ভাল ফ্যাসিস্ট হবার সহজ উপায় পর্ব-৫

বাংলা English
Rui Zink
Rui Zink
Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures,  imagines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16.Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over. 
 Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়’, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc. 
Manual Do Bom Fascista
Manual Do Bom Fascista
AUTHOR: Rui Zink
Translation from portuguese: Rita Ray

দ্বিতীয় পর্ব

কণ্ঠস্থ থাকা

“ওই ব্যাটা দোআঁশলাটা[1] ভেবেছিল যে বেশ খেলার ছলে ‘রাজত্বি’ করবে… কিন্তু

যখন দেখল যে ব্যাপারটা মোটেই হাল্কা নয় তখন নিশ্চয়ই কাপড়চোপড় হলদে করে ফেলেছিল!

কিন্তু কি আস্পর্ধা, দোআঁশলা মশাইয়ের কথার মাঝখানে ব্যাগড়া দেওয়া, তাও

আবার এমন একটা বক্তৃতার মাঝখানে যেটা কিনা এতই, মানে এতই গুরুত্বপূর্ণ

জাতি এবং দেশের জন্যে… আর শুধু এই কারণেই আমাদের

জিডিপির বৃদ্ধি ০.২ শতাংশ কমে যাবে…”

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট যে কমেন্ট বক্সে মন্তব্য করে

পাঠ ২২

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট মহিলাদের সম্মান করে

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট মহিলাদের সম্মান করে না বলাটা বাড়াবাড়ি, আত্মসম্মানে আঘাত দেওয়া, লজ্জাজনক মিথ্যে। একজন ভাল ফ্যাসিস্ট মহিলাদের সম্মান করে। কেবল একটাই ক্যাভিয়াট আছে, মানে সমস্যাকে একটা মৃত ভাষায় যা বলা হয়ে থাকে আর কি। একজন ভাল ফ্যাসিস্ট মহিলাদের তখনই সম্মান করে, এ বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই, যখন তারা নিজেদের সম্মান করাতে পারে। যদি তারা নিজেদের সম্মান করাতে না পারে তো একজন বেচারা ভাল ফ্যাসিস্টের কি দোষ যদি সে তাদের সঙ্গে উচিত ব্যবহার করে? জোরে একটা থাপ্পড় বা যৌন হেনস্থা, এগুলোকেই কি ওরা ডেকে আনছে না?  

         যদি মহিলারা নিজেদের সম্মানের যোগ্য না করে তোলে, আঁটোসাঁটো স্কার্ট পরে রাস্তায় বেরিয়ে যায়,  জোরেজোরে কথা বলে, মদ খায়, উঁচু গলায় হাসাহাসি করে, উঁচু হিলতোলা জুতো পরে, বুক-দেখান ও হাত না ঢাকা জামা পরে, বুক দুটোকে দেখানর জন্যে ইচ্ছে করে উঁচু করে, চুল খুলে, হাহাহিহি করে, একজন ভদ্রমহিলার ব্যবহারের অযোগ্য ভাষায় কথা বলে, মন্দসঙ্গে হাসাহাসি করে (যেমন সমকামী বা কোন কালো   মানুষের সঙ্গে), পায়ে হেঁটে, গাড়িতে, মেট্রোতে, সরকারি পরিবহণে, এক কথায়, যদি মহিলারা রাস্তায় বেরিয়ে নিজেদের মর্জি মাফিক চলে (অর্থাৎ, নিজেদের সম্মানের অযোগ্য করে) তাহলে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কি করতে পারে? বেচারা ভাল ফ্যাসিস্ট, সে আর কি-ই বা করতে পারে?

         আর না, ওই সুন্দর লাইনটা “গাইতে গাইতে আর হাসতে হাসতে”[2] মহিলাদের ওপর ইতিবাচক ভাবে প্রয়োগ করা যায় না। আর এই যে বামপন্থীগুলো প্রসঙ্গ থেকে কথাগুলো আলাদা করে ফেলছে! মোসিদাদ পুর্তুগেজ়ার স্মৃতিবিধুর গানে লাইন হিসেবে ওটা খুব সুন্দর, কারণ সংগঠনটা শুধু ছেলেদের ছিল, এক গাদা মহিলা নিয়ে এসে সেটাকে নোংরা করার জন্যে নয়।  

         তাসত্ত্বেও, অনেক সময়ে তারা যোগ্য না হলেও একজন ভাল ফ্যাসিস্ট তাদের সম্মান করে। এমনকি ওদের মধ্যে যদি কেউ বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে তো তাকে সাবধান করে দেওয়ার ভদ্রতাটুকুও ওর আছে:

         “আরে ম্যাডাম, আপনার ভাগ্য ভাল যে আপনি পুরুষ নন, নাহলে ঘুষি মেরে চোখে সর্ষেফুল

        দেখিয়ে দিতাম!” 

পাঠ ২৩

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট একটা বারে ঢোকে

আমরা একটা বারে বসে আছি। ধরে নেওয়া যাক যে সেটা আপনিই, প্রিয় পাঠক। আরে, চলুন চলুন, লজ্জা পাবেন না। এমন ভাব দেখান যে আপনি একজন ভাল ফ্যাসিস্ট হয়েই গেছেন, অন্তত এই অধ্যায়ে। চারদিকে দেখুন। লোকজন নাচছে, তাই না?

         এমন একজন মহিলাকে খুঁজুন যাকে আপনার একলা বলে মনে হচ্ছে, অন্তত এই মুহূর্তে। কোন তাড়া নেই, এমন একজনকে বাছুন যাকে আপনার পছন্দ হয়। চমৎকার, এই মহিলা চলতে পারে। কাছে এগিয়ে যান। কথাবার্তা শুরু করুন। কি বলবেন জানি না, কিছু একটা বলুন। কেবল এইটা বলবেন না যে ওখানকার মিউজ়িকটা “ফালতু, শিট” – স্ল্যাং দিয়ে আলাপ শুরু করাটা ঠিক হবে না।

         এই তো, ওর রাশি কি জিজ্ঞেস করুন।

         দেখুন, আপনার দিক থেকে এটা একটা পরীক্ষা বৈ আর কিছু নয়।

         একটা ছোট্ট পরীক্ষা, দুষ্টুমি নয়, একেবারেই নির্দোষ। মহিলাটি সহজলভ্যা কিনা কেবল এইটা দেখার জন্যে।

         যদি ও সহজলভ্যা হয় তাহলে ও একটা বেহায়া, বাজে মেয়ে। সুতরাং শিকারের মরশুম শুরু।

         আর যদি ওকে বাগে আনাটা কঠিন হয়?

         তাহলে আপনি আবার চেষ্টা করবেন।

         এরপর ও যদি জবাব না-ও দেয়, ও যদি গ্রাহ্য না-ও করে, তাহলেও আপনি যে প্রশ্নটা মুখে আনা যায় না সেটাই করবেন: এই সদাশয়া সুন্দরী কুমারী কি আপনার সঙ্গে একটি আরো আরামদায়ক স্থানে যেতে ইচ্ছুক?

         যদি ও উত্তরে হ্যাঁ বলে তো আপনি যা ভাবছিলেন সেটাই ঠিক: ও একটা সহজলভ্যা আর অসভ্য আর বেহায়া বাজে মেয়ে তো বটেই, তাছাড়াও ও একটা বেশ্যা।

         আর যদি না বলে?

         তাহলে তো আরও খারাপ। দুয়ে দুয়ে চার তো হয়েই গেল। ছেনাল মাগী।

         শিখে রাখুন, প্রিয় পাঠক: মহিলারা সবকটাই হল গিয়ে এক একটা বেশ্যা, বিশেষ করে তারা যদি আমাদের সঙ্গে শুতে না চায়।  

         [অনুশীলনী: এবার এটা কুড়িবার লিখুন: “মহিলারা সবকটাই হল গিয়ে…”

             হ্যাঁ, উদ্দেশ্য আর বিধেয়র মধ্যে কমা দিতে পারেন। এতে বরং আরও বেশি রংচঙে লাগবে। অবশ্য

             যদি আপনার রঙীন করার কোন ইচ্ছে থাকে, আপনি তো রাস্তা পার হওয়ার সময়ে কোন রঙীন

             জ়েব্রা ক্রসিং দেখলে অন্য দিক দিয়ে পার হন।]      

পাঠ ২৪

এখানে কোন হুমকি নেই

কেবল সামান্য একটা উপদেশ। একজন মহিলা যদি চায় যে লোকে তাকে সম্মান করুক, তাহলে তাকে সম্মান পাওয়ার যোগ্য হতে হবে। আর একজন ভাল ফ্যাসিস্টকে জোড় বাঁধার সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে হবে, কেবল ফালতু বকবক করতে পারে বা তাকে হাসাতে পারে বলে অন্য কোন একটা গর্দভকে বাছার বদলে। বা, আরও খারাপ, প্রচুর “লেখাপড়া জানা” বলে।  

         নিজেদের মজাদার বলে মনে করার যাদের বাই আছে [যেমন আমার] আর যারা পড়াশোনা করেছে [দুর্ভাগ্যবশত আবার আমি], একজন ভাল ফ্যাসিস্ট তাদের ঘেন্না করে, যাদের প্রচুর টাকা আছে তাদের থেকেও বেশি।  

         আর সে যদি ওই মজার মানুষটাকে ঠিক ভাবে ধরতে পারে তো ওকে ভাল করে শিক্ষা দেবে।

         “যাতে ওর ভাল করে শিক্ষা হয়।”

         যদি ওই মজার লোকটাকে দেখে মনে হয় যে সে নিয়মিত জিমে যায় তো তাহলে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট ওই মজার লোকটাকে শিক্ষা দেবার জন্যে সাধারণততার কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের সাহায্য নেয়। আরে আরে শান্ত হও, আমি তোমাদের সাহায্য চাইছি না, একেবারেই না! কিন্তু একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কি-ই বা করার থাকতে পারে যদি তার এই ছেলেছোকরা বন্ধুবান্ধবরাও “বেণী ভেজাতে” চায়? তাদের বেণী ভেজাতে না দেওয়াটা তো অভদ্রতা হবে। হ্যাঁ ধর্মাবতার, আমার আর কি-ই বা করার ছিল?

         কেউ হয়ত বলবে যে নিজের থেকে দুর্বল কাউকে মারাটা অথবা, মালটার গায়ে যদি জোর থাকে তো দলবল নিয়ে তাকে মারাটা কাপুরুষতা। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়, ধর্মাবতার, দেখুন, একদমই ঠিক নয়। ওটা কেবল বিচক্ষণতার পরিচয়, আর একজন ভাল ফ্যাসিস্ট, যার আত্মসম্মান আছে, সে বিচক্ষণ হতে জানে। তাছাড়া যার গায়ে আমাদের চেয়ে বেশি জোর এমন কাউকে মারধর করার চেষ্টা করে আমাদের কি হত? আর আমরা চুপ করে থাকলে আমাদের মুখটা কোথায় থাকত? তাহলে কি আমরা অনেকে আর যে  মালটা আমাদের চটিয়েছিল সে একলা বলে আমরা চুপ করে বসে থাকব? সেটা কি আমার দোষ যে           আমার বন্ধু আছে আর ওই জনতা, যে আমদের থেকে (ভীতুর মত) পালিয়ে যাচ্ছিল, তার নেই?

         ও! মরে গেছে? আমি নই, আমি জানি যে আমি কাউকে মারিনি। কারণ আমি তো ওখানে ছিলামই না।

         ওঃ, আমাদের ভিডিও তোলা হয়েছে? ধর্মাবতার, এটা কিন্তু বেআইনি। আমি কিন্তু আমার ভিডিও তোলার জন্যে কাউকে অনুমতি দিইনি।

পাঠ ২৫

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট লিঙ্গ ভিত্তিক মতবাদের বিরুদ্ধে

যদিও বিশ্বশুদ্ধু লোক জানে যে:

  • পুরুষমানুষেরা কাঁদে না;
  • মেয়েরা পুতুল নিয়ে খেলে;
  • মেয়েরা জন্মেছে গোলাপি জামা পরে আর ছেলেরা নীল জামা পরে;
  • এর প্রমাণ হল ছেলে বাচ্চারা মায়ের পেটের ভেতরেই লাথি মারে;
  • ঠিক যেন ফুটবল খেলছে;
  • মেয়েদের জায়গা রান্নাঘরে, যেমনটা লেখা থাকত সেই সময়ের প্রাথমিক শিক্ষার বইগুলোতে যে সময়ে ইস্কুলগুলো রাজনীতিতে নাক গলাত না;

আর বিশ্বশুদ্ধু লোক এটাও জানে যে:

  • পুরুষেরাই সব জানে;
  • পুরুষেরা হল চিরকালীন শিশু;
  • মহিলাদের মাঝে মাঝে হিস্টিরিয়াগ্রস্ত লাগে;
  • অনেক বাড়িতেই যেটা মন্দ তা হল মহিলারা তাদের স্বামীদের আর কথা শোনে না;
  • একজন মহিলার সবচেয়ে সুন্দর কৃতিত্ব হল মা হওয়া;
  • পুরুষেরা তাদের যৌন তাড়না নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না;
  • ছেলে বাচ্চারা পিস্তল আর বলের স্বপ্ন দেখে;
  • মেয়ে বাচ্চারা বিয়ে আর বাড়ি-বাড়ি খেলার স্বপ্ন দেখে;
  • জন্মানর আগেই বাচ্চারা জানে যে তারা উকিল হবে না গৃহবধূ হবে;
  • একজন মহিলা যদি তার স্বামীর চেয়ে বেশি উপার্জন করে তো সেই পুরুষ ভাবে যে তাকে খোজা করে দেওয়া হয়েছে;
  • কোন মহিলা যদি তার স্বামীকে খোজা করে দেয় তো সেই পুরুষও নিজেকে খোজা ভাবে;
  • বেশি হাসি, কম আক্কেল;
  • বেশি আক্কেল, কম হাসি;

আর এটা মেনে নেওয়াটা অসম্ভব:

  • আসলে সবসময়েই মহিলাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা ছিল, ভোট দেবার অধিকারের কোন দরকার ছিল না;
  • কাউকে তো খাবারটা তৈরি করতে হবে;
  • পুরুষেরা কখনই বাচ্চাদের নেংটি বদলাতে পারবে না কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা ভাল বাবা নয়;
  • মহিলারা পুরুষালী হয়ে যাচ্ছে আর পুরুষেরা মেয়েলি হয়ে যাচ্ছে, এটা কোথায় গিয়ে থামবে?
  • ওরা এমন সব মূল্যবোধ আমাদের ঘাড়ে চাপাছে যেগুলো আমাদের নয়।

কিন্তু সব ভাল যার শেষ ভাল কারণ আমি তো আসলে:

  • জানি ওই মহিলারা কি চায়।

পাঠ ২৬

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কালো মানুষদের তখনই সহ্য করে যখন তারা নিজেদের জায়গাটা জানে

এটা তো ওদের দেশ নয়, এটা সেই ভাল ফ্যাসিস্টইবলে থাকেযার একসময়ে মনে হত যে ওদের দেশটা “আমাদের”। এই দেশটা আমাদের দেশ আর ওদের যদি পছন্দ না হয় তো ওরা নিজেদের দেশে ফিরে যাক। যারা ভাল নেই তারা অন্য কোথাও যাক। আর মুখটা বন্ধ করুক। “ঔপনিবেশিকতা” আর “দাসব্যবসা” নিয়ে বকবক বন্ধ করুক। যে ভাল নেই সে চুপ করুক।

         ওরা ওরা আর আমরা আমরা আর এটাই তো ভাল। একজন ভাল ফ্যাসিস্ট ট্যুরিজ়মকেও সন্দেহের চোখে দেখে: ছদ্ম ইমিগ্রেশান হতে পারে। আর কৌশলগত দিক থেকে তো তাই-ই, কেবল অল্প সময়ের জন্যে ইমিগ্রেশান – ঠিক যেমন ইমিগ্রেশানকেও একটা লম্বা সময় ধরে ট্যুরিজ়ম বলে ভাবা যেতে পারে।

         একই ভাবে, যেটাকে “দাসব্যবসা” বলা হয়ে থাকে, সেটা তো আসলে আধুনিক ট্যুরিজ়মের সদ্য-উদ্ভাবিত একটা নড়বড়ে সংস্করণ হয়ে থাকতে পারে। সত্যি বলতে কি যখন অ্যাফ্রিকা থেকে কালো মানুষদের ব্রেজ়িলে নিয়ে যেত, তখন আমাদের মহিমান্বিত পূর্বপুরুষেরা কি কেবল ইতিহাসের প্রথম আজেন্সিয়া আব্রেউ[3] তৈরি করছিলেন না? এটা ঠিক যে খোলের পরিবেশ হয়ত খুব একটা উন্নতমানের হত না কিন্তু রায়ান এয়ার বা ইজ়িজেটের সীটগুলোও তো ঘাড়েঘাড়ে বসান। আর যারা প্রায় মাগনায় (বা ক্রীতদাসদের ক্ষেত্রে সত্যিই মাগনায়) সফর করছে, তাদের আবার কবে থেকে অভিযোগ করার অধিকার জন্মাল?

         দেখুন, একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কালোদের বিরুদ্ধে কিচ্ছু বলার নেই, সে কেবল মনে করে যে ওদের সংস্কৃতিটা আমাদের মত নয়, ওদের মূল্যবোধ আমাদের মত নয়, আর ওরা যদি আমাদের চাকরিগুলো কেড়ে নিতে আর, ওদের ওই বিশাল বিশাল নুনু নিয়ে, আমাদের মেয়েদের দখল নিতে এখানে আসে তো ব্যাপারটা খুবই খারাপ হবে

পাঠ ২৭

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট অবশ্য কালোদের সহ্য করে যদি তারা ভাল খেলে

ফুটবল হল অন্য গল্প, ফুটবলটা সর্বদাই অন্য গল্প হয়ে থাকবে, যদিও সর্বদা সেটা একই গল্প হয়ে থাকবে। আর ফুটবলে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কালোমানুষকে নিয়ে তখনই তামাশা করে যখন সে উল্টো দিকের দলে খেলে, আর তা-ও যদি আমরা হারতে থাকি তবেই, কেবলমাত্র ওর স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেবার জন্যে – আরে ভাই, এটা তো খেলারই একটা অঙ্গ – বা জেতার জন্যে, কিন্তু এসবই খেলাচ্ছলে, মানুষ কি ঠাট্টাও করতে পারবে না? মানে অন্যরা যা খুশি তাই করতে পারে কিন্তু আমরা ঠাট্টা-ইয়ার্কি করতে পারব না? খুব খারাপ এসব!

         যদি খেলোয়াড়টা ভাল হয় তো সে আমাদের, ক্লাবের, সুরক্ষিত করে রাখা, কারণ যা আমাদের সেটাকে আমরা রক্ষা করি। আমরা তাকে তখনই শাসন করব – তাকে শায়েস্তা করার জন্যে বা, খুব বাড়াবাড়ি করলে, শিক্ষা দেওয়ার জন্যে – যখন ও কোন ভুল করবে।

         যখন অ্যাফ্রিকান টিমের কেউ একটা ভুল করে, তখন ধারাভাষ্যকাররা যে সবসময়ে (নিয়তির মতই মারাত্মক) “অ্যাফ্রিকান সারল্য”-এর কথা বলে, তাতে ওদের কি দোষ?

         কিংবা একজন ধারাভাষ্যকার যখন বলে যে সে জাতীয় দলে “রোগজীবাণুতত্ত্বের হিসেবে বিশুদ্ধ” খেলোয়াড় পছন্দ করে!? আরে ভাই, এটা হল সবকিছুতে খারাপ দেখার একটা বাতিক।  

         একজন ভাল ফ্যাসিস্টের বর্ণবিদ্বেষে হাল্কা উদারতা আছে, ঠিক যেমন একজন ভাল ফোরম্যান একজন ভাল ফোরম্যান হত সেই সময়ে যখন ফোরম্যানেরা চাবুক ব্যবহার করত: যারা ওর নিচে, তাদের ও মারতে ওস্তাদ ছিল, আর যারা ওর ওপরে, সুবিবেচকের মত তাদের আজ্ঞাপালন করত। বিশেষ করে  কারণ সম্মানটা যদি খুবই শাদা[4] হয়, তাহলে যারা ওর ওপরে আছে তাদের মারাটা খুব সমীচীন হবে না।

         আমরা এটাও বুঝতাম যে মার খাওয়াটা, কাজ করার মতই, কালোদের পক্ষে ভাল।                 

         আর সত্যিটা হল যে এদের[5], কালো হওয়া সত্ত্বেও, পোর্তুগালের হয়ে ওই গোলটা দিয়েছিল। পোর্তুগালের জয়!!!

পাঠ ২৮

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট মনে করে যে “ওরাই” বর্ণবিদ্বেষী

বিশেষ করে কারণ আমরা, পোর্তুগিজ়রা, মানে সত্যিকারের পোর্তুগিজ়রা, যারা এখানেই ঠিকঠাক রঙ নিয়ে জন্মেছি, তারা শ্রীযুক্ত আফন্সো এনরিকশ[6] ও শ্রীমতী উরাকার[7] বংশধর, এদিক থেকে যারা আসলে বর্ণবিদ্বেষী সেই আমরা অন্য জাতিদের থেকে আলাদা, আমাদের মধ্যে বর্ণবিদ্বেষ নেই-ই বলতে গেলে।  

         তা বলে বর্ণবিদ্বেষে খারাপ কিছু নেই। সত্যি বলতে কি, জাতির শত্রুরা যাকে বর্ণবিদ্বেষ বলে সেটা তো আসলে মাতৃভূমির একজন ছেলে নিজের ভেতর যে স্বাভাবিক ভালবাসা লালন করে তার মায়ের জন্যে কেবল তাই-ই, যে মায়ের পরিচয় আর সত্যতা আর উত্তরাধিকার আর পবিত্রতা (এমনকি কুমারিত্বও) সে বাঁচিয়ে রাখতে চায়।

         কিন্তু বর্ণবিদ্বেষ যদি “খারাপ” হত, তাহলে নিশ্চয়ই:

         “ওরাই বর্ণবিদ্বেষী!”

         আর এই কথাটার পেছনে যুক্তি আছে। যদি বর্ণবিদ্বেষ ভাল আর স্বাভাবিক হত (আর এভাবেই সেটাকে দেখা উচিত, কিন্তু আমরা তো এখন একটা স্বৈরতন্ত্রে বাস করছি, রাজনৈতিক ভাবে সঠিকের স্বৈরতন্ত্রে) তাহলে সেটা ঠিক ততটাই আমাদের যেমন আগে অ্যাঙ্গোলা ছিল – কারণ যা কিছু ভাল আর স্বাভাবিক আর মানুষের স্বভাব তা সবই আমাদের, একমাত্র তা-ই হতে পারে। আর আমরা হলাম ভাল লোক। আর যার এতে সন্দেহ হয়, সে দেশপ্রেমিক নয়। এটা অবশ্য বিজ্ঞানের সবচেয়ে ভাল ভাল ব্র্যান্ড দ্বারা প্রমাণিত একটা সহজ, সরল আর সঠিক সাক্ষ্যপ্রমাণ: আমরা এখানে সবাই ভাল লোক।

         কিন্তু বর্ণবিদ্বেষ যদি খারাপ জিনিশ হয়, যেমন লোকে এখন বলে থাকে, তাহলে সেটা আমাদের হতেই পারে না, বরং সেটা ওদের, সুতরাং ওরাই বর্ণবিদ্বেষী।  

[অনুশীলনী: এই “ওরা”-টা বলতে হবে স্বরটা একটু হাল্কা করে বদলে একটু উঁচু আর তীক্ষ্ণ স্বরে, যাতে আশ্চর্যের আর অপছন্দের ভাবটা ভাল করে বোঝান যায়।]  

পাঠ ২৯

আর ওরা যেটা করছে সেটা হল নব্য-ঔপনিবেশিকতাবাদ

আর একজন ভাল ফ্যাসিস্ট নব্য-ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে। যে নব্য-ঔপনিবেশিকতাবাদ অ্যাঙ্গোলা এখন আমাদের ওপর চাপাতে চায়, সেটা খারাপ, ওরা সেটা করতে পারে না, আমরা বাধা দেব, আমরা অ্যাঙ্গোলানদের নব্য-ঔপনিবেশিকতাবাদকে বাধা দেব, ওরা বড়লোক আর ওদের হাতে মালকড়ি আছে বলে আমাদের দেশটাকে ওরা নিজেদের নব্য-উপনিবেশে পরিণত করতে পারে না। বিশেষ করে কারণ, যেটা খুব কম লোকেই জানে তা হল পোর্তুগিজ়রাই ভারত থেকে ওখানে পেট্রোল আর হীরে নিয়ে গিয়েছিল, আমরাই ওই সবকিছুর চাষ করেছি, বেয়াতু[8] আর আলেন্তাইজুর[9] তীর থেকে বীজ নিয়ে গিয়ে।     

         একজন ভাল ফ্যাসিস্ট ব্রেজ়িলেরও নব্য-ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে, যে কিনা ভাবে যে সবকিছুই তার আর যেন তেন প্রকারেণ নিজের টিভি সিরিয়াল আর খেলোয়াড়দের আমাদের এখানে পাঠিয়ে দিতে পারে।

         ঔপনিবেশিকতাবাদ থেকে নব্য-ঔপনিবেশিকতাবাদের একটা মৌলিক তফাত হল: প্রথমটা ভাল হলেও দ্বিতীয়টা খারাপ।

         তার প্রমাণ? হে আমার বন্ধুগণ, ব্যাপারটা বিজ্ঞানসম্মত:

         “ওরা আমাদের পছন্দ করে।”    

        অন্যদিকে, আমরা ওদের পছন্দ করি না।

         “নিজের দেশে ফিরে যা”, একজন ভাল ফ্যাসিস্ট বলে। “যে এখানে ভাল নেই সে চলে যাক এখান    থেকে!”

          এখানে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট, ভুল করে, কিছু অদরকারি কথা যোগ করে ফেলে। যেটা ও আসলে বলতে চায় তা হল:

         “যে এখানে ভাল নেই, সে যেন চুপ করে!”

         শ্তাদু নোভুর সময়ে এই সহজ পদ্ধতিটা খুব সুন্দর কাজ করত। যেহেতু ওটা সত্যিকারের একটা স্বৈরতন্ত্র ছিল, ওখানে কোন রাজনৈতিক ভাবে সঠিকের স্বৈরতন্ত্র ছিল না। কোন ঝামেলা না চাইলে বা বেনামে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হাত থেকে বাঁচতে চাইলে মুখ বন্ধ রাখাটাই যথেষ্ট ছিল। ব্যাপারটা কি আনন্দেরই না ছিল!      


[1]Monhé – পোর্তুগালে তাচ্ছিল্য করে ভারতীয় উপমহাদেশের বংশোদ্ভূতদের বলা হয়ে থাকে। এই অংশটুকু একটা খবরের কাগজ থেকে নেওয়া হয়েছে; ২০১৫ সাল থেকে পোর্তুগালের প্রধান মন্ত্রী আন্তনিউ কশ্তার বাবা ভারতীয় (গোয়ান) এবং তাঁর চামড়ার রং পোর্তুগিজ়দের মত যথেষ্ট ফর্সা নয়, তাই বিদ্রূপ করে অনেক কাগজই তাঁকে “monhé” বলে উল্লেখ করে।

[2]পোর্তুগালে শ্তাদু নোভুর ফ্যাসিস্ট যুব সংগঠন (বাধ্যতামূলক ভাবে সাত থেকে পঁচিশ বছরের ছেলেদের জন্যে) মোসিদাদ পুর্তুগেজ়ার অ্যান্থেমের প্রথম লাইন – লা ভামুশ কান্তান্দু ই রিন্দু (এই চললাম আমরা গাইতে গাইতে আর হাসতে হাসতে)।  

[3]Agência Abreu – পোর্তুগালের প্রধান ট্যুরিস্ট এজেন্সিগুলোর একটা।   

[4]সালাজ়ারের সময়কার সুপরিচিত একটা কথা হল «O respeitinho é muito bonito» অর্থাৎ, সম্মান হল খুব সুন্দর, এর গূঢ়ার্থ হল ভয়ে সম্মান দেখান। এখানে সবার জানা এই কথাটায় বর্ণবিদ্বেষী দ্যোতনা ফুটিয়ে তোলার জন্যে লেখক “সুন্দর”-এর বদলে “শাদা” (o respeitinho é muito branquinho) ব্যবহার করেছেন। একজন গড়পড়তা পোর্তুগিজ়ের মনের অবচেতন বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে ব্যঙ্গ করার জন্যে “respeito”, “branco” এই শব্দগুলোতে লেখক ডিমিনিউটিভ -inho যোগ করেছেন। তাঁর “ভাল ফ্যাসিস্ট” অনেকাংশেই একজন “গড়পড়তা পোর্তুগিজ়”।          

[5]Ederzito António Macedo Lopes, যিনি Éder নামেই সুপরিচিত, পোর্তুগালের একজন ফুটবল খেলোয়াড়। এঁর জন্ম পোর্তুগালের ভূতপূর্ব উপনিবেশ গিনে-বিসাউয়ের বিসাউতে আর ২০১৬ ইউরো কাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এঁর দেওয়া গোলেই পোর্তুগাল জিতে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়।    

[6]D. Afonso Henriques (১১০৬/০৯/১১ – ১১৮৫) – স্বাধীন পোর্তুগালের প্রথম রাজা। 

[7]D. Urraca (১১৪৮ – ১২১১) – দন্ আফন্সো এনরিকশের বড় মেয়ে, স্বাধীন পোর্তুগালের প্রথম রাজকন্যা। 

[8]Beato – পূর্ব লিসবনের একটা অঞ্চল। কয়েক বছর আগে শোনা গিয়েছিল যে বেয়াতুতে পেট্রোল আছে, তাই নিয়ে বৈদ্যুতিন ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর ঠাট্টাতামাশা হয়েছে, এমনকি এই নিয়ে একটা নাটকও লেখা হয়েছে।    

[9]Alentejo – লিসবনের দক্ষিণে পোর্তুগালের একটা অঞ্চল; এরকম একটা ধারণা আছে যে আলেন্তাইজুর উপকূল থেকে খানিকটা দূরে সমুদ্রে পেট্রোল আছে। ভাল ফ্যাসিস্টের বক্তব্য যে পোর্তুগালের ভূতপূর্ব উপনিবেশ অ্যাঙ্গোলা যে দুটো কারণে আজ ধনী – পেট্রোল আর হীরে – সেগুলো ওখানে পাওয়া যেত না; পোর্তুগিজ়রাই ওগুলোর “বীজ” ভারত আর পোর্তুগাল থেকে নিয়ে গিয়ে ওখানে “চাষ” করেছে।    

Rita Ray
ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *