মারিয়ানেলা (পর্ব ১৪)

বাংলা English
Benito Pérez Galdós
Benito Pérez Galdós
বেনিতো পেরেস গালদোস (১৮৪৩—১৯২০)স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি। তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা’, ‘জাতীয় ঘটনাক্রম’। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা' ইত্যাদি।বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে। কর্নেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সাল থেকে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খণ্ডে অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন্যা পেরফেক্তা’(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়্যাল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার)মতে‘তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।’ লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ন ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন।  কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন। 
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

নেলার কাছে কেমন করে এলেন কুমারী মা ?

স্বপ্নের ঘোরে আচ্ছন্ন হলে আমরা তার কাছে আত্মসমর্পণ করি, তখন চিন্তাস্রোত এলোমেলো হয়ে যায় আর ঘুম ভাঙার পর হঠাৎই অন্য কিছু ভাবনার প্রতীক্ষায় থাকি। মারিয়ানেলারও তাই হয়েছে, অদ্ভুত ভাবনা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল;‘কুমারী মা’,অন্ধ প্রেমিক এবং নিজের কুৎসিত রূপ, হঠাৎ সুন্দরী হয়ে ওঠার প্রত্যাশা ইত্যাদি জুড়েছিল স্বপ্নের ভেতর; ঘুম ভেঙে গেল সেন্যানার চিৎকারে, ঝুড়ির ভেতর থেকে তড়াক করে বেরিয়ে এল সে। চোখ খোলার পর অভ্যেসমতো ‘কুমারী মা’-এর প্রার্থনা করে নেলা কিন্তু সেদিন তা হল না, মামুলি প্রার্থনার মধ্যে তার নিজের কিছু আবিষ্কার যুক্ত হল যা লিখে রাখলে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হত। নানা রকম কথার মধ্যে নেলা বলে:“মা, গতকাল রাতে তুমি আমার স্বপ্নে এসেছিলে, বলেছিলে আজ আমাকে সান্ত্বনা দেবে। এখন জেগে উঠেছি কিন্তু মনে হচ্ছে এখন তোমাকে দেখতে পাচ্ছি আর আমার চোখের সামনে তোমার মুখ, সবকিছুর চেয়ে সুন্দর সে মুখ, পৃথিবীতে এমন রূপ অন্য কিছুর মধ্যে নেই।”

 এই কথা বলার পর উদভ্রান্ত চোখে চারপাশে তাকায় নেলা…নিজের সম্পর্কে সে কেমন এক আবছা ধারণা করে নেয়, ভাবে:‘আমার কিছু হয়েছে।’

 -নেলা, কীরে, কী হয়েছে তোর?—একটা জায়গায় নেলার দৃষ্টি অস্বাভাবিকভাবে নিবদ্ধ দেখে মালকিন সেন্যানা বলে-‘ঘোলাটে চোখে অমন করে কী দেখছিস? স্বপ্ন দেখছিস নাকি?’নেলা উত্তর দেয় না কারণ তখনও সে নিজের সঙ্গেই কথা বলে চলেছে : “…আমার এ কী?কী হল আমার? …খারাপ কিছু তো নয়, কারণ আমার মনের মধ্যে যে এসেছে তার মুখতো কুৎসিত নয়,কদর্য, ভয়ঙ্কর কালো শয়তানতো নয়, সেতো স্বর্গীয় এক সুন্দর মুখ। একটু মিষ্টি হাসি আর এমন তার দৃষ্টি কিংবা আমি এক বোকা মেয়ে অথবা ‘কুমারী মা’ স্বয়ং আমার কাছে এসেছিলেন। দেবী, আমার মা, তাহলে সত্যিসত্যি তুমি আজ আমাকে সান্ত্বনা দেবে?…কীভাবে দেবে সান্ত্বনা?কাল রাতে আমি তোমার কাছে কী চেয়েছিলাম?”

 -অরে!…অ্যাই ছুঁড়ি! —সেন্যানার মুখ ঝামটা এমন বিশ্রী চিৎকার যা সচরাচর মানুষের মুখ থেকে শোনা যায় না। ফেতি কুত্তির মতো মুখটা এবার ধো। যা।

 নেলা দৌড়য়। হঠাৎ কোনো আশায় তার মন যেন উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। কাঁপা কাঁপা জলে নিজের মুখটা দেখামাত্রই সে দমে যায়।

 “কিছুই না…অস্ফুট উচ্চারণ -সেই একই মুখ, কুদর্শন। অপরিণত নারীশরীরে বয়স্ক নারীর মন আর বয়স। ”

 মুখ হাত ধোয়ার পর আবার সেই আগের মতো অদ্ভুত অনুভব তাকে আবিষ্ট করে, আনন্দমিশ্রিত উদ্বেগে ভরে যায় মন। এমন অভিজ্ঞতা তার কদাচ ঘটেছে, তবু মারিয়ানেলা এই অনুভবগুলোকে সাজায় পূর্বাভাসের ক্রম অনুসারে।

 “পাবলো এবং আমি -সে ভাবে—আমরা দুজন পূর্বাভাস নিয়ে কত কথা বলেছি, সুসংবাদ কিংবা দুঃসংবাদ আসার আগে মানুষ বুঝতে পারে। পাবলো আমাকে এও বলেছিল যে, ভূমিকম্পের আগেও একটা বিশেষ ভাবনা এসে পড়ে,মানুষ কিছুর সংকেত পায় …পশুপাখির মধ্যেও এক বিশেষ বোধ কাজ করে…তাহলে কি এবার এখানে ভূমিকম্প হবে?”

 হাঁটু মুড়ে মেঝেতে সে বসে পড়ে এবং মাটি কাঁপছে কি না বোঝার চেষ্টা করে।

 “জানি না আমি…কিন্তু কিছু ঘটতে চলেছে। ভালো কিছু হলে আমিতো সন্দেহ করতে পারি না…‘কুমারী মা’কাল রাতে বলেছেন যে, আজ আমাকে সান্ত্বনা দেবেন…। সেটা কী? …‘মা’ কি আমার কাছাকাছি নেমে আসবে? তাকে দেখছি না,কিন্তু  বুঝতে পারছি, সে পেছনে আছে, সামনে আছে।”

 সে খনির বিশাল ওয়াশিং মেশিনের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, ওই ঢালু জমির দিকে, ভয়ার্ত চোখে চারদিকে তাকায়, মাটিমাখা মানুষ কলের সামনে চিৎকার করতে করতে  কাজ করে চলেছে, মাটি কেটে যন্ত্রের মধ্যে ফেলে জলে ফোটাচ্ছে। আরও এগিয়ে যায় সে, এবারে সে একা, লোকজন নেই, দাঁড়িয়ে পড়ে সে, মাথায় হাত রেখে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে, শূন্য দৃষ্টি,মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন, নিজেকেই নিজে বলে —‘আমার কি আনন্দ হচ্ছে, না কি, দুঃখ হচ্ছে?’

 আকাশের দিকে তাকায়, প্রতিদিনের মত আজও আকাশ দেখে তার আনন্দ হয় (সুন্দর বিশাল যে আকাশ)।

 এবার দ্রুত  হাঁটতে থাকে, খুব তাড়াতাড়ি তাকে পৌঁছতে হবে সেই গ্রামে, তার নাম  ‘আলদেয়াকোর্বা ’। খনির পথে বাঁশের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠবে না, সে যাবে অন্য পথে, ঢালু জমি এড়িয়ে সে ওপরে উঠে যাবে খোলা মাঠে;তারপর ডান দিক দিয়ে সমতলে যাবে, সেটা ‘আলদেয়াকোর্বার’ রাস্তা। রাস্তাটা খুবই ভালো বলে সে সবসময় এদিক দিয়ে যায়। পথের ধারে রঙিন সুগন্ধি ফুলের কত গাছ,গাছে গাছে কত মৌমাছি আর প্রজাপতি, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। বড়বড় কাঁটাগাছে কালো কালো ফল, ছেলেরা এটা খুব ভালোবাসে,অনেক রকম দীর্ঘদেহী গাছের বন, ডালপালা আর পরগাছা লতাপাতায় গাছেদের শরীর আবৃত,এইসব গাছেরা বোধ হয় নিজেদের অন্ধকার শান্ত ছায়াতে নিজেরাই বেশ আনন্দ ভোগ করে।

 ধীরে ধীরে হাঁটে নেলা। মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা আর মিষ্টি উৎকণ্ঠা ওকে ছাড়ে না। তার উর্বর কল্পনায় শেষ পর্যন্ত ভেসে ওঠে সাধারণ মানুষের মধ্যে চালু কথাটা—‘লোকটাকে ভূতে ধরেছে’, কোনো একটি ভাবনায় আচ্ছন্ন মানুষ সম্বন্ধে এই কথা বলা হয় কিন্তু সে বলে; ‘আমার শরীরে আছে দেবদূত আর দেবদূতী…‘কুমারী মা’ আজ তুমি আমার সঙ্গে আছো। আমার মনে হচ্ছে, তোমার দেবদূত এবং দেবদূতীদের অট্টহাসিতে আমার অন্তর ভরে যাচ্ছে।তুমিতো দূরে নেই, তোমাকে একবার দেখি, আবার কখনও দেখতে পাই না, চোখ বন্ধ থাকলে এমন হয়।

 চোখ বন্ধ করে রাখে কিছুক্ষণ, আবার খোলে। বনের পাশ দিয়ে যেতে যেতে একটি বাঁক পেরিয়ে নেলা এসে পড়ে কাঁটাগাছের ঝোপের সামনে,ঘন ঝোপ, সবচেয়ে সুন্দর এইসব গাছ দেশের সর্বত্র খুব দেখা  যায়। দেখল মোটা মোটা ফার্ণ গাছ, ফুল আর লতাপাতা, কিছু কচি লতানে গাছ মোটা গাছ জড়িয়ে আছে এবং কিছু ছোটো ছোটো গাছ, গাছেরা একে অন্যের গায়ে পড়েছে, এসব গাছেদের গুঁড়ি দেখা যায় না।নেলার মনে হল যে, ডানদিকে গাছের শাখায় শাখায় কেমন শব্দ শোনা যাচ্ছে, তাকায় সে…প্রশান্ত আকাশ!সবুজ একটা ফ্রেমের মধ্যে ‘কুমারী মা’, এই তো তার নিজের মুখ, নিজের চোখ, সেই চোখের দিকে তাকালে সমগ্র আকাশের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। নেলা স্তম্ভিত নির্বাক, এমন এক অনুভব যার মধ্যে ভয় আর আনন্দ মিলেমিশে কি এক বিশৃঙ্খলা  তৈরি করে। এক পাও সে এগোতে পারে না, চিৎকারও করতে পারে না, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে,শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ, ওই বিস্ময়কর অকল্পনীয় মুখ থেকে সে চোখ সরাতে পারে না।

ঝোপের মধ্যে তাকে দেখা গেল, মুখ থেকে বুক পর্যন্ত। এই সেই নাজারেথ-সুন্দরীর আসল চেহারা, তাঁর নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা অষ্টাদশ শতাব্দীর অনেক শিল্পীর চিত্রকলায় প্রকাশিত হয়েছে, সান লুকাস থেকে শুরু করে সমকালীন চিত্রকলায় নিষ্কলঙ্ক মুখের প্রকাশ ঘটেছে। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ সেসব ছবি দেখেছে, কখনও দেখা গেছে রাফায়েল সানসিও’র চোখে অথবা কখনও ভ্যান ডাইক এবং  বার্তোলোমে মুরিশুর চোখে। নেলা যে ছবির মতো মুখ দেখল তা রাফায়েল-কৃত সৃষ্টি, মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর মুখ স্বর্গীয় বিভায় উজ্জ্বলতম হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পকলায়। সেভিইয়ার শিল্পীর আঁকা মুখাবয়ব বড়ো গোলগাল মজার চেহারা। আশ্চর্যরকম পরিমিতি দেখা যায় চোখে; ছন্দময়, দেহসৌষ্ঠবের সঙ্গে মানানসই, দৃষ্টিতে নেই কোনো অস্বচ্ছতা, অন্য ধরণের শিল্প তার, আন্দালুসি মানুষের চোখের দ্যুতি ধরা পড়ে এই ছবিতে। ভ্রুযুগল সূক্ষ্ম তুলির টানে রামধনুর মতো দর্শনীয়। মুখেচোখে নেই বিষাদ, না ক্রোধ, তাঁর ঠোঁট একটু পুরু, স্মিত হাসি, এমন সুন্দর দাঁত যেন স্বর্গের আপেলে কামড় দিয়েছে।

 মানুষের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে বিভিন্ন  ছবির জন্ম হয়, কিছু ছবির মধ্যে বোধবুদ্ধির অভাব যে থাকে না তা নয়। সৌন্দর্য সম্বন্ধে মানুষের ধারণা কত বিচিত্র তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন শিল্পকর্মে।

 অসম্পূর্ণ যে ছবি  নেলার ঘোরের মধ্যে দেখা দিয়েছিল, যা দেখে সে অর্ধমৃতের মত বিবশ হয়ে পড়েছিল সেই ঘটনার পরিসমাপ্তি প্রসঙ্গে বলব তার মুখ হয়েছিল রোদে পোড়া শুকনো গোলাপের মতো অথবা বলা ভালো, আগুনে ঝলসে যাওয়া এক মুখ, যেমন দেখা যায় স্বর্গীয় মুখের মধুর রাঙা আভায়,এমন চিত্রকলা দেখে কত শতাব্দীব্যাপী ভক্ত এবং পাপী মানুষ সমানভাবে আনন্দে আত্মহারা হয়েছে।

 মুহূর্তের হতচকিত অবস্থা কাটিয়ে মারিয়ানেলা বিস্ময়বিহবল চোখে দেখে সুরূপা ‘কুমারী মা’-এর গলায় বাঁধা নীল টাই, এমন দৃশ্যতো সে কখনও স্বপ্নেও দেখেনি। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ চলে যায় স্বর্গীয় মায়ের কাঁধে এবং বুকে, সেসবতো আবৃত আজকের দিনের আধুনিক পোশাকে। কিন্তু যে দৃশ্য দেখে সে বিচলিত এবং হতবাক হয়ে যায় তা হল, এই রূপসী তরুণী বুনো জামের থোকা নিয়েছে হাতে…আর খাচ্ছেও। ‘কুমারী মা’-এর এ হেন অদ্ভুত আচরণ বুঝতে চেষ্টা করছে সে, এমন সময় পুরুষের গম্ভীর কন্ঠ শোনা গেল:

 -ফ্লোরেন্তিনা, ফ্লোরেন্তিনা!

 -বাবা, আমি এখানে, আমি বুনো জাম খাচ্ছি।

 -যাচ্চলে!…বুনো জাম খুব মিষ্টি,তাই না?কি খেয়ালি মেয়ে আমার!তোকে বলিনি যে, এসব খায় গাঁয়ের বাউন্ডুলে অলস বেকার ছেলেরা, ভালো বাড়ির মেয়ে…ভদ্র সমাজের মেয়ে এসব খায়?

 নেলা দেখে, বেশ জোরে পা ফেলে ফেলে সেই ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন। বয়স্ক মানুষ, মাঝারি গড়ন, মোটাসোটা, লাল মুখ এবং সুর্যের আলোর মত খুশি ঝরছে সেই মুখমণ্ডল থেকে; পাদুটো তেমন লম্বা নয়, নাক লম্বা, তার গায়ে নানা অলঙ্কার, ঘড়ির সঙ্গে বাঁধা চেন, মাথায় সূক্ষ্ম প্রশস্ত পাখার টুপি।

 -ওরে শোন, মা-সেন্যোর দন মানুয়েল পেনাগিলাস স্নেহের স্বরে বলেন—ভদ্রলোকরা বনের জাম খায় না আর এমন লাফঝাঁপ দেয় না। দেখেছিস পোশাকটা  ছিঁড়ে কী হয়েছে? …পোশাকের দাম নিয়ে কিছু বলছি না, আগে যেমন কিনে দিয়েছি, পরেও তেমন দেব …বলছি এই কারণে যে, লোকে দেখে বলবে, তোর আর পোশাক নেই, তাই  ছেঁড়াটা পরে এসেছিস…নেলা  এবার স্পষ্ট দেখতে পায় সেই মেয়ের পোশাক। খুব ভালো দামি পোশাক, কিন্তু তার গ্রাম্যভাব অদ্ভুতভাবে বদলে যায়,চকিতে তার মধ্যে চলে আসে ধনীঘরের আদুরে ভাব। সেই অঞ্চলের আরাধ্য সাধুর উৎসব উপলক্ষে সেজেছিল গ্রামের মেয়ে; মাথা থেকে পা পর্যন্ত সেইরকম সাজ। ফ্লোরেন্তিনার স্বভাবে এমন এক স্বতোৎসারিত উৎফুল্ল ভাব থাকে যে, কোনো ছকবাঁধা নিয়মে তা বদলে যায় না, ঝলমলে সাজে তার স্বভাবের পরিবর্তন হয় না। তথাপি অস্বীকার করা যায় না যে, সেই হাসিখুশি মেয়ে চেয়ে নিয়েছিল সাধারণ স্কার্ট, চুল ছিল এলোমেলো, সাজের বাহার একেবারেই ছিল না, নিজের ইচ্ছেমত সেজেছিল।

 ঝোপের মধ্যে থেকে মেয়ে যখন বেরিয়ে এল দন মানুয়েল তখন হঠাৎ নেলাকে দেখে  চিৎকার করে বললেন :

 -ও: তুই এখানে?…দ্যাখ ফ্লোরেন্তিনা, এই হচ্ছে নেলা…।  মনে করে দ্যাখ , এর কথা তোকে আগে বলেছিলাম। তোর দাদাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়…তোর দাদার সঙ্গী। নেলা, এই জায়গাটা তোর কেমন লাগছে?

 -ভালো, সেন্যোর দন মানুয়েল। আপনি কেমন আছেন?—মানুয়েলকে জিজ্ঞেস করল নেলা, কিন্তু তার চোখ ফ্লোরেন্তিনার দিকে, নির্নিমেষ সেই মেয়ের দিকে চেয়ে আছে।

 -দেখে বুঝতে পারছিস না? শান্তিতেই আছি। এই আমার মেয়ে। কেমন লাগছে ওকে?

 ফ্লোরেন্তিনা একটা প্রজাপতি ধরতে ছোটে।

 -কোথায় যাচ্ছিস? কী ওটা? —বাবা মেয়েকে ভর্ৎসনা করেন। -চ্যাংড়া ছেলেদের মতো ছুটছিস একটা প্রজাপতির পেছন পেছন?…ভদ্র সভ্য থাকতে হয়, বুঝেছিস? ভালো ফ্যামিলির মেয়েরা এসব করে না…এসব করে না।

 দন মানুয়েল বাক্যের শেষ কথাগুলো দুবার বলেন। এটা তাঁর মুদ্রাদোষ।

 -রাগ কোরো না বাবা—মেয়ে অভিযানে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে বাবাকে বলে আর বাবার টুপির এলোমেলো পাখাগুলো ঠিক করে দেয়।  তুমিতো ভালোই জান, গ্রাম আমার কত পছন্দ আর গাছ, ফুল, খোলা মাঠ দেখে আমি পাগল হয়ে যাই। আমরা যেখানেই থাকি সেই ‘কাম্পো’ নামের গ্রাম বিষাদে বড়োই বিপন্ন, সেখানে এসব কিছুই নেই…।

 -ওঃ!ওরে, ‘সান্তা ইরেনে দে কাম্পো’র অত নিন্দে করিস না, সে এক বিখ্যাত গ্রাম, এখন সেখানে অনেক আরামের ব্যবস্থা হয়েছে আর একটা বিশেষ ভদ্র সমাজ আছে। সভ্যতার কিছু সুফল সেখানে এসে পৌঁছেছে…উন্নতির সুফল যাকে বলে। আমার সঙ্গে হাটতে হাঁটতে যত খুশি প্রকৃতির গুণ গেয়ে যা;আমিও প্রকৃতির প্রেমে উদ্বেল হয়ে যাই কিন্তু সার্কাসের অ্যাক্রোব্যাটদের মতো লম্ফঝম্ফ করি না। সুসভ্য সমাজের শিক্ষিত মানুষরা হাঁটতে হাঁটতে সবকিছু দেখে  চিনে নেয়। প্রতি মুহূর্তে যা দেখে তাতেই ‘আঃ!…ওঃ…কি দারুণ…। দ্যাখো বাবা দ্যাখো…, এসব বলা আদেখলামো। ফার্ণ,মেহগনি,পাথর, কাঁটাঝোপ, জলের ধারা, যাই দেখবি তাতে আঃ উঃ করা ভালো দেখায় না…মানুষ ভাববে, তুই মরুভূমিতে মানুষ হয়েছিস…তাই বলছি আমার সঙ্গে হাঁট…নেলা বলে দেবে কোন রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরব, সত্যি করে বলতে কী, আমি বুঝতে পারছি না কোথায় আছি।

 -ওই পুরনো বাড়িটার পেছনে বাঁদিকের রাস্তাটা ধরে যেতে হবে—নেলা বলল—খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবেন…।  কিন্তু ওইতো, দন ফ্রান্সিস্কো এসে গেছেন। সত্যি তাই, দন ফ্রান্সিস্কো এসেই  চিৎকার করে উঠলেন;

 -চকোলেট(তরল) যে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে…

 -কী করব বলো দাদা?…প্রকৃতির রূপ দেখে আমার মেয়ে যা পাগলামো শুরু করেছে কী বলব, দাঁড়াচ্ছে না কোথাও, এক ঝোপ থেকে আরেক ঝোপে তিড়িং বিড়িং লাফ দিয়ে বেড়াচ্ছে, সার্কাসের খেলোয়াড় যেন!

 -বাড়ি, বাড়ি চলো। নেলা, তুইও আয়, চকোলেট খাবি-অনাথ মেয়েটার মাথায় হাত দিয়ে বললেন পেনাগিলাস-, তুই কী বলিস ভাইঝি?…কি সুন্দরী হয়েছিস তুই  এ্যাঁ? ফ্লোরেন্তিনা!চকোলেট খাওয়ার পর নেলা তোকে নিয়ে যাবে,পাবলো আর তুই ঘুরবি,নেলাকেতো থাকতেই হবে, ঘুরে ঘুরে সব দেখবি, খনি, জঙ্গল, নদী…

 দুঃখী মেয়ের দিকে ভালোবাসার চোখে তাকাল ফ্লোরেন্তিনা,প্রকৃতির অকৃপণ ঐশ্বর্যের বিপুল আয়োজনের পাশে অসহায় মেয়েটাকে অধিকতর বিষাদগ্রস্ত মনে হয়। প্রকৃতির সৃষ্টিগুলো নিখুঁত, সৌন্দর্য অমলিন আর এই মেয়ে!বাড়িতে এদের জন্যে অপেক্ষা করছে সাজানো টেবিলে ধোঁয়াওঠা চকোলেটের বাটি আর পাঁউরুটির পাহাড়। বাদামগাছের পাতায় মোড়া মাখনও আছে, আর আছে কিছু মিষ্টির ডিশ। সুস্বাদু খাবারের পাশে স্বচ্ছ কাচের পাত্রে বিশুদ্ধ ঠান্ডা জল।

 -চলো, আরম্ভ হোক!—দন ফ্রান্সিস্কো চেয়ারে বসতে বসতে বললেন।

 -নেলা —পাবলো বলল -তুমিও চকোলেট খাও।

 ফ্লোরেন্তিনা যখন সবার সঙ্গে মারিয়ানেলার হাতে চকোলেটের পাত্র দেয় তখন সে কিছুই বলেনি। প্রথমে আপত্তি করলেও ফ্লোরেন্তিনার অনুরোধ দেখে নেলা চুপ করে গেল। দন মানুয়েল লুকিয়ে লক্ষ্য করছেন মেয়েকে, তিনি জানেন যে, শহরের সুশিক্ষার সৌজন্যে তাঁর মেয়ে সামাজিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে সবার সঙ্গে মেলামেশা করতে জানে, কোন মানুষের সামাজিক অবস্থান কী বুঝে মিশতে হয়  যাতে প্রাপ্য সম্মান সে পায়, সমাজের বিন্যাসে সমতা থাকে এবং কেউ কাউকে দোষারোপ করতে পারে না। ধনীর সামনে সে অতিরিক্ত প্রগলভতা প্রকাশ করে না,আবার গরীবের কাছে অতি বিনয়ের অভিনয় প্রকাশ করে না…দন ফ্রান্সিস্কো চকোলেটের কাপ হাতে নিয়ে বললেন

 -ছোটোরা এবার বেড়াতে যেতে পারে। ওরে পাবলো, দন তেওদোরো আজকের পরে তোকে বাইরে যেতে নিষেধ করেছেন। তোরা আজ তিনজনে ঘুরতে যেতে পারিস, আমি আর ভাই একবার বাড়ির পোষ্যগুলোকে দেখে আসব…তোমরা বেরিয়ে পড়ো। পাখির মতো উড়ে বেড়াও। বেশি কথা তাঁকে বলতে হল না। বাইরের  সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে তিনটে পাখি মাঠের দিকে উড়ান দিল।

ক্রমশ…

Tarun Ghatak
 তরুণকুমার ঘটক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও  হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।‘দনকিহোতে’এবং‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক। ‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।
   

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *