মারিয়ানেলা পর্ব-২

বাংলা English
Benito Pérez Galdós
Benito Pérez Galdós
স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি। তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা’, ‘জাতীয় ঘটনাক্রম’। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা' ইত্যাদি। 
বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে। কর্নেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
 গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সাল থেকে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খণ্ডে অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।
  ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন্যা পেরফেক্তা’(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়্যাল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার) মতে ‘তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।’ লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।
  ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ন ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন।  কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন।
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

মারিয়ানেলা

পর্ব-২

গাইড-এর সঙ্গে

জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন? – গোলফিন বেশ আগ্রহ সহকারে জানতে চান, এ জিজ্ঞাসা শুধুমাত্র করুণাসিক্ত নয়।

  -হ্যাঁ সেন্যোর, জন্মান্ধ আমি -খুব স্বাভাবিকভাবেই বলে অন্ধ যুবক; – শুধু স্পর্শ, শ্রবণ আর ভাবনা দিয়েই আমি এই পৃথিবীকে চিনি। আমি বুঝতে পেরেছি যে, এ বিশ্বের যাবতীয় সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য থেকে আমি বঞ্চিত। আমি তো জানি অন্যদের চোখ আমার এই চোখ দুটোর মতো নয়, ওরা চোখে দেখে সবকিছু জানতে পারে, চিনতে পারে কিন্তু অমন এক শক্তি এত অসাধারণ যে,আমি তা অর্জন করার সম্ভাবনার আশাও কখনও করতে পারি না ।

-কে জানে…- তেওদোরো বলেন, কিন্তু বন্ধু বলো তো, আমি ওটা কী দেখছি? কী  বিস্ময়কর জমকালো দৃশ্য চোখের সামনে!

গাইড-এর সঙ্গে কয়েক পা হাঁটার পর পর্যটক দাঁড়িয়ে পড়লেন, চোখের সামনে আশ্চর্যসুন্দর দৃশ্য দেখে বিস্মিত হন তিনি। একটা খাদের মধ্যে আগ্নেয়গিরির মুখ, এই সময় তার আগুন নেই, পাথর ভাঙাচোরা, তার শরীরের অংশগুলো অবিন্যস্ত। এক বিশাল কড়াই তার কেন্দ্রে এবং প্রান্তে, রাত্রির আলো-অন্ধকারে তার  আকার অনেকগুণ বেড়ে গেছে, অতিকায় মানুষের আবছা অবয়ব, মানুষের দেহ দানবের মতো বিকটাকার, পাগুলো ওপর দিকে,অসম্ভব বৃহদাকার বাহু বহু দূর পর্যন্ত প্রসারিত, পাগুলো ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন দিকে, আকাশে ভেসে চলা বিচ্ছিন্ন মেঘেদের মতো মানুষের দেহগুলো ছড়িয়ে আছে অনেক দিকে, কিন্তু সব শান্ত, চলচ্ছক্তিহীন, দৃঢ়। মমির মতো রঙ তাদের, লালচে আভার মাটির রঙ; ওদের দৃষ্টি ভঙ্গি বিস্ময়, বিমূঢ় আর মৃত্যুর কবলে পড়া জীবের মতো। মনে হচ্ছে, বিশালাকার দানবের ফসিল; মুষ্টিবদ্ধ হাত আর বিকট মস্তকের হাস্যকর নড়াচড়া যেন স্থাপত্যের অপরিবর্তনীয় নিয়মে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। ওই পরিত্যক্ত নিসর্গ পাহাড়ি ধ্বংসস্তুপের নৈঃশব্দ্য ভয় পাইয়ে দেয়। মনে হয় হাজারো কন্ঠস্বর আর চিৎকার পাথরে পরিণত হয়েছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী পাথর হয়ে থেকে যাবে এরা।

 – বন্ধু,আমরা এখন কোথায়? – বলেন গোলফিন – মনে হচ্ছে দুঃস্বপ্নের সাগরে ডুবে আছি।

 -খনির এই অংশের নাম ‘তেররিবলে’ (ভয়ংকর) – অন্ধ যুবক বলে। সঙ্গীর বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।

-একটা বিস্ফোরণ ঘটানো হয় দুবছর আগে, সেই থেকে এর সবকিছু ফুরিয়ে গেছে। এখন ওপরের অন্য অঞ্চলে কাজ চলছে। যা দেখে আপনি এত অবাক হচ্ছেন তা হল পাথরর চাঁই, আগ্নেয়গিরির মুখের অংশ, এগুলো বিস্ফোরণে নষ্ট হয়নি। লোকে বলে যে, নিষ্পাপ চোখে এসব এক একটা আঘাত, বিশেষত চাঁদের আলোয় একে কিম্ভুতকিমাকার লাগে।আমি এটুকু অন্তত বুঝতে পারি।

– বিস্ময়কর দৃষ্টিনন্দন এ অঞ্চল – একভাবে চেয়ে থাকত থাকতে আগন্তুক বলেন – কিন্তু এ দৃশ্য দেখে আনন্দের চেয়ে ভয় লাগে বেশি কারণ আমার স্নায়ুরোগের কথা মনে পড়ে যায়। আমার কী মনে হয় জানো ? মনে হয় যে, মারাত্মক মাথাধরা রোগে আক্রান্ত মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে আমি ভ্রমণ করছি। মাথার যন্ত্রণা তীব্র হলে এমন অদ্ভুত অবয়ব চোখে ভেসে ওঠে, জ্বরের বিকারে যেমন সবকিছু গোলমাল লাগে, ছায়া ছায়া মানুষ ঘুরে বেড়ায় মাথার মধ্যে।

  -‘চোতো, চোতো’, এখানে আয় – অন্ধ যুবক কুকুরকে ডাকল – স্যার, এবার খুব সাবধান, আমরা খনির ভেতরের একটা সুড়ঙ্গে ঢুকব।

 আসলে গোলফিন দেখলেন যে, মাটিতে লাঠি ঠুকে অন্ধ ছেলেটি  সরু ছোট্ট একটা দরজার দিকে এগোচ্ছে, তিনটি মোটা বিম দিয়ে তৈরি হয়েছে দরজার কাঠামো।

 অন্ধকার গর্তের মাটি শুঁকতে শুঁকতে কুকুরটি কাছে এগিয়ে এল। অন্ধকারেই যাকে জীবন কাটাতে হয় সেই দৃষ্টিহীন ছেলে কুকুরের দেখানো পথে চলতে লাগল। পেছনে চলেছেন ডাক্তার তেওদোরো গোলফিন, মাটির নীচে যাবার পথে তাঁর কিছুটা হলেও বিরক্তি আসা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।

– অবিশ্বাস্য কাণ্ড – তিনি বললেন – তুমি একবারও হোঁচট না খেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বেরিয়ে এলে! আশ্চর্য!

 – এখানেই তো আমার বড়ো  হওয়া – বলল তরুণ। – নিজের বাড়ির মতো সব চিনি।এখানে ঠান্ডা আছে,আপনি গরম জামা গায়ে দিন। আমরা অবশ্য তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাব।লম্বাবিমের গায়ে ডান হাত ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে সে হাঁটছে।পরে বলল :

– উঁচু নীচু মাটিতে হাঁটার সময় সাবধানে চলুন। এখান দিয়েই খনির শ্রমিকরা বেরিয়ে আসে।আপনার শীত করছে?

 – বন্ধু, বলো তো ঠিক করে – ডাক্তার বেশ খুশি হয়ে জিগ্যেস করলেন – তুমি ঠিক জান যে, এই মাটি আমাদের গিলে খায়নি? এই সরু গলিটা তো হাঁ করে আছে খাবার জন্যে। আমরা ক্ষুদ্র হতভাগা জীব, কীটপতঙ্গভুকদের পাকস্থলীর ভেতর প্রবেশ করেছি। আর তুমি এই সাংঘাতিক জায়গায় মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াও?

– হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবসময় ঘুরি। এসব জায়গায় ঘুরতে আমার খুব ভালো লাগে। এখানকার সবচেয়ে শুকনো অংশে আমরা এবার প্রবেশ করছি। শুধু বালি, বালি ছাড়া এখানে কিছু নেই…বালির রাস্তা পেরিয়ে পাথর, এখানে গন্ধক-মেশানো জল আসে, এদিকে এক জায়গায় পাথরের শাঁখ পাওয়া যায়…তাছাড়া আছে ব্ল্যাকবোর্ড বানাবার পাথর, এর নাম ভঙ্গুর ‘পাওলাশিলা’…ব্যাঙের ডাক শুনতে পাচ্ছেন? গান গাইছে। আমরা মুখের কাছে এসে গেছি। প্রতি রাতে একটা অলস ব্যাঙ একটানা গান গায়। আমি চিনি ওকে, থেমে থেমে ডাকে, নাক ডাকার মতো গলার আওয়াজ।

 – কার? ব্যাঙের?

 -হ্যাঁ  সেন্যোর। আমরা শেষে এসে পৌঁছেছি।

 -হ্যাঁ, তাই দেখতে পাচ্ছি একটা চোখ আমাদের দেখছে। অন্য মুখে আলো এসে পড়েছে।

 খনির পথে নামার আগে ডাক্তার তেওদোরো গোলফিন একটা বিষণ্ণ গান শুনে চমকে উঠেছিলেন এবার অন্ধ গাইড দ্রুত তার দিকে ফিরে হাসতে হাসতে বেশ গর্বের সঙ্গে জিগ্যেস করল :

 -শুনতে পাচ্ছেন?

 – আগে এই কন্ঠস্বর শুনে আমার খুব ভালো লেগেছিল। কে গায় এমন সুন্দর গান?

 উত্তর না দিয়ে ছেলেটি দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর ফুসফুসে যত জোর ছিল তা দিয়ে ডাকল:

-নেলা !…নেলা !

 প্রতিধ্বনিতে কাছের এবং দূরের সব জায়গা ভরে গেল,নামটা বারবার বাজতে লাগল সর্বত্র। দৃষ্টিহীন তরুণ মুখে হাত চাপা দিয়ে গাড়ির হর্ণের মতো শব্দ করে বলে :

 -তোমাকে আসতে হবে না, আমি ওখানে যাচ্ছি। কামারশালায় দাঁড়াও…কামারশালায়!

তারপর ডাক্তারের দিকে ফিরে বলল:

নেলা নামের মেয়েটা আমার সঙ্গী, সে আমার গাইড, রাতে  আমরা একসঙ্গে বড়ো মাঠটা থেকে ফিরে আসছিলাম … তখন ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল।গরম জামা না পরে বাইরে বেরোতে বাবা নিষেধ করেছেন, তাই ঢুকে পড়েছিলাম একটা কুঁড়ে ঘরে আর নেলা আমার সোয়েটার আনতে গিয়েছিল আমার বাড়ি। কুঁড়েঘরে কিছুক্ষণ কাটাবার পর মনে পড়ে যায় যে, এক বন্ধু আমার জন্য বাড়িতে অপেক্ষা করছে ; নেলার জন্যে অপেক্ষা করার ধৈর্য আর ছিল না, ‘চোতো’কে নিয়ে তখন বেরিয়ে পড়েছিলাম। ‘ভয়ংকর’ নামের জায়গাটা দিয়ে যাবার সময় আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল…তাড়াতাড়ি করে এখন যেতে হবে কামারশালায়। সেখানে গিয়ে আমরা আলাদা হয়ে যাব কারণ বাড়িতে যেতে দেরি হলে বাবা রাগ করবেন। নেলা আপনার সঙ্গে অফিস পর্যন্ত যাবে ।

 -অনেক ধন্যবাদ, বন্ধু।

 সুড়ঙ্গের পথ ধরে তারা অন্য একটা জায়গায় পৌঁছে যায়, আগের থেকে অন্যরকম এটা। এখানে সমতল জমিতে একটা গভীর গর্ত আছে, ভূমিকম্প কিংবা  প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে এমন হয়; কিন্তু তা না, খনি খননের সময় এমন হয়েছে। মনে হচ্ছে, ডুবন্ত জাহাজের খোল পড়ে আছে সমুদ্র সৈকতে, বড়ো বড়ো ঢেউয়ের আঘাতে মাঝখানটা ভেঙ্গে একদিকে হেলে পড়েছে। তার ভাঙা পাঁজর দেখা যাচ্ছে, তার অসমান দিকগুলো কোথাও উঁচু কোথাও বা নীচু, তার শরীরের ভেতর পাথর জমা হয়েছে, ঢেউয়ের আঘাতে সেগুলো ছড়িয়ে আছে নানা স্থানে, চাঁদের আলোয় গোলফিনের চোখে জাহাজের বিভিন্ন অংশ ভেসে উঠছে, শবদেহ, মমি, কঙ্কাল,সবকিছুই মৃত, কিছু কিছু জিনিসে পচন ধরেছে, তবে সবকিছুই বড়ো শান্ত, সমুদ্রের সমাধি প্রান্তরে দীর্ঘকাল এরা শায়িত আছে একই জায়গায়।

 জলের শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন শেষ হল,তখন শান্ত ঢেউয়ের শব্দ শোনা গেল, পাহাড়ের খাঁজে জলের খেলা অথবা ডুবে যাওয়া জাহাজের কঙ্কালে ঢেউ এসে এমনভাবেই আছড়ে পড়ে।

 -এখানে জল আছে – সঙ্গীকে বললেন আগন্তুক।

 -যে শব্দ আপনি শুনছেন- অন্ধ গাইড দাঁড়িয়ে বলতে লাগল- এ যেন, মনে হয় …কীভাবে আপনাকে বলব? জলের গরগর শব্দ বলে যা মনে হচ্ছে তা ঠিক নয়,আমাদের গলাব্যথা হলে গরম জল মুখে নিয়ে আমরা যখন গার্গল করি তখন এমন শব্দ হয়।

 -ঠিক বলেছ। কোথায় হচ্ছে জলের শব্দ? এখানে কি ছোটো নদী আছে?

 -না সেন্যোর, বাঁদিকে একটা পাহাড় আছে, তার পেছনে খোলা মুখ আছে, একটা গর্ত,ওই পাতালের শেষ কোথায় কেউ জানে না,ওর নাম ‘ত্রাসকাভা’ (অর্থাৎ ‘গর্ত পেরিয়ে’), কেউ কেউ মনে করে যে, ওটা মিশেছে সমুদ্রে ।অন্যদের মতে ওর ভেতর আছে এক নদী, এ এঁকেবেঁকে চলে,চাকার মতো,কিন্তু বাইরে আসে না কখনও। আমার মনে হয় ওটা একটা মিল। কেউ কেউ মনে করে যে, মাটির ভেতর থেকে হাওয়া ওঠে, তার চাপে ওটা চলে, আমরা শিস দিলে যেমন হয়,জলের মুখে চাপা দিলে হাওয়া আরও জোরে তার গতি বাড়িয়ে দেয়,হাওয়া আর জলে ঝগড়া বেধে যায়, রাগে গরগর শব্দ হয়, ওদের উন্মত্ত ক্রোধের ফলে জলের শব্দ হয়, বাইরে থেকে আমরা তাই শুনি।

 -ওই গর্তে কেউ নামেনি?

 -একটামাত্র পথ আছে নামার।

 -কেমন?

 -ওর মধ্যে ঝাপ দিয়ে ভেসে যেতে হবে। যারা নেমেছে বাইরে বেরোতে পারেনি,আর দুঃখের বিষয়,ওরা আসতে পারলে আমাদের বলত ওর ভেতরে কী হয়। ওই গহ্বরের মুখটা এখান থেকে বেশ দূরে, দুবছর আগে খনিশ্রমিকরা এই জায়গা খোঁড়ার সময় পাহাড়ের গর্ত দেখতে পায়, তখনই জলের শব্দ ওরা শুনতে পেয়েছিল। ওই গর্তের সঙ্গে ভেতরের সুড়ঙ্গের যোগ আছে, ওখানে শব্দ হয়, ওটা  ওপরে উঠে আসে আর জলের তোড় নীচে নেমে যায়। দিনের বেলা আপনি পরিষ্কার সেটা দেখতে পাবেন, বাঁদিকে পাথরের পাশ দিয়ে ওখানে যাবার রাস্তা আছে। ওখানে আরাম করে বসতে পারবেন। কেউ কেউ ওখানে যেতে ভয় পায় কিন্তু নেলা আর আমি প্রায়ই ওখানে বসে পাতালের শব্দ শুনি।আর সত্যি সত্যি, সেন্যোর, মনে হয় আমাদের কানে কানে কথা বলছে, নেলা বিশ্বাস করে যে, সে স্পষ্ট শুনতে পায় সেসব কথা। আমি কিন্তু সত্যি কোনোদিন কথা শুনতে পাইনি, কিন্তু স্বগতোক্তির মতো কিছু অস্পষ্ট উচ্চারণ কিংবা বিষণ্ণ ধ্যানের মন্ত্র, কখনও আনন্দের, কখনও বা ক্রোধের অথবা বিদ্রূপের শব্দ শুনেছি।

 -আমি গরগর গরগর ছাড়া কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছি না, – হাসতে হাসতে বললেন ডাক্তার।

 -এখান থেকে সেইরকমই মনে হয়…কিন্তু আমাদের আর থাকা যাবে না, দেরি হয়ে গেছে। অন্য একটা সুড়ঙ্গে নামতে হবে, আপনি মনটা ঠিক করে নিন।

 -অন্য সুড়ঙ্গ?

 -হ্যাঁ সেন্যোর,ওটার মাঝখান থেকে দুভাগ হয়ে গেছে। তারপর দেখবেন গোলকধাঁধাঁ, শুধু ঘুরপাক খেতে হবে, কারণ কিছু কিছু নির্মাণ পরে পরিত্যক্ত হয়ে রয়ে গেছে। সবই ঈশ্বরের ইচ্ছে। ‘চোতো’ সামনে চল।

একটা খরগোশ তাড়া করে ‘চোতো’ ছুটে আসে, তারপর একটা ফুটো দিয়ে শিকারি কুকুরের মতো নীরবে প্রবেশ করে। তাকে অনুসরণ করেন ডাক্তার, সঙ্গে আছে তাঁর গাইড। সে লাঠি ঠুকে ভাঙাচোরা পাথুরে রাস্তা দিয়ে চলতে থাকে। স্পর্শের বোধ কখনও এমন সূক্ষ্ম হয়নি আগে, মানুষের ত্বকের উপরিভাগ থেকে কাঠের খণ্ড পর্যন্ত সে বুঝতে পারে। ওরা এগিয়ে যেতে যেতে প্রথমে একটা বাঁকের সামনে যায়, তারপর অনেকগুলো কোণ, ভেজা আধপচা কাঠের পাঁচিল এতসব কোণ তৈরি করেছে।

 -এসব দেখে আমার কী মনে হচ্ছে জানো? – তুলনাটা তাঁর গাইডের পছন্দ হবে বলে ডাক্তার বলেন- মনে হছে বিকৃত রুচির মানুষের চিন্তাভাবনার সঙ্গে এর তুলনা চলে। বদ মানুষের মনের অন্তরে কুৎসিত চেতনা এইরকম।

 গোলফিন ভাবেন যে,অন্ধছেলেটির পক্ষে দুর্বোধ্য ভাষা তিনি ব্যবহার করে ফেলেছেন কারণ সে ঠিক উল্টো কথা বলল :

 -আলোর অজানা জগৎ যে দেখেছে তার কাছে এসব সুড়ঙ্গের পথঘাট দুঃখের মনে হয়, কিন্তু আমি,অন্ধকার নিয়ে থাকি, আমার সঙ্গে এই জায়গার খানিক মিল খুঁজে পাই। আপনি প্রশস্ত রাস্তায় যেমনভাবে হাঁটেন আমি এখানে তেমন স্বচ্ছন্দভাবে চলাফেরা করি। কখনও কখনও হাওয়া থেমে যায়, কখনও বা অত্যধিক আর্দ্রতা এসে যায়, অন্য যেসব জায়গা আমি চিনি তার চেয়ে এই সুড়ঙ্গ আমার বেশি পছন্দের।

 -ধ্যানের ভাবনা ঠিক এইরকম।

 -আমার মস্তিষ্কের মধ্যে একটা পায়ের শব্দ শোনা যায়, একটা গর্তের অস্তিত্ত্ব বুঝতে পারি, ঠিক এই পথের মতো,এই পথেই আমার ভাবনাচিন্তা চমৎকার পুষ্টি লাভ করে।

 -ও;! দিনের উজ্জ্বল আলোয় নীল আকাশের রূপ না দেখতে পাওয়া কি কষ্টের!—স্বতোৎসারিতভাবে ডাক্তারের আবেগ বেরিয়ে পড়ে। আমাকে খুলে বলো তো, তোমার সুন্দর ভাবনা কখনও ফুরিয়ে যায় না? তার শেষ নেই?

 -আছে, আছে, এইতো আমরা এক্ষুনি বাইরে বেরিয়ে যাব। আপনি নীল আকাশের কথা বললেন না?

…আঃ ! হ্যাঁ,আমি অনায়াসে ভেবে নিতে পারি যে,সেটা মাথার ওপরে ছন্দময় এক সুন্দর ফাঁকা আবরণ, মনে হয়, হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁতে পারব, কিন্তু বাস্তবে তা কখনও সম্ভব হয় না।

 এই কথা বলতে বলতে ওরা বেরিয়ে পড়ে। গোলফিন বুকভরে নিঃশ্বাস নিলেন, বুকের ওপর থেকে একটা ভার নেমে গেল, আকাশের দিকে চেয়ে চিৎকার করে উঠলেন;

 -ঈশ্বরের অসীম কৃপায় তোমাকে আবার দেখতে পেলাম, হে সুন্দর নক্ষত্রমালা! আগে কখনও তোমাদের এত সুন্দর মনে হয়নি।

 অন্ধ যুবক হাতে একটা পাথর নিয়ে বলে;

 -যেতে যেতে আমি স্ফটিকের মতো এই জিনিসটা পেলাম। এমন মসৃণ পাথরটাকে সুন্দর বলে মনে হয় না আপনার? কেমন সুদৃশ্য পরিমিতি এর গঠনে!

 এই কথা বলে সে স্ফটিক ভেঙে ফেলতে লাগল।

 -প্রিয় বন্ধু আমার- আবেগতাড়িত হয়ে বেদনাসিক্ত কন্ঠে গোলফিন বলেন;

 -দুঃখের বিষয়, তুমি বুঝতে পারছ না যে,ওই ছোট্ট পাথরখন্ড মানুষের নজর কাড়ে না কারণ মাথার ওপর আকাশ থেকে বিচ্ছুরিত লক্ষ আলোর কাছে তার কোনো দাম নেই, মানুষের চোখে পড়ে না ওটা।

ওপরে মুখ তুলে গভীর বেদনায় অন্ধ যুবক বলে;

  -নক্ষত্ররাজি,তোমরা সত্যিই আছো?

 -ঈশ্বর মহান এবং করুণাময় –

 গোলফিন সঙ্গীর কাঁধে হাত রেখে বলেন :

-কে জানে, কে বলতে পারে, বন্ধু আমার! …দেখা গেছে, প্রতিদিন দেখা যায় যে, পৃথিবীতে কত বিরল ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।

এই কথা বলতে বলতে খুব কাছ থেকে যুবকের চোখের দিকে তাকালেন গোলফিন। দৃষ্টিহীন যুবকের চোখের মণি নড়ে না, হাসতে হাসতে সে ডাক্তারের কন্ঠস্বর যেদিক থেকে আসছে সেদিকে মুখ ফেরান।

 -আমার আর কোনো আশা নেই – অস্ফুট উচ্চারণ অন্ধের।

 একটা পরিচ্ছন্ন জায়গায় ওরা বেরিয়ে এসেছে। প্রতি মুহূর্তে চাঁদের আলো উজ্জ্বলতর হচ্ছে, বিস্তীর্ণ সমতল আলোয় আলোকিত, খানা-খন্দগুলোকে বিশাল পরিখার মতো মনে হচ্ছে। বাঁদিকে, স্বাভাবিক উচ্চতায় ডাক্তার দেখতে পেলেন কিছু সাদা বাড়ির সারি, এদের সীমানা একটাই।

 -এই বাঁদিকে – অন্ধ যুবক বলল – আমার বাড়ি। ওই ওপরে… চেনেন?  আলদেয়াকোরকাদের সুমো নামের গ্রামটার তিনটে বাড়ি অবশিষ্ট আছে, বিভিন্ন সময় বাকি সব ভেঙে ফেলে জমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে, নীচে সব চুনাপাথর। আমাদের পূর্বপুরুষরা লক্ষ লক্ষ বছর এসব কথা না জেনেই এখানে বসবাস করেছেন।

 এসব কথাবার্তা চলছে এমন সময় একটি মেয়ে ছুটতে ছুটতে তাদের কাছে আসে, কিশোরী,পাতলা ছোটোখাটো গড়ন।

 -নেলা, নেলা-অন্ধ বলে-আমার কোট এনেছ?

 -এইতো-  তাকে কোট পরিয়ে দিতে দিতে বলে সেই মেয়ে।

 -এই মেয়েটি গান গাইছিল? তোমার গলা দারুণ সুন্দর!

 -ওঃ!- খুশি হয়ে অন্ধ ছেলে বলে,-হ্যাঁ, খুব ভালো গায়। এখন, মারিয়া, তুমি এই ভদ্রলোককে অফিস পর্যন্ত নিয়ে যাও, আমি বাড়ি যাব। আমার বাবার হাঁকডাক শুনতে পাচ্ছি, আমার খোঁজে এদিক আসছে মনে হয়। আমাকে বকাবকি করবেন নিশ্চয়ই…যাই! আর দেরি করা যাবে না।

 -যাও, তুমি বিশ্রাম নাও- তার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন গোলফিন – ঠাণ্ডা পড়ছে, তোমার শরীর খারাপ হবে। অনেক ধন্যবাদ। আমরা এখন থেকে বন্ধু হলাম,বন্ধুত্ব রাখতে হবে। কিছুদিন থাকব এখানে…এইসব খনির এঞ্জিনিয়ার কার্লোস গোলফিন আমার ভাই।

 -এ্যাঁ! আচ্ছা! আমার বাবা এবং আমার প্রিয় বন্ধু দন কার্লোস; গতকাল থেকে আপনার জন্যে হানটান করছেন।

 আজ সন্ধের সময় ‘ভিইয়ামোহাদা’ স্টেশনে পৌঁছেছি…লোকমুখে শুনলাম যে, সোকার্তেস কাছেই, হেঁটেই আসা যায়। প্রকৃতির শোভা দেখা আর ব্যায়াম করতে আমার খুব ভালো লাগে, মানুষ বলল, এগিয়ে যাও, অবিরাম এগিয়ে চলো, তাই হাঁটতে শুরু করলাম, লাগেজ আগেই গাড়িতে পাঠিয়েদিয়েছি। এখন তোমরা বুঝতে পারছ তো কেমন বোকার মতো হারিয়ে গিয়েছিলাম …কিন্তু এমন খারাপ কিছু ঘটে না যার কিছু ভালো নেই…তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল, আমরা বন্ধু হয়ে থাকব,  হয়তো খুব ভালো বন্ধুই হব…ঠিক আছে, ‘আদিয়োস’(বিদায়) ভাই,তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও, সেপ্টেম্বরের ঠাণ্ডা হাওয়া ভালো না। নেলা এবার আমার গাইড হবে।

 -এখান থেকে অফিস পর্যন্ত যেতে পনেরো মিনিটের বেশি লাগবে না …এমন কিছু ব্যাপার নয়।সাবধানে যাবেন, পাথরে যেন হোঁচট না লাগে, সাবধানে নীচে নামবেন।পথে অনেক সময় মালবাহী গাড়ি এমনি দাঁড়িয়ে থাকে… ভেজা রাস্তা সাবানের মতো, যেন পিছলে পড়বেন না…‘আদিয়োস’(বিদায়), বন্ধু।

 মাটি থেকে খোলা তেরচা সিঁড়িও ওপরে,বিম দিয়ে শক্ত করা আছে ধাপগুলো।গোলফিন এগিয়ে চললেন…নেলা তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের কথাবার্তার জন্যে একটা অধ্যায় লাগবে না? ঠিকই তো, আমরা তা দিতে রাজি।

ক্রমশ … মারিয়ানেলা পর্ব-৩

Tarun Kumar Ghatak
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও  হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক। ‘দনকিহোতে’ এবং  ‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক। ‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ। 

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *