মারিয়ানেলা পর্ব ৫

বাংলা English
Benito Pérez Galdós
 স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি। তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা’,’জাতীয় ঘটনাক্রম’, ‘মারিয়ানেলা’, ‘দন্যা পেরফেক্তা’’ ইত্যাদি।
 বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের ‘লাস পালমাস’ নামক সুন্দর এক দ্বীপে। কর্নেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শু্নে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
 গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সালে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে ‘জাতীয় ঘটনাবলি’ রচনা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের এই আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে।বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খণ্ডের অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।
 ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন্যা পেরফেক্তা’(Dona Perfecta) অর্থাৎ ‘শ্রীমতী পারফেক্ট’। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়্যাল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার(উচ্চারণভেদে বারোখার )মতে ‘তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।‘ লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।
 ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ন ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন। কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন।
  
   
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

মারিয়ানেলা

পর্ব ৫

কাজ-নিসর্গ-মানুষ

সারারাত বয়লারের ধোঁয়ার সঙ্গে হাঁপানি রোগীর হাঁপের মতো শব্দ হয়েছে, অনেক ওপরে রুপোলি রেখাগুলো এঁকেবেঁকে ভেসে বেরিয়েছে আর পাহাড়ের পেছনে ছোটবড়ো ঢিবিঘেরা সোকার্তের সর্বত্র ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে আলোর খুশি, লালমাটির রাস্তাঘাট, খানাখন্দ, কালো রঙের বাড়ি সর্বত্র ছায়ান্ধকারে সরে সরে গেছে।ভোর হতে না হতেই কারখানার ঘন্টায় কর্কশ চিৎকার: “ডিউটিতে যাও”, ঘুমের জড়তা কাটিয়ে ঢুলু ঢুলু চোখে শয়ে শয়ে মানুষ বেরিয়ে পড়েছে বাড়ি, কুঁড়েঘর আর ঝুপড়ি থেকে। দরজার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হয়েছে; আস্তাবল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছে খচ্চরের দল; প্রথমেই জলাশয়ে জল পান করবে এবং কিছুক্ষণ আগেও যে কারখানাটি বয়লারের আগুনের আভায় মনে হচ্ছিল মৃতদের আবাস, এখন হাজার হাত বের করে সে বেশ উজ্জীবিত হয়েছে।

 বড়ো গাড়ির এঞ্জিনে গ্যাসের গোঁ গোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে, এটা  কামারশালার যন্ত্রপাতি এবং ওয়াশিং মেশিন চালু করবে। এর প্রধান উপাদান জল, এবার উঁচু পাইপ দিয়ে দ্রুত ছুটছে সে, ওখান থেকে পড়বে সিলিন্ডারে। মহিলাদের অট্টহাসি আর পুরুষদের বিকট চিৎকারে সকালের কাজ শুরুর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে; কিছুক্ষণ পরে  ওরা নারকীয় চিৎকারে গলা ফাটিয়ে শুরু করে চালনি(ঝাঁঝরি), একটা পাইপ থেকে অন্য পাইপে জলের তোড় ছুটে চলে, তার জোরে ধুয়ে যায় সবকিছু, নোংরা মাটি বেরিয়ে আসে চাকার সঙ্গে সঙ্গে, চাকা যত ঘোরে তত মাটি বেরোয়, শেষে চকোলেট রঙের মিহি ধুলো বেরোতে থাকে। তখন হাজারটা চোয়াল থেকে দাঁতের ঘর্ষণ শোনা যায় যেন বালি চিবোচ্ছে; মিলের চাকা ঘুরে চলেছে, আলো, জল আর মাটির খেলা হচ্ছে, মনে হচ্ছে ক্যালিডোস্কোপ, খুব জোরে ঘচঘচাং শব্দ, অসংখ্য বাসনপত্র যেন বেজে উঠে এই শব্দ করছে। একমনে দেখতে থাকলে মাথা ঘোরে, অবিরাম জলের স্রোত, কখনও স্বচ্ছ, কখনওবা লাল রঙের কাদার সঙ্গে মিশে লালচে হয়ে যায় জল, হাজার চাকার বিরামহীন ঘোরার সঙ্গে একটানা শব্দ সহ্য করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; যন্ত্রের মতো মাথা হলে অবশ্য অন্য কথা; এত রকম যন্ত্রের একসঙ্গে চলার ফলে কোনো নাটবল্টু  বিকল হয়ে পড়লে তার মধ্যে তেল দিয়ে চালু করতে হয়, এদের নানাবিধ যন্ত্রণার খবরও রাখতে হয়।

 খোলা আকাশের নীচে ওয়াশিং মেশিন। যন্ত্রবাহিত বেল্ট চলার ঘরঘর শব্দ হয়।অন্য বেল্টগুলো চালু হলে আওয়াজ হয় ছন্দময়, সেই শব্দ দানবের চলার মতো কিংবা মাটির মধ্যে ভয়ঙ্কর কম্পনের মতো। কামারশালার জলাশয়ে বিশাল হাতুড়ি পেটানোর শব্দ। তার ভয়ঙ্কর আঘাতে লোহা গলে নরম হয়ে যায়, আর সব যন্ত্র একসঙ্গে চলতে থাকলে মনে হয় এরা শাশ্বত, এরা ভেঙেচুরে মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের মতো হয়ে যায়। বিশাল হাতুড়ি একইরকমভাবে পিষে চলে আর নতুন আকার তৈরি করে, সেসব পদার্থ ভূ-তত্ত্বের  মত কঠিন যা কত শতাব্দীর সৃষ্টি।অনেক পদার্থ গায়ের জোরের চেয়ে ধৈর্যের সৃষ্টি বলে মনে হয়।

 কালো মানুষদের চেহারা কয়লার মানুষী রূপ, কামারশালার হাপরের পাশে ওরা এসে জমা হয়,  আঙুলে ধরে আগুন-গরম লোহার খন্ড নিয়ে যায়,এই ওদের কাজ।আগুনের হলকা আর হাতুড়ির ঠোক্কর কি অপূর্ব  ভাস্কর গড়ে তোলে। ছোটো ছোটো ওয়াগনের চাকা এবং এঞ্জিনের অসংখ্য টুকরো এবং ওয়াশিং মেশিনের অকেজো যন্ত্রপাতি এখানে সারানো হয়। কামারশালার ভেতরে করাতে কাঠ কাটার শব্দ হয় আর আগুনের মধ্যে ফেলে লোহাটার আকার ঠিকঠাক করে নেওয়া হয়, সেই লোহার করাতেই গাছের শরীর টুকরো টুকরো করে কাটা হয়।

ছোটো ওয়াগনের দীর্ঘ সারির সঙ্গে খচ্চরদের বেঁধে দেওয়া হয়। খালি জমির মাটি কেটে গর্ত করা হয় আর ধাতু থাকলে তা ধোবার জন্যে মেশিনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সরীসৃপের মতো গাড়ির সারি এগিয়ে চলে,গাড়িতে গাড়িতে ধাক্কা লাগে না। খনি-গর্ভের  মুখের  মধ্যে দিয়ে ওরা ভেতরে প্রবেশ করে, ভেজা ভেজা গর্তের মধ্যে থেকে যেন উঠে এসেছে গাড়িগুলো। অন্ধকারে কোনো অবাধ্য খচ্চরের ডাক শুনলে মনে হবে, জঙ্গলের গোসাপেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে চিলচিৎকার করছে। দূরের গিরিখাতে শয়ে শয়ে মানুষ মাটি কাটার সময়ে নিজেদের তোলা মাটি নিয়ে ঝগড়া করে, এগুলো যে ওদের সম্পদ। ওই মানুষেরা নিজেদের অজান্তে হয়ে যায় ভাস্কর, ভূবিদ্যার রহস্যময় অভিযানের সময় এরা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। খনি-শ্রমিকরা ওইসব জায়গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, মাটি খোঁড়ার যন্ত্র চালায়, যেকোনো মাটি খুঁড়ে দেখে,খড়ির পাহাড় ভাঙে, তছনছ করে দেয় পাহাড়ের শরীর। ডলোমাইট থেকে শুরু করে কত সুন্দর সুন্দর শিলা ওরা খুঁড়ে দেখে। জিঙ্ক না পাওয়া অবধি ওদের বিরাম নেই, ইউরোপের বহুমূল্য এই ধাতু সভ্যতা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।বেলজিয়াম এই ধাতুটি সম্বল করে রাজনীতি এবং নৈতিক শক্তিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ওহ্! টিনের পাতও মহাকাব্য রচনার উৎস হতে পারে।

 নির্মেঘ আকাশ, সূর্যদেব অকাতরে ঢেলে দিয়েছেন আলোর ঝরনা,সোকার্তেস-এর প্রসারিত  ভূমি হঠাৎ লালচে রোদে প্লাবিত হয়েছে। ভাস্কর্যের মতো পাহাড়গুলো লাল রঙে সজ্জিত, মহার্ঘ ধাতুর রঙ লাল, গভীর গর্তের ধারে জমা অপ্রয়োজনীয় মাটিও লাল, এসব যেন ব্যাবিলনের মুরাল, মাটির পথপ্রান্তর লাল, গলিপথ, যন্ত্রপাতি আর গাড়ির রঙ লাল, কারখানার রঙ লাল, সোকার্তেস-এ যত পুরুষ ও নারী কাজ করে চলেছে সবার রঙ লাল। জমা ইটের রঙ বেশ মানিয়ে গেছে, সর্বত্র একই রূপ; মাটিতে, বাড়িঘরে, লোহা আর পোশাকে। ধোয়ার কাজে ব্যস্ত নারীরা যেন কাঁচা মাটির পথভোলা পরীর দল। নদীতে যাওয়ার ঢালু রাস্তার ধারে ছুটে চলেছে পাহাড়ি ঝরনার স্রোত। মানুষ আর যন্ত্রের, লোহা আর পেশির অবিশ্রান্ত কাজের ঘাম যেন এই জলধারা।

বাড়ি থেকে বেরোয় নেলা। খনিতে কাজ না করলেও তার শরীরে লেগে আছে হালকা লাল রঙ, কারণ চুনাপাথরের পথের ধুলো থেকে কারোর নিস্তার নেই। তার হাতে এক টুকরো শুকনো রুটি, সেন্যানা প্রাতরাশের জন্যে দিয়েছেন, খেতে খেতে দ্রুত হাঁটছে সে, কোনো দিকে তাকাবার সময় নেই, চিন্তামগ্ন মেয়ে আপনমনে হেঁটে চলেছে। বাড়িগুলোর ছাদ পেরিয়ে তার চিন্তা ছুটে চলে, উঁচু নীচু মেঠোপথ পার হয়ে, সিঁড়ির মতো মাটির ধাপ ভাঙতে ভাঙতে ওপরে ওঠে নেলা, সে পৌঁছে যায় এক গ্রামে, তার নাম ‘আলদেয়াকোর্বা’। প্রথমেই তার চোখে পড়ে একটা সুন্দর চকচকে বাড়ি; বিশাল, সুনির্মিত, আনন্দের বাসভূমি সম্প্রতি তার রঙ হয়েছে, পাথরের নির্মাণে অগ্নি-নিরোধক ব্যবস্থা আছে, চারদিকে গ্র্যানাইট-এর কারুকার্য দিয়ে মনোরম পরিবেশ রচনা করা হয়েছে। আগে ছিলনা এমন লতাগাছের বাহার। আঙুরলতার পাতায় পাতায় বাড়ির মুখশ্রী আবৃত হয়ে পড়েছে, মনে হচ্ছে মানুষ হলে একে গোঁফ বলা যেত,দুটো বড়ো জানালা আছে চোখের মতো, সামনের কিলান নাক আর লম্বা ঝুলবারান্দা হল মুখে, সে মুখে  হাসি লেগে রয়েছে সর্বক্ষণ। বাড়িটার ব্যক্তিরূপ সম্পূর্ণ করতে লাগে পোশাক শুকনোর জন্যে একটা দড়ি, সেটা লম্বা বিমের সঙ্গে বাঁধা, এইসব উপকরণ নিয়ে সে বাড়ির অবস্থান, তার মুখে ধরানো চুরুট সবসময় জ্বলছে। টুপির মতো ছাদ, তার চিলেকোঠাটা টুপির ডগার ফুল।চিমনি হল কান। ওই মুখ থেকে যে নিঃশ্বাস নির্গত হয় তার নাম শান্তি, মঙ্গল এবং অচঞ্চল বিবেক।

বেড়ায় ঘেরা পথ, ডানদিকে সুন্দর  একটা উদ্যান। নেলা যখন প্রবেশ করল তখন বাড়ির গরুর পাল বেরোচ্ছে, ওরা চরতে যাবে মাঠে। এক সুঠাম চেহারার রাখাল বালকের সঙ্গে ও কিছু কথা বলে…ছেলেটা যেমন লম্বা তেমনই সবল, বয়স মাত্র দশ বছর…নেলা এগিয়ে যায়, সামনে এক পৃথুল ব্যক্তি, মোটা গোঁফ, কাঁচাপাকা চুল, সদাশয় ভাব তার মুখেচোখে, চাহনি বেশ মিষ্টি, চেহারায় সৈনিক এবং কৃষকের মিলিত রূপ, গ্যালিস দেওয়া হাফশার্ট এবং প্যান্ট পরনে, কনুই পর্যন্ত অনাবৃত। নেলা কথা বলার আগেই ভদ্রলোক ভেতরে চেয়ে বললেন:

 -ওরে, নেলা এসেছে।

 এক সুদর্শন তরুণ বেরিয়ে এল,সুপুরুষ যাকে বলে, শান্ত, ঋজু, ধীরস্থির, চোখ দুটো নিজের অক্ষপথে স্থিরনিবদ্ধ, কাউন্টারের শো-কেসে রাখা চশমার মতো।তার মুখ যেন হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি, নিখুঁত তার গড়ন, যুবতীর মতো মসৃণ তার ত্বক, যৌবনোচিত স্বাস্থ্য,প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে বর্ণিত পুরুষের মতো তার চেহারা।তার দৃষ্টিহীন সুন্দর বড়ো চোখদুটো যেন মহার্ঘ ভাস্কর্য।ওর স্থির চোখের পেছনে অন্ধকার রাত বিরাজ করে।মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশের গৌরব নেই বেচারার, প্রাচীন সাহিত্যের নায়ক দৃষ্টিহীন কিন্তু তার ব্যক্তিত্বে আছে মর্মরপ্রস্তরের শীতল গাম্ভীর্য, ভাস্করের হাতের নিপুণ শৈলীতে নির্মিত এক মূর্তি, পৌরুষের উজ্জ্বলতায় ভাস্বর।

 একটু বাতাস,সামান্য আলোর রেখা,এক অনুভব পাথরের প্রাণ সৃষ্টি করতে পারে, মানুষের সবটুকু  সৌন্দর্য থাকলেও তার সৌন্দর্য দেখার ক্ষমতাটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছে,বাইরের জগৎটা কেমন তা দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত যুবক।

 কুড়ি বছরও হয়নি তার বয়স; তার সুগঠিত দেহের সবকিছুই মানানসই, এই বয়সের যুবকদের মতোই সম্মান ও মর্যাদা তার প্রাপ্য।কিন্তু একটামাত্র খামতির জন্যে তার অক্ষমতা রয়েছে। প্রকৃতির এমন দুঃখজনক ভুল কমই দেখা যায়, একদিকে তার সব আছে কিন্তু অন্যদিকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে অন্য মানুষের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ থেকে, মানুষে মানুষে তাৎক্ষণিক সম্পর্ক রচনার সেতুটি আর নেই।ভুলটা এমন যে,তার অন্যান্য গুণাবলি আর কাজে লাগে না, এ এমন এক অবস্থা যেন সৃষ্টিকর্তা সবকিছু সৃষ্টি করে অন্ধকারে আবৃত করে দিয়েছেন যাতে নতুন সৃষ্টির আনন্দ আর কেউ পাবে না। আরও দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এই যে, ছেলেটার অন্তরের আলো খুব উজ্জ্বল, তার বোধশক্তি প্রথম শ্রেণির অথচ দৃশ্যমান কিছুই তার চোখে ধরা পড়ে না।

 সে দেবদূতের মতো স্বর্গীয়, মানুষের মতো সৌম্যদর্শন আর গাছের মতো দৃষ্টিহীন, ব্যাপারটা মোটেই সরল নয়। হ্যাঁ। এমন সাংঘাতিক ত্রুটি ভুলের রহস্য আমরা বুঝি না, যদি আমরা বুঝতে পারতাম তাহলে আমাদের চোখের সামনে খুলে যেত শরীর ও মনের গঠন-সংক্রান্ত আদি রহস্য; বুঝতে পারতাম অপমান, লজ্জা, অন্যায় এবং মৃত্যুর অসীম রহস্যময়তা, আমরা মাপতে পারতাম অগাধ অন্ধকার যা জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন এবং তার শুভময়তা।

 দন ফ্রান্সিস্কো পেনাগিলাস যুবকের পিতা, তাঁর সততার তুলনা পাওয়া ভার; সদাশয়, উদার, অমায়িক, সম্মাননীয় এবং দরাজ দিল; আর যথেষ্ট শিক্ষিত মানুষ তিনি। কখনও কেউ তাঁর নিন্দা করেনি; দেশে ধনীদের  মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মাননীয় ব্যক্তি তিনি, সব সমস্যার সমাধান তিনি সুস্থ আলোচনার মাধ্যমেই করেন।যে বাড়িতে আমরা তাঁকে দেখলাম সেখানেই তাঁর জন্ম। যৌবনে তিনি ছিলেন আমেরিকায়, স্পেনে ফিরে অভাবের তাড়নায় যোগ দেন পুলিশে। অবসর গ্রহণ করার পর জন্মস্থানে ফিরে পশুপালনে মন দিলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু জমি পেয়েছিলেন এবং পরে আরও বড়ো জমির অধিকার লাভ করেছিলেন।

 তাঁর স্ত্রী আন্দালুসিয়ার মেয়ে, খুব অল্প বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়, একমাত্র পুত্রটি মাকে হারাল, জন্মের পরপরই বোঝা গেল যে, সর্বাপেক্ষা মহার্ঘ ইন্দ্রিয়টি থেকে সে বঞ্চিত। তার সহৃদয় পিতা সেও যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে কাতর হয়ে দিন যাপন করতে লাগলেন। সম্পদে বাড়ি ভরিয়ে আর তাঁর লাভ কী?তাঁর কাছে কী দাম আছে সঞ্চিত ধনদৌলতের? সৌভাগ্যদেবী তাঁর বাড়িতে হাসি নিয়ে উপস্থিত থাকলেই বা তাঁর কী যায় আসে? কার জন্যে এত কিছু? কার দোষে ছেলেটা চোখে দেখতে পায় না গৃহপালিত স্বাস্থ্যবতী গরুর পাল, জমির হাসিমাখা ফসল, আর ফলভর্তি সুদৃশ্য বাগানের গাছ? আমাদের এই পৃথিবীতে যদি বাধা না থাকত দন ফ্রান্সিস্কো নিজে চোখদুটো ছেলেকে দান করে অন্ধত্ব নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতেন, তাতো হবার নয়।দন ফ্রান্সিস্কো ছেলের দৃষ্টিহীনতা দূর করতে পারলেন না কিন্তু যতটা তাঁর পক্ষে সম্ভব তাই দিয়ে অকৃতজ্ঞ অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করতে লাগলেন।মাবাবার মনে ছেলেকে আদরযত্ন দিয়ে বড়ো করার যে গোপন বাসনা থাকে তার সবটুকু দিয়ে দন ফ্রান্সিস্কো ছেলের জন্যে সব ব্যবস্থা করলেন।কখনও ছেলের বিরুদ্ধাচরণ তিনি করেন না। সততা এবং নৈতিকতা বজায় রেখে ছেলে মানুষ করলেন।গল্প বলে এবং অন্যান্য বই পড়ে ছেলের মন সমৃদ্ধ করতেন তিনি, স্বাস্থ্য এবং মনের দিকে লক্ষ রাখেন, তার জন্যে যথোপযুক্ত খ্রিস্টীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন, দন ফ্রান্সিস্কো পেনাগিলাস কড়া শাসনের পক্ষপাতী নন, তিনি বলেন:

 “আমার ছেলে দুবার অন্ধ হোক তা আমি চাই না”।

 ছেলেকে দেখলেন বেরিয়ে যাচ্ছে, নেলা তার সঙ্গে যাবে।ওদের খুব মিষ্টি করে বললেন  :

 “আজ অনেক দূরে যেয়ো না।ছুটোছুটি করোনা…আদিয়োস(বিদায়)।

 বাইরের গেট থেকে ওদের দেখতে লাগলেন, ওরা বাগানের বেড়া ছাড়িয়ে চলে গেল।তিনি বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন, বাড়িতে তাঁর অনেক কাজ ভাই মানুয়েলকে একটা চিঠি লিখতে হবে, একটা গরুর দুধ দোয়াতে হবে, গাছের পাতা ও শাখা ছাঁটতে হবে, মুরগিগুলো ঠিক জায়গায় আছে কি না দেখতে হবে।

ক্রমশ …

Tarun Kumar Ghatak
 তরুণ কুমার ঘটক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও  হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।‘দন কিহোতে’ এবং‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক। ‘দন কিহোতে' লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ। 

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *