।

অসংযত প্রতিযোগিতা। বিশাল দুটো চপ্সটিক নিয়ে প্রতিযোগী বিশাল একটা টুনামাছ ধরার চেষ্টা করছে আর ক্রোনোমিটার সময় গুনছে। হাসির হররা।

জ়়্যাপ।

জ়়্যাপ জ়়্যাপ জ়়্যাপ।

তানো প্রোগ্রামগুলোকে চেনে আবার চেনেও না। দেশটা ওর, লোকগুলো ওর স্বজাতি। দেশটা ওর নয়, লোকগুলোও ওর স্বজাতি নয়।

জ়়্যাপ।  

একটা বেসবল খেলা। বলের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে ব্যাটার ব্যাটটাকে দোলাচ্ছে।   

জ়়্যাপ।

আরও গান। ছেলেদের ব্যান্ড, মেয়েদের ব্যান্ড, ছেলেদের ব্যান্ড। মিক্সড ব্যান্ড। ছেলেদের ব্যান্ড, মেয়েদের ব্যান্ড…

জ়়্যাপ।

সামুরাইদের হারিয়ে যাওয়া আশ্চর্য জগৎ। পরচুলা পরা, নকল টাক লাগানো, গম্ভীর হাবভাবের লোকেরা। চোখ নীচে নামিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে থাকা ভীরু লাজুক মহিলারা। কয়েক মুহূর্তের জন্যে মনে হতে পারে এবারে বুঝি তরোয়ালের দ্বন্দ্বযুদ্ধ আর সারে সারে কাটা মুণ্ডু দেখাবে কিন্তু না, আবহসঙ্গীতটা রোম্যান্টিক, মিষ্টি আর রোম্যান্টিক, তানো বোঝে যে এটা একটা টিভি ধারাবাহিক মাত্র।      

জ়়্যাপ।

আন্তর্জাতিক চ্যানেল: সীতিউ দু পিকাপাউ আমারেলু[3], সিএনএনে মিসিসিপি সর্বদা যা করে তা-ই করছে। বিবিসিতে কিছুই হচ্ছে না।

জ়়্যাপ। জ়়্যাপ জ়়্যাপ জ়়্যাপ।

তানো এবারে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনে পৌঁছে যায়, যেটা কিনা পৃথিবীর যে কোন অংশে যে কোন উচ্চ শ্রেণীর হোটেলের একটা বাধ্যতামূলক অলঙ্কার। সেটার সুবিধাভোগ করার জন্যে একটা ক্লিকই যথেষ্ট আর, তারপর, ক্রেডিট কার্ডে কেবল “ঘরে ব্যবহৃত” বলে একটা সুবিবেচক রেকর্ড দেখাবে। এইভাবে, তানো যদি কোন কোম্পানির কাজে আসত তো এটাকে মিনিবারের খরচ হিসেবে যুক্তি দেখাতেই পারত, নিঃসঙ্গ কামুকতার খরচ বলে নয়, যেটা আসলে অচেনা শহরে একা কোন বিজ়নিসম্যানের শিশুসুলভ রোগ।      

ব্যক্তিগত অভ্যেসের ব্যাপারে তানো মোটেই নীতিবাগীশ নয়, জীবনটা তার পক্ষে বড়ই ছোট। বা, অন্তত, এই মুহূর্তে সে নীতিবাগীশ হবার পক্ষে বড় বেশি ক্লান্ত। আর, কি মুশকিল, তার তো দেশের জন্যে মনকেমন করাটা দূর করার পুরো অধিকার আছে।

তানো অন্তরঙ্গ চ্যানেলগুলোতে ঢোকার জন্যে বোতাম টিপে জাপানী বিশেষত্বতে গিয়ে পৌঁছল: মোজ়েইকের মত পর্নোগ্রাফি। সাব-টাইটেল বলছে এশিয়ান এক্সট্রিম। তা বলে অত কিছু “এশিয়ান এক্সট্রিম”-ও নয়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, প্রচুর চিৎকার, প্রচুর শীৎকার, কামনাতৃপ্তির প্রচুর মুখবিকৃতি, বিশেষ করে যে মেয়েটা পুলি-দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, হাতপা, কোমর, তলপেট, পাছা হয়ে গলা থেকে গোড়ালি অবধি। চিৎকার আর শীৎকারের মধ্যে দিয়ে এটা বোঝা যাচ্ছে না যে মেয়েটাকে আদর করা হচ্ছে না তার ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে, সে একটা প্রলম্বিত চরম যৌনসুখ করছে না স্নায়বিক বিন্দুগুলোতে আলপিনের খোঁচা খাচ্ছে। কিন্তু এর বেশি খুব একটা কিছু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না, বৈদ্যুতিন বিকৃতিগুলোর কারণে, যেগুলো, আইনানুসারে, শরীরের লজ্জাকর অংশগুলোকে ইঙ্গিতপূর্ণ কিউবিস্ট ছবিতে বদলে দিচ্ছে।         

তানো প্রায় হেসেই ফেলল। এইটা অবশ্যই তার মনকেমন দূর করে দিচ্ছে। মোজ়েইকগুলো। বেশ মজার, মোজ়েইক করা পর্নোগ্রাফি। সবই দেখায়, আবার কিছুই দেখায় না। সবই দেখতে পাওয়া যায়। শরীরগুলো সব আছে, নগ্ন, সত্যিকারের সময়ে সত্যিকারের সঙ্গমে লিপ্ত, চিৎকার, ভারী নিঃশ্বাস ও শীৎকার – কিছুই চাপা দেওয়া বা বিকৃত করা হয়নি বা পরে স্টুডিওতেও রেকর্ড করা হয়নি। সবই দেখতে পাওয়া যায় কিন্তু মূল ব্যাপারটা দেখতে পাওয়া যায় না, যেটা লোকে দেখতে চায় যখন, শত্রুভাবাপন্ন একটা শহরে শহুরে গভীর রাতে, আমরা সেটাই দেখতে চাই যেটা আমরা দেখতে চাই কারণ ব্যাপারটা প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদন আর আমাদের, প্রাপ্তবয়স্কদের, প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনের সুবিধে নেবার বৈধ বয়েস হয়ে গেছে, তা এই শব্দগুলো ঠিক যা-ই বোঝাতে চাক না কেন, “প্রাপ্তবয়স্কদের”, “বিনোদন”।     

তানো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হোটেলগুলো – মজার জিনিশ সব। ফাঁকা সব জায়গা, নো ম্যানস ল্যান্ড, স্রোতে ভাসতে থাকা দ্বীপ সব। সফরদের নোঙর ফেলার জায়গা, সে সফর যা-ই হোক না কেন, বড় হাতের “ভি” দিয়ে লেখাও হতে পারে (ভিক্টরি, ভেঞ্জেন্স, ট্রুথ[4]) বা ছোট হাতের “ভি” দিয়ে (ছোট জয়, ছোট প্রতিহিংসা, ছোট সত্যি)। ওটা একটা যাওয়া তো বটেই, তবে একটা অনিশ্চিত যাওয়া, অনাদায়ী ঋণের মত। তানো বুঝতে পারল, আরও একবার, হোটেল তার কতটা অপছন্দ, বিশেষ করে যেগুলো বিলাসবহুল।       

তানো জামাকাপড় ছেড়ে হোটেলের ড্রেসিং গাউনটা পরল। বাথরুমে ফিরে গিয়ে কমোডে বসল, তার পেছনটা স্বয়ংক্রিয় ভাবে তেতে ওঠা সিটে আচমকা আরাম পেল। ও সেই অন্য রিমোটটা নিয়ে খেলতে লাগল, যেটা কমোডের ভেতের বসানো জলের ছোট ছোট ফোয়ারাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে; মূলত মহিলাদের জন্যে জলের যে জেটটা, সেইটা দিয়ে খানিকক্ষণ নিজের প্রোস্টেটটাকে দলাইমলাই করল। বিষাদগ্রস্ত ভাবনা: ওর বয়েসে, ইরটিক ভাবে নিজেকে হাল্কা করার কোনোরকম দুঃখজনক প্রচেষ্টার চেয়ে জলের তোড় দিয়ে প্রোস্টেটটাকে দলাইমলাই করাটা বেশী আরামদায়ক। সত্যি বলতে কি, মোজ়েইকগুলো কোনভাবেই সাহায্য করেনি – তীব্র শীৎকারগুলোও নয়।      

তানো আবার কল চালিয়ে দিল। আরও একটা অবগাহন স্নান। অবগাহন স্নানের চেয়ে আর কিছু হয়ত এত জাপানী-সুলভ নয়। কত যুগ হল সে অবগাহন করে স্নান করেনি? লিশবোয়ায় তার ফ্ল্যাটে সে বহুকাল ধরেই শাওয়ারে স্নান করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন, জাপানী জাপানে ফিরে এসে অবশেষে জাপানীদের মত একটা কাজ করছে। বারবার করাটা তো খুবই সামান্য ব্যাপার। যদি সেটার জন্যে সময় হয় তো আগামী দিনগুলোতে ও আরও বেশ কয়েকবার অবগাহন স্নান করবে। এমনকি হয়ত একটা সত্যিকারের ওন্ সেনেও যাবে। কিংবা একটা পাবলিক বাথে, যেটা কিনা, শহরে, সম্ভবত ওন্ সেনের সমতুল্য।    

আরেকটা জাপানীসুলভ কাজ যেটা তানো করতে পারত সেটা হল পরিবারের লোকজনকে ফোন করা। কিন্তু পরিবারের কাকে? তানোর কোন ভাইবোন নেই। মা বাবার চেয়ে কয়েকটা বছর বেশি টিকে ছিলেন কিন্তু তিনিও তো বছর দশেক আগে মারা গেছেন। তুতো কোন ভাইবোন? হয়ত। কিন্তু তারা যেখানেই থাকুক না কেন, ওর তো তাদের কিছু বলার নেই।    

তানো, তাই, এমন একটা কাজ করবে বলে ঠিক করল যেটা পরিবারকে ফোন করার মতই প্রায় একই রকম জাপানীসুলভ: পরিবারকে ফোন না করা।   

যদি সময়-সুযোগ হয় তো কাল ও একটা মন্দিরে যাবে হয়ত, ধূপ জ্বালতে, হাতদুটোকে জোড় করতে, চোখদুটোকে আধবোজা করতে, সসম্ভ্রমে মাথা নোয়াতে, এক মুহূর্ত পরে হাতদুটো দিয়ে তালি দিতে দেবতাদের জাগানোর জন্যে। এটাও একটা সমাধান হতে পারে।  

যদি সময় হয়। ও তো এখানে বেড়াতে আসেনি। ও এখানে ওই মহিলার কাজে এসেছে – আর, একরকম ভাবে, ছেলেটারও। একটা ঋণ শোধ করতে যেটার অস্তিত্বের সাক্ষী কেবল সে আর ওই মহিলা। হিসেব করলে হয়ত দেখা যাবে যে সেটার আসলে কোন অস্তিত্বই নেই। খেলনার মত একটা ঋণ। কিন্তু তাসত্ত্বেও সেই ঋণটা আছে, কারণ যে দুই পক্ষ এতে জড়িত তারা ঠিক করেছে যে সেটা আছে। ইচ্ছা ও প্রতিরূপ হিসেবে জগৎ – এটা কে বলেছিলেন সেটা তানোর মনে আছে, সেই যৌবনকাল থেকে। জার্মান দার্শনিক শোপেনহাউয়ার। ইনগ্রিড, তার প্রথম ও শেষ ও একমাত্র জার্মান প্রেমিকা, তাঁর ফ্যান ছিল। শোপেনহাউয়ার: বুয়ে দ্য কাওয়াই[5]। ওর জন্যে তানো তাঁর সব লেখা পড়েছিল। হ্যাঁ, এমনকি বিষাদের স্তুতি পর্যন্ত।  

তাছাড়া বেচারা ছেলেটাও যে একমাত্র সন্তান ছিল। শুনে মনে হয় একটা খারাপ এরো-গুরো[6] সিনেমার নাম: একমাত্র সন্তানদের অভিসম্পাত।  

ও যদি এখন এখানে থাকত তো ওর সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও হতে পারত।

যেমনি ভাবা অমনি সে যেন মন্ত্রবলে এসে হাজির, তানোর সামনে, ওই ঘরে:

সেনসেই, আপনি এখানে কি করছেন?

তোমার খবর জানতে এসেছি, বির্নার্দু। কাজটা খারাপ করেছি?

না, কেবল…

আমি কি কোন কিছুর মধ্যে এসে পড়ে বাধা সৃষ্টি করছি?

সেনসেই, ব্যাপারটা আমার ভাল ঠেকছে না। আমিআমি তো আর…  

আর কেন ব্যাপারটা ভাল নয় শুনি, বির্নার্দু?

সেনসেই, আপনার কোন ধারণাই নেই আপনি কতটা বিপদের মধ্যে আছেন

আরে, বির্নার্দু, আমাকে নিয়ে ভেব না। আমি তো তোমাকে নিয়ে চিন্তিত।

সেনসেই, আমিআমি তো মরে গেছি।

তো? অনেক ভাল ভাল লোকেদের সঙ্গেই এটা ঘটে থাকে, বির্নার্দু। হাল ছেড়ে দেবার পক্ষে এটা কোন কারণই নয়।   

সেনসেই…

তাছাড়া, বির্নার্দু, তুমি কি জানো আর কে তোমাকে নিয়ে চিন্তা করছে?

সেনসেই, প্লিজ়়।

জানো আমার সঙ্গে কে এসেছে? তুমি যে কল্পনাও করতে পারবে না এ আমি বাজি ফেলে বলতে পারি।

তানোর জেগে উঠল। ও ঘুমিয়ে পড়েছিল – ও নিশ্চিত – খুব বেশি হলে কয়েক মিনিটের জন্যে। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট মাথাটা আরেকটু হাল্কা লাগার জন্যে, মাথাটাকে আরেকটু ভারি লাগার জন্যে।  

ও বেসিনে গিয়ে গরম জলের কলটা চালাল, তাতে একটা তোয়ালে ভিজিয়ে মুখের ওপর চাপাল।  

তানোর অ্যাডভেঞ্চারটার যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহে আছে। ওর মনে হচ্ছে শাস্তিমূলক এই অভিযানটার শেষটা ভাল হবে না। অন্তত সময়ের শ্রাদ্ধ তো হবেই। আর তানো জানে, নিজের অভিজ্ঞতাতেই, যে হারানো সময়ের খোঁজে যাওয়াটা প্রায় সর্বদাই সময়ের শ্রাদ্ধই হয়ে থাকে।   

মহিলার নিজের ছেলের যত্ন নিতে চান? সেটা আগে করলে মন্দ হত না, বেশ কটা বছর আগে, যখন তার যত্ন নেবার জন্যে হাতটা বাড়ানো, তাকে সস্নেহে দুটো কথা বলা, তাকে সাহায্য করাটাই যথেষ্ট হত। মানে মা হওয়া আর কি।   

হয়ত দোষটা মহিলারও নয়। ওটা তার স্বভাব। এরকম মানুষ তো হয়, ঝর্ণার মত। জন্ম থেকেই শুকনো একটা ঝর্ণা।      

এক বছর আগে

রাত নামছে, নামছে রাত, রাত নামছে, তকিওতে রাত, রাত, আলো-ঝলমলে রাত, বড়দিনের আগের সন্ধের মত উৎসবের রাত, চোখ টিপতে টিপতে হাসতে থাকা রাত।

একটা হিপি, অস্ট্রেলিয়ান বোধহয়, অ্যামেরিকানও হতে পারে, বির্নার্দুর কাছ ঘেঁষে আসে: হ্যালো, ইংরিজি বোঝো? টাকা আছে তোমার কাছে? ডলার? (অস্ট্রেলিয়ান, অ্যামেরিকান ডলার?) একটু সাহায্য করবে? আমি ফান্ড জোগাড় করছি সাইবার-ধ্যানের একটা অ্যাকাডেমি তৈরি করব বলে।  

রাত, নামতে থাকা রাত, ওর ভেতরে রাত, ওর ভেতরে আঁধার রাত। ভয়ঙ্কর ভেতরের রাত ওর মধ্যে।

œ

ছোটবেলার একটা স্বপ্ন: সে ঘরের মধ্যে খেলছে, যেন একটা ছবির মধ্যে, নিশ্চিন্তে, আর একটা কালো ঝাঁক এগিয়ে আসছে, শব্দহীন ভাবে, ছবির/ঘরের ভেতরে। ওটা তার প্রথম অভিজ্ঞতা ব্যক্তিত্বের দুটুকরো হয়ে যাওয়ার: সে বাইরে, একটা অব্যক্ত বেদনায়, সে নিজে যে ছেলেটা তাকে সাবধান করতে না পেরে, কারণ গলাটাও সাউন্ডপ্রুফ হয়ে গেছে।    

œ

বির্নার্দু হোটেলে। বির্নার্দু গুটিয়ে গেছে। বির্নার্দু টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। বির্নার্দু ভাবছে: আমি যদি সত্যিকারের সামুরাই হতাম তো এই মুহূর্তে সেপ্পুকু[7] করতাম। একমাত্র পথ – সত্যের একমাত্র পথ। মুখরক্ষা করতে পারিনি। মুখরক্ষা না করতে পারারও বেশি কিছু: মাথা ঠিক রাখতে পারিনি, আমার আত্মা হারিয়ে ফেলেছি, জীবন হারিয়ে ফেলেছি।   

œ

ছোটবেলার আরেকটা স্বপ্ন: সে নীরবে মায়ের সাহায্য চাইছে খেলনার একটা টুকরো জোড়া লাগানোর জন্যে, আর মা আয়নার সামনে, গল্পের রানীমার মত, আয়নার সামনে দুষ্টু রানী, আয়না, আয়না আমার, আমার চেয়ে সুন্দরী আছে কি আর। মা আয়নার সঙ্গে কথা বলছে, আর সে বাইরে, সর্বদা বাইরে, নিঃস্বর। সস্বর দুষ্টু রানীর নিঃস্বর ছেলে। প্রতিকৃতি-নারীর অদৃশ্য-পুত্র।   

œ

রাতটাকে গৌরবময় করে শেষ করার জন্যে এখন কেবল তার মাকেই ফোন করাটা বাকি। অবশ্যই কালেক্ট কল। কিন্তু মা ফোনটা ধরবে না। ধরবে না, তাই না? অভ্যেসমত নিশ্চয়ই খুব খুব ব্যস্ত থাকবে।   

চেষ্টা করেও কোন লাভ নেই। আর তাছাড়া তুমি বলতেটাই বা কি, ছেলে?  

তুমি হয়ত বলতে:  

মা। তুমিই ঠিক। বরাবরের মত ঠিকই বলেছিলে। যেরকম ভেবেছিলাম এটা ঠিক সেরকমটা নয়। কিংবা আমি ঠিক এর উপযুক্ত নই। বাড়ি ফিরে যাব? ভেবে দেখছি, মা। ফিরে যাওয়াটা। লেজটাকে দুপায়ের ফাঁকে গুটিয়ে। হ্যাঁ। তুমিই ঠিক, মা। বরাবরের মতই। মাপ করে দাও, মা। তোমাকে লজ্জা দেবার জন্যে মাপ চাইছি, মা। আমার এই অস্তিত্বের জন্যে মাপ চাইছি, মা। এটা এমন কিছু নয় যার কোন সমাধান নেই। চিন্তা করো না, আমি ঠিক করে ফেলেছি। হ্যাঁ, ঠিক করে ফেলেছি – অবাক কাণ্ড, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চিন্তা করো না, মা, এইবারে আর বাড়ি ফিরে যাব না।    

                                                    œ

অস্তিত্ব একটা কঠিন কথা। কিন্তু সেটাকে সহজ করে তুলতে একটা অক্ষর (যেমন একটা “ন”) জোড়াটাই যথেষ্ট।

œ

পরের দিন সকালের আগে দেহটাকে পাওয়া যায়নি।   

৪  

সহায়তাকারী

২০০৪ সালে তৈরি, রোপ্পোনগি হিরুজ়ু মোরি তাওয়া বা মোরি টাওয়ার চুয়ান্নটা তলার জন্যে ২৩৮ মিটার উঁচু আর যে তকিওয় এরকম বাড়ি খুব একটা নেইও সেখানকার সবচেয়ে বড় বাড়িগুলোর মধ্যে একটা হওয়া ছাড়াও এটা রোপ্পনগি এলাকার সবচেয়ে ডাইনামিক। ভেতরে ঢোকার মুখে চওড়া প্রাঙ্গণটাতে একটা ভয়ঙ্কর দেখতে ভাস্কর্য: রট আয়রনের একটা বিশাল মাকড়সা, তার লম্বা আর শীতল দাঁড়াগুলো ধনুকের মত বেঁকানো। আরও একবার, রুচিটা এরো-গুরোর গল্প আর পরিবেশের মত। তিরিয়েজ়া মাথা নাড়ল, যেন বলছে: এই লোকগুলো… মাঝামাঝি কিছু কি থাকতে পারে না? এই নরম তুলতুলে কাওয়াই-এর জন্যে পাগলা হয়ে যাচ্ছে তো পরমুহূর্তেই যৌনগন্ধী সামঞ্জস্যহীন কিম্ভূতকিমাকার একটা কিছুর পেছনে ছুটছে। আর এটাই নাকি সূক্ষ্মতার দেশ?      

(তিরিয়েজ়ার জানা উচিত যে “এই লোকগুলো” বলে বাক্যবন্ধটারই তো, শুধুমাত্র নিজেদের মনে বলা হলেও, ভয়ানক হবার একটা প্রবণতা থাকে, বাঁধাগতের মূলসূত্রটা আগে থেকে করে রাখা একটা সহজসরল ধারণার দিকে গড়িয়ে যায়। অন্য দিকে আবার… চেনা ছকগুলোর কিছু সুবিধেও থাকে, যতক্ষণ অবধি ব্যবহারকারী জানে যে এই ন্যাপিগুলো আগেকার দিনের মত কাপড়ের তৈরি হওয়ার বদলে ডিসপোজ়েবল।)   

ওরা একদম শেষ তলা অবধি লিফটটা নিল, যেখানে চতুর্দিকের দৃশ্য বসে বসে দেখার জন্যে ক্যাফে ছাড়াও ব্যক্তিগত শিল্পকলার একটা মিউজ়িয়াম আছে, ওই যেগুলোতে শাগাল, সেজ়ান, মুঙ্ক আর বেশ হৃদয়স্পর্শী মুঠো-ভর্তি ইম্প্রেশানিস্ট, এক্সপ্রেশানিস্ট, ফোভিস্ট[8], পোঁয়াতিলিস্ট[9], কিউবিস্ট, ফিউচারিস্ট, দাদাইস্ট, পাউলিস্ট[10], সুররিয়ালিস্ট, অ্যাবস্ট্র্যাকশানিস্ট, পোপিস্ট[11], হাইপার-রিয়ালিস্ট, ইপেরদাদাইস্ট[12]      থাকে। যেটা আশ্চর্যের সেটা হল তিরিয়েজ়া নয় তানোই কিন্তু ভেবে দেখল যে তকিওর মত একটা সমতল শহরে চারিদিকের দৃশ্য দেখানোর জন্যে ক্যাফেগুলো কৃত্রিমভাবে সেটাই করে যেটা লিশবোয়াতে পাহাড়গুলো প্রাকৃতিকভাবে জুগিয়ে থাকে। এই চমৎকার পর্যবেক্ষণটা করে তানো মনে মনে কাঁধদুটোকে ঝাঁকাল। এটাই তো প্রযুক্তির কাজ, ও ভাবল, প্রাকৃতিক ফাঁকফোকরগুলোকে ভরিয়ে তোলা। সমস্যাগুলো কেবল তখনই শুরু হয় যখন, হাতের গোড়ায় প্রকৃতি থাকতেও, আমরা তার পরিবর্তগুলোকে বেছে নিই। যখন পায়ে হাঁটার আনন্দের বদলে জিমের ট্রেডমিল বেছে নেওয়া হয়, সত্যিকারের নৈসর্গিক শোভাকে তার প্রতিকৃতি অনাবশ্যক করে দেয়, স্বাভাবিক আলোর বদলে স্ক্রিনকে আর হাতের বদলে নকল হাতকে সুনজরে দেখা হয়। যেমন পর্নোগ্রাফি। প্রশ্নটা বোধহয় সেটার “ন্যক্কারজনক”, “হীন”, “অনৈতিক” হওয়া নিয়ে নয়। গাল দিতে শুরু করার দরকারটা কি? যেটা ওই বিষয়ে নিন্দার্হ, যদি নিন্দা করার মত কিছু থেকে থাকে, তো সেটা হল সর্বোপরি ওটা একটা নিরাপদ যৌনক্রিয়া, কোনোরকম ঝামেলা ছাড়াই – কোনরকম মনুষ্য সংস্পর্শের প্রয়োজন ছাড়া, কোনরকম ঝুঁকি ছাড়া, কোনরকম দূষণ ছাড়া, কোনরকম জটিলতা ছাড়া। এই জন্যেই নবীনদের ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির উপভোগ করাটা বিপজ্জনক: ওদের মধ্যে এই ভুল ভাবনাটা চারিয়ে দেবার জন্যে যে জগৎটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় আর অন্যদের আমাদের মানসিক খেলায় অপরিহার্য কাজে ব্যবহার করা যায়। স্বর্গের মুখোশ পরা নরক: একই সঙ্গে চরিত্র হওয়া আর ইচ্ছেমত ব্যবহার করা; পাকাপাকিভাবে নিয়ন্ত্রণটা নিজের হাতে রাখা…

শহরটা এখন আদিগন্ত একটা আলোর গালচে। দিনের বেলা, ভাগ্য ভাল থাকলে হয়ত ফুজি ইয়ামা দেখা যেতে পারে – আজকে নয়। আজ শুধু শহরটাকেই দেখা যাচ্ছে।

তাদের সংযোগকারী তাদের সঙ্গে এসে দেখা করল। ভারী সুয়েডের কোট কনুইয়ে চামড়ার তাপ্পি মারা, চশমা, মেকি হাসি। তানো লক্ষ করল যে লোকটা কেবল তিরিয়েজ়াকেই সম্ভাষণ করল।    

– আপনার সঙ্গে আপনার দেখা হওয়াটা খুব সম্মানের, ম্যাডাম – সে বলল, তিরিয়েজ়ার হাতে প্রায় চুমো খেয়ে। – আমি সর্বদা আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকব, আপনি তো জানেনই।

তিরিয়েজ়া প্রশংসাটাকে মেনে নিল, মাথাটাকে সামান্য একটু নুইয়ে আর ঠিক যতটুকু দরকার ততটুকুই আন্তরিক একটা হাসি হেসে।   

লোকটা তিরিয়েজ়ার হাতটা ছেড়ে দিল।  

– বলাই বাহুল্য, যে পরিস্থিতিতে আমাদের আবার দেখা হচ্ছে তার জন্যে আমি অশেষ দুঃখিত।

তানো যেটা দেখল সেটা তার মোটেই ভাল লাগল না। লোকটাকে দেখে ওর ঠিক সেরকমটাই মনে হল যেরকমটা ও সারাটা জীবন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেছে: একজন “প্রশাসনযন্ত্রের লোক”, একজন রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী, ওইসব উদ্যোগকর্তাদের একজন যাদের কোন উদ্যোগ নেই, অন্যদের ব্যবসায়ে পরগাছা হয়ে যারা বাঁচে। এক কথায়, একজন “সহায়তাকারী”। এর আগেই এরকম বেশ কয়েকজনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, ছাত্রদের বাবাদের মধ্যে, যাদের এড়ানোর উপায় তার নেই। প্রায় সর্বদাই ওদের দেখে মনে হয় ওরা যেন একই অ্যাসেম্বলি লাইন থেকে বেরিয়েছে: গদগদ হাসি, ধূর্ত চোখ এমন সব চশমার পেছনে যেগুলোর বোধহয় কোন পাওয়ারই নেই, কিন্তু সেগুলো ওদের চরিত্রটা তৈরি করার অঙ্গ: উঁচু কপাল, মোটাসোটা ফোলা মুখ, অন্য হাবাগোবারা যে বিষয়টার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারছে না সেটার খানিকটা আঁচ করতে পেরে আত্মসন্তুষ্টির একটা চিরস্থায়ী ভাব। আর ওই হাবাগোবাদের একজন অবশ্যই তানো নিজে।       

লোকেদের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারা ছাড়াও হয়ত হাত গুনতে জানে বলে লোকটা তানোর অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়ে সৌজন্য দেখানোর কৃপাটুকু করল:  

– আর ইনি কে?  

তিরিয়েজ়া বলল, খুব একটা না ভেবেই:

– মিঃ তানো? ওঃ, উনি আমার আপ্তসহায়ক।   

সেপূলভেদা তানোর দিকে চেয়ে হাসল, অ্যাফ্রিকায় এক অভিযাত্রী উপজাতীয় এক যোদ্ধাকে শস্তার ঠুনকো মাল বেচচে:

– ওঃ! কোন্নিচি-ওয়া[13], তানো-সান। – তারপর জাপানের ব্যাপারে অভিজ্ঞ লোকটা পকেট থেকে একটা ভিজ়িটিং কার্ড টেনে বার করল। – আনীবাল সেপূলভেদা। সে-পু-রু-ভু-দা।   

– জোর করে বেশি চেষ্টা করার দরকার নেই। মিঃ তানো পোর্তুগাল থেকে আসছেন।

– ওঃ, আচ্ছা। – তারপর সেপূলভেদা যোগ করল, ফালতু একটা ভিজ়িটিং কার্ড নষ্ট করে ফেলার জন্যে অনুতপ্ত হবার হাবভাব নিয়ে: – বুঝেছি।  

তানো চোখদুটোকে আধবোজা করল। লোকটা কি বুঝেছে? বোঝার কি আছে?  

তিরিয়েজ়া প্রারম্ভিক কথাবার্তায় ইতি টানল:

– আমার ছেলে?  

সেপূলভেদা তার বোঝার প্রক্রিয়াটাকে শেষ করল। তানোর দেখে মজা লাগল যে ওর যেন এখন একটু অস্বস্তি হচ্ছে:

– মানে, ম্যাডাম নিশ্চয়ই বোঝেন যে, আমি যেটুকু অনুমান করতে পেরেছি, ও মানে…

– বির্নার্দু।

– … আপনার ছেলে কখনই আমাদের কনস্যুলেটের কোনরকম পরিষেবা নেয়নি। ও…

তিরিয়েজ়া বাধা দিয়ে বলে উঠল:

– বির্নার্দু খুব একটা কনস্যুলেটের পরিষেবা নেওয়া পছন্দ করত না। ওর তো একবার একটা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

সেপূলভেদা কপালে হাতটা তুলল।

– হ্যাঁ, ব্যাঙ্কক।  

এটা কি তানোর ধারণা না লোকটা প্রায় জিভটা দিয়ে ঠোঁট চাটল?

– সেই। ব্যাঙ্কক।  

– কিন্তু আমি যতদূর জানি সবকিছুই শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল।  

– চার সপ্তাহ জেলে কাটানোর পর। আর সেটাও কেবল আমি হস্তক্ষেপ করার পরই। 

– ওঃ, হ্যাঁ। অবশ্যই। কিন্তু যে মিটিংটা এখন আপনি করার জন্যে অনুরোধ করেছেন…

– আমি অনুরোধ করিনি।  

– সবটাই খুব নিয়মবিরুদ্ধ। কেইর…  

– আমার শর্তগুলো কি কোনভাবে যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না?  

– হ্যাঁ, কিন্তু… এখানে কিছুই সহজসরল নয়। জাপানীরা খুব… – অ্যাফ্রিকাবিদ অভিযাত্রী দীনহীন সোবার[14] দিকে তাকিয়ে হাসল। – কিছু মনে করবেন না, মিঃ তানো।

চারিদিকে তকিওর রাতটা দিগন্ত-বিস্তৃত আলোর ফুটকির একটা সারি। যেন তারা-ভরা একটা আকাশ, কেবল তকিওর তারাগুলো আমাদের নীচে ছড়িয়ে আছে, ওপরে নয়। মেগাসিটিটাকে দেখে মনে হচ্ছে একটা বিশাল রানওয়ে, বিশটা গডজ়িলার সমান একটা মহাকাশযানের নামার অপেক্ষায়।   

– তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়াল, সেপূলভেদা?

– ওরা হ্যাঁ বলেছে। কিন্তু কাল নয়। কটা দিন পর।

– কতদিন?

– উম… কয়েকটা দিন। ওরা অবশ্যই ক্ষমা চাইছে। শেষ মুহূর্তের কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা। বা ওইরকম কিছু একটা।   

– সেপূলভেদা, আপনার হাতে আটচল্লিশ ঘণ্টা আছে।  

– মানে, আমি জানি না…

তিরিয়েজ়া কিছু বলল না। আর সেপূলভেদার মুখটা পাংশুবর্ণের হয়ে গেল। এটাই ক্ষমতা, তানো ভাবল: শীতল ক্ষিপ্ততা। এই মহিলার গলা তোলবার কোন দরকার নেই। সত্যি বলতে কি, গলা ব্যবহার করারই কোন দরকার নেই। সেপূলভেদার এখন ঘেমেনেয়ে ওঠার জন্যে কেবল তার নীরবতাটাই যথেষ্ট।     

– গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, নিশ্চয়ই। এমন কিছু নয় যেটা আপনাকে চিন্তায় ফেলবে, আমি বলছি আপনাকে।   

তিরিয়েজ়া লোকটার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন তার বুধির সঠিক বিকাশ ঘটেনি।  

এমন কিছু নয় যেটা আমাকে চিন্তায় ফেলবে?

– মানে…   

– আপনি বলছেন যে আমার চিন্তার করার কিছু নেই?

তানো মনে মনে হাসল। এই মহিলার তারিফ করতে হয়, অবশ্যই যখন সে বন্দুকটা ওর দিকে তাক করে না।   

– আপনার ছেলেমেয়ে আছে, সেপূলভেদা?

– মানে… আমি…

– এটা একটা খুব সাধারণ প্রশ্ন বলে আমার মনে হয়। আপনার ছেলেমেয়ে আছে?

পাবলিক বাথের তেতে ওঠা ঘরে থাকলেও সেপূলভেদা এর চেয়ে খুব একটা বেশি ঘামত না।   

– মাপ করবেন। আমি দেখছি কি করতে পারি। ইতোমধ্যে…

– সেপূলভেদা…  

– এই শহরটা খুব ইন্টারেস্টিং…

– সেপূলভেদা…

– বেশ ইন্টারেস্টিং কিছু রেস্টুরেন্ট আছে। জাপান মানেই কিন্তু শুধু কাঁচা মাছ নয়। জানি না আপনি কোবে বিফ[15] খেয়েছেন কিনা…  

– সেপূলভেদা।  

– মন্দির আছে। আসাকুসা[16]। উয়েনো পার্ক[17]। শিনজুকু[18]

– সেপূলভেদা।

– কেনাকাটা করার জন্যে – ইলেক্ট্রনিক্স বা ওই ধরণের জিনিশপত্র – আকিহাবারা খুব ভাল…


[1]ক্রিপ্টোমেরিয়া (Cryptomeria, আক্ষরিক অর্থে “লুকনো অংশ”) সাইপ্রেস গোত্রের কনিফার। একসময়ে মনে করা হত জাপানেই মূলত এই গাছ পাওয়া যায়, যেখানে এই গাছ সুগি নামে পরিচিত। ইংরেজিতে এই গাছের নাম জাপানিজ় সিডার বা জাপানিজ় রেডউড।    

[2]জাপানে উষ্ণ প্রস্রবণকে “ও্ন্ সেন্” বলা হয়। সক্রিয় আগ্নেয়গিরির দেশ বলে জাপানের প্রায় সব কটি দ্বীপেই বেশ কিছু ও্ন্ সেন্ ছড়িয়ে রয়েছে।

[3]Sítio do Picapau Amarelo (হলদে কাঠঠোকরার খামার) ব্রেজ়িলিয়ান লেখক মোন্তাইরু লুবাতুর (১৮৮২-১৯৪৮) বিশ থেকে তিরিশের দশকে ছোটদের জন্যে লেখা তেইশটি ফ্যান্টাসি নভেলের একটি সিরিজ়। এই উপন্যাসগুলির কেন্দ্রে আছে হলদে কাঠঠোকরার খামার (“একটা ছোট্ট খামার যেটাতে গাছ দিয়ে ঘেরা খুব সুন্দর একটা কটেজ আছে”), এছাড়া আছে একটা ছোট নদী, তুকানো নামের এমন একটা জঙ্গল যেখানে এর আগে কারুর পা পড়েনি আর ওই নামেরই ছোট একটা গ্রাম; এই সব জায়গায় দুটো ছোট ছেলেমেয়ে আর জ্যান্ত খেলনারা নানান অ্যাডভেঞ্চার করে বেড়ায়। এই উপন্যাসগুলোর ওপর ভিত্তি করে টেলিভিশানের জন্যে একাধিক ধারাবাহিক তৈরি হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল রেদ গ্লোবুর ১৯৭৭-১৯৮৬ ও ২০০১-২০০৭ সালের প্রোডাকশান দুটো। ২০০১ সালের সংস্করণের ওপরে ভিত্তি করে ২০১২ সালে একটি অ্যানিমেটেড সিরিজ়ও হয়। যেহেতু এই উপন্যাসটি ২০১০-১১ সালে লেখা হয়েছিল, রুই খুব সম্ভবত ২০০১-২০০৭ সালের ধারাবাহিকের কথাই বলছেন।      

[4]পোর্তুগিজ়ে “ভিরদাদ”।  

[5]পর্ব ৩ টীকা ৯ দ্রঃ।  

[6]Ero guro শিল্পের এমন একটি ধারা যার মূল লক্ষ্য ইরটিজ়ম, যৌন বিকৃতি ও অবক্ষয়। এরো গুরো বলতে এমন কিছু বোঝায় যা একাধারে কামোত্তেজক এবং বিকট ও ভয়ঙ্কর। এই শব্দবন্ধ দুটি ইংরেজি শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে – ero(tic) আর gro(tesque)।     

[7]Seppuku (আক্ষরিক অর্থে “পেট কাটা”) বা হারা-কিরি পেট কেটে ফেলে এক ধরণের আনুষ্ঠানিক আত্মহত্যা। একসময়ে মূলত সামুরাইরাই নিজেদের সম্মানরক্ষার্থে এইভাবে আত্মহত্যা করতেন।   

[8]বিশ শতকের গোড়ার দিকের শিল্পীগোষ্ঠী লে ফোভ-এর(les Fauves অর্থাৎ বুনো জন্তু) শৈলী ফোভিজ়ম। ইম্প্রেশানিজ়মের বিরোধী এই শৈলীর আয়ু ছিল মাত্র তিন বছর – ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ এবং তিনটি প্রদর্শনী। অঁরি মাতিস ছিলেন এই শিল্পান্দোলনের একজন পুরোধা।   

[9]পোয়াঁতিলিজ়ম রঙ করার একটা শৈলী যাতে রঙের ছোট ছোট বিন্দু আলাদা ভাবে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুযায়ী লাগানো হয় একটা ছবি গড়ে তোলার জন্যে। ইম্প্রেশানিজ়মের এই শাখাটি তৈরি হয় ১৮৮৬ সালে।   

[10]পোর্তুগিজ় কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার (১৮৮৮-১৯৩৫) সাহিত্যতত্ত্ব সেন্সাসিউনিশমু বা অনুভূতিবাদের প্রথম স্তর Paúlismo বা পাউলিশমু।  

[11]পপ শিল্পী। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত অ্যামেরিকান শিল্পী অ্যান্ডি ওয়ারহোলের স্মৃতিকথার নাম পপিজ়ম: দ্য ওয়ারহোল সিক্সটিজ়। পপিজ়ম থেকেই পপিস্ট।

[12]রুইয়ের নিজের শিল্পতত্ত্ব। তাঁর নাট্যদল “উশ ফিলিজ়েশ দা ফে”-র ওয়েবসাইট থেকে উদ্ধৃত করছি – “১৯৮৫ থেকে ১৯৯৯ অবধি কোনরকম পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া তৈরি নাট্যদল “উশ ফিলিজ়েশ দা ফে” তাদের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছিল লিশবোয়ার রুয়া আউগুশ্তা। রাস্তায় তাদের হ্যাপেনিংগুলোর সহযোগে ফিলিজ়েশরা ইপেরদাদা (Hiperdada) আন্দোলনের সৃষ্টি করে আর সব ধরণের কর্তৃত্বের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় – নাগরিক, রাজনৈতিক অথবা নৈতিক। ফলত এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে তাদের গ্রেফতারও হতে হয়েছে সাধারণ জনজীবনের শান্তিভঙ্গ করার অভিযোগে। আজ তারা “উদ্দেশ্যমূলক” পথনাটিকার ইতিহাসে একটা দৃষ্টান্ত ও প্রেরণা।” (https://globalherit.hypotheses.org/tag/felizes-da-fe-hiperdada)

[13]শুভসন্ধ্যা।

[14]অ্যাঙ্গোলার উপজাতিদের মোড়ল। আবার সোবা এক ধরণের জাপানী নুডলও। যথারীতি কথার খেলা।   

[15]কেবল মাংসের জন্যে পালন করা চারটে প্রধান জাপানী গবাদি প্রজাতির অন্যতম হল কোবে বিফ যেটাকে অত্যন্ত সুখাদ্য বলে মনে করা হয়ে থাকে। এই গোমাংসের নানান রকম পদ হয়।    

[16]তকিওর তাইতোও এলাকার একটা জেলা। এখানে বেশ কিছু মন্দির আছে, যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল সেনসোও-জি, বোধিসত্ত্ব কান্ননের উদ্দেশে নিবেদিত একটি বৌদ্ধ মন্দির।   

[17]তকিওর তাইতোও অঞ্চলে ১৮৭৩ সালে স্থাপিত দেশের প্রথম জনসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত পার্কগুলির অন্যতম। এই পার্কে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিউজ়িয়াম আছে। বসন্তকালে চেরিফুলের শোভা দেখতে অগুন্তি মানুষ এই পার্কে আসেন।    

[18]তকিওর একটি প্রধান বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। শিনজুকু বিশ্বের ব্যস্ততম রেলস্টেশান এবং তার উত্তরার্ধ এই শিনজুকু অঞ্চলেই অবস্থিত, যদিও এই স্টেশানের চারিদিকের এলাকাকেই সাধারণ ভাবে শিনজুকু বলা হয়ে থাকে।

.

Rita Ray
  ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।     

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.