ভাল ফ্যাসিস্ট হবার সহজ উপায় (পর্ব ৯)

বাংলা English
Rui Zink
 Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over. 
 Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc. 
Manual Do Bom Fascista
Manual Do Bom Fascista

পাঠ ৪৬

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট যে সবসময় ইহুদিদের ঘেন্না করে তা কিন্তু নয়  

অদ্ভুতভাবে সে ওটা করে বামপন্থীদের সঙ্গে সামঞ্জস্য[1] রেখে, বা তাদের উল্টোদিকে[2] গিয়ে। তারা তো দুর্বলদের খুব ভালবাসে, কিংবা কল্পনা করতে ভালবাসে যে তারা দুর্বলদের ভালবাসে। একজন ভাল ফ্যাসিস্ট আবার ধরে নিতে বেশি ভালবাসে। আর একজন ভাল ফ্যাসিস্ট ধরে নেয়। সে ধরে নেয় যে সে শক্তির তারিফ করে আর সে (তাকে আপনারা বোকাও বলতে পারেন) শক্তিশালীদের দিকে থাকাটা পছন্দ করে।    

         উজবুকগুলো ভিক্টিমদের খুব পছন্দ করে, হাঁদাগুলো বুকে কার্নেশান[3] লাগান কলকাতার মাদার টেরিজ়ার থেকেও খারাপ। আর এখন বামপন্থীদের নয়নের মণি হল পালেস্তিনীয়রা।

         এবার একদিকে যদি সব ধরণের সংখ্যালঘুদের ঘেন্না করাটা একজন ভাল ফ্যাসিস্টের সবচেয়ে বড় খুশির কারণের একটা হয়, তাহলে অন্যদিকে আবার ইজ়রায়েল যে বামপন্থীদের এতটা অস্বস্তিতে ফেলছে এই সাধারণ সত্যিটা একজন ভাল ফ্যাসিস্টের মনমেজাজ ভাল করে দেয় – তার মনটা একটু নরম করে দেয়।      

         কি করণীয়, তাহলে কি করণীয়?

         ভাল ফ্যাসিস্ট একটা মাঝামাঝি পথ খুঁজে বের করে। হ্যাঁ, সে এখনও বিশ্বাস করে যে শরণার্থীদের আমদানি করে জাতির কাঠামোটাকে নষ্ট করাটা একটা সমকামী-ইহুদি চক্রান্ত; কিন্তু একই সঙ্গে সে শ্রীযুক্ত নেতান্যিয়াহুর কার্যক্ষমতা, শক্তি, দৃঢ়চরিত্রের তারিফ করে। এমনকি প্রাচীন ও ভাল সনাতন অস্বীকৃতিবাদও তাকে ইজ়রায়েলকে আরো একটু ভাল চোখে দেখতে সাহায্য করে: ওই শিবিরগুলোতে “ঠিক এইরকমই” হয়ত হত না আর “এতজনও কিন্তু মরেনি”, “বেশির ভাগই অবশ্য রোগে ভুগে মরেছে, কথাটা বিজ্ঞানসম্মত, আমি নয়ত আমার কিরকম একজন ভাই এটা পড়েছে”, কিন্তু এখন একজন ভাল ফ্যাসিস্ট এটা মানে যে লোকে যাই বলুক না কেন, “আরবগুলো[4] এক্কেবারে ওদের হাতের মুঠোয়”।    

         হ্যাঁ, একজন ভাল ফ্যাসিস্ট ইহুদিদের ঘেন্না করে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি সে জয়ীদের পছন্দ করে। জয়ীদের জন্যে তার স্বপ্নদোষ হয়, আর সেটা একটাই মাত্র কারণে: ওরা যা ইচ্ছে তাই করে।      

পাঠ ৪৭

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কোনরকম মতবাদ চায় না

এইসব মতবাদই সবকিছু শেষ করে দেয়। “ওগুলো আমাদের ওপর এমন সব মূল্যবোধ চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করে যেগুলো আমদের নয়”, বুদ্ধিজীবীর (এরাও আছে বটে) হাবভাব দেখিয়ে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট বলে।

         কারণ একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কোন মতবাদ নেই। মূল্যবোধ আছে।

         একজন ভাল ফ্যাসিস্ট রাজনীতিতেও নাক গলায় না। বিশেষ করে সে যখন রাজনৈতিক প্রচার চালায়।

         ওইসব সময়ে, যখন রাজনৈতিক প্রচার চালায় (মানে সবসময়েই), একজন ভাল ফ্যাসিস্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে:

         “রাজনীতিই এই সবকিছু শেষ করে দেয়!”

         কোন কোন সময়ে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট প্রায় কাব্যিক হয়ে পড়ে।

         “আমাদের সবাইকার সঙ্গে একজোট হওয়া দরকার!”

        “জাতি হিসেবে আমাদের একে অন্যের জন্যে থাকতে হবে।”

        “আর আমরা কেন সবাই একই দিকে কাজ করতে পারব না?”, একজন ভাল ভাবপ্রবণ (এরাও আছে বইকি) ফ্যাসিস্ট প্রশ্ন করে। সঙ্গে এটাও প্রায় বলে ফেলে:

         “আমরা কি সবাই বন্ধু হতে পারি না?”

        “যদি আমাদের বাচ্চারা বুড়োবুড়িদের সম্মান করত তাহলে কি ভালই না হত, তাই না?”, একজন ভাল নীতিবাগীশ (এরাও কিন্তু আছে) ফ্যাসিস্ট বলে। “আগের মত যদি সম্মান থাকত তাহলে কি আরো ভাল হত না?”

         একজন ভাল ফ্যাসিস্ট জানে সে কি বলছে। কেন? কারণ সে আমাদের প্রথাগুলো ভাল করে জানে।

         “না, না, আমাদের সবচেয়ে সুন্দর প্রথাগুলো”, ভুল শুধরে দেয় সুন্দরের পূজারী একজন ভাল ফ্যাসিস্ট।

         ওদিকে আবার একজন ইতিহাসবিদ ভাল ফ্যাসিস্ট যোগ করে: “আরে শালা, আগেকার দিনে সবকিছুই আরো ভাল ছিল, এমনকি অতীতটাও!”  

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত

তৃতীয় পর্ব

শব্দ কিসের জন্যে?

“রাজনীতিবিদেরা একটা নির্বাচনী বিকৃতি!”

লেখকের নাম অজ্ঞাত

*

“ভণ্ড, ল্যাদখোর, অমনোযোগী!”

ছদ্মনামে লেখা

পাঠ ৪৮

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট পাঠকও বটে

কিন্তু সাবধান: একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কখনই পড়ে না, এটা কিন্তু তার ইজ্জতের সওয়াল। কেউ ওকে কখন বিশ্বসংসার ভুলে পড়তে দেখবে না, ওটাই কেবল বাকি ছিল আর কি!

         “পড়া বিরক্তিকর, পড়াশুনো করাটা কিছুই নয়”, পেসোয়া[5] বলেছিলেন না? হ্যাঁ, কিন্তু পড়াটা খুব খারাপও বটে: পোর্তুগিজ়দের যেসব সমস্যায় সত্যিকারের আগ্রহ আছে, সেগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়।

         পাহারা দেবার মিনারে বসে কোন সিপাই যদি বই পড়ে তাহলে সে হঠাত আক্রান্ত হতে পারে। পাহারা দেবার মিনারে বসে কোন সিপাই যদি বই না পড়ে তাহলে সে হঠাত আক্রান্ত হতে পারে না। ব্যাপারটা ঠিক এটাই।

         এইজন্যেই একজন ভাল ফ্যাসিস্ট সদা-প্রস্তুত, তার কাছে কোথায় লাগে ওই বহুদিন চলে এমন ব্যাটারি লাগান পরিশীলিত পারমাণবিক ভাইব্রেটার। যাতে হঠাত করে কোন আক্রমণ তাকে অবাক করে না দিতে পারে।  

         এটা বলা সত্ত্বেও, আর আগে যা যা বলা হয়েছে সেই অনুযায়ী, এখন না পড়লেও একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কিন্তু আগে পড়েছে। পড়া এমন একটা ক্রিয়াপদ যা্র ধাতুরূপ একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কাছে সর্বদাই অতীতকাল। এমন একটা অতীত যেটা সর্বদাই অতীত কাল, হয় সাম্প্রতিক নয়ত আরো দূরবর্তী, কিন্তু যে কালে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট সেইটা করেছিল যেটা ও বলে যে করেছিল: পড়েছিল। কিন্তু বর্তমানকালে পড়া – কিংবা ভবিষ্যতকালে? ওইটাই খালি বাকি আছে! পড়লে, সেটা ভবিষ্যতেই হোক বা এমনকি বর্তমানেও, একটা ঘাটতি মেনে নেওয়া হবে। সেটা হলে বিশ্বে এমন একটা কিছুর অস্তিত্ব ধারণা করা হবে যেটার বিষয়ে সে জানে না। আর একজন ভাল ফ্যাসিস্ট জানে। 

         এমন কিছু নেই যা সে জানে না। আর সেটা কেন?

         আবার কেন, কারণ সে পড়েছে।            

পাঠ ৪৯

আরো ভাল একজন ফ্যাসিস্ট কখনই কোন বই পড়েনি

আর তাতে জগতের খুব একটা ক্ষতি হয় না, এমনকি বেচারা বইদের মতেও খুব সম্ভবত না। এটা খুব সত্যি: বইয়ের ব্যাপারে আমরা কি ভাবি তা আমরা জানি, এমনকি যেগুলো আমরা পড়ি না সেগুলোর ব্যাপারেও। বেশ, তাহলে সত্যি কথাটাই বলা যাক, হেহেহে: বিশেষ করে যে বইগুলো আমরা পড়ি না।  

         কিন্তু বইরা আমাদের নিয়ে কি ভাবে সে ব্যাপারে আমরা কি জানি? আমি ঠাট্টা করছি না। যদি বইরা কথা বলতে পারত তাহলে তাদের অভিযোগ শুনতেও আমাদের ভাল লাগত না, যখন তারা এমন একটা কি দুটো পাঠককে ধরত যাদের হজম করা কঠিন:

         “বাঁধাই-করার ঈশ্বরের কাছে আমি কি অপরাধ করেছিলাম যে আমায় এরকম সব পাঠক সহ্য

        করতে হচ্ছে?”

         আচ্ছা, আমরা তো দেখেইছি যে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট পড়ে না – পড়েছে। এবার আমরা দেখব যে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট যদি না পড়ে তো একজন আরো ভাল ফ্যাসিস্ট আরো দূরে যায়: আরো ভাল ফ্যাসিস্ট না পড়ার বড়াই করে।

         সেটা এমনকি এইজন্যেও যে পড়া মনকে দুর্বল করে দেয় (খুব কম লোকই এটা জানে)। পড়া আত্মাকে অবশ করে দেয় (এটা প্রায় কেউই জানে না)। পড়া আমাদের সংস্কৃতিকে নিঃস্ব করে দেয় (আর কেউই যে এটা জানে না সেটা অবিশ্বাস্য, সিস্টেমটাকে বয়কট করলেই শুধু এটা সম্ভব)।  

         আর, আমরা যদি ভাল করে ভেবে দেখি, তাহলে ব্যাপারটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। সত্যি বলতে কি, পোর্তুগাল তৈরি করার সময়ে দন্ আফন্সো এনরিকশ[6] কি বই পড়তেন? কিংবা মূরদের হাত থেকে লিসবন উদ্ধার করার সময়ে মার্তিঁ মুনিশ[7] যখন দরজার ফাঁকে আটকে গিয়েছিলেন? কিংবা দঁ সেবাস্তিয়াঁও[8] যিনি আরো গৌরবের খোঁজে আলকাসের-কিবিরে গিয়েছিলেন? অ্যাঁ?  

         সেই তো!

          [অনুশীলনী: নিজের সামনে একটা বই রাখুন, যোগব্যায়াম করার মাদুর আর পিলাটিস বলের পাশে, তারপর সেটাকে   না খোলার চেষ্টা করুন। আস্তে আস্তে শুরু করুন, ছোট ছোট সেটে ভাগ করে, তারপর সেটাকে বাড়াতে থাকুন যতক্ষণ   না বইটাকে বিনা আয়াসে পড়তে না পারেন। এই অনুশীলনীটা বই ছাড়া করবার জন্যে যতবার প্রয়োজন ততবার করুন।]   

ফ্যাসিস্ট যুগ

সঠিক আচরণের বন্ধুমণ্ডলী[9] (সঠিক আচরণ সাধারণত ব্যবহার করা হয় ল্যাজ গুটিয়ে পালানর জন্যে) নামের আমোদ-প্রমোদের দলটা “ফ্যাসিজ়ম”-কে বিশ শতকের প্রথমার্ধের ইতিহাসের একটা বাস্তব ঘটনা বলে চিহ্নিত করেন আর তাও – সত্যিই কিন্তু তাঁরা এটা মনে করেন – মাত্র দুটো দেশে, ইটালি আর জার্মানি। তার ফলে ফ্রাঙ্কোর স্পেন আর সালাজ়ারের পোর্তুগাল এর থেকে বাদ চলে যায়। আর ডঃ পিনোশের চিলিও, কারণ সেটা তো খেলায় নেমেছে অন্য একটা যুগে – ১৯৭৩ সালের এগারোই সেপ্টেম্বার –, অদৃষ্টের অম্লমধুর পরিহাসে পঁচিশে এপ্রিলের প্রায় ন’মাস আগে। আমরা বলতেই পারতাম যে আমাদের বাচ্চাটা আসলে অন্যদের[10] যদি না ওই দুটো সামরিক অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য আর পরিণাম একেবারে উল্টো হত। একটা হয়েছিল বন্ধ করার জন্যে আর অন্যটা খোলার জন্যে।  

          সীমিত করার এই দর্শনটার বিপরীতে অন্য একটা দর্শন আছে যেটা সবকিছুকে নিয়ে চলতে চায় অনেকটা ইউজেনিও দ’অরসের[11] (১৯৪৪) “বারোক[12]” সম্পর্কে চিন্তাভাবনার মত: কোন একটা সুনির্দিষ্ট কালকে এই নাম না দিয়ে বরং আরো বিস্তৃত কিছু একটার চিন্তা করা।  

          এমন কিছু একটা যা ধ্রুব কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে নিঃশেষিত হয় আবার ক্ষণে ক্ষণে ফিরে আসে: একটা যুগ, একটা রেখা, বিপরীতের সঙ্গে সংলাপরত, এই ওপরে তো এই নীচে।            

          হৃদয় সিস্টোলিক আর ডায়াস্টোলিক গতির মধ্যে দোদুল্যমান, এই সঙ্কুচিত হচ্ছে তো পরক্ষণেই শিথিল হচ্ছে। আমাদের সমাজগুলোও খোলা আর বন্ধ করার দুটো স্পন্দনের মধ্যে ভাসমান।

          সংজ্ঞা অনুযায়ী, মুক্ত সমাজেরা সুখের অভিলাষী বেশি হয়, কারণ তাদের মুখটা জগতের দিকে, জীবনের দিকে, জীবনের ভাল জিনিশের দিকে ঘোরান থাকে।  

          স্টিভেন স্পিলবার্গের ই.টি. (১৯৮২) কিংবা জন কার্পেন্টারের স্টারম্যান (১৯৮৪) – এই ফিল্ম দুটো অন্যের দিকে নিজেকে খুলে দেওয়াটা শুরু করে, হয়ত একটু বেশিই সরল খোলামনে, একটু বাড়াবাড়ি রকম আদর্শবাদী ও উদার প্রকৃতির হয়ে, কিন্তু আমি যতদূর জানি, একটা কল্পিত কাহিনীতে এটা অবশ্যম্ভাবী ভুল নয়। ই.টি.-তে একটা ছোট বাচ্চা ভিনগ্রহের একটা ছোট্ট অভিবাসীর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতায় আর, যে বড়রা ওকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখতে চায়,  তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে আদেশ অমান্য করে ছোট্ট শরণার্থীটিকে সাহায্য করে, যেটা খুবই ভাল। স্টারম্যান-এ একজন অল্পবয়েসি বিধবা তার স্বামীর রূপ ধরা একটি ভিনগ্রহের প্রাণীকে শয্যাসঙ্গী করে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে আর বাচ্চাটার (আমি যতদূর জানি সে একটা সঙ্কর প্রজাতির ঘনফল হবে) মধ্যে দুজনেরই বৈশিষ্ট্য থাকবে আর তার জন্যে জগতের কোন ক্ষতি হবে না বরং তার ঠিক উল্টোটা। জিজ্ঞেস করতে ক্ষতি নেই: ঈশ্বর ও একজন মানবীর সন্তান যীশুও কি তাই নন? ডেইলি শো-এর ট্রেভোর নোয়ার চেয়েও বেশি বিখ্যাত, প্রথম সঙ্কর প্রজাতির তারকা?   

          কিন্তু বদ্ধ সমাজগুলো বিশেষ করে আবার ভয়ের, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার, বহিরাগত কিছুর বিরুদ্ধে আগ্রাসী তাড়নার বশবর্তী হয়ে চলে; বহিরাগত মাত্রেই হুমকি, বেশিরভাগ সময়েই সেটা যে আসলে ভাল তা মনে করা হয় না।

          যদিও স্টারম্যান-এ যা যা উপাদান আছে মোটামুটি তাই দিয়েই এলিয়েন-এ আতঙ্কের সৃষ্টি করা হয়। হ্যাঁ, এখানেও কয়েকজনকে (এমনকি দুই লিঙ্গের মহাকাশচারীদেরকেও) ভিনগ্রহের বাসিন্দারা গর্ভবতী করে দেয়, কিন্ত পরিণাম  খুব একটা ভাল বলে মনে হয় না আর সিজ়ারিয়ানটা কিছুটা অযত্ন করে করা। এছাড়াও একটা অদ্ভুত সমাপতন আছে:  যে শব্দটাকে আজ আমরা ওই দানবের সঙ্গে চিহ্নিত করি যার জিভেও দাঁত আছে (সিনেমা যতদিন সত্যিকারের পপ আর্ট ছিল তখন এটাই ছিল তার শক্তি), ইংরিজিতে সেই শব্দটার অর্থ “বিদেশী”। এই ফিল্মগুলোতে অপরিচিত কোন কিছুই সবার আগে একটা হুমকি আর, আমরা যদি তাকে ঢুকতে দিই (আমরা যদি কোন দেওয়াল না তুলি) তাহলে  চোখের নিমেষে সেটা আমাদের ধ্বংস করে দেবে –, আর তার চেয়েও ভয়ঙ্কর যেটা তা হল আমাদের জীবনের চেয়েও ওটা আমাদের জীবনধারা-কে বিপন্ন করে তুলবে।  

          কে বলেছে ভাষা পর করে দেয় না?

          আর জগত আর অন্যদের দেখার এই দুটো ধরণ কেবল মাত্র একটা সময়ের মধ্যে আটকে থাকে না, এগুলো হচ্ছে এমন দুটো প্রবণতা যেগুলো সমানে নেচে চলে। দ’অরস আর স্টিফেন কিং যদি নকশাটা জুগিয়ে থাকেন তো উমবের্তো একো ১৯৯৭ সালের একটা লেখায় স্পষ্টভাবে “আদি-ফ্যাসিজ়ম”-এর কথা বলেন: সুপ্ত সব বৈশিষ্ট্য, যেগুলো অনুকূল পরিস্থিতিতে আবার দেখা দিতে পারে। খুব সম্ভবত গুহাবাসীদের সময়েও এমন লোক ছিল যারা গজগজ করত যে দেওয়ালে আঁকিবুঁকি কাটাটা সময় নষ্ট করা, সেটা কেবল দেওয়ালগুলোকে নোংরা করে। আর ভাল্লুকের ছবি না এঁকে শিল্পী-র উচিত ভাল্লুক শিকারে সাহায্য করা।  

          সুতরাং, মানসিক ও নৈতিক ভাবে কুঁকড়ে যাওয়ার খুব বিশ্রি একটা ধরণকে আমরা, বৈশিষ্ট্যের বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিয়ে, “ফ্যাসিস্ট” বলতে পারি।

          ফ্যাসিজ়ম কি আমাদের মধ্যে উপস্থিত আছে? ভাল প্রশ্ন। কিন্তু আমার মনে হয় আরো ভাল একটা প্রশ্ন আছে: ফ্যাসিজ়ম কি আমাদের ভেতরে আছে?                 

পাঠ ৫০

আরো ভাল একজন ফ্যাসিস্টের হাতে সময় নেই

আর দঁ সেবাস্তিয়াঁওয়ের সভায় বসে কাময়েঁশ[13] যে তাঁকে নিজের মুখে উশ লুজ়িইয়াদাশ পড়ে শুনিয়েছিলেন সেই গল্পটাও কিন্তু ঠিক নয়। আর সেটা যদি সত্যিও হয় তাহলে ব্যাপারটা তো এই: রাজা তো শুনেছিলেন, পড়েননি তো। আর তাছাড়া এখানে যখন আমাদের কথা শোনার কেউ নেই, তখন ওই মহাকাব্যটা যে ঝুল সেটা বলা যেতেই পারে। আমাকে ভুল বুঝবেন না। বইটা মহৎ – পদ্যে আমাদের সামুদ্রিক অভিযানের ইতিহাস -, কিন্তু একই সঙ্গে একঘেয়েও। খুব সম্ভবত ওই নবম সর্গ (স্পয়লার অ্যালার্ট), যেটাতে বেশ ভাল ভাল মেয়েছেলে আছে, আর “আদামাস্তোর[14]”-এর জায়গাটা, যেখানে ওকে একজন অহঙ্কারী মেয়েমানুষ  কিভাবে টুপি পরিয়েছিল সেটা বলা হয়েছে, এই দুটো অংশ ছাড়া।  

         তা বলে আরো ভাল একজন ফ্যাসিস্ট ওই ফালতু (ঝুল) বইটা পড়েনি কিন্তু। স্বীকার করছে, পড়েনি। আরো ভাল একজন ফ্যাসিস্ট সব সময়ে কেবল এটাই মনে করে না যে গল্পটা খুব বাজে ভাবে বলা হয়েছে; আরো ভাল একজন ফ্যাসিস্টের মেজাজটা যখন ভাল থাকে (অর্থাৎ কালেভদ্রে) তখন সেও স্বীকার করে।

         কিন্তু কেন পড়েনি?

         “আরে মশাই, সময় কোথায়?”

         আর, আশ্চর্যের বিষয় বা তাও হয়ত নয়, আরো ভাল একজন ফ্যাসিস্ট এ ব্যাপারে অনেক ভাল ভাল লোকের মতই বলে যে সময়ের অভাবে তারা পড়তে পারে না।

         আরো ভাল একজন ফ্যাসিস্টের হাতে সময় নেই। ওর হাতে যদি সময় থাকত – অথবা ওর হাতে যদি সময় থেকে থাকত – তাহলে হয়ত ওর হাতে সময় থাকত। কিন্তু ওর সময় হত না বলে ওর সময় ছিল না। আর যেহেতু “ওর অনেক কাজ আছে”, তাই ওর নেই। সময়।   

         যাই হোক, জগতের আর বই পড়ার লোকের দরকার নেই, বই তৈরি করার লোকের প্রয়োজন।            

         “করা”-টা আরো একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই “পড়া” নামে সময় নষ্ট হওয়ার চেয়েও, যেটা কিনা এইসব লোকেদের যাদের নষ্ট করার মত সময় আছে তাদের বৈশিষ্ট্য। 

ক্রমশ… 


[1]ফ্যাসিস্টরা বরাবরই ইহুদি-বিদ্বেষী ছিল কিন্তু বামপন্থীরা তা কখনই ছিল না। কিন্তু এখন পাশ্চাত্যের বামপন্থীরা ইহুদিভূমি ইজ়রায়েলকে পছন্দ করে না কারণ প্যালেস্তিনীয়রা এখন কমজোরি; অর্থাৎ বামপন্থী ইউরোপীয়দের ইহুদি-বিরোধিতার একটা খুব ভাল অজুহাত আছে – এমনটা নয় যে তারা ইহুদিদের পছন্দ করে না কিন্তু “তারা” যে বেচারা প্যালস্তিনীয়দের ওপর জঘন্য অত্যাচার করে। এখন পোর্তুগাল আর ব্রেজ়িলের দক্ষিণপন্থীরা ইহুদিবিদ্বেষী হওয়া সত্ত্বেও ইজ়রায়েলের দক্ষিণপন্থী সরকারকে সমর্থন করে কারণ এই সরকার প্যালেস্তিনীয়দের অর্থাৎ মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে; এটাই একটা সামঞ্জস্য – দক্ষিণপন্থীরাও ইহুদিবিদ্বেষী, আবার বামপন্থীরাও ইহুদিবিদ্বেষী।      

[2]দক্ষিণপন্থীরা বরাবর শুধু শক্তিধরদেরই পছন্দ করে এসেছে আর তার উল্টোদিকে বামপন্থীরা কেবল দুর্বল কমজোরিদেরই চিরকাল পছন্দ করে। 

[3]পোর্তুগালে ১৯৭৪ সালের ২৫শে এপ্রিল যে অভ্যুত্থানের ফলে দীর্ঘ চল্লিশ বছরের স্বৈরতন্ত্রী শাসনের অবসান ঘটে।এই অভ্যুত্থানকে কারনেশান রেভোলিউশান বলা হয় এবং কারনেশান এই অভুত্থানের প্রতীক; এখনও ২৫শে এপ্রিল পোর্তুগিজ়রা লাল কারনেশান ফুল বুকে লাগায়। এই ফুল বুকে লাগানর অর্থ এই অভ্যুত্থানের মূল্যবোধকে সম্মান করা। মাদার টেরিজ়ার বুকে লাল কারনেশান লাগানর তাৎপর্য একজন রোমান ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী গরীবদের ভালবাসার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিজ়মেও আস্থা রাখেন।        

[4]পোর্তুগালে স্বৈরতন্ত্রীদের কাছে মুসলমান ও আরবজাতি সমার্থক, এবং তারা সবাই সন্ত্রাসবাদী। 

[5]পোর্তুগালের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন ফির্ণান্দু পেসোয়ার (১৮৮৮-১৯৩৫) “স্বাধীনতা” (Liberdade) নামের একটি কবিতার দুটি পংক্তি: আঃ কি আনন্দ/ কোন কর্তব্য না করার,/পড়ার জন্যে বই থাকলেও/সেটাকে না পড়ার!/পড়া বিরক্তিকর/লেখাপড়া করাটা কিছুই নয়,/সাহিত্য ছাড়াই/সূর্য আলো ঝলমলায়। 

[6]D. Afonso Henriques (১১০৬-১১৮৫) – স্বাধীন পোর্তুগালের প্রথম রাজা; ১১২৮ সালে কোন্দ দ্য পোর্তুকালেন্সে হিসেবে লিয়ন রাজ্য থেকে নিজের কোন্দাদু বা করদ রাজ্যকে বিচ্ছিন্ন করে পোর্তুগালকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। এই স্বাধীনতা অবশেষে ১১৪৩ সালে স্বীকৃত হয়।     

[7]কিংবদন্তি অনুযায়ী ১১৪৭ সালে দন্ আফন্সো এনরিকশের নেতৃত্বে যে ক্রিশ্চান সেনাবাহিনী মুসলমানদের হাত থেকে লিশবোয়া বা লিসবন উদ্ধার করেছিল Martim Moniz সেই বাহিনীতে একজন নাইট ছিলেন। কাশ্তেলু দুশ মোরুশ, যা এখন কাশ্তেলু দ্য সাঁও জর্জ নামে পরিচিত, দখল করার সময়ে কেল্লার একটা ফটক সামান্য খোলা দেখে তার ফাঁকে নিজের শরীরটা আটকে দিয়ে সেটাকে বন্ধ করতে বাধা দেন; এইভাবে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েও বাকি সৈন্যদের কেল্লায় ঢোকাটা নিশ্চিত করেন।     

[8]D. Sebastião (১৫৫৪-১৫৭৮) – খ্রিস্টধর্মে গোঁড়া বিশ্বাসী পোর্তুগালের এই রাজা চোদ্দ বছর বয়েসে সিংহাসনে বসেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এর দশ বছর পরে উত্তর আফ্রিকার আলকাসের-কিবিরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ  হারান। কিন্তু তাঁর দেহ মৃতদেহের স্তূপে চাপা পড়ে যাওয়ার ফলে খুঁজে পাওয়া যায়নি; এই কারণে এরকম একটা বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি জীবিতই আছেন এবং পোর্তুগালের দারুণ সঙ্কটের সময়ে তিনি এক কুয়াশা-ঢাকা ভোরে মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দেশকে উদ্ধার করবেন। অনেকটা আমাদের নেতাজীর মত।  

[9]এঁরা হলেন সেইসব দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবী যাঁরা খুব কঠোর ভাবে নিয়ম পালন করার ভান করেন সত্যিটাকে আরো ভাল করে বিকৃত করার জন্যে আর মানুষকে ভুল বোঝানর জন্যে।

[10]চিলির সামরিক অভ্যুত্থানের সাড়ে সাত মাস পরে পোর্তুগালে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। তাই পঁচিশে এপ্রিলের অভ্যুত্থান এগারই সেপ্টেম্বরের বাচ্চাও হতে পারত কিন্তু হয়নি তার কারণ দুটো অভ্যুত্থানই সামরিক হলেও তাদের উদ্দেশ্য আর পরিণাম ছিল একেবারে উল্টো – চিলির অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা আর লিসবনের অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। দুটো অভ্যুত্থানই নিজেদের লক্ষ্যে সফল হয়েছিল।  

[11]Eugeni d’Ors i Rovira(১৮৮২-১৯৫৪) – কাতালুনিয়ার ফ্রাঙ্কোপন্থী একজন লেখক, সাংবাদিক, দার্শনিক ও শিল্পসমালোচক। 

[12]ঐতিহাসিক ভাবে দক্ষিণ ইউরোপের শিল্পসাহিত্যে ১৭ ও ১৮ শতক ছিল বারোক যুগ। কিন্তু এছাড়াও একটা চিরন্তন বারোক আছে যা চিরন্তন ধ্রুপদীর সঙ্গে মিলে চন্দ্র ও সূর্য, দিন ও রাতের মত পর্যায়ক্রমে ফিরে ফিরে আসে। এই চিরন্তন বারোক তার পক্ষে অনুকুল এমনসব জায়গাতেই আসে – যেমন উঁচু পাহাড়েই বরফ পড়ে; এছাড়াও সেটা একটা শক্তি, বাতাসের মত, যা আসে আর যায়। আর কোন কোন যুগে সেটাই প্রধান হয়। যে কোন উৎসব বা সঙ্কটের মত আমাদের দুর্গোৎসবও (লেখকের মতে) বারোক; শৃংখলা ও সমণ্বয় ধ্রুপদী। এ যেন ব্যাক্কাস বনাম অ্যাপোলো।    

[13]Luiz Vaz de Camões (১৫২৩/২৪-১৫৭৮) – পোর্তুগালের জাতীয় কবি, পোর্তুগালের মহাকাব্য উশ লুজ়িইয়াদাশ রচনা  করেছিলেন।  

[14]উশ লুজ়িইয়াদাশ-এর পঞ্চম সর্গে মহাকবি কামঁয়েশ আদামাস্তোর নামের একজন দানবের চরিত্র সৃষ্টি করেন। এই দানবকে গ্রীক পুরাণের টাইটানকন্যা টেথিসের প্রণয়প্রার্থী হওয়ার অপরাধে যেখানে অতলান্তিক আর ভারত মহাসাগর এসে মিলেছে, সেই ঝটিকা অন্তরীপে (কাবু দাশ তরমেন্তাশ, ভাশকু দা গামা যার নোতুন নাম দেন কাবু দা বোয়া শ্পেরান্সা বা উত্তমাশা অন্তরীপ) সমুদ্রের গভীরে ছুঁড়ে ফেলা হলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে আর প্রবল ঝড়ের আকার ধারণ করে নিজের বিদ্রোহ প্রকাশ করে। যেসব জাহাজ তার সাম্রাজ্য, এই অন্তরীপ, পার হবার চেষ্টা করত তাদেরই সে ঝড় হয়ে ডুবিয়ে দিত।     

ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *