মারিয়ানেলা (পর্ব ১৯)

বাংলা English
Benito Pérez Galdós
  বেনিতো পেরেস গালদোস (১৮৪৩—১৯২০)       

স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম।ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি।তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 'ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা','জাতীয় ঘটনাক্রম'। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা'' ইত্যাদি।  বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে।কর্ণেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।  গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সালে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশতি শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খন্ডের অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।  ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় 'দন্যা পেরফেক্তা'(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়াল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস।জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার) মতে 'তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।' লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।  ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ণ ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন। কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্তেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন।   
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

পোষ মানানো

দুজনে একসঙ্গে অল্পক্ষণ হাঁটলেন, কেউ কোনো কথা বলল না।তেওদোরো গোলফিন প্রাজ্ঞ, বিবেচক এবং বাকপটু অথচ নিজেকে নেলার মতোই অবুঝ এবং স্বল্পবাক ভাবতে লাগলেন।নেলা কোনো প্রতিরোধ না করে তাঁর সঙ্গেই যেতে থাকে, ডাক্তারও তার  সঙ্গে একইরকমভাবে মানিয়ে চলতে থাকেন যেন এক অনিচ্ছুক শিশুকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।এইভাবে কিছুক্ষণ চলার পর একটা বাঁকে দেখা গেল দৈত্যাকার পশুর হাড়ের মতো সাদা ভাঙ্গাচোরা বড়ো বড় পাথর দাঁড়িয়ে আছে।ডাক্তার বসলেন সেখানে, তাঁর সামনে দাঁড়াল নেলা, তাকে এসব বেজায় দুষ্টুমির কথা জিজ্ঞেস করবেন বলে দুহাতে ধরলেন এবং গম্ভীর স্বরে জিগ্যেস করলেনঃ

-ওখানে তুমি কী করছিলে?

-আ…আ…আমি…কোথায়?

-ওইখানে।আমি যা বলছি তুমি তা ভালোই বুঝতে পারছ।স্বীকারোক্তি(কনফেসন) করার সময় যাজককে কিংবা নিজের বাবাকে যেমন উত্তর দিতে হয় তেমন দাও।

-আমার বাবা নেই—নেলার জবাবে সামান্য বিদ্রোহের সুর শোনা গেল।

-তা ঠিক, কিন্তু মনে করো আমিই তোমার বাবা, এবার বলো। ওখানে তুমি কী করছিলে?

-ওখানে আমার মা আছে—রুক্ষ্মস্বরে নেলা উত্তর দেয়।

-তোমার মা মারা গেছেন। তুমি জান না যে, মারা যাবার পর মানুষ অন্য জগতে চলে যায়?

-মা ওখানেই আছে—স্থিরভাবে নেলা বলে, বিষণ্ণ চোখে জায়গাটা দেখায়।

-আর তুমি তাঁর সঙ্গে যেতে চাইছিলে, তাই না?তার মানে, নিজের জীবনটা শেষ করে দিতে চাইছিলে?

-হ্যাঁ সেন্যোর,ঠিক তাই।

-তুমি জান না যে, আত্মহত্যা করে তোমার মা বড়ো অপরাধ করেছিলেন আর তুমি তাঁকে অনুসরণ করে আরেক অপরাধ করতে চাইছিলে? এই শিক্ষাটা কেউ দেয়নি তোমায়?

-কেউ শিখিয়েছিল  কি না আমার মনে নেই।আমি যদি নিজেই নিজেকে হত্যা করতে চাই কে তা আটকাতে পারে?

-তুমি জীবনে কারও সাহায্য পাওনি বলে বুঝতে পারছ না যে, আমরা নিজেদের জীবন নিজেরা শেষ করে দিলে ঈশ্বর খুশি হন না!…ভাগ্যহীনা মেয়ে তুমি, সহজাত আবেগের বশে এসব ভাবছ, শিক্ষাদীক্ষা, ধর্মীয় চেতনা, স্নেহযত্ন,নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কিছুই তুমি পাওনি, তোমাকে বাঁচার পথ কেউ দেখায়নি।ঈশ্বর, পরলোক আর মৃত্যু সম্বন্ধে তোমার কতটুকু ধারণা আছে?… তুমি কি ভাবছ যে, ওই গুহার মধ্যে মা বেঁচে আছেন? তোমার কথা ভাবছেন আর ভালোবেসে চলেছেন?কিছু প্রানহীন অস্থিকে মা বলছ? তোমাকে কেউ বলেনি যে, একবার দেহ ছেড়ে গেলে আত্মা আর ফিরে আসে না?বুঝতে পার না যে, সমাধি যেমনই হোক না কেন, ধারণ করে থাকে শুধু ধুলো, কঙ্কাল আর দুঃখ?…নিজের ঈশ্বর সম্পর্কে কী ভাব তুমি?একজন নীতিনিষ্ঠ প্রভু আছেন ওই ওপরে, হাত দুটো আড়াআড়ি, সবকিছু দেখেন আর আমাদের জীবনের যত উদ্ভট খেলা সব সহ্য করেন, তাঁর কাছে আমরা সমর্পণ করি আত্মা, প্রেতাত্মা এবং অপশক্তি যা আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করি?তোমার বন্ধুটিতো বেশ বুদ্ধিমান, কখ্নও তোমাকে এসব কথা বলেনি?

-হ্যাঁ বলেছিল, সবই বলেছিল, কিন্তু কেমন করে বলতে হয় আমি জানি না।

-বলতে জান না বলে জীবনটা নিয়ে ভাবতে হবে না?বোকার মতো ওই গর্তের মধ্যে ঢুকে কী পাবার কথা ভাবছিলে?আরও ভালো কিছু পাবে ভাবছিলে?

-হ্যাঁ সেন্যোর।

-কীভাবে?

-এখন যা মনে হচ্ছে তখন তা ভাবিনি, আরও ভালো কিছু ভাবছিলাম আর মায়ের কাছে চলে যেতে চাইছিলাম।

-এখন দেখছি যতটা বোকা ভেবেছিলাম তুমি তার থেকে বেশি—হাসতে হাসতে বলেন গোলফিন —এখন আমার কাছে মন খুলে সব বলো।আমাকে কি খারাপ লোক মনে হচ্ছে?

-না সেন্যোর না,কাউকেই আমি খারাপ মানুষ ভাবি না,আপনাকেতো অন্য চোখে দেখি, অন্যরকম ভাবি, আপনি আমার বন্ধুকে চোখ দিয়েছেন।

-ভালো কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়, আমাকে ভালো মনে করলেও আমি তেমন খুশি নই, আমি চাই তুমি আমাকে বিশ্বাস করে সবকিছু খুলে বলো।তোমার মধ্যে অদ্ভূত কিছু ভাবনা আছে, অপরাধমূলক চিন্তা, আমাকে সব বলতে হবে,সব,দেখবে তোমার মন হালকা হবে, দেখবে আমি তোমার স্বীকারোক্তি নেবার যোগ্য কি না।।

নেলা হাসে কিন্তু তাতে বেশ যন্ত্রণা মিশে আছে। তারপর মাথা নীচু করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে।

-না, এভাবে বসলে হবে না।আমার মুখের সামনে বসো; এখানে এসো,তাকে পাশে বসিয়ে গোলফিন স্নেহের সু্রে বলেন: ‘আমার মনে হয় যে,তোমার গোপন কথাগুলো বলার মতো লোক পাওনি কোনোদিন, তাই না? কাউকে  পাওনিতো? ঠিক তাই, তুমি বড়ো একা, এ জগতে কেউ নেই তোমার…নেলা, এবার বলো কেন তুমি আত্মহত্যার কথা ভাবছ?

নেলা নিরুত্তর।

-কিছুদিন আগেও তোমার হাসিখুশি মুখ দেখেছি, আপাতভাবে তোমাকে সুখী মনে হয়েছে।হঠাৎ তোমার এ কি পাগলামো শুরু হল?

-মায়ের কাছে যেতে চাই আমি—একটু দ্বিধার পর নেলা বলে—আমার আর বাঁচার ইচ্ছে নেই।আমারতো কিচ্ছু করার নেই।আমি কীসের জন্যে বেঁচে থাকব?মরণ ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই আমার জন্যে।ঈশ্বর যদি মরতে না দেন আমি নিজের ইচ্ছেয় মরব।

-তোমার কিচ্ছু করার নেই, এই ভাবনা থেকেই এমন আত্মগ্লানি, বড়ো অসুখী মেয়ে তুমি!এমন ধারণা যে তোমার মধ্যে ঢুকিয়েছে সে অভিশপ্ত, এই গোঁয়ার্তুমি যারা প্রশ্রয় দেয় তারা পাপী।…অনেক কিছু থেকে তোমার মনে এমন আত্মধিক্কার  তৈরি হয়েছে, নিজেকে  অবাঞ্ছিত ভাবা, নিঃসঙ্গতা এবং অজ্ঞতা নিয়ে আজ তোমার এই অবস্থা।তোমার মনে হচ্ছে যে, তোমার দ্বারা কোনো কর্ম হবে না!ঈশ্বর জানেন, তুমি অন্য কারও হাতে থাকলে কী হতে পারতে!তুমি খুব স্পর্শকাতর, খুব অনুভূতিপ্রবণ, এই মনোভাব দুর্লভ,কিন্তু কি অঘটন! স্থূল হাতে হার্প দাও।কী হবে? বাজনা না বাজিয়ে ভেঙ্গে ফেলবে।তোমার শরীর বলিষ্ঠ নয়, তুমি পাথর এবং মাটি কাটার কাজ পারবে না, অনেক মানুষের গায়ে পশুর মতো শক্তি থাকে, তারা এসব কাজ করে,তাই দেখে কি বলা যায় যে,তোমার দ্বারা কিছু হবে না? হয়তো জন্তুর মতো কাজ করার জন্যেই আমরা জন্মেছি? তোমার বুদ্ধি,অনুভব এবং অন্য অনেক গুণ যা অন্যদের থাকে না তা দিয়ে কিচ্ছু করা যায় না? সঠিকভাবে যদি কেউ তোমায় চালনা করতে পারে তুমি অনেক কাজ করতে পারবে।

   এই কথাগুলো শুনে নেলা গভীরভাবে অভিভূত হয়ে পড়ে, অনুভব করতে পারে অন্তর্নিহিত অর্থ এবং তেওদোরো গোলফিনের মুখের দিকে নির্ণিমেষে চেয়ে থাকে। সেই দৃষ্টি কঠোর, অভিব্যক্তিময় এবং উজ্জ্বল।

-কিন্তু তোমার মধ্যে একটিও রহস্যময়তা নেই —কালো সিংহ বলেন—এখন তোমার দুঃখময় একাকীত্ব থেকে বেরিয়ে আসার অসামান্য সুযোগ এসেছে কিন্তু তুমি তা প্রত্যাখান করেছ।ঈশ্বরের দূত ফ্লোরেন্তিনা তোমাকে একাধারে বন্ধু এবং বোন হিসেবে পেতে চায়; এমন সততা এবং উদারতার উদাহরণ আমি পাইনি…আর তুমি কী করলে?…বনের পাখির মতো উড়ে পালালে…এটা কি অকৃতজ্ঞতা, না, অন্য কোনো অনুভূতি, আমরা বুঝতে পারি না।

-না, না, না,-কাতরভাবে বলে নেলা,আমি অকৃতজ্ঞ নই।সেন্যোরিতা ফ্লোরেন্তিনাকে আমি পুজো করি…আমার মনে হয়,সে আমাদের মতো রক্তমাংসের মানুষ নয়, আমি তার দিকে চোখ তুলে তাকাবার যোগ্য নই।

-ওরে মেয়ে, তা সত্যি হতে পারে কিন্তু তোমার আচরণে তার প্রকাশ ঘটেনি, মনে হয়েছে তুমি খুবই অকৃতজ্ঞ।

-না, আমি তা নই— কাঁদতে কাঁদতে নেলা বলে—আমি ভয় পেয়েছিলাম…হ্যাঁ খুব ভয় করছিল…আমার মনে হয়েছিল যে,অকৃতজ্ঞ  ভাববে আমাকে এবং এতে আমার এত দুঃখ হয়েছিল যে, আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলাম…আমি তো জংলী, পালিয়ে যাবার আগে তার কাছে ক্ষমা পর্যন্ত চাইনি, তাকে বুঝিয়ে বলার মতো বিদ্যেও আমার নেই…

-ওর সঙ্গে তোমার বোঝাপড়া আমি করিয়ে দেব…;তোমার কথা আমি তাকে বলব,তুমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাও না, তুমি যে অকৃতজ্ঞ নও,সব আমি তাকে বুঝিয়ে বলব।এখন মনের কথা খুলে বলো আমাকে, বলো কী ভাবছ, কেন তুমি এত হতাশায় ডুবে যাচ্ছ? নিজের ওপর তীব্র ঘৃণা হলে মানুষ নিজেকে হত্যা করার কথা ভাবে, এই ঘৃণা আসে যখন একাকিত্ব ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, যখন পরিত্যক্ত আর অবাঞ্ছিত মনে হয় নিজেকে।

-হ্যাঁ সেন্যোর, আমার মনোভাব এমনই হয়েছে।

-তুমি কি তাকে ঘৃণা কর?

নেলা নীরব হয়ে যায় সেই মুহূর্তে।তারপর হাত দুটো আড়াআড়ি করে জোর দিয়ে বলে:

-না সেন্যোর,একদমই না,তাকে আমার খুব ভালো লাগে।

-মনে মনে তাকে চেয়েছ নিশ্চয়ই।

-আমি ভাবি যে, জীবনে যা পাওয়া যায় না মৃত্যুর পর তা মানুষ পায়…তা যদি না হয় তাহলে কেন এতবার মৃত্যুর কথা মনে আসে? স্বপ্নের মধ্যে দেখি, যারা মারা গেছে তারা কত সুখী, কত তৃপ্ত।

-স্বপ্নে যা দেখ বিশ্বাস কর?

-হ্যাঁ সেন্যোর।জন্মের পর থেকে গাছ আর পাহাড় দেখতে আমি অভ্যস্ত, এখনও তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, ওদের মধ্যে কতকিছু দেখতে পাই…

-এ্যাঁ?…গাছ আর পাহাড়ের মুখ আছে?

-আছে সেন্যোর…আমার মনে হয় সব সুন্দর সৃষ্টি দেখতে পায় আর কথা বলে…এরা বলে:“আমাদের কাছে এসো,মরো আর বাঁচো, যন্ত্রণা নেই”।

-কি দুঃসহ কল্পনা! —বিড়বিড় করেন গোলফিন —মনের মধ্যে প্যাগান ধর্ম।

তারপর উচ্চকন্ঠে বলেন :

-জীবনকে যদি ভালোবাস তাহলে ফ্লোরেন্তিনা যা দিতে চায় তা নিচ্ছ না কেন?পুরনো কথাতেই ফিরে এলাম।

-কারণ…কারণ…কারণ…সেন্যোরিতা ফ্লোরেন্তিনা আমাকে যা দিতে চেয়েছে তার নাম মৃত্যু—দ্বিধাহীনভাবে বলে নেলা।

 -তার দানকে এত অবহেলা?অসুখী মানুষরা চায় ভবঘুরেদের অসহায় অবলম্বনহীন জীবন,সুশৃঙ্খল মানুষ চায় আত্মমর্যাদার জীবন।তুমি বন্য জীবনে অভ্যস্ত, প্রকৃতির সঙ্গে তোমার প্রত্যক্ষ যোগ আছে, পরিবারের ভালবাসার চেয়ে তোমার বেশি পছন্দ জঙ্গলের স্বাধীনতা।এই জীবনে তুমি কি সুখী?

-সুখী জীবন শুরু হতে যাচ্ছিল…

-তাহলে কখন তা শেষ হয়ে গেল?

দীর্ঘ নীরবতার পর নেলা উত্তর দিল: আপনি আসার পর।

-আমি!…আমি আবার কী অনিষ্ট ঘটালাম?

-আপনিই কিছু খারাপ করেননি; বরং বিশাল মঙ্গল ঘটিয়েছেন।

-তোমার সঙ্গীর দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছি আমি—নেলার মুখের দিকে তাকিয়ে খুঁটিয়ে তার অভিব্যক্তি লক্ষ করেন ডাক্তার—তার জন্যে তুমি ধন্যবাদ দেবে না আমাকে?

-অজস্র, অজস্র ধন্যবাদ জানাই আপনাকে—কান্নাভেজা চোখে নেলা তাকায় তাঁর দিকে।

কিশোরী-নারীর মনোভাব বোঝার জন্যে গোলফিন তার চোখের দিকে একভাবে চেয়ে থাকেন। তারপর বলেন :

-তোমার সঙ্গী আমাকে বলেছে যে, সে তোমাকে খুব ভালোবাসে।দৃষ্টি যখন ছিল না এবং যখন দৃষ্টি পেল, সবসময় বারেবারে তোমার খোঁজ নিয়েছে, শুধু তোমার কথাই জিজ্ঞেস করেছে।সবাই জানে যে, তার জগৎ জুড়ে আছে মাত্র একজন, সে তুমি, নেলাকে দেখতে না পেলে তার চোখের আলো কোনো কাজেই লাগবে না।দৃষ্টি ফিরে পাবার আনন্দ মাটি হয়ে যাবে যদি তোমাকে সে দেখতে না পায়।

-নেলাকে দেখার জন্যে!কিন্তু সে নেলাকে দেখতে পাবে না!…নেলা তাকে দেখা দেবে না-সে দৃঢ়ভাবে বলে।

-কেন? কীসের জন্যে?

-কারণ সে যে খুব কুৎসিত…অন্ধ অবস্থায় কানেলার মেয়েকে সে ভালোবাসতে পারে কিন্তু যখন দৃষ্টি ফিরে পায় সে দেখে সেন্যোরিতা ফ্লোরেন্তিনাকে, সে তারপর হতভাগ্য বামন মারিয়ানেলাকে ভালোবাসতে পারে না।

-কে বলেছে!…

–হয় না, তা হতে পারে না—অভাগিনী জোরের সঙ্গে বলে।

-ও তোমার মনগড়া কথা…প্রমাণ ছাড়া তুমি বলতে পার না যে, তোমাকে তার ভালো লাগে না।তোমাকে আমি ওই বাড়িতে নিয়ে যাব।

-আমি যেতে চাই না, যাব না আমি!—নেলা চিৎকার করে,এক লাফে উঠে পড়ে,দন তেওদোরোর সামনে দাঁড়ায়, এমন তড়িৎ গতি দেখে ডাক্তারতো অবাক, মেয়েটিরও কালো চোখে যেন আগুন ঝরছে, তার স্থির সিদ্ধান্তের সংকেত দেয় অমন আচরণ।

-শান্ত হও, এখানে এসো—আদর করে ডাকলেন তাকে—আমরা কথা বলব…সত্যি কথা বলতে কী,তুমি খুব সুন্দরী নও…কিন্তু শুধু বহিরঙ্গের রূপ দিয়ে কোনো যুবতীর বিচার হয় না।তোমার মধ্যে আছে প্রকৃত প্রেম, খুব আছে।

ডাক্তারের কথায় কান দেয় না নেলা, নিজের যুক্তিতে  অটল থেকে গম্ভীরভাবে একটি মাত্র বাক্য বলে:

-কুৎসিত কিছু থাকা উচিত নয়…কোনো বস্তু কুৎসিত হওয়া উচিত নয়।

-শোনো, একটা কথা শোনো, যারা রূপ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেনি তাদের সবাইকে বাদ দিলে এই পৃথিবীতো জনশূন্য হয়ে যাবে, এটা ভাবতে পারছ না?তুমি যা বলছ তা নতুন কিছু নয়।বহু শতাব্দী আগে যারা কল্পনারাজ্যে বাস করত তাদের এমন উদ্ভট ধারণা ছিল, তারা প্রকৃতির মধ্যেই থাকত আর তোমার মতো অজ্ঞতায় ডুবে থাকত,তোমার মতো ওরা নিজেদের বিযুক্ত ভাবত, তখন পৃথিবীতে এসে পৌঁছয়নি জ্ঞানের আলো… তোমার এই পাগলামো সারানো দরকার; বোঝার চেষ্টা করো যে,রূপের চেয়ে অনেক মহার্ঘ হচ্ছে গুণ, মনের সম্পদ সময় কিংবা চোখের দেখার ওপর নির্ভর করে না। নিজের মনের ভেতর ডুব দাও, সেই সম্পদের হদিশ পাবে।সৌন্দর্য নিয়ে যা ভাবছ তার চেয়েও মূল্যবান কিছু দেখতে পাবে।হাজারবার আয়নাতে চোখ রেখেও তা দেখতে পাবে না।সেই সম্পদের খোঁজ করো,তার পরিচর্যা করো, তার বিশাল ঐশ্বর্য দেখে ভয় পেয়ো না; মনের চঞ্চলতা দূর হয়ে যাবে, তোমার এক উত্তরণ ঘটবে। নিজেকে অসহায় ভাবছ, সেই প্রতিকূলতা কাটাতে পারবে সহজভাবে এবং তারপর যে রূপ আবিষ্কার করবে তা শুধু চোখের দেখার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না, নিজের সম্বন্ধে আস্থা আসবে, নিজেকে তখন অসুন্দর মনে হবে না, তোমার অন্য এক ভাব আসবে যা নিয়ে তোমার গর্ব এবং আনন্দ হবে।

এই সংবেদনশীল কথাগুলো হয় নেলা বুঝল না কিংবা গ্রহণ করল না।গোলফিনের পাশে দাঁড়িয়ে চোরা চাহনিতে লক্ষ করতে লাগল তাঁকে।উপদেশ শুনতে শুনতে ছোটো চোখগুলো তার বড়ো হয়, দেখে মনে হল যে তার ভাষা হচ্ছে:

         “এত জ্ঞান কোন কাজে লাগবে আমার, হে জ্ঞানী?”

-এখানেগোলফিন তাঁর নিজের কথাগুলো নিজেই উপভোগ করেন এবং মনস্তত্বের শিক্ষা হিসেবে বলেন:

-একটা মূল প্রশ্ন এসে পড়ে, তা হল…

নেলা ওটা অনুমান করে চোখে হাত চাপা দিল।

-এর মধ্যে আশ্চর্য হবার কিছু নেই; বরং তোমার যা হয়েছে তা খুব স্বাভাবিক।তোমার মনে ভাবাবেগ বেশি, তুমি কল্পনাপ্রবণ; তোমার সঙ্গী আর তুমি দুজনে একসঙ্গে প্রকৃতির মধ্যে মুক্ত এবং কাব্যময় জীবন কাটিয়েছ, তোমাদের সম্পর্ক নিষ্পাপ আন্তরিকতার।সে বুদ্ধিমান এবং মূর্তির মতো সুদর্শন…যারা চোখে দেখে তাদের কাছে অন্ধের রূপ বেশ ভালো লাগে।

তাছাড়াও তার হৃদয়ের ঔদার্য এবং মহত্ব আকর্ষণ করে, ভালোবাসতে জানে।অবাক হবার কিছু নেই যে,তোমাকে সে মুগ্ধ করেছে,তুমি এখনও কিশোরী, নারী হতে চলেছ, অথবা তুমি এক নারী যাকে কিশোরী মনে হয়।ওকে তুমি খুব ভালোবাস, পৃথিবীর সবকিছুর চাইতেও ওকে ভালোবাস, তাই না?

-হ্যাঁ সেন্যোর,হ্যাঁ—আবার কাঁদতে কাঁদতে বলে নেলা।

-ওকে ভালোবাসবে না, এমন ভাবনা সহ্য করতে পার না, তাই তো?

-না,না,সেন্যোর।

-তোমাকে সে ভালবাসার কথা বলেছে আর তুমি তা মেনে নিয়েছ, প্রেমের শপথ নিয়েছ।।

-ওঃ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেন্যোর।বলেছিল আমি হব তার সারাজীবনের সঙ্গিনী, আমি তা বিশ্বাস করেছিলাম…

-সেটা সত্যি হবে না কেন?

-বলেছিল যে, আমাকে ছাড়া ও বাঁচবে না আর চোখে দেখতে পেলেও আমাকে সারাজীবন ভালোবাসত।আমার খুব ভালো লাগত, আমার কুৎসিত মুখ, বামনের মতো চেহারা এবং হাস্যকর রূপ নিয়ে আমি মাথা ঘামাতাম না, কারণ সে তো আর আমাকে দেখতে পাচ্ছে না এবং অন্ধকার চোখে আমাকে সুন্দর ভাবত।কিন্তু পরে…

-পরে —করুণায় আর্দ্র হৃদয়ে অস্ফুট উচ্চারণ গোলফিনের—এখন আমি বুঝতে পারছি, সব দোষ আমার।

-দোষ না, দোষ না…আপনি একটা মহৎ কাজ করেছেন।আপনি খুব সৎ…আপনার জন্যেই সে চোখের আলো পেয়েছে…আমি মনে মনে বলি, এ এক অসম্ভব মঙ্গলময় কর্ম…কিন্তু এর পর আমাকে যেতে হবে…কারণ সে দেখবে সেনোরিতা ফ্লোরেন্তিনাকে আর আমার সঙ্গে তার তুলনা করবে…সেন্যোরিতা ফ্লোরেন্তিনা পরির মত, আর আমি!…তার সঙ্গে আমার তুলনা, ভাঙা আয়নার এক খণ্ডের সঙ্গে সূর্যের তুলনা…আমার দাম কী?কেন আমি জন্মেছিলাম? …ঈশ্বরের মতিভ্রম!আমাকে কুৎসিত একটা মুখ দিয়েছেন, একটা ছোট্ট  শরীর আর এক বিশাল হৃদয়,এত বড়ো অন্তর নিয়ে কী করব আমি? শুধু কষ্ট পাওয়া ছাড়া এর কোনো কাজ নেই।ওঃ! অন্তর ভালো না হলে আমি শুধু ঘৃণা করতাম,কিন্তু ঘৃণা করতে আমার ভালো লাগে না, কেমন করে ঘৃণা করতে হয় আমি জানি না, এটা কী জানবার আগে আমি আমার হৃদয়কে সমাধিস্থ করব যাতে আমার আর কষ্ট না হয়।

-ঈর্ষা তোমাকে যন্ত্রণা দেবে।নিজেকে অপমানিত ভেবে তুমি কষ্ট পাও।ওঃ,নেলা, তোমার নিঃসঙ্গতা বড়ো ভয়ানক।যা নেই তার অভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছ না, তোমার পরিবার বলে কিছু নেই, কাজও নেই এখন, অন্য কাজও তুমি জান না। আমাকে একটা কথা বলোতো: সেন্যোরিতা ফ্লোরেন্তিনার সাহায্য নিয়ে কী ভাবছ?

-ভয়, ভয় করছে!…লজ্জা!—চোখ বড়ো করে ভয়ে আর্তনাদ করে নেলা—ওদের সঙ্গে থাকা…সবসময় ওদের দেখা…ওরা বিয়ে করবে, আমার মন বলছে, ওরা বিয়ে করবে, আমি স্বপ্ন দেখেছি, ওরা বিয়ে করবেই!…

-কিন্তু ফ্লোরেন্তিনা খুবই ভালো মেয়ে, তোমাকে সে খুব ভালোবাসবে।

-আমিও ওকে খুব ভালোবাসি, কিন্তু‘আলদেয়াকোর্বা’তে নয়—উত্তেজিত হয়ে বলে নেলা, বিকারগ্রস্ত মানুষের মতো স্বর তার -আমার নিজের জিনিস সে কেড়ে নিতে এসেছে…সে ছিল আমার, একেবারেই আমার নিজস্ব,হ্যাঁ সেন্যোর…ফ্লোরেন্তিনা ‘কুমারী মায়ের’ মতো, তার কাছে প্রার্থনা করে বলব যে, আমার নিজের জিনিস যেন কেড়ে না নেয়…কিন্তু সে নেবে; কেড়ে নিয়েছে…এখন আমি কোথায় যাব?কী আমার পরিচয়? আমার কি কোনো দাম আছে?আমার সব হারিয়ে গেছে, সব, তাই আমি মায়ের কাছে চলে যেতে চাই।

কয়েক পা এগিয়ে যায় নেলা, কিন্তু হিংস্র জন্তুর মত থাবা বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলেন গোলফিন, কব্জিটা চেপে ধরে থাকেন।মেয়েটার নাড়ির গতি বেড়ে গেছে,তিনি বুঝতে পারেন।

-এখানে এসো —বললেন নেলাকে।এই মুহূর্ত থেকে তুমি চাও, না চাও,তোমাকে আমার ক্রীতদাসী করলাম।তুমি আমার, আমার আদেশ ছাড়া কিছুই করতে পারবে না।বেচারা! সূক্ষ্ম অনুভব, প্রাণবন্ত কল্পনা, সারল্য আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এক আশ্চর্য মেয়ে তুমি, সবার মঙ্গলের জন্যেই তোমার জন্ম হয়েছিল কিন্তু তুমি ডুবে আছ বন্য পরিবেশে, তুমি একা, বিচ্ছিন্ন, শিক্ষার অভাবে সাধারণ প্রাথমিক বোধবুদ্ধিও হয়নি!

সুস্থ বলে পরিচিত যে সমাজে আমরা বাস করি সে তোমার এত গুণের সদব্যবহার করবে না? ছেড়ে দেবে এমন এক মহার্ঘ সৃষ্টিকে? …এখানে এসো,আমার কাছ থেকে দূরে যাবার চেষ্টা কোরো না; তোমাকে আমি গ্রহণ করলাম,শিকার করলাম, এই আমার শেষ কথা, বনের মধ্যে তোমাকে ধরার ফাঁদ পেতেছি, তুমি হিংস্র পশু, আমি তোমার উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করব …এই অমূল্য হিরেটা ঠিকঠাক কাটতে পারি কিনা দেখতে হবে।আঃ! কতকিছু তুমি অবহেলা করেছ! তোমার মনের মধ্যে এক নতুন বিশ্ব আবিষ্কার করব, এখনও যা জান না এমন হাজারো বিস্ময় তোমার চোখের সামনে মেলে ধরব; তুমি অবশ্য এসব জেনে কিছু ধন্দে পড়ে যাবে, একটা আবছা ধারণা হবে।তোমার হতভাগ্য মনটা নিয়ে কিছুই ভাবিনি…কীভাবে যে বলি?সততার অদৃশ্য এক ধারা অন্তরালে বয়ে চলেছে, ওটাই সবচেয়ে মুল্যবান, সবকিছুর জন্মদাত্রী সেই মন, এমন এক সততা থেকে জন্ম নেয় আনন্দ, দ্যাখো,কি দুষ্প্রাপ্য সম্পদ এটা! নিজেদেরকে সবার থেকে ছোটো ভাবা! অন্যেরা আমাদের ওপরে আছে দেখে আনন্দ পাওয়া!আত্মবিসর্জন দেওয়ার কথা তুমি ভাব, তাই না?অন্যের জীবনের জন্যে আত্মত্যাগ করে আমরা সুখ পাই আর অন্যেরা যত বড়োই হোক না কেন আমরা ছোটো হয়ে থাকব? তুমি এটা শিখবে, সৌন্দর্যের পায়ে আত্মসমর্পণ করবে অসুন্দর, শান্ত হয়ে খুশি হয়ে অন্যের জয়যাত্রা দেখবে, তোমার মহৎ হৃদয়কে এইভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে শিখবে, তাকে সম্পূর্ণরূপে বশ্যতা মানতে হবে, যাতে কখনও ঈর্ষা কিংবা অপছন্দ ফিরে না  আসে, সবার প্রতি সমান ভালোবাসা থাকবে, যারা তোমার ক্ষতি করেছে তাদের ওপরে বসাতে শিখবে।এইভাবে যা হওয়া উচিত তাই তুমি হবে, এইতো তোমার স্বভাব, জন্ম থেকে এই শিক্ষাইতো পেয়েছ।হতভাগিনী! খ্রিস্টান সমাজে জন্মেছ অথচ খ্রিস্টান হতে তুমি পারনি; তোমার আত্মা বাস করছে সেই নিষ্কলুষ কাব্যময়  উদ্দাম প্রকৃতির মধ্যে, হ্যাঁ, এটাই ঠিক শব্দ, তুমি বুঝবে না তবু বলি…এ সেই অবস্থা যেখানে মানুষ বাস করত বটে তবে তাদের স্মৃতি বলে কিছু থাকত না।তোমার ইষ্ট দেবতার মতো এক শরীর পেয়েছ, তাকে চালনা করে কিছু  বোধ আর আবেগ। আঠারোটা শতাব্দী তোমার কাছে বৃথায় পার হয়ে গেছে, শুধু মনের উন্নতি করার জন্যেই এত বছর লেগে গেছে।আর এই স্বার্থপর সমাজ তোমাকে পরিত্যাগ করেছে,কী বলব একে? তোমাকে একটা অক্ষর না শিখিয়ে খনির নিঃসঙ্গতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, তার মধ্যে বেড়ে উঠেছ একা একা, তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়নি বুদ্ধিসঞ্জাত কোনো প্রগতির, আজকের দুনিয়াকে যে সত্যগুলো চালনা করে তাও তুমি জান না, তোমাকে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ কেউ দেয়নি,এমনকি অহঙ্কারী ধর্মের কুশিক্ষারও কোনো কিছুই তুমি জান না, কোনো গির্জাও তুমি দেখনি,তার বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ সম্বন্ধেও কিছু বলা হয়নি। কোনো প্রার্থনা-মন্ত্র আবৃত্তি করতে কিংবা বুঝতেও শেখনি, তাই বলছি জগতের কিছুই তুমি জান না, ঈশ্বর কিংবা আত্মা কিছুই বোঝো না…কিন্তু সবকিছু শিখবে, তুমি অন্য মানুষ হবে, এই নেলা থাকবে না, আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, বুদ্ধিমতী মেয়ে হবে, তুমি হবে এক কল্যাণময়ী নারী।

নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, গোলফিনের জোরালো বক্তৃতার এই অংশ নেলা বুঝতে পেরেছে,কারণ কার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলছিলেন তা মনে ছিল না বক্তার।কিন্তু ওই নিরক্ষর অসহায় মেয়ের বিশেষ ভালো লেগেছে কথাগুলো এবং মনে ধরেছে মধুর বাণী, সে এই বিষয়  শোনার যোগ্য পাত্রী।কোনো সন্দেহ নেই যে, এই অজ্ঞ মেয়ের মন আলোড়িত করেছে উচ্চমার্গীয় ভাবনা।দুঃখী নীরব  মেয়েটা দন তেওদোরোর কাঁধে ক্লান্ত মাথা রাখে।

-চলো তাহলে—হঠাৎ বললেন ডাক্তার।

 নেলার সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে ।গোলফিন লক্ষ করেন যে, তার কপালে ঘাম জমেছে, তার হাত ঠান্ডা, নাড়ির গতি দ্রুত বেড়ে যায়। কিন্তু শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও তিনি জোর দিয়ে আবার বলেন:

-চলো, চলো, এখানে ঠাণ্ডা লাগছে।

 নেলার হাত ধরলেন তিনি।এই জোরের কাছে নেলার প্রতিরোধ টেকে না, ওঁরা হাঁটতে থাকেন।কিছুক্ষণ পর মারিয়ানেলা হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে।

-ওঃ সেন্যোর -ভয়ে সে চিৎকার করেওঠে —আমাকে ছেড়ে দিন…

তার মুখ পাণ্ডুর, শরীর অস্থির লাগে, ভয়ে হিম হয়ে যায় মন আর সে ছটফট করতে থাকে। গোলফিন হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলেন, কিন্তু জ্ঞান হারিয়ে সে মাটিতে পড়ে যায়, তাকে টেনে তোলা যায় না।মৃত মানুষের মতো শরীর।

-কিছুদিন আগে —গোলফিন বলেন —এই জায়গাটাতেই তোমাকে আমি কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম, মনে আছে?সেদিন হাঁটার ক্ষমতা ছিল না তোমার।আজও তাই হবে।

ওকে তুলে নিলেন বাহুতে।বালিকা-নারীর গরম নিঃশ্বাসে মুখ পুড়ে যাচ্ছে।শিকড় রেখে চারাগাছ মাটি থেকে উপড়ে নিলে যেমন হয় তেমনই তাকে শুকনো এবং দুর্বল মনে হয়। ‘আলদেয়াকোর্বা’র বাড়িতে পৌঁছে তার শরীর তত ভারী মনে হয় না।নেলা তার গলা ধরে থাকে, হতাশ হাত দুখানা যেন ছেড়ে দেয়, কিন্তু কোনো শব্দ করে না।

গোলফিন প্রবেশ করলেন।কারও মুখে কথা নেই।এক পরিচারিকা তাকে নিতে আসে এবং দন তেওদোরোর নির্দেশে তাকে নিঃশব্দে নিয়ে যায় ফ্লোরেন্তিনার ঘরে।সে তখন একা, অল্প আলো, হাঁটুমুড়ে মেঝেতে বসে একটি চেয়ারে হাত রেখে ভক্তিভরে প্রার্থনা করছে।এমন অসময়ে ঘরে একজনকে প্রবেশ করতে দেখে সে ভয় পায় কিন্তু ভয়ের চেয়ে বিস্ময়ের ঘোর তাকে বেশি আচ্ছন্ন করে, গোলফিনের বলিষ্ঠ কাঁধের ওপর একটা শরীর।

গোলফিন যখন একটি সোফার ওপর নামিয়ে দেয় কাঁধের মেয়েকে ফ্লোরেন্তিনা বিস্ময়ে বিহ্বল এবং রুদ্ধবাক।

-নিয়ে এলাম এখানে…কী বুঝছ?আমি প্রজাপতি-শিকারি নই?

___

ক্রমশ…

Tarun Kumar Ghatak
 তরুণ কুমার ঘটক      
 যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ এবং‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।        

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *