মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (পঞ্চম পর্ব)

বাংলা English
 Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.  

[আত্মনিয়ন্ত্রণ]

血気の勇を戒むること[1]

নারিতা

এ৩৮০টা নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামল কাঁটায় কাঁটায় সকাল নটায়। যে করিডরটা গিয়ে ইমিগ্রেশান কাউন্টারে পড়েছে সেইখানে তানো আর তিরিয়েজ়ার দেখা হল। সেখানে তখন শয়ে শয়ে লোক, যার মানে ইউরোপ বা অ্যামেরিকা থেকে আসা অনেকগুলো উড়ান ওই সময়ে এসে নেমেছে। বিচ্ছিন্ন ও মানচিত্রে ভালভাবে নির্ধারিত একটা গন্তব্যস্থান হওয়ার বিভিন্ন রকম সুবিধে আর অসুবিধে থাকে। চীন আর কোরিয়া, ওই দ্বীপপুঞ্জের দুই প্রতিবেশী, কয়েকশো নটিকাল মেইল দূরে অবস্থিত।    

আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণ করে যাত্রীদের লাইনগুলো দুটো দলে বিন্যস্ত করা – দেশি ও বিদেশি;  বেষ্টনীগুলো দেওয়াল ছাড়া গোলকধাঁধার রীতিসিদ্ধ আঁকাবাঁকা লাইন তৈরি করেছে, যেগুলো খুব কাজে আসে যদি লাইনগুলো খুব লম্বা হয়, আর যদি ঠিক তা না হয় তো সেটা অস্পষ্ট একটা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বৈদ্যুতিন প্যানেলে অনেকগুলো ভাষায় “তকিওতে স্বাগত” লেখা – সেগুলোর মধ্যে পোর্তুগিজ় একটা।      

তানো ভেবে পেল না সে খুশি হবে না অখুশি। তাত্ত্বিক ভাবে সেটা নির্ভর করে ওর বিশ্বস্ততাটা কোনদিকে, আর সে নিজের বেছে নেওয়া ভাষা/দেশের বিষয়ে কতটা আবেগপ্রবণ, তার ওপরে।     

তিরিয়েজ়া কিন্তু জানে যে এই “জাপানে স্বাগত”-টা যতটা না ১৫৪৩ সালের সুন্দর একটা তারিখে “আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানো প্রথম ইউরোপীয় দেশ”-এর প্রতি সম্মান দেখানোর চেয়েও বেশি ব্যবহারিক একটা বিষয়: গত দশক ধরে এ দেশে আসা আগন্তুকদের বড় একটা অংশ ব্রেজ়িল থেকে, বিশেষ করে জাপানের বাইরে জাপানের রাজধানী সাঁও পাউলুর গুয়ারুল্যিউশ থেকে, আসে। হয় ট্যুরিস্ট হিসেবে, নয় এমিগ্র্যান্ট বা এমিগ্র্যান্টদের বংশধর হিসেবে। এই শেষের জনেরা, জাপানিদের ছেলেপুলে ও জাপানি নামধারী হওয়া সত্ত্বেও, সবসময়েই যে জাপানি জানে তা কিন্তু নয়। ওয়াকিবহাল মহিলা হিসেবে তিরিয়েজ়া কোথাও একটা পড়েছিল যে আস্ত কতগুলো শহরও আছে, হামামাৎসু বা নাগোয়ার মত, যেখানে জনসাধারণের জন্যে লেখা পথচিহ্নের একটা বেশ ভাল অংশ দুটো ভাষায় লেখা হয়, জাপানি আর পোর্তুগিজ়ে।      

ক্লান্তির (টাইম জ়োনটা ন’ঘণ্টা লাফ মেরে এগিয়ে গেছে) জন্যেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক, তানো এক মুহূর্তের জন্যে ইতস্তত করল, যেন ও জানে না কোন লাইনে – জাতীয় না অন্যসব জাতীয়তা – ওকে যেতে হবে। জাতীয়। অন্যসব জাতীয়তা। ঢেউয়ের খেয়ালখুশিতে ভেসে চলা একটা ছোট নৌকো।      

তিরিয়েজ়া ব্যঙ্গ করার লোভ সামলাতে পারল না:

– কি হল, তানো? পাসপোর্ট ফেলে এসেছেন?

দিশাহীন নৌকো, হতচকিত, বুঝতে পারল না:

– অ্যাঁ?

তিরিয়েজ়া মাথা নাড়ল:

– নাকি এয়ারপোর্টটাকে আর মনে নেই?

তিরিয়েজ়া অবিচার করছিল। ওর জানার কথা নয়, কিন্তু তানো যখন ইউরোপের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল তখন ও হানেদা[2] থেকে গিয়েছিল, নারিতা থেকে নয়। সত্যি বলতে কি (বা সেটা ঠিক সত্যি না হলেও), ওই বিমানবন্দরটা যতটা না তানোর তার চেয়ে অনেক বেশি ওর।

œ

আধঘণ্টা পরে, ওদের হোটেলে নিয়ে যাবার জন্যে পাঠানো ইঞ্জিনে চালানো কাঠামোটার ভেতরে ওরা। হাইওয়েতে কিছুটা ট্র্যাফিক ছিল – সেটা অবশ্য বাকি বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোর তুলনায় কিছুই নয়। এটা, হয়ত, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রেলের সিস্টেমটা থাকার সুবিধে। যেন জাপানিরা এমন একটা রহস্য জানে যেটা অন্য আর কেউ জানে না।    

(যে গাড়ি বিক্রি করাটা গাড়ি কেনার চেয়ে ভাল?)

তিরিয়েজ়া বলল:

– আপনি তো নিজের ঘরে ফিরছেন, তানো। আপনার নিশ্চয়ই খুব আনন্দ হচ্ছে।   

– মানে…

– আপনার আনন্দ হচ্ছে না?

– আপনাকে কি বলি বলুন তো, ম্যাডাম?

– তিরিয়েজ়া।  

– যে আমার আনন্দ হচ্ছে? হচ্ছে, আমার আনন্দ হচ্ছে।

– আর আপনি কৃতজ্ঞ। ঘটনাচক্রে।   

– হ্যাঁ, সেটাও বটে, ম্যাডাম।

– তিরিয়েজ়া।

– তিরিয়েজ়া।

– আপনার তাহলে আনন্দ হচ্ছে আর আপনি কৃতজ্ঞও?

– খুব।  

– খুব ভাল।   

এক বছর আগে

ইয়োকোতোবিগেরি[3]। ওরা এটার আশা করেনি। একটা ইয়োকোতোবিগেরি। ওরা এমন আশ্চর্য ভাব দেখাচ্ছিল মনে হচ্ছিল যেন ওরা কখন ইয়োকোতোবিগেরি দেখেনি। এমনকি সিনেমাতেও নয়। পাটাকে উঁচিয়ে হাওয়ায় লাফ কাটা, বাটামের মত পাটাকে যেন সমস্ত শরীরটা ধরে আছে। হ্যাঁ, ও, ওই হাস্যকর গাইজিন[4], ইয়োকোতোবিগেরি কি জানে, আর ঠিক ওই মুহূর্তেই – আরোও বেশি করে নির্ভুল হবার জন্যে পরপর কতগুলো সুনির্দিষ্ট মুহূর্ত থাকে – ও ওরকম একটা লাথি মারছিল কমলা-চুলো নাকউঁচু, অপ্রসন্নতায় ব্যাঁকানো ওপরের ঠোঁট, রোদ-খাওয়ানো বাদামী চামড়া আর বদ পাঙ্কের হাবভাবওয়ালা ছেলেটার নাকের হাড়টা তাক করে। প্রতিদ্বন্দ্বী (নামটা মনে হয় কেন, উপযুক্ত নাম, ওর খালি বার্বিই নেই) অতর্কিত আক্রমণে হতচকিত হয়ে চিৎ হয়ে পড়ে গেল। প্রশিক্ষক এবার আর “আজিমে! আজিমে!” না বলে বললেন “ইয়ামে! ইয়ামে!”, নিজে পেয়ারের ছাত্রকে বাঁচাবার জন্যে। আর “নিয়ন্ত্রণের অভাব”-এর জন্যে বির্নার্দুকে ধমক দিলেন। জঘন্য!             

এক মিনিট আগে কোথায় ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ যখন, যেটাকে ও একটা স্বচ্ছন্দ কুমিতে[5] মাত্র বলে ভেবেছিল – দোওজোওর সঙ্গীর সঙ্গে খেলাচ্ছলে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার হাল্কা আদানপ্রদান – সেটা চলার সময়ে এই প্রশিক্ষক (তাকে তানোর সঙ্গে একই উচ্চতায় বসাতে বির্নার্দুর ঘেন্না হয়) যখন কেন বার্বিকে আক্রোশভরে কাপুরুষের মত তাকে, অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে গিয়ে, কনুইয়ের গুঁতো মারতে দিয়েছিল?    

আর তখনই বা আত্মনিয়ন্ত্রণ কোথায় ছিল যখন, সে হতভম্ব হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই, প্রশিক্ষক লড়াইটা চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আর, একচুলের জন্যে, বির্নার্দুর রগে একটা লাথি এসে লাগেনি যেমনটা রাস্তার লড়াইতেও সবচেয়ে প্রতারক আর ৯৯ইতররাই কেবল করে থাকে?       

তারপর, ড্রেসিং রুমে, সবাই আয়নায় সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে, অন্তঃসারের চেয়ে নিজেদের ইমেজ নিয়েই বেশি চিন্তিত, আত্মতুষ্টির হাসি হাসতে হাসতে যে যার মোবাইলের অ্যাপগুলোর তুলনা করছে?     

œ

ওই স্কুলটা যে ভাল নয় সে বিষয়ে ওর তখনই সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল। জিমটার ফ্যারাওয়ের মত, দূর-ফ্যারাওয়ের মত ধরণধণের জন্যে তো বটেই। তিনটে স্পেশাল ক্লাস, মাস্টারক্লাসের জন্যে ওকে যে পরিমাণ টাকা দিতে হয়েছে তাতে ওর চোখ দুটো খুলে হাতে চলে আসার জোগাড় হয়েছে! কিংবা তা-ই হত হয়ত, যদি বির্নার্দুর চোখদুটো এখনও থেকে থাকত। নেই। ওগুলোকে তো সে উপড়ে ফেলেছে। ওগুলোকে তো সে উপড়ে ফেলেছে, ফেলেনি? সে এখন আর অন্তত কিছু দেখতে পায় না। কিছুই আর সে দেখতে পায় না, কোনকিছুরই কিছু না।       

কারাতে তো এটা নয়। কারাতে তো অপ্রয়োজনীয় পাশবিকতা নয়, ভাঁওতা নয়, আক্রোশ নয়। ধৃষ্টতাও নয়। চরিত্রের, আন্তরিকতার, আত্মনিয়ন্ত্রণের, স্পিরিটের[6], আদবকায়দার অভাব নয়।  

ওরিগামি ওতেরু

তিরিয়েজ়া হাবভাব সতেজ, চনমনে, তার রোদচশমার আড়ালে, সেই কালো আর রুচিশীল আর শক্তিশালী গাড়ির মধ্যে যেটা ওদের বিমানবন্দর থেকে হোটেলে নিয়ে গিয়েছিল। ফার্স্ট ক্লাসে এখন মনে হয় বাথসল্ট মেশানো স্নানের জলও পাওয়া যায়।

তানোর অবস্থা অবশ্য ঠিক এরকম নয়। ওদের দেখে এক জোড়া কমিক চরিত্র বলে মনে হয়: তিরিয়েজ়া আত্মবিশ্বাসী, তানো আবছা কিছুটা অস্বস্তিতে ভরা। ওদের দেখে প্রায় স্বামীস্ত্রী বলে মনে হয়, জরাজীর্ণ আর নেতিয়ে পড়া একজোড়া স্বামীস্ত্রী, যাদের মধ্যে কোনরকমের আর বোধ বাকি নেই। দুজনেই পেছনের সিটে বসে, দুজনে রিঙের যার যার কোণে চলে যাওয়ার জন্যে যেটা যথেষ্ট লম্বাচওড়া, যে যার জানলা দিয়ে বিশাল তকিওর বাড়িঘরদোর, একঘেয়ে ও বোদা শহরতলি যেতে দেখতে দেখতে। নানা কথা ভাবতে ভাবতে, কথা না বলে, তিরিয়েজ়া “মুখে” একটা মুখোশ-হাসি “বকলস দিয়ে আটকে” (সাহিত্যের এই উল্লেখটা[7] কোথা থেকে বেরল?), তানো কপালটা কুঁচকে, একটা পালাতে না জানা জালে আটকা পড়া টুনামাছের হাবভাব নিয়ে।       

হঠাৎ করে এই তানোকে দেখলে প্রাচ্য ঔদাস্য দেখাতে আর অতটা পটু বলে মনে হয় না। তাছাড়া কি ধরণের লোক নিজের মাতৃভূমিতে এত কম খুশি নিয়ে ফেরে? এই তানো হয়ত দুগুণ বিশ্বাসঘাতক। সুতরাং, প্রতারক প্রতারিত হওয়ার চেয়েও বেশি ন্যায্য আর কি হতে পারে?      

হ্যাঁ, ওদের দেখে বলতে গেলে একজোড়া স্বামীস্ত্রীই মনে হয়, বহুদিন ধরে মন কষাকষি হতে থাকা এক দম্পতি। কিছু সময় কেটে যাওয়ার পরে বাকি সব স্বামীস্ত্রীর মতই এরা। ব্যাপারটা দুঃখজনক, কিন্তু. ছুরির মুখে তো আর বাগবিতণ্ডা চলে না।   

œ

ওরা চেক ইন করল। সৌজন্য – আর অত সম্মানীয়া একজন অতিথিকে সশ্রদ্ধ সম্মান – দেখিয়ে ম্যানেজার ওদের বলল যে, সাধারণ রীতি না হলেও ওরা এখনও হোটেলের যে কোন একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে প্রাতঃরাশ সারতে পারে। হোটেল ওরিগামি – বা স্থানীয়দের ভাষায় ওরিগামি ওতেরু – এককালে তকিওর সবচেয়ে ভাল হোটেল ছিল। আজ সেটাকে ওয়্যাট ও আরও গুটি কয়েক হোটেল পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। কিন্তু সেটা এখনও ভদ্রস্থ একটা পাঁচতারা, তার বিলাসিতার মূল্য সাধ্যের মধ্যে, কনফারেন্সের জন্যে ভাল ভাল হল আর নিজস্ব একটা শপিং মল আছে। আকাশের দিকে উঠে যাওয়া চল্লিশটারও বেশি তলা, একদম ওপরের তলার রেস্টুরেন্টটা থেকে চারিদিকের দৃশ্য দেখা যায়, সেটা প্রাতঃরাশের সময়ে পাশ্চাত্যবাসীদের একটা চিড়িয়াখানার খাঁচায় পরিণত হয়। এমনটা নয় যে ট্যুরিস্টদের ঠেলে ওপরে পাঠিয়ে দেবার জন্যে কোন পুলিশবাহিনী আছে, বা শাদা গ্লাভস পরা আশাররা ট্যুরিস্টদের জোর করে লিফটগুলোতে ঠেসে ঢুকিয়ে দেয়[8]। ব্যাপারটা স্রেফ এটাই যে ওই পঁয়তাল্লিশ তলাতেই সেই সব চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় পাওয়া যায় যার জন্যে এতজন ইউরোপীয় আর অ্যামেরিকান আর অস্ট্রেলীয় আর অবশ্যই নিউজ়িল্যান্ডীয়রা তকিও-নামক ওই অদ্ভুত রকম সুপরিচিত বা সুপরিচিত ভাবে অদ্ভুত শহর-গ্রহে স্রেফ আধঘণ্টা কাটিয়েই আকুলিবিকুলি করতে থাকে – ডিম, টোস্ট, মাখন, বেকন, সিরিয়াল; কমলালেবু, গ্রেপফ্রুট, ট্রপিকাল আর টমেটোর জ্যুস; দুধ, কফি, ফলের স্যালাড, ইয়োগার্ট; ব্ল্যাকবেরি কুমড়ো কমলার জ্যাম, ম্যুসলি।       

কোথায় তোমার বঁড়শিটা ফেলেছ সেটা আমায় বল আর আমি তোমাকে বলে দেব মাছটা কোথায় থাকতে পারে।[9] বা, অন্তত, কোথায় সেটাকে তুমি খুঁজে পাবার পরিকল্পনা করছ।  

তানো ভেবেছিল একতলায় প্রথাগত রেস্টুরেন্টটায় প্রাতঃরাশ সারবে। সেটাতে ওপর থেকে সারা শহরের দৃশ্য দেখা যায় না কিন্তু সেটা ঐতিহ্যবাহী বাগানটার ঠিক পাশে, যেটা মাত্র চারশো বছরের নবীন, যাতে সাঁকো আছে, কুঞ্জবন আছে, চা-কুটির আছে, বোমা পড়ার সময়কার বোমা পড়ার হাত থেকে অলৌকিক ভাবে বেঁচে যাওয়া একটা বাগান, যাকে ঘিরে এই অতি-আধুনিক হোটেলটা অতি আগ্রহভরে গড়ে তোলা হয়েছিল। যে দেখতে চায় না সে-ই কেবল দেখতে পায় না, অর্থাৎ, যারা কেবল দৃশ্য দেখতে চায় তারাই এটাকে দেখতে পায় না। ওপর থেকে চারিদিকের দৃশ্য দেখার রেস্টুরেন্টটা ওরিগামির সম্পদ নয়।[10] তার আসল ঐশ্বর্য হল এই বগানটা। ভেতরের সংযত জিনিশটাই সম্পদ, বাইরের ওই চটকদার জিনিশটা নয়।       

জাপানে, একটা ঐতিহ্যবাহী বাগান বা প্রাচীন কোন সৌধ – যার কম-বেশি প্রতীকী তাৎপর্য ও মূল্য আছে – তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আধুনিক কিছু একটা তৈরি করাটা মোটেই বিরল নয়।    

তানোর কি সত্যিই জাপানি প্রাতঃরাশ বেশি পছন্দের? ওই খাবারটা মানে ওই খুদে খুদে খোপওয়ালা ট্রেটা, যার একটা খোপে ভিনিগারে চোবানো একফোঁটা একটা বাঁধাকপি, অন্য আরেকটায় মাছের একটা কুচি আর এভাবেই বাকিগুলোতে তামাগো অমলেটের[11], আচারের, ভিনিগার আর মশলায় ভেজানো ম্যাকারেলের গুঁড়ো? হয়ত না। হয়ত কেবল এই কারণেই যে এটা তাকে কয়েকটা শান্তিদায়ী মুহূর্তের জন্যে ওই মহিলাকে এড়িয়ে যেতে দেবে। না, ভয় নয় – একজন পুরুষমানুষের ভয় হয় না। এটাকে, বরং, আশঙ্কা বলা যেতে পারে।  

দুর্ভাগ্যবশত, মানুষ যা চায় তা সর্বদা করে না। বিশেষ করে যখন তার তানোর মত অতখানি ঋণ থাকে। তখন কেবল এটাই বলা যেতে পারে:

ম্যাডাম, আপনি কেবল আমার মাথাটা আপনার বগলের তলায় নিয়ে আসেননি কেন, যদি আপনার সেটাই অভিপ্রায় হয়ে থাকে? জায়গাটা তো তাহলে কম লাগত।   

কিন্তু তার জবাবে তিরিয়েজ়া স্বচ্ছন্দে বলতে পারত: কিন্তু, তানো, তাতে মজা হত কি? কারুর মাথা কাটাটা একটা মডেল প্লেন তৈরি করার মত, চ্যালেঞ্জটা হল বাক্সের বাইরে যেটা আঁকা আছে সেটার প্রতি নিজের হাতে সুবিচার করা।   

নৈতিক ঋণ হল সবচেয়ে খারাপ ঋণ। সবচেয়ে অনৈতিক সেটা।

যাই হোক, ঋণটা আসল না নকল?

(হুম… আর এ কথাটার কি কোন গুরুত্ব আছে?)  

œ

একটা নৈতিক ঋণ হল মূল্যের মত, অসংখ্য কারণের ওপর নির্ভর করে, যেগুলোর ওপর সেটা নির্ভর করে, আসলে কিন্তু ঋণদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে করা চুক্তিটার ওপরেই ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে থাকে। এই দুই পক্ষই ঠিক করে, বিবেচনা করে, ঋণের কতখানি কখন কিভাবে ফেরত দিতে হবে – কিংবা, ফেরত যদি না-ও দেওয়া যায়, কতটা অন্তত মকুব হবে। তানোর দুর্ভাগ্য যে ও এ ব্যাপারে ভীষণ ভাবে জাপানি।      আর, জাপানি হওয়ার ফলে, ওর আর কোন উপায় ছিল না। সফরটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিরিয়েজ়ার সঙ্গে থাকার শাস্তিটা ওর মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই। চূড়ান্ত পরিণাম যা-ই হোক না কেন। শেষ অবধি পৌঁছনোর আগে যত ঘটনাই ঘটুক না কেন।     

তিরিয়েজ়া আধখানা ক্রোয়াসঁ নামিয়ে রাখল।

– মিটিংটা সাতটার সময়ে মোরি টাওয়ারে। সেটা কোথায় জানেন তো, তানো?

– মোরি টাওয়ার? না মনে হয়, ম্যাডাম।

– আমি তো ভাবতাম তকিও শহরটাকে আপনি চেনেন।

– আমি শহরটা ছেড়েছি তিরিশ বছরেরও বেশি হয়ে গেছে, ম্যাডাম।

– তিরিয়েজ়া।  

– তিরিয়েজ়া-সান।  

– এবার কিন্তু আপনি ব্যঙ্গ করছেন, তানো।

– জাপানে এইভাবেই মানুষকে সম্বোধন করা হয়। তিরিয়েজ়া-সান। বলবেন না যে আপনি সেটা জানেন না। 

– আর বাচ্চাদের?

চান।  

– তানো-চান?

– আমি তো বাচ্চা নই।  

– আপনি ঠিক জানেন যে আপনি বাচ্চা নন? লোকে তো বলে পুরুষমানুষেরা নাকি কখনই…

– না, আমি বাচ্চা নই। তিরিয়েজ়া-সান।   

তিরিয়েজ়া-সান হাসল:

– কিন্তু আমি কি আপনাকে তানো-চান বলে ডাকতে পারি?

তানো-চান ঠোঁট দুটোকে টিপল।

– যারা অন্তরঙ্গ তাদের মধ্যে সেটা সম্ভব।

– খুব ভাল। খুব ভাল, তানো-চান।

œ

বিশাল শহরটা কম্পাসের বৃত্তের সব দিকে ছড়িয়ে গেছে, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ধরে, একটা লম্বা সমুদ্রের সবটা জুড়ে সার্ডিন ধরার সারগাসুমের[12] একটা অতিকায় জালের মত। অথবা, উল্টে পড়া বয়াম থেকে গড়িয়ে পড়া ঝোলাগুড়ের মত।      

একজন লোকের মনে হতেই পারে যে বিশাল শহরটা নড়াচড়া করছে, মন্থর (কিন্তু অনিবার্য) সম্প্রসারণের ফলে। বলাই বাহুল্য যে একটা দ্বীপে সম্প্রসারণের সম্ভাবনাগুলো খুবই সীমিত আর, পুবে, সুমিদা ও হারা নদীদুটো তকিও উপসাগরে গিয়ে পড়ে সমুদ্রের দেখা পাচ্ছে। কিন্তু এই শক্তিশালী নিসর্গশোভাকে  সেইসব অতিথিদের কলকোলাহলে পূর্ণ সর্বত্রবিদ্যমানতা ছেঁকে নেয় যারা প্লেনে করে এক দেশ থেকে আরেক দেশে উড়ে যাওয়া পছন্দ করে – কিন্তু মুখ বদলানোটা যাদের নাপসন্দ। অন্তত উপবাসভঙ্গের সময়ে তো কখনই নয়। বিষয়টা খুবই আশ্চর্যের: যে লোকগুলো নিজেদের দেশে বুক ফুলিয়ে জাপানি রেস্টুরেন্টে যায় সুশি আর সাশিমি খাবার জন্যে, এখন সশরীরে জাপানে এসে তারা যেন পিছু হঠে যায়। ব্যাখ্যাটা, তিরিয়েজ়ার কাছে, বলাই বাহুল্য, বেশ সহজসরল: একটা ছোট্ট পরিবর্তন স্বাগত, কিন্তু একসঙ্গে অনেকগুলো পরিবর্তন অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিতে এটাকে বলে একটা “সংস্কার” আর একটা “বিপ্লব”-এর মধ্যে পার্থক্য। “প্রয়োজনীয় সংস্কার”-এর পক্ষে থাকলে ভোট আসে, একটা “বিপ্লব”-কে সমর্থন করলে তারাও ঘাবড়ে যাবে যারা বলে থাকে “এটাতে একটা বড়সড় পরিবর্তন আনতেই হবে”।      

যাই হোক, হয়ত বিকেলের দিকে, একটা মন্দির থেকে ঘুরে এসে, একটা জাদুঘর দেখার পরে, একটা কিমোনো, একটা ইউকাতা বা সৌভাগ্যদায়ী বেড়াল মানেকিনেকো কেনার পরে, ওই তথাকথিত ট্যুরিস্টরা এদেশীয় জিনিশ আর স্থানীয় খাবার চেখে দেখার সাহসটা জোগাড় করে ফেলতে পারবে।    

œ

– আপনি এখন ফ্রি, তানো। আমাকে কিছু কাগজপত্র দেখতে হবে। আমরা ঠিক চারটের সময়ে এখানে দেখা করব, ঠিক আছে?     

তানো আর কি বলতে পারে?

– ঠিক আছে, তিরিয়েজ়া-সান।

– ভেরি টিপিকাল ব্যাপারটা বাদ দিন তো, তানো। তিরিয়েজ়া চলবে। এই ফাঁকে বিশ্রাম নিয়ে নিন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে সারাটা রাস্তা আপনি চোখের পাতা এক করেননি।   

সাবটেক্সট: আমি করেছি। আমি খুব নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি আর এখন আমি লেটুসের মত তাজা। 

যদি না, বলাই বাহুল্য, তিরিয়েজ়া মিথ্যে বলে থাকে। মহিলারা, তানোর অভিজ্ঞতায়, এরকম করেই থাকে।  

পুরুষেরাও ডিটো, কিন্তু এদের নিয়ে তানোর কোন সমস্যা নেই।

এক বছর আগে

ঠিক কি কারণে বির্নার্দু নিজের জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছিল?

সেটা কি রাতটার জন্যে? শস্তার হোটেলটার পাশেই ভিনদেশিদের জঘন্য আর কুৎসিত একটা বার। অ্যাফ্রিকান দারোয়ানটা, প্রকাণ্ড শক্তিধর একটা দৈত্য হাসিমুখে ডেকে চলেছে, “গার্লস, ম্যান, ফ্রি ড্রিঙ্কস, ম্যান”।       

নাকি দিনটার জন্যে? হাইওয়ে, অনেক অনেক হাইওয়ে। হাইওয়ের ওপরে হাইওয়ে, সব কিরকম চ্যাটচেটে জড়িয়েমড়িয়ে রয়েছে, একটা বালতিতে ঈলমাছেদের মত। অশ্লীল যোনির মত, ভেতরে মানুষ নিয়ে রোবোর মত ফোঁপরা ইমারতগুলোর ভেতর দিয়ে হাইওয়ে চলে যাচ্ছে। খেলনার শহর, প্রাপ্তবয়স্কদের ডিজ়নিল্যান্ড। শহরটা খেলনার শহর খেলনার শহর খেলতে থাকা খেলনার শহর খেলনার শহর খেলছে। খেলনার ঘুরন্ত ও অ্যান্ড্রয়েড সব প্ল্যাটফর্ম সহ খেলনার পার্কিং লট, যেগুলো খেলনার গাড়িটাকে ধরে – ঠিক যেমন ওই খেলাগুলোতে একটা ক্রেন দিয়ে তুলে সফট টয় জেতা যায় – ওপরে তুলে অন্য সব সত্যিকারের গাড়ির পাশে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, অন্য সেইসব সত্যিকারের গাড়ি যেগুলো খেলনার গাড়ি খেলনার গাড়ি খেলছে।     

রাতটাই কি বির্নার্দু যেটা করেছিল ওকে দিয়ে সেইটা করিয়ে নিয়েছিল? রেস্টুরেন্টগুলোতে বিশাল বিশাল সানতোলা[13], নিওন আলোতে মোড়া তাদের বিশাল দাঁড়াগুলো নাড়াচ্ছে। হাসি আর হাসি। থিম দিয়ে সাজানো সব বার। মাতাল আর খুশি পণ্যজীবীরা। পঞ্চাশের দশকের “কিচ”[14] স্টাইলে থিম দিয়ে সাজানো বারে ভ্যাম্পায়ার নার্স, নকল রক্তের মত ব্ল্যাকবেরি জ্যুস তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়াচ্ছে আর সে তাকে বলছে রঙিন মেনু থেকে একটা পানীয় বেছে নিতে, নকল রক্তের মত কোন ফলের রস ইংরিজিতে যেগুলোর নাম – ভ্যাম্পায়ার বেবি ব্লাড আর বডি পার্টিজ় লাভ (নো অ্যালকোহল)। একটা পান্ডা-ঝোলা নিয়ে কৈশোরের উপান্তে এক মেয়ে আরেকজন কিশোরীর সঙ্গে হাসাহাসি করছে, এই কিশোরীর মোবাইলটা আবার প্লেবয় দুনিয়ার গোলাপী খরগোশনীদের গোলাপী-খরগোশ রঙে মোড়া।      

তাহলে কি দিনটাই দায়ী ছিল? এক কথায়, একটা মন্দির। মন্দিরের ভেতরে মন্দিরসুলভ শান্তি। মূর্তি আর শ্যাওলা। মন্দিরের শান্তি ভেঙে খানখান হয়ে গেল যখন বিশাল সিলিন্ডারের একটা মোটরসাইকেল করে একজন ভিক্ষু এলেন। কাওয়াসাকি, বা হয়ত ইয়ামাহা, বা হয়ত হোন্ডাই। ভিক্ষু ফেসশিল্ড লাগানো হেলমেটটা টেনে খুলে ফেললেন। ভিক্ষুটি নবীন, পরণে কমলা জোব্বা, পায়ে শাদা মোজার সঙ্গে স্যান্ডেল, কিন্তু মণিবন্ধে একটা ব্র্যান্ডেড ঘড়ি। (এ কথা সত্যি, ওই লোকগুলো মনে হয় সবকিছুরই নকল পছন্দ করে কেবল যেখানে সেগুলোর কোন গুরুত্বই নেই সেখানে ছাড়া: ব্র্যান্ডগুলোকে সত্যিকারের হতে হবে, এইটাই হল খেলা।) ভিক্ষু তাঁর বিশাল হন্ডা থেকে নামলেন, অন্যমনস্ক ভাবে বির্নার্দুর দিকে তাকালেন – কোনোরকম সহানুভূতি বা একাত্মতা বা আগ্রহ ছাড়াই – তারপর পাশের একটা দরজা দিয়ে ঢুকে গেলেন, যেন তাঁর কিছুই আসে যায় না। এটাই কি, ভিক্ষু হয়েও সে ব্যাপারে যার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই এমন একজন ভিক্ষুকে দেখেই কি তার ক্রাইসিসটা শুরু হয়েছিল?     

নাকি ওই তৃতীয় রাতটার জন্যে? কাবুকিচোও[15]। অসহ্য একটা দৃশ্য। অসংযমে ভরা যত লাভ ওতেরু, তাদের ঢোকার মুখে প্রেম করার জন্যে সবচেয়ে উদ্ভট সব বিছানার ছবি লাগানো। বিভিন্নরকম ভাড়া, “বিশ্রাম” (দু’ঘণ্টা) বা “সারারাত”-এর (ছ’ঘণ্টা) জন্যে। বাস্তববুদ্ধিওয়ালা প্রেমিকপ্রেমিকা, বাস্তবসম্মত গোপনীয়তা বাস্তবসম্মত একটা শহরে। সবকিছুর বাজার। সবচেয়ে নিশাচর নেটচারীদের জন্যে ইন্টারনেট ক্লাব সব। সবকিছুর দালালেরা খদ্দেরদের ডাকছে। বির্নার্দুকে খুব একটা কেউ ফুসলানোর চেষ্টা করছে না, এমনকি বেশির ভাগ সময়েই সবাই ওকে সাড়ম্বরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। একমাত্র যেখানে বিদেশিই লক্ষ্য সেখানে ছাড়া। তকিও তো আর ব্যাঙ্কক নয়। যেখানে শেষ পর্যন্ত কোনদিনই কোন কাবুকি থিয়েটার গড়ে ওঠেনি – আইরনির কথাই যদি হয় – সেই কাবুকিপাড়াই কিন্তু আমোদপ্রমোদের পাড়ার বিষণ্ণ সব ডিস্কোর বিষণ্ণ রাতের নিরেস একটা নকলের মত বলতে গেলে। আর বির্নার্দু শুধুই বিরস বোধ করছিল। ওর তাইল্যান্ডের বাজে স্মৃতিগুলো ছিল অবশ্যই। ওখানে মাঝবয়েসি পেডোফিলগুলোকে উত্যক্ত করার বদলে ওরা ওকে ভেতরে নিয়ে গিয়েছিল – ব্যাপারটা প্রায় হাস্যকর ছিল – ঘৃণ্য একটা অপরাধে অভিযুক্ত করে: একটা ধর্ষণ যেটা অত্যাচার পর্যন্ত গড়িয়ে শেষ হয়েছিল মৃত্যুতে। ওখানেই বির্নার্দু শিখেছিল, অনেক মূল্যের বিনিময়ে, যে খাঁটি সারল্যের চেয়ে আর কোন কিছুকে এত নোংরা ও দোষী দেখায় না।     

œ

তার ওপর আবার বির্নার্দুর নিজের ব্যাপারেই খুব খারাপ কতগুলো স্মৃতি ছিল। সেটাই কি কারণ? এত কমবয়েসের একজন, যার এত সুযোগসুবিধে আছে, তার কি করে এতগুলো খারাপ স্মৃতি থাকতে পারে?   

যদি কেউ ভাল করে ভেবে দেখে তাহলে এই সিদ্ধান্তে পৌছনোটা কঠিন হবে না যে এতটা খারাপ স্মৃতি কেবল দুধরণের এতখানি কমবয়েসের কমবয়েসিদের থাকতে পারে: রাস্তার ছেলেপুলে (দুঃখদুর্দশার সন্তানসন্ততি), কিংবা বড়লোকদের ছেলেপুলে (মায়ের কোলের ছেলে)।   

মায়ের কোলের ছেলে? এটাই কি কারণ, এটাই কি সবচেয়ে বড় কারণ, যেটার জন্যে বির্নার্দু, বাইশ বছর বয়েসে, সেটাই করেছিল যেটা কেউ কেউ ষোলতে চেষ্টা করে আর, তারপর, তাদের ক্রাইসিসটা কেটে যায়? মায়ের কোলের ছেলে। এর চেয়ে অব্যর্থ সংজ্ঞা আর কি হতে পারে? আর কোন সংজ্ঞা এতটা অব্যর্থ হতে পারে কি? অব্যর্থ সংজ্ঞা আর কিছু কি হতে পারে? এর চেয়ে অব্যর্থ কেবল কিয়ুদোওর একজন তিরন্দাজই হতে পারে, ওই যেসব তিরন্দাজ লক্ষ্যভেদ করে তাক না করেও, কেবল চোখ বুজে, শান্তভাবে শ্বাস নিয়ে ছোঁড়ার আগেই তিরটাকে লক্ষ্য খুঁজে নিতে দিয়ে। মায়ের কোলের ছেলে। যার মা আছে তার সব আছে। যার মা আছে তার কিচ্ছু নেই।            

হারাজুকু[16]। মেয়েরা কসপ্লে[17] করে বেড়াচ্ছে, ঠিক যেন সারা শরীর দিয়ে কুরুশ বুনছে: যৌন আবেদনে ভরা পোষাক দিয়ে কৈশোরটাকে ঢাকা দিচ্ছে। আর জিরাফ-ট্যুরিস্টগুলো জিরাফপনা করছে, গদগদ হয়ে, ওদের ওপরে চড়ে ছবি তুলছে, ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাশ, ফ্লেশ ফ্লেশ ফ্লেশ ফ্লেশ। 

কি ঘেন্না!


[1]অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জি জানালেন এর অর্থ “বেশি সাহস দেখাতে বারণ করা”।

[2]১৯৭৮ সালে নারিতা বিমানবন্দর তৈরি হওয়া অবধি হানেদা বিমানবন্দরই ছিল তকিওর একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এই উপন্যাস ২০১১ সালের, কাহিনী অনুযায়ী তিরিশ বছরেরও আগে তানো দেশ ছেড়েছে, অর্থাৎ ৭৮ সালের কিছু আগে বা পরে।

[3]Yoko tobi geri – সাইডকিক।

[4]Gaijin – বিদেশি।

[5]Kumite – আক্ষরিক অর্থে “হাত আঁকড়ানো”, কারাতে প্রশিক্ষণের তিনটে প্রধান বিভাগের অন্যতম, যাতে একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে ট্রেনিংটা দেওয়া হয়।    

[6]মেরুভল্লুক পর্ব ৪, টীকা ৩ দ্রঃ।  

[7]রুই নিজেই নিজের লেখা উল্লেখ করছেন; তাঁর প্রথম (প্রকাশিত) উপন্যাস অতেল লুজ়িতানু-তে (১৯৮৬)তিনি লিখেছিলেন “মুখে বকলস দিয়ে আঁটা মুখোশ”।  

[8]ভীড়ের সময়ে তকিওর মেট্রোতে এটা সত্যিই ঘটে থাকে, usher বা ভীড় সামলানোর জন্যে নিযুক্ত কর্মচারীরা যাত্রীদের ঠেলে কামরার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়।    

[9]রুই যথারীতি একটা প্রবচনকে বেঁকিয়েচুরিয়ে ব্যবহার করছেন। মূল প্রবচনটা হল – Diz-me com quem andas, dir-te-ei quem és, অর্থাৎ মানুষের সঙ্গ দিয়েই তার চরিত্র বোঝা যায়।  

[10]এই হোটেল এবং বাগান সত্যিই আছে, রুই নিজে সেখানে একাধিক বার থেকেছেন এবং একতলায় বাগানের ধারের এই নির্জন রেস্টুরেন্টে বহুবার খেয়েওছেন; প্রতিবারই তাঁকে ওই রেস্টুরেন্টে ঢুকতে নিরস্ত করার চেষ্টা হয়েছে ওপর থেকে দৃশ্যটা অনেক বেশি ভাল, ফুজি ইয়ামা দেখতে পাওয়া যায়, এই বলে।    

[11]Tamagoyaki – আক্ষরিক অর্থে “গ্রিল করা ডিম”, একে তামাগো বা দেশিমাকিও বলা হয়ে থকে। এটা একধরণের জাপানি অমলেট যাতে অনেকগুলো স্তরে ডিমভাজা রেখে সেটাকে গুটিয়ে পরিবেশন করা হয়।   

[12]Sargaço বা Sargassum এক ধরণের খয়েরি বা গাঢ় সবুজ রঙের সামুদ্রিক উদ্ভিদ যা বিশ্বের সব নাতিশীতোষ্ণ ও ক্রান্তীয় মহাসাগরে পাওয়া যায়, যেখানে এরা অগভীর জলে এবং প্রবাল প্রাচীরে বাস করে। অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের সারগাসো সমুদ্রের নামকরণ এই শৈবালের কারণেই হয়েছে। এই শৈবাল সাধারণত বেশ কয়েক মিটার লম্বা হতে পারে। সমুদ্রের মধ্যে এই জট-পাকানো শৈবালের মধ্যে নানান সামুদ্রিক প্রাণী বাস করে, তার মধ্যে বিভিন্ন রকমের ঈল ও সজারুমাছও পড়ে।    

[13]Japanese spider crab (Macrocheira kaempferi) এক ধরণের সামুদ্রিক কাঁকড়া যার বাস জাপানের আশেপাশে সমুদ্রে। এর দাঁড়া প্রায় চার মিটার বা বারো ফুট অবধি লম্বা হতে পারে আর এর ওজন ১৯ কিলোগ্রাম মত হয়ে থাকে।    

[14]Kitsch বলতে সাধারণত এমন সব আর্ট বা ডিজ়াইনকে বোঝায় যেগুলোকে নকল করার অতিমাত্রায় সরল, যুক্তিহীন ও মামুলি প্রচেষ্টা বলে মনে করা হয়। বিশ শতকের প্রথমার্ধে কিচ বলতে পপ-কালচারের সৃষ্টিগুলোকে বোঝাত যেগুলোর মধ্যে চারুকলার গভীরতা পাওয়া যেত না। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে পপ আর্টের আবির্ভাব ঘটার পরে কিচ-কে কখন কখন কদর করা হয়ে থাকে।  

[15]কাবুকিচোও তকিওর শিনজুকু্তে একটা আমোদপ্রমোদের আর লালবাতি এলাকা। এই এলাকায় অনেক “লাভ হোটেল”, নৈশ ক্লাব, রেস্টুরেন্ট ও দোকানপাট আছে এবং সেই কারণে একে বলা হয় “যে শহর ঘুমায় না”। এলাকার নামকরণ হয়েছিল চল্লিশের দশকে এখানে একটা কাবুকি থিয়েটার তৈরি করার পরিকল্পনার কারণে; থিয়েটারটা শেষ পর্যন্ত তৈরি হয়নি কিন্তু নামটা রয়ে গেছে।    

[16]Harajuku তকিওর শিবুয়াতে হারাজুকু স্টেশান থেকে ওমোতেসানদোও অবধি বিস্তৃত একটা এলাকা। আন্তর্জাতিক স্তরে হারাজুকু সংস্কৃতি ও অল্পবয়েসিদের ফ্যাশান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে অল্পবয়েসিদের জন্যে অনেক ছোট ছোট বুটিক ও ক্যাফে আছে, আবার ওমোতেসানদো (মেইজি মন্দিরে ঢোকার মুখ থেকে আরম্ভ করে আওয়ামা-দোওরি অবধি চলে যাওয়া জাপানি এলম গাছের সারি দেওয়া একটা অ্যাভেন্যিউ যার পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসা ছোট ছোট গলিগুলো দিয়ে হারাজুকু তৈরি) ধরে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের বড় বড় চেনও আছে। হারাজুকু অঞ্চল দেশি-বিদেশি ট্যুরিস্টদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।   

[17]Cosplay – “costume play” থেকে আসা এই শব্দ এমন একটা পার্ফর্ম্যান্স আর্ট বোঝায় যাতে এতে অংশগ্রহণকারীরা, যাদের কসপ্লেয়ার বলা হয়, বিশেষ কোন চরিত্রের মত সাজপোষাক করে। কসপ্লের জনপ্রিয় উৎস হল আনিমে, কার্টুন, কমিক্সের বই, মাঙ্গা, টিভি সিরিজ় আর ভিডিও গেমস।     

ঋতা রায়
  ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।     

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.