ভাল ফ্যাসিস্ট হবার সহজ উপায় (পর্ব ৮)

বাংলা English
Rui Zink
   Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over. 
 Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc. 
Manual Do Bom Fascista
Manual Do Bom Fascista

পাঠ ৪০

কারণ ওরা আমাদের পছন্দও করত

ওরা আমাদের খুব ভালবাসত। আমরা বন্ধু ছিলাম, আমরা খুব একটা ঝামেলা পাকাতাম না, আইন নিয়ে,  মাইনে নিয়ে, লোকজনকে গ্রেফতার করার পদ্ধতি নিয়ে ছোটখাট কিছু সমস্যা ছিল বটে, আর তারপর বন্দি অবস্থায় ওদের বিনা পয়সায় কাজ করিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটাও ছিল – ওই যে কবিতাটায় মিঙ্গাশ[1] সুর দিয়েছিল, সেটায় যেমন বলেছে, “প্রতিবাদ করলেই মার খাবি[2]; কিন্তু আমাদের ঔপনিবেশিকতাটা ভাল ছিল, বাকি সব ওই খারাপগুলোর মত নয়। আর ভাল কেন ছিল? কারণ সেটা পোর্তুগিজ় ছিল আর একটা পোর্তুগিজ় জিনিশ শুধু ভালই হতে পারে। ওই ঔপনিবেশিকতাটা ছিল আমাদের, সরস, (ফরাসিটার মত) দুর্গন্ধে ভরা নয়, বা (বেলজিয়ানটার মত) আঠালো নয়, বা (ইংরেজদেরটার মত) স্কটল্যান্ডীয় নয়, বা (দিনেমারদেরটার মত) রকারডাকীয়[3] নয়, বা (ইটালিয়ানদেরটার মত) তেলতেলে নয়, জার্মান ঔপনিবেশিকতার মত অপটু ভাবে জ্ঞানগম্যিহীন নয়।  

         (এই শেষের অংশটা একেবারে সত্যি)।

         তাছাড়া পোর্তুগাল তো উপনিবেশ তৈরি করেনি – ভাল পথে নিয়ে গিয়েছিল। সাম্রাজ্য একটা সুন্দর জিনিশ আর, ভাল করে জলে দিলে, সেটা আর ভাল হয়।  

         সত্যি বলতে কি জার্মান ঔপনিবেশিকতা সাংঘাতিক একটা বিপর্যয় ছিল। আর নামিবিয়া ছিল সরকারি ভাবে বিশ শতকের প্রথম গণহত্যার মঞ্চ, যখন, ১৯০৫ সালে, একজন ভাল সৈনিক সুশৃঙ্খল ভাবে হেরেরো জাতিকে খতম করতে লাগল। ২০০৪ সালে জার্মানি সরকারিভাবে ক্ষমা চেয়েছে আর, ২০১১ সালে, প্রতীকী ভাবে কয়েকটা খুলি ফেরত দিয়েছে [য. – এসব জিনিশ কেউ বানিয়ে বলে না]।

পাঠ ৪১

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট জানে যে ডিকলোনাইজ়েশানটা খুব বাজে ভাবে করা হয়েছিল

এটা নিয়ে কে আর তর্ক করবে? পোর্তুগিজ়দের হঠাত করে এমন একটা দেশে ফিরে আসতে হল যেটা তাদের নয়। ব্যাপারটা খুব অমানবিক হয়েছিল। খুব বাজে ভাবে ব্যাপারটা করা হয়েছিল। ব্যাপারটা ছিল একটা ট্র্যাজেডি। এমন অনেকেই ছিল যারা তাদের সবকিছু হারিয়েছিল। এমন সব লোক যাদের এমন একটা জীবন ছিল যেটাকে তারা ভাল বলে মনে করত, যারা কারো কোন ক্ষতি করেনি, আর যাদের রাতারাতি একটা গুটিয়ে যাওয়া পোর্তুগালে, একটা শুকিয়ে যাওয়া দেশে ফিরে যেতে হয়েছিল, যেখানে আবার কেউ ওদের চায়ওনি। এমনকি তাদের পরিবারও নয়, যারা ওদের আশ্রয়ে দিলেও সেটা করেছিল মনে বিদ্বেষ আর অবিশ্বাস নিয়ে – সত্যি বলতে কি, ওরা যদি কালো না-ও হয়, অ্যাফ্রিকান তো বটে, অ্যাফ্রিকার মানুষ, অন্য মানুষ। যেসব মানুষ মনের মধ্যে প্রচণ্ড রাগ ক্ষোভ নিয়ে, অসন্তোষ নিয়ে ফিরেছে।

         সেই সব লোক, যেমন খবরের কাগজ পড়ে না তেমনি এখনও ক্ষুব্ধ আর আহত বোধ করে। আজও  এমন লোক আছে যারা “বিশ্বাসঘাতক মারিউ সুয়ারেশ[4]-এর মৃত্যু কামনা করে।

         এটা অস্বীকার করা যায় না যে ডিকলোনাইজ়েশান অনেকের জন্যেই আকস্মিক ও অমানবিক – একটা গুরুতর ভুল, বিভ্রান্তিকর, বিশৃঙ্খল, অন্যায্য ছিল।  

         এটা বললে এ-ও বলতে হয় যে আমার একজন খুব ভাল বন্ধু মনে করে – সে একজন সেনা, ডাক্তার আর চিত্রকর – যে ডিকলোনাইজ়েশান একটা অলৌকিক ঘটনা। খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটা ছোট্ট আর পিছিয়ে-পড়া দেশ পাঁচ লাখ মানুষের ফিরে আসাটাকে সামলে নিয়েছিল। ভাল হোক খারাপ হোক, এটা একটা বিশাল ব্যাপার। আর বৈমানিক সেতুটা[5] কাজে এসেছিল। ডিকলোনাইজ়েশানটা বিশৃঙ্খল ছিল? হ্যাঁ, ছিল। ইতিহাসের ক্লাসে দেরি করে আসার কোন না কোন ফল তো হবেই।

পাঠ ৪১

একজন ভাল ফ্যাসিস্টের সত্যিই মনকেমন করে

একজন ভাল ফ্যাসিস্টের সেই সোনালি সময়ের জন্যে মন কেমন করে যখন সে শ্রীযুক্ত ভেলেশের বন্ধু ছিল, যিনি আন্তনিউ মারিয়া কার্দোজ়ুতে[6] (এখন সেখানে একটা বহুতল, তাতে মনে হয় সবরকম ব্যবস্থাই আছে, এমনকি সনা আর জাকিউজ়ও[7]) কাজ করতেন। আর কেউ যদি শ্রীযুক্ত ভেলেশের বন্ধু ভাল ফ্যাসিস্টকে বিরক্ত করত তো তার কপালে অশেষ দুঃখ ছিল, শ্রীযুক্ত ভেলেশের কানেকানে কয়েকটা কথা ফিসফিসিয়ে বলাটাই যথেষ্ট ছিল, কখন কখন তো উনি ক্লাসিকুর[8] টিকিট দিয়ে পাওনা মেটাতেন আর, ব্যস, মামলা খতম। নে, এবার বোঝ! এর থেকে তো সোজা কিছু হয়ই না।   

         আর তারা গ্রেফতার না হলেও ভয় পেয়ে যেত। দেখে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যেত।

         একজন ভাল ফ্যাসিস্টের সেই সময়ের জন্যে মন কেমন করে যখন ইচ্ছেমতন সমকামীদের নিয়ে মজা করা যেত। আর তারা যদি পুলিশের কাছে নালিশ করতে যেত তো ব্যাপারটা আরো বিগড়ে যেত, থানায় তো রীতিমত হাসাহাসি শুরু হয়ে যেত। এখানে ওসব সমকামিতার মত ব্যাপারস্যাপার চলত না।

         আর অ্যাফ্রিকায় কালোগুলো সিধে হয়ে চলত। ভয়ে চুপ করে থাকত। শহরের কেন্দ্রে কেবল কাজ করতে আসত, ওদের প্রায় দেখাই যেত না (সেই সময়ে অ্যাফ্রিকায় খুব বেশি কালো ছিল না, খুব অল্পই ছিল, এখনকার মত না)। শহরে শাদাদের এলাকায় যদি ওরা ধরা পড়ত তো তাদের ব্যাপারে তদন্ত করা হত – ওখানে ছাতার মাথা ওরা কি করছিল, ওদের কাছে কি কাজ করার কোন আদেশ বা অনুমতি ছিল?  যদি ওদের কাছে কোন কাগজপত্র না থাকত বা কোন নির্মাণের কাজে শ্রমিকের দরকার হত তো কয়েকজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়ে কাজ শেষ না হওয়া অবধি কয়েক মাস বিনা পয়সায় জোর করে খাটান হত (মানে যদি গ্রেফতারই হয়ে থাকে তো তিনবেলা খেতে পেত, শোবার জায়গা পেত, বিদ্যুতের খরচ দিতে হত না, এর ওপর আবার মাইনেও চাই?)। আর এতে তো ওদের কেবল ভালই হত। সভ্যতা ভদ্রতা শিখত। তাহলে বন্ধুটা কে শুনি, কে?   

পাঠ ৪৩

একজন ভাল ফ্যাসিস্টের এমনকি-আছে

হ্যাঁ, একজন ভাল ফ্যাসিস্ট অনেক দূর থেকে অপরাধী দেখে চিনতে পারে – মানে বোঝাই তো যাচ্ছে রং দেখে আরো ভাল করে চিনে ফেলে। কিংবা জাতি দেখে। তাসত্ত্বেও একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে যেটাকে সবচেয়ে ভাল ব্র্যান্ডের ল্যাবকোট পরা বৈজ্ঞানিকেরা এমনকি-আছে নাম দিয়েছেন।

         এই এমনকি-আছে একজন ভাল ফ্যাসিস্টকে ভাল রকম ভোগায়, হাম, মাম্পসের বা অন্য কোন ছোটদের অসুখের চেয়ে বেশি।

         একজন ভাল ফ্যাসিস্টের এমনকি জিপসি বন্ধুও আছে

         এমনকি কালো বন্ধুও আছে

         এমনকি মুসলমান বন্ধুও আছে

         আর পাকেচক্রে যেটা ও আগে থেকেই জানে সর্বদা সেটা এরাই প্রথমে সত্যি বলে প্রতিপন্ন করে।

         “আমার এমনকি একজন জিপসি বন্ধুও আছে যে বলে যে জিপসিদের ব্যাপারে যা শোনা যায় তা

        সব সত্যি।”

        “আমার এমনকি একজন অ্যাঙ্গোলান বন্ধুও আছে যে বলে যে অ্যাঙ্গোলানরা সাঙ্ঘাতিক খারাপ।”        

        “আমার এমনকি একজন মুসলমান বন্ধুও আছে যে বলে যে মুসলমানরা খুব পিছিয়ে পড়ে   রয়েছে।”

         এটা প্রায় ভাবা যেতেই পারে যে বন্ধুর চেয়েও এরা হল কতগুলো ফুটনোট, বাচ্চাদের স্কুটারের[9] মত: কাজের, সহজে বাতিল করা যায় আর যেটাকে আমরা ফুটপাথের ওপর বা মাটিতে ফেলে রাখতে পারি। যতক্ষণ না আমাদের ওরকম একজন বন্ধুর আবার দরকার পড়ছে, বা বান্ধবীর।       

        মাঝেমধ্যে একজন ভাল ফ্যাসিস্টের লিভারে এমনকি যাচ্ছেতাই রকমের ব্যথা হয়, যেটা প্রসঙ্গক্রমে এটাই মনে করিয়ে দেয় যে লিভারের ব্যথাটা যাচ্ছেতাই-ই হয়।

পাঠ ৪৪

পোর্তুগাল অবশ্যই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে ভাল

অবশ্যই।

         আর সেটা কেন?

         প্রথমত, কারণ সেটা তা-ই। যখন কোন কিছু একটা হয়, তার কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, নাহলে সেটা দুর্বলতার লক্ষণ হত, কিংবা জিনিশটার মৌলিক গুণটাকেও দুর্বল করে দিতে পারে।  

         দ্বিতীয়ত, কারণ আমরা, পোর্তুগিজ়রা পৃথিবী-শ্রেষ্ঠ।

         আর আমরা কি কারণে পৃথিবী-শ্রেষ্ঠ?

         বাঃ! কি প্রশ্ন! আমরা পৃথিবী-শ্রেষ্ঠ কারণ আমরা পৃথিবী-শ্রেষ্ঠ। কেন জিগ্যেস করাটা বেশ সন্দেহজনক, যে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে তার মধ্যে কিছু না কিছু গণ্ডগোল আছে।

         কিন্তু আপনাদের যদি আরো প্রমাণ লাগে তো এই নিন আরো অনেকগুলো প্রমাণ: পোর্তুগাল অন্যদের চেয়ে বেশি ভাল কারণ অন্যরা (বিশেষ করে কালোরা) বর্ণবিদ্বেষী হলেও পোর্তুগাল বর্ণবিদ্বেষী নয়। আর সেইজন্যেই সে বেশি ভাল।  

         অবশ্য বর্ণবিদ্বেষী হওয়াটা খারাপ কিছু নয়। একদমই নয়। ব্যাপারটা স্বাভাবিক।

         কিন্তু যদি একটুও খারাপ হত তো অন্যরাই বর্ণবিদ্বেষী।

         যাই হোক না কেন, যেটা সত্যি সেটা সত্যিই, বাকি সব ফালতু বকবকানি:

         “আমরা, পোর্তুগিজ়রা, অন্য সব জাতিদের থেকে বেশি ভাল কারণ আমরা নিজেদের অন্য সব

        জাতিদের থেকে বেশি ভাল বলে মনে করি না।”

         বোঝা গেছে না এঁকে দেখাতে হবে?!

পাঠ ৪৫

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদী হয়

আর সে মনে করে যে পোর্তুগালে বড্ড বেশি অভিবাসী আছে।

         এর সঙ্গে একমত না হয়ে কি পারা যায়? হিসেব করে দেখা গেছে যে সারা পৃথিবীতে প্রায় পঞ্চাশ লাখ পোর্তুগিজ় আর পোর্তুগিজ় বংশোদ্ভূতরা ছড়িয়ে আছে, কোথাও খুব কম সংখ্যায় আবার কোথাও বিশাল সম্প্রদায় তৈরি করে। ক্যানাডা থেকে ভেনেজ়ুয়েলা, ফ্রান্স থেকে জার্মানি, লুক্সেম্বার্গ থেকে ব্রেজ়িল, সব জায়গাতেই রক্তবীজের ঝাড়। এমনকি ব্রেক্সিটের পরেও ইংল্যাণ্ডে এ দেশ থেকে যাওয়া প্রচুর অভিবাসী আছে।  

         আর সবচেয়ে যেটা খারাপ তা হল এরা স্থানীয় রীতিনীতির সঙ্গে মানিয়ে নেয় না, নিজেদের বিচিত্র সব প্রথাই মেনে চলে: এমন একটা মাছ[10] শুকিয়ে খায় যেটাকে নরওয়ে বা আইসল্যাণ্ড থেকে আনতে হয়, এমন একটা অদ্ভুত সুধা খায় যার নাম “মিনি”[11], এমন জোরে কথা বলে যেন নিজেদের দেশেই আছে, আমাদের চাকরিগুলো কেড়ে নেয়, আমাদের মেয়েছেলেদের চুরি করে। এমনকি আমরা আমাদের দেশের মাটিতে আমাদের প্রিয় খেলায় হেরে গেলে অকৃতজ্ঞগুলো সেই দুঃখজনক ঘটনার জন্যে উৎসব পালন করে।

         ভাল ফ্যাসিস্ট একদম সঠিক: অভিবাসীরা[12] যার যার দেশে ফিরে যাক!

         এমনকি পোর্তুগালকে ঘিরে আমাদের একটা দেওয়াল তুলে দেওয়া উচিত। সেটা হলে সবচেয়ে ভাল হয়।

         আরে, দাঁড়াও দাঁড়াও! দেওয়াল তো একটা আছেই, যে দেওয়ালটা আমাদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ইউরোপের দূষণ থেকে দক্ষভাবে রক্ষা করেছে: দেওয়ালটার নাম স্পেন।

“এলিট” সম্পর্কিত একটা অদ্ভুত ধারণা

অ্যাভিয়েটর চশমা চোখে যে ছোকরা বীভৎস একটা কনভার্টিবল চালিয়ে সমুদ্রের তীরের দিকে চলে গেল তাকে দেখে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট ততটা বিরক্ত হয় না যতটা একটা সাধারণ জামাকাপড় পরা মেয়েকে বাগানের একটা বেঞ্চে, বা রাস্তার ধারে একটা ক্যাফেতে চুপচাপ বসে, বা স্রেফ ঘাসে শুয়ে একলা একলা শান্তিতে বই পড়তে দেখলে হয়। কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করতে দেখলে।   

         কারণ কনভার্টিবলের ছোকরাটা বড়লোক – তার ভাগ্যটা ভাল। বাপমা, ধনসম্পত্তি, লটারি, এর মধ্যে যেটাই হোক না কেন। হিংসে হয় বটে, আবার সেটা কেটেও যায়। ভাবের একটা আদানপ্রদান আছে: পারলে আমরা ওর জায়গায় হতাম; আর ওই ছোকরা জানে যে আমরা ওর জায়গায় হতে চাই, আর সেটা থেকেই হয়ত ওর আনন্দের বেশির ভাগটা আসে।

         কিন্তু ওই যে মেয়েটা শস্তার জামা পরে, বাগানের খুব শস্তার (এমনকি মাগনারও) একটা বেঞ্চে বসে, বা বন্ধুদের সঙ্গে ঘাসে (সেটাও মাগনার) বসে চড়ুইভাতি করতে করতে, কিংবা রাস্তার ধারে একটা ক্যাফেতে (যদি কফি নিয়ে থাকে তো আটষট্টি সেন্ট) চুপচাপ বসে বই পড়ছে, ও কিন্তু আমাদের ভয় দেখাচ্ছে, প্রচণ্ড বিরক্ত করছে, হিংসের চেয়েও খারাপ এক জিনিশ মনের মধ্যে জাগাচ্ছে: ক্ষোভ।

         ও একটা ওয়াইল্ড কার্ড, ওকে বোঝা অসম্ভব। ও চেনাজানা রঙের সব তাসগুলোকে নিয়ে খেলে না। ও আর ওর ঘাসে-বসা বন্ধুরা যে চেনা সব তাসগুলো নিয়ে খেলে না শুধু তাই না, তার চেয়েও গুরুতর, আমাদের তাসগুলোকে নিয়ে খেলেই না। ওরা আমাদের মূল্যবোধ ব্যবস্থার বাইরে। এটাই গায়ে জ্বালা ধরায়!  কিভাবে এত কম জিনিশ দিয়ে ওরা আনন্দ করতে পারে? সাধারণ মানুষ বিনা পয়সায় বা প্রায় বিনা পয়সায় (লাইব্রেরি বা বাগানের বেঞ্চগুলোর জন্যে কোন পয়সা খরচ করতে হয় না) যা ব্যবহার করতে পারে সেগুলোরই সুবিধা নিয়ে খোলা আকাশের নীচে বসে শান্তিতে একটা বই পড়ে ওই মেয়েটা কি আনন্দ পায়, কিংবা ভোক্তা নয় এমন একজনের মত তো তার হাবেভাবে কোনরকম নালিশ বা দুঃখ নেই?  

         এটা একজন ভাল ফ্যাসিস্টকে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।

         আর কেউ একজন ভাল ফ্যাসিস্টকে অস্বস্তিতে পড়তে দেখতে চায় না।

         এইজন্যেই একজন ভাল ফ্যাসিস্ট এতটা বিপজ্জনক যখন সে দল বেঁধে রাত্রে বেরয়।

         কারণ সে তো আর শুধু পেটানর জন্যে আলালের ঘরে দুলালদের খোঁজে বেরয় না। সে লাগাম পরানর জন্যে “বুদ্ধিজীবীদের হাবভাব” নিয়ে ঘোরা গবেটদের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়।

         “কি নিয়ে হাসাহাসি করছ শুনি?”, একজন ভাল ফ্যাসিস্ট প্রশ্ন করে। আর প্রায় যোগ করে ফেলে, “কি নিয়ে ভাবছ?”

         এতে একজন ভাল ফ্যাসিস্টের গায়ে ভীষণ জ্বালা ধরে, লোকে কি নিয়ে ভাবছে সেটা জানতে না পেরে।

         জেলে এই ধরণেরই কিছু একটা হয়। যেসব দেশে রাজনৈতিক পুলিশ থাকে, তারা আর নিজেদের মধ্যে থাকে না যখন বুঝতে পারে যে বন্দিকে কাগজ-কলম বা একটা বই দিলে সে একটা অদ্ভুত সান্ত্বনা পায়।

         “এখানে আমরা কোন বই চাই না।”  

         নাঃ, অর্থনৈতিকভাবে উচ্চবর্গের লোকেরা একজন ভাল ফ্যাসিস্টের গায়ে জ্বালা ধরায় না। সত্যি বলতে কি লোকে যা চায় ওরাও তো তা-ই চায়। টাকা করতে! একটা বাগানবাড়ি কিনতে! আলগার্ভ[13] যেতে!    

         খেলার জগতের এলিটরাও – বলে লাথি মেরে বা র‍্যাকেট দুলিয়ে যারা কোটিপতি – ভাল ফ্যাসিস্টের মনের শান্তি নষ্ট করে না। কারণ (অন্তত তার মাথায়) ওদের স্বপ্নগুলো আর তার স্বপ্নগুলো এক। অর্থাৎ অসমতার মধ্যেও সমতা আছে, অন্যায্যতার মধ্যেও ন্যায্যতা আছে। রোনালদো আর মেসি বড়লোক, কিন্তু ওরা বড়লোক গরীব, ঠিক যেমন পপ গায়কেরা বড়লোক, কিন্তু বড়লোক গরীব। আমাদের থেকে ওদের বেশি টাকা আছে? আচ্ছা, বাবা, ঠিক আছে, আর ঘ্যানঘ্যান করতে হবে না, কিন্তু ওরা আমাদেরই মত!

         এবার যারা একজন ভাল ফ্যাসিস্টের গায়ে সত্যিকারের জ্বালা ধরায় তারা হল শিক্ষিত লোকজন। বুদ্ধিজীবীরা। নকল বুদ্ধিজীবীরা। বুদ্ধিজীবী আর নকল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তফাতটা একজন ভাল ফ্যাসিস্ট খুব একটা জানে না – সে কেবল জানে যে ওই দুজনকে দেখলেই ওর বিরক্ত লাগে। একজন ভাল ফ্যাসিস্টের মাথায় এলিটের অর্থ: স্নব, ভান করে বেড়ান শিল্পীরা, যে লোকগুলো এমন সব কনসার্টে যায় যেগুলো কেউ বোঝে না, যে উদ্ধত লোকগুলো এমন সব ছবি পছন্দ করে যেগুলো এমনকি আমার ছেলেও আঁকতে পারে, যে লোকগুলো এমন ভাব দেখায় যেন হাঁটতে তাদের খুব ভাল লাগে। যাদের স্বপ্নগুলো স্বাভাবিক তাদের নিয়ে হাসাহাসি করে ওই যে দঙ্গলটা।   

         এরাই হল একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কাছে “মেরে ফেলার লায়েক এলিটেরা”। একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কি ঘেন্নাটাই না করে এই বাতিকগ্রস্ত মালগুলোকে!

         “বাতিক” হল একটা জিনিশ যেটা বাতিকগ্রস্ত মালগুলোর থাকে। যে মালগুলো তাড়ার সব কটা তাস নিয়ে খেলে না। যে ছুঁড়িগুলো মলে শপিং করতে না গিয়ে বাড়িতে বসে – ইইইইঃ! কি ঘেন্না, কি ঘেন্না! – বই পড়ে।  

         এইভাবে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট একজন জোচ্চোর কন্ট্র্যাক্টার, ম্যানেজমেন্টের একজন হোমরাচোমড়া, খেলার জগতের একজন হাঙরের চেয়ে একজন গরীব ইস্কুল মাস্টারের বিরোধিতা আরো সহজে করতে পারে যার রেনো পিকাসো ছাড়া অন্য কোন গাড়ি চালানর ক্ষমতা নেই আর যার এক কামরার ফ্ল্যাটটার দাম শোধ করতে তিরিশ বছর লাগবে।

         কেউ যদি আকাশছোঁয়া, বা এমনকি গ্রহনক্ষত্র-ছোঁয়া, ধনসম্পত্তি করে ফেলে তো তাতে ভাল ফ্যাসিস্টের মনে কোন দাগ কাটে না, যতক্ষণ ওই বড়লোক বা বড়লোক হয়ে ওঠা মালটার স্বপ্ন আর উচ্চাভিলাষ “আমাদের মতই হয়”

         আর আমাদের মত করেই কথা বলে। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আমাদের মত করে কথা বলতে হবে। সত্যি বলতে কি, ওরা যে আমাদের মত করে ভাবে সেটা জানার সবচেয়ে ভাল উপায় হল ওরা যদি আমাদের মত করে কথা বলে।  

         আর এই জন্যেই তো একজন টিভির অনুষ্ঠান সঞ্চালিকার পক্ষে একই সঙ্গে “এলিটদের বিপক্ষে” কথা বলা আর সগর্বে নিজের নতুন গাড়িটা দেখান সম্ভব হয়, যেটা কিনতে নাকি “এক কাঁড়ি টাকা” লেগেছে।

         ওই এলিট-বিরোধী অনুষ্ঠান সঞ্চালিকা যে টুকটাক বইও লেখে, তাতে কোন দোষ নেই। তাছাড়া  বই পড়ার জন্যে সময় না পাওয়ার ভাল অজুহাত একটা বই লেখার চেয়ে আরও ভাল কিছু হতে পারে কি? নাহলে আর কিসের জন্যে পোর্তুগালে এত লেখক আছে বলে আপনার মনে হয়? কিন্তু ওই হতচ্ছাড়ির কপালে অশেষ দুঃখ লেখা আছে যদি তাকে বই পড়তে দেখা যায়! তাহলে তো তাকে শূলে চড়ান হবে।

ক্রমশ …  


[1]রুই আলব্যার্তু ভিয়াইরা দিয়াশ রুদরিগশ মিঙ্গাশ (১৯৩৯) অ্যাঙ্গোলার একজন গায়ক ও সুরকার। তিনি অ্যাঙ্গোলার জাতীয় সঙ্গীতে সুর দিয়েছেন।    

[2]আন্তনিউ জাসিন্তুর লেখা কবিতা “মোনানগাম্বে” কবিতাতে এই লাইনটা আছে। এই কবিতায় মিঙ্গাশ সুর দেন। মোনানগাম্বে হল সেই সব কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাঙ্গোলাবাসী যারা চুক্তিবদ্ধ হয়ে শ্বেতাঙ্গদের চাষের জমিতে কাজ করত। বেশির ভাগ সময়েই নিজেদের পরিবার ছেড়ে অনেক দূরে গিয়ে তাদের এই কাজ করতে হত।    

[3]ডিজনি কমিক্সে স্ক্রুজ ম্যাকডাকের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে একজন জন ডি রকারডাক।  

[4]মারিউ সুয়ারেশ (১৯২৪ – ২০১৭) – পোর্তুগালের একজন রাজনৈতিক নেতা ও সমাজতন্ত্রী দলের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজন যিনি স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর প্রথম অস্থায়ী সরকারে বিদেশমন্ত্রী হিসেবে অ্যাফ্রিকায় পোর্তুগালের উপনিবেশগুলোর স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছিলেন।   

[5]Ponte aérea বা এয়ারলিফট করে ইভাকুয়েট করা, যেটা এই মুহূর্তে কাবুলে করা হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের এগারোই নভেম্বর অ্যাঙ্গোলা স্বাধীন হবার সঙ্গে সঙ্গেই ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী তিনটি আন্দোলনের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই অরাজকতা থেকে বাঁচতে সাড়ে তিন লাখ শ্বেতাঙ্গ পোর্তুগাল, দক্ষিণ অ্যাফ্রিকা ও ব্রেজ়িলে পালিয়ে যায়; এর মধ্যে প্রায় পৌনে দু লাখ লোককে পোর্তুগাল এয়ারলিফট করে লিসবনে ফিরিয়ে আনে।   

[6]রুয়া আন্তনিউ মারিয়া কার্দোজ়ু নামের রাস্তায় পিদ (পুলিসিয়া ইন্তেরনাসিওনাল ই দ্য দিফেজ়া দু শ্তাদু) বা পোর্তুগিজ় গেস্টাপোর সদর দপ্তর ছিল।  

[7]কথার খেলা। জাকুজ়ি (Jacuzzi) বা বিশেষ ধরণের টবে স্নানের ব্যবস্থা বোঝাতে গিয়ে লেখক “J’accuse” কথাটা ব্যবহার করেছেন, যেটা আসলে এমিল জ়োলা দ্রেফুস মামলার (যাতে দ্রেফুস নামের একজন ইহুদিকে দেশদ্রোহিতার মিথ্যে মামলায় ফাঁসান হয়েছিল) সময়ে ১৮৯৮ সালের তেরোই জানুয়ারি ফরাসি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে খোলা চিঠি লিখে একটা খবরের কাগজে ছাপিয়ে ছিলেন এবং সেই লেখার শিরোনাম ছিল “J’accuse” বা “আমি অভিযোগ করছি”।     

[8]যে কোন দুই বড় ক্লাবের মধ্যে ফুটবল খেলা, যেমন আমাদের মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল। সালাজ়ারের স্বৈরতন্ত্রী শাসনের সময়ে পিদের গুপ্তচরদের “খবর” এনে দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে অনেক সময়ে হয়ত টাকার বদলে খেলার টিকিটের মত ছোটখাট অনুগ্রহ দেওয়া হত। অবশ্য এটা লেখকের অনুমান। অনেক সময়ে কারোর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে গুপ্তচরেরা ইচ্ছে করে ভুল “খবর” দিত।  

[9]Trotineta, দূষণহীন যান হিসেবে এই মুহূর্তে পোর্তুগালে খুব জনপ্রিয়। ভাড়াও পাওয়া যায় তবে সমস্যা হল ব্যবহারের পর এগুলোকে রাস্তায়ঘাটে, ফুটপাথে যেখানেসেখানে ফেলে রাখা হয় যার ফলে পথচারীদের খুব অসুবিধা হয়।      

[10]কড বা “বাকাল্যিয়াউ” যেটা, বলতে গেলে, পোর্তুগালের “জাতীয় খাদ্য”। 

[11]Mini, ২৫০ মিলিলিটারের বিয়ারের বোতল। পোর্তুগালে খুব জনপ্রিয়। 

[12]এই পাঠটা পুরোটাই ব্যঙ্গে ভরা। পোর্তুগাল এমিগ্রান্টদের দেশ, সারা পৃথিবীতে, বিশেষ করে ইউরোপের ধনী দেশগুলোতে, অ্যামেরিকা ও ক্যানাডায় বহু পোর্তুগিজ়ের বাস। তাসত্ত্বেও ফ্যাসিস্টদের পোর্তুগালে ইমিগ্রান্ট বা বিদেশীদের ঢোকা নিয়ে আপত্তি।   

[13]Algarve – অ্যাটলান্টিকের পাড়ে পোর্তুগালের দক্ষিণতম অঞ্চল। মূলত পর্যটনকেন্দ্র এবং বিদেশিরাই, বিশেষ করে ইংরেজরা, এখানে থাকে।   

Rita Ray
ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *