মারিয়ানেলা (পর্ব- ২১)

বাংলা English
Benito Pérez Galdós
Benito Pérez Galdós
বেনিতো পেরেস গালদোস (১৮৪৩—১৯২০)        স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম।ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি।তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 'ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা','জাতীয় ঘটনাক্রম'। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা'' ইত্যাদি।  বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে।কর্ণেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।  গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সালে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশতি শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খন্ডের অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।  ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় 'দন্যা পেরফেক্তা'(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়াল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস।জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার) মতে 'তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।' লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।  ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ণ ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন। কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্তেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন। 
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

আততায়ী চোখ

‘আলদেয়াকোর্বা’র বাড়িতে ফ্লোরেন্তিনার ঘরে আনন্দের  প্লাবন। সেন্যোরা পেনাগিলাস-এ মৃত্যুর পর এঘরে কেউ থাকেনি, কিন্তু দন ফ্রান্সিস্কো ভাবলেন, তাঁর ভাইঝি এঘরে থাকের যোগ্য,  তাই খুব যত্ন করে সাজালেন ঘর, নিয়ে এলেন সৌখিন কিছু জিনিস যা তাঁর স্ত্রীর জীবনকালে কেউ দেখেনি। দুপুরে ঝুলবারান্দা আর বাগান জুড়ে প্রতিদিন রঙের মেলা বসে, আলো আর পাখির গানে মুখরিত হয় সেই স্থান।  অল্প কয়েকদিন সেই ঘরে থাকার পর ফ্লোরেন্তিনা নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাকে মানানসই করে নেয়। নানাবিধ জিনিস এবং ঘরের ভিন্ন ভিন্ন  অংশগুলো দেখেই বোঝা যায় এই ঘরে  যে বাস করে তার রুচি কেমন, নীড় দেখে পাখির জাত চেনা যায়। এমন মানুষ আছে যারা প্রাসাদকে করে তোলে নরক, আবার কেউ কেউ কুঁড়েঘরকে করে তোলে প্রাসাদ,  ঘরে পা দিলেই তা বোঝা যায়।

সেদিন ঝড় উঠেছে (কোনদিন তা ঠিক করে বলা যাচ্ছে না বলে ‘সেদিন’ বলা হলঃআমরা শুধু জানি যে, সেটা একটা দিন)।সারা সকাল বৃষ্টি হয়েছে। পরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল এবং শেষে ভেজা আবহাওয়ার মধ্যেই দেখা  গেল অতীব সুদৃশ্য এক রামধনু।বিশাল রামধনুর এক পা সমুদ্রের সামনে ‘ফিকোব্রিগা’র পাহাড়চুড়োয়, আরেক পা ‘সালদেওরা’র অরণ্যের মাথায়। রাজকীয় অথচ সারল্যে পূর্ণ এই রামধনু এমন ঐশ্বর্যময় যে তার সঙ্গে কোনোকিছুর তুলনা সম্ভব নয়, কোনো বস্তুর আকৃতি কিংবা সৌন্দর্যতো  নিখুঁত হয় না। এই রামধনু জগতের যাবতীয় দৃশ্যমানতার সংক্ষিপ্ত রূপ অথবা বলা ভালো, যা কিছু দেখা যাচ্ছে তার শুরু এবং শেষ।

নিজের ঘরেই আছে ফ্লোরেন্তিনা, কোনো অলংকারে মুক্তো বসাচ্ছে না, কোনো কাপড়ে সোনার সুতো সেলাই করছে না, তবে কাজ করছে, ‘নিরপেক্ষ’ এবং অন্যান্য সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপণ  দেখে একটা পোশাক কাটছে। ছোটো ছেলেমেয়েরা খেলতে খেলতে যেমন নানাভাবে বসে এবং ওঠে তেমনভাবেই সে চলাফেরা করতে করতে কাজ করছে, কখনও পায়ে ভর দিয়ে বসছে, কখনও হাঁটু পেতে বসছে, কাঁচির কিন্তু বিশ্রাম নেই। তার পাশে পড়ে আছে স্তূপীকৃত উলের গোলা, উল বোনার কাঁটা এবং অন্যান্য কিছু জিনিস, এসবই সে আনিয়েছে ‘ভিইয়ামোহাদা’ থেকে, একবার এখানে, আরেকবার ওখানে কাটাকুটি চলছে; ফ্লোরেন্তিনা পোশাকের হাতা, নীচের দিক এবং সমস্ত শরীর বুঝে তৈরি করছে। কোনো নির্দিষ্ট মডেল এবং ছাঁচ দেখে সে এটা বানাচ্ছে না, যা মনে হচ্ছে তাই করছে, সে জানে যে, ফলেই বৃক্ষের পরিচয়। সকালে যখন কাজটা শুরু করে তার অমায়িক বাবা বলেছেন:

-ওরে ফ্লোরেন্তিনা, তোকে দেখে মনে হচ্ছে যে, পৃথিবীতে দরজি নেই। ভদ্র সমাজের একমেয়ে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে হাতে কাঁচি নিয়ে… মোটেই ভালো দেখায় না।নিজের পোশাক নিজে বানিয়ে নিবি, এটা আমার পছন্দ নয় অন্যের জন্যে বানালেও কি আমার ভাল লাগবে?  দরজিরা তাহলে কী করবে?

-যে কোনো দরজি আমার চেয়ে এটা ভালো বানাবে —হাসতে হাসতে বলে ফ্লোরেন্তিনা —কিন্তু তাতে আমার কিছু করার থাকবে না, বাবা, আমি এটা নিজে বানাতে চাই।

তারপর ফ্লোরেন্তিনা একা রইল ঘরে, না, না, একা বলা যায় না, ওই ঘরের ওয়াড্রোব এবং বিছানার মাঝখানে পুরনো দিনের একটা সোফা আছে, তাতে দুটো কম্বল। একদিকে বালিশের ওপর একটা মাথা দেখা যাচ্ছে, দেখে মনে হচ্ছে তার সাড় নেই। দুর্বল একটা শরীর। ঘুমোচ্ছে। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝেই চমকে উঠছে, স্বপ্নের মধ্যে বোধহয় ভয়ের কিছু দেখছে। তবে  দুপুরে কিছুটা শান্ত মনে হল। তখন ফ্লোরেন্তিনার বাবা তেওদোরো গোলফিনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। সোফার কাছে এগিয়ে গেলেন ডাক্তার, মুখটা নীচু করে দেখলেন, এতো নেলা।

-মনে হচ্ছে এখন ভয়ঙ্কর স্বপ্ন নেই— তিনি বললেন—। গোলমাল করা চলবে না।

-তোর কী মনে হচ্ছে? —হাসতে হাসতে মেয়েকে জিগ্যেস করেন দন মানুয়েল–। দেখছেন ডাক্তার, কী কাজ নিয়ে মেতে আছে?  নিরপেক্ষভাবে আপনি বলুনতো। এসব দেখে আমার অস্বস্তি হবে না? সত্যি কথা বলতে কী, এসব ঝামেলা নেবার দরকারটা কী? আমার মেয়ে প্রতিবেশীকে যথাসাধ্য সাহায্য করে বলে আমি ওর খুব প্রশংসা করি, আমিও তাকে দানধ্যান করতে উৎসাহ দিই, তাবলে নিজের হাতে এসব আজেবাজে কাজ করবে…

-ছেড়ে দিন ওকে —মেয়েকে দেখে গোলফিন বেশ খুশিমনেই  বলেন —সেন্যোর দন মানুয়েল, প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্ব ভাবনা থাকে।

-দানধ্যান করতে করতে যদি সব শেষ করে দেয়, যদি দেউলিয়া হয়ে যাই আমরা তাহলেও আমি বাধা দেব না —পকেটে হাত রেখে অভিজাত ভঙ্গিতে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বলেন দন মানুয়েল —কিন্তু দাতব্য করার আর ভালো পথ নেই? আমার ভাইপোর আরোগ্য  দেখে ও ঈশ্বরকে স্মরণ করেছে… এতো খুব ভালো কথা, ভক্তি খুব ভালো… কিন্তু দেখুনতো…

নেলার সামনে দাঁড়ালেন, তাঁকে দেখেই সে কৃতার্থ বোধ করবে ভাবলেন।

-এর চেয়ে যুক্তিযুক্ত কাজ আর হয় না —বলতে লাগলেন —এই হতভাগ্য মেয়েটাকে বাড়িতে ঢোকানোর আগে আমার মেয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু করতে পারত, রাজ দরবারে কিংবা সমাজের বিশিষ্ট লোকদের সামনে কোনো অনুষ্ঠান করতে পারত… কেন, একটা লটারি করা যেত না? বন্ধুদের মধ্যে টিকিট বিক্রি করে দিতাম, বিক্রির টাকা কোনো সেবাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া যেত। ‘ভিইয়ামোহাদা’র ভদ্রসভ্য মানুষদের নিয়ে একটা সংগঠন গড়ে তুলতে পারতিস কিংবা ‘সান্তা ইরেনে দে কাম্পো’র বন্ধুবান্ধবদের নিয়েও গড়া যেত, সবার সঙ্গে মিলন-সন্ধেতে অনেক টাকা তোলা যেত…কী? যেত না? যারা ষাঁড়ের লড়াই ভালোবাসে তাদের নিয়ে একটা বিশেষ লড়াইয়ের ব্যবস্থা করা যেত।আমি লড়াকুদের দায়িত্ব নিতে পারতাম…ওঃ! কাল রাতে দন্যা সোফিয়া আর আমি এসব নিয়ে কথা বলছিলাম… ওই মহিলার কাছে শেখ, শিখে নে যতটা পারিস। তার কাছে গরিবদের অনেক ঋণ আছে। লটারির ওপর নির্ভর করে কত মানুষের সংসার চলছে। আর যত অনুষ্ঠান হয় অভিনেতারা কাজ পায়। ওঃ! অনাথ আশ্রমে যারা থাকে তারাই শুধু দরিদ্র নয়। সোফিয়া আমাকে বলল যে, মুখোশনৃত্য করে এই শীতে অনেক টাকা উঠেছিল। গ্যাস কোম্পানি, থিয়েটার মালিক এবং সেখানকার কর্মচারীরা পেয়েছিল… গরিবরাও নিজেদের রুটি কেনার পয়সা পেয়েছিল… ওরে, এসব যদি পছন্দ না হয় তাহলে রাশিবিজ্ঞান পড়… রাশিবিজ্ঞান।

ফ্লোরেন্তিনা হাসে, উত্তরে কিছু বলতে পারে না কারণ তার আগেই তেওদোরো গোলফিন বলে দেন:

-প্রত্যেকের নিজের মতো দানধ্যানের পথ আছে।

-সেন্যোর দন তেওদোরো —দন মানুয়েল উচ্চকিত কন্ঠে বলেন–, আমার মেয়ের মনের মতো কথা বলেছেন আপনি।

-ঠিক তাই —মেয়েটির দিকে চেয়ে ডাক্তার বলেন:

-ফ্লোরেন্তিনার মতো আর কেউ নেই।

-সব দোষত্রুটি সত্ত্বেও —মেয়ের গায়ে হাত রেখে আদর করতে করতে বাবা বললেন:

-আমি নিজের থেকে বেশি ভালোবাসি ওকে। দেখা যাক, কোন জায়গাটা  ওর বেশি পছন্দ, ‘আলদেয়াকোর্বা’, না, ‘কাম্পো’? কীরে?

-‘আলদেয়াকোর্বা’ আমার মোটেই খারাপ লাগে না।

-আঃ দুষ্টু মেয়ে!…এবার বুঝেছি তোর মতলব…ভালো, আমার ভালো লাগছে…আপনারা জানেন, ঠিক এই মুহূর্তে আমার দাদা তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিচ্ছেন? পারিবারিক বিষয়: ভালো কিছু হবে নিশ্চয়। দেখুন দন তেওদোরো, আমার মেয়ের দিকে চেয়ে দেখুন একবার; তার মুখে এপ্রিলের সব গোলাপ ফুটে উঠেছে। দাদা কী বলেন দেখা যাক।

চলে গেলেন ভালো মানুষটি। তেওদোরো আবার নেলাকে দেখতে গেলেন।

-গত রাতে ঘুমিয়েছে? —ফ্লোরেন্তিনা জিগ্যেস করে।

 -একটু। সারারাত তার দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার আওয়াজ শুনেছি। আজ রাতে তার জন্যে ভালো বিছানা আনার ব্যবস্থা করেছি। আমার ঘরের সামনে ছোট্টো  ঘরটায় ওর বিছানা হবে।

-হতভাগ্য নেলা —ডাক্তার  উচ্চকন্ঠে বলেন—। এই দুঃখী মেয়েটার জন্যে আমি কতটা ভাবি আপনারা জানেন না। কেউ হয়তো একথা শুনে হাসবে কিন্তু আমরাতো পাথর নই। এমন অসহায় মানুষের অবস্থা কিছুটা ভালো করার চেষ্টা খুব ছোটো কাজ নয়। নেলার মতো অনেক অসহায় মানুষ এই পৃথিবীতে আছে। কে খবর রাখে ওদের? কোথায় থাকে তারা? সমাজ নামক মরুভূমিতে এরা হারিয়ে যায়…সমাজের মধ্যেও মরুভূমি থাকে, মানুষের মধ্যেই আছে অন্ধকার জগৎ, আছে মাঠের নির্জনতায়, খনিতে আছে, আছে কারখানায়। মাঝে মাঝেই আমরা ওদের সামনে দিয়ে যাই কিন্তু ওদের দেখতে পাই না…ওদের কিছু ভিক্ষে দিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলি, চিনতে চাই না ওদের… সমাজের এই অন্ধকার দিকে আমরা মনোযোগ দিতে চাই না। প্রথমে ভেবেছিলাম নেলার ব্যাপারটা ব্যতিক্রমী ঘটনা, কিন্তু না, আমি ভেবেছি, মনে রেখেছি এবং দেখেছি যে, ওর মধ্যে যা আছে তা খুব সাধারণ, অনেকের মধ্যেই তা আছে। এটা এক দৃষ্টান্ত, এদের মধ্যেই কল্যাণকর কাজের জন্যে নৈতিকভাবে উন্নত মানুষ আসে, এরা জানতে চায়, এদের সততার তুলনা নেই কিন্তু এরা পরিত্যক্ত এবং বিযুক্ত বলে মনের জোর বাড়াতে পারে না। এদের চিত্তবৃত্তি অন্ধতায় ডুবে থাকে, যেমন পাবলো পেনাগিলাস-এর দৃষ্টিশক্তি থাকলেও শারীরিকভাবে অন্ধ হয়েছিল।

ফ্লোরেন্তিনা দৃশ্যতই উজ্জীবিত বোধ কররে। সে গোলফিনের কথাগুলো অনুধাবন করেছে বলে মনে হয়।

-তোমার চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছ — ডাক্তার বলেন— ওর কল্পনাশক্তি খুবই উচ্চমার্গের, বোধশক্তি প্রাণবন্ত, ভালোবাসা আছে অন্তরে, আবেগ আছে, মনের ব্যাপ্তি আছে, কিন্তু একইসঙ্গে স্থূল কুসংস্কারে বদ্ধ মন, ধর্ম সম্বন্ধে আবছা ধারণা, ভুল চিন্তা আছে, ভয়ঙ্কর ভুল, নৈতিক বোধ শুধু স্বভাবজাত, তার পরিশীলন হয়নি একটুও। নিজে যা শিখেছে তার বাইরে কোনো শিক্ষা সে পায়নি, সজীব গাছে আছে শুধু শুকনো পাতা, পরিচর্যা করলে এমন হত না। কারও কাছেই কোনো শিক্ষা পায়নি। শৈশবে লেখাপড়ার কোনো সুযোগ পায়নি, ভালোবেসে কেউ সদুপদেশ দেয়নি, পায়নি কোনো ধর্মীয় শিক্ষা। নিজের খেয়ালে চলেছে, কারও নির্দেশ মেনে চলেনি। তার বিচারবুদ্ধি সম্পূর্ণ নিজের, বাইরের প্রভাব কিছুই পড়েনি তাতে। কল্পনা আর অনুভব তার শক্তি। প্রথম থেকেই তার মনে ভক্তি এসেছিল বলে আদিম মানুষের মতো সে আরাধনা করে প্রকৃতির। তার আদর্শ হল প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। ফ্লোরেন্তিনা, তুমি যদি আমার কথা ঠিকমতো বুঝতে না পার তাহলে অন্য সময় ভালো করে বুঝিয়ে বলব। তার মনে সৌন্দর্য সম্পর্কে একটা ধারণা আছে, স্বাভাবিক নিয়মে যে অগ্রাধিকার থাকে তাও আছে। আর সমগ্র সত্বা, তার অন্তরের আকুতি নিজের ধারণামতোই চলে। চেতনায় যে উন্নত দিশা আছে তাতে এক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তার মনে, নৌকাডুবিতে পড়ে যাত্রী যেমন মাটি সম্পর্কে একটা অস্পষ্ট ধারণা আঁকড়ে থাকে এও সেরকম, আমাদের চেতনায় প্রবল প্রভাব আছে ধর্মীয় বিজয়বার্তার, তার কাছে এটা সামান্য এক গুঞ্জন ছাড়া কিছু নয়।

…এ এক নগণ্য কৌতূহল মাত্র। ইউরোপের জ্ঞানবিজ্ঞান সম্পর্কে এশিয়ার মানুষের যেমন থাকে। যদি এসব কথা তুমি না ধরতে পার আমি পরে ভালোভাবে বলব… কিন্তু তার মেধার  সৌজন্যে অল্পসময়ের মধ্যেই বুঝতে পারবে বিশাল প্রগতির কথা এবং আমাদের সমকক্ষ হয়ে উঠবে।একটু আলোকপ্রাপ্ত হলেই সে দ্রুত পেরিয়ে আসবে শতাব্দীর পর শতাব্দী…; এখনও সে খুব পেছনে পড়ে আছে, দেখতে পায় খুব কম, কিন্তু আলো পেলেই চলতে পারবে।সেই আলোটুকু আজ পর্যন্ত কেউ তাকে দেয়নি, কারণ পাবলো নিজে দেখতে পেত না বলে দৃশ্যমান বাস্তবতা সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ, ফলে অনিচ্ছাসত্বেও মেয়েটার মধ্যে ভুল ভাবনা সে রোপণ করেছে।পাবলোর মতো অতিশয় আদর্শবাদী এবং অনুভবী এই ধরণের মানুষের  সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হতে পারে না।

এই অভাগিনিকে আমরা শেখাব সত্য কী, অন্য শতাব্দীর দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে হবে, চিত্তবৃত্তির সম্পদ তাকে চেনাতে হবে, আমাদের এই শতাব্দীতে নিয়ে আসতে হবে তাকে, যে মনের জোর তার নেই তা আনতে হবে, তার স্বভাবজাত ধারণা আর বিশ্রি কুসংস্কার কাটিয়ে খ্রিস্টীয় ভাবনাতে উদবুদ্ধ করতে হবে। এখানে আমাদের  একটা দারুণ ক্ষেত্র আছে, এই আদিম প্রকৃতির মধ্যে তাকে বহু শতাব্দীর উন্নত বোধে দীক্ষিত করতে হবে, সময়ের চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাক শেখাতে হবে অসংখ্য আবিষ্কৃত সত্য, আমরা নির্মাণ করব এক নতুন সত্ত্বা, কারণ,  এটা,  বুঝতে পারছ তো ফ্লোরেন্তিনা(ভুল বুঝো না), নতুন জীবন সৃষ্টি করার সমান, যদি বুঝতে না পার  ভালো করে বুঝিয়ে বলব।

ফ্লোরেন্তিনা জ্ঞাণী না হলেও গোলফিন নিজস্ব ভঙ্গিতে যা বলেছেন তা বুঝতে পেরেছে বলেই তার বিশ্বাস। এই বিষয়ে সে কিছু বলবে ভাবছে এমন সময় নেলার ঘুম ভেঙ্গে গেল, তার আর বলা হল না। নেলার ভয়ার্ত চোখ ঘরের চারদিকে ঘোরে; কিছুক্ষণ পর সে একবার একজনের দিকে তাকায়, আবার তাকায় অন্যজনের দিকে। ওই দুজন তাকে লক্ষ করছে।

-আমাদের দেখে ভয় পাচ্ছ? —ফ্লোরেন্তিনা মিষ্টি করে জিগ্যেস করে।

-না, ভয় না — নেলা তোতলায় —আপনি খুব ভালো; সেন্যোর দন তেওদোরো খুব ভালো।

-এখানে তোমার ভালো লাগছে না? কীসের ভয় তোমার? গোলফিন তার একটা হাত ধরেন।

-সবকিছু খুলে বলো আমাদের —তিনি বললেন–; আমাদের দুজনের মধ্যে কাকে বেশি ভালো লাগে? আমাকে,  না,  ফ্লোরেন্তিনাকে?

উত্তর দিল না নেলা। ফ্লোরেন্তিনা এবং গোলফিন হাসেন, কিন্তু সে চুপ করে থাকে।

-শোনো মেয়ে, একটা কথা বলছি —ডাক্তার বলতে থাকে— এবার আমাদের মধ্যে যেকোনো একজনের সঙ্গে তোমাকে থাকতে হবে। ফ্লোরেন্তিনা এখানে থাকবে, আমি চলে যাব। এই দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নাও। কাকে বাছবে?

মারিয়ানেলা কোনো কথা না বলে ওদের দিকে তাকায়; দুজনের দিকে চোখ ঘুরতে ঘুরতে শেষে তা স্থির হয় গোলফিনের মুখে।

-আমার মনে হচ্ছে আমাকেই সে বেছে নিল। নেলা, এটা ঠিক হল না, ফ্লোরেন্তিনা রাগ করবে।

বেচারা নেলা অসুস্থ, তবুও তার মুখে স্মিত হাসি ফুটে ওঠে। ফ্লোরেন্তিনার দিকে  দুর্বল হাত বাড়িয়ে ক্লান্তস্বরে বলে –

আপনি রাগ করলে আমার দুঃখ হবে।

ওই কথা বলার পর মারিয়ানেলা বড়ো কাতর হয়ে পড়ে, মুখ পান্ডুর হয়ে যায়, ঘাড় সোজা করার চেষ্টা করে, তার চোখদুটো বেরিয়ে আসছে। পায়ের শব্দ শুনতে পায়।

-আসছে! — নেলার আতঙ্ক যেন গোলফিনকে নাড়া দেয়।

-সে আসছে। সেই তো! — সোফা থেকে উঠে ফ্লোরেন্তিনা দরজায় যায়।

ঠিক তাই। পাবলো দরজা ঠেলে ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করেছে, সোজা হেঁটে আসে সে, দীর্ঘদিন অন্ধ থাকার ফলে এভাবে চলাই তার স্বভাব। হাসতে হাসতে আসছে সে, নিজেই চোখের ব্যান্ডেজ খুলে ফেলেছে, সামনে চেয়ে আছে। এখনও চোখ সবদিক দেখতে সড়গড় হয়নি বলে পাশের মানুষকে দেখতে পাচ্ছে না।

এই প্রসঙ্গে বলা যায় যে, যারা কখনও অন্ধ হয়নি তারাও সোজা সামনে তাকায়। এটা মানুষের দৃষ্টিপাতের সাধারণ নিয়ম

-তুতো বোনটি আমার— ফ্লোরেন্তিনার দিকে এগোতে এগোতে সে বলে— আজ আমাকে দেখতে এলে না কেন? তোমার খোঁজেই আমি এলাম। তোমার বাবা বললেন যে, তুমি গরিব লোকেদের জন্যে পোশাক বানাচ্ছ। তাই তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।

ফ্লোরেন্তিনা বিহ্বল ; কী বলবে বুঝতে পারে না। ডাক্তার কিংবা নেলা কাউকেই দেখেনি পাবলো। সোফার দিকে উঠে একটু দূরে সরে যাবে বলে ফ্লোরেন্তিনা ঝুলবারান্দার দিকে এগিয়ে যায়, কিছু  টুকরো কাপড় হাতে নিয়ে কাজ করার ভঙ্গিতে বসে। সূর্যের মিষ্টি আলো এসে পড়েছে তার গায়ে, বাঁদিকের পাঁজরে আলোটা প্রখর আর তার বাদামি-গোল মুখে ঝলকল করছে এক ঝলক আলো। সেই আলোর এক রহস্যময়ী মূর্তি যেন সেই সুন্দর মুখের মেয়ে। চুল তার অবিন্যস্ত, পোশাকও ঢিলেঢালা, তবু ওই যুবতীর স্বভাবিক রূপের ঐশ্বর্য ঝরে পড়ছে, তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠেছে বিশুদ্ধ সম্ভ্রান্ত ভাব, শিল্পের নিখুঁত সৃষ্টিও যেন এই রূপের কাছে পরাভূত হয়েছে।

-তুতো দাদা! — সুন্দর ভ্রূযুগলের মাঝখানে কুঞ্চন— দন তেওদোরো তোমাকে আজও ব্যান্ডেজ খোলার অনুমতি দেননি। এ তুমি ঠিক করনি।

-পরে তো দেবেন —হেসে বলে যুবক —আমার কিছু হবে না। ভালোইতো আছি আমি। আর যদি কিছু হয়ও আমার তাতে যায় আসে না। তোমাকে দেখার পর আবার যদি অন্ধ হয়ে যাই আমার কোনো আপশোশ হবে না।

ভর্ৎসনার সু্রে বলে ফ্লোরেন্তিনা:

-বেশ ভালোই হবে তাহলে!

-আমার ঘরে একা ছিলাম; বাবা বেরিয়ে গেছেন, যাবার আগে তোমার কথা বলছিলেন। কি বলেছেন তুমিতো জানই।

-না, আমি কিছু জানি না —সেলাই করতে করতে বলে ফ্লোরেন্তিনা

-আমি তো সব জানি…আমার বাবা বাজে কথা বলার লোক না। আমাদের দুজনকেই ভালোবাসেন। উনি বেরিয়ে যাবার পর আমি নিজেই ব্যান্ডেজ খুলে ফেললাম, তারপর মাঠের দিকে কিছুক্ষন চেয়ে রইলাম…। রামধনু দেখে চমকে উঠলাম… মুগ্ধতা এবং ধর্মীয় আবেগে বোবা হয়ে গেলাম… জানি না কেন? ওই অসামান্য জমকালো দৃশ্য আমারতো অচেনা, আমার মাথায় একটা ভাবনা এল, এই বুঝি বিশ্বের ছন্দময়তার এক প্রমাণ… এমন রঙের নিষ্কলুষ সহাবস্থান দেখে কেন জানি তোমার কথা মনে হল… কেন জানি না রামধনু দেখে বলে উঠলাম: “আমি আগে কোথাও এমন দৃশ্য দেখেছি মনে হচ্ছে”। তোমাকে  প্রথম দেখে যেমন অনুভব হয়েছিল তেমনই হল এবার, আমার হৃদয়ের ফ্লোরেন্তিনা, সত্যি বলছি। আমার হৃৎপিন্ড বুঝি বুকের মধ্যে আটকে ছিল না; আমার কান্না পেল… কাঁদলাম, চোখের জলে আমার চোখ ডুবে গেল। তোমাকে ডাকলাম, উত্তর পেলাম না… আবার যখন আমার চোখ দেখতে চাইল তখন রামধনু আর নেই… তোমাকে খুঁজতে বেরোলাম, ভাবলাম বাগানে গিয়েছ… নেমে এলাম, ওপরে উঠলাম, এবার তোমার সামনে… এমন অসামান্য সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে যে, মনে হচ্ছে আগে ভা্লো করে দেখা হয়নি… আজকের আগে পর্যন্ত দেখিনি; এখন তোমার সঙ্গে তুলনা করার সময় পেয়েছি, আমি অনেক নারী দেখেছি… তোমার পাশে তারা সবাই কুৎসিত… আমার অন্ধত্বের সময় তুমি ছিলে বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হচ্ছে… না, না, আমার মনে হচ্ছে যে, চোখের আলো যখন পেলাম তখনই তোমার জন্ম হল, যে মুহুর্তে বিশ্বজগতের অধীশ্বর হলাম তখন আমার ভাবনা তোমার জন্ম দিল…শুনেছি যে, তোমার সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো সৃষ্টি আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আমি আগে তা বিশ্বাস করতে চাইনি, কিন্তু এখন বিশ্বাস করি,আলোতে যেমন আমার বিশ্বাস এসেছে তেমনই এসেছে সেই কথায়।

এই বলে মেঝেতে একটা হাঁটু মুড়ে দাঁড়াল…আতঙ্কিত এবং লজ্জায় লাল হয়ে ফ্লোরেন্তিনা  সেলাইয়ের কাজ ছেড়ে অস্ফুট স্বরে বলল:

-ঈশ্বরের দোহাই, দাদা!

-তুতো বোন আমার! ঈশ্বর সহায়! —নিষ্পাপ স্বরে পাবলো বেশ জোরে বলল-,তুমি এত সুন্দর কেন? আমার বাবা ঠিক বলেছেন…তাঁর যুক্তি আর উদার মনের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না…ফ্লোরেন্তিনা, আমার মনে হয়েছিল হয়তো তোমাকে ভালোবাসতে পারব না, মনে হত অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলব।কি বোকামো!ঈশ্বরের দয়ায় আমার প্রেমে যুক্তি আছে…আমার বাবার কাছে আমার ভুল স্বীকার করেছি, আমাকে বলেছেন যে, আমি ভালোবাসতাম এক দানবীকে… এখন বলতে পারি যে, আমি এক পরির প্রতিমা পেয়েছি। নির্বোধ অন্ধ দেখতে পেয়েছে, শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের সৌন্দর্যকে শ্রদ্ধার্ঘ দিতে পারল… কিন্তু আমি কাঁপছি…তুমি দেখতে পাচ্ছ না যে, আমি কাঁপছি? তোমাকে দেখছি আমি, তোমাকে ধরতে চাই, আর কিছু নয়, আমার অন্তরে বন্দি করতে চাই তোমাকে, আলিঙ্গন করব, তোমাকে আমার বুকে জড়িয়ে ধরব… জোরে, খুব জোরে।

দুই হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পাবলো নিজেকেই আলিঙ্গন করার ভঙ্গি করে।

-বুঝতে পারছি না কী মনে হচ্ছে আমার —পান্ডুর হয়ে যায় তার মুখ, কথা জড়িয়ে যায়, খুবই বিব্রত বোধ করে সে —প্রতিদিন আমি আবিষ্কার করি এক নতুন বিশ্ব, ফ্লোরেন্তিনা, আলোর পৃথিবী পেয়েছি, আজ নতুন কিছু দেখলাম। তুমি এত রূপবতী, এত স্বর্গীয়, তুমি কি আমার হবে? তুতো বোন, তুতো বোন, আমার হৃদয়ের রানি; মানে স্ত্রী!

মনে হচ্ছে সংগা হারিয়ে সে মেঝেতে পড়ে যাবে। ফ্লোরেন্তিনা উঠে পড়তে যায়। পাবলো তার হাত ধরে, তারপর হাতের আবরণ সরিয়ে সে আবেগতাড়িত হয়ে হাতে চুম্বন করে, চুম্বন করতে করতে গোনে— এক, দুই,তিন, চার… ওঃ! আমি মরে যাচ্ছি!

-ছাড়ো, ছাড়ো— দাঁড়িয়ে উঠে ফ্লোরেন্তিনা বলে এবং পরে তুতো দাদাকে ওঠায়—ডাক্তার গোলফিন, একে আপনি বকুনতো!

তেওদোরো চিৎকার করেন;

-এ্যাই! যাও এক্ষুণি… চোখে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিজের ঘরে যাও!

গোলমাল হয় পাবলোর, সে ওইদিকে মুখ ঘোরায়। সোজা তাকায় ডাক্তারের দিকে, তিনি কম্বলে আবৃত সোফার সামনে  দাঁড়িয়ে আছেন।

-আপনি ওখানে, ডাক্তার গোলফিন? —সোজা ওঁর দিকে যায় পাবলো।

-এইতো এখানে আমি— গম্ভীরভাবে বললেন তেওদোরো–, ব্যান্ডেজটা লাগিয়ে তুমি নিজের ঘরে যাও। আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।

-আমি তো একদম ঠিক আছি… তাহলেও আপনি যা বলবেন তাই করব… কিন্তু আগে দেখতে দিন।

কম্বলগুলো দেখে আর দেখে তার মধ্যে পড়ে আছে একটা দেহ, মড়ার মতো মুখ তার, দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। আসলে, মনে হচ্ছে যে, নেলার নাকটা খুব ছুঁচলো হয়ে আছে, চোখ ভেতরে ঢোকা, মুখটা সরু, ত্বকের দাগগুলো বেড়ে গেছে, চুল উঠে গেছে, কপালটা কুঁচকে আছে। চোখ বোঁজা, দুর্বল শ্বাসপ্রশ্বাস, পান্ডুর ঠোঁট আধখোলা, যন্ত্রণাকাতর দুঃখী মানুষের দেহ, মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী সংকেত।

-হায়!— কাকার মুখে শুনলাম যে, ফ্লোরেন্তিনা একটা গরিব মেয়েকে নিয়ে এসেছে… কি উদার মন তার, প্রশংসা না করে পারা যায়?… আর তুমি দুঃখী মেয়ে, আনন্দ করো, এক দেবদূত তোমাকে তুলে এনেছে,… অসুখ করেছে না কি? আমার বাড়িতে তোমার কোনো কিছুর অভাব থাকবে না… আমার তুতো বোন ঈশ্বরের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিমা… এই গরিব মেয়েটা বড্ড অসুস্থ, তাই না ডাক্তার?

-হ্যাঁ—গোলফিন বলেন— একা থাকতে চাইছে ও… আর ওর দরকার নৈঃশব্দ।

-ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি।

সেই মেয়ের মাথা স্পর্শ করার জন্যে পাবলো হাত বাড়ায় ,মাথায় হাত রেখে সে বুঝতে পারে যে, মানুষের দুঃখের চরমতম প্রকাশ ঘটেছে এই ছোট্ট দেহটায়, মানুষের চরম অপমানের নিদর্শন এই দেহ। তখন নেলার চোখ চলে যায় তার মালিকের চোখে। পাবলোর মনে হয় যে, সমাধিগহবর থেকে কেউ চেয়ে আছে তার দিকে, ওই চোখে লেগে রয়েছে অসম্ভব বেদনা এবং অসহনীয় যন্ত্রণা। তারপর কম্বলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে নেলার একটা শীর্ণ,শক্ত, বিবর্ণ হাত; সেই হাত দিয়ে পাবলোর হাত ধরে মেয়ে, তার স্পর্শে যুবকের পা থেকে মাথা কেঁপে যায়, এমন জোরে সে চিৎকার করে ওঠে যে, মনে হয়, তার সমগ্র আত্মা আর্তনাদ করে উঠেছে।

 এক অস্বস্তিকর নীরবতা, ঝড়ের আগে এমন নীরবতা দেখা যায়, তার ফলে ঝড় বেশি ভয়ঙ্কর মনে হয়, সবার মনে একটি দুর্বল কন্ঠস্বর মর্মভেদী হয়ে ওঠে, নেলা কাঁপা  কাঁপা গলায় বলে;

-হ্যাঁ, পাবলো, আমার মালিক,আমি নেলা। মারিয়ানেলা।

দুঃস্বপ্নের ভোরের মতো খুব ধীরে ধীরে পাবলোর হাত নিজের শুকনো ঠোঁটে ধরে চুম্বন করে…দ্বিতীয়বার আরেকটি চুম্বন… তৃতীয়বার চুম্বন করতে যাবে এমন সময় যুবকের হাত থেকে অসাড় ঠোঁট পিছলে যায়। সবাই চুপ করে যায়। তার দিকে চেয়ে কারও মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোয় না। কিছুক্ষণ পর প্রথমেই কথা বলে পাবলো:

-তুমি?…তুমি সেই?…

হাজারো কথা ভিড় করে আসে তার মনে, কিন্তু সে কিছুই প্রকাশ করল না। কিছু বলার জন্যে নতুন একটা ভাষা সে আবিষ্কার করলে ভালো হত, ইতিমধ্যেই সে আবিষ্কার করে ফেলেছে দুটো নতুন জগৎ… এক,আলোর জগৎ, দুই, প্রেমের বহিরঙ্গের জগৎ। শুধু দেখে যায়, দেখা ছাড়া কিচ্ছু করার নেই তার, মনে পড়ে যায় এক অন্ধকার জগতের কথা, সেখানেই সে বাস করত, সেই কুয়াশায় হারিয়ে গেছে ওর কত আবেগ, তার কত ভাবনা এবং ভুল ধারণা। কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরেন্তিনা নেলার মুখ দেখবে বলে এগিয়ে আসে এবং গোলফিন মানুষ হিসেবে, প্রাজ্ঞ ব্যক্তির মতো কিছু নিস্পৃহ মন্তব্য করলেন:

-ওকে হত্যা করল! এই যুবকের অভিশপ্ত দৃষ্টি মেয়েটাকে হত্যা করল।

পাবলোর দিকে চেয়ে কঠোরভাবে বললেন:

-তুমি চলে যাও!

-মৃত্যু!… এইভাবে কোনো কারণ ছাড়াই মারা যাওয়া… এ হতে পারে না – নেলার কপালে হাত রেখে ফ্লোরেন্তিনা বড়ো বেদনায় চিৎকার করে— মারিয়া!… মারিয়ানেলা!

মৃতদেহের দিকে ঝুঁকে বারবার ডাকে সে, যেমনভাবে তার দিকে তাকাত, যেমনভাবে ডাকত ঠিক সেইরকম, কুয়োর মধ্যে পড়ে যাওয়া মানুষকে যেমন ওপর থেকে ডাকা হয়, মানুষটা হয়তো ততক্ষণে গভীর কালো জলের মধ্যে তলিয়ে গেছে…

-উত্তর দিচ্ছে না—আতঙ্কিত হয়ে পাবলো বলে।

গোলফিন মুমূর্ষু মেয়েটার জীবনদীপ নিভে যেতে দেখেও বুঝতে পারেন যে,তার ত্বকের নীচে উষ্ণ রক্ত বইছে। পাবলো তার দিকে ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নামিয়ে চিৎকার করে: নেলা, নেলা, ওঃ! আমার বান্ধবী!

সেই মেয়ের  শরীর নড়ে ওঠে, চোখ খোলে সে, হাতদুটো নড়ে। মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে ফিরে আসছে সে। কৌতূহলী চোখে পাবলো তার চোখের দিকে  তাকিয়ে আছে দেখে মৃত্যুপথযাত্রী মেয়ে লজ্জা এবং ভয়ে কুঁকড়ে যায় এবং অপরাধ লুকোবার মতো করে তার দুর্ভাগা মুখটা লুকোতে  চেষ্টা করে।

-ওর কী হল? —ফ্লোরেন্তিনার ব্যাকুল প্রশ্ন—। দন তেওদোরো, ওকে বাঁচাতে পারলেন না?… কীরকম মানুষ আপনাকে বলব?… ওকে বাঁচাতে না পারলে বলব, আপনি একজন বাক্যবাগীশ ছাড়া কিছুই না।

দয়ামায়ার প্রাণ তার, দানধ্যানের জন্যেই সে বিখ্যাত, ডাক্তারের ওপর প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়ে যায় সে।

-নেলা!— ‘অন্ধের যষ্টি’র দিকে চেয়ে পাবলো বেদনার্ত এবং বিস্ময়বিহব্বল— মনে হচ্ছে আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছ! আমি তোমার কী করেছি বলোতো।

অসুস্থ মেয়ে হাত বাড়িয়ে ফ্লোরেন্তিনার হাত ধরে বুকের ওপর রাখে; তারপর পাবলোর হাত নিয়ে বুকে রাখে। যতটা জোরে পারে হাতগুলো চেপে ধরে রাখে। নিমীলিত চোখে নেলা ওদের দিকে চেয়ে থাকে, কিন্তু সেই চাহনি অনেক দূরের, গভীর গহবর থেকে আসছে, ভীষণ অন্ধকার কোনো কুয়ো থেকে আসছে। আগে যেমন বলা হয়েছে, অন্ধকার বিষণ্ণ কুয়ো প্রতি মুহুর্তে গভীর থেকে গভীরতর হয়ে যাচ্ছে।হঠাৎই তার শ্বাসপ্রশ্বাস মন্থর হতে থাকে। দুজনের হাত আরও জোরে আঁকড়ে ধরে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তেওদোরো ব্যস্ত হয়ে পুরো বাড়িটাকে নাড়িয়ে দেন: চিৎকার করে ডাকেন, ওষুধ, মালিশের তেল আনাবার চেষ্টা করেন, রোগীকে বাঁচাবার জন্যে বারবার ডাকতে থাকেন যাতে প্রাণ দ্রুত বেরিয়ে না যায়।

-মুশকিল— তিনি বলেন— জলের ফোঁটা আটকানো যাচ্ছে না, পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে, হা! নীচের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে ঢালু পথ দিয়ে, সমুদ্র থেকে দুই ইঞ্চি দূরে আছে, তবু চেষ্টা করব।

সবাইকে বেরিয়ে যেতে বললেন ডাক্তার। শুধু রইল ফ্লোরেন্তিনা। আঃ! শরীরটা নড়াবার চেষ্টা করেন, স্নায়ু সবল করার জন্যে ঝাঁকুনি দেন, সংগাহীণ অঙ্গের রক্ত সঞ্চালন করার সবরকম পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, কিন্তু সব চেষ্টা একটু একটু করে ডুবে যেতে থাকে। হতভাগ্য নেলা!

-এটা নিষ্ঠুরতা -হতাশায় বলেন তেওদোরো। মালিশ করার জন্যে  যা আনা হয়েছিল ছুঁড়ে ফেলে দিলেন–, আমরা যা করছি তা নিষ্ঠুরতা। কুকুরের কামড়ে যার ক্ষত হয়েছে কুকুর তাড়িয়ে তার ক্ষতে প্রলেপ দিচ্ছি যদি আরেকটু সময় বেঁচে থাকে। হাতের বাইরে চলে গেল।

-কিছু করা যায় না?

-ঈশ্বর যা করেন।

-কীসের অসুখ ওর?

-মৃত্যু— ডাক্তার নন যেন তিনি, বিকারে ছটফট করছেন।

-কিন্তু মৃত্যুর কারণটা কী? কোন রোগে মৃত্যু?

-মৃত্যু।

-বুঝলাম না। বলছি কী রোগে?

-মৃত্যুর কারণে! লজ্জা, ঈর্ষা, ক্রোধ, দুঃখ, প্রেমের বঞ্চনা- কী থেকে মরন হল ভাবার ক্ষমতা আমার নেই। এক বিশেষ রোগ! না, না, আমরা কিছুই জানি না… যা জানি আমরা তা অতি তুচ্ছ।

-ওঃ কি ডাক্তার!

-আমরা কিচ্ছু জানি না। ভাসা ভাসা জ্ঞান আমাদের।

-কী?

-যেকোনও জিনিস… মরণ!

-একটা মানুষ মারা গেল, তার মৃত্যুর কারণ জানা গেল না, বিনা অসুখে কেউ মারা যায়? সেন্যোর গোলফিন, রোগটা কী?

-আমি জানি? কী করে বলব?

-আপনি ডাক্তার না?

-চোখের, আবেগের না।

-আবেগ! আবেগ!— চেঁচিয়ে ওঠেন তিনি আর কথা বলেন রোগিনীর সঙ্গে—বেচারা, বড়ো দুঃখী তুই, কোন আবেগ তোর প্রাণটা কেড়ে নিল? কীসের এত আবেগ? ফ্লোরেন্তিনা, তোমার হবু বরকে এই কথাটা জিগ্যেস করো।

বিস্ময়ে হতবাক ফ্লোরেন্তিনা।

-হতভাগিনী! —কাঁদতে কাঁদতে তাঁর গলা বুঁজে আসে–। মনের কষ্ট কি এভাবে কাউকে হত্যা করতে পারে?

-‘ত্রাসকাভা’ থেকে যেদিন ওকে নিয়ে আসি সেদিন দেখেছিলাম ভয়ে কাঁপছে।

-কিন্তু ওটা কারণ হতে পারে না। নাঃ, বিশ্বাস হচ্ছে না।

-তুমি বলছ, ওটা কারণ না। ঈশ্বর জানেন প্রকৃতি কী বলে? হ্যাঁ, ওটাই কারণ।

-মনে হয়, ওকে জোর আঘাত দেওয়া হয়েছে। কঠিন আঘাত। –মনে করে দ্যাখো একটু আগে এই চোখদুটো দেখছিল, এখন চিরকালের জন্যে বুঁজে আছে; ভাবোতো, এক অন্ধ যুবক ওকে ভালোবাসত, এখন সে আর অন্ধ নেই এবং মেয়েটিকে সে দেখেছে… দেখেছে নিজের চোখে…স্পষ্ট দেখল! এই দেখাটা আততায়ীর মতো!

-ওঃ, কি ভয়ঙ্কর প্রহেলিকা!

-না, প্রহেলিকা না— চিৎকার করেন তেওদোরো, তাঁর কন্ঠস্বরে আতঙ্ক—স্বপ্নভঙ্গের এমন হতাশা, বাস্তবতার এমন অকস্মাত আঘাত দুই সুন্দর মানুষের মধ্যে বিধ্বংসী বাস্তবতার রাক্ষস প্রবেশ করে সব ছারখার করে দিল। আমিই ডেকে এনেছি সেই বাস্তবতা! সেই রূঢ় বাস্তবতা!

-ওঃ কি রহস্য!— ফ্লোরেন্তিনার এমন যন্ত্রণাদগ্ধ মন যে, সবকিছু ঠিক বুঝতে পারে না।

-রহস্য নয়, না কোনো রহস্যময়তা নেই— উত্তেজিত ডাক্তার একই কথা বলেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁর অস্থিরতা বাড়তে থাকে— এ নিখাদ বাস্তবতা, স্বপ্ন আর কল্পনার মৃত্যু। বাস্তবতা ছেলেটার নতুন জীবন এনে দিল; মেয়েটার জীবনে তা হল পরম যন্ত্রণা, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। অপমান, দুঃখ, পরাজয়, ব্যথা, ঈর্ষা… মৃত্যু!

-এত…এতসব…

-সব হল দুটো চোখের জন্যে, যে চোখ আলো দেখতে পেল দেখল বাস্তবতা! … আমার মন থেকে এই শব্দটা তাড়াতে পারছি না। আমার মস্তিষ্কের মধ্যে আগুনের অক্ষরে শব্দটা লেখা হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।

-শুধু কয়েকটা চোখের জন্যে সব শেষ… যন্ত্রণায় মানুষ এত তাড়াতাড়ি মারা যেতে পারে?… কোনো প্রতিকারের সময় দিল না!

-জানি না— তেওদোরো বললেন, তিনি চরম বিচলিত এবং সন্ত্রস্ত। অন্ধকারাচ্ছন্ন চরিত্রের মানবিক গ্রন্থটা তিনি দেখছেন, সেখানে বিজ্ঞান-সম্মত দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না জীবন-মৃতুর রহস্যময় রুপকথা!

-আপনি জানেন না! —বেপরোয়া ফ্লোরেন্তিনা বলে–, তাহলে কীসের জন্যে আপনি ডাক্তার হয়েছেন?

-আমি জানি না, জানি না, জানি না— সিংহের থাবার মতো হাতে নিজের মাথায় সজোরে আঘাত করতে করতে বলেন ডাক্তার—হ্যাঁ, একটা জিনিস জানি, সেটা হচ্ছে এই যে, সবকিছুর বাইরের চেহারা দেখা ছাড়া বিশেষ কিছুই জানি না। শোনো ফ্লোরেন্তিনা, আমি একজন চোখের মিস্তিরি, আর কিছু নই।

এই কথা বলার পর গভীর মনোযোগ দেখতে লাগলেন সেই মন যা জীবিত আর মৃতের মাঝে ঘুরতে থাকে, তারপর তিক্ত কন্ঠস্বরে চিৎকার করে বললেন:

-আত্মা! তোমার কী হয়েছে?

ফ্লোরেন্তিনা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

-আত্মা—মাথা নীচু করে অস্ফূট স্বরে বলে —উড়ে গেছে অনেকক্ষণ!

-না—নেলার গায়ে হাত দিয়ে বললেন ডাক্তার —এখনও সামান্য কিছু আছে, কিন্তু এত সামান্য,…আমাদের বিশ্বাস করতেই হবে যে, ওর আত্মা চলে গেছে। পড়ে আছে দীর্ঘশ্বাস।

-হা ঈশ্বর!—প্রার্থনার মন্ত্র বলতে বলতে চিৎকার করে ফ্লোরেন্তিনা।

-ওঃ! অপমানিত আত্মা!— গোলফিন বলেন—বোঝাই যাচ্ছে যে, আত্মার বাসস্থানটা  ভালো ছিল না…

খুব কাছে বসে দুজন জীবিত মানুষ সেই শরীরটার দিকে চেয়ে থাকে।

-ওর ঠোঁট নড়ছে— ফ্লোরেন্তিনা চেঁচিয়ে ওঠে

-কথা বলো।

হ্যাঁ, নেলার ঠোঁট নড়েছে। এক, দুই, তিনটি শব্দ শোনা গেল।

-কী বলছে?

-কী বলল?

দুজনের কেউই বুঝতে পারেনি। নিশ্চয়ই সে ভাষা বোঝে তারা যারা অসীম জীবনের অধিকারী হয়। আর তার ঠোঁটের নড়াচড়া আর দেখা গেল না। আধখোলা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল সাদা দাঁতের সারি। তেওদোরো নীচু হয়ে নেলার কপাল চুম্বন করে দৃঢ়ভাবে বললেন:

-নারী, এই পৃথিবীটা ছেড়ে চলে গিয়ে ভালো করলে!

ফ্লোরেন্তিনার কান্না বাঁধ মানে না। কাঁপা গলায় চাপা স্বরে সে বলল:

-আমি ওকে সুখী করতে চেয়েছিলাম, সে তা হতে চায়নি।

ক্রমশ…

Tarun kumar Ghatak
তরুণ কুমার ঘটক       
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ এবং‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।  

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.