A Story by ANINDITA MITRA

বাংলা English

গান তুমি হও …

পায়ে গুলগুলির নখের আঁচড় লাগতেই ঘুম ভেঙে গেল। তড়াক করে উঠে বসে গুলগুলিকে টেনে নিলাম কোলে। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললাম, ” সোনা আমার। এখন ভালো আছিস তো গুলগুলি?”গোল গোল চোখে আমার দিকে দেখেই  গুলগুলি একলাফে চলে গেল সোফায়। দুদিন আগে কালীপুজো আর ভাইফোঁটা কেটেছে। কালীপুজো এলেই  আমার প্রাণটা গুলগুলির জন্য ছটফট করে। বাজির দাপটে গুলগুলি খাটের তলায় গুটিয়ে থাকে, খেতে খেলতে কিছু করতেই চায় না। গুলগুলির বিবর্ণ মুখের দিকে তখন তাকানোই যায় না। ভাবলাম, একবার ছাদে যাই। হেমন্ত প্রায় এসেই গেছে , দীপাবলির দীপগুলোর বুকে এখনও লেগে আছে ঘিয়ের গন্ধ। হেমন্ত এলেই মনটা ঘিরে ফেলে একটা অজানা বিষাদের ছায়া, বাবার হাতে লাগানো আমলকি গাছের পাতায় লেগেছে হলুদের ছোঁয়া। ফোনে মেসেজ ঢুকলো, খুলে দেখলাম যে আজ গান শিখতে বিকেলের ব্যাচটা আসবে না। এই সময়টা অদ্ভুত, উৎসব শেষ হলেও রেশ  রয়ে যায় মানুষের মনে, জীবনের মূল স্রোতে ফিরতে একটু সময় লাগে। আমি গান গাই আর গান শেখাই। গানই আমার ধর্ম, গানই  আমার জগতের সবটা জুড়ে আছে। মোবাইল নাড়াচাড়া করতে করতে নিজের ঘরে গেলাম।  মা নেই, দুর্গাপুরে মামারবাড়ি গেছে। দিদি দীপাবলির সময়ে এসেছিল, আবার সংসারে ফিরে গেছে।  দেবব্রত বিশ্বাসের ” ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত” বইটি সদ্য ধরেছি, ভাবলাম পড়ি। দুটো পাতা সবে শেষ করেছি, কানে এলো মালিদাদা রহমান আর রহমানের বউ সুমিতার পরিত্রাহি চিৎকার। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই হন্তদন্ত হয়ে সুমিতা এসে হাজির। ” দিদি একটা ঘটনা ঘটেছে, এক্ষুণি চলো। ” তড়িঘড়ি করে নেমে এলাম। দেখলাম একটা চোদ্দো পনেরো বছরের মেয়ে রহমানের সঙ্গে জোর তর্ক করছে। রহমান আমাকে দেখেই ছুটে এসে বললো,” দিদি,  জানো মাটি খুঁড়তে এসে দেখি মেয়েটি বসে আছে। কিছু কথা জিজ্ঞেস করতেই হাউমাউ করে কাঁদছে। ” সুমিতা বললো, ” দিদি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে বোধহয়, দেখো কাণ্ড। ” আমি বললাম, ” রহমান, সুমিতা একটু ভেতরে যাও ,আমি দেখি।” মেয়েটির কাছে এগিয়ে গেলাম। অবাক চোখে মেয়েটি দেখলো আমার দিকে। দেখে মনেই হচ্ছে স্কুল ফেরত এসেছে, নীল সাদা ড্রেস, দুটো বিনুনি ঝুলছে। কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললাম, ” সোনা তুমি রাস্তা হারিয়ে ফেললে আমি বলে দিতে পারি, কোথায় যাবে বলো? বাড়ির নাম্বার দাও, আমি বলে দেবো। ” সজোরে আমার হাতটা সরিয়ে মেয়েটি বললো, ” আমি আর কখনও বাড়ি  ফিরে যাবো না।” ” ছিঃ মা  অমন বলতে নেই, তোমার বাড়ির লোকজন কতটা চিন্তা করছেন বলো তো! দেখে মনে হচ্ছে তুমি তো সেন্ট মার্টিন স্কুলে পড়ো?” মেয়েটি মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, ” হুম। ” মনে মনে ভাবলাম মেয়েটিকে বকাঝকা করা যাবে না, বন্ধুর মতো গল্প করতে করতে বাড়ির কথা জানতে হবে। ” তোমার মুখ তো একেবারে শুকিয়ে গেছে, অনেকক্ষণ খাবার জল পেটে পড়েনি বুঝি? ঘরে চলো। ” ” হুম ,আজ টিফিন খাইনি। মনটা ভীষণ খারাপ গো।” ” সব শুনবো তোমার কথা, আগে ঘরে চলো। বাই দ্য ওয়ে তোমার নামটা বলো।” ” আমার নাম মেঘমিতা দাস, সবাই মেঘ বলেও ডাকে।” ” বাহ্ খুব মিষ্টি নাম,আমিও তোমাকে মেঘ বলবো। তুমি তো মেঘেদের বন্ধু, তাহলে আমরাও তো বন্ধু হতে পারি? ” কথাগুলো বলেই হাত বাড়িয়ে দিলাম। চোখ থেকে মেঘমিতার জল গেল উবে, পদ্মপাতার  মতো মিষ্টি  মুখটাতে দেখা দিল হাসির ঝিলিক। ” এসো ঘরে,  এসো। ” হাত ধরে মেঘমিতাকে ঘরের মধ্যে নিয়ে এলাম।  আমার বাদ্যযন্ত্রের সরঞ্জাম দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে মেয়েটি বললো ,” তোমার ঘরখানা খুব সুন্দর। ওহ্ অ্যান্টি তুমি গান গাও? ” সব রাগ,কষ্ট নিমেষে উধাও হয়ে গেল। ” হুম, ওই একটু আধটু গাওয়ার চেষ্টা করি। তুমি বুঝি গান গাইতে খুব ভালোবাসো? ” কথাটা শুনে মেঘের মুখখানা শুকিয়ে গেল।” ভাবলাম মেয়েটা বোধহয় কষ্ট পেয়েছে, কথা ঘোরানোর জন্য বললাম, ” শোনো মেঘ তুমি অনেকক্ষণ এখানে এসেছো, তোমার মা খুব চিন্তা করবেন। মায়ের ফোন নাম্বার দাও সোনা, আমি মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলি। প্লিজ দাও।” ” আমার তো মা নেই। ” ” কোথাও গেছেন বুঝি? তবুও চেষ্টা করি। নাম্বার দাও।” ” মা তো চলে গেছে তারাদের দেশে, ছোট থেকেই দিম্মা এই কথাই বলেছে। আমি রোজ রাতে আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। দিম্মা রবীন্দ্রনাথের ” মনে পড়া” কবিতাটা খুব বলতো। কয়েক বছর আগে দিম্মাও আমাকে ফেলে চলে গেল তারাদের দেশে। ” আমি মেঘকে টেনে নিলাম কোলের কাছে। মনটা খুব খচখচ করছে, ফোন নাম্বারটা আবার চাইতে সাহস পেলাম না। হঠাৎ চোখে পড়লো মেঘের শার্টে একটা পরিচয়পত্র সাঁটা আছে, সেখানে নাম্বারও আছে। মনে মনে ভাবলাম এখান থেকেই নিতে হবে, মেঘের মনে জমে আছে অভিমানের মেঘ। খুব জোরজার করলে নাও বলতে পারে, অজানা আশঙ্কা মনটাতে উদয় হলো। ততক্ষণে আমার ইশারায় সুমিতা কেক আর মিষ্টি  নিয়ে এসেছে, প্লেট মেঘের হাতে তুলে দিয়ে বললাম, ” আগে খাও। এতক্ষণ না খেয়ে কেউ থাকে? তোমার বাবা জানলে কষ্ট পাবেন।” বিদ্রুপ মেশানো করুণ হাসি খেলে গেল মেয়ের মুখে, কেক কামড়ে বললো, ” বাবিনের বয়েই গেছে কষ্ট পেতে, বাবিন আমার পড়াশোনা ছাড়া আর খুব একটা খবর নেয় না, সময় কোথায় বাবিনের? অনেক সময় কাজের জন্য বাইরে থাকে। আমি জ্ঞান হবার পর থেকে দিম্মা আর সুজাতা মাসির কাছেই থাকি। দিম্মা খুব আসা যাওয়া করত, এখন তো সব …” ” কাঁদতে নেই সোনা। খেয়ে নাও।” ” অ্যান্টি, তোমার তানপুরাটা একটু দেখবো? ” “নিশ্চয়ই। ” অন্য একটা সোফায় লাফ দিয়ে বসে  তানপুরাটা কোলে তুলে নিল মেঘ। ” আমি আসলে হারমোনিয়ামেই রেওয়াজ করি। গানটা চালাতে আমাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয় তো, খুব ছোটবেলায় দিম্মা হারমোনিয়ামটা কিনে দিয়েছিল, সেটাতেই করি , আজ বাবিন সেটাই রাগের মাথায় ফেলে দিল  …”   এতটুকু একটা মেয়ের মুখে যুদ্ধ শব্দটা শুনে একটু অবাক হলেও পরক্ষণেই ভাবলাম যে মানুষ  জন্মলগ্ন থেকেই যুদ্ধ করতে শিখে যায় ,এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।  “ছোটবেলায় যখন গান শিখতাম তখন বাবিন কোনো আপত্তি করেনি। একটা সময়ের পর আমি গুরুজির কাছে গানের পরীক্ষা দিতাম, ছোট ছোট অনুষ্ঠানে যেতাম, ক্রমশ বুঝলাম বাবিন একদম পছন্দ করছে না। আমি পড়াশোনা অবহেলা করিনি, গান আমাকে শান্তি দেয় অ্যান্টি। হারিয়ে যাওয়া মাকে সুরে সুরেই ছুঁতে পারি, দিম্মা বলে গেছে কখনও গান না ছাড়তে, গান ছেড়ে দিলে আমি বেঁচে থেকেও মরে যাবো। বাবার সব বন্ধুর ছেলেমেয়েরা এখনই মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষাগুলোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সব্বাই একরকম হয় বলো অ্যান্টি? বাবিন কিছুতেই বোঝে না। আমার গান নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছে আছে। বাবিন বলে ওসব গান নিয়ে পড়ে কিছু করতে পারবে না, নিজে তো সারাদিন ল্যাব আর ছাত্রছাত্রী নিয়েই থাকে। ধুর ভালো লাগে না কিছু। আমি বাড়ি যাবো না, যেদিকে চোখ যায় চলে যাবো।” মেঘের চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললাম,  ” ছিঃ ছিঃ অমন করে বলতে আছে? যে মেয়ে এই বয়েসেই জীবনযুদ্ধ শব্দটার অর্থ অল্প হলেও বুঝতে শিখেছে সেই মেয়ের মুখে এসব কথা মানায়? তোমার বাবা একদিন ঠিক বুঝবেন ,দেখো, তোমার সাধনা, তোমার গানই ওঁকে বোঝাবে।” খুব বেশি কথা ইচ্ছে করেই বাড়ালাম না, মনটা আনচান করছে। অনবরত মনে হচ্ছে যে কতক্ষণে ফোন নাম্বারটা নেব। ক্রমশ দেখলাম মেয়েটার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে, ঝটপট করে নাম্বারটা জামার পকেটের ব্যাচ থেকে নিলাম। হাতটা ভয়ে কাঁপছে, এমন পরিস্থিতিতে কখনও পড়িনি, মা দিদি কেউ নেই বাড়িতে। একবার ভাবলাম কাছের বন্ধু সুজানকে বলি, পরক্ষণেই মনে হলো পুলিশে খবর দিই, সব দোলাচল কাটিয়ে শেষমেশ মেঘের বাড়ির নাম্বারে ফোন করেই ফেললাম। প্রথম নাম্বারটা বেজে গেল, পরের নাম্বারটা ডায়াল করতেই একজন মহিলা ধরলেন। “আমি বসুন্ধরা মাইতি বলছি সল্টলেকের এডি ব্লক থেকে, আপনাদের মেয়ে আমার বাড়ির সামনে এসে খুব কান্নাকাটি করছিল, আমি এখনও আমার কাছে রেখেছি, অনুরোধ করছি দয়া করে এসে নিয়ে যান। আমি থানা পুলিশ করতে চাইছি না। ” টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে ওই মহিলা বললেন “দিদি    আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। ” -এটুকু বলতে বলতেই মহিলা অঝোরে কেঁদে উঠলেন। আরো বললেন ” দাদাবাবু সাংঘাতিক চিন্তা করছে, আমি এক্ষুণি বলছি। মেয়েটা বড় ভালো গো, খুব কষ্ট পাচ্ছে, ছোট থেকে মানুষ করছি গো, আমি  কাজের লোক…” ” আপনি শান্ত হবার চেষ্টা করুন, চিন্তা করবেন না, আমার কাছে আছে। আপনি বাড়ির লোককে পাঠান। ঠিকানা বলছি ,লিখে নিন দিদি।” ঠিকানা লিখেই ওই মহিলা লাইন কেটে দিলেন। এসে দাঁড়ালাম বারান্দায়, বিকেলের আলো একটু একটু করে কমে আসছে। আকাশের নীলচে ছায়া পড়েছে সামনের ঝিলে। সুমিতা চা দিয়ে গেল, গভীর দুশ্চিন্তা থেকে সাময়িক রেহাই পেতে  হাতের  কাছে রাখা পত্রিকা ঘাঁটতে লাগলাম। খানিকটা সময় যেতে না যেতেই সুমিতা আবার এলো। ” সুমিতা, মেয়েটা উঠেছে?” ” না, দিদি। তবে একজন এসেছেন, মনে হচ্ছে মেয়েটার বাবা। তুমি তাড়াতাড়ি কথা বলে মিটিয়ে নাও, আর ঝামেলা ভালো লাগছে না, মা নেই, অন্য কিছু ঘটনা ঘটে গেলে করার কিছু থাকবে না। কোনো দোষ না করেও তুমি জড়িয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি মিটিয়ে নাও। ” “আহ্ সুমিতা, একটা ছোট মেয়ে না বুঝে আবেগের বশে এখানে চলে এসেছে, এত ভয় পাচ্ছ কেন? বাড়ির লোক তো এসেছেন, পাঠিয়ে দাও। ” ” কচি  বাচ্চা তো নয় দিদি? ” ” এত কথা না বলে পাঠিয়ে দাও। আমি কথা বলছি।” কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই মনে হলো যে একটা ছায়া আমার দিকে এগিয়ে আসছে,বাইরের আলো একেবারেই ক্ষীণ হয়ে গেছে। ডুবন্ত  সূর্যের পাঁচমিশালি রঙের আভাটুকু রয়ে গেছে আকাশের গায়ে। কানে এলো, ” বসুন্ধরা। ” মুহুর্তে মনে হলো যোজন যোজন মাইল দূর থেকে একটা খুব চেনা গলার আওয়াজ কানে আসছে। চোখ ফেরাতেই দেখি সৌমিক দাঁড়িয়ে আছে,  চশমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে চিরপরিচিত সেই দুটো চোখের উজ্বল চাউনি। ” বসুন্ধরা, ভাবিনি এমন পরিস্থিতিতে তোমার সঙ্গে দেখা হবে, তোমাদের বসার ঘরে তোমার ছবি দেখেই বুঝতে পেরেছি যে এটা তোমার বাড়ি। কেমন আছো বসুন্ধরা? তোমরা কবে সল্টলেকে এসেছো ,জানি না তো?”  মুচকি হেসে বললাম, ”  ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর আর কোনো যোগাযোগ তো আমাদের মধ্যে ছিল না সৌমিক, দুজনের পথ দুটো আলাদা দিকেই বেঁকে গেছে। মাঝখানে খবর পেয়েছিলাম তুমি বিদেশে ছিলে, এটুকুই আর কিছু না।” ” বসতে পারি? ”  “ওমা আবার জিজ্ঞেস করতে হবে, চা বলি? ” ” না বসুন্ধরা  চা খাওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় আমি এখন নেই, সুজাতা যখন খবর দিল তখন আমি নিউ কামার রিসার্চারদের সঙ্গে মিটিং করছিলাম। খুব টেনশন হচ্ছিল, ভাবছিলাম লোকজনকে বলি। তখনই তুমি সুজাতাকে ফোন করেছিলে। মেয়েটা এমন একটা কাজ করলো, তোমাকে নিশ্চয় খুব বিরক্ত করেছে?” ” আহা বিরক্ত করবে কেন? আজ যদি আমার  সন্তান এই কাজ করতো তাহলে আমি রাগ করতাম?”  আমাদের বিয়ে হয়েছিল বছর কুড়ি আগে, তারপর একটা সময়ের পর দুজনের ডিভোর্স হয়ে যায়।  পরে শুনেছিলাম সৌমিক আবার বিয়ে করেছে। “বসুন্ধরা, কিছু চিন্তা করছো?” ” নাহ্।” ” মেয়েটা  যত দিন যাচ্ছে তত অবাধ্য হচ্ছে, পড়াশোনায় খুব একটা মন নেই। আমার বন্ধুর ছেলেমেয়েরা যেখানে এখনই কেরিয়ারের নির্দিষ্ট পথ  ঠিক করে ফেলেছে ও সেখানে …  মাঝে মাঝে ভীষণ হতাশাগ্রস্ত লাগে।” ” চিন্তাভাবনায় মিল না হলেই কেউ অবাধ্য হয়ে যায়? ” মৃদু হাসি হেসে গেলাম বারান্দায়, সৌমিক এসে দাঁড়ালো দরজা ঘেঁষে। বাগানে আর বারান্দায় শুরু হচ্ছে মরসুমি ফুল ফোটার আয়োজন, সন্ধের স্নিগ্ধ নির্যাস গড়িয়ে পড়ছে ফুলের রেণুতে। ” বাহ্, নাইস বসুন্ধরা, তোমার গার্ডেনিং-এর নেশা আছে জানা ছিল না তো, রিয়েলি বিউটিফুল। ” ” দেড়  বছর আমি তুমি সংসার করেছি। আমার মনের ঘরে কখনও ঢোকার চেষ্টা তুমি করোনি সৌমিক। তোমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। ছাড়ো। একটা কথা বলি?” ” প্লিজ বলো। ” ” এখানে দেখো পাথরকুচি ফুলগুলো নিজের সৌন্দর্য নিয়ে ফুটে আছে, এখন তো শিউলির বিদায় নেওয়ার সময় এসে গেছে। তবু এখনও দু একটা ফোটে, ঝরে গিয়ে মাটিতে পড়ে থেকে গন্ধ বিলোয়। সব ফুলের রূপ, গন্ধ, একরকম হয় না, সবাই নিজেদের রূপেই অপরূপ। সব মানুষের চিন্তাভাবনা, জীবনবোধ, ভালোলাগাও আলাদা আলাদা হয়। সবাইকে এক ছকে ফেলা যায় না। ” ” তুমি তাহলে বলছো মেঘকে পড়াশোনার দিকে নজর দিতে বলে ভুল করেছি।” ” কোনটা  ঠিক কোনটা ভুল সেটা বিচার করার আমি কে? আমি তো আর তোমার জীবনে,যাপনে জড়িয়ে নেই সৌমিক, তার ছিঁড়ে গেছ। আজ বিশেষ একটা পরিস্থিতিতে কিছু বলতে হচ্ছে। দেখো  সন্তান হচ্ছে একটা ছোট্ট গাছের মতো, আমরা যেমন গাছকে যত্ন করি বাচ্চাও তেমনই আমাদের আলোছায়ায় বেড়ে ওঠে। একটা সময়ের পর তার  জায়গা পৃথিবীর বুকে তাকেই তৈরি করতে দেওয়া উচিত। সাহিত্য কবিতার খবর তুমি তো তেমন রাখো না। রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আছে, নাম স্নেহগ্রাস।” ” তোমার মুখে এই প্রথম নাম শুনলাম, বিশ্বাস করো। স্কুলের পাট চোকাবার পর সাহিত্যের পাতা খুলে দেখিনি। একটু শুনি তোমার মুখে, আমার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে হয়তো রিলেট করতে পারবো। ” “এখানে কবি মায়েদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, তবে সন্তান মা বাবা দুজনের শরীর মনের অথবা শুধু মনের অংশ। ইনফ্যাক্ট  সিঙ্গল পেরেন্টদের ক্ষেত্রেও ভীষণ মানানসই ,তাই বলছি। ” অন্ধ মোহ বন্ধ তব দাও মুক্ত করি-/ রেখো না বসায়ে দ্বারে জাগ্রত হয় প্রহরী / হে জননী আপনার স্নেহ-কারাগারে/ সন্তানেরে চিরজন্ম বন্দী রাখিবারে/  বেষ্টন করিয়া তারে আগ্রহ-পরশে, জীর্ণ করি দিয়া তারে লালনের রসে, মনুষ্যত্ব-স্বাধীনতা করিয়া শোষণ আপন ক্ষুধিত চিত্ত করিবে পোষণ?” আসলে  …” আমাকে ঝট করে থামিয়ে সৌমিক বললো,” কথাগুলো মনে মুহূর্তে দাগ কেটে গেল  বসুন্ধরা।” “রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির মাধুর্য এটাই যে আমাদের জীবনের অনেক ঘটনার সঙ্গে  রবীন্দ্রনাথের সৃজন মিলে যায়।” “আরো একটু বলো প্লিজ।” “শেষটুকুতে কবি বলেছেন, ” নিজের সে বিশ্বের সে বিশ্বদেবতার-/ সন্তান নহে গো মাতঃ সম্পত্তি তোমার।” জীবনের পরতে পরতে মিলে যায় তাই না?” ” তুমি একেবারে আগের মতোই আছো বসুন্ধরা, সেই গলার আওয়াজ, একটুও হারিয়ে যাওনি।” ” আমি তোমার তো কাছে চিরকাল হারিয়েই ছিলাম!  ” নীরবতা নেমে এলো কথার মাঝপথে, দুজনে খানিকক্ষণ তাকালাম দুজনের দিকে, হেমন্ত কালের হিম-আলো লেগেছে দুজনের শরীরে। লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সৌমিক বললো,” সবটাই আমার জন্য হয়েছে, অতিরিক্ত আগলাতে গিয়ে সবটাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তোমাকেও ধরে রাখতে পারিনি বসুন্ধরা, আলো মেঘের মা তো ধরা ছোঁয়ার বাইরে, মেয়েটাও পাশে থেকেও আমার অতিরিক্ত শাসনের জন্য দূরে সরে যাচ্ছে। ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি বসুন্ধরা। মাঝে মাঝে মনে হয়  উফ্ আর নিতে পারছি না! বিশ্বাস করো। ”  “আমি কিছুই তেমন তোমার থেকে চাইনি সৌমিক, শুধু নিজের ব্যক্তিত্ব বিকাশের ডানা মেলতে চেয়েছিলাম। যাইহোক আমি এখন তোমার জীবনে অতীতের একটা ছিন্ন-ফুল মাত্র, বর্তমানে বাঁচো প্লিজ। মেয়েটার তুমি ছাড়া এখন কেউ নেই, একটু বন্ধু হয়ে ওঠবার চেষ্টা করো, দেখবে অনেক সমস্যা মিটে যাবে। সন্তান তো আমাদের আজ্ঞাবহ জীব নয়, বুঝতে হবে সৌমিক। ” ” উঠতে হবে বসুন্ধরা, তোমার কাছে আমার ঋণের সীমা পরিসীমা নেই। ” ” সবকিছুকে ঋণের জালে জড়ানো যায় নাকি? আর একটা কথা, মেয়েটার মনের ইচ্ছেটাকে মেরে ফেলে দিও না প্লিজ,তোমার মেয়ে গান বড্ড ভালোবাসে, ওর গলা থেকে সুর  কেড়ে নিও না। গান গেয়েও বেঁচে থাকা যায়। সবাইকেই ইঁদুর দৌড়ে ছুটতেই হবে কেন? আর একটা কথা! ” ” বলো।” ” সকালে হারমোনিয়াম রাগের মাথায় না ফেললেই পারতে!”  “তোমার কাছে ,মেঘের কাছে আমি একজন নিরস নিষ্ঠুর মানুষ।” ” নিজের লোকেদের সঙ্গে এত লড়াই করতে নেই সৌমিক। যদিও আমি এখন আর তোমার নিজের লোক নই।”  “তুমি কাঁদছো বসুন্ধরা? কখনও তোমাকে কাঁদতে দেখিনি।” ” তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে বোধহয়!” সৌমিক এগিয়ে গেল দরজার দিকে, ধূসর রঙের নিয়নের আলো পড়েছে দরজার কাছে। কোথা থেকে ভেসে আসছে চিরন্তনী গান, ” বন্ধু রহো রহো রহো সাথে…” 

Anindita Mitra
অনিন্দিতা মিত্র -
বই পড়তে খুব ভালোবাসি। টুকটাক প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখা লিখতে পছন্দ করি।

© All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.