মারিয়ানেলা পর্ব- ৮

বাংলা English
Benito Pérez Galdós
Benito Pérez Galdós
বেনিতো পেরেস গালদোস (১৮৪৩—১৯২০)
  
    স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি। তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা’, ‘জাতীয় ঘটনাক্রম’। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা' ইত্যাদি।
    বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে। কর্নেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
   গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সাল থেকে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খণ্ডে অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।
   ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন্যা পেরফেক্তা’(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়্যাল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার ) মতে ‘তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।’ লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।
   ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ন ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন।  কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন।
   
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

                       পর্ব – ৮

আবোলতাবোল চলছেই

পরের দিন পাবলো আর ওর গাইড আগের দিনের  মতোই সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল; কিন্তু আকাশ মেঘলা, অস্বস্তিকর ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, ঝড় ওঠার আশঙ্কা আছে, তাই ওরা স্থির করল যে, অনেকটা পথ হাঁটবে না। ‘আলদেয়াকোর্বা’র সর্বসাধারণের মাঠ পার হয়ে ওরা খনির গর্তের দিকে হাঁটে, ওদের ইচ্ছে খননের জায়গাটার দিকে যাবে।

  -নেলা,আজ তোমাকে এমন একটা কথা বলব যা শুনলে তুমি আনন্দে লাফিয়ে উঠবে —বাড়ি থেকে খানিক দূরে গিয়ে অন্ধ যুবক বলল:

  -নেলা, আমার বুকের মধ্যে আনন্দের ঢাক বাজছে…মনে হচ্ছে যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, প্রকৃতি ইত্যাদি থেকে যা শিখেছি সব আমার ভেতরে প্রবেশ করে সার বেঁধে চলছে…এক শোভাযাত্রার মতো। গতকাল আমাদের বাড়িতে যারা এসেছিলেন তাদের তো দেখেছ…দন কার্লোস আর ওর ভাই, আমরা যাকে রাতে দেখেছিলাম। তিনি এক বিখ্যাত জ্ঞানী মানুষ আমেরিকার রাজ্যে রাজ্যে ঘুরে আশ্চর্য চিকিৎসা করেছেন, দূরারোগ্য অসুখ সারিয়েছেন…দন কার্লোস আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাই আমাকে দেখার জন্যে তাঁকে অনুরোধ করেছেন…কি সদাশয় মানুষ তিনি! প্রথমে আমার সঙ্গে কথা বললেন; অনেক কিছু আমাকে জিগ্যেস করলেন, তারপর অনেক মজার মজার কথা বললেন। শেষে আমাকে শান্ত থাকতে বললেন, আমার চোখের পাতায় তাঁর আঙ্গুলের নরম স্পর্শ পেলাম…কিছুক্ষণ পর কিছু বললেন, আমি সেসব কথা বুঝতে পারিনি, ডাক্তারি কথা। তারপর আমাকে জানালার কাছে নিয়ে গেলেন। একটা যন্ত্র দিয়ে আমাকে দেখছিলেন বুঝতে পারলাম, কি যন্ত্র তা বুঝতে পারিনি, তখন সেই ঘরে একটুও শব্দ হয়নি। দেখা শেষ হলে ডাক্তার আমার বাবাকে বললেন;

  -চেষ্টা করব।

 খুব নীচু স্বরে আরও কিছু কথা বলছিলেন, আমি বুঝতে পারিনি, মনে হয় ওঁরা ইশারায় কথা বলছিলেন। ওঁরা চলে যাবার পর বাবা আমাকে বললেন:

  -বাবা,আমার মনে যে আনন্দ হচ্ছে তোর কাছে তা আমি গোপন রাখতে পারছি না। ওই ভদ্রলোক ঈশ্বরের দূত,আমাকে আশার কথা বললেন, সামান্য, কিন্তু এই প্রথম আশার কথা শুনলাম, তাই সেটা অনেক বড়ো মনে হচ্ছে। ওই আশাটুকু ঝেড়ে ফেলে বলছি, এ অসম্ভব, না, না, প্রায়  অসাধ্য কাজ, কিন্তু সেটা…আমার মনে জাঁকিয়ে বসে আছে, পাহাড়ের গায়ে যেমন আটকে থাকে শ্যাওলা। আমার বাবা আমাকে এভাবেই বললেন। তাঁর কন্ঠস্বর শুনে

বুজতে পারছিলাম কাঁদছিলেন…নেলা, কী করছ? নাচছ নাকি?

  -না, এইতো, তোমার পাশেই আছি।

  -আমি আনন্দের কথা বললেই তুমি নেচে উঠতে তাই…জিগ্যেস করলাম…কোনদিকে যাব আজ?

 -দিনটা অলক্ষুণে। চলো ‘ত্রাসকাভা’র দিকে হাঁটি, ওটা ঢাকা জায়গা, পরে নেমে আসব ‘বারকো’(জাহাজ) এবং ‘তেররিবলে’(ভয়ঙ্কর)-এর দিকে।

  -ঠিক আছে, তুমি যা চাও…আঃ, নেলা তুমি আমার সঙ্গিনী বলে কথাটা বলছি, যদি সত্যিই সেরকম কিছু ঘটে যায়, যদি ঈশ্বর আমার প্রতি সদয় হন, তোমাকে চোখে দেখার অপ্রত্যাশিত আনন্দ পাব!…যদি একদিনের জন্যেও আমার দৃষ্টি পাই, পরে না হয় আবার অন্ধ হয়ে যাব তাহলেও আমি ঈশ্বরকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাব।

 নেলা কোনো কথা বলে না। আনন্দের উচ্ছ্বাস দেখাবার পর আকশে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে থাকে।

  -কত আশ্চর্য কান্ড এ পৃথিবীতে দেখা যায়— পাবলো বলে- আর ঈশ্বরের করুণা ঝরে পড়ে…আবার হঠাৎ নেমে আসে তাঁর ক্রোধ। আপনা আপনি এসে পড়ে, অনেক অত্যাচার আর শাস্তি সহ্য করার পর, ঠিক  যেমন চিরস্থায়ী নিশ্চিত সুখ বলে যা ভাবা হয় তারপরই ক্রোধ, তোমার কী মনে হয়?

  -হ্যাঁ, তুমি যা আশা করছ তাই হবে— ধীরস্থিরভাবে নেলা বলে। নিরুত্তাপ উত্তর নেলার।

  -কীকরে জানলে তুমি?

   -আমার মন বলছে।

  – ও, তোমার মন বলছে? এসব খবর সত্যি হয় না কেন? —পাবলোর আর্ত জিজ্ঞাসা। হ্যাঁ, কোনো কোনো বিশেষভাবে নির্বাচিত মন ভবিষ্যৎ ধরতে পারে। নিজের মধ্যে আমি তা লক্ষ করেছি, আমি চোখে দেখি না বটে তবে মাঝে মাঝে আমার অন্তরাত্মা ফিসফিস করে দুর্বোধ্য কিছু বলে যায়। তারপরই ঘটনা ঘটে, আচমকাই ঘটে, অবাক হয়ে আমি বলিঃ ‘এমন ঘটবে আমি জানতাম’।

  -আমারও হয় ঠিক এইরকম— নেলা বলে— গতকাল তুমি বলেছিলে যে, আমাকে তুমি খুব ভালোবাস। বাড়ি যেতে যেতে নিজের মনে বলেছিঃ

  -এতো বিরল ঘটনা, কিন্তু এরম ঘটবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

  -আ

  -অদ্ভূত কান্ড, আমাদের মনের কি মিল দেখেছ! একটা বন্ধন নেই, কিন্তু ইচ্ছেরা জোড় বেঁধে রয়েছে। যে অমূল্য ইন্দ্রিয়টি আমার নেই তা যদি ফিরে পাই তাহলে জোড় বাঁধার সুতো তৈরি হয়ে যাবে। দেখার আগেই তোমাকে ভালোবাসার ভাবনাতে আমি বিভোর থেকেছি, কাজেই দেখতে পেলে আমার ভাবনার পরিবর্তন ঘটবে না একটুও। দেখার সৌভাগ্য থাকলে নতুন করে বিস্মিত হব, তাছাড়া আর কিছু নয়, ভালোবাসার মতো মনটাতো আমি আগেই পেয়ে গেছি…কিন্তু মনে হচ্ছে, আজ তুমি বিষণ্ণতাবোধে আচ্ছন্ন।

  -হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ, আজ মনটা ভালো নেই…সত্যি কথা বলতে কী, জানি না আজ এমন হচ্ছে…আনন্দ হচ্ছে খুব, আবার তেমনই দুঃখ হচ্ছে, একসঙ্গে দুই মনোভাব। আজকের দিনটা কি বিশ্রি! …দিন না এলেই ভালো হত, রাত হয়ে থাকত দিনের বদলে, বেশ হত তাহলে।

  -না, না অমন বোলো না, যা আছে তাই থাকুক, রাত আর দিন যেমন হয় হোক। ঈশ্বরের দয়া হলে আমি তফাতটা আরও ভালো বুঝতে পারব।  কত যে আনন্দ হবে আমার! …আমরা এখানে থেমে গেলাম কেন?

 -বিপজ্জনক জায়গা। আমরা সরু রাস্তাটা ধরব।

 – ও? ত্রাসকাভা? ভেজা ঘাসের পথ নেমে হারিয়ে গেছে গহ্বরে। ওখানে পড়ে গেলে বেরিয়ে আসা যায় না। জায়গাটা আর ভালো লাগছে না, চলো নেলা, এখান থেকে চল যাই।

  – হাঁদা, এখান থেকে গুহা পর্যন্ত অনেকটা হাঁটতে হবে। আজ কী সুন্দর লাগছে!

  নেলা থেমে সঙ্গীর হাত ধরে, গহ্বরের মুখটা দেখে, সমতলে ওই মুখ অনেকটা তেরচা ফানেলের মতো লাগছে। ছোটো গর্তের মুখে যাবার পথ কচি ঘাসে আবৃত হয়ে রয়েছে। আর একটু দূরে বাঁকা বাঁকা পাহাড় নানাবিধ জংলি ঝোপে ঢাকা, তার ভেতর ফুটে আছে অসংখ্য নানারঙের বুনো ফুল। একটা বিশাল জিভের মতো দেখাচ্ছে। তার পাশে কল্পনা করা যাচ্ছে, কল্পনা কেন, দেখা যাচ্ছে একটা গর্ত, ঘন ঘাসে চাপা পড়ে গেছে তার মুখ, এর সঙ্গে তুলনা করা যায় সেই দৃশ্যের যেখানে দন কিহোতে ঝোপঝাড় কেটে ফেলে মঁতেজিনোর গুহায় নামছেন দড়িতে ঝুলে।

 নেলা দেখে যাচ্ছে একদৃষ্টে।

 -ভয়ঙ্কর ‘ত্রাসকাভা’কে সুন্দর বলছ কেন? —বন্ধু জিগ্যেস করে তাকে।

 -বলছি কারণ এর ওপর ফুটে আছে অনেক ফুল। গতসপ্তাহে সব শুকিয়ে গিয়েছিল, আবার ফুটেছে, নতুন নতুন ফুল, দেখতে কি ভালো লাগছে! হা কুমারী মা! কত পাখি বসে আছে ডালে, কত প্রজাপতি ফুলে বসে মধু তুলে নিচ্ছে…‘চোতো’, ‘চোতো’, আয় এখানে, পাখিগুলোকে ভয় দেখাবি না। একদম চুপ।

  নেলার ডাক শুনে লাফাতে লাফাতে ছুটে আসে কুকুরটা আর পাখিদের নিজেদের শান্ত প্রজাতন্ত্রে নিজেদের মতো বসল আবার পাখিরা।

 -এখানে আমার ভয় লাগছে—সঙ্গিনীর হাত ধরে বলে পাবলো।

 –আমরা কি এখন খনির দিকে যাব? রাস্তা আমার চেনা। এ আমার রাজ্য। এখান থেকে সোজা চলে যেতে পারি ‘বার্কো’ পর্যন্ত। ‘চোতো’ তুই সামনে যা,আমার পায়ে পায়ে জড়াস না।

  সিঁড়ির মতো ধাপকাটা পথ দিয়ে নীচের দিকে নামে ওরা। খনিমালিকদের বিষ্ফোরণের ফলে যে গভীর গর্ত হয়েছে তার কাছে দ্রুত চলে আসে ওরা। সবুজ প্রকৃতির অঞ্চল ছেড়ে ওরা প্রবেশ করে এক বিশাল গহ্বরের মধ্যে, তার দেওয়ালে নানাবিধ যন্ত্রপাতি ব্যবহারের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে অদ্ভূত আকর্ষনীয় স্তরগুলো, কেটে কেটে বিভিন্ন খোপ করা হয়েছে, চোখে পড়ছে নানারকম পদার্থ। এই সেই জায়গা তেওদোরো গোলফিনের মনে হয়েছিল ডুবে যাওয়া জাহাজের অভ্যন্তর ভাগ ঢেউ তার দেহ খেয়ে ফেলেছে এবং তার গ্রাম্য নামের সঙ্গে এই জায়গার মিল আছে। দিনের আলোয় বিস্ময় বিহ্বল চোখে দেখার মতো জায়গা। নানারকম ভাগে কাটা হয়েছে মাটি, কোনোখানে আছে গন্ধক আর কয়লার আধিক্য, ওদের কালো গাদ পড়ে আছে, আছে লিগনাইট যেখানে পাওয়া যায় কালো রঙের মূল্যবান ধাতু, মাটির ধাতব স্তর যা দেখে মনে হয় জমাটবাঁধা রক্ত, বড়ো বড়ো পাথরের অংশ, মানুষের কৃৎকৌশলে অসংখ্য টুকরো হয়েছে তার। প্রকৃতির সৃষ্টিতে মানুষের হাতের আঘাত, অনাবৃত ক্ষতের মতো। অক্সাইড এবং লোহায় ভরতি পাহাড়ি নদী দেখে মনে হচ্ছে রক্তের স্রোত বয়ে চলেছে।

  -কোথায় আমাদের বসার জায়গা? —পাবলো জিগ্যেস করে— চলো বসি, হাওয়ার তেজ যেন না বাড়ে।

  গভীর খাদ থেকে ওপরে উঠে এসেছে একটা পায়েচলা পথ, তার পাশে পাথর, মাটি আর কিছু গাছগাছড়া, ওরা বসল একটা বড়ো পাথরের ছায়ায়, সেই পাথরের মাঝখানে একটা বড়ো ফাটল দেখা যাচ্ছে। দুটো পাহাড় বলা যায়,একটার গায়ে আরেকটা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ধারগুলো অসমান,দেখে মনে হচ্ছে দুটো ভাঙ্গা চোয়াল নিজেদের কামড়াবার চেষ্টা করছে।

 -জায়গাটা কি সুন্দর! —বলল পাবলো —মাঝে মাঝে হাওয়া থাকে, কিন্তু আজ নেই। শুনতে পাচ্ছি জলের গরগর শব্দ, ‘ত্রাসকাভা’র পেটের মধ্যে সেই নদী।

 -আজ সব চুপচাপ— নেলা বলে-, তুমি কি একটু গড়িয়ে নেবে?

 -খুব ভালো বলেছ। বাবার কথা শুনে কাল রাতে আমার একটুও ঘুম হয়নি, ভাবছিলাম ডাক্তার, ওষুধ ইত্যাদির কথা, চোখের কথা…সারারাত মনে হয়েছে একটা হাত আমার চোখের মধ্যে প্রবেশ করছে আর খুলে যাচ্ছে একটা বন্ধ দরজা, মরচে ধরা।

 একথা বলতে বলতে নেলার গায়ে মাথা রেখে সে বসল।

 -ওই দরজাটা— সে বলতে থাকে— ছিল আমার মনের খুব কাছে, খুলে গেল, তোমাকে যেমন বললাম ঠিক সেইরকম, তারপর একটা জায়গা দেখা গেল, সেখানে আমার ভাবনা উবে গেল। ওঃ নেলা, আমার হৃদয়ের রানি! আমার কাছে এক দেবীর মূর্তি ধরে এসেছ তুমি! আমার যে সম্পদ নেই তা যদি ঈশ্বরের অসীম কৃপায় পেয়ে যাই!…আমি তাহলে হব সবচেয়ে সুখী মানুষ, তোমাকে সঙ্গিনী আর বান্ধবী হিসেবে পেয়েছি বলেও আমার নিজেকে খুবই সুখী মনে হয়। আমরা দুজন মিলে একটাই মানুষ যদি ভাবতে পারি তাহলে বড়ো আনন্দ হয়; শুধু একটাই দুঃখ, তোমাকে দেখতে পাই না, দেখতে পেলে তোমার রূপে আমি যে কি আনন্দ পেতাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এখন তোমার রূপ সম্বন্ধে একটা অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে খুশি থাকতে হয়। হৃদয়ের গভীরে আছে কৌতূহল, কিন্তু চোখে আছে এক অন্ধকার। দেখতে পেলে আমার ভালোবাসার নতুন এক রূপ দেখা যেত। তোমার লাবণ্যসুধায় আমার হৃদয় পূর্ণ কিন্তু তার মধ্যে আরও কিছু আছে যা আজও আমার কাছে অধরা রয়ে গেছে।

 -শুনতে পাচ্ছ না? —আচমকা নেলা বলে ওঠে, বন্ধু যা বলছে তা থেকে দূরে নিয়ে যেতে চায় তার মনোযোগ।

 -কী?

 ভেতরে ওই যে গুঞ্জন,…‘ত্রাসকাভা’ …কথা বলছে, ‘ত্রাসকাভা’! …শুধু বলে চলেছে হ্যাঁ,হ্যাঁ,হ্যাঁ…আমার মায়ের গলা শুনতে পাচ্ছি, পরিষ্কার বলছে; “ওরে আমার মেয়ে, কত সুখে আছিস এখন?”

  -এ শুধু তোমার কল্পনা। অবশ্য কল্পনাও কথা বলে; সেকথা বলতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আমার কল্পনা মাঝে মাঝে এত বকরবকর করে যে, তাকে ধমক দিয়ে চুপ করাই। তার কন্ঠস্বর তীক্ষ্ণ, বলিষ্ঠ এবং অসহ্য আর বিবেকের স্বর গম্ভীর,শান্ত,বিশ্বস্ত, সে যা বলে তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 -এখন মনে হচ্ছে মা কাঁদছে…ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে দূরে, অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে— কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে নেলা।

 হঠাৎ গর্ত থেকে হাওয়ার হালকা ঝাপটা এল।

 -তুমি লক্ষ করোনি একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস পড়ল?…আবার সেই গলা: খুব নীচু গলায় আমার কানে কানে বলছে, খুবই নীচু গলায়…

 -তোমাকে কী  বলছেন?

 -কিছু না— একটু থেমে নেলা বলল— তুমি বলছ এসব আজগুবি। ঠিকই বলছ বোধহয়।

 নেলার হাত ধরে অন্ধ যুবক বলে:

  -আমি তোমার মাথা থেকে এসব উদ্ভট চিন্তাগুলো বের করে দেব। সারা জীবন তো আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে। হা ঈশ্বর! জন্মের সময় যদি আমার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিলে তাহলে আমাকে কেন দিলে এত আশা? ডাক্তার গোলফিনের হাতে যদি আমার পুনর্জন্ম না ঘটে তাহলে বড়োই দুর্ভাগ্য আমার। সেটাতো সত্যিই নবজন্ম হবে আমার কেমন হবে সে জন্ম? নতুন জীবন? নেলা, বান্ধবী আমার, ঈশ্বর জানেন আমার হৃদয় জুড়ে বসে আছে একটাই ভাবনা যে, এ জীবনে তোমার আমার বন্ধন কখনও ছিন্ন হবে না। অমোঘ, অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত আমার। আমি চোখ পাব, নেলা, তোমার সুন্দর মুখ দেখে আমার চোখ সার্থক হবে, আমি দেখব নিজের চোখে তোমার স্বর্গীয় সুষমা, তারপর তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। তুমি হবে আমার ভালোবাসার বউ…আমার জীবনের জীবন হবে তুমি, আমার আত্মার আনন্দ আর অহঙ্কার তুমি। কী? কিছু বলছ না যে!

 যুবকের সুন্দর মুখ নেলা নিজের বুকে চেপে ধরে। কথা বলতে চায়, কিন্তু আবেগে রুদ্ধ হয়ে যায় কন্ঠস্বর।

 -যদি ঈশ্বর এই দান আমাকে দিতে অস্বীকার করেন— যুবক বলে, তাহলেও তোমার আমার বিচ্ছেদ ঘটবে না, আমার স্ত্রী হবে তুমি, হবেই, অবশ্যই অন্ধ যুবকের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে তোমার আপত্তি যদি না থাকে। না, না, তোমার কাঁধে এমন কষ্টকর জোয়াল আমি চাপাতে চাই না, জোর করব না কোনোদিন। কত ভালো ভালো ছেলে তোমাকে ভালোবাসবে, তোমার জীবন সুখে ভরিয়ে দেবে ওরা। তোমার অসামান্য উদার মন, তোমার সুন্দর পোশাক, তোমার রূপ তাদের হৃদয় দখল করে নেবে আর বিশুদ্ধ প্রেমের আলো জ্বালিয়ে দেবে তোমার জীবনে। তোমার ভবিষৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তবে আমি শপথ করে বলতে পারি যে, তোমার প্রতি আমার প্রেম সমুদ্রের মতো বিশাল, অনিঃশেষ, অনন্ত। আমি আজ সেই প্রেম নিয়ে প্রস্তুত। কী? কিছু বলছ না কেন? আমাকে কিছু বলবে না?

 -হ্যাঁ বলব, ভালোবাসি, তোমাকে খুব ভালোবাসব—বন্ধুর মুখে মুখ রেখে বলে নেলা…কিন্তু আমাকে দেখার জন্যে অস্থির হয়ো না তুমি। তুমি যেমন ভাবছ আমি বোধ হয় তেমন সুন্দর দেখতে নই।

   বলতে বলতে নেলা তার পুরনো ছোট্ট ব্যাগ হাতড়ে একটা কাচের খন্ড বের করে। আগের সপ্তাহে সেন্যানার বাড়িতে একটা আয়না  ভেঙ্গে গিয়েছিল। সেই অপরিচ্ছন্ন ভাঙ্গা কাচের টুকরোয় নিজের মুখ দেখে সে; এত ছোট সেটা যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জোর করে নেলা প্রথমে একটা চোখ, তারপর নাক দেখে। একটু দূরে সরিয়ে পুরো শরীরের আধখানা দেখার চেষ্টা করে। ওঃ! দেখার পরিণাম কি কষ্টকর! সে রেখে দিল ভাঙ্গা কাচের খন্ড, ঠিক তখনই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল বড়ো বড়ো জলের ফোঁটা।

 -নেলা,আমার কপালে জলের ফোঁটা পড়ল।বৃষ্টি পড়ছে না কি?

 -হ্যাঁ বন্ধু্‌ মনে হচ্ছে বৃষ্টি পড়ছে— কাঁদতে কাঁদতে বলে নেলা।

 -না, এ তোমার চোখের জল। তুমি জেনে রাখো একথা বলে দিল আমার অন্তর। তুমি সেই উদারমনা মেয়ে; তোমার আর আমার আত্মার মিলন ঘটেছে, স্বর্গীয় রহস্যময় বন্ধন, এ বন্ধন কাটা যায় না, বুঝলে? একই জিনিসের দুই ভাগ। তাই না?

 -তাই।

 -তুমি কী বলবে তাতো বুঝিয়ে দিল চোখের জল। তুমি আমায় খুব ভালোবাসো, তাই না? দৃষ্টিশক্তি আসুক বা না আসুক তোমার ভালোবাসার হের ফের হবে না তো?

 -হ্যাঁ, একই রকম ভালোবাসব সবসময়— বিচলিত হয়েও নেলা দৃঢ়ভাবে কথার উত্তর দিল।

 -আমার সঙ্গে থাকবে তো?

 -সবসময়, প্রতি মুহূর্তে, চিরকাল।

 -শোনো— অন্ধ যুবক ভালোবাসায় উদ্বেল হয়ে বলে —যদি দৃষ্টিহীন হয়ে থাকা এবং তোমাকে হারানো দুইয়ের মধ্যে বাছতে হয় আমি তাহলে অগ্রাধিকার দেব…

-অগ্রাধিকার দেবে না দেখাকে —ওঃ! ‘স্বর্গীয়া মা’! আমার প্রাণে আজ কি আনন্দই না হচ্ছে!

 -তোমার রূপ না- দেখাকে অগ্রাধিকার দেব কারণ আমার হৃদয়ের মধ্যে তোমাকে দেখতে পাই, মনে মনে বলি, এ যে আলোর মতো সত্যি। এই বুকের মধ্যে তুমি আছ, তোমার ব্যক্তিত্ব আমাকে মোহাবিষ্ট করে আর আমাকে সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে।

 -হ্যাঁ,হ্যাঁ,হ্যাঁ…নেলা পাগলের মতো বলে -আমি সুন্দরী, খুব সুন্দরী।

 -শোনো নেলা, আমি একটা পূর্বাভাস পেয়েছি… একটা ইঙ্গিত, মনে হচ্ছে আমার ভেতরে ঈশ্বর কথা বলছেন, বলছেন আমি দৃষ্টিশক্তি পাব, তোমাকে দেখব, আমরা সুখী হব… তোমার মন একথা বলছে না?

  -আমার…আমার অন্তর বলছে যে, তুমি আমাকে দেখবে… তোমার রূপ দেখব কি আনন্দ বলো! —অন্ধ যুবক স্বতোৎসারিত আবেগে চিৎকার করে—কিন্তু যদি দেখি আমার হৃদয়ে তুমি আছ, সত্যের মতো তার উপস্থিতি, একথা বলি আর আমার মন ভরে যায়।

 -হ্যাঁ,হ্যাঁ,হ্যাঁ— নেলার ঠোঁট কাঁপে, চোখ বড়ো হয় আর তার উচ্চারণে তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়।

 -ঈশ্বর আছেন তোমার মাথায়, তাঁর আশীর্বাদ পড়ুক তোমার ওপর।

 -আর তুমি! —বন্ধুর কপাল চুম্বন করে বলে নেলা–, তোমার কি ঘুম পাচ্ছে?

 -হ্যাঁ,ঘুম আসছে। কাল রাতে একদম ঘুমোইনি। এখানে এত ভালো লাগছে…।

 -ঘুমোও।

 সে বাচ্চাদের ঘুমপাড়ানি গান গাইতে থাকে। একটু পরেই পাবলো ঘুমিয়ে পড়ে। নেলা আবার ‘ত্রাসকাভা’ কন্ঠস্বর শোনে, তাকে বলছে: ‘ওরে মেয়ে আমার…এইতো, এখানে…’।

ক্রমশ…

Tarun kumar ghatak
 তরুণকুমার ঘটক 
  
 যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও  হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।  ‘দনকিহোতে’ এবং  ‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক। ‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ। 

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *