nur salma juli reviewing – ‘আনত কুসুমের ঘ্রাণে’ by mostofa tarequl ahsan

বাংলা English
মোস্তফা তারিকুল আহসান
মোস্তফা তারিকুল আহসান 
জন্ম:১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০; সাতক্ষীরা
বি এ অনার্স, বাংলা সাহিত্য, এম.এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পি এইচ ডি: ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; ২০০৩। পেশা: অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
অবসর: ভ্রমণ, গান শোনা,আড্ডা ।
গল্প: 'মহাপ্রস্থান'(১৯৯৯), 'কয়েকটি বালকদিগের গল্প'(২০০৫), 'গল্প গল্প খেলা'(২০১০), 'মাহবুবের কুটিরশিল্প'(২০১৪), 'নমস্কার'(২০১৬), 'কাআ তরুবর'(২০২০)।
উপন্যাস: 'অবগাহন', 'প্রজাপতি পাখা মেলো'।
কবিতা: 'যদিও জাতিস্মর নই '(২০০৩), 'এ দৃশ্য হননের'(২০০৬), 'কন্টিকিরি রাত'(২০১১), 'মেঘেদের ইশতেহার'(২০১৪), 'কপিলাবস্তুর পথে'(২০১৮)।
কাব্যনাট্য: 'আনত কুসুমের ঘ্রাণে'(২০২১)।
অনুবাদ: 'বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ছোট গল্প–১'।
ছোটদের গল্প: 'তিতিরের স্কুলে যেতে দেরি হয়'।
ছড়া: 'সর্দি কাশি বাবু'।
প্রবন্ধ: 'সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্য ২০০৩), 'বাংলাদেশের কবিতা: উপলব্ধির উচ্চারণ'(২০০৭), 'সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্ম '(২০০৮), 'বাংলাদেশের কথাসাহিত্য: মেঘ ও রৌদ্র'(২০১৮), 'বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চা: তত্ত্ব ও অধ্যায়ন'(২০২০), ক্ষেপুউল্লাহ বয়াতির জীবন ও সাহিত্য (২০১২)
আনত কুসুমের ঘ্রাণে
কাব্য নাটক: 'আনত কুসুমের ঘ্রাণে'
লেখক :মোস্তফা তারিকুল আহসান
গ্রন্থ-সমালোচক:নূর সালমা জুলি 

আনত কুসুমের ঘ্রাণে’ : কবির জীবনের দ্বৈরথ

আনত কুসুমের ঘ্রাণে মোস্তফা তারিকুল আহসান (১৯৭০) এর এ বছর প্রকাশিত কাব্যনাটক। সাহিত্যের কম-বেশি সব অঙ্গনে স্বচ্ছন্দ বিচরণকারী লেখকের এধরনের রচনা এটিই প্রথম। প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যে কাব্যনাটক চর্চা প্রায় হাতে গোনা। কবিতাকারে নাটকীয় আমেজ এনে শিল্পভোক্তার মন ভরানোর কাজটি খুব একটা সহজ না। যাহোক, “একজন কবির ব্যক্তিজীবন ও তার শিল্পজীবনের দ্বন্দ্ব নিয়ে এই কাব্যনাট্যের কাঠামো তৈরি হয়েছে। অক্ষরবৃত্তের টানা গদ্যছন্দে রচিত এই নাটকে কাব্যের সুষমা পাঠকের হৃদয়ের গভীরে চারিয়ে দেবার সক্ষমতা আছে এই কবির। যদিও কাব্যের খানিকটা সৌন্দর্য তাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে এর নাট্যগুণের দিকে নজর দিতে গিয়ে। সেটাই কাব্যনাট্যের দাবি।” মোট তিনটি চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে এখানে। গল্পটা এমন : কবি এবং কবিপত্নী ফারহার মধ্যে উত্তপ্ত কথোপকথন হচ্ছে। বিশ বছরের সংসার ছেড়ে চলে যাচ্ছে ফারহা। দুই সন্তানের জননী সে। বড়টি মেয়ে। নাম আফসানা। যাকে পছন্দের ছেলের সাথে স্বামীর অমতে বিয়ে দিয়েছে। আর ছোটটি ছেলে। নাম আবির। যাকে কবি বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছে। ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিল ফারহা। আজ স্বামীর প্রতি পাহাড়সমান অভিযোগ এনে ঘর ছাড়তে উদ্যত সে। ফারহা বলে :

তোমার বয়সের অর্ধেক বয়সী এক তরুণীর সাথে তুমি/ রাতদিন ঘুরে ফেরো, হাস্য-তামাসা আর নানারঙ্গে/ মেতে থাকো/ আমাকে রাতের কীট মনে করে তাচ্ছিল্য করে চলেছ/ দিনদিন

এই অভিযোগ শতধারায় ছড়িয়ে পড়ে আলঙ্কারিক ভাষায়। ফ্ল্যাশব্যাকে বিশ বছরের গল্পটি আমরা দুজনের সংলাপের মধ্য দিয়ে শুনে ফেলি। শিল্পের সাধক কবির ব্যক্তিজীবন ক্ষত-বিক্ষত। স্ত্রীর অভিযোগ খণ্ডন করার চেষ্টাও আজ সে বাদ দিয়েছে। কথায় কথায় আমরা জানি দেশের প্রথম সারির কবি তিনি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর জন্মদিনে ফুল নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন তিনি স্ত্রীকে একা ফেলে রেখে। মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ও অঙ্কিত হয়। এবং এসব গল্প তাদের সংলাপের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। স্ত্রীর অসন্তোষ কবিকে ক্ষুব্ধ করে যেমন ক্ষুব্ধ করে দেশের বর্তমান অরাজক অবস্থা। কবি বলেন :

এই দেশটা চোখের সামনে স্বাধীন হলো, কত স্বপ্ন নিয়ে।/ স্বপ্নের সেই সব বীরেরা সামান্য স্বার্থের লোভে পাল্টে নিল পথ?/ বাংলাদেশের ভূগোল ছাড়া আর কিছুই স্থির নেই।/ এখন কী চমৎকার পাল্টে গেছে, মানুষ-মনুষ্যত্ব,/ নৈতিকতা, আমাদের নিজস্ব-সাহিত্য-সংস্কৃতি/ দিন দিন নষ্ট হতে চলেছে নষ্ট বুদ্ধি আর নৈতিকতার/ যাদুমন্ত্রে। 

. . .

আমার সৎ-বোধ আমাকে স্থির রেখেছে। 

স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বুকে করে থেকেছি। 

লালন করেছি বাংলাদেশের চিরন্তন ছবি। 

এভাবে ব্যক্তিজীবনের সঙ্কটের মধ্যে জাতীয় জীবন ঢুকে পড়ে। অনেকটা সংসারের অশান্তিপূর্ণ পরিবেশকে রাষ্ট্রীয়  সমস্যার সাথে একীভূত করে সমস্যাকে বৃহত্তর রূপদানের সচেতন প্রয়াস লক্ষ করা যায়। ক্লাইম্যাক্স দিয়ে এই গল্প শুরু। শেষে দেখা যায় যে মেয়েটিকে কেন্দ্র করে ফারহার অভিযোগ সেই মেয়েটি মানে বীথিকা এসে পড়ে। সে আবার সাথে করে আনে আফসানাকে। স্বামীর আচরণে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে সে। ফারহা নিজের পছন্দে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল আজ তার করুণ পরিণতি। বীথিকার স্বীকারোক্তি :

আমি তো বলেছি শিল্পের পাঠ নিয়েছি আমি স্যারের/ কাছ থেকে—/ . . .

আমার কোন পাপ নেই। 

. . .

তিনি আমার গুরু, শিল্পের পাঠ ঢুকিয়ে দিয়েছেন আমার/ আত্মায়—

দ্বন্দ্বের আগুনে জল ঢেলে দেয় বীথিকা। এবং আখ্যানের পরিসমাপ্তি ঘটে কবির আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে। অনেকটা অভিমান থেকে এই আত্মনিবেদন। আসলে মানুষের গড়পড়তা জীবন আর শিল্পের পরিশীলিত জীবন দুয়ের মধ্যে ফারাক রয়েছে। ভোগ আর উপভোগের মতো ব্যাপারটা। ফারহা তার ভালোবাসার মানুষটিকে চার দেয়ালের ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে নিজের তৈরি মাপকাঠিতে বিচার করেছে। ফলে তৈরি হয়েছে আকাশসমান অভিমান আর অভিযোগ। শিল্পীর স্বভাবজাত নিরাসক্তিকে সে সহজভাবে নেয় নি। অবহেলা ভেবে বুকে কষ্ট জমিয়েছে। এই দ্বন্দ্বটা চিরকালের। ঘরের আসক্তি আর শিল্পিজনোচিত নিরাসক্তির বিরোধকে অপরূপ কবিভাষায় শিল্পরূপ দানের নান্দনিক প্রয়াস ‘আনত কুসুমের ঘ্রাণে’ কাব্যনাটকটি। ভাষা যথেষ্ট অলঙ্কারবহুল। সংলাপগুলো বেশ দীর্ঘ। অনেকটা কথাসাহিত্যের আমেজ নিয়ে আসে। প্রথমদিকের সংলাপে ড্যাস, বিস্ময়সূচক চিহ্ন, কমা এসবের ব্যবহার থাকলেও দাঁড়ির ব্যবহার নেই বললেই চলে। কিন্তু ভাষার লালিত্যময়তার জন্য পাঠকের ক্লান্তিভাব আসে না। বেশ সুখপাঠ্য। অনেকটা এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো। যেমন :

ভেবেছিলাম কবিতার শব্দবোধের মতো তোমার/ ভেতরটা মোহন/ ভেবেছিলাম, কবিতার পঙক্তির মতো তোমার অন্তর/ স্তরে স্তরে ছন্দে সাজানো/ কাশফুলের শুভ্রতা খেলা করে অনবরত তোমার অলিন্দে/ ভেবেছিলাম, শ্রাবণের বৃষ্টি, বর্ষার মেঘ আর ফাগুনের/  হাওয়া মিলে অন্য এক নিকুঞ্জ তুমি। 

এমন দ্যুতিময় কাব্যভাষা এর। জীবনের এক জটিল বিষয়ের উপর আলো ফেলেছেন কবি। কাল থেকে কালান্তরে প্রবহমান এই দ্বন্দ্ব। ভালোবাসার মানুষের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার আকুতি আর অনেকটা ‘ওথেলো’র সঙ্কট যা দিনের আলোর মতো বাস্তব। এখানে এসে বাসা বেঁধেছে। হ্ঠাৎ আখ্যানে বীথিকার প্রবেশকে ক্লাইম্যাক্স বলা যেতে পারে তবে আমার মনে হয় শুরুতে ফারহার ঘর ছাড়ার বিষয়টাতেই বেশি উত্তেজনা বিরাজমান। বীথিকার প্রবেশ অনেকটা নাটকীয়তায় ভরা এবং আখ্যানের পরিসমাপ্তির জন্য প্রয়োজন ছিল। এই লেখাটির প্রকরণগত পরিচর্যাতে কবির বেশ মনোযোগ লক্ষ করা যায়। দীর্ঘ সংলাপকে মাধুর্যময় করে তুলেছেন তিনি। নামকরণেও নান্দনিকতার প্রকাশ লক্ষণীয়। সবমিলিয়ে পাঠকের শিল্পবোধকে নাড়া দিতে সক্ষম মোস্তফা তারিকুল আহসান এর কাব্যনাটক ‘আনত কুসুমের ঘ্রাণে’।

নূর সালমা জুলি
নূর সালমা জুলি  । 
 জন্ম রাজশাহীতে। ৭ আগস্ট, ১৯৮১। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে লেখাপড়া। সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। 'মাহমুদুল হক : একজন কথাশিল্পীর প্রতিকৃতি' শিরোনামে গবেষণাকর্মের জন্য ২০১৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কথাসাহিত্য বিষয়েই তার লেখালেখি। ছাত্রজীবন থেকে ছোটকাগজে মাঝে মধ্যে লেখেন।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *