মারিয়ানেলা (পর্ব ১১)

[gtranslte]

Benito Pérez Galdós
Benito Pérez Galdós
   বেনিতো পেরেস গালদোস (১৮৪৩—১৯২০)
  
    স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি। তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা’, ‘জাতীয় ঘটনাক্রম’। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা' ইত্যাদি।
    বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে। কর্নেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
   গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সাল থেকে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খণ্ডে অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।
   ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন্যা পেরফেক্তা’(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়্যাল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার ) মতে ‘তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।’ লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।
   ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ন ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন।  কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন।
   
Marianela - Benito Pérez Galdós
Marianela – Benito Pérez Galdós

‘আলদেয়াকোর্বা’র গোষ্ঠীপিতা

পর্ব – ১১

 -ওই দ্যাখো,দুধদোয়া শুরু হয়ে গেছে- সবাইকে অভিনন্দন জানাবার আগেই বললেন তিনি। সবাই দুধ খাবে মনে হয়। দন্যা সোফিয়া, কেমন লাগল হাঁটতে?…আর আপনার দন তেওদোরো?…অনেকটা হেঁটেছেনতো আজ? মারিয়ানেলার কি হয়েছে?…পায়ে লেগেছে না কি?

 বাড়ির সামনের চত্বরে সবাই প্রবেশ করল। হাম্বাহাম্বা ডাকতে ডাকতে গোরুগুলো গোয়ালঘরে ঢুকছে, সবাই এই গম্ভীর ডাক শুনতে পাচ্ছে আর তার সঙ্গে নাকে লাগছে খড়ের মিষ্টি গন্ধ, কয়েকজন মজুর খড়ের গাদায় ফেলে দিচ্ছে নতুন খড়ের আঁটি, সবারই বেশ ভালো লাগে এইসব দৃশ্য এবং গন্ধ।

 পাথরের একটা বেঞ্চিতে নেলাকে বসিয়ে দিলেন ডাক্তার আর সেই মেয়ে শ্রদ্ধায় অবশ, বিস্ময়ে একভাবে চেয়ে আছে সেই মানুষটির দিকে যিনি তাকে এতটাই মূল্য দিয়েছেন।

 -পাবলো কোথায়? —এঞ্জিনিয়ার জিগ্যেস করলেন।

 -এইমাত্র বাগানে গেল—বললেন সেন্যোর পেনাগিলাস। তিনি সোফিয়াকে দিলেন একটা সাধারণ চেয়ার —ওরে নেলা, যা না, ওকে দ্যাখ, ওর সঙ্গে  একটু হাঁটাচলা কর।

 -না, না, এখনও হাঁটা ঠিক হবে না -তেওদোরো ওকে আটকে দিলেন —তাছাড়া আমাদের সঙ্গে ও দুধ খাবে তো।

 -আজ সন্ধেতে আপনি আমার ছেলেকে দেখবেন না? —সেন্যোর পেনাগিলাস জিগ্যেস করলেন।

 -কাল তো দেখেছি, আজ আর দরকার নেই -গোলফিন বললেন; অপারেশন করা যাবে।

  -সফল হবে তো?

 -কী? সফল…? তা বলা যায় না। দৃষ্টিশক্তি তার কাম্য। আমি যদি সেটা দিতে পারি আমার খুব আনন্দ হবে। সে আনন্দের তুলনা নেই। আপনার ছেলেটি খুব বুদ্ধিমান, সেরা বুদ্ধিমান, তার কল্পনাশক্তি অসামান্য, মনের দিক থেকে এত উদার সহজে মেলে না। দৃশ্যমান পৃথিবী তার অধরা বলে এইসব গুণগুলো এত প্রখর…। আমাদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার চরিত্রের সাফল্য, বিশুদ্ধ আর প্রকৃতির সৃষ্টিতে তার অনাবিল আনন্দ, যেখানে মানুষের হাত পড়েনি সেখানেই তার আনন্দ। তার মধ্যে সবটাই আদর্শ, মহান আদর্শ আর অসীম সুন্দর। মর্মর-প্রস্তরের জমাট স্তুপের মতো এক সুবিশাল সৃষ্টি…বাস্তবকে সে চেনে না…নিজের অন্তরেই তার বাস, তার জীবন সম্পূর্ণভাবে স্বপ্নময়…ওঃ! যদি দেখার শক্তিটা তাকে এনে দিতে পারতাম! মাঝে মাঝে ভাবি: “আমরা চোখ দিতে পারলে সে হবে মানব-দেবদূত!” সমস্যা আছে,সন্দেহ আছে…। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ মানুষ করে তুলতে হবে; এ কাজ করবে বিজ্ঞান; স্বপ্নের জগৎ থেকে তাঁকে বাস্তবে নিয়ে আসতে হবে, তখন তার ভাবনাগুলো সঠিক হবে, তার মধ্যে আসবে মানসিক বল যাতে সব জিনিসের সঠিক মূল্যায়ণ করতে পারবে।

 ফেনাওঠা, সাদা, অল্প উষ্ণ দুধের গ্লাস এল সবার জন্যে। প্রথমে পেনাগিলাস দিলেন সোফিয়াকে, বাকি দুজনকে অন্যেরা দুধের গ্লাস দিল। গোলফিন নিজের গ্লাস দিয়ে দেন নেলাকে,সে লজ্জায় না, না করে।

-নে, নে—বলেন সোফিয়া—ভালো মেয়ের মতো দুধ খা, উনি দিচ্ছেন, নে।

 -দন তেওদোরোর জন্যে আরেকটা গ্লাস নিয়ে আয় -দন ফ্রান্সিস্কো বললেন এক ভৃত্যকে।

 নীরবতার মধ্যে দুধ দোয়ার চোঁ  চোঁ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

 -তখন সব জিনিসের সঠিক মূল্যায়ন করার ক্ষমতা আসবে; -ডাক্তারের বাক্যটাই বললেন দন ফ্রান্সিস্কো পেনাগিলাস, কথাটা  তাঁর অন্তর বিদ্ধ করেছে, সেন্যোর দন তেওদোরো অসাধারণ একটা কথা বললেন। এই কথাগুলো ঘুরেফিরে মনে আসছে, আপনাকে আমার উৎকণ্ঠার কথা বলছি, কদিন ধরেই আমি এসব ভাবছি।

 ডাক্তারের পাশের বেঞ্চিতে বসলেন দন ফ্রান্সিস্কো। তেওদোরো, কার্লোস এবং সোফিয়ার জন্যে ভেতর থেকে চেয়ার আনা হল। নেলা তখন থেকেই পাথরের বেঞ্চিতে বসে আছে, সে দুধ খেয়েছে বোঝা যাচ্ছে তার গোঁফ দেখে, সাদা দাগ পড়েছে।

 -হ্যাঁ,যা বলতে চাইছিলাম সেন্যোর দন তেওদোরো, আমার ছেলের কথা ভেবে আমার মনের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে; ওকে ঘিরে যে আশা জেগেছে তাতেই আমার এই অবস্থা, আশা তো ওকে আমরা দিয়েছি…সে আশা বেড়েই চলেছে। আপনাকেতো বলেছি যে, ওকে আমি নানারকম বই পড়ে শোনাই, আমার মনে হয়, বই পড়ার ফলে তার চিন্তাশক্তি খুব বেড়ে যায়, দেখতে পায় না বলে তার মাথায় চিন্তাভাবনার জোরটা বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারলাম কি না জানি না।

 -ঠিকই বলেছেন, আমি সব বুঝতে পেরেছি।

 -তার চিন্তাস্রোত কখনোই থামবে ননা ওর কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই,ওর আলোচনাগুলো নতুন ধরণের। আমার মনে হয়, এই পৃথিবীর কিছুই নিজের চোখে দেখতে পায় না বলে ওর কথায় যুক্তিগুলো এলোমেলো হয়ে যায় আর ভুলে ভরা থাকে ওর কথাগুলো।

 -এরকমই হওয়ার কথা।

 -যা খুবই বিরল তা হল কল্পনার অবাধ টানে ওর এমন হয়, যেন ছোট্ট ঘরে বন্দি হারকিউলিস লোহার দেওয়াল ভেঙে ফেলতে চাইছে।

 -খুব ভালো বলেছেন, চমৎকার।

 -আমি বলছি, ওর কল্পনা বোধবুদ্ধির অন্ধকারে আটকে থাকতে পারছে না। আলোর জগতে প্রবেশ করে নিজের মনের মতো চিন্তাভাবনা দিয়ে দৃষ্টিহীনতার অভাব দূর করতে চাইছে। পাবলোর মধ্যে আছে বিস্ময়কর মনের জোর, সবকিছু বোঝার এই অদম্য মনোভাব ডানাভাঙা পাখিরমত।  কিছুদিন হল ও ভীষণ উত্তেজিত, ঘুমোচ্ছে না, সবকিছু জানার প্রবল ইচ্ছে পাগলামোর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।  সবসময় নতুন বই পড়তে বলছে আর মাঝে মাঝে এমন সরল আর একইসঙ্গে ধারালো মন্তব্য করছে যে, আমার হাসি পেয়ে যায়। তার কথায় বড়ো অবাস্তব ভাবনা, তার বিরোধিতা করা যাবে না!… আমার খুব ভয় হয় যে, হয়ত শেষপর্যন্ত পাগল হয়ে যাবে, মাথাটা বোধহয় বিগড়ে যাচ্ছে। দেখবেন মাঝে মাঝে হয়ে যাচ্ছে বিষম দুঃখী আর চিন্তামগ্ন…একটা চিন্তায় ডুবে থাকে এক সপ্তাহ, সেটা থেকে মন ঘোরানো যায় না। মৌলিক কোনো মজার বিষয় থেকে অনেকদিন বেরোতে পারে না। তবে সবসময় বলে, নেলা খুব সুন্দরী। সবাই হেসে ওঠে আর নেলার মুখ শুকিয়ে যায়।

 -নেলা তো সুন্দরী বটেই -স্নেহের  স্বরে বলেন তেওদোরো গোলফিন-, নিশ্চয়ই, সে ঠিকই বলে।

 -আমারও তাই মনে হয়, আর এখন সাদা গোঁফ নিয়ে আরও সুন্দরী হয়েছে-সোফিয়ার তির্যক মন্তব্য।

 -হ্যাঁ, আমি বলব, সে সুন্দরী -তেওদোরো তার মুখটা ধরে আদর করে আবার বলেন, -সোফিয়া, তোমার রুমালটা দাওতো…এই তো, গোঁফটা মুছে দিলাম।

 তেওদোরো রুমালটা ফেরত দিয়ে দিলেন সোফিয়াকে। দন ফ্রান্সিস্কো ওকে অন্ধ ছেলের সঙ্গে কথা বলার জন্যে ভেতরে যেতে বলেন, সে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়ির ভেতরে গেল।

 -যখন তার বিরুদ্ধে কিছু বলি—দন ফ্রান্সিস্কো বলেন-, আমার ছেলে বলে যে, আমার দৃষ্টি যদি ফিরে পাই তাহলে বোধহয় অন্যরকম কিছু হয়ে যাবে, সবচেয়ে মজার আজগুবি কাণ্ড ঘটে যাবে! সবকিছুর মধ্যে সত্যিটা ধরা পড়বে।

 -আপনি ওর কথার বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না আর এখন বই পড়াটা  বন্ধ  রাখুন। কিছুদিন  ওকে একদম শান্ত থাকতে হবে। এই ধরণের অপারেশনের আগে মস্তিষ্কে বেশি আলোড়ন ঠিক নয়।

 -যদি ঈশ্বরের কৃপায় আমার ছেলেটা দেখতে পায় -সেন্যোর পেনাগিলাস আবেগদীপ্ত কণ্ঠে বলেন,আপনাকে মহত্তম মানুষ বলে ভাবব, সর্বশ্রেষ্ঠ দরদী মানুষ হিসেবে আমি গ্রহণ করব। ওর চোখের অন্ধকার আমার জীবনের অন্ধকার; এই কালো ছায়া আমার দিনগুলো করে দিয়েছে যন্ত্রণার, যা কিছু তার মঙ্গলের জন্যে অর্জন করেছি সবই মূল্যহীন মনে হয়। আমি ধনী, এই ধন কোন কাজে লাগবে? সে যা দেখতে পাচ্ছে না তাতে আমার বিন্দুমাত্র  আনন্দ নেই। এক মাস আগে আমি একটা বড় সম্পত্তির মালিক হব বলে বিজ্ঞপ্তি পেয়েছি…দন কার্লোস, আপনিতো জানেন যে, আমার তুতো ভাই ফাউসতিনো মারা গেছে, সে থাকত মাতামোরেস-এ। তার ছেলেপুলে নেই, আমার ভাই মানুয়েল আর আমি তার উত্তরাধিকারী…এ তো শুয়োরকে ডেইজি ফুল দেওয়ার মতো ব্যাপার, না, ভাইয়ের সম্পর্কে একথা খাটে না, তার এক সুন্দরী বিবাহযোগ্যা কন্যা আছে, আমার মত হতভাগ্য সম্পর্কে ওই কথাটা ঠিক, একমাত্র ছেলেইএইসব সম্পদ ভোগ করতে পারছে না, এ কি আমার অভিশাপ নয়?

এই কথাবার্তার পর কেউ কিছুক্ষণ কথা বলে না, শুধু গোয়ালঘরে গোরুদের  আদুরে ডাক শোনা যাচ্ছে মাঝে মাঝে।

 ‘আলদেয়াকোর্বা’র গোষ্ঠীপিতা সেন্যোর পেনাগিলাস গভীর দুঃখের সঙ্গে বললেন:

 -জীবনে কাজের আনন্দই সেরা, কিন্তু আমার ছেলের ভাগ্যে সে আনন্দ নেই। প্রকৃতির সৌন্দর্য সে দেখতে পায় না, কীকরে জানবে মাঠের খোলা হাওয়া কেমন কিংবা চাষবাসের মধ্যে যে মাধুর্য আছে তাই বা কীরকম? আমি বুঝি না ঈশ্বর এক মানুষকে কেন বঞ্চিত করলেন এভাবে? মাঠে পশুর পাল, ফলভর্তি গাছ, সবুজ মাঠ আর কতরকমের গাছগাছালি সে দেখতে পেল না! যারা কাজ করে তাদের মজুরি দেবার আনন্দ কিংবা আকাশ দেখে আবহাওয়া কেমন হবে তা অনুমান করার মজা সে পাচ্ছে না। শুধু উদ্ভট চিন্তার মধ্যে ঘুরপাক খায় তার মস্তিষ্ক; এছাড়া জীবনে তার কিচ্ছু করার নেই। নিঃসঙ্গ জীবনে পরিবারের সুখ তার কপালে জুটবে না, আমি মারা গেলে আমার অন্ধ ছেলেটার কী হবে? কোথায় পাবে পরিবারের উষ্ণতা? ও বিয়ে করতে চাইবে না, কোনো মেয়েও চাইবে না তাকে বিয়ে করতে; এত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমি ওকে বিয়ে করার পরামর্শ দেব না। এইরকম হতাশ অবস্থায় যখন সেন্যোর তেওদোরো আশার কথা বললেন তখন আমি হাতে যেন স্বর্গ পেলাম, আমার দিকে চোখ তুলে চেয়েছেন স্বয়ং ঈশ্বর…দেখতে পেলাম এক যুবকের সুখী জীবন, যেন স্বপ্ন, ছেলের সঙ্গে তার মিষ্টি বউ, দেখলাম দেবদূত, আমার চারপাশে নাতি নাতনি, দেখলাম আমার সমাধি শৈশবের ফুলে সেজে উঠেছে, আমার মৃত্যুর পর বেঁচে থাকবে  ভালোবাসার স্পর্শ, সমাধিগহ্বরে পর্যন্ত পৌঁছে যাবে সেই অনির্বচনীয় সুখানুভূতি…আপনারা এটা বুঝতে পারবেন না; আপনারা জানেন না যে, আমার প্রিয় ভাই মানুয়েল আর আমি সুসংবাদ পেয়েছি, সেই আশায় শুধু হিসেব করে যাচ্ছি, আরও হিসেব আসছে মাথায়…দেখুন, কেমন সংবাদ—খুব দ্রুত কতকগুলো চিঠি বের করলেন, যেটা খুঁজছেন সেটা পেলেন না। সে খুব খুশি,লিখেছে: “তোমার ছেলে পাবলোর সঙ্গে আমার ফ্লোরেন্তিনার বিয়ে দেব, তুমি  পাচ্ছ আধ মিলিয়ন পেসো, তুতো ভাই ফাউস্তিনোর সম্পত্তির অংশ।”  আমার মনে হচ্ছে, আমার ভাইটাকে দেখছি, আনন্দ হলেই অভ্যেসমতো দুহাত তুলে নাচে…যেকোন সময়মেয়েকে নিয়ে ও এখানে চলে আসবে; আমার সঙ্গে থাকবে ৪ঠা অক্টোবর পর্যন্ত, দেখতে আসবে আমার ছেলের দৃষ্টি পাবার মুহূর্তটায় কী হয়…

 ধীরে ধীরে শান্ত রাত নেমে আসছে, চার ভদ্রলোককে ঘিরে এক স্নিগ্ধ অন্ধকার ঘন হয়ে আসে। বাড়িতে বাড়িতে উনুন জ্বালার তোড়জোড় শুরু হয়েছে, গ্রামের মানুষের রাতের খাবার তৈরি করার সময় হয়ে গেছে। গোষ্ঠীপিতা যেন বিষণ্ণ  শান্তির মানবিক মুখ, কথা শুরু করলেন আবার:

 -আমার ছেলেটা ফ্লোরেন্তিনার স্বামী হবার যোগ্য হয়ে উঠলেই আমার ভাই আর আমি খুব সুখী হব। মেয়েটা ‘কুমারী মায়ের’ মতো নিষ্পাপ,ছবিতে তাঁর মুখ দেখেছি,এক দেবদূত এসে তাঁকে বলছেন: ‘তোমার সঙ্গে আছেন প্রভু’। ছেলেটা যদি অন্ধই থেকে যায় তাহলে তো কিছুই হবে না…কিন্তু  আমার পাবলো যদি দৃষ্টিশক্তি পায় তাহলে আমার সব স্বপ্ন পূরণ হবে, ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমার বাড়ি আলোয় ভরে উঠবে।

 সবাই চুপ, উদারমনা বাবার কথা গভীরভাবে তাদের নাড়া দিয়েছে। পিতা রুক্ষ্মসূক্ষ্ম দুই হাত চাপা দিলেন চোখে, একফোঁটা চোখের জল মুছে ফেললেন।

 -তেওদোরো এবার তোমার কথা একটু শুনি-কার্লোস  দাদাকে বলেন।

-শুধু এইটুকু বলতে পারি যে, এই কেসটা আমি খুব ভালোভাবে দেখেছি, ফলে বলতে পারব না যে, ‘এ সারবে না’। কিন্তু আমাদের বন্ধু যেসব বিখ্যাত  বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছেন তারা সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছেন,কিন্তু ‘সারবে না’ বলার যথেষ্ট কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না।

 আমি নিশ্চিতভাবে সারিয়ে দেব বলছি না কিন্তু অসম্ভব মনে করি না। কাল যে পরীক্ষা করেছি তাতে রেটিনার আঘাত ধরা পড়েনি;চোখের নার্ভ তেমন খারাপ হয়নি। রেটিনা অটুট থাকলে অন্য বাধাগুলো  কাটানো খুব কঠিন কিছু নয়। যে পথ দিয়ে দেখার আলো প্রবেশ করে সেটা যদি বেঁকেচুরে যায়, সেটা যদি পাথরের মতো শক্ত হয়ে পড়ে তাহলে আমাদের সমস্যা হয়…সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যদি নিজের কাজ ঠিকমত করে  তবে রোগ ধরতে পারে না..। কিন্তু চোখের রাজ্যে অনেক কিছুই অকেজো হয়ে থাকে।

 -তার মানে সবকিছু মিলে জন্মগত ছানি দেখা দেয়?—বলেন গোষ্ঠীপিতা।

 -ওঃ! না সেন্যোর; শুধু যদি তা হত আমরা সুখী হতাম। কেবল অকেজো অংশটা বাদ দিলেই ল্যাঠা চুকে যেত…আলোর প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেলে একটা পাঁচিল তৈরি হয়ে যায় আর দেখার মতো আলো বেঁকে যায়,তখনই সব শেষ হয়ে যায়।আরও কিছু আছে সেন্যোর দন ফ্রান্সিস্কো। মণির মধ্যে ফাটল হয়, তখন বারবার চোখে হাত চলে যায়। আমি খুঁটিয়ে দেখলাম, এতদিন  ধরে যে অঙ্গটি অচল তার ভেতর পর্যন্ত পরীক্ষা করে দেখলাম রেটিনা ঠিক আছে,আলোর পথ বন্ধ  থাকলেও তা খোলা যাবে। অন্য দিকে এই সদ্য-অধিকৃত অন্ধকার প্রাসাদের অভ্যন্তরে আলো নিভিয়ে প্রবেশ করে দেখলাম ভেতরে যাবার পথ সম্পূর্ণ  বন্ধ…যদি অসম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকত আমাদের সুবিধে হত খুব,কিন্তু সেটা সাধারণ ব্যাপার…চোখের  স্নায়ুগুলোর মৃত্যু ঘটলে আমরা কিছু করতে পারি না।  অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ থাকত না…তখন কী করার থাকে? ধৈর্য। এই কেসটা আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে…লক্ষণ দেখে বোঝা যায় যে,ভেতরের অবস্থা বিকল হয়নি। মহামান্য রেটিনা আলো গ্রহণ করতে উন্মুখ যা দৃষ্টির পথ খুলে দিতে পারে। গ্লুকোমা একটা বড়ো বাধা…তবে তার চিকিৎসা সম্ভব। অন্ধকার পথের বাধা দূর করা যাবে বলে মনে হচ্ছে… কিন্তু অন্য একটা কথা ভাবছি। ফাটল এবং ছানি দুটো একসঙ্গে কিছু আলো ফেলতে পারে কিন্তু আমাদের অন্ধ ছেলের চোখে কোনো আলো আসবে না।এই সমস্যাটা আমাকে চিন্তায় ফেলেছে…। বোঝা যাচ্ছে যে, আলো যাবার পথ বাঁকা…আলোর পথে যথেষ্ট বাধা আছে…ওটাই আমাদের দেখতে হবে,বুঝলেন দন ফ্রান্সিস্কো।  সাহস আছে তো আপনার?

 -সাহস? নিশ্চয়ই আমার সাহস আছে!—জোর দিয়ে বলেন দন ফ্রান্সিস্কো।

 -কেসটা সামলাবার জন্যে যথেষ্ট সাহস লাগবে…

 -কোনটা?

 -অপারেশনটায় আপনার ছেলের খুব যন্ত্রণা হবে, পরে আগের মতোই দৃষ্টিহীন থাকতে হবে…আমি আপনাকে বলছি: অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। করব অপারেশন?

 -আগে যা বলেছি এখনও তাই বলব: অপারেশন করুন, ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন, আপনি এগিয়ে যান।

 -এগিয়ে যাব! আমার কথাই আপনি উচ্চারণ করলেন।

 দন ফ্রান্সিস্কো উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাতে ধরলেন তেওদোরের সিংহের থাবের মতো হাত।

 -এই আবহাওয়ায় অক্টোবর মাসের শুরুতে অপারেশন  হওয়াই ভালো-গোলফিন বললেন—কাল বলে দেব রোগীকে কীভাবে চিকিৎসা করা হবে। এমন উঁচু জায়গায় মানুষ বিশুদ্ধ হাওয়া পায়।

  পেনাগিলাস তাঁদের নৈশাহার করার আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু এঁরা তা গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। নেলাকে নিয়ে সবাই একসঙ্গে বেরোলেন,তেওদোরো মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, দন ফ্রান্সিস্কো তাঁদের খনির মূল কেন্দ্র পর্যন্ত  পৌঁছে দেবেন বলে বেরিয়ে এলেন। নৈঃশব্দ্যআর রুপসী রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ওঁরা ভালো বিষয় নিয়ে কথা বলতে লাগলেন। যেমন, খনির উৎপাদন আর দেশের ফল-ফসল। গোলফিন ভাইয়েরা বাড়িতে প্রবেশ করার পর দন ফ্রান্সিস্কো ফিরে আসবেন নিজের বাড়িতে,তাঁর মন বিষণ্ণ, বড়ো নিঃসঙ্গ মানুষ তিনি, মাটিতে চোখ রেখে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন বাড়ির দিকে। উৎকণ্ঠাআর আশায় ভারাক্রান্ত মনের মধ্যে কেবলই আসাযাওয়া করে ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা, আনন্দ আর সন্দেহ তাঁকে বিভ্রান্ত করে। রাস্তায় ‘চোতো’ তাঁর সঙ্গ নিল, দুজনেই কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলেন।  চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল, গোষ্ঠীপিতার ছায়া তাঁর সামনে দিয়ে সিঁড়ি ভাঙে, দুজন মানুষ যেন সিঁড়ি থেকে লাফিয়ে অন্য সিঁড়িতে উঠছেন। কুকুরটা তাঁর সঙ্গেই আছে। ‘আলদেয়াকোর্বা’র গোষ্ঠীপিতা যে চিন্তায় এত ভারাক্রান্ত তা লাঘব করার মতো কেউ নেই, তাই তিনি বললেন :

-‘চোতো’, কী হবে বলতে পারিস?

ক্রমশ…

Tarun Kumar Ghatak
  তরুণ কুমার ঘটক    
  
 যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ এবং‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক।‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।
   

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *