কুরোসাওয়ার ড্রিমস : এক এশিয়ো মেনিফেস্টো – অমিতাভ চক্রবর্তী

বাংলা English

Poster of the film ‘DREAMS’ by AKIRA KUROSAWA

স্বপ্ন ‘সারা জীবন স্বপ্নেরা আমায় শাসন করেছে, এবার আমি স্বপ্নদের শাসন করছি।‘ ‘ড্রিমস’ ছবির রিলিজের সময় প্রেস কনফারেন্সে ওয়াশিংশন পোস্টে এই কথা বলেছিলেন পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া। ১৯৯০ সালে ৮০ বছর বয়সে এই ছবিটা তৈরী করেন তিনি। জাপানি নাম ‘ইয়ুম’। আট টা ছোট ছোট ছবি মিলে ‘ড্রিমস’। প্রত্যেকটাই কুরোশোওয়ার সারাজীবনে দেখা স্বপ্নের মধ্যে বাছাই করা আটটা স্বপ্ন।

এক কথায় স্বপ্ন হলো ধারাবাহিক কতকগুলো ছবি বা আবেগের সমষ্টি যা ঘুমের সময় বা কখনো সচেতন থেকেও মানুষের মনকে আছন্ন করে ভেসে বেড়ায়। সেই সব আকাঙ্খা, আবেগে, কল্পনার বহিঃপ্রকাশ কখনো হয় সরাসরি আবার কখনো হয় বিভিন্ন প্রতিকী ব্যঞ্জনার মধ্যে দিয়ে। বিজ্ঞান তাকে তাকে ব্যাখ্যা করে ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং তার অভিজ্ঞতার একটা রূপরেখা তৈরী করে। রঙের ঢল, মনের মহল স্বপ্নপ্রসূত কিন্তু অলীক নয়। কারণ স্বপ্নই ভীষণ বাস্তবতা।

আকিরা কুরোসাওয়ার এই ছবির ভিত্তি জাপানের লোককথা, ঐতিহ্য, প্রাচীন বিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সমকালের বোঝাপড়া। প্রকৃতি পরিবেশ বিষয়ে পরিচালকের সজ্ঞান সতর্কতা।

কুরো্সাওয়া তাঁর চলচ্চিত্রে যে সমাজ ভাবনা এবং সচেতনতার পরিচয় দিয়েছিলেন সারাজীবন তার মধ্যে ড্রিমস সব কিছুকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যায়। পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবেশ বিষয়ে এক সুগঠিত ভাষ্য হয়ে ওঠে এই ছবি। কুরোশোওয়া নিজেই বলেছেন, ‘এই ছবির অর্থ সহজ কিন্তু গূঢ়ার্থ কঠিন’। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সমালোচক ম্যালকম অস্টিন বলেছেন,’ এই গুঢ়ার্থে খোঁজ মিলবে আটটি স্বপ্নের সুরিয়াল ইমেজের ভিতরে ঢুকলে। প্রথম পাঁচটি স্বপ্নের স্পেক্টাকুলার রূপ বিশ্লেষন করে শেষ তিনটে তে পৌঁছলো’। কুরোশোওয়া ব্যাখ্যা করে বলেন,’ আমি শুধু দেখানোর সময় মনে রেখেছিলাম জীবন তত সহজ নয়। একটা বাদামের খোশা ভেঙে তার ভিতরে ঢুকতে হয়’। জীবনের একদম অন্তিম পর্যায়ে পরিচালক অবশেষে সবুজ পৃথিবীর কাছে এলেন এবং অত্যন্ত ধীর গতিতে তাকে পর্যালোচনা করলেন আর তৈরী করলেন ড্রিমস।

কিছু কিছু ঘটনার পর পৃথিবী আর আগের মত থাকে না। নতুন যুগের সূচনা নিয়ে মানুষ খুব সাধারণ মন নিয়ে দেখা শুরু করে। সময়ের এগিয়ে যায় আর ক্রমশঃ প্রত্যেকের মানস লোকে স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন খেলে বেড়ায়। সেই ভাবনা গুলো জুড়ে থাকে আশাবাদ ও ইতিবাচক বিশ্লেষন। কুরোসাওয়া এই চিন্তায় উপাদান সরবরাহ করলেন এই ছবির মাধ্যমে।

ড্রিমস কুরোসাওয়ার একান্ত ব্যক্তিগত ও গভীর বোধ থেকে উঠে আসা ছবি, যা শৈল্পিক ভাবে মুক্ত হলেও অত্যন্ত মার্জিত এবং নিয়ন্ত্রিত। এই চলচ্চিত্রে আটটা স্বপ্নকে দুটো পর্বে ভাগ করা হয়। প্রথম পাঁচ টা স্বপ্ন নিয়ে প্রথম পর্ব এবং শেষ তিনটে স্বপ্ন নিয়ে দ্বিতীয় পর্ব। অবশ্য সমালোচকেরা পরের তিনটে স্বপ্ন কে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন কারণ এই স্বপ্ন গুলোর মধ্যে পরিবেশ সমস্যা নিয়ে একটা অন্তর্লীন যোগসূত্রের সন্ধান পেয়েছেন। এই ভাবে কুরোশোওয়া আর কোন ছবিতে পরিবেশ এবং মানুষের সম্পর্কে নিয়ে এতটা চিন্তিত হন নি। জীবনের অন্তিম পর্বে পৌছে তাই এই ছবির বক্তব্য হয়ে উঠেছে কুরোসাওয়ার এপিটাফ।

মানুষ তখনি মেধাদীপ্ত হয়ে ওঠে যখন সে স্বপ্ননীল থাকে। এই মন্ত্র জপতে জপতে কুরোশোওয়া ‘ড্রিমস’ এবং তার পেইন্টিং এর ড্রাফট করেন। তিন দশক আগের এই ছবিটি মূলত কয়েকটি স্বপ্ন কোলাজের অভিনব নির্মান যা প্রথাসিদ্ধ কাহিনীকে চুরমার করে দিয়েছে।

‘ওয়ান্স আই হ্যাড আ ড্রিম’ এই উক্তি দিয়ে সিনেমা শুরু হয় যা সারাসরি দর্শককে স্বপ্নের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। রোদ উঠেছে, তার মধ্যে বৃষ্টি পড়ছে। জাপানী লোক প্রবাদ এই সময়ে নাকি শেয়ালদের বিয়ে হয়। কিন্তু এই বিয়ে মানব চোখের বাইরে। তাকে দেখা বারণ, অপরাধ। ভুল বশতঃ দেখে ফেললে রামধনুর তলায় বাস করা সেই সব শেয়ালদের কাছে গিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করে আসতে হয়। না হলে জীবন পথে ফেরা হয়না। প্রকৃতির গোপনীয়তা রক্ষা করতে ব্যার্থ হলে মানুষের মৃত্যু ছাড়া কোন পথ নেই। একটা বালক মায়ের নিষেধ স্বত্তেও গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সেটা দেখে ফেলে। ধীর লয়ে বাজছে লোকবাদ্য। স্তব্ধতার বুক চিরে নাচতে নাচতে চলেছে মুখোশধারী শেয়াল মানুষেরা। তাদের পদক্ষেপ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে তারাই মানুষের ভিতরের স্বত্তাগুচ্ছের চলমান প্রদর্শনী। জাপানী লোককথায় শেয়াল একটা বহুল প্রচলিত ব্যাপার। গল্পে তাদের দেখানো হয় বুদ্ধিমান জীব এবং জাদু ক্ষমতা সম্পন্ন, যা তাদের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। মানুষের রূপ ধারণ করতে এই ক্ষমতাটা তাদের সাহায্য করে। প্রাচীন জাপানে শেয়াল এবং মানুষেরা পাশাপাশি বাস করতো। এই ভাবে বাস করতে করতে প্রাণী হিসেবে তারা লেজেন্ড হয়ে ওঠে।

পরের স্বপ্ন দেখানোর আগে আবার পর্দায় লেখা ফুটে ওঠে, ‘অ্যানাদার ড্রিম-দ্য পিচ অর্চার্ড’। গাছ যদি আমরা কেটে ফেলি কী থাকে এই ন্যাড়া পৃথিবীতে। ‘হিনামাৎসুরি’ পুতুলদের উৎসব। এবং তা সাধারণত পালন করা হয়ে থাকে বসন্তের সময়ে। এই সময়ে পিচ গাছ গুলো ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। পুতুলেরা এই সময়ে দেখা দেয়। পিচ গাছ এবং তার গোলাপী ফুলের প্রতিনিধিত্ব করতেই যেন তাদের আগমন। একটি বাচ্চা ছেলের পরিবার বাগানের পিচ গাছ গুলোকে কেটে ফেলায় এই উৎসবের সময়ে বাচ্চা ছেলেটি মনোকষ্টে ভোগে। চেতনার স্তর পেরিয়ে অবচেতনে বাচ্চাটা হ্যালুসিনেট করে। দেখতে পায় তার দিদির সংগ্রহের পুতুল গুলো সব জীবন্ত হয়ে উঠে সারবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে। তারা বাচ্চাটাকে ভর্ৎসনা করছে পিচ গাছ গুলোকে কেটে ফেলার জন্য। কিন্তু যখন বুঝতে পারে ওই পিচ গাছ গুলোকে নিয়ে বাচ্চাটার অদম্য ভালোবাসা পুতুলেরা ঠিক করে একবারের জন্য হলেও ওই ছেলেটিকে ফুলে ভরে ওঠা পিচ গাছ আবার দেখাবে। জাপানীরা বিশ্বাস করে পুতুলেরা খারাপ আত্মাকে ঠেকায়।

পরের স্বপ্নের বিষয় ‘তুষার ঝড়’। চারজন অভিযাত্রীদের একটা দল প্রবল তুষার ঝড়ে আটকে পড়ে বাঁচার জন্য প্রবল লড়াই করছে। পরিস্থিতি এমন যে তারা ক্রমশঃ বুঝতে পারছে মৃত্যু অবসম্ভাবী। যদিও অভিযাত্রী দলের নেতা বাঁচার চেষ্টা করে চলেছে আপ্রাণ। তবুও সেই ঝড় কে দমন করে মৃত্যুকে অতিক্রম করা একপ্রকার অসম্ভব। ঠিক তখনি এক রহস্যময়ী নারীর আবির্ভাব ঘটে। কেউ জানে না কোথা থেকে এই নারীর আগমন। সে চেষ্টা করে শেষ চেতনা সম্পন্ন মানুষটিকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে। এবং অতিলৌকিক প্রক্রিয়ায় জাগিয়ে তোলে দলনেতাকে। তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়। বেঁচে ওঠা দলনেতা বাকীদের চেতনা ফিরিয়ে আনে। তুষার ঝড় থেমে আসে, দেখা যায় তাদের ক্যাম্পও বেশী দূরে নয়। মানুষের অন্তরের ভালোবাসা আর জীবনে এগিয়ে যাবার স্পৃহা থাকলে মানুষ একসময় তার লক্ষ্যে পৌঁছয় এই স্বপ্ন সেই বিশ্বাসকেই যেন প্রতিষ্ঠিত করে।

পরের গল্পের নাম সুড়ঙ্গ। স্বপ্নের বিষয় বস্তু যুদ্ধ। এই যুদ্ধ নামক ধারনার ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রনেতাদের স্বার্থসিদ্ধি খুবই সাধারণ একটা শঠতা আমাদের বাস্তবতায়। এ বিষয়ে কারোর মনেই কোন ধোঁওয়াশা থাকা উচিত নয়। একজন জাপানী অফিসার যুদ্ধ শেষে বাড়ী ফেরার পথে একটা লম্বা সুরঙ্গের সামনে এসে দাঁড়ায়। হঠাৎই যুদ্ধে মারা যাওয়া এক সৈন্য সেই অফিসারের সামনে এসে উপস্থিত হয়, জানতে চায় কেন তাকে কুকুরের মত মরতে হলো। তার মা তো তাকে মৃত দেখতে চায়নি। তার মুখটা যেন মৃত্যুর মত হালকা নীল রঙের। সেই সৈন্যটি যেন তার মৃত্যুকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তবুও তাকে তার মৃত্যুকে মেনে নিতেই হবে। বিশ্বাস করতেই হবে। মৃত্যুকে মেনে নেবার কথা শুধু মাত্র এই একজন বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত জাপানী সৈনিকদের জন্য প্রযোজ্য নয়, বরং কেন তাদের এই ভাবে যুদ্ধে মরতে হলো এই প্রশ্নটা পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও যুদ্ধবিরোধী প্রতিটা মানুষের মনের কথা হয়ে ওঠে। ছবির ওই টানেলের মধ্যে দিয়ে পরিচালক আমাদের মনের সুরঙ্গে ঢুকে যান সহজেই, একটা যুদ্ধ বিরোধী মনোভাব তৈরী করার জ্ন্য। এই মনোভাব তৈরী করাই যেন তাঁর স্বপ্ন।

ভিনসেন্ট ভ্যানগগকে দেখা গেল পরের স্বপ্নে। যাদু বাস্তবতার মোড়কে। একটা উজ্জ্বল পৃথিবী তো সবার স্বপ্ন যেখানে যেমন রঙ থাকবে তেমনি সেখানের মানুষ হবে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষন ক্ষমতার অধিকারী। উল্লেক্ষযোগ্য বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক মার্টিন স্করসেসি এই ছবিতে ভ্যান গগের চরিত্রের অভিনয় করেছিলেন। ছবি নিয়ে পড়াশোনা করে একজন ছাত্র নিজেকে খুঁজে পায় শিল্পী ভ্যানগগের ছবির মধ্যে যেখানে সে শিল্পীর মুখোমুখি হয় একটা গমের ক্ষেতে এবং তার সাথে কথোপকথন চালায়। ছাত্রটি হঠাৎ শিল্পীকে পথের মধ্যে হারিয়ে ফেলে এবং তাঁর অন্যান্য ছবির মধ্যে দিয়ে তাকে খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। ভ্যান গগের ছবি ‘হুইট ফিল্ড উইথ ক্রোজ’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই স্বপ্নে। এই অংশের সঙ্গে শপ্যাঁর ১৫ নম্বর প্রিলিউড ডি ফ্ল্যাট মেজরে। ভ্যান গগের জীবন ও কাজের মধ্যে দিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রাণ ভরে দেখে নেওয়ার ছোট্ট কিন্তু উল্লেখযোগ্য উপস্থাপন এই ‘ক্রো’ শিরোনামের স্বপ্নটা।

পরের স্বপ্নদুটি মূলত দুঃস্বপ্নই। এবং তারা পরস্পর সম্পর্কে যুক্ত। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে যা মাউন্ট ফুজির কাছে অবস্থিত তা হঠাৎই গলতে আরম্ভ করে। এই পাওয়ার প্ল্যান্ট বিস্ফোরণ হলে কী ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে তা অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘লাল ফুজি পাহাড়’ পর্বেই। পর পর ছয়টি রিঅ্যাক্টর বিস্ফোরণের ফলে ফুজি পর্বত পর্যন্ত চুড়ান্ত লাল বর্ণ ধারণ করেছে। মানুষ পালাচ্ছে। হন্য হয়ে ছুটছে। কিছুটা যাবার পরে বাঁচার তাগিদে সমুদ্রে মিশে যাচ্ছে। এই সিনেমা যখন বানানো হয়েছিল তখন জাপান এই ধরনের বিস্ফোরণের সম্মুখিন হয় নি, কিন্তু সেটাই জাপান বাসী প্রত্যক্ষ করে ২০১১ সালে ফুকুশিমাতে। কিন্তু চেরনোবিলে ১৯৮৬ সালে এরকম দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছিলে তাই ১৯৯০ সালের ছবিতে এই আতঙ্কের উপস্থিতি স্বাভাবিক। ছবির এই স্বপ্ন অংশে নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে বিস্ফোরনের ফলে যখন নিজেদের বাঁচাতে মানুষ সমুদ্রে গিয়েও ঝাঁপ দিচ্ছে তাদের মধ্যে তিনজন প্রাপ্ত বয়স্ক আর দুজন বাচ্চা পড়ে আছে মাটিতে। অচিরেই তারাও বুঝতে পারে রেডিয়েশনের প্রভাবে তাদের মৃত্যুও নিশ্চিত। এই মৃত্যু তো সর্বৈব রাষ্ট্রের প্রতারণা তাদের প্রতি। কারন এই পাওয়াল প্ল্যান্ট নির্মানের সময় তো রাষ্ট্র বলেছিলো পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিরাপদ। মানুষ যদি ভুল না করে তবে কোন বিপদ ঘটবে না। এই মিথ্যে কথার জন্য প্রতিবাদের ভাষা বেরিয়ে আসে এক বৃদ্ধার অন্তর থেকে। বলে ওঠে এই ভয়ংকর প্রতারণার জন্য এই সব পরিকল্পনাকারী রাষ্ট্র নেতাদের যদি ফাঁসি না হয় সে নিজে তাদের হত্যা করবে। আর এই কথার উত্তরে আরেক বৃদ্ধের মুখ দিয়ে পরিচালক বলিয়ে নেয় তার আপ্তবাক্য – চিন্তা করোনা। তেজস্ক্রিয়তা তোমার হয়ে সেই হত্যার কাজ করে দেবে। মানুষ বিশেষত বিজ্ঞানীরা ভুলে গেছে যে তারা হয়তো বুদ্ধিমান, কিন্তু তারা প্রকৃতির হৃদস্পন্দন অনুভব করতে জানে না। তারা এমন সব জিনিষ বানায় যে শেষ মেশ মানুষকে অসুখি করে তোলে। তাদের এই আবিষ্কার গর্বিত করে কারণ বুদ্ধিহীন জনগনের সমর্থন তারা পেয়ে গেছে।

এই স্বপ্নের রেশ টেনে পরিচালক কুরোসাওয়া তার স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যায় পরের পর্বেও। স্বপ্ন হলেও তার বাস্তব ভিত্তি কোথাও স্খলিত হয়না। পরিচালক দর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন মানুষ তার মূল্যবোধের অপার ক্ষতিসাধনের ফলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর পরিবেশের ক্ষতি করেছে। এই গল্পে একজন মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে কুয়াশাচ্ছন্ন জনহীন পার্বত্য অঞ্চলে। সেখানে সে দেখা পায় এক শিং ওয়ালা একজন মানুষের। সে বলে – ‘মানুষ থাকা অবস্থায় আমি কৃষক ছিলাম। বাজারে ভালো দাম বজায় রাখতে প্রচুর দুধ আমি নদীতে মিশিয়ে দিয়েছি। কী ভয়ঙ্কর বোকামি করে আলু আর বাঁধাকফি বুলডোজার দিয়ে দ্বংস করেছি।‘ পরিবেশের এই ধ্বংস তাদের এক শিং ওয়ালা প্রানীতে পরিনত করেছে। দুই শিং ওয়ালা দৈত্য কখন তাদের খেয়ে ফেলে এই আতঙ্কে তারা বাস করছে। ড্যানডেলিয়ান ফুল শুধু বেঁচে আছে , গোলাপ হয়েছে দুষ্প্রাপ্য। জেনেটিকালি মডিফায়েড প্ল্যান্টসই এক্মাত্র তাদের অস্তিত্ব ঘোষণা করতে পারছে। বাকী সব গাছপালা অদৃশ্য। পুঁজিবাদ আমাদের চারপাশের যতরকম অন্যায়কে গা সওয়া বানিয়ে ফেলেছে কুরোশোওয়া বলেছেন – এ গুলোর ফল আমাদের ভোগ করতে হবে, যদি আমরা এখুনি চোখ না খুলি।

‘সমস্যা এবং সমস্যার তীব্র রূপের এই সব স্বপ্ন দুঃস্বপ্নের শেষ ভাগে অষ্টম স্বপ্ন হিসেবে আসে ‘ভিলেজ অব দ্য ওয়াটার মিলস’। একজন তরুণ গিয়ে উপস্থিত হয় এক গ্রামে যার প্রান্ত দেশ ধরে বয়ে গেছে একটা শান্ত নদী। সেখানে সে একজন জ্ঞানী বৃদ্ধের দেখ পায় যে একটি ভেঙে যাওয়া উইন্ড মিলের চাকা ঠিক করছিল। সেই তরুণ যখন ওই বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করে – ‘আপনাদের গ্রামে বিদ্যুৎ নেই?’ বৃদ্ধ উত্তর দেয় – ‘ দরকার পড়ে না। আসলে মানুষ আরাম আর আবেশে খুব সহজেই অভ্যস্থ হয়ে যায়। তারা মনে করে যে আরাম আয়েশেই উন্নতি। আর এটা করতে গিয়েই তারা উপযোগী জিনিষকে দূরে সরিয়ে দেয়।‘ সহজ কথায় তারা বেঁচে আছে আধুনিক উন্নত টেকনোলজির দূষণ থেকে। বিস্মিত তরুণকে সেই বৃদ্ধ জানায় যে তারা এই গ্রামে কেউ গাছ কাটেনা। ওই গ্রামে বিধান দেবার মত কোন মন্দির বা পুরোহিত নেই। দীর্ঘজীবী হয়ে মৃত্যুর পর তারা সেই মৃত্যুকে নিয়ে জীবনের মতোই উৎসব উজ্জাপিত করে। এই ছবি শেষ হয় এক বৃদ্ধের মৃত্যুর শোকযাত্রা দিয়ে সেখানে গ্রামের মানুষ দুঃখের বদলে আনন্দ করছে কারন তারা মনে করে মৃত্যুই হলো এক সুন্দর জীবনের যথাযথ পরিনতি। ওই বৃদ্ধ মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ প্রকৃতির একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র যেটা সে প্রায়সই ভুলে যায়। সেই জন্যই তারা প্রকৃতি ধ্বংসের মহোৎসবে মেতে ওঠে যে প্রকৃতির ওপরেই মানুষের জীবন নির্ভরশীল। মানুষের জন্য সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্মল বাতাস, পরিষ্কার জল, গাছ মাটি। কিন্তু বররমান সময়ে সব কিছুই নোংরা। দুষিত। পৃথিবীর সর্ব প্রান্তের, সর্বকালের সচেতন মানুষের মনের কথা যেন ধ্বনিত হয় এই বৃদ্ধের সংলাপে। আমরা তো আকাঙ্খা করি, স্বপ্ন দেখি ওই ওয়াটার মিলের গ্রামের মতোই একটা পৃথিবী।

পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর ব্যাক্তিগত আভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার গুনে এই স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্নগুলো নির্মান করেছিলন। আর যথার্থ ভাবেই সেই সব দুঃস্বপ্ন বর্তমান পৃথিবীর প্রাকৃতিক, সামাজিক, মানসিক দূষনের বিষবাষ্পে আক্রান্ত প্রতিটা মানুষের উদ্বেগকে স্মরণ করায়, এবং তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এত বিপর্যয়ের মধ্যেও মানুষকে আশাবাদ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দেখতে উজ্জীবিত করে।

Amitava Chakrobarty
 যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। কর্ম জীবন শুরু হয়েছিল অভিনয়ের হাত ধরে থিয়েটারে। ফটোগ্রাফি চর্চার প্রতি অদম্য ভালোবাসা ছিল ছোট বেলা থেকেই। কিন্তু এই চর্চাকে কখনোই জীবন জীবিকা হিসেবে দেখেনি বরং পরবর্তীতে অভিনয় থেকে কর্মজীবন প্রতিস্থাপিত হয়েছিল চিত্র পরিচালনায় এবং চিত্রনাট্য রচনায়
 দীর্ঘ ২০ বছর টেলি ছবি, ছোট ছবি এবং দৈনিক ধারাবাহিক পরিচালনার এবং সিনেমা চর্চার অভিজ্ঞতা নিয়ে বর্তমানে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত। 

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *