An Open Letter to Myself by ahmed faruk mir

বাংলা English

নিজেকে লেখা চিঠি

প্রিয় পঙ্খীরাজ, তুমি এত যে ছুটতে চাও, আরও কতটুকু ছুটতে বাকি থাকে, বল তো! এ ছোট্ট জীবনে তোমার জন্য কতটুকু ছোটা সমীচীন, তুমি কী জানো তা? গল্প জানো তুমি? আজ একজন নাবিকের গল্প শুনবে প্রিয় পঙ্খীরাজ? আজ তোমায় একজন নাবিকের গল্প শোনাবো, যার শরীর জুড়ে বসবাস করে সমস্ত সামুদ্রিক পাখিরা। যার হৃদয়ে জমে থাকে জলের শীৎকার। যার আঙুল থেকে অনন্তকাল ফোঁটাফোঁটা ঝরে পড়ে জলবিন্দু এবং সমুদ্র। সে এক সামুদ্রিক শুশুকের মতো! সে এক জলাচ্ছাদিত পানকৌড়ির মতো। সে জল ভালোবাসে! তুমি অবাক হবে, আমিও জল ভালোবাসি।

গল্পটি তুমি বুঝতে পারছো? যদি না পারো তবে আজ থাক। আজ তোমাকে অন্য কথা বলি।

প্রিয় পঙ্খীরাজ, এই যে ভালো আছো বলে উত্তর দাও; এই যে ভালো আছো বলে মনে হয়; এটুকুই কি ভালো থাকা? এটুকু কি দুরন্ত সে নাবিকের দুঃস্বাহসের চেয়ে কম? এত সাহস কেন তোমার? এত কেন পারো তুমি কপটাচার? থামতে চাও না, হারতে চাও না, কেবল ছুটতে চাও! এত কেন ছুটতে হয় তোমাকে? এত কেন বেঁচে থাকা প্রয়োজন? এত কেন ভালোবাসা চাও? এত কেন কাঙালপনা করো তুমি? এই অদ্ভূৎ বেঁচে থাকার মধ্যে যে মাদকতা আছে তা সত্য কিংবা মিথ্যা, তা বাস্তবিক কিংবা না, তা বায়বীয় কিংবা স্থানু তা কে জানে? কে জানতে চায়! তাহলে এত ভেবে কী লাভ?

বুদ্ধিমানরাও কী  তোমার মতো এত ভাবে? বুদ্ধিমানরাও কী  তোমার মতো এত চুপিচুপি প্রশ্নে  প্রশ্নে নিজেকে জর্জরিতা করে? হয়ত করে, হয়ত করে না।

প্রিয় পঙ্খীরাজ, তুমি হয়ত জানো না, বৃদ্ধ কবিরা সব মারা গেছেন। বৃদ্ধারা এখনও আটপৌরে হয়ে জবুথবু বেঁচে আছেন। প্রেমিকদের জন্য চোখের জল নিস্তেজ। ওরা একা এবং জীবনের প্রতি ভীতু এবং নিরাশ। অথচ তুমি এতকাল বেঁচে থাকবে কেন বলতো? এ জগতে একটি কবিতা লিখতে ব্যয় হয় একটি সমস্ত জীবন। অথচ একই জীবনে প্রতিষ্ঠা করা যায় বিবিধ মিস্ত্রি, একজন জলকর, রঙ্গবালক, মুনাফাকৌশলী এবং আরও অসংখ্য মাননীয়।

পঙ্খীরাজ, অথচ তুমি বেঁচে থাকো কেবল একটি গল্প লেখার জন্য! এ কেমন তোমার জীবনচারণ! এ কেমন তোমার বুদ্ধির বাহাদুরী?

এক জীবনে প্রেম এতবার আসতে পারে কেমন করে! এক জীবনে এত গল্প আসতে পারে কেমন করে? কেমন করে সুবোধ সুন্দরীদের দেখলেই তুমি বিগলিত হয়ে পড়ো! এ কেমন নির্লজ্জতা? এ কেমন অবিশুদ্ধ অভিসন্ধি তোমার? এত লাম্পট্য কেন একটিমাত্র সামান্য জীবনে?

প্রিয় পঙ্খীরাজ, এসবের বাইরে আরও আছে অসংখ্য প্রশ্ন। ঠিক যেমন, “কেমন অবস্থায় থাকাটাকে বলবে, তুমি ভালো আছো?” লোককে বলার জন্যই যদি বলো, তা কি সত্যিই তোমার ভালো থাকা? অথচ এ কি নিজের সাথে নিজেরই বুজরুকি নয়? তবে কীভাবে থাকাগুলোকে ভালো থাকা বলে? তুমি কি সত্যিই জানো? কেউ কি জানে প্রিয় পঙ্খীরাজ?

পঙ্খীরাজ, যা ছেড়ে আসো, তাও কেমন তোমায় টানে; তাই না বলো! কেমন অদ্ভূত মনে হয় চারপাশ! মনে হয় না? মনে হয় না; যদি ফিরে যেতে পারতে! যদি একই সাথে পাশাপাশি আবার হাঁটা যেতো! যদি আবারও অতিক্রম করা যেতো মুহূর্তকালের বিনিদ্র রাত! অথচ এসব ভেবে মাঝে মাঝে হাসিও পায় তোমার, তাই তো পঙ্খীরাজ? ওটা কিন্তু আনন্দ নয়। ওটা দুঃখ! দুঃখ বারবার আসে। আনন্দও বারবার আসে। কোন কিছুই নিরবচ্ছিন্নভাবে তোমার হয়ে থাকে না। প্রেমও নয়, প্রেমিকাও নয়।

আজ তোমায় এসব বলছি। এই চিঠিতে বলছি। কারণ কী জানো? আজ বড় উদাস লাগছে। বড় অস্থিরতা নিয়ে লিখছি তোমায়। আজ আমায় ক্ষমা করো।

পঙ্খীরাজ, যদি একই বৃত্ত থেকে সামনের দিকে তাকাও! এটুকু মোটা দাগে সত্য নয় যে, তুমি অপেক্ষা করো সেসব সবুজের জন্য, যা তুমি দৃঢ় সংকল্পে ছুঁতে চাও, যা ছুঁতে আরও কিছুদূর হেঁটে যেতে হবে বলে ভাবো! এও তো মিথ্যে নয়। তবে তুমি কোন দিকে যাবে বলে ভাবছো? তুমি কি জানো পঙ্খীরাজ, কোথায় তোমার বিধিবদ্ধ সুখ? তুমি জানো না। কেউ জানে না।

শৈশবের আলো ঝলমলে সকালটা পেরিয়ে এসে তুমি পেয়েছো একটি ঠাণ্ডা কৈশর এবং এখন তুমি একটি টগবগে পঙ্খীরাজ হয়ে ছুটছো। সবই কেমন শাঁইশাঁই লাগে! কেমন করে ওসব চলে যায়? কেমন করে আসে? তুমি কিছু বুঝতে পারো? বুঝতে পারার জন্য তোমার কোন চেষ্টাই বা থাকে? থাকে না, তাই তো; তাই না? তাহলে শুধুশুধু এত ভাবনা বা আসে কোথা থেকে?

পঙ্খীরাজ, তুমি কি জানো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতির নাম কী? জানো না? বেশ, আমিই বলে দিই। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতির নাম প্রেম। তবে কি জানো, প্রেমে ফেঁসে যেতে নেই। প্রেমের জন্য শোক করতে নেই। প্রেমের জন্য অনুতাপ করতে নেই। প্রেমের জন্য শোধ নিতে নেই। প্রেমের জন্য বিদ্বেষে জ্বলতে নেই। তুমি প্রেমকে প্রেমের মতো ছেড়ে দিতে পারো। প্রেম নিয়ে বায়োস্কোপ খেলা শোভা পায় না। প্রেমকে ভালোবেসো। ভালোবাসাকে ভালোবেসো। ভালোবাসা এবং প্রেম জীবনে খুব বেশিবার আসে না।

পঙ্খীরাজ, তুমি যাকে ভালোবাসো সে রূপসী নয়। তার নয় টানাটানা চোখ। গল্পকন্যার মতো বাঁকা ভ্রু নয় তার। তার পা নয়  গোলাপের পাপড়ির মতো গোলগাল। তার কণ্ঠ নয় দোয়েলের মতো মিষ্টি। কিন্তু তোমার প্রেমিকার আছে গল্প হয়ে ওঠার অদম্য ইচ্ছা। গল্প হয়ে থাকার অদম্য বাসনা। প্রাণবন্ত নারী বিপ্লবকালে প্রজ্ঞাবতি কথাটি তোমার প্রেমিকার ক্ষেত্রেই প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। তুমি ভালোবাসো। ভালোবাসো হৃদয় দিয়ে। অনুভূতির সমস্তটুকু দিয়ে ভালোবাসা গ্রহণ করো। ভালোবাসো পুনরুত্থানের যন্ত্রণাময় গল্পগুলো হৃদয় থেকে মুছে ফেলে। কারণ, একমাত্র পুনরুত্থানই তোমাকে পেছন থেকে টেনে ধরে। তোমাকে যা পরিপূর্ণ অনুভব করতে বাধা দেয়, তাকে দ্রুততম সময়ে ডিঙিয়ে যাও। তাকে অতিক্রম করো ভালোবাসা এবং প্রেমের জন্য। 

প্রিয় পঙ্খীরাজ, খুব ঝড়ের মতো ভালোবাসা প্রায়ই আসে না। এবং ভালোবাসাকে গ্রহণ করতে জানাও এক মহত্মর শক্তি। সুতরাং ভালোবাসাকে জয় করা এবং শ্রদ্ধা করা যায় বলেই পবিত্র আত্মারা বলেছেন। অতঃপর তাকে ভালোবাসা যায়, যার চিন্তাশক্তি সমস্ত জগত ছুঁয়ে যেতে উৎসুক থাকে। তাকে ভালোবাসা যায়, যে ভাবতে ভালোবাসে। যার অন্তর্দৃষ্টি প্রখর এবং যার হৃদয়াবেগ নিয়ন্ত্রিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নয়। 

প্রিয় পঙ্খীরাজ, এসমস্ত কিছুর মতোই সত্য, যেমন তুমি ভালোবাসো তোমার প্রেমিকার অন্তরের গভীরতম বোধকে। সুতরাং তুমি জানো, বোধ এবং চিন্তাশক্তিই তোমাকে এবং তাকে অসংখ্য অন্যদের থেকে পৃথক করেছে।

কেউ কেউ সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে এবং ভীত থাকে এবং প্রায়শই কন্নায় ভেঙে পড়ে। তুমি ওসব ভালোবাসাকে ধরে রাখো ভালোবাসা দিয়ে। মমতা দিয়ে আগলে রাখো। এসব উপদেশ নয়। এসবই ভালোবাসার জন্য ভালোবাসা। যে নারী হৃদয় তোমাকে অভিযোগ করে মমতার জন্য, সে তোমাকে অজস্র ভালোবাসে। তাকে মমতা দিয়ে আগলে রাখার শক্তি থাকা চাই। অথচ তুমি কি পারো তা? পারবে বলে মনে হয়? সুতরাং নিরন্তর চেষ্টা করে যাওয়াই হোক তোমার মহত্মর সাধনা।

প্রিয় পঙ্খীরাজ, যত দ্রুতই তুমি ছুঁটে চলো, পথ আরও বেশি দূরে, পথ আরও বেশি কুয়াশাচ্ছন্ন। অথচ আরও একটি সত্য তোমার জন্য অপেক্ষমান। সত্যটি হলো “সমস্ত পথ নাগালের মধ্যেই।”  

তোমার কি শিশির ভালো লাগে? অথবা শিশির নামের কোন মেয়ে? শুষ্ক ডিসেম্বর আসলেই যার কথা মনে পড়ে! তোমার কি কবিতা ভালো লাগে? নাকি কবিতা লিখতে গেলেই মনে পড়ে মেঘ নামের কোন নারী কবির চিবুক! জানি, এসব কথা অকারণ! এক জীবনে হৃদয় জুড়ে জমা হয় অনেক কথা। অনেক মুখ ভেসে ওঠে মুখছবির মতো। অনেক কথা কল্পনায়ই মেঘের মতো ভেসে যায়। অনেকগুলো বিজলি চমকের মতো ফিরে আসে, ফিরে যায়। তবুও এসমস্ত কথাগুলো সবই অহেতুক নয়।

তোমার গন্তব্য বহু দূরে। অনেক কঠিন সে পথ এবং পথের দুপাশ। অথচ তোমার ধাত’ই হলো ছুঁটে চলা। তুমি যা চাও তা তোমার মৃত্যুর পরই আসবে। কিন্তু আগমন নিকটবর্তী। তুমি তখন পৃথিবীর সাথে মিশে যাবে। বৃক্ষ, বাতাস ও ধুলোর সাথে মিশে থাকবে। কিন্তু জগত মনে রাখবে যে তুমি এমনটি চেয়েছিলে, যেমনটি মানুষকে মহান করে তোলে। যেমনটি মানুষদেরকে মমতাময় ও গ্রন্থিত করে তোলে। যেমনটি মানুষকে প্রজ্ঞাবান, অজাত করে তোলে। 

মানুষ এক হউক। মানুষ সমস্ত জীবের জন্যই বাঁচুক। বাঁচুক ভালোবাসার জন্য। 

ভালো থেকো প্রিয় পঙ্খীরাজ। ভালো রেখো…

AHMED FARUK MIR
 জন্ম- ভোলা, বাংলাদেশ  প্রকাশিত বই - ঈশ্বরী (গল্প),সবুজ টিপ কাঁচের চুড়ি (কাব্য),জোয়ার বাঁশি ও খুফুর মূর্তি (কিশোর গল্প), নীল নক্ষত্র (উপন্যাস), হিপোক্রেটিক (উপন্যাস), অবিন্যস্ত আলোকরেখা (কাব্য), টুকটুকি (ছড়া)। লেখার বিষয়- বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি। যা মানুষকে ভাবায়। যা পরিবর্তন হওয়া উচিৎ বলে মনে হয়। সুতরাং এসব অসংগতি নিয়ে ভবিষ্যতে নানামূখী কাজ করার আগ্রহও রয়েছে। খুব ছোট বয়সে "পথের পাঁচালী" উপন্যাস এবং তাঁর লেখকের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। বর্তমানে লেখার মূল বিষয় ছোটগল্প এবং কবিতা।    ahmed86farukmir@gmail.com    

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.