ভাল ফ্যাসিস্ট হবার সহজ উপায় (পর্ব ১৩)

বাংলা English
Rui Zink
   Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.    
Manual Do Bom Fascista
Manual Do Bom Fascista

পাঠ ৭১

ভাল ফ্যাসিস্ট জীবনের পক্ষে?

নির্ভর করে। আমরা কি এমন একজনের কথা বলছি যে জন্মাতে চলেছে না এমন একজন যে জন্মে গেছে? কারণ এ দুটোর মধ্যে তফাত করাটা দরকার।

     যে জন্মে গেছে সে এমন একজন পাপী যে জন্মে অবধি পাপ করেই চলেছে আর সেইজন্যে তার মরাই উচিত।

     যে জন্মাতে চলেছে তার একটা আত্মা আছে, যে জন্মে গেছে, খুব সম্ভবত, তার কোন আত্মা নেই।

     যে জন্মাতে চলেছে, সে পবিত্র, বিশুদ্ধ। যে জন্মে গেছে সে নিশ্চয়ই কিছু একটা করেছে, নইলে জন্মাত না।

     জীবনের প্রতি ভালবাসা, একজন ভাল ফ্যাসিস্টের কাছে, জীবিতদের প্রতি ভালবাসার চেয়েও বড়। এদের বড় হাতের অক্ষরের কোন অধিকার নেই। জীবন পবিত্র, জীবিতেরা সবাই (কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশিই) এমন ঘৃণ্য জঞ্জাল যাদের দুটো করে পা আছে আর পাদুটোর মাঝখানে অপবিত্র সব জিনিশ আছে।   

     যেমন ধরুন, একজন এগারো বছরের বাচ্চা মেয়ে যদি তার ধর্ষকের সন্তানধারণ করে, তাহলে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট খুব বিচলিত হয়ে পড়ে – বাচ্চাটাকে তো রক্ষা করতে হবে!

     বাচ্চাটার বৃহত্তর স্বার্থের চেয়ে আরও কিছু গুরুতর হতে পারে কি?

     এই অবধি এসে কিছু অসতর্ক ব্যক্তি ভাবতে পারে যে ভাল ফ্যাসিস্ট মেয়েটার কথা বলছে।

     নিজেদের ভুলটা শুধরে নিন। ও এই নোংরা ঘটনাটার মধ্যে একমাত্র জীবন, যেটা সত্যিকারের নিষ্পাপ, সেটাকে নিয়ে চিন্তিত: যে বাচ্চাটা জন্মাতে চলেছে। “কারণ ওরই একমাত্র কোন অপরাধ নেই।”

     আর মেয়েটা?“আমাকে একটু হাসতে দাও তোমরা”, একজন ভাল ফ্যাসিস্ট বলে। মহিলারা – এমনকি বাচ্চারাও, তাদের বয়েস যদি এগারোও হয় – আবার কবে থেকে নিষ্পাপ হল?

     “হলে তো ভাল হত। আমি এমন কটাকে চিনি, যারা বয়েসে ছোট হলে কি হবে, এখনই পুরুষদের

মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেয়!”  

     একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণা অবশ্য আছে, লোলিটা, ওই একজন ডঃ নাবু-কোভের[1] (যিনি মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভিগান লেখক), তিনিই এটা প্রমাণ করেছেন।

     না, ভাল ফ্যাসিস্টের বইটা পড়ার সুযোগ হয়নি বটে, কিন্তু ওর কিরকম একজন ভাই সিনেমাটা দেখেছে আর…

পাঠ ৭২

সত্যি বলতে কি, একজন ভাল ফ্যাসিস্ট আসলে কি?

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কিছুই নয়। সে বর্ণবিদ্বেষী নয়, সে পুরুষতান্ত্রিক নয়, সে বিদেশীবিদ্বেষী (“বিদে কি, বস?”) নয়, সে গর্দভ নয়, সে অসভ্য নয়, সে হাঁদাগঙ্গারাম নয়, সে কারুর কোন তুতো ভাই নয়, সে চাকরি করে না, সে বেকার নয়, সে সেকশানের বড়বাবু নয়, সে সেকশানের দাদা নয়, সে প্রো-ভিসি নয়, সে কন্ডিশানার নয়, সে ছুরিকাঁচি শান দেওয়ার লোক নয়, সে গাড়োয়ান নয়, সে ইঞ্জিনিয়ার নয়, সে উকিল নয়, সে দালাল নয়, সে দমকলকর্মী নয়, সে ব্যাঙ্কের অফিসার নয়, সে গোলন্দাজ সৈনিক নয়, সে কিছুই নয়।

     তাহলে একজন ভাল ফ্যাসিস্ট আসলে কি?

     আরে! এটা একটা প্রশ্ন হল! একজন ভাল ফ্যাসিস্ট হল বিশুদ্ধ আনন্দ!

পাঠ ৭৩

ভাল ফ্যাসিস্ট কি নীতিবাগীশ?

অবশ্যই। কিন্তু সে ভাল নীতিবাগীশের গল্পটা জানে না।

     একবার একটা ভাল নীতিবাগীশ একজন দুষ্টু গরীবকে রুটি চুরি করতে দেখল।

     আর সেই ভাল নীতিবাগীশ বলল, তার ভুরুদুটোকে উঁচিয়ে:

     “আরে, আরে! লজ্জাশরম নেই নাকি?”

     দুষ্টু গরীব মাথা নীচু করল:

“আমার খিদে পেয়েছে।”

     ভাল নীতিবাগীশ দুহাতের দুটো বুড়ো আঙুল দিয়ে কোটের ফ্ল্যাপগুলোকে ধরে (বা একটা কল্পিত সাসপেন্ডার ধরে):

“বুঝলাম। কিন্তু চুরি করা খুব খারাপ। যাও, দূর হও এখান থেকে, নইলে আমি কিন্তু পুলিশ ডাকব।”   

কয়েক বছর পর, পৃথিবীর চাকাটা ঘুরল। কখন কখন তো পৃথিবীর চাকাটাকে ঘুরতেই হয়, নাহলে

তো সেটা আর পৃথিবীর চাকা হবে না। মেলার ওই বিশাল নাগরদোলাগুলোর মত, থেমে আছে মনে হলেও যেগুলো থেকেথেকেই ঘোরে আর খাঁচার ভেতরের লোকগুলো হয় আরও উঁচুতে ওঠে (অবশেষে আরও ভাল করে দেখতে পায়) নয়ত আরও নীচুতে নামে (আর একটু আগে যেসব দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিল সেগুলো আর অত ভাল করে দেখতে পায় না)।

     সংক্ষপে: দুষ্টু গরীব লোকটা চাকরি পায় আর ভাল নীতিবাগীশ তারটা খোয়ায়।

     আর, একদিন ওই প্রাক্তন গরীব তার গর্ব ফিরে পেয়ে, নোতুন জামা পরে, রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একটা লোককে কেক চুরি করতে দেখল। আর তাকে কি আর সে চিনতে পারবে না?

     হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে সে বলে:  

     “তাহলে, বন্ধু, চুরি করাটা কি আর খারাপ নয়?” আর ভাল নীতিবাগীশ উত্তর দেয়, কাঁধটা ঝাঁকিয়ে: “আমার খিদে পেয়েছে…”

পাঠ ৭৪

ফ্যাসিজ়মের ওপরে ওঠাটা কি বদলান যায় না?

হয়ত। ফ্যাসিজ়মের ওপরে ওঠাটা হল তিনতলার ডানদিকের ফ্ল্যাটের মহিলার মত। ওঁকে প্রায় কখনই আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু আমরা জানি যে উনি ওখানেই থাকেন। কিংবা এখানে: এখানে এই বিল্ডিঙে। আর মাঝেমাঝে ওঁর পায়ের শব্দ শুনতে পাই।  

     যখন চপ্পল পরে ঘোরেন, তখন কোন ব্যাপারই নয়, কিন্তু ইদানীং কাঠের মেঝেতে উঁচু হিল পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর মনে হয় যেন সারারাত আসবাবপত্র ধরে টানাটানি করেন।  

     আমরা ডাকপিয়নকে অভিবাদন জানাই, সে বলে আমাদের জন্যে আজ কিছু নেই, কেবল দনা আসেন্সাঁওয়ের[2] জন্যে আছে আর ইদানীং যে ওঁর কাছে প্রচুর চিঠিপত্র আসছে, আমরা সেটা লক্ষ না করে পারি না।

     খেয়াল হতেই দেখি যে ওঁর দরজার আইহোল দিয়ে আমরা উঁকি মেরে দেখছি, নিজেদের অনিচ্ছে সত্ত্বেও। মনে হয় যেন ওঁকে এক ঝলক দেখতে পাই, কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে পারি না।

     আমাদের খুব ভয় যে উনি এসে আমাদের দরজায় কড়া নাড়বেন, কারণ সবসময় এটা-ওটা চাওয়া ছাড়াও (এর মধ্যেই আমাদের কাছ থেকে দুটো প্লাস্টিকের কৌটো চেয়ে নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি), আসেন্সাঁও দু ফাশিজ়মুকে[3] বাড়িতে ঢুকতে দিলে উনি খুব ভয়ঙ্কর হয়ে যাবেন।

      কারণ উনি তাহলে আর বেরবেনই না। এমনকি আমরা যদি খুব ভদ্রভাবে বোঝাইও যে এটা কারুর বাড়িতে যাওয়ার সময় নয় – আরে ভাই, এটা তো একুশ শতক।  

     কিংবা বেরোলেও সবকিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে বেরবেন।

     আর, শেষে, উনি ক্ষমা চান, ফোঁপাতে ফোঁপাতে, বলেন যে উনি জ্বরের ঘোরে এসব করেছেন, নয়ত সুস্থ অবস্থায় মোটেই উনি এরকম নন।

     কিন্তু তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

পাঠা ৭৫

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট খালি নাকে কাঁদে আর নালিশ করে?

একটা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনর জন্যে এখনও অবধি যথেষ্ট তথ্য নেই, কিন্তু এমন অনেক ঘটনা আছে যেগুলো ওইদিকেই ইঙ্গিত করে। যেমন:

  • এটা রাজনৈতিকভাবে সঠিকের বিরুদ্ধে কিন্তু, ১৯৬৭ সালে, সে “ভাবনাচিন্তা করে” এমন এক প্রতিবেশীকে ধরিয়ে দিয়ে পরিষ্কার বিবেক নিয়ে ঘুমোতে গিয়েছিল, তার বড় একটা কারণ হল যে সে কর্তব্যপালন করা ছাড়াও ইন্সপেক্টার[4] সোজ়ার নেকনজরে পড়ে গিয়েছিল, আর এখন মাংসের দোকানের মালিক আবার ওকে মাংসের ভাল টুকরোগুলো দেয় – আর একেবারে জলের দরে।
  • ১৯৭২ সালে, আশ নভাশ কার্তাশ পুর্তুগেজ়াশ আর ওই নির্লজ্জ তিন মারিয়াকে[5] নিয়ে সে একেবারে লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল আর “অশ্লীলতায় ভরা” ওই বইটার (বলাই বাহুল্য, সে পড়েনি, ওইসব নোংরা জিনিশপত্র পড়াই কেবল বাকি ছিল আরকি, তা-ও যদি বা ভাল ভাল মেয়েছেলের ছবি থাকত) কারণে ওই তিনজনকে যে কোর্টে হাজিরা দিতে হয়েছে আর তাদের যে গ্রেফতার হওয়ার ভয় আছে এটা ওর খুব ভাল মনে হয়েছিল। আর ও হলে ওদের একটা কুঠরিতে বন্ধ করে চাবিটা বাইরে ফেলে দিত আর ওদের সেই কুঠরিতে গিয়ে দেখে এলেও ব্যাপারটা মন্দ হত না, ওদের এমনকি ভালও লাগত, ওদের যত ফেমিনিজ়ম ঘুচে যেত, ওদের তো আসলে পুরুষের অভাব।
  • ১৯৭৫ সালে কেমন করে “আলভারু কুন্যিয়ালকে খোজা করা হয়েছে” সেই গল্পটা বলতে বলতে ও হাসত – পিদ ওঁর অণ্ডকোষগুলোকে একটা খোলা ড্রয়ারে রেখে সবকিছু স্বীকার করতে বলেছিল নাহলে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দেবে; আর তিনি কিছু স্বীকার করেননি তাই, ব্যস! আর ওই যুগের ভাল ফ্যাসিস্ট বুঝত না যে (গল্পটা সত্যি হলে) নৈতিক দিক দিয়ে যারা খোজা তারাই আসলে এ গল্পের ভিলেন।
  • ১৯৭৮ সালে সংসদে “আর্ত দ্য সের পুর্তুগেশ”[6]-এর (লেখা: আলবের্তু পিমেন্তা[7] আর পরিচালনা: জর্জ লিশ্তোপাদ[8]) একটা এপিসোড নিয়ে আলোচনা হয়েছিল ভাল প্রথাগুলোকে আক্রমণ করার জন্যে।
  • ১৯৮৩ সালে এরতেপে[9]-তে ফোন করেছিল একটা মোটা দাগের নিরীহ ইটালিয়ান কমেডি, “পাতু কোঁ লারাঞ্জা”[10]-র নির্লজ্জ ব্যাপারস্যাপার আর কুরুচির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানর জন্যে।
  • ১৯৮৫ সালে, নিমাশ সিনেমাহলের সামনে ধর্ণা দিয়েছিল “সবকিছু ভাঙচুর করার জন্যে”  গোদারের “জ্য ভু সাল্যিউ, মারি”-র কারণ।
  • ১৯৯১ সালে, হারমানের[11] “ঊলতিমা সাইয়া” স্কিটটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল।

আর তারও আগে:

  • ১৯৩৮ সালে, আমার দাদুকে সে পেভেদেএ[12]-র হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল, অভিযোগটা মিথ্যে জেনেও, (আমার দাদু নিজের মতেই চলতেন কিন্তু কখনই সক্রিয় আন্দোলন করেননি)।
  • ১৮৯৫ সালে, ভাল ভাল সব প্রথাকে আক্রমণ করার জন্যে অস্কার ওয়াইল্ডের জেল হওয়াতে সে খুশি হয়েছিল।  
  • ১৭৬১ সালে, কাভালাইরু দ্য অলিভাইরাকে[13] ইনকুইজ়িশানে (কুশপুত্তলিকা, ধুরন্ধর মানুষটা তখন ইংল্যান্ডে ছিলেন) পোড়ানতে সে আনন্দে হাততালি দিয়েছিল।  
  • ১৭৩৯ সালে, সে আন্তনিউ জুজ়ে দা সিলভাকে[14] ইনকুইজ়িশানে পুড়িয়ে মারার প্রশংসা করেছিল।
  • ১৭৩৭ সালে, পোর্তুগালের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার, যিনি “উ জুদেউ” নামেই পরিচিত ছিলেন, সেই আন্তনিউ জুজ়ে দা সিলভাকে সে ইনকুইজ়িশানে্র হাতে তুলে দিয়েছিল।
  • ১৫৭০ সালে, সে বিধর্মীদের পুড়িয়ে মারার সরাসরি সম্প্রচারণ দেখে তো ছিলই, তার ওপরে আবার “চায়ে গারাম” আর “ঝালমুড়ি” হেঁকে হেঁকে দু’পয়সা কামিয়েওছিল।
  • ১৫৩২ সালে, লুইশ ভাশ দ্য কাময়েঁশকে[15] কর্তৃপক্ষের কাছে সে ধরিয়ে দিয়েছিল। লোকটার দুঃসাহস দেখানর একটা বাতিক ছিল, তো দেখ এবার তার ফলটা কি হয়! ভারতে গিয়ে একটা চোখ খোয়াবি, তবে যদি গিয়ে ধ্যাষ্টামো আর না করতে শিখিস!
  • ৩৩ সালে এমন একজন শান্তিকামীকে সে ধরিয়ে দিয়েছিল যে পৃথিবীতে শুধু প্রেম আর শান্তির বাণী প্রচার করে বেড়াত।
  • আর প্রাচীন ইজিপ্টেও তো “পিদেতিউকুশের অভিযোগকারীরা বলে”[16] একটা দল ছিল। তারা যে সত্যিই ছিল সে ব্যাপারে নিশ্চিত ভাবে জানা যায় বিখ্যাত ইজিপ্টোলজিস্ট জুজ়ে ভিল্যিয়েনার লেখা নীচতার বিশ্বজনীন ইতিহাস বলে একটি প্রামাণ্য বইতে।         

পাঠ ৭৬

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট কি সর্বদাই পুরুষ হয়?

ব্যাপারটা ঠিক অপরিহার্য নয়, অন্য অনেক মডেলেও পাওয়া যায়। যদিও জিনিশটার বেশি চাহিদা, নিঃসন্দেহে, পুরুষ মডেলেরই। ভাল ফ্যাসিস্ট যদি পুরুষ হবার জন্যেই জন্মে থাকে তাহলে হয়ত ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট হত না, কিন্তু এখনও অবধি বারবার এই স্টিকারটাই[17] বেশি তৈরি হয়েছে। তাসত্ত্বেও ভাল ফ্যাসিস্টের তো মা আছেন। মা খুব গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি বাবার চেয়েও, যিনি শারীরিক ভাবে যতটা উপস্থিত আসলে ততটাই অনুপস্থিত থাকেন।

     মা যেহেতু মা, তিনি অন্য মহিলাদের ঘোর অবিশ্বাস করেন। মা স্পষ্টত মা বলেই মহিলাদের চেনেন – আর জানেন যে এই ফুলগুলোকে শুঁকতে নেই।

     তিনি নিজে মহিলা বলেই মহিলাদের চেনেন – আর জানেন যে তাদের বিশ্বাস করা যায় না। এই যুক্তিটা হয়ত ভাল ফ্যাসিস্টকে সাবধান করে দিতে পারত, তার শর্তগুলোর মধ্যে অসঙ্গতির কারণে (মা যেহেতু মহিলা, তাঁকে কি বিশ্বাস করা যায়?), কিন্তু খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, সে সাবধান হয় না। কারবার যখন দজ্জাল মহিলাদের নিয়েই, তখন মায়ের জ্ঞানের চেয়ে আর কিছুই ভাল হতে পারে না, কারণ উনি যে ওদের চেনেন।

     মায়ের সবচেয়ে সুন্দর ভূমিকা হল মহিলারা তাঁর ছেলেকে বিপথে নিয়ে যাবার আর তার ফায়দা তোলা চেষ্টা করলে বাধা দেওয়া। মা নিজে মহিলা বলে খুব ভাল করেই জানেন মহিলারা কেমন হয় – সবাই ফায়দা লোটে আর, তার ফলে, একেকটি দুশ্চরিত্রা, বিশেষত যারা তাঁর ছেলের সঙ্গে কিছু একটা করতে চায়।

     আর এইজন্যেই তো বলা হয়ে থাকে যে তার বাবার ছেলে হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি একজন মার্জিত মায়ের ছেলে[18]।             

পাঠ ৭৭

একজন ভাল মহিলা ফ্যাসিস্টের কি মনে হয় একজন পুরুষ পুরুষ নয়?

হিংস্র না হলে পুরুষ পুরুষ নয়।

     এক একজন আবার একটা চরম কথা বলে থাকে – তাদের এটাই দর্শন যে, একজন পুরুষ একজন মহিলাকে মারধোর করলে সেটা এমনকি ভালবাসার প্রমাণও হতে পারে।          

     একজন ভাল মহিলা ফ্যাসিস্ট এ-ও মনে করে যে একজন পুরুষকে চূড়ান্ত অপমান করা হয় তাকে মেয়েলি বললে: তুমি পুরুষ নও, তুমি কিছুই নও ইত্যাদি। তার পৌরুষ নিয়েই প্রশ্ন তোলা।   

     আমার এখনও একজন মেয়ের কথা মনে আছে, স্কুলে, যে বলেছিল যদি আমি সত্যিকারের ছেলে হতাম তাহলে ওই ধরণের কোন অপমান মেনে নিতাম না, ওই যেরকম সেই যুগে বয়েসে বড় ছেলের দল করে থাকত আর পার্টিতে আমি তাদের অপমানের শিকার হতাম। আমি অবাক হয়ে কি বলব বুঝতে না পেরে ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম: ওকে এটা বোঝানর মত ধৈর্য বা ক্ষমতা কোনটাই ছিল না যে পুরুষাঙ্গ সর্বদা সঙ্গে করে কুংফু শেখার কোন অটোম্যাটিক কিট নিয়ে আসে না, এটা আম্পারু ময়দার[19] মত কোন ব্যাপার নয়। একটা ছেলের গার্লফ্রেন্ড তাকে তার (মানে মেয়েটার) সম্মানরক্ষা করতে বলেছিল আর তার ফলে তার (মানে ছেলেটার) কি হয়েছিল সেটা অবশ্য আমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছিলাম:

“তুমি কি একটা পুরুষমানুষ না ইঁদুর? তুমি কি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখবে না আমাকে রক্ষা করবে?”

     ও হতভাগা যেটা করেছিল সেটা হল একদল মাস্তানের টোনা-টিটকিরি না শোনার ভান করেছিল, কিন্তু ওর গার্লফ্রেন্ড নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিল। পরিণাম: ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল আর সে কখনই সুস্থ হয়ে ওঠেনি, কারণ ও মাটিতে পড়ে যাবার পর যারা এতক্ষণ ধরে মজা দেখছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, তারাও সবাই ওকে এসে লাথি কষাতে লাগল। এইভাবে দলে পড়ে মারধোর করাটা মানুষের ধর্ম, বিশেষ করে আমরা যদি দল বেঁধে ঘুরি, ধর্মাবতার।

     একজন ভাল মহিলা ফ্যাসিস্ট লজ্জার-মাথা-খাওয়া একজন টপলেস মেয়েকেও নিন্দে করে, খুব ঘৃণাভরে:

“তা-ও বুঝতাম যদি কিছু দেখানর থাকত!”


[1]Nabo – ওলকপি; Couve – বাঁধাকপি।

[2]মানে ওপরে ওঠা।  

[3]আক্ষরিক অর্থে ফ্যাসিজ়মের ওপরে ওঠা।

[4]পিদ, মানে শ্তাদু নোভুর রাজনৈতিক পুলিশের ইন্সপেক্টার। পিদ চলতই খবরিদের ওপর নির্ভর করে। সাধারণ লোকেদের মধ্যেও কেউ কেউ পিদের নেকনজরে থাকার জন্যে বন্ধু বা প্রতিবেশীদের ধরিয়ে দিত, বেশির ভাগ সময়েই ভুয়ো নালিশ করে।   

[5]Três Marias – Maria Isabel Barreno (১৯৩৯-২০১৬), লেখিকা, সাংবাদিক ও ভাস্কর; Maria Teresa Horta (১৯৩৭) লেখিকা ও সাংবাদিক; আর Maria Velho da Costa (১৯৩৮-২০২০) লেখিকা; এই তিনজনে মিলে ১৯৭২ সালে Novas Cartas Portuguesas (নোতুন পোর্তুগিজ় পত্রাবলী) নামের একটি বই লেখেন। আন্তর্জাতিক মহলে এঁরা তিন মারিয়া নামেই প্রসিদ্ধ। এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদের নামই ছিল দ্য থ্রি মারিয়াজ়। সত্তরের দশকে এই বইটি পোর্তুগালের স্বৈরতন্ত্রী শাসনের অবসা ঘটানয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। দেশের তীব্র বিভেদমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, স্বৈরতান্ত্রিক দমননীতি, রোমান ক্যাথলিক ধর্মের পিতৃতান্ত্রিকতা আর নারীদের দুর্দশা এসবই প্রকাশ করেছিল এই বই। তার সঙ্গে ঔপনিবেশিক যুদ্ধের অন্যায় অবিচারও সবার সামনে তুলে ধরেছিল। প্রকাশ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বইটিকে সরকারী সেন্সর বোর্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং লেখিকাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।  

[6]Arte de Ser Português – ১৯৭৮ সালের টেলিভিশানের একটা সিরিজ়, যেটা খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সে যুগের আন্দাজে খুব শকিং হবার ফলে।   

[7]Alberto Pimenta (১৯৩৭) পোর্তুগালের একজন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যের অধ্যাপক। তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য সমালোচনা ও প্রথা ভাঙা। তিনি লেখা ছাড়াও পারফর্ম্যান্স ও হ্যাপেনিঙের জন্যে বিখ্যাত। লেখক ওঁকে নিজের “গুরু” বলে মনে করেন।  

[8]Jorge Listopad (১৯২১ – ২০১৭) চেক বংশোদ্ভূত একজন, লেখক, সমালোচক, ফিল্ম ও নাটকের নির্দেশক আর অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৬২ সালে পোর্তুগালে নাগরিক হয়ে এই নাম গ্রহণ করেন।   

[9]RTP – ২০০৪ সালের আগে রাদিয়োতেলেভিজ়াঁও পুর্তুগেজ়া পোর্তুগালের সরকারী টেলিভিশানে সম্প্রসারণের সংস্থা ছিল।

[10]L’anatra all’arancia (পোর্তুগিজ়ে Pato com Laranja) ১৯৭৫ সালের একটি ইটালিয়ান ফিল্ম। পোর্তুগালে হলে প্রথম দেখান হয় ১৯৭৬ সালে। এটি পোর্তুগালের টিভিতে দেখান প্রথম ইরটিক ফিল্ম কিন্তু তার ফলে প্রচুর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ১৯৮৩ সালের একুশে সেপ্টেম্বার প্রাইম টাইমে, যখন পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে টিভি দেখ্‌ এই ফিল্মটি দেখান শুরু হলে এরতেপের দপ্তরে অনেকগুলি ফোন আসে ফিল্মে দেখান নগ্নতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিমটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বেশ কয়েক মিনিটের জন্যে কোন সম্প্রচারই না হওয়ার ফলে দর্শকেরা কেবল কালো স্ক্রিন দেখতে পান। পরের দিন, প্রচুর প্রতিবাদ ও ধিক্কার দেখান হয় এবং বিষয়টি ক্রমে গুরুতর রাজনৈতিক আকার ধারণ করে।      

[11]Herman José, (১৯৫৪), জার্মান বংশোদ্ভূত একজন পোর্তুগাল নিবাসী হিউমারিস্ট।

[12]Polícia de Vigilância e Defesa do Estado (PVDE) – ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত পোর্তুগালের রাষ্ট্রীয় পুলিশ; কাজ ছিল সীমান্ত পাহারা দেওয়া, বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণ করা ও রাষ্ট্রের সুরক্ষা করা। ১৯৪৫ সাল থেকে এর বদলে পিদ (Polícia Internacional e de Defesa do Estado) আসে।  

[13]Francisco Xavier de Oliveira (১৭০২-১৭৮৩), Cavaleiro de Oliveira নামে পরিচিত একজন পোর্তুগিজ় লেখক। ১৭৪০ সালে দেশ ছেড়ে হল্যান্ডে চলে যান, সেখান থেকে ইংল্যান্ডে; কোনদিন আর পোর্তুগালে ফিরে আসেননি। ১৭৬১ সালে পোর্তুগালের ইনকুইজ়িশান তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে, এবং তাঁর অনুপস্থিতির ফলে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।   

[14]António José da Silva Coutinho (১৭০৫ – ১৭৩৯) একজন লুজ়ো-ব্রেজ়িলীয় লেখক। জন্ম রিউ দ্য জানাইরুতে, শৈশবেই পোর্তুগালে চলে আসেন। কুইম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের পাঠ নিতে নিতে ১৭২৫ সালে লেখালিখি শুরু। ওঁকে “O Judeu” অর্থাৎ “ইহুদী” বলে ডাকা হত। ক্যাথলিক ধর্মালম্বী হলেও তিনি ও তাঁর পরিবার তাঁদের পুরোন ইহুদী ধর্ম পালন করছেন এই সন্দেহে তাঁদের সবাইকেই ১৭৩৭ সালে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৯৩৯ সালে ইনকুইজ়িশান তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারে। তাঁকে পোর্তুগালের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার বলে মনে করা হয়।  

[15]Luís Vaz de Camões (১৫২৩/২৪ – ১৫৮০) – পোর্তুগালের জাতীয় কবি, পোর্তুগিজ় মহাকাব্য উশ লুজ়িয়াদাশ-এর রচয়িতা। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পোর্তুগিজ় সৈন্যদলে নাম লিখিয়ে লড়াই করতে চলে যান; সেখানে যুদ্ধে একটা চোখ খোয়ান। ফিরে এসে প্রাসাদের এক কর্মচারীকে আহত করার শাস্তিস্বরূপ তাঁকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৫৫০ সালে এদেশের উদ্দেশে রওনা হয়ে পরবর্তী ষোল বছর গোয়া এবং ম্যাকাওয়ে কাটান। মহাকাব্যটির রচনা এই সময়েই হয়। এই ষোল বছরে বহুবার বন্দী হয়ে জেলে থাকতে হয়েছে।      

[16]José Vilhena (১৯২৭ – ২০১৫) একজন পোর্তুগিজ় লেখক, চিত্রকর, কার্টুনিস্ট ছিলেন। তিনি অনেকগুলি খণ্ডে নীচতার বিশ্বজনীন ইতিহাস (História Universal Da Pulhice Humana) লিখেছিলেন, তার মধ্যে একটি খণ্ড ছিল প্রাচীন ইজিপ্টের ওপর। ১৯৬২ সালে উনি লেখেন: “os queixinhas do reino chamavam-se pideteucos” বা “রাজ্যের অভিযোগকারীদের পিদেতিউকুশ বলা হত”, উনি সালাজ়ারের রাজনৈতিক পুলিশ পিদকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলেন।      

[17]আমরা ছোটবেলায় (সত্তর-আশীর দশকে) বইখাতায় যে নানারকম স্টিকার লাগাতাম, তারই কথা বলা হয়েছে।   

[18]দ্ব্যর্থবোধক কথা; পোর্তুগিজ়়ে “মায়ের ছেলে” বা “filho da mãe”-এর মানে “খানকির বাচ্চা”।     

[19]পাঠ ৬৬ দ্রঃ।  

Rita Ray
   ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।   

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *