Book Review by NUR SALMA JULI

বাংলা English

ল্যু সালোমে এবং নিৎসে, রিলকে ও ফ্রয়েড : এক স্বপ্নচারী নারীর জীবনকথন
নূর সালমা জুলি

মানুষের জীবনের বৈচিত্র্যময়তা অনেক সময় শিল্পকে হার মানিয়ে দেয়। নিজের জীবনের বর্ণময় অধ্যায় মানুষকে মুগ্ধ করে বলেই শিল্পের আশ্রয়ে সে বারবার জীবনকে ভাঙে আর বহুকৌণিক দিক থেকে দেখে তার রূপায়ণ করে। জীবন অনন্ত। এর বাঁকে বাঁকে বিস্ময়, মুগ্ধতা আর বিষাদেরা লুকিয়ে আছে। বেশিরভাগ মানুষই সমাজসত্য তথা প্রথার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে বাঁচে। কিন্তু কেউ কেউ নিজের মনের মতো করে বাঁচার জন্য লড়াই করে যায় আজীবন। এদের স্বপ্ন এদের আলাদা করে দেয়। আর তখনই এরা হয়ে ওঠে অনন্য। এমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ল্যু ফন আন্দ্রিয়াস সালোমে। 

আনোয়ারা সৈয়দ হকের(জ. ১৯৪০) লেখা ল্যু সালোমে এবং নিৎসে, রিলকে ও ফ্রয়েড(২০১২)গ্রন্থটি। এখানে ল্যু ফন সালোমের বৈচিত্র্যময় আর বর্ণাঢ্য এবং অবশ্যই লড়াকু জীবনের গল্প উপস্থাপন করা হয়েছে। ল্যু আমাদের পরিচিত ডিসকোর্সের বাইরের মানুষ। তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক বিচিত্র এবং সাহসী মানুষ। নারীর জন্য তৈরি করা বিধানকে উপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কারণটাও অদ্ভুত। জ্ঞানরাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। আর দশজন নারীর মতো ঘর-সংসারকেই জীবনের একমাত্র গন্তব্য বানাতে চাননি। লেখাটা শুরু হয়েছে ১৮৮১ সালের এক রাতের ঘটনা দিয়ে। ইতালির রোমে এক একুশ বছরের তরুণী তার চেয়ে বয়সে বারো বছরের বড় এক যুবকের সাথে পথে পায়চারি করছে। পাথরবাঁধানো রাস্তায় চাঁদের আলো রুপালি চাদর বিছিয়ে দিলেও সেসবে এই পথচারীদ্বয়ের ভ্রুক্ষেপ নেই। সন্ধ্যা থেকে রাত দুটো অব্দি চললো এই পদচারণা এবং আলাপন। আলাপনের বিষয় দর্শনচর্চা। লেখক বলছেন :

এই গভীর রাতে রাস্তায় পায়চারি করতে করতে তারা আলোচনা করছে সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টোটল, দেকার্তে, হেগেল, কিয়ের্কেগার্দ, পাসকাল, স্পিনোজা, রুশো, ভলতেয়ার, কী নিয়ে নয়! একুশ বছরের মেয়েটির মুখে অনর্গল দর্শনের আলোচনা শুনে যুবকটি যেন একেবারে মুগ্ধ। মাঝে মাঝেই সে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছে।

 এই মেয়েটি ল্যু সালোমে। আর যুবকটি পল রি। পল রি “দর্শনশাস্ত্রের একজন লেখক এবং ডক্টরেটপ্রাপ্ত একজন দার্শনিক।”  রাশিয়ার পিটার্সবার্গে ১৮৬১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ল্যু সালোমের জন্ম। পিতা গুস্তাভ ফন সালোমে ছিলেন জেনারেল এবং জার প্রথম নিকোলাসের প্রিয়পাত্র। মিসেস গুস্তাভ পরপর পাঁচ পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে গৌরবান্বিত বোধ করেন। ষষ্ঠ সন্তানটিও পুত্র হবে এমন আশা করলেও হয় না। ল্যু সালোমে মাকে হতাশ করলেও পিতার চোখের মণি ছিলেন। জারের স্টাফ বিল্ডিং এ এক সাজানো-গোছানো রাজকীয় বাড়িতে বেড়ে ওঠে ল্যু সালোমে। অত্যন্ত ধার্মিক এই পরিবারটি। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস ছোট্ট ল্যুকে বেশ প্রভাবিত করে। কিন্তু একটা বিশেষ ঘটনায় কিশোরী ল্যু এই সিদ্ধান্তে আসে যে ঈশ্বরের ধারণাটা মানুষের মনগড়া। ল্যু সালোমের এই ধারণা স্বভাবতই তাঁর পরিবার পছন্দ করেনি। ল্যু সালোমে এসময় গল্প লেখা শুরু করে। আর তাঁর মধ্যে প্রচণ্ড জ্ঞানতৃষ্ণা জাগ্রত হয়। সতেরো বছরের ল্যু সালোমে একদিন সেন্ট পিটার্সবার্গের ডাচ রিফর্মড চার্চের পুরোহিত হেন্ডরিক গিলোটের বক্তৃতা শোনে। চল্লিশ বছরের এই ধর্মযাজক তাঁর কথামালায় মুগ্ধ করে ফেলেন ল্যুকে। ল্যু ঠিক করে তাঁর ঈশ্বরের প্রতি আস্থাহীনতা আর জীবনের জটিল সব ভাবনা থেকে মুক্তি পেতে গিলোটের কাছে পাঠ নেবে। গিলোটকে পত্র দেয় সে। গিলোট ল্যু সালোমের জ্ঞান আহরণের ইচ্ছে অনুধাবন করে তাঁকে শিক্ষাদানে আগ্রহ দেখায়। লেখক বলছেন :

হেন্ডরিক গিলোট তাঁকে শিক্ষা দিলেন ধর্ম, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব; পড়ালেন বিখ্যাত সব দার্শনিকের দর্শনতত্ত্বের বই। পড়ালেন দেকার্তে, পাসকাল, কান্ট, কিয়ের্কেগার্দ, রুশো, ভলতেয়ার, স্পিনোজা, শোপেনহাওয়ার। এর পাশাপাশি তিনি তাঁকে পড়তে শেখালেন ফরাসি ও জার্মান সাহিত্য। পড়ালেন গ্যেটে, ভিক্টর হুগো, বালজাক, গীতা, উপনিষদ, কনফুসিয়াস। . . . ডাচ ভাষা শেখালেন কান্টের দর্শন পড়ার জন্য।

গিলোটের সান্নিধ্যে নবজীবন পেলেন ল্যু সালোমে। তাঁর জ্ঞানপিপাসু মনের ক্ষুধা নিবৃত্ত হতে লাগলো। ১৮৭৯ সালে পিতার মৃত্যুর পর ল্যু তাঁর সিদ্ধান্তগুলো প্রকাশ করতে থাকে। তাঁর ধর্মীয় অনুশাসনে আস্থাহীনতা সামনে আসে। যেটা মায়ের ভালো লাগে না। মা গিলোটের ব্যাপারটা অর্থাৎ মেয়ের জ্ঞান আহরণের বিষয়টা জেনে যান। এরকম সময় ল্যু সালোমের জীবনে আরও বড় বিপর্যয় ঘটে। তাঁর মানসিক আশ্রয়দাতা গিলোট কামনার হাত বাড়িয়ে দেয় তাঁর দিকে। 

সেই দিন যেন ল্যুর মোহভঙ্গ হলো। . . . ল্যুর চোখের সামনে আকাশ থেকে যেন মর্ত্যের পৃথিবীতে আছড়ে পড়লেন গিলোট। মানুষ-ঈশ্বরের পদবী থেকে মুহূর্তের ভেতরে তিনি শুধু মানুষে রূপান্তরিত হয়ে গেলেন!

