মারিয়ানেলা (পর্ব – ১৭)

বাংলা English
Benito Perez Galdos
  বেনিতো পেরেস গালদোস (১৮৪৩—১৯২০)      স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম।ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি।তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 'ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা','জাতীয় ঘটনাক্রম'। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা'' ইত্যাদি।  বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে।কর্ণেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।  গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সালে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশতি শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খন্ডের অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।  ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় 'দন্যা পেরফেক্তা'(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়াল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস।জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার) মতে 'তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।' লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।  ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ণ ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন। কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্তেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন।  
Marianela - Benito Pérez Galdós
Cover Page of Marianela – Benito Pérez Galdós

পলায়ন আর বিষাদ

সারাসোকার্তেস-এ ছড়িয়ে পড়ল আনন্দ-সংবাদ, এমন অসামান্য ঘটনা সচরাচরতো ঘটে না। বয়লারে, কর্মশালায়, খনির ওয়াশিং মেশিনের ঘরে, ঢালু পাহাড়ি পথে।গভীর গহ্বরে, পাহাড়ের শিখরে, উন্মুক্ত প্রান্তরে এবং সেই অঞ্চলের সর্বত্র অন্য কোনো কথা নেই। মজার মজার মন্তব্য শোনা গেল:‘আলদেয়াকোর্বা’ গ্রামের মানুষ শুনেছিল যে, দন ফ্রান্সিস্কো পেনাগিলাস-এর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল, ওঁর ভাই দন মানুয়েল পেনাগিলাস এই সাফল্য উপলক্ষে খনির সব কর্মচারীকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবেন, মহাভোজ হবে আর শেষে দন তেওদোরো সমস্ত অন্ধদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারেন।

‘আলদেয়াকোর্বা’র বাড়িতে যাবার সাহস হয় না নেলার।একটা অজানা শক্তি তাকে সেখান থেকে সরিয়ে রাখে।খনির চারপাশে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায় সারাদিন, দূর থেকে দেখে পেনাগিলাসদের অতি পরিচিত বাড়িটা, তার মনে হয়, সেই বাড়ি নিশ্চয় বদলে গেছে। তার মনে জমে ওঠে অসাধারণ এক আনন্দের অনুভব, নিজের প্রতি এক লজ্জা; এক আদর্শ প্রেমের উন্মাদনা, অযৌক্তিক ভালোবাসার অসহনীয় জ্বালা। অসম্ভব একাকীত্বের মধ্যে মনের টানাপোড়েনের চূড়ান্ত অবস্থায় এক শান্তি আসে, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এটাই, প্রকৃতির রূপে বিভোর হয়ে যায়,ঈশ্বরের দিকে ছুটে যায় সব ভাবনাচিন্তা।অন্য মানুষেরা যখন গির্জার চোখধাঁধাঁনো বেদি দেখে ভক্তিতে গদগদ হয়, খ্রিস্টীয় ধর্মের বাণী শুনে মোহিত হয় এবং অতীন্দ্রিয় ভাবের জগতে মগ্ন হয়ে পড়ে তখন আকাশের মেঘ আর মাটির ফুল নেলার হৃদয় মথিত করে, মাঠের নির্জনতার মধ্যে সে ভাবে আর মনে মনে আওড়ায় হাজারো বিষয়, বুঝতে পারে না যে, এগুলোই তার প্রার্থনা।‘আলদেয়াকোর্বা’র দিকে চেয়ে সে বলে:

-আর ওদিকে ফিরব না…।আমার সব শেষ…এখন কোন কাজে লাগব আমি?

কঠোরতার মধ্যে সে অবশ্যই লক্ষ্যকরে যে, তার মনের এমন চরম সংঘাতের মধ্যেও অন্যের প্রতি ঘৃণা আসছে না। ঠিক বিপরীতভাবে তার মনে জন্ম নিচ্ছে সকলের প্রতি ভালোবাসা, শত্রু-মিত্র সকলের প্রতি সমান দৃষ্টি; খ্রিস্টান ধর্মের কঠোর অনুশাসনের বাইরে এক অলৌকিক হাতের স্পর্শে তুচ্ছাতিতুচ্ছ গাছে ফুল ফুটে চলেছে, ঈর্ষা এবং প্রত্যাখানের মধ্যে নেলা লক্ষ্যকরে যে, আশ্চর্যজনকভাবে জন্ম নিচ্ছে প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা।শুধু বদলাচ্ছে না সেই ভাবাবেগ যাকে আগে আমরা বলেছি, নিজের প্রতি লজ্জা।আরেক আবেগ সে ভুলে যেতে পারছে না, ‘আলদেয়াকোর্বা’তে আগে যা ঘটেছে।ভদ্র, শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে এই বিশাল বিশেষ অনুভবকে বলা হয় বিশুদ্ধ প্রেম, এর উৎস আত্মসম্মানবোধে, ভদ্র শিক্ষিত সমাজে এর গুরুত্ব খুবই বেশি।কারণ অনেক কাজের মূলে থাকে এই বোধ। মারিয়ানেলার কন্ঠস্বরের দাম থাকলে সে হয়তো বলত:

-যে নির্দয় অবজ্ঞা এবং অবহেলা আমার জীবনে আসছে তা সহ্য করতে দেবে না আমার আত্মসম্মানবোধ।কারণ ঈশ্বরের ইচ্ছে, এই অপমান আমাকে সইতে হবে, কিন্তু তিনি চান না যে,আমি নিজের স্বভাব থেকে বিচ্যুত হই।ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমার অবলম্বন প্রাকৃতিক নিয়ম কিন্তু তার ওপর কিছু করার সাহস আমার নেই।

কিন্তু এমন কথা সে বলতে পারে না, তাই তার কঠোর মনোভাব ব্যক্ত হয় এইভাবে:

-না, আমি আর ফিরে যাব না ‘আলদেয়াকোর্বা’তে…আমার এ মুখ আর দেখাতে চাই না… সেলিপিনের সঙ্গে পালিয়ে যাব কিংবা চলে যাব মায়ের সঙ্গে।এখানে আমার কিচ্ছু করার নেই।

কিন্তু এই কথা বলার সময় সে ভাবে যে, ‘কুমারী মা’ তার জন্যে যে সাহায্য পাঠালেন তা সে গ্রহণ করতে পারছে না।দুঃসময়ের অন্ধকারে তিনি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সহৃদয় হাত কিন্তু সে তা প্রত্যাখান করবে।

সান্ত্বনা পাচ্ছে না সে, তবু স্মরণ করে ‘কুমারী মা’কে।স্বপ্নের মধ্যে যাঁকে দেখে আনন্দে মন ভরে উঠেছিল তাঁকে আজ পরিত্যাগ করতে হচ্ছে!…কে যেন আদর করে তার নাম ধরে ডাকে আর তার কাছে পায় বোনের  ভালোবাসা, পায় সুন্দর বাসস্থান, মর্যাদার সম্পর্ক, স্বীকৃতি, মঙ্গল আর সে কি না এত সুখের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না, ওই ডাকে আছে আশা, আছে কৃতজ্ঞতা!…ঈশ্বরের সহায়তার হাত তাকে অপমানজনক অন্ধকার জীবন থেকে উদ্ধার করতে চায়, গৃহপালিত পশুর জীবন থেকে অসহায় মেয়েটাকে দিতে চায় সম্মানজনক ভদ্র মানুষের জীবন আর সেই স্বর্গীয় হাতখানা আজ সে দূরে ঠেলে দিচ্ছে!…

“আঃ! —বুকের ওপর থাবার মতআঙুলগুলো চেপে ধরে আর চিৎকার করে—না, না,পারি না, আমি পারব না…‘আলদেয়াকোর্বা’র পথ আমি কিছুতেই মাড়াতে পারব না, কোনো শর্তেই ওখানে আর যাব না।আমার আত্মার ‘কুমারী মা’, রক্ষা করো আমাকে!…মা, আমার, কাছে এসো…।”

রাতে বাড়ি যায় নেলা।পথে সেলিপিনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল,তার হাতে একটা ছোটো লাঠির মাথায় আটকানো টুপি।

-আরে নেলি—বলে বালক

-দ্যাখতো, দন তেওদোরো এইরকম দেখতে না?ইনোহালেস-এর পুকুরটার পাশ দিয়ে যাবার সময় জলের মধ্যে আমার ছায়া দেখলাম।ঈশ্বর ভরসা!আমি অবাক হয়ে দেখলাম যে, আমাকে ঠিক দন তেওদোরো গোলফিনের মতো দেখাচ্ছে…।

এই সপ্তাহের যেকোনো দিন আমরা ডাক্তার হয়ে যাব, প্রচুর টাকা হবে আমাদের…আমি যা চাইছিলাম তা পেয়ে গেছি।তুই দেখবি সেন্যোর সেলিপিনকে দেখে আর কেউ হাসাহাসি করবে না।

আরও তিনদিন নেলা পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগল, খনির চারদিকে ঘুরে বেড়ায়, নদীর এবড়োখেবড়ো তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় সালদেওরো বনের মধ্যে…

সেটা এক বিচ্ছিন্ন নির্জন স্থান।শুধু রাতে এসে ঢুকে পড়ে ঝুড়ির মধ্যে, ঘুম হয় না তার।এক রাতে ভয়ে ভয়ে সে তার বন্ধুকে বলে:

-কখনরে সেলিপিন?

-সেলিপিন অভিজ্ঞ অভিযাত্রীর মতো গম্ভীর হয়ে বলে:

-কাল।

দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দুজন অভিযাত্রী উঠে পড়ল, সবাই যে যার কাজে লেগে পড়ল।সেলিপিন নিজের কাজ করে,সেন্যানা নেলার হাতে একটা চিরকুট-বার্তা পাঠালেন এনজিনিয়ারের বাড়ির পরিচারিকার কাছে। ফিরে এসে নেলা দেখে যে,তার জন্যে অপেক্ষা করছে ফ্লোরেন্তিনা।তাকে দেখে নেলা অবাক হয়, ভয় করে তার, কারণ সহজাত বোধ থেকে কিংবা হৃদয়ের কোনো গোপন ডাকে সে অনুমান করতে পারে, এমন সময় ওই মেয়ের এখানে আসার উদ্দেশ্য কী!

-নেলা, বোন আমার—খুব নরম আদুরে স্বরে বলে ফ্লোরেন্তিনা:

-এ কেমন ব্যবহার তোমার?…একদিনও ওখানে গেলে না কেন?…শোনো, পাবলো তোমাকে দেখতে চাইছে…তুমি জানো না এখন সে বলতে পারছে, “ওটা দেখব, সেটা দেখব, ওকে দেখতে ইচ্ছে করছে।” তুমি  শোনোনি যে,আমার তুতো দাদা আর অন্ধ হয়ে নেই?

-জানি, শুনেছি—নেলা তার হাত ধরে বলে।বলতে বলতে সেই হাতে অনেকবার চুমু খায়।

-চলো, এখনই চলো।শুধু নেলা,নেলা করছে আর তেমন কিছু বলছে না।আজ যাওয়া ভালো কেননা দন তেওদোরো ব্যান্ডেজ খুলবেন…আজ হবে চতুর্থবার…প্রথম যেদিন ব্যান্ডেজ খুললেন, ওঃ! সে কি দিন!যখন দেখলাম যে, তুতো দাদা চোখের আলো পেয়েছে তখন আমরা আনন্দে যেন পাগল হয়ে গেছি।প্রথম কার মুখ দেখল জানো? আমার!…আমার মুখ দেখল।

মারিয়ানেলা ‘কুমারী মা’-এর হাতখানা সরিয়ে দিল।

-আমার পবিত্র প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেলে?—বলে ফ্লোরেন্তিনা—তুমি ভাবলে আমি ঠাট্টা করেছি?হায়!‘কুমারী মা’ আমাদের জন্যে এতকিছু করেছেন, তার তুলনায় এতো অতি সামান্য…আমার ইচ্ছে যে, এখন এই জগতে সব দুঃখ দূর হয়ে যাক, আমার আনন্দ ভাগ করে নিতে চেয়েছিলাম, সর্বত্র ছড়িয়ে দেব আমার সুখ, চাষিরা ফসল বোনার সময় যেমন বীজ ছড়িয়ে দেয় জমিতে; সমস্ত দুঃখী মানুষের ঘরে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করে; “তোমাদের দুর্দশার অবসান হয়েছে; আমি সবার দুঃখমোচনের পথের সন্ধান এনেছি”।এতো আমার পক্ষে সম্ভব নয়,একমাত্র ঈশ্বরই তা করতে পারেন।আমার ইচ্ছে থাকলেও সেই ক্ষমতা নেই, তবে যতটুকু পারি তাই করি…নেলা, এখানেই আমার যা বলার তা শেষ হয়ে গেছে।এখন তুমি এই খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে এসো, তোমার নিঃসঙ্গ ক্লিষ্ট জীবনের সঙ্গে যে জিনিসপত্র জড়িয়ে আছে তাদের বিদায় জানাও।ওই যন্ত্রণার প্রতিও মমতা থেকে যায়।

মারিয়ানেলা কোনো বস্তুকে বিদায় জানাল না, আর সেইসময় বাড়িতে তার দরদি মানুষেরা কেউ না থাকায় তাদের জন্যে তাকে আর অপেক্ষা করতে হল না।ফ্লোরেন্তিনা খ্রিস্টান ধর্মের মহৎ ভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়ে সহানুভূতি আর ভালোবাসা দিয়ে যাকে আপন করে নিয়েছে তার হাত ধরে বেরিয়ে আসে;নেলা তাকে বাধা দেবার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে; সে বেরিয়ে আসে।তার মনে হল যে, একটা অপার্থিব শক্তি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে, দেবদূতের হাতে ধরা আত্মারা এইভাবে স্বর্গে চলে যায়, সে চলে আসে অবধারিত অমোঘ টানে।সেদিন ওরা হাঁটতে থাকে ‘ইনোহালেস’-এর পথে, এখানেই ফ্লোরেন্তিনার সঙ্গে হতভাগ্য অনাথ মেয়েটার প্রথম দেখা হয়েছিল।এই জায়গায় এক অপ্রশস্ত গলির মধ্যে দিয়ে যাবার সময় ফ্লোরেন্তিনা তার বান্ধবীকে বলে:

-বাড়িতে যাওনি কেন?আমার কাকা বললেন যে, তোমার স্বভাবে স্বাভাবিক সৌজন্য আর বিনয় আছে কিন্তু তার পরিশীলন ঘটেনি।ঈশ্বরের করুণাবশত যা পেয়েছ সেটা নিতে বাধা দিচ্ছে তোমার বিনয়? আমার কাকারতাই মনে হয়েছে…বেচারা কাকা সেদিন যে কীভাবে কাটিয়েছেন ঈশ্বর জানেন…; বলছিলেন, মরে গেলেও তাঁর আর কিছু যায় আসে না…এত কান্নার পরেও আমার চোখদুটো অটুট আছে,দেখতে পাচ্ছিস?ব্যাপারটা হল কী জানো?কাল সারারাত ধরে আমার কাকা, বাবা আর আমি একটুও ঘুমোইনি;পরিবারের নানারকম পরিকল্পনা নিয়ে হাওয়ার দুর্গ বানাচ্ছিলাম, হ্যাঁ, সারারাত ধরে…তুমি চুপ করে আছো যে!…কথা বলছ না কেন?…আমার মত তোমার আনন্দ হচ্ছে না?

নেলা তাকাল সেই মেয়ের দিকে,আলতো করে তার মিষ্টি হেসে হাতটা সরিয়ে দিল,এই হাতখানাই ধরেছিল তাকে।

-বলো…কীবলবে?নেলা,তোমার চোখে দেখছি অন্য এক চোখ।

সত্যিই তাই; অনাথ, অসহায় মেয়ের চোখ ঘুরছে এক থেকে অনেক ভাবনায়, ‘কুমারী মা’র দিকে তাকিয়ে যেন ভয় পেয়ে যায় সে।

-তোমার হাত কাঁপছে কেন?—ফ্লোরেন্তিনা জিজ্ঞেস করে, শরীর খারাপ লাগছে? মুখটা ফ্যাকাসে, দাঁতে দাঁত চেপে আছো।শরীর খারাপ হলে আমাকে বলো,আমি তো আছি, আমি সারিয়ে তুলব, আজ থেকে তোমার পাশে নিজের লোক আছে, সে তোমাকে দেখবে,তোমাকে সে ভালোবাসে…আমি একা নই, পাবলো তোমার প্রতি খুব দরদি…আমাকে বলেছে।আমরা দুজন খুব ভালোবাসব তোমাকে, সে আর আমি আলাদা নই, দুজনের এক শরীর…তোমাকে সে দেখতে চায়…যে আগে কখনও কিছু দেখেনি, ভেবে দ্যাখো,সে তোমাকে দেখতে চাইছে…কিন্তু তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না…ওর বোধশক্তি আর কল্পনা এত বেশি, অন্ধের যে শক্তি থাকার কথা নয় তাও আছে তার, সুন্দর আর অসুন্দরের মধ্যে তফাত সে প্রথম থেকে বুঝতে পারত।এক খণ্ড মোম হাতে নিলে তার বেশ ভালো লাগত আর এক টুকরো কয়লা নিলে প্রচন্ড খেপে যেত।আকাশের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করত আর বিরক্তিকর মনে হত ব্যাং।যা কিছু সুন্দর সবই তাকে এমন উদ্দীপিত করত যেন মনে হত পাগলামো করছে, কুৎসিত যা কিছু তাতে তার আতঙ্ক, সেসব কথা শুনলে ভয়ে কাঁপতে থাকে, আমরা বেশি ভয় পেয়ে যেমন করি সেইরকম।আমার সম্বন্ধে ওর তেমন খারাপ ধারণা ছিল না কারণ আমাকে দেখামাত্রই বলে উঠল:

-এইতো আমার তুতো বোন, কি রূপসী তুমি!ঈশ্বর দয়া করেছেন,চোখে দেখে এখন বুঝতে পারছি!

নেলা আলতোভাবে সরিয়ে দিল ফ্লোরেন্তিনার হাত এবং তারপর তাকে ঠেলে দিয়ে নিজে মাটিতে পড়ে গেল, দেখে মনে হয় যেন হঠাৎ তার প্রাণ বেরিয়ে গেল।তার দিকে ঝুঁকে ফ্লোরেন্তিনা স্নেহের সুরে বললেন:

-কী হল তোমার?…অমন করে আমার দিকে তাকাচ্ছ কেন?

অনাথ মেয়ে ভয়ঙ্কর চোখে নিনির্মেষ চেয়ে রইল ‘কুমারী মায়ের’ দিকে, কিন্তু সেই দৃষ্টিতে দীপ্তি নেই,নেই বিদ্বেষ কিন্তু তাতে আছে বেদনার্ত অনুরোধ, যেন এক মুমূর্ষু ব্যক্তি সাক্ষাৎ ঈশ্বর ভেবে তার মূর্তির সামনে করুণা ভিক্ষে করছে।

-দেবী—নেলার অস্পষ্ট উচ্চারণ—তোমার বিরুদ্ধে আমার কোনো বিদ্বেষ নেই…তোমাকে আমি ঘৃণা করি না…ঠিক তার উল্টো,তোমাকে খুব ভালোবাসি, তোমাকে পুজো করি…

এই কথা বলতে বলতে ফ্লোরেন্তিনার পোশাকের একটা দিক ধরে শুকনো ঠোঁটে পাগলের মতো চুম্বন করতে লাগল।

-কে বলবে তুমি আমাকে পছন্দ করনা?—ফ্লোরেন্তিনা বিচলিত হয়ে বলে—আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো কিন্তু আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ…ওঠো, উঠে দাঁড়াও।

-তোমাকে খুব ভালোবাসি, পুজো করি—ওর পায়ে চুমু দিতে দিতে আবার বলে মারিয়ানেলা-, কিন্তু আমি পারব না, পারব না…

-কী পারবে না?ঈশ্বরের দোহাই, উঠে দাঁড়াও।

ফ্লোরেন্তিনা ওকে তোলার জন্যে হাত বাড়িয়ে দেয় কিন্তু তার সাহায্য ছাড়াই লাফিয়ে উঠে পড়ে নেলা এবং খুব দ্রুত অনেকটা দূরে চলে যায়, সেখান থেকে কাঁদতে  কাঁদতে বলে;

-আমি পারব না,পারব না!

-কী…?ঈশ্বর এবং ‘কুমারী মা’ আছেন!…কী হয়েছে তোমার?

-আমি ওখানে যেতে পারব না—সে ‘আলদেয়াকোর্বা’র বাড়ির দিকে নির্দেশ করে, দূরে গাছে ঘেরা ছাদ দেখা যাচ্ছে।

-কেন?

-‘কুমারী মা’ জানেন —কিছুটা আত্মস্থ হয়ে নেলা বলে-,‘কুমারী মা’ তোমাকে আশীর্বাদ করুন!

আঙুল দিয়ে ক্রশ চিহ্ন এঁকে তা চুম্বন করে নেলা শপথ নিল।

ফ্লোরেন্তিনা ওর দিকে এগিয়ে যায়, মারিয়ানেলা বুঝতে পারে এই এগিয়ে আসার মধ্যে ভালোবাসা আছে, সে ছুটে তার দিকে গিয়ে বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে;

-ঈশ্বরের নামে…আমাকে একবার আলিঙ্গন করো।

ফ্লোরেন্তিনা আদর করে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।নেলা নিজেকে হঠাৎ ছাড়িয়ে নিয়ে কাছের উঁচু জায়গায় একটা ঝোপের মধ্যে চলে যায়।ঘাসে ঘেরা ওই ঝোপের কাছে যাওয়া খুব সহজ নয়।

-নেলা, বোন আমার —ফ্লোরেন্তিনা উদ্বেগে কাতর হয়ে চিৎকার করে।

-আদিওস(বিদায়), আমার প্রাণের বন্ধু, তোমাকে বিদায় জানাই!—শেষবারের মতো তার দিকে চেয়ে নেলা বলল।

ঘন বনের মধ্যে সে অদৃশ্য হয়ে যায়।ফ্লোরেন্তিনা শিকারির মতো ঘাসের শব্দ শোনার চেষ্টা করে, শিকার পালিয়ে গেলে যেমন হয় তাই হল এই মেয়ের; তারপর সব নীরব,প্রকৃতির বোবা স্বগতোক্তি ছাড়া কিছুই শোনা গেল না,আমাদের ভাবনাগুলো যেন সরসর শব্দে ঘুরে বেড়ায় বনের মধ্যে।ফ্লোরেন্তিনার ইন্দ্রিয়গুলো অসাড় হয়ে যায় অবশ লাগে শরীর, দুঃখে মন ভরে ওঠে যেন একটা প্রিয় স্বপ্ন চলে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরে।এই ঘটনা নিয়ে কী বলবে ভেবে পায় না সে,তার যে অগাধ মহত্ব অনেকসময় বিচারবুদ্ধি অতিক্রম করে যায় তা দিয়ে কোনো ব্যাখ্যা হয় না।

অনেকটা সময় একই জায়গায় তাকে বসে থাকতে দেখা যায়, মাথা ঝুঁকে আছে, গালে আগুন জ্বলছে,স্বর্গীয় চোখদুটো জলে ভিজে যাচ্ছে, হঠাৎ দেখা যায় তেওদোরো গোলফিনকে, ধীরে ধীরে হেঁটে আসছেন বাড়ি থেকে।মেয়েটিকে একা দেখে ডাক্তার খুব অবাক হন।যন্ত্রণা এবং হতাশা তার রূপ খর্ব করার তো দূরের কথা,তাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে।

-কী হয়েছে তোমার? এখানে একা বসে আছ!—ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন।

-ভয়ঙ্কর একটা কাণ্ড ঘটে গেছে সেন্যোর দন তেওদোরো—ফ্লোরেন্তিনা চোখ মুছতে মুছতে বলল—আমি ভাবছি, কেবলই ভেবে যাচ্ছি পৃথিবীতে কত খারাপ জিনিস আছে।

-কোন কোন জিনিস খারাপ বলছ সেন্যোরিতা?…কোথায় দেখলে?

-বিকৃত জিনিস; কিন্তু সবচেয়ে বিকৃত হচ্ছে একটা জিনিস।

-কোনটা?

-অকৃতজ্ঞতা, সেন্যোর গোলফিন, কাছের ঝোপঝাড়ের ওপারে তাকিয়ে বলে:

-ওইদিক দিয়ে পালালো!উঁচু জায়গায় উঠে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে চেষ্টা করে সে।

-না, কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

-আমিওতো দেখতে পাচ্ছি না—হাসতে হাসতে বলেন ডাক্তার —সেন্যোর দন মানুয়েল আমাকে বলেছেন যে, তুমি নাকি প্রজাপতি ধরতে খুব ভালোবাসো, তাই এই নিরালায় আসলেও ধরা দেয় না,ওরা তাই তোমার কাছে অকৃতজ্ঞ।

-তা নয়…‘আলদেয়াকোর্বা’য় এলে আপনাকে সব বলব।

-এখন যাব না, ওখান থেকেইতো আসছি, কিন্তু তোমার কথা শোনার জন্যে আনন্দের সঙ্গে আবার যাব।‘আলদেয়াকোর্বা’ গিয়ে সব শুনব।যাই হোকনা কেন আমাকে শুনতেই হবে।

ক্রমশ…

Tarun Kumar Ghatak
তরুণ কুমার ঘটক      
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ এবং‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।       

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.