মারিয়ানেলা পর্ব ৯

Marianela 9
Benito Pérez Galdós
Benito Pérez Galdós
 স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি। তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা’,’জাতীয় ঘটনাক্রম’, ‘মারিয়ানেলা’, ‘দন্যা পেরফেক্তা’’ ইত্যাদি।
 বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের ‘লাস পালমাস’ নামক সুন্দর এক দ্বীপে। কর্নেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শু্নে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
 গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সালে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে ‘জাতীয় ঘটনাবলি’ রচনা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের এই আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে।বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খণ্ডের অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।
 ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন্যা পেরফেক্তা’(Dona Perfecta) অর্থাৎ ‘শ্রীমতী পারফেক্ট’। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়্যাল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার(উচ্চারণভেদে বারোখার )মতে ‘তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।‘ লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।
 ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ন ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন। কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন।
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

মারিয়ানেলা

পর্ব ৯

গোলফিনেরা

সোকার্তেস-এ এসে অবধি মোটেই একঘেয়ে লাগে না তেওদোরো গোলফিনের। এখানে আসা পর প্রথম দিন ভাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটালেন ল্যাবরেটরিতে আর পরের দিনগুলো খনির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ালেন, খুঁটিয়ে দেখলেন সবকিছু, দেখে তারিফ করতে লাগলেন, প্রকৃতির বিশাল শক্তি দেখে বিস্মিত হলেন আর মানুষের শিল্পকর্ম দেখে মুগ্ধ হলেন। খনি অঞ্চল সোকার্তেস-এ রাতে একমাত্র বয়লারের শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ শোনা যায় না, যন্ত্রসংগীতশিল্পী ডাক্তারের ভ্রাতৃবধূ সোফিয়ার বাজনা শুনে তিনি তো খুব খুশি, ভাই কার্লোস-এর স্ত্রী সোফিয়ার অনেকগুলো ছেলেমেয়ে মারা গেছে, তিনি এখন সন্তানহীনা।

 দুই ভাই বড়ো অমায়িক এবং সহৃদয়। খুব দরিদ্র পরিবারে এঁদের জন্ম, শৈশব থেকেই লড়াই করেছেন অশিক্ষা এবং দারিদ্রের বিরুদ্ধে, অনেকসময় নিজেদের পরাজিত ভেবেছেন; কিন্তু মনের জোরে বীরের মতো সংগ্রাম চালিয়ে শেষ পর্যন্ত হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছেছেন তীরে, ফেলে এসেছেন উত্তাল ঢেউ যার মধ্যে গরিব মানুষ ভেসে যায়।

 তেওদোরো বড়ো, তিনি হলেন ডাক্তার আর ছোটোভাই কার্লোস হলেন এনজিনিয়ার। ছোটোভাই যখনই চেয়েছেন তখনই সবরকম সাহায্য করেছেন দাদা, তারপর অভিযানের নেশায় চলে গিয়েছিলেন আমেরিকায়। সেখানে ইউরোপের বিখ্যাত চিকিৎসকদের সঙ্গে সমান তালে কাজ করলেন, দ্রুত অর্জন করলেন অর্থ এবং খ্যাতি। স্পেনের ভিন ভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণের পর যাত্রা করলেন ‘নতুন বিশ্বে’(লাতিন আমেরিকা), সেখানে অল্প কিছুদিন থেকে ফিরে এলেন। অভিযানে বেরিয়ে বারবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন, উদ্দেশ্য ছিল চক্ষুচিকিৎসার বিজ্ঞান সম্বন্ধে জ্ঞান সঞ্চয় করা কারণ  তাঁর পেশাইতো ছিল চোখের ব্যাধির চিকিৎসা।

 তাঁর মুখের গড়ন সাদামাটা, গায়ের রঙ বাদামি, সুঠাম শরীর যৌন-আবেদনে আকর্ষক, পুরু ঠোঁট, কালো কোঁকড়া চুল, দৃষ্টি উজ্জ্বল, ক্লান্তিহীন সবল তাঁর প্রকৃতি, যদিও দক্ষিণ আমেরিকার আবহাওয়ায় শরীর কিছুটা খারাপ হয়ে গেছে। তাঁর গোল বড়ো মুখাবয়ব, চওড়া কপাল, ছোটো করে কাটা খাড়া চুল, আগুনের গোলার মতো চোখ, পেশিবহুল হাত ইত্যাদি দেখে মানুষ তাঁর সম্বন্ধে বলে: ‘কালো  সিংঘ’। সত্যিই তাই, দেখে তাঁকে সিংহই মনে হয়, পশুরাজের মতোই তিনি  নিজের আধিপত্য জাহির করার কোনো সুযোগ নষ্ট  করেন না কিন্তু অন্য কারোর অহংকারের সঙ্গে এই মানুষটির আত্মবিশ্বাসের তুলনা চলে না কারণ তাঁর নামের সঙ্গে দুটি গৌরব যুক্ত: এক, শল্যচিকিৎসার প্রতি তাঁর আবেগ, দুই, দরিদ্র ঘরে জন্ম। সাজিয়ে গুছিয়ে পরিশীলিত ভঙ্গিতে কথা বলতে পারেন না বলে তাঁর কথায় কিছু ভুল থেকে যায়। বাক্যগুলো বলেন দ্রুত আর কেটে কেটে, তাঁর চিন্তাভাবনা ঠিক বোঝা যায় না, সবই যেন বিদ্যুতের মতো চমকায় আর তৎক্ষণাৎ নিভে যায়। সোফিয়া কোনো বিষয় তাঁকে জিগ্যেস করলে বলেন: “দেখতে হবে এ বিষয়ে আবাস এজেন্সি কী বলে”।

 –আমরা—তেওদোরো বলেন—যদিও মাঠের ঘাস থেকে এসেছি, এমন বংশধারা সবচেয়ে নীচু, সেখান থেকে আমরা সব হয়েছি মোটা মোটা গাছ……মানুষের উদ্যোগ এবং কর্মসাধনা দীর্ঘজীবী হোক…। আমার মনে হয় যে, আমরা গোলফিনেরা আপাতভাবে এসছি ‘মারাগাতেরিয়া’ থেকে তাই আমাদের শিরায় বইছে ইংরেজ রক্ত…এমনকি আমাদের  পদবিগুলো দেখে মনে হয় এসব খাঁটি স্যাক্সন জাতের। আমি ভেঙ্গে বলছি, ‘গোল্ড’ অর্থাৎ ‘সোনা’… ‘ফাইন্ড’ অর্থাৎ  ‘দেখা’…এ থেকে ‘গোলফিন’, তার মানে হচ্ছে আমরা ‘স্বর্ণসন্ধানী’…আমার ভাই মাটি খুঁড়ে সোনা খোঁজে আর আমি তা খুঁজি বিশ্বব্রহ্মান্ডের অপরূপ অভ্যন্তরে যার সংক্ষেপিত রূপ হল মানুষের চোখ।

 এই ইতিহাস সবটাই সত্যি আর তার মধ্যেই তিনি আমেরিকা থেকে ফিরলেন, নিউইয়র্ক—লিভারপুল রুট দিয়ে; তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর দেশত্যাগ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গেছে; কিন্তু তাঁর কথা কেউ বিশ্বাস করে না কারণ আগে দেখা গেছে তিনি যা বলেন তার উল্টোটা করেন।

 তাঁর ভাই কার্লোস সাধুপুরুষ, ধীরস্থির, পন্ডিত, কাজপাগল। খনি এবং ধাতু-বিষয়ক শাস্ত্রের প্রতি এত প্রেম যে, স্ত্রীর চেয়েও শতগুণ আবেগ আছড়ে পড়ে ওইসব বিষয়ে। কিন্তু তাতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে চিড় ধরে না। অন্যান্য সবদিক দিয়ে দুজনে সম্পূর্ণ ঐক্যমত নিয়ে সংসার করেন অথবা তেওদোরোর মতে ওঁরা ‘একের মধ্যে দুই’, একইরকম জমাটবাঁধা। ভাইটি সবসময় বিয়ে বিয়ে করতেন আর বলতেন; “বিয়েটা আমার ‘জোড়বাঁধা’, বিপরীতের জোড়”।

 রূপেগুণে সোফিয়া আদর্শ গৃহবধু, কিন্তু দিন দিন তাঁর মুখভার হতে থাকে কারণ ক্রমেই তিনি পৃথুলা হতে থাকেন, ব্যাপারটা দুঃখেরতো বটেই। লোকে বলত যে, পাথুরে কয়লার দেশে খনি অঞ্চলের হাওয়ায় মানুষের মেদ কমে যায়; সেই উদ্দেশ্যে এখানে আসা, ওঁরা বছরভর এই গ্রামে থাকবেন স্থির করলেন। অন্যদের পক্ষে চুনাপাথরের ধুলো আর ধোঁয়া বিরক্তিকর।

 সেই নারীর সন্তানেরা বাঁচল না, আর তখন থেকে তাঁর প্রধান কাজ হল পিয়ানো বাজানো এবং মহিলাদের সংগঠন তৈরি করে শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সেখানকার স্কুল এবং হাসপাতালের উন্নতিসাধন। তাঁর দাতব্য কর্মের জন্যে মাদ্রিদ শহরে অনেক বহর তাঁকে বিস্ময়কর নারী বলে মনে করা হতে থাকে এবং তাঁকে অনুকরনীয় বলে প্রচার হয়ে যায়। উচ্চবংশীয় দু-তিনজন পরোপকারী নারীর সাহায্যে কুড়িটিরও অধিক নাট্যানুষ্ঠান করলেন, এছাড়া মুখোশনৃত্য, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই ইত্যাদি সবই দরিদ্রসেবার লক্ষ্যে।

 তাঁর নানাবিধ সখ প্রায়শই বদলে যায় তবে তার মধ্যে একটা কুকুর আর বেড়াল পরিবৃত হয়ে থাকা, এই সখ দরিদ্রসেবার মত অবশ্য মহৎ নয় তবে এই প্রাণীগুলোর প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ভালোবাসার মতোই মনে হয়। সোকার্তেস-এ বসবাসকালীন তাঁর একটা কুকুর ছিল যার নাম ‘টয় টেরিয়ার’, এটি খনির কর্মশালার নির্দেশক ইউলিসিস বুল এনেছিলেন ইংলন্ড থেকে। সুন্দর এবং ভালো জাতের শিকারি কুকুরটা শিশুর মতো নরম স্বভাবের, ফুলের মতো সজীব। ওর নাম ছিল লিলি, ইংলন্ডে দাম নিয়েছিল দুশো দুরো।

 গোলফিনের জীবনে সুদিন যেমন ছিল দুর্দিনও এসেছিল, খারাপ সময়ে এঁরা পিয়ানো বাজাতেন, গান গাইতেন, তবে সোফিয়ার যে চিল চিৎকার সোকার্তেস-এ  তা গান বলে চলে যায় বইকি! এঞ্জিনিয়ারের কন্ঠস্বর চাপা; তেওদোরোর স্বর আরও নীচু; পাদ্রি-পুরোহিতের কোরাস দলে ওঁরা  যোগ দেন, সোফিয়ার গলা তাতে বেশ জোরালো শোনা যায়, তিনি মহিলা পুরোহিতের সম্মান পান। এইসব গানের যাই হোক না কেন, এই গান মানুষকে আত্মত্যাগের ভাবে উজ্জীবিত করে।

 বেড়াতে বেরোলে ওঁরা সাধারণত বাইরেই বিকেলের খাবার খান। এক বিকেলে(সেপ্টেম্বর মাসের শেষ, তেওদোরো খনিতে আসার ছদিন পর) অ৬রা বেড়িয়ে ফিরে আসছেন সার বেঁধে: ‘লিলি’,সোফিয়া, তেওদোরো, কার্লোস। পথটা এত সরু যে দুজন পাশাপাশি হাঁটা যায় না। ‘লিলি’র গায়ে নীল রঙের গরম পোশাক, তাতে মালকিনের নামের আদ্যাক্ষর লেখা। সোফিয়ার কাঁধে ছাতা, তেওদোরোর লাঠিটাও কাঁধে, তার ডগায় ঝোলানো টুপি। হাওয়ায় ঘুরতে বেশ ভালো লেগেছে ওঁর। ‘ত্রাসকাভা’র ধার দিয়ে হাঁতার সময় ‘লিলি’ ছোটো ছোটো পায়ে দ্রুত অন্য পথে চলে যায়, ঢালু ঘাসের জমিতে ছোটে। প্রথমে ছুটছিল, পরে গড়িয়ে যেতে থাকে, সোফিয়া আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন। মায়ের মতো আদরের সুরে ডাকতে ডাকতে তার পেছনে ছোটেন, বিপজ্জনক অবস্থা, কিন্তু তাঁর স্বামী ধরে ফেলেন, বলেন;

–‘লিলি’ জাহান্নমে যাক, ঠিক ফিরে আসবে। এখানে নামা যায় না, খুব পেছল।

–‘লিলি’, ‘লিলি’…সোফিয়া চিৎকার করে ডাকতে থাকেন, ভাবেন যে, তাঁর আদরের  ডাক শুনে সে থেমে যাবে, হারিয়ে যেতে পারবে না।

 এমন  মিষ্টি ডাকেও ‘লিলি’র ভাবান্তর দেখা গেল না, সে নেমেই যেতে লাগল। মাঝে মাঝে মালকিনের দিকে তাকায়, তার কালো চোখ দুটো যেন বলে:  ‘সেন্যোরা, ঈশ্বরের দোহাই,অবুঝের মতো কাজ করবেন না।’

 সাদা খাড়া একটা পাহাড়ে থেমে যায় ‘লিলি’, পাতালে নামের মুখটা আগেই দেখা গিয়েছিল, সেখানকার কাঁটাঝোপে ঢাকা পড়ে যায় সে। সবার চোখ সদিকে, ওঁরা হঠাৎ দেখতে পান কী একটা নড়ে উঠল। ওঁরা ভাবলেন কোনো  ভয়ার্ত জন্তু আড়ালে গা ঢাকা দিল, কিন্তু সোফিয়া চিৎকার করে উঠলেন আবার, তাতে ভয়ের চেয়ে বিস্ময় বেশি।

 –এতো নেলা!…।নেলা এখানে কী করছিস?

 নিজের নাম শুনে মেয়েটা ভয়ে আর লজ্জায় একেবারে কুঁকড়ে যায়।

 –আরে পাগলি,এখানে কী করছিস?…সোফিয়া আবার বলেন:   ‘লিলি’কে ধর, এনে দে আমার কাছে…হায় ঈশ্বর, তোমার দয়ায় ওকে দেখতে পেলাম। কোথায় ঢুকে পড়েছে দ্যাখো। তোমার দোষেই আমার ‘লিলি’টা নেমে গেল…কী শেখাচ্ছ ওকে, অ্যাঁ? তোমার দোষেই তার এমন বাড় বেড়েছে, যা ইচ্ছে তাই করছে।

 –ওই মেয়েটা বাররাবাস-এর স্বভাব পেয়েছে—দন কার্লোস বললেন দাদাকে— কোথায় নেমেছে দেখলে?

 ‘ত্রাসকাভার’-এর ধারে এইসব কথাবার্তা চলছে এমন সময় নেলা ধরার চেষ্টা করে ‘লিলি’কে। কুকুরটা আজ খুব দুষ্টুমি করে  ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে, এতদিন বাড়িতে একঘেয়ে বাঁধা জীবনে এমন স্বভাব দেখা যায়নি, সে মেয়েটার হাত ফসকে পালায়। সোফিয়া আবার চিৎকার করতে থাকেন, তাঁর ধৈর্য আর আদর-আহ্লাদ লোপ পায়, কিন্তু কুকুর তাতে ভ্রুক্ষেপ করে না, মহিলার প্রতি কোনো দরদ না দেখিয়ে সে পালিয়ে যেতে যেতে তাঁর দিকে তাচ্ছিল্য-ভরা চোখে তাকায় আর যেন বলে:

 –সেন্যোরা, তোমরা যেমন ইচ্ছে বেড়াও, আমাকে শান্তিতে থাকতে দাওতো।

 গুহার মুখে কাঁটাগাছের ঝোপের ভেতর আটকে পড়েছে নরম তুলতুলে ‘লিলি’; তার গায়ের গরম জামাটাকে কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না সে। বেরোতে না পেরে লিলি চিৎকার করে ডাকছে, কাতরভাবে সাহায্য চাইছে। বাঁচাতে বলছে কাঁদো কাঁদো স্বরে।

 –হায়, আমার ‘লিলি’ আর আসবে না! আমি আর বাঁচব না!হায়, হায়, সব গেল আমার!

 সোফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেঃ

 –এই নেলা, নেলারে, যদি ওকে বের করে আনতে পারিস তোকে আমি বড়ো কুকুর দেব। বের করে আন ওকে… যা—খুব সাবধান…ভালো করে ধরবি কিন্তু!

 সাহস করে নেলা এগিয়ে যায়, ঝোপঝাড় ভেদ করে এক হাতে বড়ো বড়ো শাখাগুলো সরিয়ে অন্য হাতটা বাড়িয়ে ‘লিলি’র ল্যাজ ধরে ফেলে, টেনে বের করে আনে ঝোপ থেকে। কুকুরটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে নেলা দিগ্বিজয়ীর মতো গুহা থেকে ওপরে উঠে আসে।

 –তুই, তোর, তোর দোষ–, কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলেন সোফিয়া, ‘লিলি’র মাথায় তিনবার আলতো করে চাপড় দিলেন, তুই যদি ওই জঙ্গলের  ভেতর ঢুকে না যেতিস…যেখানেই যাস তোকে ঠিক তুলে আনব…দুষ্টুটা আমার!

 পথভ্রষ্ট জীবটাকে চুমু খেয়ে তিনি তার পাছায় দুবার চাপড় দিলেন, তাঁর মনে হয় যে, তেমন কিছুই হারায়নি, পেয়ে গেছেন অমূল্য রত্ন, কুকুরের গায়ের গরম-জামা ঠিকঠাক করে দিলেন, তারপর  আদর করে নেলার কোলে দিয়ে বললেন:-

 –নে, কোলেই রাখ, বড্ড ক্লান্ত হয়ে গেছে বেচারা আর বেশি হাঁটলে ওর শরীর খারাপ হবে।সাবধানে নে…। আমাদের আগে আগে হাঁট…আবার বলছি, সাবধানে ধর…কেমন করে নিয়ে যাচ্ছিস আমি পেছন থেকে দেখতে পাব।

 পরিবারটি আবার  হাঁটতে শুরু করল, সামনে নেলা। ওর ঘাড়ের ওপর থেকে ‘লিলি’ তার মালকিনকে দেখতে পাচ্ছে, সে বোধহয় বলছে:

 –এই যে আমি, তুমি কি বোকা!

 সুন্দর ‘লিলি’র এত মারাত্মক বিপদ ঘটে গেল, নিজের চোখে দেখেও তেওদোরো গোলফিন এতক্ষণ একটি কথাও বলেননি, কিন্তু খোলা মাঠে ওঁরা পাশাপাশি  যখন হাঁটছেন তখন ভাই এবং ভাইয়ের বউকে বললেন:

 –আমি ভাবছি, সোফিয়া কিছু মনে কোরোনা, ওই জীবটার জন্যে তুমি খুব কষ্ট পেয়েছ। দুশো দুরোতে কেনা কুকুরছানা আর পাঁচটা ফেতি কুকুরের মতো নয়, একথা মানতেই হবে। আমি জিগ্যেস না করে পারছি না কেন তুমি ওই ছোট্ট কুকুরটার গরম জামা তৈরির জন্যে এত সময় আর টাকা খরচ করলে অথচ নেলার জন্যে একজোড়া জুতো কিনে দেওয়ার কথা তোমার মনে হল না!

 –জুতো? নেলার জন্যে? — হাসতে হাসতে উচ্চকন্ঠে বলেন সোফিয়া–; জুতো নিয়ে ও কী করবে?… দুদিনে জুতোর দফারফা করে ছাড়বে। আমার কথা শুনে হাসতে পারেন, যেকেউ ঠাট্টা করতেও পারে। হ্যাঁ, আমি বুঝি যে, ‘লিলি’র জন্যে এতকিছু করা বাড়াবাড়ি… কিন্তু আমার দান করার ইচ্ছে নেই, এই অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে করা উচিত নয়…এমন কথা আপনি বলতে পারেন না—একথা বলার পর সোফিয়া গম্ভীর হয়ে যান, তাঁর মুখেচোখে অহঙ্কারী অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে—। একথাও বলতে পারি যে, দানধ্যানের কাজে আমার বুদ্ধি এবং আন্তরিকতা কারও চেয়ে কম নয়… ভিক্ষে দিলেও দেখতে হয় যেন সেটা অপাত্রে না পড়ে। এখন আপনি আমাকে শেখাচ্ছেন! … দেখুন, তেওদোরো, আপনি যেমন চোখের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ আমিও এ ব্যাপারটায় অভিজ্ঞ।

 –হ্যাঁ,হ্যাঁ, আমরা জানি, তুমি অসামান্য কান্ড করেছ! আমাকে আর বলতে হবে না যে, নাটকের অভিনয়, নাচ, ষাঁড়ের লড়াই সবই তুমি করেছ গরিবদের কল্যাণের জন্যে; লটারিতে মোটা অঙ্কের টাকা খাটিয়ে যা পেয়েছ তার অনেকটা অলস মানুষদের খাওয়ায় চলে গেছে, অসুস্থ মানুষরা পেয়েছে অতি সামান্য। এসব দেখেশুনে আমার মনে হয় যে, এই সমাজ নাচ, গান, নাটক আর লটারিতে যতটা আগ্রহী তার সামান্য অংশ দাতব্য কর্মে নয়।ওকথা বলে লাভ নেই; আমি জানি এসব বড়ো বড়ো অনুষ্ঠানের দাম আছে, আমি স্বীকার করছি। কিন্তু তুমি আর তোমার বান্ধবীরা কখনও হতদরিদ্র মানুষের কাছে গিয়ে তার মুখ থেকে শোনেনি এই দুর্দশার কারণ কী… কিংবা তার দারিদ্র কী ধরণের, কীসের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ, আর এমন কিছু নিদারুণ কষ্টে থাকা লোক আছে যাদের একটা কয়েন কিংবা এক টুকরো রুটি ছুঁড়ে দিলে দুঃখ লাঘব একেবারেই হয় না……

 –আমাদের আদর্শের মধ্যে এই প্রচারের কথা আছে– বিরক্ত মনে সোফিয়া বলে—আমি  কী করেছি না করেছি তার কতটুকু জানেন আপনি?

 –আরে রাগ কোরোনা বোন—গোলফিন বলেন–; আমার যুক্তি শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র কথায় দাঁড়ায়, তা হল এই যে, নেলার জন্যে একজোড়া জুতো তুমি কিনে দিতে পারতে।

 –আমি কথা দিচ্ছি, কালই সে জুতো পাবে।

 –না, তা হবে না কারণ আজ রাতেই আমি ওকে জুতো কিনে দেব। এ ব্যাপারে তোমাকে কিছু করতে হবে না।

–এই…নেলা! –অনেকটা দূরে চলে গেছে বলে সোফিয়া চিৎকার করে ডাকলেন ওকে–, কাছাকাছি থাক, আমি দেখব তুই কীভাবে ‘লিলি’কে নিয়ে যাচ্ছিস।

 –বেচারা! –কার্লোস বলেন–। কে বলবে যে মেয়েটার ষোলো বছর বয়েস!

–বাড় নেই। কী লজ্জার কথা! —সোফিয়া বলেন— আমার নিজের মনে হয় ঈশ্বর এদের বাঁচিয়ে রাখেন কেন? …নিজের  মনেই প্রশ্ন  করি:  এর জন্যে কী করার আছে? কিচ্ছু না, শুধু খেতে দেওয়া আর পোশাক কিনে দেওয়া ছাড়া কী করার আছে… সবাই জানে… জামাও ছিঁড়ে ফেলে, যা গায়ে দেয় সব কিছুই  সে নষ্ট করে ফেলে। কোনো কাজ  করতে পারে না, কাজ করতে গেলেই অজ্ঞান হয়ে যায়; কিছু করার মতো সামান্য শক্তি তার নেই। পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে বেড়ানো, গাছে ওঠা, সারাদিন টো টো করে ঘোরা আর পাখির মতো গান গাওয়া, এইতো ওর কাজ, যা গায়ে দেয় কদিন পরেই ছিঁড়ে যায়।

 –তবে আমি নেলার মধ্যে লক্ষ করেছি –কার্লোস বলেন— ওর বন্য স্বভাবের মধ্যেও আছে বুদ্ধি এবং উদ্ভাবনী শক্তি। না, নেলা উজবুক কিংবা বেকুব নয়। কেউ ওকে লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্ব নিলে ও অধিকাংশ ছেলেমেয়েদের চেয়ে এগিয়ে যেতে পারত। কী? পারত না? নেলার কল্পনাশক্তি আছে; সামান্যতম লেখাপড়া শেখেনি বলে ওই কল্পনাপ্রবণ মেয়েটা হয়ে গেছে কুসংস্কার এবং আবেগে আচ্ছন্ন।

 –ঠিক তাই, আদিম মানুষের এই রকমই হয় –বলেন তেওদোরো— ও পড়ে আছে পশুপালনের যুগে।

–গতকালই –কার্লোস বলেন— আমি ‘ত্রাসকাভা’র পাশ দিয়ে যাবার  সময় ওকে এই জায়গায় দেখেছিলাম, আজ যেমন দেখলাম ঠিক তেমন। ডাকলাম আমি, বেরিয়ে এল, ওখানে কী আছে জিগ্যেস করলাম, অতি সরলভাবে আমাকে বলল যে, মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল… তুমি জান না যে, নেলার মা ওই গহ্বরে নেমে বেরোতে পারেনি।

 –তার মানে, ও আত্মহত্যা করেছিল –সোফিয়া বলেন— ওই মহিলার জীবন ছিল খারাপ, শুনেছি ওর স্বভাবে অনেক দোষ ছিল। লোকে বলে, মদে চুর হয়ে থাকত সবসময়। এঞ্জিনে কয়লা দেয় যারা তাদের মতো মাতাল হয়ে থাকত। এইসব মানুষেরা অপরাধ করে সবার মতোই বেঁচে থাকে, নোংরা জীবন ওদের ভালো লাগে, এরা আত্মহত্যা করলে মানুষের দরদ উথলে উঠবে কেন? ভয়ঙ্কর কত কিছু আছে এই সমাজে, এমন মানুষ আছে যাদের জন্মানো ঠিক নয়, না, তেওদোরো সূক্ষ্ম যুক্তি দেবেন, যা খুশি বলতে পারেন কিন্তু আমি বলব…-

 –না, না, শোনো বোন— তেওদোরো জোর দিয়ে বলেন— আমি বলব যে, আত্মহত্যা যে করে তার প্রতি আমাদের আন্তরিক করুণা থাকা উচিত। যতখুশি গালমন্দ তুমি করতে পার কিন্তু একইসঙ্গে…ভাবতে হবে কী কারণে এমন ভয়াবহ পরিণতির দিকে মানুষ যায়…সমাজ যদি তার বাঁচার অনুকূল না হয়, যদি কোনো সহায় না থাকে তাহলে মানুষ এমন অন্ধকার পথ বেছে নেয়…

 –সমাজের সাহায্য! কেউ কেউ অবশ্যই… —সোফিয়া রাগতভাবে বলেন— সমাজ সকলকে সাহায্য করতে পারে না। পরিসংখ্যান দেখুন, তেওদোরো, দেখুন একবার… গরিবের সংখ্যাটা দেখুন… কিন্তু সমাজ কাউকে কাউকে সহায়তা দেয় বৈকি, কিন্তু ধর্ম কার কাজে লাগে?

 –সমস্তরকম দুর্দশার মধ্যে চরম বলে যদি কিছু চিহ্নিত করা হয় তাহলে আমি বলব তা হল অশিক্ষা, অজ্ঞতা… কুসংস্কারাচ্ছন্ন হতভাগ্য মানুষ ঈশ্বর সম্বন্ধে কিছু অস্পষ্ট অসম্ভব ভাবনা নিয়ে বসে থাকে… নিরক্ষর মানুষ তাকে সঠিক পথটা দেখাতে পারে না, নিয়ে যায় অপরাধের পথে; অজ্ঞ নিরক্ষর মানুষকে ধর্মও কিছু দিতে পারে না। শেষ পর্যন্ত আছে আদালত, বিচারক তাকে পাঠায় কারাগারে… তোমাদের নিজেদের কর্ম কঠোর শাস্তি পাচ্ছে, এমনই নিষ্ঠুর আইন। সামনেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তোমাদের প্রিয় বাসস্থানটির নীচে,পরিত্যক্ত মানুষের দঙ্গল,জীবনে তারা কিছুই পায়নি… তোমরা চোখের সামনে দেখতেই পাচ্ছ, হ্যাঁ… কখনও  তোমরা ওদের মধ্যে সামান্যতম  মর্যাদা  দাওনি যাতে ওরা বুঝতে পারে যে,ওরা মানুষ, দাওনি প্রয়োজনীয় কিছু শিক্ষা; মনুষত্বের অপমান দেখেও ভাবনি যে,পশুর মতো যান্ত্রিক জীবনযাপন থেকে তাদের একটু উন্নত করা যায়; দেখছ ওরা কেমন অস্বাস্থ্যকর ঘরে বাস করে, অখাদ্যকুখাদ্য খায়, দিন দিন ওদের মধ্যে বর্বরতা প্রকাশ পায়, তোমরা যে আরাম ভোগ কর তার ছিঁটেফোঁটাও ওদের দেবার কথা ভাবনি…তোমাদের  সব উদ্যম ওদের হত্যাকান্ড, চুরিডাকাতি আর আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে কিন্তু এইসব অপরাধ নিবারণের জন্যে স্থায়ী কোনো শিক্ষালয় গড়ার কথা  তোমাদের মনে হয়নি।

 –আমি জানি না সহায়তা কেন্দ্রগুলো কী করে –সোফিয়ার কন্ঠে তিক্ততা— পরিসংখ্যানটা একবার দেখুন তেওদোরো, পড়ুন একবার, দেখুন এই হতভাগ্যদের সংখ্যা…পড়ে দেখুন…

 –আমি পরিসংখ্যান পড়ি না, বুঝলে বোন, তোমার পরিসংখ্যানে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আশ্রয়কেন্দ্র ভালো নিশ্চয়ই কিন্তু অনাথদের ভয়াবহ সমস্যা সমাধানের পক্ষে তা অপ্রতুল। হতভাগ্য অনাথ শিশুরা টো টো করে ঘুরে বেড়ায় রাস্তায় কিংবা মাঠেঘাটে, তাদের ভাগ্যে জোটে না মানবিক সহানুভূতি, পুরসভার তরফ থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু পরিবারের উষ্ণতা মেলে না কোনোদিন, তাদের অন্তরে এই অভাববোধ থেকে যায় চিরকাল। ওঃ! শূন্য হৃদয়ে ওই উত্তাপ বড়ো দরকার। খুব কমই দেখা যায় যে,মানুষের মতো মর্যাদা, মহত্ত্ব এবং সম্মান আপনা থেকেই আসে কারও কারও মধ্যে। এই বিষয়ে আমার একটা ভাবনা আছে; একেবারেই ব্যক্তিগত চিন্তা, তোমাদের মনে হতে পারে, এসব উদ্ভট কল্পনা।

 –বলো না আমাদের , শুনি।

 –অনাথ কিংবা  শৈশবের দুর্দশাজনিত সমস্যা সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়, যেমন তোমরা সঙ্গীদের নিয়ে অন্যান্য সামাজিক ব্যাধিও দূর করতে পারবে না, কিন্তু এত বিশাল অব্যবস্থার কিছু উপশম অবশ্যই হবে; এরপর আইনের সাহায্যে দরকার হলে আইন প্রনয়ণ করে ঘোষণা করা যেতে পারে… না,এটা ঠাট্টার বিষয় নয়… যেকোনো অনাথ, তার জন্ম যেখানেই হোক না কেন, নিজের অধিকারে দত্তক সন্তানের সম্মান পাবে, যাদের সন্তান নেই তারা নিজেদের পরিবারে তাকে গ্রহণ করবে। এমনভাবে তাকে পালন করা হবে যে, অনাথ শিশু ভাববে না যে তার মা-বাবা নেই, আর মা-বাবারও মনে হবে না যে, তাদের নিজেদের সন্তান নেই।

 –আপনার মতে— সোফিয়া বলেন— এমন ব্যবস্থা হতে পারে যে, আমরা নেলার মা-বাবা হয়ে যাব।

 –কেন নয়?— তেওদোরো বলেন-, তখন আমরা একটা কুকুরছানা কেনার জন্যে দুশো  দুরো খরচ করব না আর ‘লিলি’র আদরযত্ন নিয়ে সারাটা দিন ব্যস্ত থাকব না।

 –এই মজার আইন থেকে কেন ছাড় পাবে ধনী অবিবাহিতরা? তারা প্রতিবেশীদের সন্তানদের মতো কেন পালন করবে না অনাথকে?

 –আমার আপত্তি নেই— মাটিতে চোখ নামিয়ে বলেন ডাক্তার— কিন্তু এটা কী?… রক্ত! সবার চোখ মাটিতে, রক্তের দাগ লেগে আছে রাস্তায়।

 –হা যিশু! —চোখে হাতচাপা দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন সোফিয়া–নেলার রক্ত নিশ্চয়ই।  তার পা কেটে রক্ত বেরিয়েছে!

 –এইতো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে… তোমাদের সাধের ‘লিলি’কে ধরার জন্যে কাঁটাঝোপের ভেতরে ঢুকেছিল সে। নেলা, এদিকে আয়।

 ডান পা থেকে রক্ত ঝরছে, নেলা  খোঁড়াতে খোঁড়াতে কাছে আসে।

 –বেচারা ‘লিলি’ আমার, দে, আমার কোলে দে –সোফিয়া তার কুকুরটাকে নিয়ে বলেন—, ওর গায়ে যেন আঘাত না লাগে।  তোর পায়ের যন্ত্রণা হচ্ছে না? ও!  তেমন কিছু নয়। ওঃ কি রক্ত! …এসব আমি দেখতে পারি না। সংবেদনশীল এবং নার্ভাস সোফিয়া চোখ ফিরিয়ে নেন, ‘লিলি’কে আদর করতে থাকেন।

 –দেখি, দেখি কী হয়েছে? —নেলাকে টেনে কাছের এক পাথরের ওপর বসান। চশমা পরে ভালো করে দেখেন নেলার পা।

 –না, তেমন কিছু না:  দুতিন জায়গা ছড়ে গেছে… মনে হচ্ছে, কাঁটা ফুটে আছে… জ্বালা করছে? হ্যাঁ, এইতো, এখানে কাঁটা ফুটেছে… দাঁড়া, এক মিনিট। সোফিয়া, সার্জিক্যাল অপারেশান দেখে কষ্ট হলে তুমি পালাও এখান  থেকে।

সোফিয়া ভয় পেয়ে সরে যান, তাঁর মহামূল্যবান স্নায়ু এসব থেকে যথাসাধ্য দূরে থাকতে অভ্যস্ত। তেওদোরো তাঁর হাতবাক্স থেকে কয়েকটা যন্ত্র বের করেন এবং  মুহূর্তের মধ্যে কাঁটাটা বের করে আনেন।

 –সাহসী মেয়ের সহ্যশক্তি বেশি থাকে, –নেলার শান্ত মুখ দেখে বলেন ডাক্তার, –এবার ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতে হবে।

 নিজের রুমাল দিয়ে ক্ষতস্থান তিনি বেঁধে দিলেন। নেলা হাঁটার চেষ্টা করে। কার্লোস তার হাত ধরেন।

 –না, না, এখানে আয়— তেওদোরো মেয়েটাকে কাঁধে তুলে নেন।

 –আমার মাথা ধর, খুব শক্ত ওটা। এবার লাঠি আর টুপিটা নে।

 সোফিয়া ওদের দেখে হাসিতে গড়িয়ে পড়ে। তেওদোরোর কাঁধে নেলা, তার হাতে লাঠি আর টুপি।

Tarun Kumar Ghatak
 তরুণ কুমার ঘটক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও  হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।‘দন কিহোতে’ এবং‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক। ‘দন কিহোতে' লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ। 

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *