মেরুভল্লুকের প্রেম- রুই জ়িঙ্ক, অনুবাদ ঋতা রায় (দ্বিতীয় পর্ব)

বাংলা English
Rui Zink
  Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.  
Cover Page of O amante e sempre o ultimo a saber

মেরুভল্লুকের প্রেম

দোজোতে একটা মোবাইল

শাদা সুতির কোট আর প্যান্ট পরা খালি পা বাচ্চা ছেলেরা, তাদের কোমরে শাদা থেকে হলুদ আর কমলা থেকে সবুজ হতে থাকা ন্যাকড়ার ফালির বেল্ট, সামরিক সব ভঙ্গী, একটা পা ভাঁজ করা, অন্যটা লম্বা করে বাড়িয়ে রাখা, কোমর বা বেল্টের কাছে মুঠি, ভাল করে পাকানো, অন্যটা একটা কাল্পনিক প্রতিপক্ষের কাল্পনিক চিবুক লক্ষ করে কাল্পনিক একটা ঘুষি ছুঁড়ছে। একটা সেকেন্ডারি স্কুলের জিমে, খুব সিরিয়াস, খুব মিষ্টি, গোটা বারো মত।          

বাবামায়েরা তাদের ছেলেদের কারাতেতে ভর্তি করতে খুব ভালবাসে, তারা বিশ্বাস করে যে তাদের মধ্যে শৃঙ্খলার যে এত অভাব সেটা কারাতে পূরণ করবে। বাবামায়েরা কারাতের প্রশিক্ষককে বলতে গেলে একধরণের একজন বৈধ ডীলার বলে মনে করে, এমন কেউ যে নাকি তাদের সেই জিনিশটার জোগান দেবে যেটা ভবিষ্যতের জন্যে লড়াইয়ে জেগে থাকার জন্যে বাচ্চাদের দরকার। এক্সট্রা-কারিক্যিউলার একটা বিষয় যেটা ওদের পড়াশুনোতে সাহায্য করতে পারবে, নিজেদের প্রতি আরও বেশি বিশ্বাস রাখতে শেখাবে – আর, ঘটনাক্রমে, আরও ভাল মোটর কো-অর্ডিনেশান এনে দেবে।       

ফলস্বরূপ, (আর এটা হল আরও একটা কারণ যেটা পুরুষ জন্মদাতারা স্বীকার করে না) বাচ্চাগুলোকে গুণ্ডাদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শেখানো, যারা স্কুলেও যেমন আছে তেমনি রাস্তাতেও গিজগিজ করছে, যে বাবারা নিজেদের কৈশোরে যেভাবে নাকাল হয়েছিল এবং সেটাকে – সেই দুর্বলতাটাকে – উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটা জেনেটিক খুঁত হিসেবে নিজেদের ছেলেদের মধ্যে গোপনে চারিয়ে দিয়েছে ভেবে ভয় পেয়েছিল, এইভাবে তার একটা খেসারৎ পাবে।         

জিমটাকে নানান ভাবে ব্যবহার করা যায় আর এই ক্লাসটা সবচেয়ে সহজভাবে যে ক্লাসগুলো দেওয়া যায় তার মধ্যে পড়ে। গি (যেটাকে সাধারণ লোকেরা কিমোনো বলে থাকে) ছাড়া আর কোন সাজসরঞ্জাম লাগে না আর, এটার প্রয়োজনও কেবলই আনুষ্ঠানিক। ব্র্যান্ডেড স্পোর্টস শুয়ের কোন খরচ নেই – যেটা কিনা আজকের এই ভোগবাদী যুগে বাড়তি একটা পাওনা। আর, অত্যাশ্চর্য ব্যাপারটা হল খালি পায়ে ঘুরে বেড়ানটা বাচ্চা ছেলেগুলোর কাছে একটা ইলেক্ট্রনিক গেমসের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় আর মজার হয়ে দাঁড়ায়, ওই যে গেমসগুলো ব্লিং ব্লিং আর ভ্লাআআক আর শাজ়াআআআং করে, আর যেগুলো ঘটনাচক্রে সেই একই অমায়িক সাপ্লায়ারের কাছ থেকে আসে, যেটা হল কোরিয়া আর চীনের ঠিক উল্টোদিকে অর্ধচন্দ্র আকারের একটা দ্বীপপুঞ্জ।       

বাবামারা যদি থামত, ভেবে দেখবার জন্যে যদি এক সেকেন্ডের জন্যেও থামত তো তারা ওই মহাশ্চর্য ব্যাপারটা দেখতে পেত, যেটা হল জাপানীদের একেবারে উল্টো প্রকৃতির জিনিশপত্র, ইন ওয়ান সিটিং, জগৎকে বিক্রি করে ফেলতে পারাটা: মার্শাল আর্ট, হাইব্রিড গাড়ি, ভিডিও গেমস, কাঁচা মাছ, মননশীল দর্শন, অ্যানিমেটেড ড্রয়িং, একাধারে “যোদ্ধৃ মেজাজ”-এর সঙ্গে পুরুষানুক্রমিক কাল্পনিকতা আর খেলনার স্বপ্নের একটা মেঘ, সেটা যেমন ভয়ঙ্কর তেমনি মিষ্টি[1]। আর বাচ্চাগুলো খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে: কারাতে ক্লাসের পর, যেটা কারুশিল্প ও প্রাচীন, নিয়মকানুন আর আদবকায়দায় ভর্তি, তারা ক্লান্ত আর খুশি হয়ে বাড়ি পৌঁছয়, তারপর পোকেমন কিংবা নিনজা হাতরি (বা অন্য কোন স্টিকারের) জন্যে বিস্কুট চায় ওরকম কোন একটা টিভি সিরিয়াল হাঁ করে দেখতে দেখতে যেখানে হিরোরা শত্রুদের ধ্বংস করে, এক ঝটকায়, হাসি থেকে চিৎকারে জ়্যাপ[2] করে, আর আলট্রা-প্লপের গানগুলোর বিকট আওয়াজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বহুনাক্ষত্রিক শূন্যে লাফায়।        

এই ক্লাবটায় দুজন গুরু আছে। একজন বেশি সামরিক, পেশীবহুল, নীরস, জ়েন সন্ন্যাসীদের মত মাথা কামান, পাতলা দাড়িগোঁফ। অন্যজন বেশি ছোটখাট, কম নীরস আর, একজন মনযোগী দর্শকের চোখে, কম নিশ্চিত। তার হারানো কঠিন পার্টনারের চেয়ে তার একটা উপরি সুবিধে আছে – সে সত্যিই জাপানী, খাঁটি জিনিশ। আর জানাই তো আছে, খাঁটি জিনিশ-কে কখনই অত বেশি খাটতে হয় না। কন্দ রেদন্দুর[3] ট্রান্সভেস্টাইটদের প্রশ্ন করে দেখা যেতে পারে প্রকৃতি যেটা আমাদের দেয়নি এমন কিছুর ভান করতে কতখানি কষ্ট হয়। একজন নারী? একজন নারী নারীর মত দেখতে না হওয়ারও বিলাসিতাটা করতে পারে। কিন্তু একজন পুরুষ, যে নিজেকে নারী হিসেবে দেখাতে চায়, সে ওই বিলাসিতাটা করতে পারে না। একজন পুরুষের তো বারোটা বেজেই গেছে, সে তো কাজ করতে বাধ্য, কঠিন শ্রমসাধ্য কাজ, ধারাবাহিক কাজ, কঠিন ও ধারাবাহিক কাজ। আমাদের, পুরুষদের, অশেষ ভোগান্তি।    

আজ যে ক্লাসটা নিচ্ছে সে হল ওই জাপানী। আর ওই মুহূর্তে জাপানীটি কি ভাবছিল, তার বহু-ব্যবহৃত ওই গি-এর মধ্যে, যার কালো বেল্টটা কোমরে যেমনতেমন ভাবে বাঁধা? শরীরের পাশে হাতদুটো ঝুলে আছে, তার ইচ্ছে করছে একটা সিগারেট খেতে, এটাই সত্যি। কিন্তু পারছে না। কারাতের শিক্ষকরা ছাত্রদের সামনে সিগারেট খেতে পারে না। ব্যাপারটা খুব খারাপ দেখাবে। এটা একটা নিয়ম, বিশেষ করে একটা সেকেন্ডারি স্কুলে, যেটার জিমটা একটা দোজোতে পরিণত হতে পারে কেবলমাত্র মানসিক অ্যালকেমির একটা জাদু ছাড়পত্রের মাধ্যমে। তাছাড়া সে-ও তো সিগারেট খাওয়াটা ছেড়েই দিচ্ছে। অনেক বছর ধরেই ছাড়ছে। সিগারেট খাওয়াটা। এটাও বলা যেতে পারে যে, বহু বছর হল, সে বাঁচাটা ছেড়ে দিচ্ছে। আর পরমাশ্চর্য ব্যাপারটা হল এই যে সে ক্রমশ তার কোন কোন উদ্দেশ্য সফল করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।      

শিষ্যেরা এখন কিহোন করছে, প্রাথমিক সব ভঙ্গী আর আক্রমণ আর প্রতিরক্ষা। মুখের সমান উচ্চতায় সামনে ঘুষি।    

ওইৎসুকি জোদান। আমার তালে তাল মিলিয়ে!  

ছেলেরা কপাল কোঁচকায়, খুব মন দিয়ে, ছোট্ট ছোট্ট যোদ্ধাদের দেখতে বেশ মজা লাগে। খুব খুউব সিরিয়াস।    

– ইচি! নি! সান! চি!  

তারপর তারা এগিয়ে আসে, আক্রমণের ভঙ্গীতে, যেটা তারা প্রথমে শিখেছে, জ়েনকুৎসো দাচি। সামনের পাটা ভাঁজ করা, নব্বই ডিগ্রিতে, পেছনেরটা দৃড়ভাবে কোণাকুণি করে রাখা।

– এবার পরপর তিনবার নিজেদের মত করে কর। আজিমে!  

ব্যাপারটা বেশ মজার। আজকাল ক্লাসই হল একমাত্র জায়গা যেখানে এই জাপানী লোকটা জাপানী বলে। ক্লাসের জাপানী, যেটা ওর পার্টানারও বলে।   

ইয়ামে।   

ছাত্ররা আবার তাদের একদম গোড়ার ভঙ্গীতে ফিরে গেল, পাদুটো সামান্য ফাঁক করে দাঁড়ান, সামনের দিকে, বেল্টের গিঁঠটার ওপরে হাতদুটো ঝোলান, মুঠি পাকানো, এখনও সতর্ক।

গুরু আবার ইয়ামে বললেন আর এইবারে কিন্তু ছাত্ররা আলগা দিল। গুরু ওদের বললেন হাতগুলো গোল করে ঘোরাতে, পাগুলোকে শিথিল করতে, নিঃশ্বাসের ব্যায়াম করতে। শিষ্যেরা তাঁর আদেশ পালন করল। ওরা বাচ্চা কিন্তু, এই ক্লাসটা চলার সময়ে, গর্বিত যোদ্ধাও বটে। গুরু বললেন:

ইয়োইi!

ছাত্রেরা আবার তাদের আগের অবস্থানে ফিরে গেল।  

কাতা!

জাপানীতে কাতা মানে ফর্ম। কারাতের পরিভাষায়, প্রতিটা দিগবিন্দু থেকে পরপর আসা কয়েকজন কাল্পনিক (বা অন্তত পক্ষে অদৃশ্য) শত্রুর বিরুদ্ধে বিন্যাস করা একটা লড়াই।    

হায়েন শোদান!

ছাত্রেরা সমস্বরে বলে উঠল:

হায়েন শোদান!

গুরু, গুরুর মত, মাথা নেড়ে, তারিফ জানালেন।   

যোদ্ধার মত, শিষ্যদের হিংস্রতা আর একাগ্রতা মন দিয়ে লক্ষ করতে করতে গুরু হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন:

ইচি।  

প্রথম মুভমেন্ট। একটা প্রতিরক্ষা। একটা গেদান বারাই, বাঁ হাত বুকের কাছে তৈরি হয়ে দৃঢ় ভাবে নেমে আসেছে থেমে থাকা একটা তলপেট তাক করা অলীক মায়ে গেরি-র দিকে। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির উদ্ভাবন হওয়ার আগেই কারাতে ছিল, মনকে দেহ দিয়ে প্রক্ষেপ করার শিল্প।      

নি।  

দ্বিতীয় মুভমেন্ট। একটা প্রতি-আক্রমণ। সোলার প্লেক্সাসে ওইৎসুকি। এমন একটা ঘুষি যেটা একটা লড়াইকে শেষ করে দিতে পারে। একদমই তাই। কারাতেতে প্রতিটা মার প্রথম ও শেষ বলে মনে করে নেওয়া হয়। শূন্য হাতের পথটা চূড়ান্ত হাতের পথও[4] বটে।      

সান… কিয়াই!   

যে চিৎকারটা একজন কারাতেকা সবচেয়ে উত্তেজনার মুহূর্তে গলা থেকে বার করে। ভেতরকার শক্তিটাকে উচ্চারিত করা ছাড়াও কিয়াই প্রতিপক্ষকে বিচলিত করার কাজটাও করে, নিজের ভয়টা প্রকাশ করার বদলে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখায়, আর তলপেটে অবস্থিত কি-এর শক্তিগুলোকে চ্যানেলাইজ় করা। ভেতর থেকে উঠে আসা একটা চিৎকার, আদিম চিৎকার।   

গুরুকে দেখে সন্তুষ্ট মনে হচ্ছিল না। একাগ্র ছাত্রদের লক্ষ করছিলেন, মুখের যোদ্ধৃভাব খুব একটা (এমনকি একদমই) বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, কঠোর ভুরু এমন একটা কারুর যার কাছে নিখুঁত হওয়ার চেয়েও ব্যাপারটা অস্তিত্বেরই অবমাননা।    

ইচি, নি, সান… ভাল করে!  

গুরু একজন ছেলের কাছে গিয়ে তার কনুইয়ের ভঙ্গীটা ঠিক করে দিলেন। আরেকজনের কাঁধটা সোজা করে দিলেন। অন্য আরেকজনের হাঁটুটাকে আরেকটু ভাঁজ করে দিলেন – সামনের জানু আর পাটা নব্বই ডিগ্রিতে রাখাটা অপরিহার্য!     

š

অন্য গুরুটি, যে গুরুর মাথাটা কামানো, মনে করে কেবল জুতোটা খুলে, কোনরকম অভিবাদন না করে “বাইরেরজগৎ” আর দোজোর মধ্যেকার অদৃশ্য সীমারেখাটাকে পার হয়ে এল। গুরুদের নিয়মকানুন গুরুদের মানতে হয়। অভিবাদন না করলে ক্লাসের আদবকায়দাকে কেবল লঙ্ঘন করা হয়; জুতো না খোলাটা হত দোজো যে ক্ষণস্থায়ী মন্দির তার অবমাননা করা।         

– তানো? ফোন।    

তানো নামের জাপানী গুরুটি পার্টনারের দিকে তাকাল। দুজনেই জানে যে বুদোওর[5] মেজাজ-টাকে ফোনের মত এমন সামান্য কিছুর জন্যে বাধা দেওয়া যায় না। এটাই ওরা ছাত্রদের কাছ থেকে দাবী করে – বাবামায়ের কিনে দেওয়া মোবাইলগুলো লকারে পড়ে থাকে। যে মুহূর্তে আমরা দোজোতে ঢুকি, সেই মুহূর্ত থেকে আমরা কারাতের একটা প্রতীকী দুনিয়ায় থাকি। সময়ের বাইরে একটা সময়ে। বলতে গেলে আমরা যেন একটা শিন্তো মন্দিরে ঢুকবার ফটক, একটা তোরি পার হয়ে এসেছি। এক ঘণ্টা আগেই ওই জিমটা হয়ত একটা বাস্কেটবল খেলা কিংবা এয়ারোবিক্স ক্লাসের জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে। তাতে কিছু আসে যায় না, যে মুহূর্তে ওই জায়গাটা, যে কোন জায়গা, কারাতের অধিকারে আসে, ওখানে কেবল কারাতের মর্মের জন্যেই জায়গা থাকে। সামরিক এই জগৎটাতে ঢোকার চাবি হল প্রাথমিক অভিবাদন, জায়গাটার প্রতিই, জায়গাটার মর্মের প্রতি, ফুনাকোশি সেনসেইয়ের ছবির প্রতি, যেটা ইন্সট্রাকটার দেওয়ালে ঝুলিয়েছেন, কিংবা জাপানী প্রবচনগুলোর প্রতি, যেগুলো কেউ না বুঝলেও এটা বোঝে যে সেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওই সমান্তরাল বিশ্বটা থেকে বেরতে হলে, কেবল গুরুর অনুমতি নিয়েই আর নতুন করে আবার দোজো, দোজোর আত্মা, পূর্বগামী গুরুদের স্মৃতি, বর্তমান গুরুদের অভিবাদন জানিয়েই বেরনো যায়। ফোন ধরা? ফোন ধরার অর্থ হল ওই পবিত্র জায়গার ভেতরে বাইরের জগতের একটা জিনিশ নিয়ে আসা, একটা মামুলি দৈনন্দিনতার একটা কালো ছোপ যেখানে আমরা আবার ঠিক তার উল্টোটা হয়ে যাব যাতে দোজো আমাদের উন্নীত করে, যেখানে দোজো আমাদের তুলে দেয়।      

(কিংবা ওই ধরণের কিছু একটা।)

তানো তার সহকর্মীর দিকে তাকাল, যার নাম কুর্তু, একটা “আশা করি এটা সত্যিই জরুরি” ভাব নিয়ে। সেটা করার অবশ্য ওর দরকার ছিল না। ওরা দুজনেই দুজনকে অনেক বছর ধরে চেনে আর একই সঙ্গে বসে নিয়মকানুনগুলো তৈরি করেছে। সত্যি বলতে কি, কারাতেই তো ওদের রুজিরুটি। ওটা এমন একটা কিছু যেটাতে ওরা বিশ্বাস করে (মানে, বিশেষ করে কুর্তু) আর দুজনেই জানে যে উদাহরণটাকে ওপর থেকেই আসতে হয়।     

তানো ফোনটা ধরল। ছাত্রদের শেখানোর জন্যে “শুভসন্ধ্যা”-র বদলে বলল:

মোশি মোশি? – আর, কেবল তারপরেই:

– হ্যালো?

তারপর সে শুনতে পেল। উল্টোপারের গলাটা।

উল্টোপারের গলাটা।

কুর্তু পার্টনার আর বন্ধুর মুখটা ভাল করে লক্ষ করল এবং যেটা দেখল সেটা ওর ভাল লাগল না: পার্টনার আর বন্ধু দুটো আঙুল (বুড়ো আঙুল আর তর্জনী) সেই জায়গাটায় তুলল যেখানে চোখদুটো নাকের হাড়টার সঙ্গে মেলে। মুখটায় চাপা উদ্বেগ।  

ছাত্ররাও খেয়াল করল।  

– এখনই? দুদিন পরে? কিন্তু আমি…

[…]

– হ্যাঁ, ম্যাডাম। আমার স্মরণে আছে।   

[…]

– আমি জানি। আমি অস্বীকার করছি না যে…

[…]

– হ্যাঁ, ম্যাডাম, আমি জানি আমি কি কথা দিয়েছিলাম।

[…]

– আমি, যেমন বলেছিলাম, ম্যাডাম, আপনাকে সেবা দিতে তৈরি।

[…]

– না, আপনার সচিবকে বিষয়টা দেখতে হবে না। আমার পাসপোর্ট আপডেট করা আছে।

[…]

š

ছাত্ররা গুরুকে কখন এত বিচলিত হতে দেখেনি। অবশ্য তিনি যে চিৎকার চ্যাঁচামেচি বা ওই ধরণের কিছু করছেন তা নয়। যা-ই হোক না কেন, তিনি তো প্রাচ্যের মানুষ। আর, প্রাচ্যের একজন ভাল লোক হিসেবে, তাঁর প্রাচ্যের নির্বিকল্পতা আছে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই নিজেদের বাড়িতে সংঘর্ষে অভ্যস্থ হওয়ার ফলে, একুশ শতকের ছেলেপুলেরা দাম্পত্য কলহ বুঝে ফেলার জন্যে জন্ম থেকেই তাদের ডিএনএতে একটা ষষ্ঠেন্দ্রিয় খোদাই করে এনেছে। আর এইটা হল (ওরা চিনে ফেলেছে) কাহিনীর ওই মুহূর্তগুলোর একটা যেখানে বাপী আর মামণি একে অন্যকে “ঘৃণাপূর্ণ শব্দ” বলে, ঘৃণা (অবিশ্বাস, ক্ষোভ, বিদ্বেষ) একটা ফাটা টেস্টটিউব বেয়ে তরল ধাতুর মত গড়িয়ে পড়ে।     

š

তানো কোমা থেকে জেগে উঠে বুঝল যে তার ছাত্রদের তাকে প্রয়োজন। গুরুকে, বাপীকে নয়। গুরুকে। সেনসেই-কে।   

– কোথায় তাকিয়ে আছ, তামাগোচিরা[6]?

ছাত্ররা নিজেদের অবস্থানে ফিরে গেল।

হায়েন শোদান! মন দিয়ে!

তানো ভরসা-জাগানো রূঢ়তার সঙ্গে একটা বাচ্চার গি-টাকে ঠিকঠাক করে দিল।   

– নিজেরা কর! আর এই কিয়াই-তে জোর দাও!

ছাত্ররা আসন্ন লড়াইয়ে মন দিল।

আজিমে!   

š

ক্লাসটা আর বেশিক্ষণ চলল না। নিজেকে অবিচল দেখাতে গিয়ে গুরু তাঁর শিষ্যদের দোজোর চারিদিকে দৌড় করালেন, দৌড়ের গতি কমে গেলে শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করালেন, হাতগুলোকে নিয়ে, ভাল করে শ্বাস টেনে নিয়ে খু-উ-উ-ব ধীরে ধীরে শ্বাসটাকে ছাড়া। তারা মাটিতে শুল, চিৎ হয়ে, শরীরের দুপাশে হাতদুটো আলগোছে রাখা, চোখ সব বন্ধ, নগণ্য জগতে ফিরে যাবার আগে একটা ছোট্ট মেডিটেশান। তানো তালি মেরে ওদের ঘোরের ভেতর থেকে বের করে আনল, আর বাচ্চাগুলো এক লাফে উঠে দাঁড়াল, খুশি হয়ে, শেষ অভিবাদন জানানোর জন্যে গ্রেডেশান অনুযায়ী – সবচেয়ে উঁচু থেকে (ওখানে নীল) শাদা বেল্ট অবধি – নিজেদের জায়গা খুঁজে নিতে গিয়ে ছোটখাট রকমের একটা তোলপাড় করে। শাদা বেল্ট লাইনের একেবারে শেষে দাঁড়াবে কিন্তু সে অন্য বেল্টদের মত ঠিক একই সম্মা্নের যোগ্য, গুরু সর্বদাই এটা বুঝিয়ে দেন। কারণ এটা যদি সদ্য-দীক্ষিতদের বেল্ট হয়, যারা কিছু জানে না, এটা কিন্তু “সত্যিকারের গুরুদেরও” – যাঁরা এতদূর অবধি পৌঁছতে পারেন যে, আশির্বাদধন্য হয়ে আবার কিছু না-জানা অবস্থাতেই ফিরে যান। যেদিন তাঁরা বৃত্তটা সম্পূর্ণ করেন, গ্র্যান্ড মাস্টার তাঁর দশম দানের ব্ল্যাক বেল্ট ত্যাগ করে আলোকপ্রাপ্তদের শাদা বেল্টটা আবার পরে নেন, যাদের জন্যে সবকিছুই স্থায়ী নতুনত্ব। বাচ্চারা এই নীতিগল্পের বিশেষ কিছুই বোঝে না, তার ওপর আবার ওই সময়ের ক্লাসটা সবচেয়ে ছোটদের, কিন্তু ওরা না বুঝতে পারলেও এইসব শুনতে ভালবাসে। তারা গূঢ় তত্ত্ব ভালবাসে, শৃঙ্খলা ভালবাসে, কল্পরাজ্য ভালবাসে। এক কথায় ওরা কোরিওগ্রাফি ভালবাসে।            

গুরু চিৎকার করে বললেন সেইজ়়া! আর সবাই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ইয়োই! আর সবাই চুপ করে গেল, চোখ বন্ধ করে, কেবল কয়েকজন ছটফটে ছাড়া।  

গুরু ওই পাঁচটা প্রবচন বললেন, এক এক করে, ওরা যাতে সেগুলো শুনে শুনে বলে।

জিনকাকু কানসেই নি ৎসুতোমুরো কোতো!  

বলাই বাহুল্য বাচ্চাগুলো না চাইলেও শব্দগুলোকে বিকৃত করে ফেলে:  

– জিন কান্সেই নিতসুমোরোত!

মাকোতো নো মিচি উয়ো মামোরু কোতো!

– মাকোতু মিচঅ মারুতঅ!

দোরইয়োকু নো সেইশিন ও ইয়াশিনাউ কোতো!

– দোরিকু সেইশিনুতঅ!

কেক্কি নো ইউ ও ইমাশিমুরু কোতো!

– কেকিনঅ ই উ ইমাশিতঅ!

রেইগুই ও ওমোনজ়ুরু কোতো!   

– রেইগঅ মেজ়ুরা কোতঅ!

প্যারডি করার জন্যে ওরা প্রবচনগুলোকে বিকৃত করে না। এগুলো সাগরের ইলমাছ নয়, পচা বাদাম নয়, আমার উঠোনের রেইনেতা আপেল[7] নয়। ওগুলো হল পাঁচটা প্রবচন। ওরা কখনই সেই স্পর্ধাটা দেখাবে না। ওটাই কেবল বাকি ছিল। ওগুলো পাঁচটা প্রবচন। ওগুলোকে প্রচুর উৎসাহ নিয়ে বলতে হয়। ওগুলো পাঁচটা প্রবচন। সেটা না করার অর্থ নিজেদেরই মূল্য কমিয়ে দেওয়া।     

কেবল: ওরা জাপানী জানে না। আর, জাপানী না জেনে তাদের পক্ষে জাপানী বলাটা কঠিনের থেকেও অনেক বেশি কিছু।


[1]বাচ্চারা আনিমে আর মাঙ্গার জগতে দুটো পরিপূরক বৈপরীত্য দেখে: একটা “যোদ্ধৃ মেজাজ”-কয়ে ফুটিয়ে তোলা আর একই সঙ্গে সেটা একটা টেডি বেয়ারের মত শিশুসুলভ আর কোমল।  

[2]টিভিতে zapping করার অর্থ একের পর এক চ্যানেল বদলাতে থাকা।  

[3]রুয়া কন্দ রেদন্দু লিসবনের প্রাণকেন্দ্রের একটা রাস্তা, এখানে স্ট্রিপটিজ় বা এই জাতীয় অনেক নাইটক্লাব আছে। প্রসঙ্গত রুইয়ের বাসও এই রাস্তাতেই।  

[4]কারাতের আক্ষরিক অর্থ “খালি হাত” (কোনোরকম হাতিয়ার ছাড়া খালি হাতে লড়াই করা)। কারাতে-দোওর অর্থ “শূন্য হাতের পথ/উপায়”; কারাতের আরও একটা ভাবনা হল একটা মারই যথেষ্ট – একটামাত্র ঘুষি বা লাথি লড়াইয়ের মীমাংসা করে ফেলতে পারে।    

[5]বুদোও মানে মার্শাল আর্ট।  

[6]Tamagotchi – বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে তামাগোৎচি জাপানে তৈরি একটা ডিজিটাল পোষ্য যেটাকে খাওয়াতে হত, বেড়াতে নিয়ে যেতে হত, ঘুম পাড়াতে হত। মূলত বাচ্চাদের জন্যে তৈরি এই খেলনাটি সারা বিশ্বে দারুণ জনপ্রিয় হয়।  

[7]রুইয়ের ছোটবেলায় স্বৈরতন্ত্রী শাসনকালে বাচ্চারা দেশের জাতীয়সঙ্গীতের প্যারডি করত। সাগরের বীরের (Heróis do mar) হয়ে যেত সাগরের ইলমাছ (eirozes do mar), মহান জনগণ (nobre povo) হয়ে যেত পচা বাদাম (nozes podres) আর সাহসী জাতী পোর্তুগাল (Nação valente de Portugal) হত আমার উঠোনের রেইনেতা (একরকমের আপেল) আপেল (Maçãs reinetas do meu quintal)। কিন্তু এই বাচ্চারা সেরকম কোন প্যারডি করছে না। ওরা স্রেফ জাপানী জানে না বলে বিকৃত উচ্চারণ করছে।

Rita Ray
  ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।    

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.