ল্যু গিলোটের থেকে দূরে থাকতে সুইজারল্যান্ড এলেন। মায়ের সাথে জুরিখে থাকতে শুরু করেন। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে পড়া শুরু হয় তাঁর। ১৮৮০ সালের দিকে ইউরোপে শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়েই মেয়েরা পড়তে পারতো। যা-ই হোক, অতিরিক্ত লেখাপড়ার চাপে ল্যুর ফুসফুস দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে। গিলোটের স্মৃতি ল্যু সালোমে ভোলেনি কিন্তু শরীরের ব্যাপারে অর্থাৎ কুমারিত্ব রক্ষার ব্যাপারে তিনি বেশ সচেতন ছিলেন। বিষয়টা খুবই অদ্ভুত। এমনকি পরবর্তীকালে নিজের চেয়ে বয়সে বছর দশেকের বড় ফ্রিডরিশ কার্ল আন্দ্রিয়াসের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। বিষয়টি রহস্যে আবৃত। পারস্যের রাজ পরিবারের এই উচ্চশিক্ষিত সন্তানটি সব জেনে মানে শর্ত মেনেই এই বিয়ে করে। যা সারাজীবন রক্ষা করে চলে। 

১৮৮২ সালে মা ল্যুকে নিয়ে ইতালির রোমে আসেন হাওয়া পরিবর্তনের জন্য। এখানেই ‘মেমোয়ার্স অব অ্যান আইডিয়ালিস্ট’ বইটির লেখক মালিদা ফন মেসেনবাগের সাথে আলাপ হয় তাঁর। এই বিপ্লবী নারীলেখক তাঁর সাহিত্য সংগঠন ‘রোমান ক্লাব’ এ আসার অনুমতি দেন ল্যু সালোমেকে। এখানেই জার্মান পল রি এর সাথে আলাপ। পল রি বিস্মিত হন ল্যুর জ্ঞানতৃষ্ণা দেখে। পল রি ল্যুর প্রতি দুর্বল হলেও ল্যু এসব ব্যাপার থেকে অনেক দূরে। পল রিই একদিন পৃথিবীখ্যাত দার্শনিক ফ্রিডরিশ নিৎসেকে জার্মানিতে চিঠি লেখেন। বন্ধুকে ল্যু সালোমে সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে রোমে তাদের সাথে দেখা করার জন্য লেখেন। ল্যু এসব শুনে খুব খুশি। সে ঠিক করে তারা তিন বেডরুমের একটি বাড়ি ভাড়া করবে এবং সে, পল, আর নিৎসে থাকবে। সারাক্ষণ জ্ঞানচর্চা করবে। ল্যুর এই প্রস্তাবে মা এবং মেসেনবাগের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। প্রথাগত নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিষয়ে ল্যুর আস্থা ছিল না। সে এসব ব্যাপার একটু ভিন্নভাবে দেখতে শিখেছিল। কেন শিখেছিল এসব ব্যাখ্যা লেখক দেওয়ার চেষ্টা করেছেন গ্রন্থে। নিৎসের জীবন এবং দর্শন নিয়ে বেশ কথাবার্তা আছে এখানে। যেমন : 

জ্যাঁ পল সার্ত্রেসহ বিশ শতকের সব দার্শনিক তাঁদের চিন্তাভাবনায় নিৎসের প্রভাব অনুভব করেছেন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রভাব পড়েছিল সাহিত্যে এবং মনোবিজ্ঞানে; পৃথিবীর বিখ্যাত কবি রাইনার মারিয়া রিলকে থেকে জর্জ বার্নার্ড শ, ইয়েটস, কামু, মার্লো, টমাস মান, হারমান হেস, ইউজিন ওনিল, জেমস জয়েস পর্যন্ত কে নয়?

ল্যু সালোমে নিৎসের বিষয়ে বলেন, “নিৎসে হচ্ছেন পৃথিবীর মানবজাতির এক নিঃসঙ্গ প্রতিভা।” নিৎসে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্যাজ স্পোক জরাথ্রুস্ত্র’ রচনার অনুপ্রেরণা পান ল্যুর থেকে। তিনি ল্যুকে নিয়ে নিজের জীবনের নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে চেয়েছিলেন। হয়নি। এসব বিষয়ে আলোচনা আছে। খুব সাদামাটাভাবে এদের সম্পর্ক, নিৎসের ব্যক্তিজীবন এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। নিৎসে ল্যুকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং ল্যুর একবাড়িতে থেকে জ্ঞানচর্চার বিষয়টি শুনে তিনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। যা ল্যু সালোমে মেনে নেয় না। তবে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা হয়। এসময় রোমে এক স্টুডিওতে পল, নিৎসে আর ল্যু সালোমে একটি ফটো তোলে। যেখানে ঘোড়ার গাড়িতে ল্যু চাবুক হাতে আর ঘোড়ার জায়গায় পল ও নিৎসে। এই ফটোগ্রাফটি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। 

ল্যু সালোমের ‘স্ট্র‍্যাগলিং ফর গড’ বইটি ১৮৮৪ সালে বেরোয় এবং সেটা বেস্ট সেলার হয়। এই বই পড়েই অভিভূত আন্দ্রিয়াস ল্যুকে বিয়ে করেন। অদ্ভুত এক শর্তে। পল রির সাথে ল্যুর দূরত্ব বাড়ে। পরে আলাপ হয় পত্রিকার সম্পাদক জর্জ লেডেব্যুর সঙ্গে। বিবাহিত ল্যুর সাথে এর একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৮৯০ এ ল্যু ‘রুথ’ নামে একটি উপন্যাস লেখে। পরে ইবসেনের ‘ডলস হাউস’ পড়ে ল্যু ‘ইবসেনস হিরোইনস’ নামে একটি সমালোচনা বই লিখে নামকরা ঔপন্যাসিকের পাশাপাশি সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। স্বামীর প্রতি অন্যায় করেছেন ভেবে ল্যু সালোমে আন্দ্রিয়াসকে মিস্ট্রেস রাখতে বলেন। সে রাজি হয় না কিন্তু পরে দুজন গৃহপরিচারিকার ঘরে দুটি সন্তানের জন্ম দেয় আন্দ্রিয়াস। যাদের ভালোবাসা দিয়েছিলেন ল্যু। রিলকে ল্যুর ‘জিসাস দ্য জু’ বইটি পড়ে মুগ্ধ। এই জীবন্ত কিংবদন্তিকে নিজের দুর্বলতা জানায় সে। তখনও সে পরিচিত হয়ে ওঠেনি পৃথিবীর কাছে। ২২ বছরের তরুণ কবি রিলকে ৩৬ বছরের ল্যুকে অন্য এক জীবনের স্বাদ এনে দেন। এক অর্থে ল্যুর জীবনে প্রথম পুরুষ রিলকে যাকে সে স্পর্শ করেছে। রিলকের সাথে আলাপের পরে ল্যু লেখেন ‘ফেনিসকা’ উপন্যাসটি। লেখক বলছেন : 

জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাঁর অনুশোচনা হয় জীবনকে ঠিক সময়ে ঠিকভাবে উপভোগ না করার জন্য। এত বছর ধরে এ রকম দিবারাত্রি পড়াশোনা করে এবং এজন্য মাঝেমধ্যে নিজেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ করে ফেলার জন্য অনুশোচনা হয়! তিনি হয়তো বুঝেও বোঝেন না, ক্রিয়েটিভ অ্যাকটিভিটি বা সৃজনশীলতার প্রকাশও মূলত একধরনের লিবিডো অ্যাকটিভিটি! এবং তাঁর পরবর্তী জীবনের বন্ধু সিগমুন্ড ফ্রয়েডই এর আবিষ্কারকর্তা। অর্থাৎ যৌনবাসনার চরিতার্থতাও সৃজনশীলতার অনুশীলনের ভেতরে মানুষ অনুভব করতে পারে।

রাইনার মারিয়া রিলকের হয়ে ওঠায় ব্যাপক ভূমিকা ছিল ল্যুর। ল্যুর জীবনে পরে আরও অনেকে এসেছেন। ফ্রয়েডের সাথে ল্যুর সাক্ষাৎ হয় ১৯১১ সালে। তিনি ফ্রয়েডের সাথে সাইকোঅ্যানালিসিস করতে যান। ফ্রয়েডও ল্যুর গুণমুগ্ধ হয়ে পড়েন। ফ্রয়েডের ছাত্র টস্ক, বন্ধু অ্যাডলার এদের সাথেও আলাপ হয় ল্যুর। ল্যু এসময় নারীর প্রসঙ্গে বেশ লেখালেখি করেন। তিনি “নারীর স্বকীয়তাকে ধরে রেখেই পুরুষের সমকক্ষ হয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যেতে বলেন।” প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ল্যুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। যুদ্ধের সময় তিনি সাইকোঅ্যানালিসিস করতেন। ফ্রয়েড তাঁর কাছে রোগী পাঠাতেন। 

যা-ই হোক, ১৯৩১ সালে অসুস্থ ল্যু ‘মাই থ্যাংকস টু ফ্রয়েড’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। ফ্রয়েড এতে খুব খুশি হন। ১৯৩২ সালে ল্যু আত্মজীবনী ‘স্কেচ অব মাই এক্সপেরিয়েন্সেস অব মাই লাইফ’ লেখা শুরু করেন। ১৯৩০ সালের ৪ অক্টোবর ল্যুর স্বামী আন্দ্রিয়াস মারা যান। শেষজীবনে ল্যুর ভাবনা লেখকের প্রেক্ষণবিন্দুতে :

সারা জীবন পুরুষের সঙ্গে মিশে, ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের সঙ্গে মিশে সালোমে কি শেষমেশ এই জ্ঞান অর্জন করলেন যে নারীর মেধার বিকাশ নিয়ে পুরুষের কোনো মাথাব্যথা নেই। সে নারীকে চায় অনন্তকাল ধরে তাঁর শরীরের সঙ্গিনী হিসেবেই? সে চায় শুধু নারীর স্নেহ ও ভালোবাসা। তা ছাড়া আর কিছুই নয়? . . . জ্ঞানের স্পৃহায় নিজেকে নিমজ্জিত করে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় যখন তিনি গিলোটের দ্বারস্থ হন, তখন সেখানেও তিনি দেখেন নারীর জ্ঞান, সাধনা, কর্মস্পৃহা, একজন পুরুষের কাছে শ্রদ্ধা অর্জনের চেয়ে তাঁকে আরও পুরুষের কাম্য করে তোলে। . . . পুরুষের সমাজে বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা করতে গিয়ে সালোমে বারবারই লিঙ্গবৈষম্যের গহ্বরে পড়ে যান। নিৎসের মতো জ্ঞানী একজন দার্শনিক পুরুষ, পল রির মতো জ্ঞানী একজন লেখক ও দার্শনিক, আন্দ্রিয়াসের মতো বহু ভাষাবিদ একজন বিদ্বান এবং রাইনার মারিয়া রিলকের মতো একজন অতিশয় প্রতিভাবান তরুণ কবিও সালোমের কাছে চেয়েছিলেন দৈহিক আশ্রয় এবং ভালোবাসা। কেউ সফল হয়েছিলেন, কেউবা হননি।. . . সালোমে যদি ভাগ্যবিপাকে মেয়ে না হয়ে পুরুষ হয়ে জন্মাতেন, তাহলে এ পৃথিবীতে তাঁর প্রকাশ হতো ভিন্ন। তাঁর ইতিহাস লেখা হতো ভিন্নভাবে। নিৎসে থেকে শুরু করে ফ্রয়েড পর্যন্ত সবাই তাঁকে তাঁদের সতীর্থ বলে গ্রহণ করতেন। কিন্তু সেটা হয়নি। . . . তিনি যেন তাঁদের শিষ্য বা প্রেরণাদাত্রীই হয়েই থেকে গেছেন, সমকক্ষ আর হতে পারেননি।

লেখকের এই বিশ্লেষণ নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করেছে। কাল থেকে কালান্তরে বয়ে চলা এ এক অমোঘ সত্য। সভ্যতাগর্বী মানুষের পৃথিবীতে নারীকে বারবার এমন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। আলোর নিচে এই আদিম অন্ধকার প্রেতের মতো নৃত্য করে চলেছে। বোধের দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে ক্লান্ত শুভবোধ। নারীকে তার ভাগ্যজয়ের জন্য অদ্ভুত এক লড়াইয়ে নামিয়ে রেখেছে এই গ্রহ। সিসিফাসের মতো যন্ত্রণায় কাতর নারী। লড়াই পুরুষেরও আছে কিন্তু সেটা একমুখী। আর নারীর লড়াই দ্বিমুখী তো বটেই ক্ষেত্রবিশেষে বহুমুখী। 

সালোমে ১৯৩৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী ছেড়ে যান। একটু বিস্তারিতভাবেই ল্যু সালোমের জীবনের গল্প উপস্থাপন করলাম। লেখক খুব যত্নের সাথে এই মানুষটিকে এবং তাঁর সাথে জড়িয়ে থাকাদের গল্পটা নিয়ে এসেছেন। পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিক, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিকদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে কাজটি শ্রমসাধ্য। ঝরঝরে মেদহীন গদ্যে একটা বৃহৎ জীবন ও সময়ের বয়ান আমাদের ঋদ্ধ করতে সক্ষম। 

জীবনী সাহিত্যের বিশেষ ব্যাপারটা হলো খুব আড়ম্বরহীনভাবে জীবনের গল্প উপস্থাপিত হয় এখানে। একটা জীবনের বয়ানে উঠে আসে খালি চোখে দেখা সমাজ, সময়, সংস্কৃতির কথা। যেখানে বহুজীবন অতি সাবলীলভাবে সৌখিন মাছের মতো সাঁতার কেটে বেড়ায়। শুধু প্রয়োজন মনোযোগ দিয়ে তাদের বর্ণ আর গতিবিধি দেখা। এখানেও ল্যু সালোমের গল্পে তার মা, রাশিয়া, ইতালি, জার্মানির মানুষ, তাদের ভাবনা, সমাজের চিত্র, নারীকেন্দ্রিক সংস্কারগুলো খুব অনায়াসে উঠে এসেছে। ল্যু সালোমের মা চেয়েছিল যে সে হাফ ডজন পুত্র সন্তান গর্ভে ধারণ করে গর্বের অধিকারী হবেন। কন্যার জন্ম দিয়ে তাই তার মধ্যে একটা অতৃপ্তি কাজ করেছিল। এই বিষয়টি ল্যুকে প্রভাবিত করে। কিংবা রাশিয়া বা ইতালির সমাজ মেনে নিতে পারছিল না যে একটি মেয়ে সংসার ধর্ম পালন না করে জ্ঞানের সাধনা করে জীবন কাটাবে। তখন উপমহাদেশ আর ইউরোপের মধ্যে পার্থক্যগুলো নিমিষেই ঘুঁচে যায়। আসলে সব দেশেরই সমাজ নামক সংগঠনটি কতকগুলো ক্ষেত্রে এক। তার মধ্যে অন্যতম নারীকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে। ল্যু সালোমে এজন্যই প্রাসঙ্গিক আজকের দিনেও। ল্যু চেয়েছিলেন স্বাধীন একটা জীবন। যেখানে জ্ঞানরাজ্যের বিচিত্র পথে তিনি অবাধ বিচরণ করবেন। তিনি তাঁর সাধনা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা দিয়ে সে পথেই হেঁটেছেন সারাজীবন। তাঁর সম্পর্কে বলা হতো যে তিনি মানুষকে ভেতর থেকে অনুপ্রাণিত করতে পারতেন, প্রভাবিত করতে পারতেন, নিজের কথা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারতেন। সব বিষয়কে নিজের মতো করে ভাবার শক্তি তাঁর ছিল। প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত ল্যু সালোমে ফ্রয়েড আর অ্যাডলারের চিন্তাকে সরাসরি মেনে না নিয়ে নিজের মতো করে ভাবতেন। লেখক বলছেন :

অ্যাডলারের মতে, ফ্রয়েড সবকিছুর ভেতরে যৌনতার ছায়া দেখতে পান, কিন্তু মানুষ চলে তার ধারণা এবং মূল্যবোধ দিয়ে। তিনি ভালো ধারণা এবং ভালো মূল্যবোধের বিপরীতে খারাপ ধারণা এবং খারাপ মূল্যবোধের সংঘর্ষের কথা বললেন। ফ্রয়েড এবং অ্যাডলার দুজনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে সালোমে তাঁদের কারও মতকেই একেবারে খাঁটি সত্য বলে মনে ধারণ করলেন না। তিনি নিজের মত তৈরি করলেন। সেটা হলো মানুষের মূল্যবোধ এবং যৌনতা একটা সমঝোতার ভেতর দিয়ে চলে, যখন এই সমঝোতার ভেতরে ভুল-বোঝাবুঝি হয়, তখনই মানুষের ভেতরে শুরু হয় দ্বন্দ্ব এবং তখনই মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

এভাবে নিজের চিন্তার প্রকাশ ঘটান ল্যু সালোমে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের আচরিত জীবনবোধের কাছে মাথা নত না করে নিজের স্বকীয়তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। তাঁর চেষ্টাকে সাধুবাদ দিতেই হয়। তবে তাঁর গভীরতলসঞ্চারী সমাজবিশ্লেষণ শক্তি নারীকেন্দ্রিক যে ভাবনাগুলোর প্রকাশ ঘটিয়েছে তা বাস্তব। পুরুষের সমাজে নারীকে তাঁর যোগ্যতার মাপকাঠিতে নয় তার নারীত্বের দ্বারাই বিচার করা হয়। পুরুষ নারীর মেধা আর বিচক্ষণতাকে গুরুত্ব না দিয়ে আসলে নিজেদের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। যেভাবে পুরাণে সতী নারীর উদাহরণ দিতে গিয়ে বলা হয় কুষ্ঠরোগগ্রস্ত স্বামীকে কোলে করে বেশ্যালয়ে নিয়ে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম। যা-ই হোক, ল্যু সালোমে সারাজীবন অনেক মানুষের সংস্পর্শে এলেও পথ তাঁকে চলতে হয়েছে একাই। ঘরে-বাইরে সর্বত্র একটা লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। এই লড়াই প্রত্যেকটা নারীর। তবে এই স্বপ্নচারী নারীটি নিজেকে না পাল্টে সমাজকে পাল্টানোর চেষ্টা করেছেন। সে কারণে নিজেকে তৈরিও করেছেন। পড়ালেখাকে অঙ্গীকৃত করে শেষতক লড়ে গেছেন। কীভাবে যেন ভেতর থেকে তিনি নিঃসঙ্গ ছিলেন। আসলে কী নারীর কখনও সঙ্গী হয়? আর সে নারী যদি আচরিত জীবনবোধের উপর প্রশ্ন তোলে তাহলে তো আর কথায় নেই। গল্পটি এমনই একজন স্বপ্নবাজের। এবং একজন নিঃসঙ্গ মানুষের সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবার, নিজের পরিচয় গড়বার, নিজের মতো করে বিশ্বাস, স্বপ্ন আর ইচ্ছের সাথে বাঁচবার লড়াইয়ের গল্প ল্যু সালোমে এবং নিৎসে, রিলকে ও ফ্রয়েড গ্রন্থটি।

Nur Salma Juli
 নূর সালমা জুলি  ।   জন্ম রাজশাহীতে। ৭ আগস্ট, ১৯৮১। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে লেখাপড়া। সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। 'মাহমুদুল হক : একজন কথাশিল্পীর প্রতিকৃতি' শিরোনামে গবেষণাকর্মের জন্য ২০১৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কথাসাহিত্য বিষয়েই তার লেখালেখি। ছাত্রজীবন থেকে ছোটকাগজে মাঝে মধ্যে লেখেন। 

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *