মারিয়ানেলা (পর্ব- ২০)

বাংলা English
Benito Pérez Galdós
Benito Pérez Galdós
বেনিতো পেরেস গালদোস (১৮৪৩—১৯২০)       

স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম।ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি।তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 'ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা','জাতীয় ঘটনাক্রম'। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা'' ইত্যাদি।  বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে।কর্ণেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।  গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সালে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশতি শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খন্ডের অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।  ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় 'দন্যা পেরফেক্তা'(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়াল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস।জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার) মতে 'তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।' লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।  ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ণ ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন। কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্তেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন। 
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

নতুন বিশ্ব

কিছুদিন পিছিয়ে যাই আমরা।ডাক্তার তেওদোরো গোলফিন যখন প্রথম ব্যান্ডেজ খোলেন পাবলো আতঙ্কে আর্তনাদ করে ওঠে।তারপর থেকে শরীরের নড়াচড়া দেখে মনে হয় অসুখটা ফিরে আসছে।হাতের ভর রাখে কোনো এক জায়গায়, দেখে মনে হয়, তার আগের অবস্থায় চলে যাচ্ছে।আলোকিত ঘরটা তার কাছে এক বিশাল পাতালপুরী, সেখান থেকে মাটিতে পড়ে যাবার মতো অবস্থা তার।আত্মরক্ষার সহজাত বোধেই সে চোখ  বুজে ফেলে।ডাক্তার তেওদোরো গোলফিন, তার বাবা এবং বাড়ির অন্য সকলেই উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছে, আবার একবার সে তাদের দেখল, কিন্তু ভয় কাটছে না তার।তার উত্তেজিত মস্তিষ্কে  অনেক ছায়ামূর্তির আসা যাওয়া চলছে, যেন খুব দ্রুত কিছু ঘটে যাচ্ছে, তার মনে হচ্ছে সবকিছুর সঙ্গে তার ধাক্কা লেগে যাচ্ছে; দূরের পাহাড়গুলো তার হাতের নাগালের মধ্যে চলে আসছে, সে তার পাশের জিনিস এবং মানুষগুলোকে দেখে ভাবছে সবকিছু তার চোখের ওপর এসে পড়বে।

 তেওদোরো গোলফিন খুব আগ্রহের সঙ্গে এই ঘটনাগুলো লক্ষ করছেন, কারণ জন্মান্ধ মানুষের চোখে এটা তার দ্বিতীয় অপারেশন।অন্যেরা আনন্দ প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছে না কারণ এই সৌভাগ্যবান ছেলেটির দিক থেকে এমন কিছু প্রকাশ পাচ্ছে যা দেখে তারা বিচলিত এবং বিস্মিত হচ্ছে।পাবলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে আনন্দের এক বিকার।তার স্নায়ু এবং কল্পনা দুইই ভীষণ রকম উত্তেজিত যার জন্যে তেওদোরো বুদ্ধি করে যথাসম্ভব বিশ্রাম নিতে বাধ্য করেছেন। হাসতে হাসতে তিনি বললেন :

-এখন পর্যন্ত তুমি অনেকটা দেখতে পেয়েছ।দৃষ্টিহীনতা থেকে মুক্তি, অন্ধকার থেকে আলোয় আসা, সূর্যের রাজ্যে প্রবেশ করা থিয়েটার হলে প্রবেশের মতো সহজ নয়।এ এক নতুন জন্মলাভ, তাতে আছে যন্ত্রণা।

পরে পাবলো তার সদ্যজাত দৃষ্টির ক্ষমতা দেখাবার প্রচন্ড চেষ্টা করে এবং  দৃশ্যমান জগৎ যাতে সে দেখতে পায় তার সুযোগ করে দেন ডাক্তার তেওদোরো গোলফিন।

-আমার অন্তর—প্রথম অনুভব কেমন ! পাবলো বলে—ভরে যাচ্ছে অপরূপ সৌন্দর্যে, এত অপার সৌন্দর্য আগেতো কখনও দেখিনি।আমার মনে এত আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল কেন? আগে জানতাম না কাকে আকার বা আয়তন বলে, একটা অস্পষ্ট ধারণা ছিল,প্রথমে সে  স্পষ্ট এবং  মনে হয়েছিল ভয়ঙ্কর, আমাকে চুড়োয় তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে পাতালের গভীরে।সবকিছু সুন্দর আর পবিত্র, তবে আমার ভয় কাটছে না।এমন অপরূপ অনুভব বারবার পেতে চাই।আগে সৌন্দর্যের যে ব্যপ্তি দেখেছিলাম তা এখন আবছা মনে হচ্ছে, সে এক শান্তশ্রী রূপের ঐশ্বর্যময় ব্যাপ্তি,আমাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে ঝুঁকে চোখের সামনে এসেছিল।দেখলাম সমগ্র বিশ্বচরাচর আমার দিকে ছুটে আসছে, আমি অভিভূত এবং ভয়ার্ত হয়ে গিয়েছিলাম।আকাশ এক মহান শূন্যতা, ঠিক বোঝাতে পারব না কেমন…এক অসাধারণ দৃশ্য, তার নিজের প্রকাশক্ষমতা অতুলনীয়।আকাশ এবং পাহাড়গুলো একযোগে আমাকে লক্ষ করছিল এবং আমার দিকে ছুটে আসছিল…কিন্তু ওই রাজকীয় উপস্থিতি শীতল এবং কঠোর।আমাকে আপনি দেখান বড়ো স্পর্শকাতর এবং দরদি সেই মেয়েটাকে, নেলা, কোথায় গেল নেলা?

এই কথা শুনে গোলফিন পুনরায় নতুনভাবে চোখ দেখে রোদচশমার ব্যবস্থা করে দিলেন এবং বাইরের সবকিছু দেখার অনুমতি দিলেন।

-ও; হে ঈশ্বর, যাকে এখন দেখছি সে কি নেলা?—পাবলো মুগ্ধ হয়ে অতি উৎসাহে বলে ওঠে।

-এ তোমার তুতো বোন  ফ্লোরেন্তিনা।

-আঃ—বিভ্রান্ত যুবক চিৎকার করে ওঠে, এ আমার তুতো বোন!…এমন রূপ সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণা ছিল না …ঈশ্বরের পরম করুণায় আমি স্বর্গীয় আলো নিজের চোখে দেখতে পেলাম! আমার তুতো বোন,তুমি এক মধুর সংগীত, এই যাকে চোখে দেখছি সে যেন জগতের ছন্দময়তার প্রকাশ…কিন্তু নেলা? কোথায় সে?

-তাকে দেখার অনেক সময় পাবি—খুব খুশিমনে বলেন দন ফ্রানসিস্কো,এখন একটু শান্ত হ।

-ফ্লোরেন্তিনা!ফ্লোরেন্তিনা!—বিকারগ্রস্ত রোগীর মতো বারবার বলতে থাকে পাবলোএই মুখে কী আছে যে, মনে হচ্ছে ঈশ্বর স্বয়ং মানুষের রূপ ধরে এসেছে।তুমি  নিশ্চয় সূর্যের কোলে বসে আছ।তোমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে সূর্যরশ্মি…অবশেষে বুঝতে পারলাম পরী কেমন দেখতে হয়…আর তোমার শরীর,হাত, চুল দেখে আমার হৃদয়ে আলোড়নউঠেছে, অসামান্য ভাবনা মনে আসছে…এসব কী?

-রঙ, রঙের জগৎ খুলে যাচ্ছে—গোলফিনের অস্ফূট উচ্চারণ–, চারপাশের এইসব জিনিসে রামধনুর রঙ দেখছে।এখনও দূরত্বের সঙ্গে চোখের মেলবন্ধন হয়নি।

-আমি নিজের চোখের ভেতর তোমাকে দেখছি—পাবলো বলতে থাকে—যা ভাবছি তার মধ্যে মিশে যাচ্ছ তুমি, আর তোমার দৃশ্যমান চেহারা আমার এক  স্মৃতি।কীসের স্মৃতি?এখন পর্যন্ত আমি কিছুই দেখতে পাইনি…এই জীবনের আগেও বোধহয় আমার একটা জীবন ছিল। আমি জানি না, কিন্তু  তোমার ওই চোখের কথা আমি জানতাম।আর বাবা,আমার বাবা কোথায়? আঃ! দেখছিতো, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি।তুমি আমার বাবা…তোমার প্রতি আমার যে ভালোবাসা আছে তার জন্যেই তোমার সঙ্গে এই দেখা…আচ্ছা, আমার কাকা? …তোমাদের দুজনকে দেখতে একরকম… কোথায় আছেন ঈশ্বর-প্রতিম গোলফিন?

-এইতো,এখানে… রোগীর পাশে—তেওদোরো তার সামনে গিয়ে বললেন—এই তোমার কাছে, পশুর চেয়েও কুদর্শন।‘তেররানোভার’ সিংহ বা কুকুরতো তুমি দেখনি, সুতরাং আমার রূপ কেমন বুঝতে পারবে না…লোকে বলে, আমাকে ওইসব জন্তুদের মতো দেখতে।

-সবাই ভালো—সরলভাবে বলে পাবলো,কিন্তু আমার তুতো বোন সবার প্রিয়…আর নেলা?হায় ঈশ্বর! নেলাকে আনা হচ্ছে না কেন?

তাকে বলা হল যে,তার সঙ্গিনী বাড়িতে আসেনি, তাকে খুঁজতে যাওয়াও হয়নি, একথা শুনে দুঃখে তার মন ভার হয়ে গেল।সবাই তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে, উত্তেজনায় তার ক্ষতি হতে পারে, তাই তাকে শুইয়ে দেওয়া হল, ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।পরের দিন তার মধ্যে স্বাভাবিক উদ্যমের প্রকাশ দেখা যায়।জলের একটা গ্লাস দেখতে চাইল, সেটা দেখে বলল:

-জলের গ্লাসটা দেখেই মনে হচ্ছে জল পান করছি।

একইভাবে সব জিনিসের প্রতি তার সম্ভ্রম প্রকাশ পায়, এই জিনিসগুলোই তার কল্পনার জগতে জীবন্ত হয়ে উঠত।চশমার মধ্যে দিয়ে সে বাইরের বস্তু সম্পর্কে যাতে কোনো বিকৃত ধারণা না করে তাই গোলফিন তার চোখের সামনে একটা রঙের সঙ্গে অন্য রঙের তফাত এবং একসঙ্গে রঙের মিশ্রণ দেখাতে লাগলেন, কিন্তু  যুবকের নতুন চোখে সুন্দরের সঙ্গে অসুন্দরের পার্থক্য করার প্রবণতা দেখা যায়।দুই বিপরীত ধারণার বিচার সে করতে শুরু করে, বস্তুর উপযোগিতা কিংবা মানুষের ঔদার্য নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই।একটা প্রজাপতি পথ ভুল করে তার ঘরে প্রবেশ করেছে দেখে তার খুব আনন্দ হয়।তার কাকা লেখার কালি রাখার জন্যে দোয়াতের উপযোগিতা বোঝালেও সে ওটা দেখে  বিরক্ত হয়।‘ক্রুশবিদ্ধ’ এবং ‘স্বর্গের নর্তকী পরিবৃত শঙ্খে’র নৌযাত্রা’-এই দুই ছবি দেখে শেষেরটা সে বেশি পছন্দ করে যা দেখে ফ্লোরেন্তিনা হতাশ হয়, কারণ সে চেয়েছিল যে, পাবলোকে পবিত্র কিছু দেখানো হোক, মানুষের পাপ নিয়ে কিছু না দেখানোই ভালো।তার সামনে উপস্থিত মানুষদের মুখগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে সে লক্ষ করে, মুখের সঙ্গে ভাষার আশ্চর্য মিল দেখে সে খুবই অবাক হয়।বাড়ির পরিচারিকা এবং গ্রামের অন্য মহিলাদের দেখে সে বিরক্ত হয় কারণ এরা কেউ দেখতে সুন্দর নয়, খুবই সাধারণ এরা।তুতো বোনের রূপ দেখে অন্য নারীদের সম্বন্ধে তার বীতরাগ হয়।

এতদসত্বেও সবাইকে দেখতে চায় সে।তার কৌতূহল এত বেড়ে যায় যে,কিছুতেই তাকে শান্ত করা যায় না এবং নেলাকে না দেখতে পেয়ে তার অস্থিরতা খুব বেড়ে যায়, ফ্লোরেন্তিনাকে অনুরোধ করে যেন এক মুহুর্তও যেন সে তাকে ছেড়ে না যায়।

তৃতীয় দিনে গোলফিন তাকে বললেন;

-ইতিমধ্যেই তুমি দৃশ্যমান জগতের অনেককিছু দেখে ফেলেছ।এখন নিজের চেহারাটা একবার দেখা দরকার।

একটি আয়না আনা হল, পাবলো নিজের মুখ দেখে বলে উঠলঃ

-এই আমি? …মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে উন্মত্তের মতো।–-বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।জমাট শান্ত জলের মধ্যে এ কেমন আমি?কাচের মধ্যে কি অপরূপ দেখায়! মানুষ পাথর দিয়ে এইসব তৈরি করেছে ভাবলে আশ্চর্য লাগে।

-না, জীবন বাজি রেখে বলা যায় যে,আমি কুৎসিত নই…কী বল তুমি,বোন?আর তুমি আয়নায় নিজেকে যখন দেখ তখনই এমন সুন্দর লাগে?তা হয় না।স্বছ আকাশে নিজের মুখ দ্যখো, তোমার  চেহারা ঠিক কত সুন্দর দেখবে।নিজেকে দেখে তোমার মনে হবে যে, দেবদূতীদের দেখছ।

ফ্লোরেন্তিনা একা তার ঘরে, প্রথম রাতে এই মেয়ে তার তুতো দাদার শুশ্রুষা করেছে, করেছে আন্তরিকভাবে, এখন তা জেনে পাবলো বলে:

-বোন শোনো, আমার বাবা আমাদের ইতিহাসের একটা অনুচ্ছেদ পড়ে শুনিয়েছিলেন, ক্রিস্তোবাল কলোন(কলম্বাস) নামে একজন অভিযাত্রী আবিষ্কার করেছিলেন ‘নতুন বিশ্ব’, এই ভূখন্ড তখন পর্যন্ত ইউরোপের কোনো মানুষ দেখেনি।সেই অভিযাত্রী চেনা পৃথিবীর চোখ খুলে দিলেন যাতে  আরও সুন্দর এক জগৎ দেখতে পাওয়া যায়।আমার কাছে তেওদোরো গোলফিন সেই অভিযাত্রী, জন্মান্ধ হল সেই ইউরোপ, তার  চোখের আলো হল আমেরিকা এবং  তার আশ্চর্য সুন্দর রূপ।আমিও আবিষ্কার করছি এক ‘নতুন বিশ্ব’।তুমি আমার আমেরিকা, তুমি সেই সুন্দর দ্বীপ যেখানে প্রথম পা রেখেছিলেন অভিযাত্রী।বিশাল অরণ্য আর নদীর মহাদেশ এতদিন সে দেখতে পায় নি।হয়তো আরও সুন্দর কিছু আমার দেখা বাকি আছে।

তারপর সে গভীর চিন্তায় ডুবে নীরব হয়ে গেল।কিছুক্ষন পরে জিগ্যেস করলঃ

-নেলা কোথায় আছে?

-সে বেচারার যে কী হয়েছে আমি জানি না—ফ্লোরেন্তিনা বলল—নিশ্চয়ই তোমাকে দেখতে চাইছে না।

-ও খুব লাজুক এবং বিনয়ী—পাবলো বলে—বাড়ির  লোকেরা বিরক্ত হবে ভেবে ভয় পায়।ফ্লোরেন্তিনা, তোমাকে চুপি চুপি বলছি,আমি ওকে খুব ভালোবাসি।তুমিও ওকে ভালোবেসো।আমার বন্ধু এবং সুন্দরী সঙ্গিনীকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।

-কাল আমি নিজে যাব ওকে খুঁজতে।

-হ্যাঁ, হ্যাঁ…খুব ভালো হয়, কিন্তু তুমি বেশিক্ষণ বাইরে থেকো না।তোমাকে দেখতে না পেলে আমার বড়ো একা লাগে।তোমাকে দেখে যে আমার এমন অভ্যস হয়ে গেছে, না দেখে এক মুহূর্তও থাকতে পারি না, এই তিনদিন যেন আমার কাছে কত শতাব্দীর সুখ…এক মুহূর্তও এই সুখ থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না।কাল রাতে বাবা বলছিল যে,তোমাকে দেখার পর অন্য কোনো নারীকে দেখার ইচ্ছে না থাকাই উচিত।

-কী যে বলনা!—মেয়েটার মুখ লাল হয়ে যায়, তবুও সে বলে:

-আমার চেয়ে ঢের সুন্দরী অনেক মেয়ে আছে।

-না, না,সবাই বলে যে, নেই—পাবলো বেশ জোর দিয়ে একথা বলতে বলতে ব্যান্ডেজবাঁধা চোখে তুতো বোনের দিকে চায়, যেন এত বাধা সত্বেও তাকে দেখার ইচ্ছে দমন করতে পারছে না -আগে লোকে বলত কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে চাইনি, কিন্তু দৃষ্টি পেয়ে যখন এই পৃথিবীর রূপ দেখতে পেলাম তখন বিশ্বাস হল, হ্যাঁ, আমার বিশ্বাস হল। সৌন্দর্যের নিখুঁত এক প্রতিমা তুমি; এর চেয়ে সুন্দর কিছু নেই,হতে পারে না…তোমার হাতখানা দাও।

তুতো দাদা নিজের উষ্ণ হাতের মধ্যে এই মেয়ের হাতখানা টেনে নিল।

-এখন আমার মুখে হাসি—সে বলে—অন্ধের হাস্যকর অহঙ্কারের কথা ভেবে আমি হাসছি, বাইরের কিছু না দেখেও আহাম্মকের মতো কিছু ধারণা গড়ে নিতাম…বাস্তব আমাকে বিস্মিত করেছে, এই বিস্ময় সারাজীবন আমি ধরে রাখব…।আহা বাস্তব!যে বাস্তবতা দেখেনি সে এক নির্বোধ…ফ্লোরেন্তিনা, আমি একটা নির্বোধ ছিলাম।

-না, তুমি তা নও; তুমি চিরকাল বুদ্ধিমানই ছিলে, এখনও তাই আছ…তবে এখন তোমার কল্পনাকে আর উজ্জীবিত করো না…ঘুমোবার সময় হয়ে এল…দন তেওদোরো এমন সময় বেশি কথা বলতে নিষেধ করেছেন কারণ তোমার ঘুম হবে না…তুমি চুপ না করলে আমি চলে যাব।

-এখন কি রাত হয়েছে?

-হ্যাঁ, রাত হয়েছে।

-যাইহোক, রাত হোক আর দিন হোক,আমি কথা বলতে চাই—পাবলো বিছানায়  শুয়ে অস্থির হয়ে ওঠে—একটা শর্তে আমি চুপ করতে পারি, সেটা হল যে, তুমি আমার পাশ থেকে যাবে না আর মাঝে মাঝে হাততালি দেবে যাতে আমি বুঝতে পারব যে, তুমি আমার বিছানার পাশে আছ।

-ঠিক আছে, তাই করব আমি,এটাই জীবনের প্রথম প্রতিশ্রুতি—একবার হাততালি দিয়ে বলে ফ্লোরেন্তিনা।

-আমি যখন বুঝতে পারি যে, তুমি হাসছ তখন মনে হয় আমি এক সুগন্ধময় সজীব পরিবেশে শ্বাস নিচ্ছি আর আমার আগেকার বোধগুলো তোমার ভিন্ন ভিন্ন রূপ মনে করিয়ে দিচ্ছে।তোমার স্মৃতি আমার মনে এমনভাবে গেঁথে আছে যে,এখন ব্যান্ডেজবাঁধা চোখেও তোমাকে একইরকম দেখছি…

-আবার কথা বলছ? …দন তেওদোরোকে ডাকছি আমি—সেন্যোরিতা ফ্লোরেন্তিনা কপট রাগ দেখিয়ে বলে।

-না, ওঁকে ডেকোনা…চুপ করে বোসো।আমি যদি চুপ করতে না পারি তাহলে বলো …যদি চুপ করে যাই তাহলে যা ভাবি, যা উপলব্ধি করি, আর এখানে যা দেখছি সব আমার মস্তিষ্ককে আরও অস্থির করে তুলবে, আমি মানসিকভাবে কষ্ট পাব…তুমি কি চাও আমি ঘুমোই?…ঘুম!ফ্লোরেন্তিনা, তোমাকে যদি মাথার মধ্যে বসাই আমার মস্তিষ্ক জ্বলবে, আমি পাগল হয়ে যাব…যা বলতে পারব না তাতে কষ্ট হবে, আবার একরকমের আনন্দও হবে, এই অনুভব ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।সারারাত তোমার সঙ্গে আর নেলার সঙ্গে কথা বলব…বেচারা নেলা!তাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে, খুউব…

-আমি নিজে কাল ওকে খুঁজতে যাব…এখন কথা শেষ…চুপ করো, নইলে আমি চলে যাব।

-থাকো তুমি…।আমি নিজের সঙ্গে কথা বলব…কাল রাতে আমরা দুজন কথা বলার সময় যা বলেছিলাম আমি তাই বলব আবার…তুমি কী বলেছিলে মনে করার চেষ্টা করছি।

-আমি?

-তার মানে, তোমার মুখে শোনা যে কথাগুলো আমি মনে করতে পারব…চুপ…আমি কল্পনা করতে পারি ভালো।

পরের দিন ফ্লোরেন্তিনা তার তুতো দাদার সামনে এসে বলল;

-মারিয়ানেলাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে আসছিলাম কিন্তু সে পালিয়ে গেল।কি অকৃতজ্ঞতা!

-আর খুঁজলে না ওকে?

-কোথায় খুঁজব?আমার কাছে থেকে ছুটে পালিয়ে গেল!আজ বিকেলে আবার বেরবো আর যতক্ষণ না পাই খুঁজে বেড়াব।

-না।আজ বেরিয়ো না—পাবলো বলে–, ও আসবে, একাই আসবে।

–মেয়েটা পাগল মনে হয়।

-ও কি জানে যে আমি দেখতে পাচ্ছি?

-আমিইতো ওকে বলেছি।কিন্তু তার মাথার ঠিক নেই।বলে,আমি নাকি ‘কুমারী মা’?আমার পোশাক চুম্বন করে।

-তার মানে সবার মতো তারও একই কথা মনে হয়েছে।তুমিতো এমনই। নেলা এত ভালো…।বেচারা! ফ্লোরেন্তিনা, ওকে দেখতে হবে, ওকে বাঁচাতে হবে।বুঝেছ?

-ও একটা অকৃতজ্ঞ মেয়ে—বিষণ্ণ মনে বলে ফ্লোরেন্তিনা।

-আঃ, অমন বলো না।অকৃতজ্ঞতা কাকে বলে নেলা জানে না। ও

খুব ভালো…আমি ওর ভক্ত…ওকে খুঁজে আমার কাছে আনা উচিত।

-আমি যাব।

-না,না, তুমি না—তার হাত ধরে পাবলো দ্রুত বলে—আমাকে সঙ্গ দেওয়াই তোমার আসল কাজ। সেন্যোর গোলফিন ব্যান্ডেজ খুলে চশমা দিতে যদি তাড়াতাড়ি না আসেন আমি নিজেই খুলে ফেলব।কাল থেকে তোমাকে দেখিনি, এটা আমি সহ্য করতে পারছি না…দন তেওদোরো এসেছেন?

-নীচে তোমার আর আমার বাবার সঙ্গে আছেন।এখুনি ওপরে আসবেন।একটু ধৈর্য ধরো, বাচ্চা ছেলের মতো করো না।

পাবলো গজগজ করতে করতে নিজেকে সামলে নেয়।

-আলো! আলো!…এই অস্থিরতা আসছে এতক্ষণ চোখবাঁধা অবস্থায় থাকার জন্যে।এভাবে বাঁচা যায় না…আমি নিশ্চয় মরে যাব।প্রত্যেকদিন খাবার চাই, তেমনই চোখের কাজ চাই…আজ তোমাকে দেখতে পাই নি, দেখার জন্যে পাগল হয়ে যাচ্ছি।তোমাকে দেখার জন্যে আমার মন যে বড্ড ছটফট করছে।বাস্তব দীর্ঘজীবী হোক!…তোমার সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের জয় হোক, ছলনাময়ী নারী,সমস্ত সৌন্দর্যের নির্যাস তুমি।কিন্তু এমন রূপ সৃষ্টি করে ঈশ্বর যদি হৃদয় না তৈরি করে থাকেন তাহলে এই সৃষ্টি অর্থহীন!…আলো! আলো!

 তেওদোরো ওপরে উঠে তার চোখের সামনে বাস্তবতার দরজা খুলে দিলেন; আনন্দের প্লাবনে ভেসে গেল মন।

নানারকম কথাবার্তার মধ্যে কেটে গেল একটা শান্ত দিন।রাত পর্যন্ত সে আর মনে করতে চাইল না তার জীবনের বহুদূরের ঘটনা, মুছে যাচ্ছে সেসব দিনের কথা যেমন করে দিগন্তের অন্ধকারে মিশে যায় শান্ত দিনের আলো।খুব পুরনো কোনো ঘটনা মনে করে মানুষ যেমন বলে তেমনভাবেই সে বলল:

-নেলাকে তোমার ভালো লাগে না?

ফ্লোরেন্তিনা তাকে বলে দিল, না,ভালো লাগে না।অন্য অনেক বিষয়ে কথা হল ওদের দুজনের।সে রাতে বাড়িতে হঠাৎ খুব হইচই শুনতে পেল পাবলো।তেওদোরো গোলফিন, ফ্লোরেন্তিনা এবং তার বাবার কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে মনে হল।তারপর সে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল, স্বপ্নে দেখল নানারকমের ঘটনা, যা কিছু দেখেছে এবং যা সে কল্পনা করেছে তার বিচিত্র মেলা।স্বপ্ন শুরুতে ছিল মিষ্টি, নম্র সুখের, পরে তা পরিণত হল উদবেগ আর উৎকন্ঠায় পূর্ণ বিভীষিকায়, সদ্য আলোকিত গুহার মতো তার মনের গভীরে লড়াই বেধে যায় সুন্দর আর অসুন্দরের…

এই দ্বন্দ্বে আবেগের বিভিন্ন স্তরে আলোড়ণ ওঠে, কিছু স্মৃতি চাপা পড়ে যায় আর কিছু কথা ওপরে উঠে আসে।পরের দিন গোলফিনের প্রতিশ্রুতিমতো পাবলো দাঁড়াবে এবং বাড়ির মধ্যে হাঁটতে পারবে।

ক্রমশ…

Tarun Kumar Ghatak
তরুণ কুমার ঘটক      
 যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ এবং‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।  

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.