A STORY by Ahmed Faruk MIR

বাংলা English

অনাগত সভ্যতার নাম হোক মিত্রতা

এক.

বিবর্তন একটি গতিপথ। আমরা কেবল যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত দৌড়াচ্ছি আমরা। একদিনের জন্যও সুখের শেষটা দেখতে পারিনি আমরা কেউ। যেখানে গিয়ে আমরা স্থির হতে পারি। এমন কি বিশ লক্ষ বা তারও অধিক বছর ধরে যারা মানুষ বলে নিজেদের পরিচয় দেয়, তারা সবাই এই বাহ্যিক এবং স্নায়বিক বিবর্তনের গতির মধ্যেই ছিল। এখনও আছে। সুতরাং চূড়ান্ত সুখ বলতে আমরা যা বুঝি তার মাত্রা স্যাপিয়েন্সরা হয়তো কোন একদিন ছুঁতে পারবে। যেদিন তারা বলতে পারবে, “আমি সুখী এবং আমি সুখী।”

ততদিন আমরা অপেক্ষা করবো।

এক সুবহি সাদিকের পূর্বমুহূর্তে আপন স্বপ্নে বিভোর গল্পটি নীনা সেনকে বলছিল ত্বকী মুবারাক।

তখন ছিল জানুয়ারির শেষাশেষি শীতকাল। তীব্র শীতে গুটিসুটি হয়ে নীনা সেন গল্পটি শুনছিল ঘুমঘুম মাদকতা নিয়ে। নীনা সেন বসেছিল ত্বকী মুবারাকের পাঁজর থেকে সামান্যই দূরে। এবং দু’জনের মধ্যে একটি কালো রঙের শক্ত প্রাচীর ছিল। অথচ নীনা সেনের ধবধবে ফর্সা পা বার বার ছুঁয়ে যাচ্ছিল ত্বকী মুবারাকের শ্যামলা রঙের শক্ত আঙুলে। নীনা সেন ও ত্বকী মুবারাক নিজেদের মধ্যে খেয়াল করছিল শেষ রাতের অদম্য অস্থিরতা। ওরা নিজেদেরকে চিরাচরিত প্রাকৃতিক উদ্দীপনা থেকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। অথচ ত্বকী মুবারাক নিজেও বুঝতে পারছিল না, এই অমূলক নিয়ন্ত্রণ কতক্ষণ স্থায়ী হওয়া উচিত। ত্বকী মুবারাকের শরীর ও মন প্রায়ই বিদ্রোহ করে বসত। অথচ সে ছিল শক্ত নিয়ন্ত্রক।

ত্বকী মুবারাক নীনা সেনের কাঁধের উপর দিয়ে শেষ জানুয়ারির দূরবর্তী চাঁদটির দিকে তাকিয়ে ছিল এবং গল্পটি বলে যাচ্ছিল। মুক্ত গল্পকালে তার চোখগুলো হয়ে উঠছিল রক্তাভ ও লালচে রঙের।

ত্বকী মুবারাক ঠিক এই সময়টিতে গল্পের মধ্যেই ডুবে থাকতে চেয়েছিল এবং সে উপলব্ধির আরও গভীরে ডুবে গিয়ে নীনা সেনকে বলতে চেয়েছিল, “যাবতীয় মানুষের সুখ মূলত একটি মিলনমেলার নাম।”

আমরা এতদিনে যা জেনেছি, নীনা সেন, তা একটি রাতের চাঁদের আলোয় ধুয়ে যেতে পারে। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমিই সমূলে সর্বনাশ হয়ে গিয়েছিলাম, যখন আমি জানতে পেরেছিলাম আমার সমস্ত জানাশোনা ছিল মিথ্যা! আপনি জানবেন এবং জেনে খুশি থাকবেন, কারণ আপনার ভিতরে ছিল ধৈর্য ও আপনার ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা। আপনি তাড়াহুড়াগুলোকে সব সময়ই উপেক্ষা করতেন। এবং ধীরে ধীরে একটি চমৎকার গল্পের আবহ তৈরি করে নিতেন। আপনি অস্থিতায় কেঁপেকেঁপে উঠেও অনায়াসে সংযত হয়ে থাকতেন। অথচ এটি ঐশ্বরিক ইচ্ছের বাইরে একটি খেলা। এবং একটি মোহযুক্ত মিথ্যা।

নীনা সেন, আপনি এটুকু উপলব্ধি করতে পারেননি যে, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিল একটি আবেগহীন পাথুরে গল্প। অথচ আপনি আরও বেশি করে পছন্দ করতেন আবেগময় কথাকাহিনিগুলো। আমি যা মনে মনে অপছন্দ করতাম।

নীনা সেন, একটি গল্প এমনভাবেও শুরু হতে পারে, যেভাবে আমরা কথা বলা শুরু করি এবং কারো কণ্ঠে গান শুনে অথবা কারো নাচ দেখে মুগ্ধ হই। অথচ আমি মুগ্ধ হই আজ থেকে মাত্র একটি শতাব্দী পরবর্তী সময়ের কথা ভেবে। আমি মুগ্ধ হই একটি কেন্দ্রীভূত পৃথিবীর জন্য অপেক্ষা করে। চেষ্টা করলে হয়তো আপনিও উপলব্ধি করতে পারবেন গল্পটি শুনতে শুনতে।

আমি এবং আমরা সবাই একটি গোপন পরামর্শের জন্যও অপেক্ষা করি, যখন আমাদের মধ্যে কোন বাধা-বিধান থাকবেই না। যখন একটি গান অথবা কয়েক মিনিটের নৃত্যের মতোই আমরাও মুগ্ধ হবার অধিকার নিয়ে আলোচনা করবো।

এটি একটি সৌন্দর্যবোধ এবং মানুষের জন্য সবচেয়ে বৃহত্তম উন্মুক্ত দরজার মতো।

দুই.

সন্ধ্যাকালীন ঘটনাগুলো সকাল অবধি পরিবর্তিত হয়ে ফিরে আসে। হয়তো এমন এক সকালের সাথে মিলেও যায়, যা ঘটেছিল আরও বহুকাল আগে।

নীনা সেন, আপনি দেখুন, একটি  করুণ সুর দিনভর বাজতেই থাকে। ভায়োলিন অথবা বেহালাবাদকের কুঠুরী থেকে চুইয়ে আসা সুরগুলোর কথা বলতেই আমি বেশি ভালোবাসবো। অথচ আমরা সকাল এবং সন্ধ্যার সুরগুলোর পার্থক্য সহজেই বুঝে উঠতে পারি। সুতরাং আমি ধীর গতির নিরবচ্ছিন্ন পরিবর্তনের কথাটিই মনে করিয়ে দিচ্ছি আপনাকে।

শেষ জানুয়ারির কনকনে ভোর তখন। নীনা সেন বিভোর শীত ও গল্পে। তিরতিরে ঠাণ্ডা হাওয়া নীনা সেনকে ভয়ানক জাপটে ধরেছিল। তার গায়ে ছিল একটি সোনালি রঙের চাদর। এবং এটি ছিল জানুয়ারির তুলনায় পাতলা ও কম লম্বা। নীনা সেনের ফর্সা পা ছিল শীতার্ত নাগরিকের মতোই সামান্য ওমের জন্য কাতর। ত্বকী মুবারাকের পায়ের স্পর্শ আরও দৃঢ়ভাবে প্রয়োজন ছিল তার। অথচ ওদের মধ্যে ছিল একটি শক্ত কালো প্রাচীর।

ত্বকী মুবারাক গল্পটি বলে যাচ্ছিল নরম ও কোমল কণ্ঠে। নীনা সেনের মতো নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল তার। এটি ছিল একটি আবেগময় স্বপ্ন এবং ত্বকী মুবারাক যা সত্য বলে মনে করে। এবং একটি মিত্র সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিল সে। এবং সে অপেক্ষা করছিল শক্ত কালো দেয়ালটি ছুড়ে ফেলার শক্তি ও সময়ের জন্য।

ত্বকী মুবারাক গল্পটি বলে যাচ্ছিল…।

প্রিয় নীনা সেন, গল্পটি আরও গভীর হয়ে শুনুন, আরও নীরবতা পালন করুন হৃদয়ের গভীরে। হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ করুন এবং পাঁজরের আরও কিছুটা নিকটবর্তী হোন, যেন আপনার নিঃশ্বাসের পরিপূর্ণ শব্দ আমার হৃদয়কে স্পর্শ করে এবং আমি আরও গভীরে ডুবে যেতে পারি গল্পের।

জানুয়ারির শেষ শীতের এই গল্পটি আমাকে এবং আপনাকে নিয়ে যাবে বহু যুগ পরের একটি সকালে। যখন আপনার দেশ এবং আমার দেশ বলে কিছু থাকবে না। আমরা হবো একটি একীভূত পৃথিবীর যত্রতত্র মানুষ। আমাদের কোন নগর থাকবে না এবং আমাদের প্রয়োজন হবে না কোন নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব সনদ।

আপনি দেখে থাকবেন, মানুষ কত দ্রুত ছুটে চলেছে! মানুষ কত দ্রুত তার প্রিয় মানুষকে খুঁজে বের করছে সম্প্রদায়, ধর্ম এবং জাতিগুলোকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে। আপনি দেখে থাকবেন, মানুষ কত দ্রুত ভেঙেচুরে ফেলছে অঞ্চলের সীমারেখা। এবং ছুটে যাচ্ছে ধর্ম-অধর্মের গণ্ডি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে।

নীনা সেন, আমি একটি ছোট্ট-ক্ষুদ্র প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি দশ হাজার মাইল উত্তরের শীতাঞ্চল থেকে। আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন কেবল মাত্র প্রোটেস্টান্ট অথবা শিয়া অথবা শূদ্র এর অজুহাতকে সামনে টেনে এনে! অথচ আমাকে আপনার কণ্ঠ এবং কোমর মুগ্ধ করেছে। আমাকে মুগ্ধ করেছে আপনার চোখ ও ভ্রু। আমি দশ হাজার বছর ধরে বিমূর্ত রয়েছিলাম। এবং আমার এ দীর্ঘ সময় কাটছিল কেবল আপনার নৃত্যদৃশ্য দেখেই। বিশ্বাস করুন, এই বিবর্তিত সময়ের শপথ করে বলতে পারি।

নীনা সেন, আমরা যত ধীরে সভ্যতাকে স্থাপন করেছি কতগুলো গোষ্ঠী এবং জাতির সীমাবদ্ধতায়, তার চেয়ে দ্রুততম সময়ে আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলবো, দেখতে পাবেন।

ত্বকী মুবারাক তাকিয়ে রইল এবং নীনা সেন আরও একবার ইচ্ছা পোষণ করলো ত্বকী মুবারাকের পায়ের স্পর্শ পাবার। দূরবর্তী চাঁদ তখন আরও কিছুটা নিচে নেমে এসেছে এবং স্পর্শ করেছে নীনা সেনের চিবুক।

তিন.

অসম্ভব অনুভূতিময় আমরা মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে আমরা অনুভূতিহীন! জীবন থেকে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, নীনা সেন। আসুন, আমরা একটি গল্পের শরীরে নিঃশ্বাস ফেলি। আসুন, আমাদের কথাগুলো আবারও এক বার বলে দেই একে অপরকে। আসুন, আমরা আবারও কোথাও বসি। যেখানে লম্বা মাথাওয়ালা প্রকাণ্ড ঝাঁকড়া ও প্রাচীনতম পাইনবৃক্ষরা অহংকারে উদ্যত।

নীনা সেন, আপনি আগেও জানতেন যে, পাইন’ই পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত বৃক্ষ। এবং ভেড়া ও শূকর’ই আলোচিত প্রাচীন গৃতপালিত। এবং নিয়ান্ডারথালেরা স্যাপিয়েন্সদের চেয়েও শক্তিশালী বিলুপ্ত বুদ্ধিসম্পন্ন।

নীনা সেন, আসুন আমরা আলোচনা করি আমাদের অতীত ও ভবিষ্যৎ কাল। আমরা আলোচনা করি সামনাসামনি বসে। আমরা আলোচনা করি একে অপরের দৃষ্টিতে ছাই হয়ে। এবং এমন কি প্রয়োজনমতো আমরা একে অপরের শরীরে আশ্রয় নিতে দ্বিধাবিভক্ত চিন্তাকে লুপ্ত করার সাহস সঞ্চয় করি।

নীনা সেন, আসুন, আমরা সমঝোতা করি আমাদের ধর্মগুলোর বাইরে এসে। আমরা কাছাকাছি হই এবং নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দগুলোকে বুদ্ধের হাতে ছেড়ে দেই। তিনি অবশ্যই একটি সুরাহা আমাদের সামনে উপস্থিত করতে পারবেন। কারণ, একমাত্র তিনিই চেয়েছিলেন প্রাণীর নিরবিচ্ছিন্ন মুক্তি।

নীনা সেন, আমার ভাবনা নয় এটি কেবল, এটি বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত, আপনি চার লক্ষ বছরকে পর্যালোচনা করুন এবং প্রতিষ্ঠিত করুন নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে। আমি বলব, চার লক্ষ বছরের তুলনায় জলবিন্দুপ্রতিম সময়ের মধ্যেই আজকের দেশ এবং কাঁটাতার এবং যুদ্ধ আমাদের জন্য হয়ে উঠবে কেবল লিখিত ইতিহাস। সত্যি বলতে, অসংখ্য টানাপোড়েনের মধ্যে আমরা একদিন সত্যিকারের সাম্যব্রতী একটি পৃথিবী পাবো। এবং আমার এবং আপনার মধ্যে এই ভূখণ্ড ও বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের ভাগাভাগি আর থাকবেই না।

নীনা সেনের কাছে এসব কথাগুলো মনে হচ্ছিল স্বপ্নের মতো। নীনা সেনের মাথায় কখনও এমন চিন্তা উদয় হয়নি। এমন কি অধিকাংশের কাছেই পরিবর্তনের এমন অলৌকিক ভাবনাগুলো মনে হবে অমূলক এবং আজগুবি। কারণ, স্যাপিয়েন্সরা প্রকাণ্ড জগতের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষণায়ু। সুতরাং তাদের সাধারণ চিন্তা কেবল বেঁচে থাকার সময়কালেই সীমাবদ্ধ। বড়জোর চিন্তার বিস্তৃতি পৌঁছতে পারে প্রপিতা এবং প্রপৌত্র পর্যন্ত। সুতরাং ধীর গতির বিবর্তনসূত্র মানুষের সাধারণ চিন্তা হতে সুদূরবর্তীই থেকে গিয়েছে।

ত্বকী মুবারাক নীনা সেনকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, “সামান্য কিছু মানুষই দেখতে পায় দূরবর্তী পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ এবং যুগ থেকে যুগের বিবর্তন এবং অগ্রযাত্রা।” সামান্য কিছু মানুষই হতে পারে সত্যিকারের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং তারাই জানে, দূরবর্তী স্বপ্নগুলোর সত্য ও মিথ্যা…।

চার.

নীনা সেন, আপনি যখন শুনতে চেয়েছিলেন রোমাঞ্চে ভরা অথবা মন ভালো করার গল্প, তখন আমি চেয়েছিলাম শৃঙ্খল ভাঙার গল্প বলতে। নীনা সেন, আপনি অপেক্ষা করুন নতুন একটি পর্বের জন্য। ত্বকী মুবারাক আশ্বস্ত করছিল অস্থির নীনা সেনকে। অথচ সে অপেক্ষা করছিল কিছুটা স্পর্শ এবং সামান্যতম ওমের জন্য। কারণ ত্বকী মুবারাক গল্পটি শুরু করেছিল জানুয়ারির শেষ দিকের কোন এক সুবহি সাদিকের পূর্বকালে, যখন তীব্র শীতে মানুষেরা অপেক্ষা করে প্রিয় মানুষদের শরীরের ওমের জন্য।

নীনা সেন তাই করছিল এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ বলে উঠেছিল ত্বকী মুবারাককে উদ্দেশ্য করে, “মানুষের শরীরের ওমই সবচেয়ে আরামদায়ক।” এবং সম্মতির অপেক্ষা না করেই ত্বকী মুবারাকের আরও কিছুটা নিকটবর্তী হয়ে বসেছিল সে। যতটুকু নিকটবর্তী হলে আপন চিবুকে ত্বকী মুবারাকের তপ্ত নিঃশ্বাস পড়তে সহায়ক হয়।

কারণ ততক্ষণে দু’জনই নিজেদের মধ্যকার ধর্মগত জটিলতাকে নির্দ্বিধায় হাস্যকর মনে করার সাহসী সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিল।

ত্বকী মুবারাক আবার গল্পটি শুরু করল। সে বলছিল পরিবর্তনের কথাগুলো, এভাবে, “আমি জন্মকাল থেকে একই পাখির ডাকে করুণ মৃত্যুর আনন্দ পাই। একই পাখির ডাকে আমি আবার ফিরে যেতে পারি মায়ের কোল ঘেঁষে। আমি হয়তো সেই থেকেই খেয়াল করেছিলাম আমাদের বিবর্তন। অথচ কত মন্থর গতিতেই…!”

আমি অধিকাংশ সময়ই জগতের সত্যগুলোকে একটি সূক্ষ্ম নিক্তিতে মেপে মেপে দেখে নিতাম। আমি খেয়াল করতাম, বলার প্রয়োজন পড়ে না এমন সূক্ষ্ম গতিতে পরিবর্তনগুলো আমাদেরকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে নিয়ে যায় কোন এক নতুন পৃথিবীর দিকে। যেমন করে মানুষ আঠারোশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত ভাবতেই পারেনি তাপ থেকে যে বাষ্প উৎপন্ন হয় এবং তা থেকেই তৈরি হতে পারে রেলগাড়ির ইঞ্জিন। যদিও তার কয়েকশো বছর পূর্ব থেকেই মানুষ ভাত রান্না করত এবং ফুটন্ত পানির হাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে যেতো ঢাকনা। অথচ তারা এই রুপান্তরিত শক্তিকে খেয়ালই করেনি দীর্ঘকাল।

নীনা সেন, আসুন আমরা বুঝতে চেষ্টা করি আমরা কী চাই। আসুন, আমরা বুঝতে চেষ্টা করি, আমাদের কি প্রয়োজন। আসুন, আমরা ভেঙে ফেলি আমাদের সমস্ত জটিলতাগুলো এবং গায়ের রঙ এবং ভাষাগুলোকে। নীনা সেন, তারপর আমরা মিলিত হই প্রেমে, সংগমে এবং মানবতায়। আমাদের সন্তানেরা পৃথিবী জুড়ে বাঁচুক। আমাদের সন্তানেরা পৃথিবী জুড়ে বেড়ে উঠুক এবং একটি বাসযোগ্য শান্তি বয়ে নিয়ে আসুক।

আসুন, আমরা স্নেহে মিলিত হই। বুকের মধ্যে জমা করি নিজেদের ও মানুষদের জন্য সামান্যতম মমতা এবং শান্তিময় ওম!

পাঁচ.

একটি দীর্ঘ গল্পের মধ্যে বাস করে আপনি এটুকু জানতে পেরেছিলেন যে, গল্পটি ছিল একটি মানব ও মানবীর ইচ্ছার প্রতিফলন। এটি কোন ব্যক্তিবিশেষের সুবিধা বা অসুবিধা তো নয়ই, এমনকি এটি কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের স্বার্থকেও প্রভাবিত করে না। আপনি বুঝতে পারবেন একটু ভাবতে বসলেই, আমি একটি নাগরিক সংসার নিয়ে কোনদিনই ভাবিনি। এমনকি প্রেমিকার মনস্তত্ত্ব নিয়েও নয়। যদিও আপাত দৃষ্টিতে তাই মনে হবে।

আমি ভেবেছিলাম জগতময় মানবপ্রেম নিয়ে। ভেবেছিলাম ঈশ্বর ও কল্পিত অনুমতির অপেক্ষাগুলো নিয়ে, যেগুলো আমাদেরকে আলাদা করেছিল। অথচ সে অনুমতি এবং অপেক্ষা কেবল আত্মনিমগ্নতার। বলতে গেলে আত্মবিলোপের তীব্র আকাক্ষার প্রতিফলনও এটি। কারণ অমরত্বই মানুষ সবচেয়ে আরাধ্য বস্তু। সুতরাং দ্বিতীয় জীবনের আকাক্ষাই ছিল মানুষের জন্য পরম লোভনীয়। পাহাড় অথবা পাথরও আত্মনিমগ্ন থেকেছে বরাবর। আপনি নিশ্চয়ই গ্রীক নার্সিসাসের কথাও শুনে থাকবেন। ভালোবাসার ব্যাপারেও ওগুলো ছিল বরাবর স্থির ও নিশ্চল! অথচ মানুষের ক্ষেত্রে ভালোবাসার বাইরে আরও বিশেষ যা প্রয়োজন হয় তা হল শরীর। কিন্তু পাহাড়ের সংবেদন নেই, কেবল আছে স্থির দাঁড়িয়ে থাকার মাধুর্য।

মানুষ যদি বলে আত্মার সাথে শরীরের সম্পর্ক নেই, তবে আমি তাকে মনে করিয়ে দেব, “লেডি চ্যাটার্লিজ” এর কথা। আপনি হয়ত জেনে থাকবেন, “ডিএইচ লরেন্স” এর সৃষ্ট এক অনবদ্য প্রেমিকার কথাই আমি বলছি। “মৈত্রেয়ী দেবী” এবং মধ্যযুগীয় “সিমোন দ্য বোভ্যয়ারের” কথাও আমি বলবো, যারা ছিল “জ্যাঁ পল সার্ত্রে” ও “মির্চা এলিয়াদ” এর একনিষ্ঠ প্রেমিকাদ্বয়।

নীনা সেন, আসুন, আমরা আমাদেরকে হৃদয় উজার করে ভালোবাসি। এবং ঘৃণা করি ততটুকু যতটুকু না করলেই নয়।

ছয়.

আসুন, আমরা আরও সাহস সঞ্চয় করি এবং এগিয়ে যাই।

সত্যিই আপনি শুনে অবাক হবেন যে, পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম মানবিক বিপর্যয় ইহুদী হত্যার মূলে ছিল কীসের ধারণা! আপনি সত্যিই অবাক হবেন যে, মানব মনের সমস্ত গভীরতম কূট আকাঙ্ক্ষা এবং ধর্মগুলোর সাম্প্রদায়িক চর্চার মতো এটিও ছিল একটি ঘৃণ্যতম পদক্ষেপ। আমি আবারও বলি, আপনি আগেই না জেনে থাকলে এবং আপনার মধ্যে মানবিক অনুভূতি জাগ্রত থাকলে আপনি অবাক না হয়ে পারেন না যে, হিটলারের ঘোষিত গণহত্যা বহন করবে বর্ণ ও সৌন্দর্য ও গুণ বৈষম্যেরই একটি বিকৃত ইতিহাস।

ধারণাটি বর্ণনা করলে এর অর্থ এমন দাঁড়ায় যে, পৃথিবীব্যাপী একমাত্র যোগ্য উত্তরাধিকারীদেরই টিকে থাকার অধিকার রয়েছে। আমরা যাদেরকে জানি আরিয়ান হিসেবে। এবং বাইবেল যাদেরকে চিহ্নিত করেছে নিকৃষ্ট হিসেবে এবং যারা কালো, যারা সমকামী, যারা খাটো এবং যারা যৌন আবেদনময়ী নয়, যাদের স্তন সুডৌল নয়, এমনকি যাদের যোনিপথ শিল্পসম্ভাবনাময় নয়, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। এছাড়াও যাদের লিঙ্গ ভয়ানক কৃষ্ণাভ, তারাও যেন সুন্দর যোনিবিশিষ্টাদের শরীরে স্থাপন না করতে পারে সংক্রামিত অঙ্কুর।

ঠিক এসব কারণেই যুগে যুগে সাদাদের চেয়ে কালোরা ছিল পিছিয়ে। আর্যরা করেছিল দ্রাবিড়দের উৎখাত। নাৎসিরা চেয়েছিল ইহুদীদের বিলুপ্ত করে দিতে। অথচ সত্যি কথা বলি, এই হত্যাকাণ্ডে সাদাদের গোপন অনুমোদন ছিল গভীরতম সত্যের মতো।

নীনা সেন গল্পটি শুনতে শুনতে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল এবং মানুষের প্রতি তার ঘৃণা দীর্ঘায়িত হচ্ছিল। অথচ সে চুপচাপ শুনেই যাচ্ছিল ত্বকী মুবারাকের চোখের অস্থির মণির দিকে চোখ রেখে। নীনা সেনের ঠোঁট কাঁপছিল, মানুষের প্রতি তীব্র রাগে অথবা হতে পারে ত্বকী মুবারাকের কাক্ষিত মমতার স্পর্শে। অথচ শেষ জানুয়ারির তীব্র ঠাণ্ডা সুবহি সাদিকের ঝুলে থাকা চাঁদ তখনও স্পর্শ করেছিল নীনা সেনের ফর্সা গ্রীবা।

সাত.

ত্বকী মুবারাক তখনও গল্পটি বলে যাচ্ছিল, যখন ধীরে ধীরে ভোর ফুটে উঠেছিল এবং সুবহি সাদিকের চাঁদ যখন দ্রুত নেমে এসেছিল। নীনা সেনের গ্রীবা স্পর্শ করে ধীরে ধীরে পাঁজর ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দীর্ঘ ভ্রমণে বিশ্রামরত চাঁদটি। ত্বকী মুবারাক নীনা সেনের পাঁজর অতিক্রম করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল পাহাড়ে নেমে আসা গোলাপিরঙা চাঁদের দিকে।

ত্বকী মুবারাক নীনা সেনের পাঁজর থেকে নিজেকে দূরে টেনে রাখতে চেয়েছিল, চাঁদ যখন আরও নেমে এসেছিল পাঁজর থেকে কোমরে। ত্বকী মুবারাক সমস্ত মনযোগ সন্নিবেশিত করতে চেয়েছিল গল্পটিতে। সে অস্থিরতার সাথে এবং অপেক্ষাকৃত জোরে জোরে বলে যাচ্ছিল গল্পটিকে। ত্বকী মাবারাক পূর্বের মতোই বলে যাচ্ছিল হিটলার এবং শান্তির কথা, যা কথাক্রমে গল্প হয়ে উঠছিল।

হিটলার এবং প্রাচীন যুগের শেষ দিকের এলিটরা, যারা দাসপ্রথাকে ভেবে নিয়েছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত দুর্বলতর সৃষ্টি এবং তারা তাদেরকে ব্যবহার করত যথেচ্ছা, এবং তারাই তৈরি করে গিয়েছিল একটি শান্তিময় এবং একীভূত পৃথিবীর ভিত্তিমূল। কারণ, মানুষেরা যুগ বিবর্তনের সাথে সাথে সজোরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার প্রয়াস পেয়েছিল অত্যাচারীদেরকে। এবং অত্যাচারিতরা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। আর তারা তখন থেকেই সচেষ্ট হয়েছিল একটি বর্ণপ্রথাহীন এবং একটি সাম্রাজ্যহীন একীভূত পৃথিবী গঠন করে নিতে।

আমাদের উত্তারাধিকারীরা আজ থেকে সামন্য কিছু বছর পরই দেখতে পাবে গণহত্যার ঐসব সুফল। তারা দেখতে পাবে কাঁটাতারের বিপরীতে অবাধ যাতায়াত। তারা দেখতে পাবে সাদাদের কোলে কালোদের বলিষ্ঠ সন্তান। তারা দেখতে পাবে আলিঙ্গন ও সঙ্গমরত নারী এবং পুরুষ, যাদের বর্ণ বিপরীত। অথচ তারা পরিপূর্ণ মৈথুনতৃপ্ত। অথবা পরিপূর্ণ বলতে আমরা যা বুঝি তার চেয়েও বেশি তৃপ্তিময় হবে তাদের সঙ্গমকাল।

নীনা সেন, আমার কথা বিশ্বাস করুন, আমরা দ্রুতই ফিরে যাবো একটি শৃঙ্খলহীন মুক্ত পৃথিবীতে। ঠিক যেমন ছিল কৃষি বিপ্লবের পূর্ববর্তী আমাদের আদি পুরুষ ও নারীরা।

আট.

নীনা সেন, একটি গল্প বলতে গিয়ে আমরা চলে গিয়েছিলাম প্রাচীন এবং পরবর্তী কয়েকশ বছরের ইতিহাসে। এবং আমরা পরবর্তী কয়েকশ বছরের ধারণাকে নিজেদের করে নিতে পেরেছি। আপনি বেঁচে থাকুন বা মৃত্যু হোক আপনার, আপনি একটি ডায়েরিতে লিখে রেখে যেতে পারেন একীভূত পৃথিবীর পরিকল্পনাকে, যাতে সহজতর হতে পারে আপনার উত্তরাধিকারীগণের পরবর্তী পৃথিবী এবং পরিকল্পনাগুলো।

আমরা দীর্ঘকাল ধরে যে ভাবনাগুলোকে জমা করে রেখেছিলাম, তার চেয়ে ভিন্নরকম ভাবনাগুলো আমাদের মাথায় অধিকাংশ সময়ই আসে না। আমরা ভাবতেই পারি না আমাদের ভাবনার বাইরেও আছে বিস্তর জানা-শোনার অবকাশ। যেমন ধরুন, কনফুসিয়াস, যীশু কিংবা মুহাম্মদ কখনও ভাবতেই পারেননি জরা অথবা মৃত্যুর ভাবনায় ঈশ্বরের বাইরেও মানুষের প্রজ্ঞার হাত কতটা কার্যকরী!

মানুষ এবং জগতকে জিম্মি করার সবচেয়ে বিষয়ভিত্তিক এবং সবচেয়ে সাম্প্রতিক ভাবনা হলো বায়োনিক স্পাই ফ্লাই। মানুষ শতশত কোটি টাকা এই খাতে ব্যয় করে আনন্দ পায়। আনন্দটা হলো অন্যকে জিম্মি করার কৌশলগত বিষয়-আশয়কে কেন্দ্র করে। নীনা সেন, এখনও মানুষেরা মানুষকে দাস হিসেবে দেখতেই বেশি পছন্দ করে।

অথচ এসবের প্রয়োজন পড়বে না আর অল্প কিছু বছর পর’ই। নীনা সেন, অল্প কিছু মানে এমন নয় যে, আপনার অথবা আমার মৃত্যু পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের কথা বলছি। সত্যি বলতে আমরা সভ্যতার আজকের স্তরে এসে পৌঁছেছি বিবর্তনের লাখ লাখ বছর পর। সুতরাং আমরা যদি আগামী একশ বছরে কয়েক লাখ বছরের গড়ে ওঠা শৃঙ্খল সভ্যতা ভেঙে ফেলতে পারি তা হবে ন্যানো সেকেন্ডের বিপ্লবের মতোই ব্যাপার।

নীনা সেন, আসুন আমরা ভাবি, এবং আমরা নিজেদেরকে আরও নিকটবর্তী করে তুলি এবং একে অন্যের শরীরের মধ্যে নিজেদের জায়গা করে নিই।

নীনা সেন, জাতিগত এবং ধর্মীয় বাধাকে বেতোয়াক্কা করে এভাবেই আমরা সম্প্রদায়, দেশ ও জাতিকে একীভূত করে তুলতে সফলকাম হবো।

“একীভূত পৃথিবী”,  আমার গল্পের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক উচ্চারিত শব্দ। নীনা সেন, আসুন জানুয়ারির শেষ রাতের এই শীত সমারোহে আমরা আরও নিকটবর্তী হই। আমরা একে অন্যের নিঃশ্বাস ঘনীভূত করতে সহায়তা করি। ব্রহ্মনীয়, মুহাম্মদীয়, প্রোটেস্ট্যান্ট, আর্য এবং দ্রাবিড় রক্ত মিলে তৈরি হোক এক উন্মুক্ত পৃথিবী।

এবং এভাবেই ঘনীভূত হোক সমস্ত জগত। এবং আসন্ন সভ্যতার নাম হোক মিত্রতা।

Ahmed Faruk Mir
  জন্ম- ভোলা, বাংলাদেশ  
প্রকাশিত বই - ঈশ্বরী (গল্প),সবুজ টিপ কাঁচের চুড়ি (কাব্য),জোয়ার বাঁশি ও খুফুর মূর্তি (কিশোর গল্প), নীল নক্ষত্র (উপন্যাস), হিপোক্রেটিক (উপন্যাস), অবিন্যস্ত আলোকরেখা (কাব্য), টুকটুকি (ছড়া)। 
লেখার বিষয়- বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি। যা মানুষকে ভাবায়। যা পরিবর্তন হওয়া উচিৎ বলে মনে হয়। সুতরাং এসব অসংগতি নিয়ে ভবিষ্যতে নানামূখী কাজ করার আগ্রহও রয়েছে। খুব ছোট বয়সে "পথের পাঁচালী" উপন্যাস এবং তাঁর লেখকের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। বর্তমানে লেখার মূল বিষয় ছোটগল্প এবং কবিতা।  
ahmed86farukmir@gmail.com     

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *