মারিয়ানেলা পর্ব-১

Benito Pérez Galdós
Benito Pérez Galdós
স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের পাশে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয় বেনিতো পেরেস গালদোসের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তিনি। তাঁর অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফোরতুনাতা এবং হাসিন্তা’, ‘জাতীয় ঘটনাক্রম’। 'মারিয়ানেলা', 'দন্যা পেরফেক্তা' ইত্যাদি। 
বেনিতো পেরেস গালদোস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে গ্রেট কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জের 'লাস পালমাস' নামক সুন্দর এক দ্বীপে। কর্নেল পিতার মুখে স্পেনের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন গালদোস। স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি তাঁর আগ্রহের সৃষ্টি হয় অতি অল্প বয়সে। ১৮৬২ সালে সাহিত্য এবং কলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রহসন-কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্প লিখতে থাকেন। সেই সময় থেকেই চিত্রকলায় আগ্রহী হতে থাকেন। নাটকে বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি মাদ্রিদে থাকাকালীন প্রায়শই নাটক দেখতে যেতেন। এই শহরেই স্পেনীয় লেখক লেওপোলদো আলাস ক্লারিন-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
 গালদোস ছিলেন লাজুক স্বভাবের, সহজ জীবন তাঁর ভালো লাগত,জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া পছন্দ ছিল না তাঁর, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন লেখক, 'দন কিহোতে' উপন্যাসটির পাতার পর পাতা তিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। বালজাক এবং ডিকেন্স তাঁর প্রিয় লেখক। ১৮৭৩ সাল থেকে শুরু করে চল্লিশ বছর ধরে চার খন্ডে 'জাতীয় ঘটনাবলি' রচনা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর স্পেনীয় জীবনের আলেখ্যটি মহান সাহিত্যকীর্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার ধারাটিকে পুষ্ট করে। বাস্তববাদী লেখক গালদোসের অন্যান্য রচনার মধ্যে আছে ৫১টি উপন্যাস,২৩টি নাটক এবং ২০টি খণ্ডে অন্যবিধ রচনা। তিনি ছিলেন বহুপ্রজ লেখক।
  ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন্যা পেরফেক্তা’(Dona Perfecta) অর্থাৎ 'শ্রীমতী পারফেক্ট'। এই উপন্যাসের মূল বিষয় মতাদর্শগত সংঘাত। ১৮৮৯ সালে স্প্যানিশ রয়্যাল একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন গালদোস। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাটক রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। স্পেনের অন্যতম সমকালীন লেখক পিও বারোহার (উচ্চারণভেদে বারোখার) মতে ‘তিনি জানতেন মানুষকে কীভাবে কথা বলাতে হয়।’ লোকজীবনের সাদামাঠা ভাষাই ছিল তাঁর পছন্দ, অলঙ্কারসমৃদ্ধ জমকালো বাক্য তিনি লিখতেন না।
  ১৯১২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয় এবং স্পেনের সাহিত্যজগতে তুমুল আলোড়ন ওঠে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় গদ্যকার বেনিতো পেরেস গালদোস ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন।  কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে অংশগ্রহণ করেন।

মারিয়ানেলা

পর্ব-১

পথ-হারানো

সূর্য ডুবে গেছে। সংক্ষিপ্ত আলোছায়ার খুনসুটি শেষ হবার পর নেমে এসেছে শান্তশ্রী অন্ধকার,রাতের সেই কালো শরীরের ওপর ধীরে ধীরে অপসৃত হতে থাকে দিনান্তের শব্দাবলি আর পর্যটকমশাই এক পথ ধরে এগিয়ে চলেন, রাত হচ্ছে বলে তিনি দ্রুত হাঁটতে থাকেন। সরু পথ ধরে চলেছেন তিনি, মানুষ আর পশুর অবিরাম চলায় পথের ঘাস তেমন সজীব নেই, ক্লান্তিবিহীন পথিক পাহাড়ি পথ ধরে ওপরে উঠতে থাকেন, কাঁটাগাছের ঝোপ, কিছু জংলি আর ওক গাছে সেই পথ প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে। (এতক্ষণে বোঝা যাচ্ছে যে, আমরা আছি স্পেনের উত্তরে।)

 মাঝবয়েসি ভদ্রলোক, সুঠাম শরীর, দীর্ঘকায়, প্রশস্ত কাঁধ, দৃঢ় ভঙ্গিতে চলা, মুখেচোখে দৃপ্ত ভাব, চোখের ভাষা উজ্জ্বল, স্বাভাবিক মেদ থাকলেও শরীরের ভার তাঁকে বহন করতে হয় না(যদিও বলা যেতে পারে যে, মেদ জমার বয়স তাঁর হয়নি), তাঁকে দেখলেই সবার ভালো লাগার কথা। গ্রীষ্মকালে সচ্ছল মানুষরা যে পোশাক পরে তিনিও তাই পরেছেন। মাথায় গোল হ্যাট, এই ধরণের টুপির একটা সুন্দর নাম আছে, ‘বাউলার হ্যাট’, পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার জন্যে মানানসই লাঠি নিয়েছেন, কাঁটাগাছ সরাতে খুব কাজে লাগে হাতের শক্ত লাঠি, ঝোপঝাড় এত বেড়ে গেছে যে, এটি না থাকলে তাঁর পোশাক ছিঁড়ে যেত।

 থামলেন পর্যটক, দিগন্তের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন, অধৈর্য চেপে বসল তাঁর মনে, কিছুটা অস্থির বোধ করছেন। যে পথে হাঁটছেন তা নিয়ে খটকা লাগল তাঁর মনে, কোনো গ্রামবাসীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন, দেখা হলে জেনে নেবেন কোথায় এসে পৌঁছেছেন, যাতে খুব দ্রুত গন্তব্যে যেতে পারেন। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলেন, “না,আমার ভুল হতে পারেনা, আমাকে বলা হয়েছিল যে, পথের বাঁকে নদী পেরোতে হবে…তাইতো করেছি আমি। তারপর এগিয়ে যেতে হবে, শুধু সামনে এগিয়ে চলা আর কিছু নয়। আসলে ওইদিকে, আমার পেছনে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট এক গ্রাম, সেখানকার রাস্তায় কাদার আধিক্য দেখে আমি নাম দিয়েছি VILLAFANGOSA অর্থাৎ ‘কাদাগ্রাম’, তার মানে এখান থেকে সামনে এগিয়ে চলো, অবিরাম এগিয়ে চলো…। (এই রাস্তাটা আমার খুব পছন্দের, আমার হাতে একটা ঢাল থাকলে অন্যদিকে তাকাতাম না), সোকার্তেস-এর বিখ্যাত খনিতে আমাকে যে যেতেই হবে।”

 এরপর দীর্ঘ পথ হাঁটার পর বললেন: “আমি হারিয়ে গেছি, নির্ঘাত হারিয়ে গেছি, …তেওদোরো  গোলফিন, তোমার এগিয়ে চলার ফলশ্রুতি শেষপর্যন্ত এই। উজবুক মানুষ কথার দাম বোঝে না। হয়তো তোমার সঙ্গে ইয়ার্কি করেছে কিংবা ওরা জানে না কোথায় আছে সোকার্তেস-এর খনি। বিশাল খনি অঞ্চলে অবশ্যই থাকবে বড়োবড়ো বাড়ি, চিমনি, যন্ত্রের কানফাটা আওয়াজ, গাড়ির হর্ণ, ঘোড়ার চিঁহিচিঁহি ডাক, কত রকমের কল, আমি এসব কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, কানেও প্রবেশ করছে না কোনো শব্দ…মনে হচ্ছে, আমি এসে পড়েছি এক মরুভূমিতে…কী  নির্জনতা! যদি আমি অপশক্তি বিশ্বাস করতাম তাহলে ভাবতে পারতাম যে, আমার গন্তব্যস্থলের হাতছানি ওইসব অপার্থিব শক্তির সঙ্গে আলাপ করার সম্মান এনে দিয়েছে।

 …শয়তান! এসব জায়গায় কি লোকজন থাকে না? …চাঁদ উঠতে এখনও আধঘন্টা বাকি। ওঃ, তুই এক অতিবড়ো ছলনাময়ী, তোর জন্যেই আমি এমন করে ভুল পথে এসে পড়েছি! …ওঃ! কোথায় এসেছি তাও যদি জানতাম! …কিন্তু কোথায় কী? …এই কথাগুলো বলার পর তিনি এমন ভাব দেখালেন যেন বিপদে তিনি কখনও ভয় পান না, গোলফিন, তুমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছ, এবার কি ঘাবড়ে গেলে?…গ্রামের মানুষরা ঠিকই বলেছিল…এগিয়ে যাও, অবিরাম এগিয়ে চলো। এই মুহূর্তে সামনে চলার বিশ্বজনীন নিয়ম তো বিফল হতে পারে না।

 এই অভ্রান্ত নিয়মের দ্বারা তাড়িত হয়ে খেয়ালের বশে আরও এক কিলোমিটার হাঁটলেন সরু পথ ধরে, আঁকাবাঁকা কিছু অচেনা অজানা পথ যেন তাঁকে আরও বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে, আরও বোধহয় গোলমাল পাকিয়ে ফেলছেন বলে তাঁর মনে  হল।

 অনমনীয় মনোভাব আর দৃঢ় সংকল্পের বলে এগিয়ে চলার পরে তাঁকে থেমে যেতে হল। যে সরু রাস্তা প্রথমে ওপরে উঠছিল এতক্ষণে তা নীচের দিকে নামতে শুরু করল, একই রাস্তা অবশ্যই, কিন্তু শেষপর্যন্ত এতটাই নীচে নেমে গেল যে, পর্যটকমশাই বুঝতে পারলেন, তিনি নেমে এসেছেন এমন এক জায়গায় যেখান থেকে গড়িয়ে আরও তলায় যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

 “বাঃ, বেশ সুন্দর!” – হাসতে হাসতে বললেন, নিজের রসিকতায় মন কিছুটা হালকা হল, তবে এই মনোভাবের মধ্যে যে বৈপরীত্য আছে তা অস্বীকার করা যাবে না। কোথায় আছো, প্রিয় গোলফিন? মনে হচ্ছে, পাতাল প্রবেশ করেছ, তাই না? নীচে কিছু দেখতে পাচ্ছ? কিচ্ছু না, একেবারে শূন্য…ঘাসের চিহ্নমাত্র নেই, বদলে গেছে সমতলের রূপ। এখানে শুধু এবড়ো খেবড়ো পাথর, যেটুকু  জমি  দেখা যাচ্ছে তাতে গাছগাছালির চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না, মরচে ধরা লোহালক্কড়ের টুকরো ছড়িয়ে আছে…আমি নিশ্চয়ই খনিতে এসে পড়েছি…কিন্তু কোনো মানুষের দেখা নেই, চিমনির ধোঁয়া উঠছে না, কোনো আওয়াজ নেই, দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের বাঁশি শোনা যাচ্ছে না, একটা কুকুরও ডেকে উঠছে না…কী করব? একটা পথ এখান থেকে ওপর দিকে উঠে গেছে। ওই পথ ধরব? না কি পেছন দিকে হাঁটব?…পশ্চাদপসরণ?  কী অদ্ভুতুড়ে কান্ড! আমার স্বভাব বদলে ফেলব যেন আমি সেই-আমি নই কিংবা এই রাতের মধ্যেই পৌঁছে যাব সোকার্তেস-এর খনিতে, আমার আদরের ভাইকে আলিঙ্গন করব। এগিয়ে চলো, অবিরাম এগিয়ে চলো।

 এক পা এগিয়ে চলার পর তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন ওই অজানা পথের অমোঘ টানে।

 হে পৃথিবী, এসব কী? আমাদের কী?…এইভাবে আমাকে তুমি গিলে খেতে চাও?…এই অলস পৃথিবী যদি একটু আলো জ্বালাতে চাইতো আমরা নিজেদের মুখ দেখতে পেতাম…আমি নিশ্চিত জানি যে, ওই নীচে নামলে কোনো স্বর্গে পৌঁছতে পারব না। মনে হচ্ছে, এ এক নিভন্ত আগ্নেয়গিরির অংশ…ধীরে ধীরে ধ্বংসাবশেষের এমন শান্ত পথ ধরে হাঁটতে হবে। এটা আবার কী? আঃ! একটা পাথর। বাঁচা গেল। বসার পক্ষে চমৎকার, চাঁদ ওঠা পর্যন্ত এখানে বসে সিগারেট টানা যাবে আরামসে!

 বিচক্ষণ গোলফিন খুব শান্ত মনে বসলেন, হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত পথচারী যেমন বসে বিশ্রাম নেয়, সিগারেট ধরাতে যাবেন এমন সময় কানে এল এক কন্ঠস্বর…হ্যাঁ, মানুষেরই কন্ঠস্বর, দূর থেকে আসছে, একটা বিশ্রী গোঙানি, বলা ভালো, এটা এক বিষাদ-সংগীত, একটা বাক্য ঘুরেফিরে আসছে, রেশটা যেন ‘মোরেন্দো’ সংগীতের অংশ, কিন্তু রাতের নৈঃশব্দ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে, শ্রবণেন্দ্রিয়তে ধরা থাকছে না শেষ পর্যন্ত।

 “ঠিক আছে – তৃপ্ত মনে বললেন পর্যটক — আমাদের মানবতাবোধ আছে; ওটা এক মেয়ের গান; হ্যাঁ, ওই কন্ঠস্বর নারীর, কন্ঠস্বরটি অসামান্য। এখানকার  জনপ্রিয় সংগীত আমার খুব ভালো লাগে। এখন সে নীরব…আমার শুনতে ইচ্ছে করছে, কখন ফের শুরু করবে দেখা যাক, …ওইতো, আবার, আবার শোনা যাচ্ছে। কি মিষ্টি গলা! আহা! প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে। সুরের মায়ায় আমি কেমন বিহ্বল হয়ে যাচ্ছি। মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে সুর আর সেন্যোর গোলফিন, খুব নিষ্ঠাবান ব্যক্তি, পৃথিবীর কুসংস্কারে তাঁর বিশ্বাস নেই, এবার তিনি পরিচিত হবেন মৎস্যকন্যার সঙ্গে, মিশরের বামন-ভূত আর পরীদের সঙ্গে এবং ওদের বাড়ির পাগলামোর সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেবেন…; কিন্তু আমার শ্রবণেন্দ্রিয় যদি তঞ্চকতা না করে তাহলে বলতেই হবে যে, কন্ঠস্বরটি দূরে চলে যাচ্ছে…সুমধুর কন্ঠের গায়িকা চলে যাচ্ছে। এই যে মেয়ে! থামো, একটু দাঁড়াও!”

 অল্পক্ষণের জন্যে মিষ্টি গানের কলি পথহারা পর্যটকের মন ভরিয়ে দিয়েছিল, সে গান অতল অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যেতে যেতে গোলফিনের চিৎকারে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেল। কোনো সন্দেহ নেই যে, পরীর রহস্যময় প্রেমের বিষাদ-সংগীত নির্জনতায় নিয়ে এসেছিল কিছু অপ্রত্যাশিত আনন্দ, সে বোধহয় মানুষের অকস্মাৎ কন্ঠস্বর শুনে ভয় পেয়েছে, অদৃশ্য হয়ে গেল সেই জায়গার গভীর কোনো খাদের ভেতর যেখানে মহার্ঘ পাথরের মধ্যে নিজের মনের মতো ছোট্ট বাসস্থান আছে যেখানে তাকে ঘিরে থাকে অদ্ভুত আলোর ঝরনা।

 “স্বর্গীয় অবস্থা— বিড়বিড় করেন গোলফিন— সিগারেট ধরানোর চেয়ে ভালো কোনো কাজ তার করার নেই। কোনো মন্দ ব্যাপার একশো বছর টিকে থাকে না। ধূমপান করতে করতে অপেক্ষা করতে হবে। আমি পায়ে হেঁটে একা একা খনিতে আসার কল্পনায় মেতে উঠেছিলাম। প্রথমে আমার লাগেজ এসে থাকলে প্রমাণ হয়ে যাবে যে, সেই  ‘এগিয়ে চলো, অবিরাম এগিয়ে চলো-র সুবিধে কত”।

 মৃদু হাওয়া বইতে শুরু করল আর তেওদোরো গোলফিন শুনতে পেলেন কিছু শব্দ, সেই অচেনা পাতালপুরী থেকে উঠে আসছে। কান খাড়া করে কিছু শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তাঁর বুঝতে সময় লাগল যে, কেউ হেঁটে আসছে। দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করলেন:

 -ওগো, পুরুষ বা নারী, যেই হও না কেন, আমাকে বলে দাওতো, এই পথ ধরে কি সোকার্তেস-এর খনিতে যাওয়া যাবে?

 তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই কুকুরের ডাক শোনা গেল, প্রচন্ড রাগে সে ডাকছে, তারপরই এক পুরুষের কন্ঠ, সে বলল:

 -‘চোতো’,’চোতো’, আয়, এখানে আয়!

 -এঃ!- পর্যটক চেঁচিয়ে উঠলেন— হে বন্ধু, সমস্ত দানব কুলের প্রতিনিধি অথবা যে হও না কেন, এই কুকুরটাকে তাড়াতাড়ি বাঁধো, আমি শান্তি প্রিয় মানুষ ভাই!

 -‘চোতো’, ‘চোতো’!

 গোলফিন দেখলেন যে, তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে বিশাল কালো একটা কুকুর, সামনে এসে গোঁ গোঁ করে তার প্রভুর ডাকে পিছিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে পর্যটকমশাই একটা মানুষের ছায়া দেখতে পেলেন, অভিব্যক্তিহীন এক নিশ্চল পুরুষ, পাথরের খেলনা পুতুল, সে  দাঁড়িয়ে আছে, দশ গজ দূরে হবে, নীচে অবশ্য, দাঁড়িয়ে আছে সেই সরু রাস্তায় যেটা সেই পাতালের দিকে এঁকেবেঁকে নেমে গেছে। সেই পথ আর মানুষটি মনোযোগ আকর্ষণ করল তাঁর, তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন;

 -ঈশ্বর সহায়! শেষ পর্যন্ত সেই পাগলিনীর আবির্ভাব ঘটল। এবার আমরা বুঝতে পারব কোথায় আছি। আমি ভাবতে পারিনি যে, আসল রাস্তার এত কাছাকাছি এসে গেছি। কিন্তু এতো সরু রাস্তা নয়, এটা বড়ো রাস্তা! …হ্যালো বন্ধু! বলতে পারবে আমি কি সোকার্তেস-এ এসেছি?

 -হ্যাঁ, সেন্যোর, খনি, এইতো সব খনি, মূল কারখানা থেকে আমরা একটু দূর আছি।

 এই কন্ঠস্বর এক তরুণের, তাকে বেশ অমায়িক মনে হয়, কথা শুনে মনে হল সে  স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে পারে। তার কথা শুনে ভালো লাগল পর্যটকমশাইয়ের, ভালো লাগল পরিষ্কার আকাশ, অন্ধকার ছিন্ন করেছে চাঁদের আলো, মাটি দেখা যাচ্ছে, তাঁর আনন্দ হচ্ছে কারণ এবার সঠিক পথে তিনি যেতে পারবেন।

 -আলো! আলো! —নামতে নামতে বললেন পর্যটক— মনে হচ্ছে যে, আদিম পৃথিবীর অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে আসছি, এতক্ষণে বাস্তব অবস্থায় আমি আসছি…ভালো বন্ধু, তুমি আমাকে যা বললে তার জন্যে ধন্যবাদ জানাই, আরও কিছু তোমার কাছে জানতে হবে…সূর্য ডোবার পর ‘ভিইয়ামোহাদা’(আক্ষরিক অর্থ ‘ভেজাগ্রাম’) থেকে বেরিয়েছিলাম। সবাই বলেছিল, এগিয়ে যাও, অবিরাম এগিয়ে যাও…

 -আপনি কি মেন বিল্ডিংটায় যাবেন? —নিশ্চল ঋজু রহস্যময় যুবক জিগ্যেস করল, সে ডাক্তার-পর্যটকের দিকে তাকায়নি।

 -হ্যাঁ, সেন্যোর, কিন্তু আমি ভুল রাস্তায় চলে এসেছি।

 -খনির প্রবেশপথ এটা নয়; রাবাগোনেস-এর মোড়ে যাবার পথ এটা, সেখানে আছে বড়ো রাস্তা, ওখানে রেললাইন পাতার কাজ চলছে, সেখান থেকে দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবেন মূল জায়গায়, এখান থেকে যেতে সময় লাগবে, বেশ দূর আছে জায়গাটা, রাস্তাও খুব খারাপ, খনির শেষ প্রান্তে এসে গেছি আমরা, অনেকগুলো খাড়াই আর সুড়ঙ্গ আমাদের পার হতে হবে; নীচে নামতে হবে; শেষে সোকার্তেস-র সব খনি ঘুরে আমাদের যেতে হবে, এক প্রান্ত থেকে অন্য এক প্রান্তে, সেখানে আছে কর্মশালা, বয়লার, যন্ত্রপাতি, ল্যাবেরটারি, অফিস।

 -তাহলে বলো, আমার ভুলটা খুব সরল, তাই না? —গোলফিন হাসতে হাসতে বলেন।

 -আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে আমার খুব ভালো লাগবে, এসব অঞ্চল আমি খুব ভালো চিনি।

 উঁচু নিচু পথে হোঁচট খেতে খেতে চলেছেন গোলফিন, শেষে সোজা পথ পেলেন, প্রথমেই সেই সহৃদয় যুবককে ভালো করে দেখলেন। অবাক হয়ে ডাক্তার অল্প কিছুক্ষণ থামলেন।

 -তুমি…অস্পষ্ট উচ্চারণ।

 -আমি অন্ধ, হ্যাঁ, সেন্যোর— যুবক বলে— কিন্তু চোখে না দেখেও এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরতে পারি, আমার লাঠি হোঁচট থেকে আমাকে বাঁচায়, ‘চোতো’ আমার সঙ্গী, নেলা না থাকলে ওই আমার সহায়। আপনি আমাকে অনুসরণ করুন, আমি ঠিক নিয়ে যেতে পারব।

ক্রমশ… মারিয়ানেলা পর্ব-২

Tarun Kumar Ghatak
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ ভাষায় প্রাক্তন শিক্ষক ও  হিস্পানিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদক।  ‘দনকিহোতে’ এবং  ‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ সহ বিয়াল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদক। ‘দনকিহোতে’ লীলা রায় স্মারক পুরস্কার অর্জন করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর অনুদিত গল্প কবিতা ছাড়াও প্রকাশিত হয় স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

2 comments

  • Krishna Gangopadhyay

    খুব ভালো লাগলো। গোলফিনের সাথে ওই রহস্যময় রাস্তায় আমরাও সঙ্গী। চোখের সামনে সন্ধ্যার পাহাড়ি পথ ফুটে উঠছে….পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

  • Khub bhalo laglo.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *