মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (চতুর্থ পর্ব)

বাংলা English
Rui Zink
 Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.  
Cover Page of O amante e sempre o ultimo a saber


মেরুভল্লুকের প্রেম

দেড় শতক দেরিতে

এনার্জি বয়ে চলেছে, কি, ওই এনার্জি। প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তি – সেটাই আমাদের শক্তি। প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তি ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধেই ঘুরে দাঁড়ানো। তার নেতিবাচক এনার্জিটাকে আমাদের সদর্থক এনার্জিতে পরিণত করা। স্পিরিট বা উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলা। সামুরাইয়ের পথটা হয়ত মৃত্যুর, কিন্তু সেটা শান্তিরও বটে। দোও হল পথ। কারা-তে মানে শূন্য-হাত। কারাতে দোও মানে শূন্য হাতের পথ। এছাড়া আছে কেনদোও, ই-য়াই-দোও[1], জু-দোও, আইকি-দোও[2]…   

œ

এসবই স্পিরিটের[3] পথ যেগুলোর প্রকাশ ঘটে শরীরের আকৃতিতে। শরীরটা যদি হাতিয়ার হয়, তাহলে আত্মাই হল সত্যিকারের অভীষ্ট। শরীর? কলম, তুলি, থামের ভিত্তি, কাণ্ড ও শীর্ষ। যিনি সত্যিই দক্ষ তিনি আত্মার সঙ্গে লড়াইটা করেন, শরীরের সঙ্গে নয়। সুন সু[4]: যুদ্ধটা শুরু হওয়ার আগেই সেটাকে জিতে নিতে হবে। ব্লাফিঙের[5] সঙ্গে সেটাকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। এনার্জি বইতে থাকে, এনার্জি।

œ

জোও দো[6]। উদ্দেশ্য হল হারমোনি বা সঙ্গতি। যন্ত্র? অসঙ্গতি। পথটাকে যে সোজা হতেই হবে তার কোন মানে নেই, বরং সোজা না হওয়াতেই বোধহয় তার লাভ। শরীরটা সসীম, মন বা আত্মা তা নয়। শরীরটা মনের জন্যে ঠিক সেইরকম যেমন দেবতাদের জন্যে উপাসনার জায়গা। অতীন্দ্রিয় সত্যের শারীরিক প্রকাশ। কিন্তু শুধুই তা-ই নয়। শরীর মনের আবাসও বটে, আমাদের পরিপূর্ণতা অর্জন করার একমাত্র উপায় বলেই শরীর গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাস নেওয়াটা অপরিহার্য। শ্বাস নিতে জানাটা।            

œ

         এইজন্যেই জ়াজ়েনের[7] অবস্থানটা এত গুরুত্বপূর্ণ। বসে থাকতে জানাটা, সঠিক ভঙ্গীতে, সহজ, শিথিল, কাঁধদুটো প্রশান্ত, মাথাটা শূন্য। রান্না করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের সব স্বাভাবিক ক্রিয়াই সমান গুরুত্বপূর্ণ, কেউ কারুর থেকে বেশী বা কম নয়। যেখানে এনার্জিটা থাকে, সেই তলপেট নাড়িভুঁড়ির বাড়িও বটে, যেখান থেকে সব বর্জ্য বেরয়। সবেরই মূল্য আছে, কিছুরই কোন মূল্য নেই। কোন কিছুরই কোন কিছুর থেকে বেশি মূল্য নেই। বস্তুরাই হল বস্তুদের একমাত্র গোপন অর্থ[8]।     

œ

আমি খুঁজি না, খুঁজে পাই – বুদ্ধ বলেছিলেন। আর তারপর বলেছিলেন: একজন গরীবকে ছিপ দিও না, তাকে মাছ ধরতে শেখাও। তাতে শিষ্য প্রশ্ন করেছিল: হ্যাঁ, কিন্তু যতদিন ওই গরীব লোকটা মাছধরার কোর্সটা করছে, আমরা কি তাকে খিদেয় মরে যেতে দেব? সেটা শুনে বুদ্ধ চুপ করে গিয়েছিলেন। আর শিষ্য বলে চলল: না খোঁজার অর্থ কি তবে থেমে থাকা? জ়াজ়েনের ভঙ্গীতে? তার উত্তরে বুদ্ধ বললেন: আজকাল পুরো যাত্রাটাই বসে থেকে হয়, দাঁড়ানো অবস্থায় আর নয়, আমাদের নিজেদের পা দিয়ে আর সেটা হয় না। দোওজোওতে ছাড়া, যেখানে আমরা খালি পায়ে থাকি। খালি পা, অসূয়া রহিত আত্মা। দোজোওর পাঁচটি নীতি: আদবকায়দা, আত্মা, চরিত্র, আন্তরিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ।

• জিনকাকু কানসেই নি ৎসুতোমুরো কোতো [চরিত্র]

• মাকোতো নো মিচি উয়ো মামোরু কোতো [আন্তরিকতা]

• দোরইয়োকু নো সেইশিন ও ইয়াশিনাউ কোতো [আত্মা]

• রেইগুই ও ওমোনজ়ুরু কোতো [আদবকায়দা]

• কেক্কি নো ইয়ু ও ইমাশিমুরু কোতো [আত্মনিয়ন্ত্রণ]

সুন্দর সুন্দর সব কথা। তাদেরই সন্ধানে – বা বলা যেতে পারে অন্য একটা কিছুতে তাদের রূপান্তরের সন্ধানে – বির্নার্দু তকিওর উদ্দেশে ফ্লাইট নাম্বার ১৬০-এ চড়েছিল।     

সে উৎসমুখে যাচ্ছিল। বেচারা বির্নার্দু। সে, হয়ত, উৎসমুখে যাচ্ছিল। কিন্তু তার যেতে দেড়শ বছর দেরি হয়ে গিয়েছিল।

উৎসমুখে যাওয়া

বাকি সফরটা কি এভাবেই চলবে? ওই অসহ্য মহিলা সামনে সামনে চলবে আর ও তার পেছন পেছন?  

মহিলা যখন এক্সিকিউটিভ ক্লাসে মজা করছে, লোকেরা এক্সিকিউটিভ ক্লাসে যা করে তা-ই করতে করতে, তানো আইল আর জানলার মাঝখানে, ৩৭ ডি সিটে, বিশালাকার এক বয়স্ক জার্মান দম্পতির মধ্যিখানে নট নড়নচড়ন হয়ে বসে আছে, তারা যেন ওর অনিচ্ছুক পাহারাদার হিসেবে যুদ্ধ বা ওরকম একটা কিছু থেকে ওকে গায়ের জোরে বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের সফরটাও খুব একটা সুখের বলে মনে হচ্ছে না: তারা হয়ত নিজেদের পেশাদার ছেলেকে দেখতে তকিও যাচ্ছে, এমনকি কোন জাপানি মেয়ের সঙ্গে তার বিয়েতেও হতে পারে, যার সঙ্গে তার চেনাশোনা হয়েছিল, ধরে নেওয়া যেতে পারে ব্যার্লিনে, কলেজে পড়ার সময়ে। তানো ওদের নিজের সিটটা ছেড়ে দিতে চেয়েছিল, যাতে ওরা পাশাপাশি বসতে পারে। তাতে ওই দম্পতি এমন করে ওর দিকে তাকিয়েছিল যেন ও মানসিক বাতুলতার একটা শোচনীয় অতল গহ্বর। ওদের চাহনিটা, সুস্পষ্ট ভাবে, বলেছিল, এই জাপানিটা জানে না নৌকোটা জলে ভাসিয়ে রাখাটা কতখানি ক্লান্তিকর ছিল, ছেলেপুলেদের জন্যে আত্মত্যাগ করতে করতে, শেষ পর্যন্ত, সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়ে, তাদের বয়েসও চলে গেছে আর তারা সাহসও হারিয়ে ফেলেছে স্থগিত রাখা ওই মৃতদেহটাকে শেষ করে দেওয়ার[9]। এখন, যন্ত্রণাদায়ক ভাবে একসঙ্গে থাকতে বাধ্য, তারা অন্তত ঘণ্টা তেরোর জন্যে একে অন্যের কাছ থেকে তাদের কষ্টার্জিত ছুটিটা পাবে।          

আপনার তো অবশ্যই খুশি হওয়া উচিত, তানো, বাড়ি ফিরছেন বলে।

তার কি সত্যিই খুশি হওয়া উচিত? যেটা অবশ্যই তার করা উচিত সেটা হল বাথরুমে গিয়ে একটা সিগারেট খাওয়া। আগুনের ফুলকি শনাক্ত করার অ্যালার্মটাকে পরীক্ষা করা। কিংবা সেটা না করাই বরং ভাল, ওকে আবার বিপজ্জনক ট্যুরিস্ট সন্দেহে গ্রেপ্তারও করতে পারে। প্লেনটা তো চলেছে তাদের দিয়েই ভর্তি হয়ে, ট্যুরিস্ট বা টেররিস্ট – কাগজ পড়ে যা মনে হয় কেবল এই দু’ধরণের লোকেরাই যাতায়াত করে – সাইবেরীয় রাতে স্বপ্নচারণ করতে করতে।  

ক্যাবিনের আলোগুলো নেভানো। স্ক্রিনগুলোতে একটা নির্বাক সিনেমা, অন্তত যাদের হেডফোনগুলো লাগানো নেই। এটা কোন সিনেমা হতে পারে? একটা অ্যাকশান ফিল্ম বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু একটা সিটকমও হতে পারে। কি হচ্ছে সেটা বোঝানোর জন্যে কোনোরকম স্বর ছাড়া, পরিবেশটার (কমিক/ভয়ের/রোম্যান্টিক) ওপরে জোর দেওয়ার জন্যে কোন আওয়াজ নেই, ছবিগুলোকে কিরকম যেন উদ্দেশ্যবিহীন বলে মনে হচ্ছে, ওগুলোর মধ্যে কোন সংলগ্নতা নেই, কোন মানে নেই।        

প্রবাদগুলো সর্বদাই ভুলভাল। একটা ছবি যে হাজারটা কথার সমান হতে পারে, এটা আর যা-ই হোক স্বতঃসিদ্ধ নয়। সত্যিটা? অনেক বেশি কাঠখোট্টা: কোন কথা ছাড়া, সাউন্ডট্র্যাক ছাড়া একটা ছবি হল… কেবল একটা ছবিই। একটা ছবি হাজারটা কথার সমান? সেটা নির্ভর করে, জীবনের বাকি সবকিছুর মতই, কথাগুলোর ওপরে, ছবিটার ওপরে। দেখার ক্রিয়াটা বড় বেশি স্ফীত একটা মুদ্রা, একটা সর্বদাই ফাটো-ফাটো বুদ্বুদ, যেটা ফেটে গিয়ে নিজেকে অকিঞ্চিৎকর বলে প্রকাশ করতে চলেছে। এটাই ছবির সওদাগরেরা চায় না যে জনসাধারণ জেনে যাক।   

ক্রমানুসারে চলা ছবিগুলো, সুতরাং, একটা শূন্য, বিচ্ছিন্ন ছবির চেয়েও খারাপ। মনুষ্যত্বের একটা করুণ রূপক; চোখ বেঁধে কানামাছি খেলতে খেলতে ধাক্কা খাওয়া মনুষ্যত্ব, মেলায় টক্কর খাওয়ার খেলার গাড়িগুলোতে পরিণত হওয়া মনুষ্যত্ব, অনুকম্পার যোগ্য, অর্থ বিরহিত, নির্বাক চলচ্চিত্রে পরিণত যাতে এমনকি উপভোগ্য করে তোলার জন্যে ক্যানবন্দী কোনোরকম হাসির হররাও নেই।      

œ

তোমাদের উৎসমুখে যেতে হবে। জীবনে অন্তত একবার আমাদের উৎসে গিয়ে পান করতে হবে।

ওর মাথায় কি ঘুরছিল যখন ও এই কথাটা বলেছিল?

œ

তোমাদের উৎসমুখে যেতে হবে। জীবনে অন্তত একবার আমাদের উৎসে গিয়ে পান করতে হবে। সেটা যদি আমাদের বিষিয়ে দেয়, তা-ও। জীবনটা তো কেবল প্রতিষেধক নয়, বিষও বটে। এটাই ফুগুর[10] শিক্ষা।    

œ

যা-ই হোক, এইভাবে বললে সুন্দরও লাগে বটে। কিন্তু সেটা কথা দিয়ে তৈরি একটা ছবি। একটা সুন্দর উডব্লক প্রিন্ট, হোকুসাইগুলোর[11] মত, ফুজিপর্বতের একটা স্টাইলাইজ়ড দৃশ্য, বা এমনকি বিখ্যাত ওই ঢেউটারও[12], সেই স্টাইলাইজ়ড ঢেউটা – “পেশকাদা[13] মাছগুলোর মত ল্যাজটা মুখে পুরে”, কুর্তুর কথামত।    

শুনতে ভাল লাগে। সুন্দর মনে হয়। মানেটাই কেবল – মানেটাই কেবল নেই, কোন মানেই নেই। দুঃখের হলেও এটাই সত্যি। এর কোন মানেই দাঁড়ায় না।   

œ

তাহলে শুরু করতে হয় ফুগু দিয়ে। বেলুন মাছ। এইভাবে বললে অ্যানিমেটেড ফিল্মের নরম তুলতুলে, ফুলোফুলো কোন পুতুলের নাম মনে হবে: বেলুন মাছ ফুগুর অ্যাডভেঞ্চার আর তার পোষা ও ট্রেন করা টক্সিন। (এই আইডিয়াটা চুপচাপ গোপন রাখাই ভাল, নইলে কেউ আবার এটাকে চুরি করে বড়লোক হবার চেষ্টা করবে।)    

এবার ফুগুর টক্সিনটা কিন্তু ট্রেনিং পাওয়া ছাড়া আর সবকিছুই হতে পারে, মাননীয় গুরুমশাই। বেলুন মাছ ফুগু এমন একটা টক্সিন ছাড়ে যেটা একজন রাষ্ট্রপতি ও তাঁর অগুনতি পারিষদবর্গকে মেরে ফেলার শক্তি ধরে। তাসত্ত্বেও, বা সেইজন্যেই, মরার আগে ও পরে একজন দক্ষ হত্যাকারী হওয়া ছাড়াও ফুগু অতি উপাদেয় একটা সুখাদ্যও বটে। মুখের জন্যে মাছ মরে[14]? বেশ, তাহলে মাছটাকে যে খায় সে-ও মুখের জন্যেই মরে। অবশ্য পাকশালের সুদক্ষ ও জ্ঞানী প্রভু যদি ওই পৈশাচিক মাছটাকে কাটেন তবে সবই ঠিকঠাক থাকবে।      

(হয়ত।)  

ফুগু, বেলুন মাছ।

আর ওই উৎসমুখে যাওয়া-র গল্পটা কি? কবে থেকে উৎসমুখে যাওয়াটা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? একটা প্রবাদ ছিল না, খুব ভুল না হয়ে থাকলে সেটাও পোর্তুগিজ়, যেটা বলতে গেলে উল্টো কথাটাই বলে: কলসি এতবার ঝর্ণায় যায় যে[15] 

œ

বেচারা ছেলেটা। বেচারা বির্নার্দু। তকিওতে কি এমন হয়েছিল যাতে ও ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল?

এমন কোন ছবি (ভয়ানক, মনোমোহিনী, আজগুবি) ওর আত্মাটাকে গ্রাস করে ফেলেছিল?   

একজন জাল গুরু? তার জন্যে তো ওর এগারো হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেবার দরকার ছিল না, সে তো ও লিশবোয়াতেই হাতের গোড়ায় পেতে পারত। যেমন, এমন একজন যে ওকে গাম্বুজ়়িনু[16] শিকার করতে পাঠিয়েছিল। উৎসমুখে যেতে হবে  

তকিওতে বেচারা বির্নার্দুকে এমন কিসে ধরেছিল যেটা ওকে মাটির আরও গভীরে টেনে নামিয়ে দিয়েছিল? কি ওকে একেবারে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলেছিল?   

তানো যদি খ্রিস্টান হত তো ওর কাছে হয়ত এর একটা উত্তর থাকত: জাল সব ভবিষ্যদ্বক্তা, মন্দিরের সব ফেরিওয়ালা, যোগ্যতাসম্পন্ন বুজরুকের দল, এরাই ছিল সেই তারা।    

যিনি নিজে খুবই শিষ্ট ও ভদ্র, সেই কুরোজ়াওয়া সেনসেইয়ের দোওজোওটাই তো চলে স্রেফ ট্যুরিস্টদের দয়াতে। “স্পিরিট”-এর খোঁজে আসা বিদেশীরা। এমনকি স্পিরিটও হয়ত আছে, তানো এতে বিশ্বাসও করতে রাজি আছে – কিন্তু সেটা ভীষণভাবে জলে গোলা একটা ব্যাপার।   

জাপানের সঙ্গে ঠিক কি ঘটেছিল? কয়েকটা ব্যাপার ঘটেছিল। বিশ শতক ঘটেছিল। হিরোশিমা আর নাগাসাকি ঘটেছিল। তার অর্থনীতিতে অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটেছিল। তার সঙ্গে বাজারের খেলাটা ঘটেছিল। তকিও এখন আর কোন দোজো নয়, সেটা একটা সুবৃহৎ রাজধানী। সেখানে এখন কেনদোও, জুদোও বা কিউদোওর[17] অনুগামীর চেয়ে বেসবল বা জ্যাজ়ের ফ্যান খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ। ছেলেটা কি খবর দেখত না? কবে শেষ একজন জাপানি স্পোর্টসে পরিণত হওয়া এই মার্শাল আর্টসগুলোর কোন একটার গুরুত্বপূর্ণ কোন প্রতিযোগিতায় জিতেছে? এমনকি জিউ জিৎসুও – শেষবার সেটার ঐতিহ্যগত রূপটা সামনাসামনি দেখা গেছে ব্রেজ়িলের সমুদ্রতীরগুলোতে। তকিওর অ্যারিনায়, বড় বড় লড়াইয়ের তারকারা প্রায় সবসময়েই বিদেশিরা হয়ে থাকে। এমনকি স্মো[18]-ও, তার সুতোর মত নেঙটি পরা দৈত্যদের নিয়ে, মাটিতে ছড়িয়ে রাখা মুঠো মুঠো নুন নিয়ে, রেফারির পাখা নেড়ে লড়াই শুরু করার সঙ্কেত নিয়ে, এখন আর আগেকার মত নেই। জাপানের জন্যে বুলগেরীয় স্মোতোরিরা ঘটে গেছে, অবৈধ বাজি ধরা ঘটে গেছে, লাস ভেগাসের মেজাজটা ঘটে গেছে।           

œ

তানো তাও একটা শেষ চেষ্টা করেছিল, এয়ারপোর্টে পৌঁছনোর পরেও, ব্যাপারটা থেকে বেরিয়ে আসার। পেছনে রয়ে যাবার। সত্যি বলতে কি, ও সঙ্গে গেলে মহিলার বিশেষ কি সুবিধে হতে পারে?   

জানেন, ম্যাডাম?

হ্যাঁ, তানো?

আমার এখনও মনে হচ্ছে যে আমি ঠিক উপযুক্ত লোক নই।  

বোকা বোকা। আপনার জন্যেই তো বির্নার্দু ওখানে গিয়েছিল।

তানো চুপ করে গিয়েছিল। চলতি কথায় কি যেন বলে? হাতে একটা খরবুজা নিয়ে[19]

একটা বড় খরবুজা। একটা বিশাল বড় খরবুজা। একটা বড় খরবুজা যেটা এমনকি কোন কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে হলুদ আর বড় খরবুজাদের জন্যে একটা পুরস্কারও পেয়ে যেতে পারে।   

গুরু, আপনি কি নিশ্চিত যে উৎসমুখে যাওয়াটা ভাল?  

অবশ্যই, বির্নার্দু। আরে বাবা, কেনই বা তা হবে না?

এক বছর আগে

মজার না হলে প্রায় ট্র্যাজিক তো বটেই। ট্র্যাজিক না হলে প্রায় মজার তো বটেই।

প্লেনে ও-ই ছিল বিরল একটা পাখি। জেট ইঞ্জিন লাগানো একটা পাখির ভেতরে ডানাহীন এক পাখি। ইউরোপীয় এক তরুণ, হাবভাব খুব গুরুগম্ভীর, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মত মুণ্ডিত মস্তক। বাহুতে উল্কি করা, কানজির চিত্রলিপি। ভয়ানক একটা চিন্তা: আর ওই যে লোকটা উল্কি করেছে, সে হলফ করে ওকে যেটা বলেছে – বিশুদ্ধ স্পিরিট” – সেটা না করে সে যদি হাস্যকর কিছু একটা করে থাকে, যেমন “প্রায় নতুন একটা ব্লেন্ডার বিক্রির আছে”? যেটাকে আমরা পড়ে বুঝতে পারি না এমন কিছু নিজেদের ত্বকে লিখতে দেওয়ার এটাই একটা ঝুঁকি।       

প্লেনটা যেন একটা সাপোজ়িটার যেটা এমনসব ট্যুরিস্টে ঠাসা যারা বাড়ি ফিরছে অন্তঃসারশূন্য ইউরোপের আইফেল টাওয়ার, টাওয়ার অফ লান্ডান, পিসার হেলানো মিনার, তর দ্য বেলাঁই[20], আলিকান্তের সব তুরোনের[21] ছবি তোলার পর।        

বির্নার্দু ৪১ সি-তে খুব কৃচ্ছ্র ও জ়েন হাবভাব নিয়ে বসে ছিল। উৎসের পথে একজন একজন দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ যাত্রী। আর বাকি প্লেনটার জাপানিগুলো? বাকি-প্লেনটাতে জাপানিগুলো মধ্যবিত্ত ও খোশমেজাজ, শহুরে ও ভদ্র, নিরুদ্বেগ ও হাসিখুশি, তাদের ডিজিটাল ক্যামেরার ডিজিটাল মেমারিতে হাজার হাজার ফোটো নিয়ে, ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পরে, ক্যাজুয়াল শিক।     

সে: মরমে মরে যাওয়া ট্যুরিস্ট। ওরা: হাসিখুশি ট্যুরিস্ট। হাসিখুশি আর, তার চেয়েও খারাপ, নিজেদের ট্যুরিস্টের তকমার ব্যাপারে স্বচ্ছন্দ, ট্যুরিস্ট হওয়ার জন্যে কোনরকম লজ্জা ছাড়াই। ওর পেছনের দলটা যেমন, কয়েকজন বেশ বয়স্কা মহিলা, খুব ছোট্টখাট্ট, সবাই বেশ ডাকাবুকো, সবসময়েই বকবক করে চলেছে, আর থেকে থেকেই গাঁটের এক্সারসাইজ় করার জন্যে উঠে পড়ছে, করিডরেই যেন এমন একটা কাতা[22] করছে যার না আছে মাথা না আছে মুণ্ডু, কিন্তু মাসিমাদের মত কখনই পরনিন্দা পরচর্চা বকবকানি হাহাহিহি না থামিয়ে। এই বুড়িগুলোর বাকি অন্য সব বুড়িদের মধ্যে কি-ই বা তফাত, ওই যারা ট্যুরিস্টদের মত তীর্থযাত্রা করতে কোন একটা সান্তিয়াগো দ্য কোম্পোস্তেলা[23] বা ফাতিমায়[24] যায়?       

বির্নার্দু যখন খাবার মেনু থেকে সবুজ চা আর ঠাণ্ডা তোফু বেছে নিচ্ছে (চটপট ওই মেজাজটার মধ্যে ঢুকে পড়ার জন্যে), তার পাশের মাঝবয়েসী দম্পতি রেড ওয়াইনে ছোট্ট ছোট্ট চুমুক দিচ্ছে আর, বোয়ালমাছের মত বিশাল হাঁ করে, মাংসের লাসান্যিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বির্নার্দু তখনও মারাত্মক আহত হয়ে মরমর হয়নি, ওর তখনও কিছু আশা ছিল বা, যেমনটা বলা হয়ে থাকে, সে “ভবিষ্যৎ নিয়ে গর্ভবান”[25] ছিল।    

ব্যাপারটা কিন্তু একটা কুলক্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। বির্নার্দু তখনও নারিতায় নামেনি, তার আগেই জাপান আর সে জাপান ছিল না।   

œ

সে জাপান রেলওয়েজ়ের একটা ট্রেন ধরেছিল শহরে যাবার জন্যে। সেই প্রথম ওর মনটা ভেঙে গেল যখন ও খেয়াল করে দেখল যে, যেমনটা শোনা যায় সেটা কিন্তু ঠিক নয়, ইংরিজিতেও স্টপগুলোর ঘোষণা হচ্ছে, লিখেও আবার বলেও। ওর কাছাকাছি দুই অস্ট্রেলীয় মহিলা উত্তেজিত ভাবে কিওতো আর তার “ম্যাগনিফিসেন্সি” নিয়ে মন্তব্য করছে। মন্দিরের ছড়াছড়ি, অগুনতি সত্যিকারের গেইশা, কিমোনো ও কাঠের স্যান্ডেল পরা। তারপর তারা অন্য একটা প্রসঙ্গে চলে গেল: জাপানে “ইজ়ি জাপানিজ়ি”[26] বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও বেশি। টোকিও হোটেলের[27] জার্মান ছোঁড়াগুলোর চাঁদপানা মুখগুলো আর আলফাভিলের[28] পপের নির্লজ্জ জাতীয়সঙ্গীত, “বিগ ইন জাপান” যেটা আশীর দশককে বিষাদাচ্ছন্ন করে রেখেছিল আর যেটাকে এখনও ইউটিউবে দেখতে পাওয়া যায়, এইসবের চেয়েও বেশি শ্লেষাত্মক একটা সংস্করণ। বির্নার্দুর মাথা ভোঁভোঁ করছিল, ওর মনে হচ্ছিল যেন ও ভাসছে। সকাল দশটা কিন্তু ওর কাছে তখনও মাঝরাত। জেটল্যাগের নির্বাক নৃত্য তার কাজ করে যাচ্ছিল।

ও অনলাইনে আকিহাবারায়[29] একটা শস্তার হোটেলে ঘর বুক করে রেখেছিল। কোথায় যে গিয়ে পড়েছিল, বেচারা। পুরো পথটা জুড়ে ইরটিক দাসীদের নকল করতে থাকা লোলিটারা প্যামফ্লেট বিলি করছিল: “কাকু, মেইদো বারে[30] এসে খানিকটা ভাল সময় কাটিয়ে যান।”   

হোটেল: বির্নার্দু আশা করেছিল একটা রিওকান[31], মাদুর আর ঐতিহ্য সহ, ওর কপালে জুটল নোংরা একটা খুপরি যেটা কিনা আমস্টারডাম বা তার আশেপাশের যে কোন ইয়ুথ হোস্টেলের ঘরেরই মত। ঘরটা: খুবই ছোট কিন্তু পশ্চিমী কেতার। বাথরুমে, বির্নার্দু আবিষ্কার করল যে কমোডের সিটটা গরম করা। যেন ওর পাছাগুলোর জন্যে এই হাস্যকর আতুপুতু করাটার দরকার ছিল! তার ওপর একটা রিমোটও ছিল, গোপনাঙ্গের স্বাস্থ্যরক্ষার্থে তোড়ে জল ঢালার জন্যে। সবচেয়ে মৌলিক ক্রিয়াগুলো – সবচেয়ে ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গতাটা – খেলনায় পরিণত হয়েছে। খুবই দুঃখজনক।    

নতুন একটা অ্যাকোয়ারিয়ামে কানকো ছাড়া মাছের মত, বির্নার্দু রাস্তা দিয়ে যেভাবে পারে ভেসে চলেছিল। নবতম ফ্যাশান পরিহিত মার্জিত রুচিশীল নবীনেরা। নবীনারা: হিলগুলো এতটাই উঁচু যে রণপা বলে মনে হচ্ছে। ব্র্যান্ডেড হাতব্যাগ, খয়েরি রঙের ওপরে সোনালি রঙের হিয়েরোগ্লিফ সব – হাতব্যাগের সমুদ্র একটা। হাইস্কুলের ছাত্রীরা নাবিকদের সাজে, নগ্ন পায়ের ওপরে বিশাল মোটা মোটা স্টকিং আর সাংঘাতিক খাটো স্কটিশ স্কার্ট। রং-করা চুল আর কৃত্রিম ভাবে বাদামি করা ত্বক নিয়ে ছেলেরা বাজে সিনেমার বাজে গ্যাংস্টারদের নকল করছে। মনে হচ্ছে যেন সব কটা শোকেসেই একটা কলের পুতুল কিংবা একটা নরম তুলতুলে কাল্পনিক জন্তু রাখা আছে। চোঙা মুখে দিয়ে একটা লোক বিপ্লব ঘোষণা করছিল। না, না, বিপ্লব নয়। একটা নতুন গায়ে মাখার সাবানের। রেস্টুরেন্টগুলোর শোকেসে, ভেতরকার প্লাস্টিকের খাবারের প্লাস্টিকের প্রতিমূর্তি। প্লাস্টিকে কাঁকড়া, প্লাস্টিকের নুডলস, প্লাস্টিকের বেগুন, খিদে পাওয়ানোর বদলে খিদে মেরে দিচ্ছে। কিন্তু লোকেরা খেতে যাচ্ছে। বির্নার্দু কক্ষণও একসঙ্গে পরপর এতগুলো রেস্টুরেন্ট দেখেনি। কোল্ড ড্রিঙ্কের এতগুলো মেশিনও নয়। একটাতে তো একজন নামজাদা মার্কিন অভিনেতার মুখ ছাপা রয়েছে, একজন বর্বর দেবতার মত। আমাদের পানীয়গুলো কিনুন কারণ আমাদের কাছে বর্বর দেবতার মুখ আছে।      

স্ক্রিন, পুতুল, কলের পুতুল, নিরর্থকতা, ব্র্যান্ডেড হাতব্যাগ, খেলনা, খাবারদাবার, বিজ্ঞাপন। স্পিরিট কোথায়? স্পিরিট কোথায়? স্পিরিট কোথায়?

œ

রাস্তায় গোলমাল, আলো, রঙ, স্পিরিটের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। কারাতের স্পিরিট, সামরিক স্পিরিট, বুদোওর স্পিরিট। প্রেমিক-প্রেমিকারা হাসছে, বড় বেশি নিরুদ্বেগ, স্কটিশ মিনিস্কার্ট আর শাদা স্টকিঙে হাইস্কুলের ছাত্রীরা, সবাই গালভরা হাসি নিয়ে, স্কুল থেকে বেরিয়ে আসা পিঠে ব্যাগ নিয়ে ইউনিফর্ম পরা ছেলেরা, সচ্ছল সমৃদ্ধিশালী একটা ভীড়, শাদা শার্ট আর টাই পরা, চোখে চশমা আর নিখুঁত ভাঁজ-ফেলা প্যান্ট পরিহিত বণিকেরা, আর শোকেসে নরম তুলতুলে সব পুতুল, শোকেসে নরম তুলতুলে সব পুতুল।   

রাত, মাকড়সা-রাত[32]। রোপ্পোনগির[33] নাইজেরীয় দারোয়ানেরা পশ্চিমী খদ্দের ধরছে, নিকৃষ্টতম প্রবৃত্তিগুলোর দিকে হাসিহাসি চোখটাকে টিপে:   

গার্লস, ম্যান! নাইস গার্লস! ফার্স্ট ড্রিঙ্ক ফর ফ্রি!

বির্নার্দুর নিজেকে যান্ত্রিক একটা তিমির ভেতরে পিনকিও বলে মনে হল। বিশাল একটা ঝুটো শহরের পেটের মধ্যে নিজেকে একটা ঝুটো মানুষ বলে মনে হল। স্পিরিট কোথায়? স্পিরিট কোথায়? স্পিরিট কোথায়?


[1]জাপানি মার্শাল আর্ট যেটা সতর্ক থাকা, তাড়াতাড়ি তরোয়াল বার করে আকস্মিক আক্রমণের জবাব দেওয়ার ওপরে জোর দেয়।  

[2]জাপানের আধুনিক একটা মার্শাল আর্ট যেটা বিভিন্ন শৈলীতে বিভক্ত হয়ে গেছে। এর উতপত্তি হয়েছিল মোরিহেই উয়েশিবার হাত ধরে, যিনি এতে নিজের মার্শাল আর্টসের জ্ঞান, দর্শন আর ধর্মীয় বিশ্বাসের একটা মিশেল ঘটান। উয়েশিবার লক্ষ্য ছিল এমন একটা আর্ট তৈরি করা যার সাহায্যে লোকে একই সঙ্গে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে আবার তাদের আক্রমণকারীদের আহত হওয়া থেকে বাঁচাতেও পারবে। আইকিদোওকে সাধারণত “প্রাণশক্তির সঙ্গে যুক্ত করার পথ” বা “সঙ্গতিপূর্ণ স্পিরিটের পথ” বলে অনুবাদ করা হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠাতা দর্শন অনুযায়ী আইকিদোও অনুশীলন করার প্রাথমিক লক্ষ্য হল হিংসা বা আগ্রাসন চর্চা করার বদলে নিজেকে জয় করা।      

[3]এই স্পিরিটটা হলো অকুতোভয় থাকার স্পিরিট, আত্মোৎসর্গের স্পিরিট, মনঃসংযোগ বাড়িয়ে প্রকৃতির থেকে লব্ধ শিক্ষাকে শরীর সঞ্চালনায় প্রয়োগ করার স্পিরিট। বলা যেতে পারে যে এই স্পিরিট হলো প্রস্তুতি ও মনঃসংযোগ।

[4]Sun Tzu ছিলেন পুর্ব চাউ এর শাসনকালে প্রাচীন চীনের একজন সেনানায়ক, যুদ্ধকৌশলী, লেখক এবং দার্শনিক। জন্মের সম্যে তাঁর নাম ছিল সুন ইয়ু তবে পাশ্চাত্যে তিনি সুন সু নামেই পরিচিত, যা আসলে একটি সাম্মানিক পদবি যার অর্থ “প্রভু সুন”। তাঁকে সুন্চি বিংফা-র রচয়িতা হিসেবে মনে করা হয়। এর আক্ষরিক অর্থ হল “প্রভু সুনের রণকৌশলাবলি”, বা ইংরেজিতে দ্য আর্ট অফ ওয়ার। এটি একটি প্রাচীন চৈনিক সামরিক আলোচনা গ্রন্থ। এটি সম্ভবত লেখা হয়েছিল খৃস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে। এটিকে রণকৌশলের উপর লেখা শ্রেষ্ঠ বই মনে করা হয়।

[5]পোকার খেলায় ব্লাফিং হল একটা কৌশল যার সাহায্যে একজন খেলোয়াড় নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে তার হাতের চেয়েও একটা ভাল দান ফেলে দিতে বাধ্য করে। হাতে থাকা তাসের চেয়ে বেশি মূল্যের বাজি ধরাকেই ব্লাফ করা বা ব্লাফিং বলা হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হল আরও ভাল তাস আছে এমন অন্তত একজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে তাস ফেলে দিতে বাধ্য করা।

[6]আক্ষরিক অর্থে “জোও-এর পথ”; একে জোওজুৎসুও বলা হয়ে থাকে। জাপানের এই মার্শাল আর্টে তিন থেকে পাঁচ ফুট লম্বা একটি লাঠি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।   

[7]জ়েন বৌদ্ধধর্মের চর্চার ভিত্তি হল Zazen, যার আক্ষরিক অর্থ হল “বসা অবস্থায় ধ্যান”। এর উদ্দেশ্য হল “কেবল বসে থাকা, মাথাটা খোলা রেখে, যেসব চিন্তাভাবনা মুক্তভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে সেগুলোর থেকে নিজেকে মুছে না ফেলে। এটাকে, মোটামুটি ভাবে, অস্তিত্বের প্রকৃতির প্রতি অন্তর্দৃষ্টির উপায় বলে ধরা যায়।     

[8]আলব্যার্তু কায়েইরুর মেষপালক-এর ৩৯ নং কবিতার শেষ পংক্তি।   

[9]ফির্ণান্দু পেসোয়া – cadáver adiado। মেনসাজেঁই বা বার্তা-র “D. Sebastião, Rei de Portugal” কবিতার শেষ তিনটি পংক্তি:  

Sem a loucura que é o homem                 উন্মত্ততা ছাড়া মানুষ আর কি

Mais que a besta sadia,                           স্বাস্থবান পশুর চেয়েও

Cadáver adiado que procria?                    প্রজননকারী স্থগিত রাখা এক মৃতদেহ?

[10]ফুগু বেলুন মাছ বা শজারু মাছ বা এই মাছগুলো দিয়ে তৈরি একটা পদ। একটা বিষাক্ত টক্সিন থাকার ফলে এই মাছ মানুষের পক্ষে প্রাণঘাতী হতে পারে, যদি মাছটাকে কেটে পরিষ্কার করার সময়ে এর বিষাক্ত অংশটা সাবধানে বাদ না দেওয়া হয়।

[11]বিখ্যাত জাপানী শিল্পী কাৎসুশিকা হোকুসাইয়ের (১৭৬০-১৮৪৯) best known for the woodblock print series Thirty-Six Views of Mount Fuji উডব্লক প্রিন্ট।

[12]পর্ব ১ টীকা ৯ দ্রঃ।

[13]কড বা হেরিং প্রজাতির এক ধরণের মাছ যা পোর্তুগালে খাওয়ার চলন খুব বেশি। এর একটা রান্নার নাম “pescadinha de rabo na boca” মানে মুখে ল্যাজ ঢোকানো ছোট পেশকাদা, কারণ মাছগুলো ছোট বলে বাজারে সেগুলোকে একটা গোল আকৃতি দেওয়ার জন্যে ল্যাজগুলোকে মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

[14]জনপ্রিয় একটি প্রবাদ হল “Pela boca morre o peixe” অর্থাৎ মাছ মরে মুখ দিয়ে (টোপটা গিলে)। মানে আমাদের চুপ করে থাকাই উচিত, মুখ খুললেই আমরা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ব। রুই এই প্রবাদটিকে আক্ষরিক ভাবে ব্যবহার করেছেন, বেলুন মাছ মুখ দিয়ে শুধু মরে না, মারেও (যে তার বিষাক্ত টক্সিনটা মুখ দিয়ে খায়, তাকে)।   

[15]আরেকটি বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ “Tantas vezes vai o cântaro à fonte, que um dia lá deixa a asa”, যার অর্থ কলসী এতবার ঝর্ণায় যে একদিন তার হাতলগুলো ওখানেই ফেলে আসবে। অর্থাৎ, যেখানে বিপদের ভয় আছে সেখানে বেশি না যাওয়াই ভাল।

[16]কাল্পনিক এক জন্তু যেটাকে শিকার করার জন্যে নির্বোধ বা অতিমাত্রায় সরল কাউকে পাঠানো হয় বোকা বানানোর জন্যে।

[17]সামন্ততান্ত্রিক জাপানের সামুরাই শ্রেণীর কিউজুৎসু বা ধনুর্বিদ্যা শিল্পের ওপর ভিত্তি করে যে মার্শাল আর্টস গড়ে উঠেছিল।  

[18]sumō – জাপানের জাতীয় ক্রীড়া, কুস্তি।

[19]যখন নিজের ইচ্ছে মত কিছু ঘটেনি বলে কেউ হতাশ মনমরা হয়ে পড়ে তখন তাকে পোর্তুগালে চলতি কথায় বলে “হাতে খরবুজা ধরে বসে আছে”।

[20]Torre de Belém বা Torre de São Vicente – লিশবোয়ায় তাইজুর তীরের কাছে একটা ছোট দ্বীপের ওপরে ষোড়শ শতকে তৈরি ছোটখাটো একটা দূর্গ। এখান থেকেই পোর্তুগিজ় অভিযাত্রীরা জাহাজে উঠত আবার ফিরে এসে এখানেই নামত। এখন এটা ইউনেস্কোর একটা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।    

[21]কাতালোনীয়তে torró d’Alacant, কাস্তেলীয়তে turrón de Alicante আমাদের বাদামের তক্তির মত চৌকো একটা মিষ্টি আমন্ড দিয়ে তৈরি হয় আর ক্রিসমাসের সময়ে স্পেনের সর্বত্র এটা খাওয়া হয়।

[22]জাপানি ভাষায় কাতা-র আক্ষরিক অর্থ “ফর্ম”; এই শব্দের সাহায্যে একা একা অনুশীলন করার জন্যে মার্শাল আর্টসের কোরিওগ্রাফ করা কিছু চলন বোঝায়। এই কাতা অনুশীলনের লক্ষ্য হল চলনগুলোকে মনে রাখা ও সেগুলোকে নিখুঁত করে তোলা।

[23]Santiago de Compostela – উত্তর-পশ্চিম স্পেনের স্বশাসিত গালিসিয়া অঞ্চলের রাজধানী ও হাজার বছরের পুরনো রোমান ক্যাথলিকদের একটি তীর্থক্ষেত্র। প্রতি বছর এখানে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী আসে। 

[24]Fátima – মধ্য পোর্তুগালে অবস্থিত একটি তীর্থক্ষেত্র। বলা হয় যে ১৯১৭ সালে তিনজন বালকবালিকা ভেড়া চরাতে গিয়ে বিভিন্ন দিনে তিনবার মা মেরিকে দেখতে পায়। এখানে প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য তীর্থযাত্রী আসে।    

[25]রাইনার মারিয়া রিলকে তাঁর ব্রীফেন আন আইনেন ডিষ্টার (এক কবিকে কেখা চিঠি) বইয়ের আট নম্বর চিঠিতে লিখেছেন “wenn man traurig ist… da unsere Zukunft uns betritt” (আমরা যখন বিষাদগ্রস্ত হই… তখন আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে)। অর্থাৎ আমরা ভাল কিছুর জন্যে আকুল হই। এই বইটি যখন পোর্তুগিজ়ে অনূদিত হয় তখন এই লাইনটি হয়ে দাঁড়ায় – “Quando estamos tristes estamos grávidos de futuro” (আমরা যখন বিষাদগ্রস্ত থাকি তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে গর্ভবান থাকি); শেষের অংশটা রুই এখানে ব্যবহার করেছেন।    

[26]Easy Japaneesy – তুচ্ছার্থে বলে থাকে, বিশেষ করে মার্কিন, ইংরেজ ও অস্ট্রেলীয়রা। এর মানেটা অনেক রকম হতে পারে: জাপানিদের সহজেই ঠকানো যায়, বা জাপানি মেয়েদের সহজেই জয় করা যায়, কিংবা জাপানি প্রযুক্তির সবকিছুই খুব সহজ হয়ে যায়… মূল ব্যাপারটা হল এটা দেখানো যে জাপান (আমাদের সবাইকার মতই) মার্কিন সংস্কৃতির কাছে মাথা নুইয়ে থাকে এমনকি অপমানও মেনে নিতে তৈরি থাকে। 

[27]Tokio Hotel – ২০০১ সালে তৈরি একটা জার্মান রকব্যান্ড।

[28]Alphaville – ১৯৮২ সালে তৈরি একটা জার্মান পপব্যান্ড। আশীর দশকে এই ব্যান্ড খুবই জনপ্রিয় ছিল আর তাদের সাফল্যের মূলে যে গানগুলো ছিল “Big in Japan” তাদের মধ্যে একটা।   

[29]অনেকের মতে তকিওর আকিহাবারা অঞ্চলকে আধুনিক জাপানের পপুলার কালচারের পীঠস্থান। এই অঞ্চল ভিডিও গেমস, আনিমে আর মাঙ্গা, ইলেকট্রনিক্স আর কম্পিউটার-সম্পর্কিত জিনিশপত্রের বাজার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলেই ২০০১ সালে ও দেশের প্রথম মেড ক্যাফে খোলা হয় আর এখন এখানে এই ধরণের ক্যাফের ছড়াছড়ি।      

[30]Meido kafeবাmaid café – এই ক্যাফেগুলোতে ওয়েট্রেসরা পরিচারিকাদের মত পোষাক পরে পরিচারিকাদের মত আচরণ করে, গ্রাহকেরা যেন কোন ক্যাফেতে নয়, কারুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছে বা তাদের মনিব, সেইভাবে তাদের সঙ্গে সেবা করে।   

[31]Ryokan জাপানের প্রথানুসারী অতিথিশালা যেখানে অতিথিরা তাতামির (জাপানি মাদুর) ওপরে পাতা ফুতোনে (জাপানি তোষক বা কুশান) ইউকাতা (ঘুম বা বিশ্রামের সময়ে পরিধেয় সাদাসিধে কিমোনো) পরে ঘুমোয়। 

[32]রোপ্পোনগিতে মার্কিন-ফরাসী শিল্পী লুইজ় বুর্জোয়ার তৈরি তিরিশ ফুট উঁচু একটা মাকড়সার লোহার ভাস্কর্য আছে। ওটার মধ্যে ভয়ঙ্কর কিছু একটা আছে, যেন বলছে যে রাত হল একটা মাকড়সা যে নিজের জালে আমাদের জড়িয়ে ফেলে।    

[33]রোপ্পোনগি নাইটক্লাবগুলোর জন্যে বিখ্যাত মধ্য তকিওর একটা এলাকা। এখানকার নৈশজীবন স্থানীয় মানুষ ও বিদেশিদের কাছে সমান আকর্ষণীয়। তকিওর এই এলাকাতেই বিদেশি ট্যুরিস্টদের বেশি আনাগোনা।   

Rita Ray
  ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।    

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

4 comments

  • Мыслящие граждане в российской федерации сейчас начали разуметь, что сегодня высшее правительство их всех дурачит и дополнительно высылает на погибель солдат проливать кровь в Украинское государство. Они сегодня стали молвить про это, в противоположность безучастных других граждан, которые сейчас безразлично глядят, каким образом ущемляют их всех свободу и дополнительно посылают родных граждан на несправедливую, пагубную для жизни и экономики российской федерации, войну.

  • Различные русские солдатики уже давным-давно догадались, что их в совокупности применяют, как живой экран, направляя на огонь Украинского государства армии. Осознавая несообразность этой, несправедливой, относительно Украины, войны, российские рядовые многочисленно стали отрекаться воевать. Именно тем все они сохраняют для себя жизнь и отнюдь не осуществляют преступных приказов, за которые российской федерации привелось бы оплатить соромом и презрением всего демократического мира.

  • Президент Америки намеревается подписать закон о Ленд лизе специально для доставки вооружения в Украинское государство 9 Мая. Целый мир верит, это ускорит окончание незаслуженной войны российской федерации насупротив Украины.

  • Лидер Страны Китай заявлял, собственно что он почитает территориальную неделимость Украинского государства. Это в целом значит, что в свою очередь он изучил ситуацию да и понял, что в свою очередь Украинское государство выиграет в несправедливой войне российской федерации насупротив Украины.

Leave a Reply

Your email address will not be published.