An Open Letter to Myself by SWARNENDU SENGUPTA

বাংলা English

আমি যখন আমাকে লিখি

অন্ধকারের সঙ্গে কথা বলি। সেইসব কথা, যা এতোদিন প্রকাশ্যে বলিনি। কথার সঙ্গে কিছু ভাবনা থাকে, ভাবনা কখনো কথা জুগিয়ে চলে। 

লিখছি যখন, আমি, তাকিয়ে আছি আমি-র দিকে। আমার আর এক আমি, এটা অবশ্য বেশ একটা গোপন বোঝাপড়া, যতটা গোপন নয়, আমার বউয়ের নানা আছিলায় আয়নার সামনে এলে একফাঁকে একটু নিজেকে দেখে নেওয়া। এটা হয়, নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে থাকা, সেই কবে থেকে এর শুরু, তা আর বলতে পারব না।

এক একদিন এক একরকমের আমি-র মুখোমুখি হই। মিলগুলো খুঁজে দেখার আগে, এতো অন্য, এতো অমিলের আলোয় চোখ ঝলসে ওঠে ! চারপাশের অমিলগুলো, কিছুতেই মেলানো যায় না এমন দৃশ্যগুলোর ভিতর দিয়ে যেতে যেতে এই একটু আগের আমির সঙ্গে এখনের আমি-র অমিল টের পাই, সংঘাত টের পাই।

সামনে একটা মস্ত গাছ, আমি তাকালাম। নতুন কিছু দেখার জন্য তাকানো না, সেই পুরানো-কে নতুন করে দেখার জন্য যতটা। আমি দেখি, আমার দেখার ধরনটিকে, এও আসলে আর একভাবে আমাকেই দেখা। এভাবেই শুনি, এভাবেই চিনি, এভাবেই জানি। এই দেখা-শোনা-চেনা-জানা’র সঙ্গে আমার ঘর অনেকদিনের। এই দেখাশোনাচেনাজানা দিয়ে-ই একজন নিজেকে গড়ে তুলে, ভাঙে, তারপর আবার গড়ে।

প্রতিবার একটা রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি, একফাঁকে, লাগোয়া বড়ো রাস্তাটি দিয়ে যাওয়ার সময়। জীবনের প্রায় অনেকটা কাটিয়ে দেওয়ার পরও, কোনদিন ঐ রাস্তাটি ধরে চলে যাওয়া হয় নি যেখানে যেখানে নিয়ে যেতে পারে রাস্তাটি। ভেবে দেখতে গিয়ে, এটা বুঝেছি, সারাজীবন চেনা রাস্তার বাইরে খুব একটা যাওয়া হয় না আমাদের। তবু তার কতটা ?

সময়, কী ভীষণ কুয়াশাচ্ছন্ন একটি রাস্তা। একমাত্র রাস্তা সম্ভবত, পেছনদিকে হেঁটে যাওয়া সহজ যেখানে, বাধাহীন। সেই রাস্তার কোথাও একফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াবুড়ি, পমি খঁড়ি-রা সব। সেই এক বুড়ি যার ইয়া ইয়া ডাকের সঙ্গে মিশে থাকা খিলখিল হাসিতে ভীত, শঙ্কিত আমার ছোটোবেলা এখনও কেঁপে কেঁপে ওঠে। একা, নিঃসঙ্গ পমি খঁড়ির পচে যাওয়া মৃতদেহ সারি সারি পিঁপড়ের দল নাকি খুবলে ছিঁড়ে খাওয়ার পর তার মৃত্যুর খবর একচিলতে কুঁড়ে ঘরের বাইরের পৃথিবী আঁচ পেয়েছিল। এই ছবিগুলো থেকে গেছে, তারাও আছে, তাদের না-থাকার শূন্যতা যতটা কুয়াশাচ্ছন্ন, ধূসর,  জীবনে রহস্যময়তা শব্দটি ততখানি স্পর্শযোগ্যতায় অটুট রয়েছে। তাদের খুঁজে ফিরি যখন, কোন সেই ফেলে আসা স্মৃতিজটিল পথ ধরে, কোন আমিকে খুঁজে ফিরি আসলে ? কেউ চলে গেলো না, হারালো না, সকলে সবকিছু মিলে শুধু আমাকেই গড়ে তুলছে, গড়ে চলেছে। যা কিছু আমার স্মৃতির অংশ হয়ে আছে, সেসব আসলে এই আমি-র এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বই কিছু নয়।  

এসব কথাগুলি ঠিক এভাবে-ই কি বলিনি আমাকে, আগে, কোনোদিন ? সকল উচ্চারিত বাক্যের সীমা অনেকগুণ ছাড়িয়ে যায় আমাদের অনুচ্চারিত কথাগুলি। অনুচ্চারণ, অর্থাৎ নিজেকেই বলা নিজের কথাগুলি। তারাও কি হারিয়ে যায় স্মৃতির ধূসর সঞ্চয় থেকে ? হারায় না কিছুই, সম্ভবত। কথার মতো কিছু ছবি ফিরে ফিরে আসে। অনেক অসংখ্য ছবি, সেই স্মৃতিজটিল পথের, ধরা হয়ে আছে। সেই ছবিগুলো একটির পর আর একটি সাজিয়ে নিলে যা গড়ে ওঠে, তা আসলে কী ? আমার দেখার ধরন, না, এই আমি-র আর এক রূপ ? 

আজ আমাকে লিখছি এসব কথা। লিখছি যখন, আপন হতে বাহির হয়ে, আমারই দিকে তাকিয়ে দেখছি। এই দেখার ভিতরে লুকিয়ে থাকে সেই গোপন ইচ্ছেটি। একটু জেনে নেওয়া, একটু বুঝে নেওয়া এই আমিকে। তবু তার কতটা বুঝেছি,কতটা জেনেছি ? 

আমাকে আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। যে আমাকে দেখি, যে আমাকে বুঝি, তার একটা মন আছে। মন! এইখানে একটা কথা বলে নিই, এই মনটাকে দেখতে চেয়েছি যতবার, চোখের পাতাদুটি বন্ধ হয়ে এসেছে। খোলা চোখে তাকে দেখা যায় না। আমাদের চোখ খোলা থাকে যখন, চোখের সঙ্গে সেও দেখে। মন দিয়ে দেখা। একইভাবে, মন দিয়ে শোনা। কান শোনে, মন দিয়েও তো শোনা যায়। যে দেখাশোনাচেনাজানা দিয়ে আমি আমাকে গড়ে তুলি, তার সঙ্গে মন-এর একটা বোঝাপড়া থাকে। কিন্তু এই মনটিকেই যখন দেখতে চাইব ? গভীর এক নৈঃশব্দ্যের মাঝখানে এসে, চোখদুটি বন্ধ করে দাও । আমরা সকলে জানি, চোখ দুটি বন্ধ হয়ে গেলে, থাকে শুধু অন্ধকার!

এই অন্ধকারের ভিতরেই কি রয়ে গেছে আমাদের মন, তাকে আসলে টের পাই নৈঃশব্দ্যের ভাষা দিয়ে নিরন্তর বলে যাওয়া কথাগুলির মাধ্যমে, এই একার সঙ্গে একার বিরতিহীন বলে যাওয়া কথাগুলোই কি মনের কথা? না, মনের সঙ্গে কথা? 

মন যে দেখে, তা খুব একরকমভাবে জানি। না হলে, পালি ভর্তি গিমা শাক নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে পমি খঁড়ি আমাদের উঠোনে এসে দাঁড়ায় কী করে? কালী মন্দিরের পাশে, ঠিক পাশে নয় সামনে, সার সার দাঁড়িয়ে থাকা বট অশ্বত্থ গাছের কোটর থেকে বড়ো, কালো পোকাগুলোকে কাঠিতে করে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে আনি। তর্জনীর চাপে পোকাটিকে ধরে থাকলে সে ঠক ঠক করে মাথা ঠুকে, কী নাম পোকাটির? কাট-ঠোকরা পোকা বলা যায় তো? আমি নামের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। একজন জানায়, পোকাটির নাম টকটকি পোকা। তারা পোকাটিকে টকটকি পোকা বলেই জানে। তবে এটা পোকাটির ভালো নাম নয়। ভালো নাম আছে একটা, সেটা এখনো খুঁজে পাওয়া যায় নি। 

তবু একটা নাম খুঁজে পাওয়া গেছে পোকাটির, কিন্তু সেই গাছগুলো? পাড়ার কিছু মোড়ল, তারাই রক্ষক-ভক্ষক, একদিন সব গাছ কেটে বিক্রি করে দেয়! গাছ কেটে উন্নয়ন। তো, সেই গাছগুলোর সঙ্গে দেখা হয় এখনো, কীভাবে দেখা হয়? যাক সে কথা, দেখা যে হয়, তা জানি। কিন্তু অন্য দু-পাঁচজন লোক ডেকে তাদের আর দেখাতে পারি না। 

দেখি যখন, মন দিয়ে দেখি। তাদের ছায়ায় গিয়ে দুদণ্ড বসি।

চোখ বন্ধ করলে, শুধু অন্ধকার। সেখানে বিস্তর কিছুর আনাগোনা। আমার অন্ধকারের সঙ্গে দেখা হয়। কথা হয়।

Swarnendu SenGupta
   শূন্যদশকে আত্মপ্রকাশ, স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত কবিতা ও কবিতা বিষয়ক লেখালিখিতে বিশেষ আগ্রহী। ধানইন্দিরা প্রথম কবিতার বই, এছাড়াও আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত। কবিতার অনুবাদ হয় না, কবিতার ক্ষেত্রে অনুসৃজন শব্দটির ব্যবহার ও মেনে নেওয়ার ইচ্ছে এখান থেকেই। এখনো পর্যন্ত মার্গারেট এটউড ও যোশেফ ম্যাসির কবিতার অনুসৃজন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গুয়ান্তানামোর কয়েদিদের কবিতা, সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিকথার অনুবাদ, সংকলন ও সম্পাদনা নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।  

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *