a WRITING by shubhamoy sarkar

বাংলা English

‘একটি কুঁড়ি বারুদগন্ধে…’

লেখক : শু ভ ম য়  স র কা র

করিডোর পেরিয়ে বাঁ হাতের সিঁড়ি দিয়ে নামার মুখেই পেছন থেকে উড়ে এসেছিল প্রশ্নটা- আপনার স্বপ্নের রঙ কী? চিরকালই জিন্স-টী শার্টে সপ্রতিভ আমি সেদিন পাঞ্জাবি পরেছিলাম, অনেকদিন পর আকাশে মেঘ, নিস্তরঙ্গ একঘেয়ে করলা সেদিন তিস্তামুখীনতা ছেড়ে অন্যরকম সুর তুলেছিল, কলেজ ক্যাম্পাসের ইউক্যালিপটাস,কৃষ্ণচূড়াগুলোও পড়ন্তবেলার বিষণ্ণতা ভুলে একটু যেনো অন্যরকম…!

-নীল

-আমার ধূসর…!

দু’জনের স্বপ্নের রঙ মেলেনি কিন্তু পথ হেঁটেছিলাম আমরা, তারপর হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে এক নদীর সঙ্গে দেখা,সে নদী সাক্ষী রইলো আমাদের কথোপকথনের,আমাদের নীল আর ধূসর রঙিন স্বপ্নের…! আমাদের কথোপকথনে এলো শুভংকর-নন্দিনী। আবহমান ধ্বংস ও নির্মানের সময় সেটা, বাতাসে বারুদগন্ধের শেষটুকু মিলিয়ে যায়নি তখনো, বৃষ্টিভেজা সময়ে আমরা অনুভব করলাম প্রেমের মূলেও আছে ভিটামিন, আমাদের রোমান্টিক স্বপ্নে তখন ডানা মেলছেন শীর্ষেন্দু, পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি মানবজমিনের একখন্ড। দীপনাথের চোখ দিয়ে চারপাশে মণিদীপা বোসের সন্ধানে কেটে যায় একেকটি বিষণ্ণ সন্ধে। সময় এগোয়, তিস্তার জল একইভাবে বহে যায়, আর সেই স্রোতের দিকে তাকিয়ে আমাদের স্বপ্নে নেমে আসে আরও কিছু ভাবনা, যা এতোদিনের রোমান্টিকতার থেকে অনিবার্য এক টেক-অফ। তবে কি আমরা বেরিয়ে যাচ্ছিলাম প্রেম, ভালোবাসার সুখী-বিসুখী ভাবনা থেকে! নাকি ধীরে ধীর ঢুকে পড়ছিলাম আরও এক অন্যরকম রোমান্টিক ভাবনায়, স্বপ্নে, যেখানে একটু একটু করে ফিরে আসছে বারুদগন্ধ, ভরে উঠছে তিস্তা, কলেজস্ট্রিটে ফের নামছে রহস্যময় সন্ধ্যা, হিন্দু হস্টেলের পাশের গলিতে যুবকটি পালাতে পালাতে ‘কলকাতা৭১’ এর ব্ল্যাক ক্যানভাসের মতো মুন্ডু হয়ে প্রশ্ন করছে আমাদের…! আসলে সময় যে তখন গর্ভবতী।

না, আমি বারুদগন্ধের সে’সব দিন দেখিনি, আমি যখন বড় হচ্ছি তখন সবই শান্ত এবং ভালো, সত্য তখন হচ্ছিল জমকালো! আপাতত শান্তিকল্যাণ হয়েই ছিল সব কিছু। স্থিতাবস্থার সেই সুদিনেই দেখতে দেখতে হঠাৎ যেদিন যুবক হলাম,অনিবার্য প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হলাম,নিজেই নিজের কাছে..! তারপর এবং তারও পর স্বপ্নে এলো এক অন্যরকম রোমান্টিসিজম, স্বপ্নে তখন অনিমেষ-মাধবীলতারা বাসা বাঁধছে, জেলাস্কুলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে অনিমেষের গলা যেনো শুনতে পাচ্ছি, হস্টেলের ঘরের দেওয়ালে জিনাত আমনের পোস্টার সরে জায়গায় করে নিচ্ছেন চে, হস্টেল সংলগ্ন শিরিষতলায় লোডশেডিংয়ের আধো-অন্ধকারে নিরাপদ আন্দোলনের ঘেরাটোপে আমাদের বোঝানো হচ্ছে–ওসব বারুদগন্ধের স্বপ্নে বাস্তবতা কম, স্থিতিশীলতা কম, হঠকারী, স্বপ্নের রোমান্টিকতায় ভরা। আমরা কজন মাথা নাড়ছি, বিশ্বাস করতে চেষ্টা করছি কিন্তু রাতে স্বপ্নে ফের নেমে আসছে বোকা অনিমেষ আর মাধবীলতা, কালো ক্যানভাসের ভেতর থেকে ভেসে উঠছে সেই ছেলেটির মুখ, প্রশ্ন করছে, আমাদের ভাবনা আর বিশ্বাসগুলো তছনছ হয়ে যাচ্ছে…! ঘুম ভেঙে যাচ্ছে আমার। শেষরাতে দূর থেকে কেটে কেটে ভেসে আসা হিন্দি ফিল্মিগানের কলি শোনা যাচ্ছে, আমি ফের ঘুমিয়ে পড়ি, প্রশ্ন করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ি। প্রেসিডেন্সিফেরৎ আমার খুন হয়ে যাওয়া ছোটকাকু সেই কবে,আমার বালকবেলায় শিখিয়েছিল – প্রশ্ন করবি,সব কিছুতে প্রশ্ন করবি,নিজেকেও প্রশ্ন করবি… ‘! সেই থেকে আমি প্রশ্ন করি,নিজেকেও। প্রতি ছুটিতে হিন্দু হস্টেল থেকে বাড়িতে আসতো ছোটকাকু,তারপর একদিন আর ফিরলো না, শুনলাম জীবিত অবস্থায় শেষ দেখা গিয়েছিল দমদম লীলা সিনেমাহলের কাছে। আসলে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতো,আজ থাকলে জিজ্ঞেস করতাম – ছোটকা,তোমার স্বপ্নের রঙ কী?  আমি নিশ্চিত, অনিবার্যভাবে লালই হতো।

রাত বাড়ে, দু’হাজার একুশের এই আটাশে জুলাই, বাইরে আজ উত্তরের শ্রাবণধারা। আপাত নিরাপদ এক টেবলে মুখোমুখি আমি আর কম্পিউটার, কী বোর্ডে আঙুলের চঞ্চল চলাফেরা। আমি ধীরে ধীরে বিস্মৃত হচ্ছি সেইসব ম্যাড়ম্যাড়ে, নিভুনিভু ক্রেডেল মেসিনের কালিঝুলি মাখা ঘরগুলো, ছোটছোট কাঠের খুপরি-বাক্সে রাখা সীসার অক্ষরমালা, আর আরও রহস্যময় কিছু বিপজ্জনক মানুষদের। আমি ভুলছি হাতে লেখা পোস্টার আর সে’সব সেঁটে দেওয়ার বিপজ্জনক কিছু দেওয়াল…! এদিকে বাইরে রাত বাড়ে, মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে, কথার ‘পরে কথা…! আজ আটাশে জুলাই, স্বপ্ন দেখতে দেখতে চারু মজুমদার নামের একজন মানুষ আজ চলে গিয়েছিলেন যার রাজনৈতিক ভাবনা যদি কিছু প্রশ্ন তুলেও থাকে, স্মৃতিহীন উত্তর প্রজন্ম তাঁর স্বপ্ন নিয়ে ভেবেছে কি কখনো? আমার স্বপ্নে আজ ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত উত্থান তবু এই ভুলভুলাইয়ার শপিংমলের চলন্ত সিঁড়িতে উঠতে উঠতে নামা কিংবা নামতে নামতে ওঠার নিরলস স্রোতের গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েও স্বপ্ন দেখে সারাটা জীবন জাস্ট ফুঁকে দেওয়া মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে পুজোর ছুটিতে বাড়িতে আসা সেই ছোটকাকুর কথা, যারা আমাকে, আমার মতো অনেককেই চিনতে শিখিয়েছিল মহানাগরিক জীবনের অসামঞ্জস্যগুলো নিয়ে প্রশ্ন করতে আর শিখিয়েছিল স্বপ্ন দেখতে। বুঝেছিলাম স্বপ্ন দেখাও আসলে এক রোমান্টিসিজম, তারপর চে-র ছবি যেদিন প্রথম দেখলাম, অনুভব করলাম চোখে স্বপ্ন না থাকলে আর যাই হোক, বিপ্লবী কিংবা রোমান্টিক, প্রেমিক কিংবা বিতর্কিত, কোনোটাই হওয়া যায় না।

আমরা স্বপ্ন দেখি আজও, যে স্বপ্ন প্রাত্যহিকতার ঘেরাটোপ ডিঙিয়ে আরও কোনো অন্তহীন বিপন্ন বিস্ময়ের কথা বলে কারণ স্বপ্নের শেষ লগ্নে পৌছনোর পরও ‘স্টপ-ওভার’ হতে পারেনা, ইতিহাস অন্তত সে’কথাই বলে…! ট্রিগারে আঙুল রেখে হয়তো আর স্বপ্ন দেখে না মানুষ, কী-বোর্ডে রাখা চঞ্চল আঙুল রেখেই কেউ কেউ হয়তোবা ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নগুলোকে জোড়া লাগাবার চেষ্টা করে মাত্র। স্বপ্নগুলো কিন্তু রয়েই যায় আর তাই ‘কখন কী ঘটে যায় কিচ্ছু বলা যায় না’….! আজকাল স্বপ্নে একটা দেওয়াল লিখন বার বার ফিরে আসে –

“একটি কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল হয়ে ফুটবে কবে

সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে”

————————————————————-

এ লেখায় কিছু প্রিয় কবির বিখ্যাত কিছু পংক্তি সামান্য এদিক ওদিক করে নিজের মতো ব্যবহার করেছি।।

শু ভ ম য়  স র কা র
জন্ম জলপাইগুড়িতে। কিছুটা কলকাতাকেন্দ্রিক বেড়ে ওঠা,তারপর অনেকটা সময় কেটেছে গৌহাটি শহরে। ইংরাজি নিয়ে পড়াশোনা, উচ্চতর শিক্ষা উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অধুনা বাস শিলিগুড়িতে। সম্পাদিত পত্রিকা "মল্লার"। কবিতা দিয়ে অক্ষরজার্নি শুরু হলেও এখন কথাকার হিসেবেই পরিচিত। রয়েছে গল্পসংগ্রহ, উপন্যাস,সম্পাদিত গ্রন্থও। 'প.ব.বাংলা আকাদেমি' থেকে সম্পাদক হিসেবে পুরস্কৃত। ওপার বাংলার 'চিহ্ন'পুরস্কার সহ আরও নানান সম্মানে সম্মানিত। পেয়েছেন 'সাহিত্য অকাদেমি'র 'ট্র‍্যাভেল গ্রান্ট'। অংশ নিয়েছেন 'সাহিত্য অকাদেমি'র অনুবাদ কর্মশালায়। যৌথভাবে 'সাহিত্য অকাদেমি' থেকে প্রকাশিত হয়েছে অনুবাদ সংকলন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জীবন কর্মশালায় বক্তা হিসেবে অংশ নিয়েছেন।  দৈনিক এবং লিটল ম্যাগাজিনের নিয়মিত লেখালেখি। 
  shubhamoy.sarkar123@gmail.com 



© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *