a story of ahmed faruk mir

বাংলা English

পারত্রিক

আহমেদ ফারুক মীর

“একদিন।” ঘটনাবশত অকারণ মৃত্যুর জন্য তখনও আমি তৈরি নই। অথচ রবি ঠাকুরের গান শুনতে শুনতে ঢুলুঢুলু ঘুমের মধ্যে জড়িয়ে গিয়ে দেখি পরকাল থেকে চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে আমাকেই দোষী করে। এবং আমি তখন সদলবলে বেহেস্তে বসে গান গাইছিলাম। আমার হাতে ছিল একটি মৃদঙ্গ। আমার বেহেস্তী বন্ধুদের কারো কারো হাতে বেহালা, কারো হাতে ভায়োলিন এবং কেউ কেউ মনের সুখে মৃদু তালে বাজিয়ে চলেছিল তুবড়ি। আমাকে কেন দোষী করা হলো তা আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এবং আমাকে বলা হয়েছিল, আমি এই কারণে দোষী যে আমি বেহেস্তে বসে গাইছিলাম রবি ঠাকুরের গান।

জেসিকা শবনম। একজন তন্দ্রাময়ী তরুণী। জেসিকা শবনম। যিনি মৃত্যু ঘুরে এসে পৃথিবীতে গল্প বলেন। তিনি গল্প বলেন আমাদের কাছে এবং আমরা গল্পগুলোকে আপনাদের কাছে বলার লোভ সামলে রাখতে পারি না। অতঃপর গল্পটি ধীরে ধীরে বলে শেষ করি যতক্ষণ না আপনারা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঢলে পড়েন একে অন্যের শরীরের ওপর।

জেসিকা শবনম। এটি যার দেখা একটি অভিনব স্বপ্নের অমায়িক গল্প। যা বিষন্ণ অথচ ভাবনা জাগানিয়া। এটি একই সাথে রোমাঞ্চকর এবং দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়ার মতো জটিল। জেসিকা শবনমের গল্পটি মৃত্যু ভাবনা ও পরবর্তী জগৎ সম্পর্কে আমাদেরকে একটি অন্য রকম ভাবনা ভাবতে উৎসাহিত করেছে। পরজগতের ফ্যান্টাসির ভাবালুতা সম্পর্কে আরও এক বার, আরও অন্য রকম করে ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে আমাদেরকে।

অথচ আমাদের কাছে এখনও পর্যন্ত কোন চিঠিপত্র আসেনি আমাদের মৃত পূর্বপুরুষ এবং পূর্বনারীগণের নিকট থেকে। এবং জেসিকা শবনমের স্বপ্নটির ব্যাপারেও আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি। কারণ সমগ্র অভিজ্ঞতা যাচাই করে দেখা গিয়েছে স্বপ্ন বাস্তবিক ভাবনাগুলোরই একটি অবচেতন অংশ।

জেসিকা শবনম, একজন তেত্রিশ বছরের তরুণী, ঘুমই যার প্রিয় এবং যিনি চাষ করেন অনন্তকালের স্বপ্নগুলোর। যিনি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন এবং তা প্রিয় মানুষদেরকে বলে দিতে পছন্দ করেন। যিনি স্বপ্ন দেখেন এবং মিলিয়ে নেন খোয়াবনামার চিত্রগুলোর সাথে। মানুষের নানামুখী শখের মধ্যে বলতে পারেন এটি তার একটিই এবং এক মাত্র শখ, যা তাকে ধীর গতিতে হলেও আধ্যাত্মের দিকে নিয়ে গিয়েছে।

বিশ্বাস করুন, দাদু এবং নানুদের মৃত্যুর পূর্বের সময়গুলোতে আমরাও সন্ধ্যাকালে একটি খোয়াবনামা নিয়ে বসতাম এবং আমাদের মাঝখানে জ্বলতে থাকত একটি কেরোসিনের লণ্ঠন। এবং আমরা তার আলোয় বইটির চিত্রে আঙুল ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে ভাগ্য গণনা করতাম এবং গত হয়ে যাওয়া রাতের স্বপ্নগুলোর ব্যাখ্যা খুঁজে ফিরতাম। আমরা উৎসুক হয়ে থাকতাম আমাদের সৌভাগ্যের ক্ষণগুলো জানার আগ্রহে। তখনও গ্রামে প্রাকৃতিক অন্ধকার এবং জাতীয় অজ্ঞতার মিশেল। তখন অনাগত সৌভাগ্যের প্রতি ভরসাই ছিল মানুষের একমাত্র বন্ধু। এবং বলতে গেলে ওগুলো মানুষের মগজে কিলবিল করত। এবং তারা খুব উচ্ছ¡লতা নিয়ে শুনতে বসত কালো এবং শাদা ভুতের কল্পিত কাহিনিগুলো। ওসব ভুতগুলোর মধ্যে কিছু কিছু বয়ে বেড়ায় সৌভাগ্যের সুসংবাদ। যা তারা গভীর রাতে অথবা ভোরের দিকে পথেঘাটের তেকোণায় দেখেছিল বলে অন্যদের নিয়ে গল্প বলার আসর জমাতো।

অতএব জেসিকা শবনমের স্বপ্নটি মিলিয়ে নেয়ার জন্য আমিও খুঁজে ফিরছিলাম সে চিত্রওয়ালা বইটি, যার নাম “কী করিলে কী হয়।” আমি সমস্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা পেয়েছিলাম শুধুমাত্র সেই স্বপ্নটি ছাড়া যেটি জেসিকা শবনম আমাদেরকে বলেছিলেন। আপনারা নিশ্চয় আগ্রহ প্রকাশ করবেন তার চেহারার আদল জানার জন্য। আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন সেই তন্দ্রাবতী এবং স্বপ্নময়ী জেসিকা শবনমের শরীরের ত্বক কেমন হতে পারে। নিশ্চয়ই ভাবছেন তার চোখের মণি শাদা কিনা? মেয়েটি কখনও রোদে হাঁটে কিনা এবং তার চলাফেরা কেবল অন্দরমহলেই সীমাবদ্ধ কি না?

আপনারা নিশ্চয়ই জানার অধিকার রাখেন যেহেতু আপনারা একনিষ্ঠ শ্রোতা।

জেসিকা শবনম একজন বুদ্ধিমতি তরুণী। যার বাবা ছিলেন একজন জেনারেল। এবং যিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন মুক্তিকামী মানুষের জন্য যুদ্ধ করে। যিনি স্বপ্ন দেখতেন মানুষের জন্য একটি শান্তিময় পৃথিবীর। এবং তিনি একটি যুদ্ধ বিমান থেকে লাফিয়ে পড়েন মাউন্ট এভারেস্ট এর বরফে এবং তিনি কথিত মৃত্যুর পর অক্ষত অবস্থায় ঘুমিয়ে আছেন শাদা বরফের নুড়িগুলোর অনতি গভীরে।

জেসিকা শবনম প্রায়ই ইচ্ছে পোষণ করেন বাবার আত্মার নিকটবর্তী হবার, অন্তত স্বপ্নচারণের মধ্যে দিয়ে হলেও। এবং তিনি দিনের পর দিন ঘুমিয়ে কাটান। অতঃপর এই প্রথম তিনি স্বপ্নে বিচরণ করেন একটি অন্য পৃথিবীতে। যার নাম বেহেস্ত। এবং যা অসংখ্য ঈশ্বর বিশ্বাসী মানুষের মোহের জগৎ।

সুতরাং এবার আমরা যেতে পারি স্বপ্নটির আগপাছে এবং একবার দেখে আসতে পারি আসলে প্রকৃত প্রস্তাবে কী ছিল জেসিকা শবনমের স্বপ্নটি।

জেসিকা শবনম আমাদের মাঝে বসলেন এবং আমরা ঘিরে ধরলাম তাকে। আমরা যখন বৃত্তাকারে বসেছিলাম তখন আমাদের ঠিক মাঝখানে ছিল পূর্বের মতোই একটি লণ্ঠন। লণ্ঠনটি জ্বলছিল দাউদাউ করে এবং জ¦লছিল হলুদ রঙের আগুন। এবং আগুনের চারপাশে জমে উঠছিল গোলগোল কালো রঙের ফুলকি। যেগুলো ছিল সাজানো ও দৃষ্টিনন্দন। আমরা সকলেই প্রথমত জেসিকা শবনমের গাল এবং কপালের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কারণ লণ্ঠনের হলুদ আলোয় তার গালে ছিল হলুদাভ এবং সোনালি আভার মিশেল। এবং আমাদের কাছে মনে হয়েছিল তিনি সত্যিই একজন পরকালযাত্রী, যিনি আমাদের কাছে এসেছেন গল্প বলতে। এবং তিনি শীঘ্রই প্রস্থান করবেন।

একটি দারুণ রোমাঞ্চকর রাত্রির মধ্যে দিয়ে আমরা যেতে শুরু করলাম। আমরা নড়েচড়ে বসলাম।  

জেসিকা শবনম মুখ খুললেন এবং বললেন তার প্রথম কথা। তিনি দেখেছিলেন তার মৃত্যু হয়েছে এবং তিনি দারুণভাবে তা উপভোগ করার চেষ্টা করছেন। তাকে কবরে রাখা হয়েছে যা একটি শহরের মতোই সুন্দর। এবং তার পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই পূর্বকাল থেকে বাস করছিল সেখানে। যারা এক সময় তার বন্ধু ছিল এবং যারা এখনও তার বন্ধু।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তার মৃত্যু হয়েছে কি না। সকলেই বললো তার মৃত্যু হয়েছে এবং তাকে নতুন জগতে অভয় দিলেন। তারা তাকে স্বাগত জানালেন এবং পরিচিত হতে লাগলেন একে অন্যের সঙ্গে।

জেসিকা শবনম পরকাল সম্পর্কে ভীত ছিলেন, কারণ তিনি পরকালের সুখের জন্য যা প্রচলিত প্রয়োজন তা থেকে বিরত থাকতেন। কারণ দিন এবং রাতের অধিকাংশ সময় তিনি ঘুমিয়ে কাটাতে ভালোবাসতেন। এমনকি যখন মসজিদগুলোতে সুরে সুর মিলিয়ে ফজর অথবা এশার আযান হতো তখনও। সত্যি বলতে জেসিকা শবনমের ছিল একাধিক ছেলে বন্ধু এবং যাদের সাথে ছিল আন্তরিক হৃদ্যতা। এমনকি ছিল শারীরিক সুখ বিনিময়ের অপার্থিব শান্তি। এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার বন্ধুরা ছিল সহনশীল। কারণ জেসিকা শবনমকে তারা কেউই ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করার কারণ খুঁজে পায়নি।

তারা এসমস্ত বিষয়ে সচেতন ছিল যে, ব্যক্তিমালিকানার ধারণা থেকেই বিবাদের সূত্রপাত। সুতরাং তারা একটি সুখময় পৃথিবীই কামনা করতো। জেসিকা শবনম তার বন্ধুদের এবং তাদের বান্ধবীদের নিয়েও ছিলেন পরিপূর্ণ সুখী।

অতঃপর তাকে প্রায়ই ভয় দেখানো হতো তার নিকটাত্মীয় এবং অন্যসব বন্ধুদের মধ্যে অধিকাংশের দ্বারা। অথচ জেসিকা শবনম থাকতেন নির্বিকার। তিনি দেখতে ছিলেন অনন্যা রুপসী এবং তিনি ছিলেন একটি অতিকায় সিন্দুকের মালিক। যা তার জেনারেল বাবা রেখে গিয়েছিলেন এবং রেখে গিয়েছিলেন অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী, রক্ষক ও রক্ষিকা। তার ঘরের মেঝেগুলো ছিল ঝকঝকে এবং সোনালি পাথুরের কারুকার্যে মোহনীয়। এবং দেয়ালগুলো থেকে সোনালি আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হতে দেখা যেত। তার ঘরের চৌবাচ্চাগুলোতে ছিল গোলাপি গন্ধের পরিপূর্ণ জল এবং তিনি সেগুলোতে গোসল করে বসতেন চিলেকোঠার সিঁড়িতে। তিনি আকাশ দেখতেন এবং কল্পনায় দেখতেন আম্রপালির নৃত্য। আপনারা হয়তো এতদিনে বৈশালীর নগরবধু আম্রপালির গল্প শুনে থাকবেন। যিনি একজন জনপ্রিয় নর্তকী হিসাবে বর্তমান ছিলেন খ্রিষ্টপূর্বে পাঁচশত অব্দে।

সুতরাং একদা তিনি ছিলেন সুখী ও স্বাধীন। একদা তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠা। অথচ বয়সের গতির সাথে সাথে তিনি হয়ে পরেছিলেন জীবনের প্রতি দুর্বল এবং ভীত। জনমনোরঞ্জন ছেড়ে তখন তিনি দাঁড়ালেন পরকালের দরজায় গিয়ে এবং মনে মনে তিনি অশুভ শক্তির ভয়ে কাঠ হয়ে ছিলেন। যা তাক ঈশ্বরের মতো অলৌকিক শক্তির কাছে সমর্পিত হতে বাধ্য করে। আমি অন্য কোন গল্পেও বলেছিলাম, “অলৌকিকতাই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী মিথ যা জগতের মানুষকে সবচেয়ে বেশি পরাভূত করেছিল। এবং মানুষের স্বাধীনতায় সবচেয়ে বেশি পরিমানে অদৃশ্য বাধা প্রদান করেছিল।”

সে যাই হোক, আমরা এখন আসি জেসিকা শবনমের কাছে যিনি আমাদেরকে গল্প শোনানোর জন্য অপেক্ষমান।

জেসিকা শবনম পরকালের নারী ও পুরুষদের সাথে নিজের আত্মপরিচয় পর্ব শেষ করলেন। তাকে অভয় দেয়া হল এবং তাকে বলা হল তিনি এখানে পৃথিবীর মতোই স্বাধীন। এবং তার নতুন বন্ধুরা বলল, নৈরাশ্যবাদীরাই কেবল মানুষকে অহেতুক ভয় দেখানোর চেষ্টা করে এবং তাদের প্রত্যেকের নিজেদেরও একই অভিজ্ঞতার ঝুলি রয়েছে। সত্যি বলতে এখন তাদেরকে মনে মনে ঘৃণা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

জেসিকা শবনম তখনও নিশ্চিত ছিলেন না যে আসলেই তার মৃত্যু হয়েছে কিনা। তিনি নিজেকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করলেন এবং তার মনে হল সত্যিই তিনি এখন পৃথিবীর বাইরে। কারণ তার বাবার দেয়া প্রিয় সিন্দুকটি তিনি খুঁজে পেলেন না। যাতে রয়েছে বাবার সমস্ত জীবনের আয়ের প্রতিটি কানাকড়ি। এবং যা একজন জেনারেলের মেয়ের জন্য যথেষ্টই স্থূল।

অতঃপর তিনি নতুন জগতটি ঘুরে দেখার ইচ্ছে পোষণ করলেন এবং নিজের পাজরের সাথে দুটি সোনালি ডানার অস্তিত্ব অনুভব করলেন। জেসিকা শবনম ইচ্ছে পোষণ করলেন এবং তিনি উড়তে লাগলেন। সত্যি বলতে তিনি অবাক হতে ভুলে গেলেন এবং তার কাছে মনে হল এটিই স্বাভাবিক এবং সত্য। তিনি একটি সুন্দর সাজানো বাগান প্রদক্ষিণ করার জন্য সাথে নিলেন তার কয়েকজন পরিচিত বন্ধুকে। এবং উড়তে উড়তে তারা দেখতে পেলেন সৌন্দর্যমণ্ডিত বাগান, ফলগুলো এবং নানান রঙের পাখিদের। মনে হচ্ছিল পাখিরা কথা বলে হাওয়াদের সাথে। ওরা জেসিকা শবনমের দিকে তাকায় এবং গল্প করতে থাকে। জেসিকা শবনম বুঝতে পারেন ওদের আলাপ-আলোচনা। তিনি পাখিগুলোর ভাষা বুঝতে সক্ষম এবং নিজেও প্রয়োজনমতো কথা বলতে সক্ষম পাখিদের সাথে। অথচ আপনারা অবাক হবেন যে, জেসিকা শবনমের কাছে বিষয়গুলো মোটেও আজগুবি মনে হচ্ছিল না। সোনালি ডানার মতো পাখিগুলোর ভাষাও তার কাছে মনে হল নিতান্তই স্বাভাবিক। সুতরাং ঠিক তখন তার ভাবনার জগতে কোন পরিবর্তন ঘটে না।

জেসিকা শবনমের কাছে মনে হতে থাকে এটিই হয়তো বেহেস্ত। যাতে বসবাস করে সুখী আত্মারা। বেশ শান্তি লাগে তার কাছে। বেশ প্রেম প্রেম লাগছিল তখন। জেসিকা শবনম তার বন্ধুদের নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন এবং বাধ্যযন্ত্রগুলো নিয়ে বসেন। তিনি বাজান এবং গান করেন। তিনি বন্ধুদের সাথে সুর ও আনন্দ বিনিময় করতে থাকেন। বিনিময় করতে থাকেন শরীর ও ছন্দ। জেসিকা শবনম আত্মহারা হয়ে যান এবং ঠিক তখন তার ভেতরে কোন পাপবোধ কাজ করে না। এমন কি বেহেস্ত কর্তৃপক্ষ এসমস্ত শারীরিক মৈথুনকে অনুমোদন দেন খুশি মনে।

শবনম আমাদেরকে গল্পটি এ পর্যন্ত বললেন। তারপর তিনি যে অবাক করা বিষয়টি বললেন তা আমি গল্পের প্রথমেই বলেছিলাম। শবনম একটি চিঠির কথা বলেছিলেন, যেটি বেহেস্ত কর্তৃপক্ষ পাঠিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়েছিল পৃথিবীতে। এবং যেটি ছিল একটি নালিশবার্তা। কারণ জেসিকা শবনম একটি অপরাধ করেছিলেন যা ছিল তার কাছে নিতান্তই অজানা। তাকে বলা হয়েছিল তিনি রবি ঠাকুরের গান গেয়েছিলেন, এটি ছিল পরিপূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অথচ অসংখ্য পুরুষ এবং নারীর একক এবং যৌথ শরীরবৃত্তীয় মৈথুনগুলো ছিল পরিপূর্ণ অনুমোদিত। এবং নেশাপ্রদ মদপূর্ণ চৌবাচ্চা ছিল এবং ছিল সমকামী পুরুষ ও নারীদের যথেচ্ছা খেয়ালখুশির অনুমোদন। এসব এমন কি জেসিকা শবনমের ক্ষেত্রেও। জেসিকা শবনমের মনে পড়ল বিবি হাওয়া এবং একটি আপেল বৃক্ষের কথা।

অতএব তিনি লজ্জ্বা পেতে শুরু করলেন তার পৃথিবীবাসী বন্ধুদের কাছে নিজের অবস্থানের কথা ভেবে। তিনি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলেন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে। এবং তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি দৃঢ়তার সাথে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, বেহেস্ত এবং পৃথিবীর মধ্যে তেমন কোন তফাতই নেই। একই রকম বাধা-বিপত্তি যেন বেহেস্তের করিডোর থেকে করিডোর জুড়ে। ঘৃণীত সাম্প্রদায়িকতার এক কঠিন দেয়াল এখানেও বর্তমান। অথচ তাকে বেহেস্ত সম্পর্কে বলা হয়েছিল একেবারেই ভিন্ন সব মতামত। যা তাকে আলোড়িত করত। অথচ ওসব মুখরোচক গল্পগুলো তিনি আমলে নিতেন না। কারণ তিনি ছিলেন একজন স্বাধীনতাপ্রিয় নারী। এবং তিনি চূড়ান্ত নিশ্বেষের মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে একটি ঘৃণা এবং বিদ্বেষ কাজ করত বেহেশতী স্বামীর ভাবনাগুলো নিয়ে। কারণ বেহেশতী স্বামী মানেই অসংখ্য রুপসী স্ত্রীর প্রভু। যাদের ফর্সা শরীরের রক্ত চলাচল দৃষ্টিগোচর হয়। যারা নানান রকম অঙ্গভঙ্গিতে পারদর্শী এবং আমরা, আপনারা যেগুলোকে বলি ছেনালীপনা। এবং ওসব নারীরা সকলেই একজন স্বামীর শুভাকাক্সক্ষী এবং মৈথুনপ্রার্থী। এবং যিনি একটি হারেম খানার রাজার মতোই কর্তৃত্বশীল। সুতরাং জেসিকা শবনম এমন একজন স্বামীর অস্তিত্বকে ভালোবাসার কথা ভাবতেই পারতেন না। বরং স্বাভাবিক ভাবেই ঘৃণা করতেন পুরুষ কর্তৃত্বের এসব পারত্রিক ধারণাকে।

অতএব স্বপ্নের ঘটনা এবং তার আকুল আবেদনের প্রেক্ষিতেও কর্তৃপক্ষ যখন মরিয়া তখন তিনি চুপচাপ বসেছিলেন। আপনারা জানেন, পৃথিবীতে যিনি অপরিমেয় সুখের মধ্যে ছিলেন, যার বাবা ছিলেন একজন জেনারেল এবং শিশুকাল থেকেই যিনি ছিলেন অসংখ্য সুখী মানুষের প্রিয় মানুষ, তার কাছে এই সামান্য বিষয়টি পৃথিবীর সকল আঘাতের চেয়ে ভয়ানক এক আঘাত।

জেসিকা শবনম স্বপ্ন দেখছেন। গল্পটিই আসলে একটি স্বপ্নেরই চিত্রকল্প। গল্পটি আমাদেরকে তিনি বলেছিলেন। এবং আমি আপনাদেরকে বলছি। আমাদের মাঝে জ্বলছে একটি লণ্ঠন। ঠিক জেসিকা শবনম যেভাবে আমাদেরকেও বলেছিলেন। তখন গভীর রাত। বাইরের অন্ধকারে আপনাদের মতো আমাদেরও কৌতুহলে জ্বলজ্বল করছিল চোখ। আমরাও ছিলাম উত্তেজনায় ঝকঝকে দৃষ্টি নিয়ে।

আমরা বাস্তব থেকে পালিয়ে যেতে যেতে অবাস্তবের শরীরে ডুবে যাই। স্বপ্ন দেখতে দেখতে আমরা সাজিয়ে ফেলি আমাদের প্রিয় সংসার। আমাদের সকল অপূর্ণতা এবং আনন্দের জন্য হাহাকার করতে থাকি এবং অনেকগুলো চমৎকার আকাঙ্ক্ষাকে জমিয়ে রাখি পরকালের জন্য। এটি একটি অনন্য সান্ত্বনা, যা দেখা যায় না এবং মানুষকে প্রায়ই আশান্বিত করে তোলে।

অতঃপর জেসিকা শবনমের ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি স্বপ্ন থেকে ছুটে আসেন। একটি জগৎ আর একটি জগতের মধ্যে লুকিয়ে রাখা থাকে। হৃদয়ে লুকিয়ে থাকে যা, তার নাগাল পাওয়া ভার। যা বাস্তবে পাইনি তার দায় থাকে অন্য কোথাও পাবো বলে। এবং এভাবেই তৈরী হয় ভাবনার সুখ ও সান্ত্বনার আশ্রয়।

প্রায়শই আমাদের চোখে আসে পরাবাস্তব। যেমন আসে জেসিকা শবনমের। শবনম জেগে থাকেন। তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। আশা জাগে আরও বোধহয় ভয়ানক সুখ অপেক্ষা করে আছে অন্য কোথাও। বোধহয় আরও অসম্ভব সুখেরা বসবাস করে দূর কোন অদৃশ্য রাজ্যে। কারণ জেসিকা শবনম এবং আমাদের চারপাশ আমাদেরকে ভয়ানকভাবে প্রভাবিত করে। এবং চোখ, কান খুলে তাকানোর কথা মনে আসলেই জেসিকা শবনম উড়িয়ে দেন ওসব অলৌকিক আশির্বাদবিষয়ক চিন্তাগুলোকে, যা তাকে প্রায়ই ঘোরের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখত।

এবং তিনি স্থির হয়ে ভাবতে থাকেন, গণমানুষের পরকাল আসলে এমনই কিনা যেমন তিনি দেখেছিলেন। অথবা আদৌ কিছু রয়েছে কিনা পরকাল নামে। কিন্তু জেসিকা শবনম কোন পার্থক্যই খুঁজে পান না ইহকাল এবং পরকালের মধ্যে। তিনি হতাশ হয়ে ওঠেন। কারণ ওখানেও তাকে দোষী করা হয় লৌকিক সাম্প্রদায়িকতা লঙ্ঘণ করার দায়ে। তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়। তার কাছে মনে হতে থাকে প্রকৃত অর্থে সমস্ত অপ্রাপ্তি এবং আকাঙক্ষাই মানুষকে তাড়িত করে, বয়ে নিয়ে চলে জগৎ ও তার বাইরের সুখী অন্য কোন জগতে। আসলে মানুষের ভাবনা সীমাহীন। অধিকাংশ সময়েই মানুষ তার ভাবনাগুলোর কাছে হেরে গিয়ে আনন্দ পায়।

আহমেদ ফারুক মীর

 জন্ম- ভোলা, বাংলাদেশ
 প্রকাশিত বই - ঈশ্বরী (গল্প),সবুজ টিপ কাঁচের চুড়ি (কাব্য),জোয়ার বাঁশি ও খুফুর মূর্তি (কিশোর গল্প), নীল নক্ষত্র (উপন্যাস), হিপোক্রেটিক (উপন্যাস), অবিন্যস্ত আলোকরেখা (কাব্য), টুকটুকি (ছড়া)।
লেখার বিষয়- বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি। যা মানুষকে ভাবায়। যা পরিবর্তন হওয়া উচিৎ বলে মনে হয়। সুতরাং এসব অসংগতি নিয়ে ভবিষ্যতে নানামূখী কাজ করার আগ্রহও রয়েছে।
খুব ছোট বয়সে "পথের পাঁচালী" উপন্যাস এবং তাঁর লেখকের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। বর্তমানে লেখার মূল বিষয় ছোটগল্প এবং কবিতা।  
 ahmed86farukmir@gmail.com    

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

One comment

  • এমন যদি হতো,,,,,তাহলে তো মৃত্যুর ভয় মুছে যেতো।কল্পনার সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায় বাস্তবের কাছে।
    তবুও এক নিঃশ্বাসে পড়ার মতো লেখা।ভালো লেগেছে।
    তোমার লেখা বরাবরই অন্যদের চেয়ে আলাদা।এটাই তোমার বৈশিষ্ট্য। বেঁচে থাকুক এই ভালোলাগা, ভালোবাসা অনন্তকাল ধরে।
    ভালোবাসায় ভাগ হয়না,যেটা হয় সেটা ভালোবাসা নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *