A story by ahmed Faruk Mir

বাংলা English

দ্রাবিড় শম্ভূ

বর্ম পরিধানকৃত পিতা, এগিয়ে আসুন। আমরা আজ যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি তাতে স্রষ্টার ইচ্ছা-স্বাধীনতাকে উপযুক্ত জবাব দেয়া সহজ হবে। আমরা যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি তাতে দুঃশাসকের শক্তিকে পরীক্ষার মাধ্যমে মোকাবেলা করা সহজ হবে। পবিত্র পিতা, আসুন আমরা আর অপেক্ষা না করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করি। তার নাম দ্রাবিড় শম্ভূ, যে বলেছিল, এবং যে বিস্তার লাভ করেছিল পুবের জঙ্গল জুড়ে। তার ছিল মুষ্ঠিযোদ্ধার মতো শক্ত শরীর, দানবের মতো শক্ত হাত, এবং চিতার মতো পিটপিটে চোখ। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সকল ও সমস্ত যুদ্ধেই সে জিতে নিয়েছিল। যেসব যুদ্ধে তার প্রতিপক্ষ ছিল প্রখর দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন পাইথন অথবা সবচেয়ে ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন নেকড়ে অথবা সাদা রঙের হনুমান। অথবা অন্য কোন লড়াকু সজারু সদৃশ সরীসৃপ।

এবং সে-সমস্ত যুদ্ধে জয়ের পর ভয়ানক ক্ষিপ্র আওয়াজ তুলে দ্রাবিড় শম্ভূ পিতাকে বলেছিলেন, পবিত্র পিতা, সমস্ত বিষাক্ত নৈপুণ্যতা নিয়ে এবং জনতার ইচ্ছাধীন ঈশ্বরেরই মতো স্বেচ্ছাচার নিয়ে যারা পৃথিবীকে সামান্য করে রেখেছে তাদের জন্যই আজকের যুদ্ধ চক্রান্ত। ঈশ্বর শক্তির বাহাদুরি ভালোবাসেন। ঈশ্বর ভালোবাসেন ক্রীড়া ও কর্কশ। এবং ঈশ্বর ভালোবাসেন কখনও কখনও যিশুর মতো সুবোধ ও সবচেয়ে বেশি প্রশংসনীয়। সুতরাং ঈশ্বর আমাদেরকেও পাঠিয়েছেন পক্ষান্তরে। আমাদের মৃত্যুই ঈশ্বরের সুখ। এবং আমাদের বেঁচে থাকা এবং যুদ্ধজয়ও ঈশ্বরের শুভক্ষণ। আমরাই শক্তি প্রয়োগে সবচেয়ে বেশি পারদর্শীতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হবো। ঈশ্বর, আল্লাহ এবং ভগবানের কসম, যেসব বিতর্কিত নামের মধ্যে বসবাস করেন স্বয়ং স্রষ্টা।

পিতা, এগিয়ে আসুন, বাহুকে শক্ত করুন এবং ভয়কে জয় করুন…।

আমরা ইতিমধ্যে জেনে নিয়েছি যে, আমাদের সামনে আছেন পরাক্রমশালী যোদ্ধা ও অপকৌশলী শক্তিকলাময় শত্রুরা। এবং যারা ভালোবাসেন মানুষকে নিয়ে ভয়ানক খেলায় মেতে উঠতে এবং কর্তব্যহীন সময়গুলোতে মৈথুনে লিপ্ত থাকতে। যারা আমাদের মাথার ওপরে ধারালো তলোয়ার হয়ে আছেন এবং যে কোন সময় আমাদের মাথা কেটে দ্বিখণ্ডিত করতে পারেন। সুতরাং আমরা তাদের কোন অতিরিক্ত সুযোগ দিতে পারি না। এবং আমরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবো এবং জয় আমাদের সুনিশ্চিত। আমরা আমাদের বাহুবল এবং অস্ত্রবল আরও বৃদ্ধি করবো এবং কুখ্যাত ক্যালিগুলার মতো হত্যা করবো সমস্ত অপশক্তিকে। সুতরাং আসুন আমরা এগিয়ে যাই।

দ্রাবিড় শম্ভূ একটি শক্ত পাথরের ওপর দাঁড়ালেন এবং সকলের উদ্দেশ্যে তার বক্তৃতা ব্যক্ত করলেন।

দুই.

নৈঃশব্দকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিল দক্ষিণীয় সাদা রঙের বকেরা। এবং তখনই শুরু হয়ে যেতো ছিপছিপে সন্ধ্যার আমেজ। দিন হলেই ম্যাকাওয়ের মতো সবুজ রঙের টিয়ে পাখিদের আকাশ চিড়ে উড়ে যাওয়ার সময় হয়ে আসতো। এবং তখনও দ্রাবিড় শম্ভূ একাধারে চিৎকার করে যেতেন। অনেকটা স্বেচ্ছাচারী ঈশ্বরের মতোই নির্ভয় ছিল তার গলার স্বর। তার চেয়েও আরও দক্ষিণে একটি খড়ের দোচালা ঘরে একাকী রঙের মন নিয়ে বসবাস করতো শ্যামলা রঙের ইরা ইহিতা। ইহিতার চোখ ছিল টলমলে ঘন জলের মতো গভীর। যেন অনায়াসেই শরীর ভেদ করে হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করতে সক্ষম দুটি কালচে বাদামী রশ্মিজাল। এবং মেয়েটির অধর ছিল বর্ষা জলে টইটম্বুর দিঘির মতো স্পষ্ট। এবং প্রায়ই যেসব অধরে ভরে ওঠে রূপোলি বৃষ্টিতে। এবং ইরা ইহিতা অধিকাংশ বিকেল দক্ষিণের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে পার করে দিতো। তার

চোখে সামুদ্রিক হাওয়া লাগতো এবং চোখগুলো দুলে উঠলেই ওর শরীরও দুলে উঠতো। অথচ দ্রাবিড় শম্ভূ ছিল বেগবান সুপুরুষ। যার শরীরময় জবজব করত নোনতা ঘামে।

আর শম্ভূ ভালোবাসতো দক্ষিণের সমুদ্র তীরবর্তী জঙ্গল এবং খোলা জায়গাগুলোতে অহেতুক হেঁটে বেড়াতে। এবং প্রায় প্রতি সকাল হবার সময়গুলোতেই সে ইহিতার শ্যামলা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। এবং মেয়েটিও ঠিক একইভাবে তাকিয়ে থেকে থেকে সময় প্রক্রিয়াকে থামিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর থাকতো।

কি আশ্চর্য তাই না? যুদ্ধ এবং প্রেম সমান্তরাল গতিতে চলতে পারে…। আসুন, আমরা অপেক্ষা করি!

তিন.

প্রাচীন শম্ভূর শোধ ও সঙ্কল্পের আগুনকে আবার আমরা যৌক্তিকতার শব্দবাক্যে মিলিয়ে নিতে পারি। আমরা দেখে নিতে পারি তার ইচ্ছা ও পরিকল্পনাগুলোকে। দ্রাবিড় শম্ভূ প্রাণ ভালোবাসতো। ভালোবাসতো বিবিধ প্রাণীদের থেকে তাদের আবাস ছিনিয়ে নেয়ার স্বৈরকল্পনাকে নস্যাৎ করতে। সে ভাবতে ভালোবাসতো, সমগ্র প্রাণ এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ভূমি ও প্রকৃতির অধিকার নিশ্চিত করতে। আপনারা বিশ্বাস করুন, আপনারা ভাবতেই পারেন না যে, নিজেদের আবাস বিস্তৃত করার অভিপ্রায়ে আপনারা সমস্ত প্রাণি প্রজাতির আবাসকে প্রতিনিয়ত ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছেন। অথচ ঈশ্বরের প্রকৃতি এবং ভূমি কেবল আপনাদের ইচ্ছা-স্বাধীনতার জন্যই নয়। যেমন শাসকের অধিকারেই নয় সমগ্র রাজ্য।

আপনারা আকাশের দিকে তাকান এবং দেখুন, ওখানে রয়েছে নানান আকৃতির বাঘ, ঘোড়া ও মানুষের স্থিরতা বিলুপ্ত করা রুপসী পরীগুলো। আমরা যাদেরকে আমাদের কল্পনা দিয়ে নির্মাণ করতে ভালোবাসি। এবং আমরা যেসব রুপসী পরীদের নিয়ে সংসার ও সহবাস করতেও যারপরনাই ইচ্ছাধীন থাকি। সুতরাং ঐদিকে দেখুন, এবং ভাবুন, কীভাবে একটি বস্তু নিমেষেই অন্য বস্তুর আকৃতি ধারণ করতে পারে। এবং তা হয়ে যায় নিজের অজান্তেই। নিজের অজান্তে একটি কাঁঠালের আকৃতি হতে পারে একটি ডাবের মতো, অথচ কোন কাঁঠালই আদতে ডাব নয়। এবং এতে ঈশ্বরের কোন পরিকল্পনাও নিহিত থাকে না। আপনারা ভাবুন এবং মেধাকে কাজে লাগান।

অতঃপর এসব বিক্ষিপ্ত ভাবনার পর দ্রাবিড় শম্ভূ স্বৈরাচারী ভূপিতাদের কথাগুলো নিয়ে পুনরায় ভাবনা-চিন্তা করলেন। তার পেশিবহুল হাত উলম্ব করে পিতাকে বললেন, এগিয়ে যেতে এবং তিনি শৃঙ্গ থেকে একটি পাথরকে মুক্ত করে কোঁচড়ে বেঁধে নিলেন। এবং ঈশ্বরের নামে পরিচালিত বুদ্ধিবিভ্রমে ভরা অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে জঙ্গলের সমস্ত মানুষকে পুনরায় আহ্বান জানালেন। তিনি তার পিতার মতো সমস্ত মানুষকে বর্ম পরিধান করার জন্য বলে উঠলেন এবং সকলেই চিৎকার করে তার শব্দ ও বর্ণের সাথে সমর্থন ধ্বনি তুললো। এবং তারা তাদের ধনুকের মাথায় তীরের ফলাকে জুড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

দ্রাবিড় শম্ভূকে আমরা দেখেছি শক্ত হাতে তাদের বিরুদ্ধে অগ্রগামী শক্তির পরিচয় দিয়ে এগিয়ে যেতে, যারা শাসক এবং যারা প্রকৃতি ও বিবিধ প্রাণিপ্রজাতির বিরুদ্ধে স্বৈরনিপুণ শক্তি প্রদর্শন করার মাধ্যমে পারদর্শীতার পরিচয় দিতে মহানন্দ পায়। দ্রাবিড় শম্ভূ নিজেকে প্রাণ থেকে বিচ্ছিন্ন দেখতে ভালোবাসে না। সে ভালোবাসে নিজের শক্তিকে কেন্দ্রে টেনে নিতে এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করতে। এবং সে ভালোবাসে ভূমি, জল ও ভূতলের সমগ্র প্রাণের অস্তিত্বকে। সুতরাং সে ঐসব শাসকের বিরুদ্ধে শক্ত হাতের শক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর ছিল। যারা ছিল জুলিয়াস সিজারের উত্তরপুরুষ অগাস্টাস টাইবেরিয়াস জার্মানিকাস কায়াস ক্যালিগুলার মতো দুঃসহ এক সিজারের রক্ত বহনকারী এবং তাদেরই মতো। যারা মানুষকে নিরন্তর বিষাদের মধ্যে ডুবিয়ে রেখে আনন্দ উপভোগ করতো। যারা ভালোবাসতো মৃত্যু এবং রক্ত। আপনারা নিশ্চয়ই কুখ্যাত টাইবেরিয়াসের নামও শুনে থাকবেন। আপনারা নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন তার অপশক্তির অভিশাপগুলোর গল্প। সুতরাং দ্রাবিড় শম্ভূ তার শক্তিমান পিতাকে সাথে করে একাধারে অনেকগুলো যুদ্ধের পরিকল্পনায় ছিল পাথরের মতো অটল।

চার.

মার্চের কোন এক বিকেলে শম্ভূর প্রথম দেখা হয়েছিল ইহিতার সাথে। সেদিন ছিল একটি বসন্তকাল। আমরা দেখেছি, মানুষের ভালোলাগার ইচ্ছেগু্লো বহুকাল থেকেই নানান বৈচিত্র্যময় ছিল। যা চিরকালই সত্যি তা হলো, মানুষ প্রাচীন গুহাকালীন সময়েও সুন্দরকে ভালোবাসতো। মানুষ বেলীফুলের তীব্র গন্ধে মাতাল হয়ে ছুটে যেতো এবং নদীর নীল জল অথবা নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসতো। এবং ভালোবাসতো চাঁদকে সবচেয়ে বৃহৎ আকৃতিতে দেখতে।

দিনকার ভালোলাগা এবং অভ্যাসমতো ইহিতা ছোট্ট গুহার বাইরে বেরিয়ে যেতো এবং নদীর ধারের খোলা আকাশের নিচে ধীর তালে বসে থাকতো। এবং ইহিতা প্রায়ই সাদা চাঁদের রাতে কলকল নদীটিতে নেমে যেতো। এবং সে কোমর সমান জলে দাঁড়িয়ে ভেসে থাকা চাঁদটির সাথে খেলা করতে করতে দূরদেশী বালকের কথা ভাবতো। এবং জলের স্পর্শে ইহিতা শিউরে উঠতো এবং তার পশুচামড়ার খসখসে অন্তর্বাস ততক্ষণে ভাসিয়ে নিয়ে যেতো রুপালি স্রোত। এবং সত্য বলছি, এর জন্য ইহিতা ভয়ে কেঁপে উঠতো না। সে জলের আরও গভীরে নেমে যেতো সে এবং সোনালি স্তনাগ্র দুটিকে জলের ঢেউয়ে ভেসে যেতে দিতো। প্রায়ই সে আঙুল দিয়ে খেলা করতো পরিপুষ্ট স্তনাগ্র দুটি নিয়ে এবং ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতো।

সে তখনও দ্রাবিড় শম্ভূর মতো বলিষ্ঠ বালক পুরুষটিকে দেখেনি। অথচ ততদিনে দ্রাবিড় শম্ভূ ইহিতাকে চিনে নিয়েছিল। এবং চিনে নিয়েছিল ইহিতার ছোট্ট গুহা এবং তার মা ও বাবাকে, যারা শম্ভূকে প্রথম দেখাতেই সুপুরুষ হিসেবে বলাবলি করেছিল। এবং বলাবলি করেছিল যৌবনাবতি ইহিতার সঙ্গী হিসেবে তাকে কেমন মানাবে। সুতরাং মার্চের সকালে তখনও ছিল অঘোষিত বসন্তকাল। এবং ছিল হলুদ হলুদ ফুলে দুলে ওঠা জঙ্গলের ভেতর এবং বাহির। এবং ইহিতা ভালোবাসতো ফুলগুলোর সাথে গল্প করতে এবং জঙ্গলের প্রজাপতিগুলোকে ছুঁয়ে দিতে। শম্ভূ নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকতো এবং তাকিয়ে থাকতো একটি পাখির মতো চঞ্চল মেয়ের দিকে। এবং সে তৎক্ষণাৎ ভুলে বসতো সমস্ত যুদ্ধ প্রস্তুতির কথা। এবং পিতার সাথে বলা সমস্ত অঙ্গীকারগুলোও। সত্যি বলতে সে ইহিতার ভেতরে ডুবে যেতো এবং ইহিতার শরীর ছুঁয়ে আসা বাতাসগুলো থেকে মিষ্টি গন্ধ আস্বাদন করার জন্য চোখ বুজে অপেক্ষা করতো।

পাঁচ.

আমি বহুদিন যাবৎ ধীরে ধীরে গল্পটি বলে যাচ্ছিলাম এবং গল্পটি ছিল একটি যুদ্ধেরই গল্প। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করুন, একজন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা একজন মহান প্রেমিকও। সুতরাং প্রাচীন যোদ্ধাপুরুষ দ্রাবিড় শম্ভূর গল্পে আমি প্রেমকে বিচ্ছিন্ন হতে দিতে পারি না। যখন ইরা ইহিতার মতো পুষ্ট অধরের প্রেমিকারা অপেক্ষায় থাকে সামর্থবান সুপুরুষের দেহালিঙ্গনের। এবং সত্যি এটাই যে, তারা বলিষ্ঠ পুরুষদের জন্যই নিজেদের যৌবনকে উৎসর্গ করতে ভালোবাসে। এবং সমুদ্রের গভীর জলে নেমে জল এবং ভাসমান চাঁদের সাথে খুনসুঁটি করার সময়কালেও ওরা কর্মঠ সুপুষের কথা ভেবে শিহরিত হয়ে উঠে। সুতরাং জ্ঞানী হলে একবার তাকিয়ে দেখুন বহু শতাব্দী পরের পৃথিবীর দিকে। এসব ক্ষেত্রে শাসন ও শোসণের পটপ্রবাহের বিষয়টিকেই আমি বেশি গুরুত্ব দেব। এবং আমি আরও মনে করিয়ে দেব, নারীর ভালোবাসা ও অবজ্ঞার বিষয়গুলোকে মানুষকে আবার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবেই। এবং নারীই হতে পারে একটি বুদ্ধিদীপ্ত ও শক্তিমান প্রজাতির ভয়াবহ বিলুপ্তির প্রদর্শক। সুতরাং আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।

সে যা হোক; সেদিন দ্রাবিড় শম্ভূর সাথে ইরা ইহিতার সামনাসামনি দেখা হয়ে গেল। ইহিতা সমুদ্রস্নানের পর স্পষ্ট চাঁদের আলো গায়ে মেখে গুহা অভিমুখে ফিরে যাওয়ার সময় তাকে দ্রাবিড় শম্ভূর ঠিক সামনে দিয়েই যেতে হলো। এবং সত্য কিংবা মিথ্যা স্বৈরতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক; ঈশ্বরের শপথ করে বলছি, ইহিতার গায়ে তখন মিহি চাঁদের আলো ছাড়া আর কিছুই ছিল না। দ্রাবিড় শম্ভূ ততক্ষণ পর্যন্ত ইহিতার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকলেন যতক্ষণ পর্যন্ত সে একটি ধূসর রঙের পাথর দিয়ে গুহামুখ আগলে না দিল। এবং তারপরই শম্ভূর ধ্যানভঙ্গ হলো এবং সে তার পিতার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। এবং সে পুনরায় সকলকে যুদ্ধের জন্য বর্ম পরিধান করার জন্য বললেন। ঠিক সে সময় তার ছিল একটিমাত্র কাঠ নির্মিত জাহাজ এবং কয়েকটি ঘোড়াচালিত যুদ্ধযান। এবং এসব ছাড়াও যা আরও গুরুত্বসহকারে বলা যায়, তা ছিল তার সাহস, একাগ্রতা এবং শপথ।

সুতরাং দ্রাবিড় শম্ভূ পৃথিবীর সমস্ত টাইবেরিয়াসদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন এবং নিশ্চিত জয়ী হবেন বলেই পবিত্র প্রত্যাশা করে নিলেন। এবং যারা তাদের শক্তি নিয়ে বরাই করতে ভালোবাসে এবং যারা নিজেদের অন্যায় শপথকে মনে করে ন্যায়সংগত। এবং যারা তাদের স্বেচ্ছাধীন ইচ্ছেগুলোকেই ধরে নেয় ঈশ্বরের ইচ্ছে। অথচ তারা ঈশ্বরের নামে অসংখ্য মানুষের হৃদয় এবং মুখকে জব্দ করে রাখতে পছন্দ করে। এবং তারা তা করে সজ্ঞানে এবং ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে। অতএব তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে একটি যুদ্ধের জন্যই…।

ছয়.

কোন এক কোজাগরী সন্ধ্যায় দ্রাবিড় শম্ভূ তার পিতাকে নিয়ে জাহাজে চড়ে বসলেন এবং জাহাজ ভাসিয়ে দিলেন উত্তরের শীতপ্রধান অঞ্চলের অভিমুখে। এবং মার্চের দখিনা হাওয়া জাহাজকে উড়িয়ে নিয়ে চললো এবং সমস্ত যোদ্ধারা দ্রুতগতিসম্পন্ন জাহাজ থেকে শিকার করল হাঙর। তাদের কাছে ছিল গতিসম্পন্ন ও ধারালো হারপুন। সুতরাং হাঙর অথবা তিমি শিকার করা তাদের জন্য ছিল সহজতর। এবং তারা প্রতি রাতেই গান করার জন্য জাহাজের মাস্তুলে উঠে বসতো এবং উচ্চস্বরে গান গাইতে থাকতো। এবং তারা খুব দ্রুতই পৌঁছে গেল একটি বৃহৎ দ্বীপে। দ্বীপের অদূরে তারা দেখতে পেল শক্তিমান মানুষেরা দুর্বলদের নিয়ে হাস্যরস করে এবং আনন্দের সাথে তাদের মধ্যে মৃত্যুভয় জাগিয়ে তোলে যাতে তারা সহজে তাদের কন্যা এবং স্ত্রীদেরকে ভোগদখল করতে পারে। এবং দুর্বলদের স্ত্রী এবং কন্যাদের সামনে সান্ত্বনার বাণী হিসেবে উচ্চারণ করে ঈশ্বরের স্বেচ্ছাচারকে এবং তারা ললাট লিখন সম্পর্কে দুর্বলদের সামনে বেশি বেশি স্মরণিকা পেশ করে এবং তাদেরকে ধৈর্য ধারণ করতে উৎসাহিত করে। এবং তারা বলে, তাদের এবং তাদের পথভ্রান্ত স্বামী ও পিতাদের মতো ঈশ্বরবিমুখদের জন্য তারা আছেন এবং তারা তাদের এবং তাদের সন্তানদের দেখভাল করবেন। এবং অঞ্চলের বুজুর্গ ব্যক্তিদের দ্বারা তাদের হয়ে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করবেন। সুতরাং পরপারে তারা যাতে অপার সুখে থাকতে পারেন তার ব্যবস্থা করবেন।

সুতরাং সেসব পুরুষ ও নারীরা তাদের ওসব অঙ্গীকার বিশ্বাস করে এবং নারীরা তাদের কাছে নিজেদের শরীরকে স্বেচ্ছায় দান করে। এবং তারা বুজুর্গদের প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা হিসেবে তাদের কন্যা সন্তানদেরকে বুজুর্গদের জন্য উপহার হিসেবে প্রেরণ করে। এবং তারা এসবের সমস্তই ঈশ্বরের সুনজর নিশ্চিত করার জন্য করে থাকে। এবং আপনারা বিশ্বাস করলে আপনাদের জন্য মঙ্গলজনক যে, ওসব নারীরা তাদের স্বামীদেরকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভুলে যায়। এবং তারা ঈশ্বরের প্রতি চূড়ান্ত অন্ধভাবে মোহাচ্ছন্ন হয় এবং আকণ্ঠ ঈশ্বরের মধ্যে ডুবে যায়। এবং এতদাঞ্চলের বুজুর্গ ব্যক্তিগণ তাদের মধ্যে পরকালের ভয় ঢুকিয়ে দিতে ভুল করে না, যাতে তাদেরকে সহজ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এবং ওসব ভীত নারীদেরকে বসে রাখা সহজতর হয়। সুতরাং প্রবলভাবে অদৃশ্যে বিশ্বাসী লোকদের ভিড়ে কথিত বুজুর্গানরা সহজেই তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে সক্ষম হন।

দ্রাবিড় শম্ভূ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেই দ্বীপের সমস্ত বুজরুকির বিষয়ে উপলব্ধি করে নিলেন এবং যুদ্ধসাজে সজ্জিত সমস্ত যোদ্ধাসমেত তার পিতাকে জাহাজ থেকে নেমে আসতে বললেন। স্বৈরাচারী এবং ঐশ্বরিক শক্তির সাথে নিজেকে কল্পনা করা ক্যালিগুলার মতো ঈশ্বর দাবীদার রাজা এবং তার বুজুর্গদেরকে হ্যাচকা টানে দ্বীপ থেকে মহাসমুদ্রে ফেলে দিলেন দ্রাবিড় শম্ভূ। এবং ওসব পরাক্রমশালী ও অপরিনামদর্শী ব্যক্তিরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমুদ্রের গভীর জলে ডুবে গেল। আপনারা বিশ্বাস করুন, ঈশ্বর নামের কোন শক্তি ওদেরকে এক মিনিটের বেশি বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি। অথচ ওদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল ঈশ্বরের প্রতি অন্ধ ভক্ত। এবং তারা তাদের জীবনের সমস্ত কিছু দিয়ে ঈশ্বরকে খুশি রাখার ধারণা নিয়ে দিনাতিপাত করছিল।

সাত.

সুতরাং দ্রাবিড় শম্ভূ অন্যত্র যাত্রা করলেন। এবং উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপের সম্রাট করে রেখে এলেন একজন নারীকে, যার স্বামী ছিল মৃত এবং যে অনিচ্ছা সত্যেও বহুবার ঈশ্বরভক্তদের খুশি করার জন্য তাদের সাথে সঙ্গম করেছিলেন। জাহাজ ভেসে চলছিল আরও অন্য এক দ্বীপের উদ্দেশ্যে। এবং দ্রাবিড় শম্ভূ জাহাজের সামনের পাটাতনে বসে ভাবছিলেন ইরা ইহিতা নামের সেই নারীর কথা, যার নিতম্ব চাঁদের মোলায়েম আলোতে মুক্তানন্দে ছন্দ তুলেছিল। এবং যার স্তনযুগল ঢাকা ছিল নিজ হাতের পাতলা আঙুল দ্বারা। অথচ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল সেগুলোর নরম স্নিগ্ধতা। এবং সেগুলো ছিল মায়াময়।

রাত যখন আরও গভীর হয় তখন জাহাজের পাল বাতাসে আরও ফুলে ওঠে। জাহাজ উড়ে চলে চাঁদ যেদিকে যায় সেদিক উদ্দেশ্য করে। শনশন শব্দ হাওয়া ছুটে যায় ফেলে আসা সমুদ্রপুরীতে। দ্রাবিড় শম্ভূর বুকের ভেতর আনন্দের মাদকতা বয়ে যায়। চারদিকে কেবল ঢেউয়ের উৎফুল্লতা। মহাসমুদ্র যেন মহামাদকের জন্মদাতা। দ্রাবিড় শম্ভূ পিতার সাথে গল্প করেন। জাহাজ চলে অন্য কোন অচেনা দ্বীপের অভিমুখে। ভোর হয়ে এলে বহুদূরে আরও আরও অন্য এক দ্বীপের ছায়া দেখা যায়। যেন আরও একটি দেশ। শম্ভূর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। এবং তিনি চিৎকার করে বলেন, সৈন্যরা প্রস্তুত হও। মহামান্য পিতা, সম্মুখ সারিতে থেকে আপনি পরিচালনা করবেন যুদ্ধ। যদি তারা সমঝোতা করে তবে আমরা কোন মুক্তিপণ ছাড়াই সুন্দরের শর্তগুলো তাদের সমুদ্রতীরের পাথরে লিখে দিয়ে যাবো। এবং তা থাকবে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি চিরায়ত নীতিমালা হিসেবে। অন্যথায় আমরা আমাদের বাহুর শক্তি ওদেরকে পরীক্ষা করার সুযোগ দেব। এবং তা হবে ওদের জন্য চরম মূল্য পরিশোধের শ্রেষ্ঠ সুযোগ।

আট.

জাহাজের সমস্ত যোদ্ধারা বর্ম পরিধান করে নিল। এবং তাদের প্রত্যেকের ধনুকে জোড়া জোড়া তীর জুড়ে নিল। তাদের শরীরে ছিল লৌহ নির্মিত বক্ষাবরণ। তাদের মস্তকে ছিল পিতলের শিরস্ত্রাণ। এবং তাদের সকলের চোখ ছিল নেকড়ের মতো তীক্ষ্ণ। এবং তারা সকলে ছিল কাঠবিড়ালির মতো ক্ষিপ্র। দূরবর্তী শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য তারা ব্যবহার করতো অভিনব নিনজা স্টার এবং সুরিকেন। সুতরাং যোদ্ধারা সকলেই ছিল পরিপূর্ণরুপে প্রস্তুত। জাহাজ দ্বীপের তীরে ভীরেছিল। এবং  শম্ভূ ভিক্ষুকের বেশে দ্বীপ পর্যবেক্ষণে বের হলো। এবং এখানে তখনও ছিল মে মাসের রুক্ষকাল। এবং দ্বীপের তীরবর্তী এলাকাগুলো ছাড়া সমস্ত এলাকা ছিল বিরানভূমি। ফসলের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। অথচ অঞ্চলের পুরোহিতগণের জন্য পেয়ালাভর্তি সুস্বাদু খাবার জোগার হতো প্রতিদিনই। বিনিময়ে তারা জলের জন্য ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করতেন। তারা রাজদরবারের প্রাসাদে বসে ঈশ্বরকে ডাকতেন এবং দ্বীপের প্রতি অঞ্চল থেকে প্রতিদিন তাদের জন্য আসতো মূল্যবান খাবার ও উপঢৌকন। এবং তা তারা নম্রতার সাথে গ্রহণ করতেন এবং ঈশ্বরের নিকট হাত তুলে দোয়া করতেন।

অথচ ক্রমেই দ্বীপে উৎপাদন কমছিল এবং ক্ষুধার্থের সংখ্যা বাড়ছিল। বাড়ছিল কঙ্কালসার শিশু, বৃদ্ধ ও নারীর সংখ্যা। এবং এসব ঘটছিল পুরোহিত প্রভূগণের চোখের সামনেই। তারা প্রতিটি অভূক্ত শিশুর মৃত্যুতেই ললাট লিখন শব্দটি উচ্চারণ করতেন এবং থাকতেন নির্বিকার। এতদসত্যেও দ্বীপের কিছু কিছু অঞ্চলে কিছু কিছু অবাধ্য মানুষ ছিল, যারা পুরোহিতগণকে পছন্দ করতেন না। বরং রাজদরবারে গিয়ে অনুরোধ করতেন দ্বীপের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে মধ্যবর্তী বিরান অঞ্চলগুলোতে জল সরবরাহ করার কৌশলগুলো রপ্ত করতে পারবে এমন লোকদেরকে রাজদরবারে আহ্বান করতে। এবং এতে সমস্ত দ্বীপ জুড়ে ফসলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সুতরাং পুরোহিতগন ক্ষেপে উঠলেন এবং ঈশ্বরের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপবাদে তাদেরকে বন্দী করার পরামর্শ দিলেন। এবং ঈশ্বর ও রাজার নিকট তাদের জন্য কঠোর শাস্তির জন্য ফরিয়াদ করলেন। সুতরাং বিদ্রোহীদেরকে হত্যা করা হলো।

আপনারা অবাক হবেন, এর পরও কিছু কিছু লোক পুরোহিতগণের নিষ্ফল হাত উত্তোলনকে ভালো চোখে দেখলো না এবং এমন লোকের সংখ্যা বেড়েই চলছিল। রাজা এসব লোকদেরকে বন্দী করে রাখলেন এবং পরবর্তীতে আরও এমন হলে তাদেরকে জনসমক্ষে শূলে চড়ানো হবে বলে হুশিয়ারী দিলেন। এবং চিন্তাশীল ও উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন মানুষদের জন্য সেই দ্বীপ হয়ে উঠলো এক ভয়ানক আতঙ্কের নাম। অথচ পিপাসার্ত এবং উপোষ মানুষের মৃত্যুর সংখ্য ক্রমশ আরও বাড়তে লাগলো।

দ্রাবিড় শম্ভূ রাজার সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাকে সিজারের উত্তরপুরুষ টাইবেরিয়াসের সাথে তুলনা করলেন। এবং তাকে আখ্যায়িত করলেন নিষ্ঠুর ও কট্টর ও অমানবিক ঈশ্বরভক্ত হিসেবে। তাকে আখ্যায়িত করলেন জ্ঞানহীন পুতুল রাজা হিসেবে। যে কেবল ঈশ্বরের উপর ভরসা করে প্রজাদের মৃত্যু দেখতে ভালোবাসে। এবং আরামপ্রিয় ভিক্ষাসর্বস্ব পুরোহিতগণের যুক্তিতে রাজ্য চালনা করে। পুরোহিতগণ দ্রাবিড় শম্ভূর আনাগোনা ভালো চোখে দেখলেন না। এবং পুরোহিত ও রাজার পক্ষ থেকে তার জাহাজে গুপ্তচর পাঠানো হলো। এবং গুপ্তচরদের তথ্য অনুযায়ী রাজা ক্ষেপে গেলেন এবং দ্রাবিড় শম্ভূর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। দ্রাবিড় শম্ভূ মনে মনে ঠিক তাই চেয়েছিলেন যে সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে রাজা নিয়েছেন। এবং খুব অল্প সময়েই প্রবল পরাক্রমশালী রাজা শক্তিমান দ্রাবিড়ের কাছে হেরে গেল। এবং রাজ্যের পুরোহিতগণ রাজদরবার ছেড়ে পালিয়ে গেল। সত্যি বলতে ঈশ্বর তাদেরকে পলায়নকালে কোন সাহায্যই করলেন না। বরং তাদের মধ্যে কেউ কেউ শম্ভূর তীক্ষ্ণ তীরের ফলায় বিদ্ধ হলো এবং ফসলহীন তপ্ত বালুর মধ্যে লুটিয়ে পড়ল।

দ্রাবিড় শম্ভূ অতঃপর চিন্তাশিলদের মুক্তি দিলেন এবং দ্বীপের অনুর্বর অঞ্চলে জল সরবরাহের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা চমৎকার কৌশল আবিস্কার করে নিল। পরবর্তী বছরগুলোতে যা দ্বীপের মানুষ ও বৃক্ষদের সজিব করে তুললো। সুতরাং সংগত কারণেই দ্রাবিড় শম্ভূর গন্তব্য তখন অন্য কোথাও, নতুন কোন মোহাচ্ছন্ন জনপদের উদ্দেশ্যে।

নয়.

জাহাজ ভেসে চলছিল আরও উত্তরের দিকে। রাত এবং দিনে, আলো ও অন্ধকারে। শক্তিমান শম্ভূ প্রায়শই দাঁড়িয়ে থাকে জাহাজের কিনারার রেলিং-এ হাত রেখে। তার মনে পড়ে ইরা ইহিতার ছিমছাম অবয়ব। সমুদ্রের বুকে ভাসমান চাঁদ দেখে শম্ভূর মনে পরে ইহিতার ভেসে যাওয়া স্তনাগ্রের ঘ্রাণের শব্দগুলো। শম্ভূর ঘন চুল বাতাসে ওড়ে। এবং উড়ে চলে ধূসর রঙের সমুদ্রচারী শোয়ালো পাখিরা। শম্ভূর আবারও মনে পড়ে ইহিতার চোখমুখ, নাভি এবং আঙুরের মতো পরিপুষ্ট অধর। শম্ভূ অপেক্ষা করে। শম্ভূ ফিরে যাবার জন্যই আরও কিছু যুদ্ধ শেষ করার প্রতিজ্ঞা করে। ভয়ানক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যে শহরে প্রজাদের দিন কেটে যেতো ততদিনে সে শহরে গিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন দ্রাবিড় শম্ভূর জাহাজ। এবং সে শহরের জনগণ দীর্ঘকাল ঈশ্বর আতঙ্কে মুখ খোলেনি। কারণ তাদের ঈশ্বর ছিল স্বয়ং সম্রাট নিজেই। এবং সম্রাট জানেন ঈশ্বর মানেই ইচ্ছের খেয়ালিপনা।

শহরটি ছিল পৃথিবীর পশ্চিমার্ধের শেষ শহর। একজন যোদ্ধার জন্য অবাক হবার কিছু নেই যে, দ্রাবিড় শম্ভূ ততদিনে পৃথিবীর পশ্চিমার্ধের শেষ শহরে পৌঁছে গিয়েছিল। শম্ভূ জানে, স্থায়ী সুখের জন্য দরকার কিছু অস্থায়ী ত্যাগ। নিষ্ঠুরতার ভয়াবহতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে দরকার তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ। সে জানে, মানুষ নিজের ক্ষুধার জন্য যতটা হা-হুতাশ করে নেকড়ে ততটা করে না। অথচ ক্ষুধা নিবারণের জন্য পশু শিকার করাকে নেকড়ের ভয়াবহ নিষ্ঠুরতাই ধরে নেয়া হয়। অথচ মানুষের প্রয়োজনে বিবিধ প্রাণী হত্যাকে ততটা নিষ্ঠুরতা কখনোই বলা হয়নি। দ্রাবিড় শম্ভূ চিন্তার গভীরে ডুবে যায় এবং ভেবে দেখে পৃথিবীর আর কোন প্রাণীই স্বজাতিকে হত্যা করে ততটা আনন্দ পায় না, যতটা পায় মানুষ। এবং একমাত্র মানুষই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীক উদরে প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রে সামান্যতমও ভাবনা-চিন্তা করে না। সুতরাং দ্রাবিড় শম্ভূ মানুষকেই প্রাণীজগতের সবচেয়ে কুখ্যাত প্রজাতি হিসেবে সাব্যস্ত করে নিল।

দ্রাবিড় শম্ভূ মানুষদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাইল তাদের ভয়ানক স্বেচ্ছাচারী ধারণাগুলো সম্পর্কে। এবং সে সফলতার পরিচয় বহন করেছিল তার প্রতিটি যুদ্ধে। আপনারা ইতিমধ্যে হয়তো ভেবে থাকবেন, দ্রাবিড় শম্ভূ ভূবিস্তৃত করার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। অথচ সত্যি তা নয়, যা আপনারা ভেবে নিয়েছেন। শম্ভূর যুদ্ধ ছিল মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনাগুলোকে প্রভাবিত করার সুযোগকে কাজে লাগানো। প্রতিটি যুদ্ধের পর যে স্বাক্ষর শম্ভূ রেখে এসেছিল।

সুতরাং চলুন আমরা গল্পের শেষ দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করি।

দশ.

দ্রাবিড় শম্ভূর কোন ঘটনাই যখন ঘটনা নয়, শম্ভূর কোন যুদ্ধই যখন যুদ্ধের মতো নয়, তার কোন গল্পই যখন জমে ওঠা গল্পের মতো নয়; অথচ এই নির্জীব কথাগুলোই কোন একদিন চমৎকার গল্প হয়ে উঠেছিল, যা আমাদের ভেতরকার বহুদিনের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা। সুতরাং আরও বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে আমাদের। গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে প্রতিটি শব্দকে। এবং ভেবে যেতে হবে শেষ পর্যন্ত। সুতরাং আসুন, চোখ বন্ধ করুন এবং ভাবুন। এবং সত্যি এটাই যে, ভাবনাই আমাদের সফলতা।

দ্রাবিড় শম্ভূ তখনও উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোর মানুষদের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য বহুদিন বহুভাবে হেঁটে যাচ্ছিল। এবং অশুভ ও অদৃশ্য কল্পিতকে পরাভূত করার জন্য আঞ্চলিক সম্রাটদের সঙ্গে যুদ্ধকৌশলের পরীক্ষায় আত্মনিয়োগ করেছিল। পুরোহিতগণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে যেসব ভীতি প্রথিত করে দিয়েছিল শম্ভূ তারই একটি সুরাহা করার জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। দ্রাবিড় শম্ভূ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন প্রাচীনকাল থেকে সাধারণ পাড়াবাসীকে ঠকিয়ে আসা শক্তিমান সম্রাট ও তাদের দোসর পুরোহিতগণের বিরুদ্ধে। এবং তা ঘটতে যাচ্ছিল ওসব পুরোহিতগণকে হাজার হাজার বছর সুযোগ দেয়ার পর।

জাহাজ তখনও চলছিল। বরফ অঞ্চল থেকে ছুটে আসা হু হু ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে দিয়ে জাহাজ ছুটে চলছিল ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্যের মতো। শম্ভূ বহু দ্বীপ এবং দেশকে ত্যাগ করে ফিরে যাচ্ছিল পূর্বাঞ্চলীয় সমুদ্রের পথ ধরে। শম্ভূর মনে পড়ছিল ইরা ইহিতা নামের সেই মেয়েটির কথা। মনে পড়ছিল একটি শান্ত সমুদ্রতীর ও ধুসর রঙের পাহাড়গুলো। যেগুলোতে রয়েছে মানুষদের জন্য গুহা। এবং শেয়ালদের জন্য আরও ছোট ঘর। এবং তারা পাশাপাশি বাস করে। সুতরাং শম্ভূ এগিয়ে যাচ্ছিল। এবং তার যোদ্ধারা তখন ছিল অর্ধক্লান্ত। যোদ্ধারা দীর্ঘ যুদ্ধের পর নিজেদের জন্য প্রয়োজন মনে করছিল নারী ও টিউলিপের। তারা নিজেদের জন্য প্রয়োজন মনে করেছিল শারীরিক ওম ও ক্ষিপ্র উষ্ণতা। এবং একজন যোদ্ধ পুরুষের জন্য তা কতটা মৌলিক আপনাদের জানা থাকবার কথা।

যোদ্ধাদের সময় কাটছিল সমুদ্রের মাছ ধরার মধ্য দিয়ে। এবং সামুদ্রিক মাছ যোদ্ধাদের ভেতরকার শারিরীক উত্তাপকে আরও বেগবান করে তুলছিল। এবং তাদের মধ্যে বহু যোদ্ধাই নিজেদের মধ্যে অনুশোচনাহীন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিল। এবং এটা ছিল তাদের জন্য তৃপ্তিদায়ক ও যৌনতার চাঞ্চল্যতাকে তারা মিটিয়ে নিতে অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিল। তারা তাদের যৌবনকে অকারণেই মরে যেতে দিতে রাজি ছিল না। বরং তারা তা উপভোগ করার কৌশলগুলো রপ্ত করে নিয়েছিল। এবং তারা নারী ভাবনায় একান্তভাবে ডুবে গিয়েছিল।

এগারো.

জাহাজ এগিয়ে চলছিল তুলনামূলক নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের দিকে। এবং যোদ্ধাদের তামাটে চেহারা ক্রমে পূর্বের ন্যায় ফর্সা হয়ে আসছিল এবং তারা সমুদ্রের জলে নিজেদের ছায়া দেখে তৃপ্তি পাচ্ছিল। এবং সত্যি বলতে তারা অপেক্ষা করছিল তাদের নিজেদের নারীদের সাথে মিলিত হবার। যাদের শরীরকে তারা ভাবতে ভালোবাসতো সুঢৌল ও কামনা জাগানো। এবং তারা যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে স্পর্শ করার জন্য অপেক্ষা করছিল। জাহাজ তখন প্রায় উড়ে চলছিল। কারণ তখন ছিল নব বসন্তের দারুণ হাওয়াকাল। সমুদ্র ছিল প্রায় উত্তাল এবং যোদ্ধাদের মন ছিল উৎফুল্ল। এবং পূর্বাঞ্চলীয় দ্রাবিড় শম্ভূ ছিল স্থির ও শান্ত।

বসন্ত শেষ হয়ে আসলেই দ্রুতবেগে চলে এসেছিল মে মাসের প্রখর রোদের সময়কাল এবং সমুদ্র আরও উত্তাল হয়ে উঠেছিল। এবং দ্রাবিড় শম্ভূ চিৎকার করে তার অভিজ্ঞ পিতাকে বলেছিলেন জলের গতিবেগ খেয়াল রাখতে এবং জাহাজের নাবিকদেরকে সাহস যোগানোর জন্য মাল্লারের গান বাজনার আয়োজন করতে। শম্ভূর পিতা ছিলেন শক্তিমান ও বুদ্ধিমান এবং সময়ের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাপুরুষ। তিনি জানতেন, বয়সের কোন এক সময় এসে পুত্রের কথাই পিতাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়। এবং এতেই লুকিয়ে থাকে সফলতা। কারণ পুত্রই তখন হয়ে ওঠে এক পরিপূর্ণ পিতা। যা ততদিনে পিতারা হারিয়ে ফেলে। সুতরাং পুত্ররা যখন পিতা হয়ে ওঠে পিতারা তখন হয়ে ওঠে এক মহান বটবৃক্ষ।

জাহাজ চলছিল গতিবেগের শেষ ও চূড়ান্ত স্তরের দিকে। এবং সমুদ্র তখন যাপন করতে যাচ্ছিল প্রলয়কাল। এবং সামুদ্রিক ঝড়ই ছিল তখন ঈশ্বরের একমাত্র ইচ্ছে। সুতরাং জাহাজের সকল যোদ্ধারা মরিয়ার মতো খুঁজে ফিরছিল একটি দ্বীপের ছায়া, যা হতে পারে তাদের মে মাসের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। এবং তারা বুঝতে সক্ষম ছিল সমুদ্রের গতিবেগ, মেজাজ এবং আগ্রহ। কারণ যোদ্ধারা সকলেই ছিল সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী লোক।

বারো.

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সমুদ্রে ঝড় উঠলো। তুমুল ঝড়ে সমস্ত জাহাজ দুমড়ে মুচড়ে গেল এবং যোদ্ধারা তখন ছিল সমুদ্রের উল্লাসিত জলের মধ্যে। ভাঙা জাহাজের কাঠগুলো হয়ে উঠেছিলো তাদের শেষ অবলম্বন। এবং তাদের জীবনের অসংখ্য যুদ্ধের মতো ঝড়ের সাথে এই যুদ্ধটিও জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মরিয়া হওয়া যুদ্ধ ছিল। যোদ্ধারা ছিল আরও বেশি শক্তিমান এবং তার চেয়েও, যেমন বলা হয়েছিল মহান ওডেসিউসের প্রিয় নাবিকদেরকে এবং যারা সকলেই সামুদ্রিক ঝড়ে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল।

ওডেসিউস ও তার নাবিকরা ছিল কল্পিত ঈশ্বর এবং দেবতাগনের প্রতি একচ্ছত্র বিশ্বাসী এবং অনুগত। অথচ ঈশ্বর এবং দেবতাগণের নিজস্ব কুটকৌশল ও অন্তর্কোন্দলের কারণেই তারা অসংখ্য মানুষকে সমুদ্রে, পাহাড়ে, উপত্যকায় ও মরুভূমির তপ্ত বালুতে প্রথিত করেছিল। এবং পরবর্তীতে তাদের উত্তরপুরুষগণ কুড়িয়ে পায়নি কিছুই, যা হতে পারতো তাদের জন্য শেষ চিহ্ন। ঈশ্বর এবং দেবতাদের ভয় তাদের মধ্যে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, তারা ঈশ্বর এবং দেবতাগণের এত অন্যায় সত্যেও তারা ঈশ্বরবিমুখ হবার সাহস পায়নি। অথচ আমরা দেখেছি পূর্বাঞ্চলীয় দ্রাবিড় শম্ভূর যুদ্ধকৌশল। এবং সাহসী বেঁচে থাকা। এবং জাহাজ বিদ্ধস্ত হবার পর তারা এক মহা ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে সকলেই বেঁচে গিয়েছিল। কেউ কেউ হয়তো বলে থাকবেন এটা তাদের ভাগ্যের সুদৃষ্টিরই ফল। আদতে তারা ভাগ্য বলে কিছুই জানতো না। বরং তারা বিশ্বাস করতো কাজে। তারা সারারাত জলে ভেসে থেকে ভোরের সূর্যের আলো ফোটার সময়কালে একটি দ্বীপের তীরের দেখা পেয়েছিল। এবং তারা উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। এবং তারা তাদের অবশ শরীর নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সেই দ্বীপে গিয়ে পৌঁছেছিল।

যোদ্ধাদের ঝড়যুদ্ধের এই জয়ের পেছনেও ছিল শক্তিমান পূর্বাঞ্চলীয় দ্রাবিড় শম্ভূর যুদ্ধকৌশল। এবং শম্ভূর কথামতো প্রতিজন যোদ্ধাই দ্রুততার সাথে এক একটি করে ভাসমান কাঠের টুকরা হস্তগত করেছিল। এবং সন্তর্পনে তাদের কুড়িয়ে নেয়া কাঠের টুকরোটি জড়িয়ে রেখেছিল। এবং তাদের কোমরে বেঁধে নিয়েছিল অল্প করে খাবার। এবং তাদের সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল তাদের বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছেশক্তি এবং হেরে যাওয়ার বিষয়টি তাদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিল। এবং সমুদ্রের জলে ভেসে থাকার সময় তারা ছিল একে অপরের নিকটবর্তী। সুতরাং তারা দ্বীপটিতে গিয়ে উঠলো এবং দ্বীপে বসবাসকারী জনগণ তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিল। দ্বীপের জনগণ ভেবেছিল দ্রাবিড় শম্ভূ ঈশ্বরের প্রতি অনুগত হবার কারণেই তারা সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিল। অথচ তাদের অন্তর্গত বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস সম্পর্কে আপনাদেরকে আগেই বলেছি।

তের.

দ্বীপে পা দেয়ার পরপরই দ্রাবিড় শম্ভূর মনে পড়েছিল মন্থর ইরা ইহিতার ঘরে ফিরে যাওয়ার কথা। এবং তার ইচ্ছে হচ্ছিল যত দ্রুত সম্ভব আপন মাটিতে ফিরে যাওয়ার জন্য। সুতরাং ঠিক এই সময়ে তার প্রয়োজন ছিল একটি জাহাজ। এবং তার আগে অন্তত কিছুদিনের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন বিশ্রাম। কোন এক গুহায় পড়ে থাকা অথবা ঠাণ্ডা ব্র্যান্ডির বোতল গলার মধ্যে ঢেলে দেয়া।

দ্রাবিড় শম্ভূকে আশ্রয় দিয়েছিল এক সহৃদয়বান কৃষাণ পরিবার এবং তারা তাকে ভালোবেসেছিল। এবং তাদের সংসারে ছিল একজন মাত্র যুবতী কন্যা। মেয়েটি ঘর থেকে বের হতো ছোট্ট পূর্বমুখী দরজা দিয়ে এবং তখন তার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো সকালের মিহি সূর্যালোকে। মেয়েটি হাঁটতো মন্থর পায়ে এবং তার ছিল সোনালী চুল। মেয়েটি ছিল ইরা ইহিতার ঠিক উল্টো। অথচ তার মধ্যে ছিল সম্ভাবনাময় ভালোলাগার শুরু। সুতরাং দীর্ঘদিনের একাকী দ্রাবিড় শম্ভূর জন্য সে ছিল একটি নতুন আশ্রয় এবং ভালোলাগার নতুন সুখানন্দ।

মেয়েটি ঘর থেকে বের হবার সময় শক্তিমান দ্রাবিড় শম্ভূর দিকে সোজা দৃষ্টিতে তাকাতো এবং তার চোখে থাকতো একটি মিষ্টি ঝিলিক। এবং মেয়েটি চলে যেতো পশুপালনের জন্য দূরবর্তী মাঠে। এবং কর্মচঞ্চল দ্রাবিড় শম্ভূকেও সে শিখিয়ে নিয়েছিল গম কাটার পদ্ধতি এবং শিখিয়ে নিয়েছিল কীভাবে খেতের পার্শ্ববর্তী আলপথে বসে ভুট্টা এবং বাদাম খুটেখুটে খেতে হয়। এবং দ্রাবিড় শম্ভূ অতিদ্রুত নিজেকে একজন যাদুকরি কৃষকপুত্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এবং সে এসব করেছিল আগ্রহের সাথে। এবং যেসব আগ্রহের কেন্দ্রমূলে ছিল সেই মেয়েটি, যার নাম এ্যালেইনা ডিয়াজ। দ্রাবিড় শম্ভূকে মেয়েটি বলেছিল দ্বীপটির প্রাচীনতম ইতিহাস। সুতরাং মেয়েটি সারাদিন ঘুরেফিরে শম্ভূকে শিখিয়ে নিয়েছিল অঞ্চলের জীবনযাপন। এবং তাকে বলেছিল মহান সব যোদ্ধাদের গল্প। এবং রাত হলেই তারা গল্প বলতে বলতে আরও ঘন হয়ে বসতো। এবং এ্যালেইনা ডায়াজের শরীরের গন্ধ দ্রাবিড় শম্ভূর স্থিরতাকে কেড়ে নিতো এবং তারা প্রেমের জন্য একজন অন্য জনের শরীরের ঘ্রাণ আস্বাদন করতো। এবং এসবই তারা করতো কোন প্রকার মেদহীন আনন্দের সাথে। এবং কোন ঈশ্বরবোধ অথবা পাপপবোধ তাদের মধ্যে জন্ম নিতো না। কারণ তারা দুজনই ছিল প্রেমের জন্য মরিয়া। সুতরাং কোন বিষাদ তাদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি।

চৌদ্দ.

একজন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বীরের জন্য যুদ্ধই যখন মৃত্যুর একমাত্র পথ তখন সে আর নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে না। নারীর প্রতি মোহ তার কাছে অবসর সময়ের জন্যই আসে। এবং তা আবার নিজের মধ্যেই লীন হয়ে যায়। অথচ সেই নারী, যার নাম এ্যালেইনা ডায়াজ। এবং যে ভালোবাসা এবং মমতা দিয়ে আপন করে নিতে পেরেছিল একজন বলশালী মহান যোদ্ধাকে, সুতরাং দ্রাবিড় শম্ভূ তার অস্তিনের বন্ধন থেকে ছুটে যেতেও ততটা আগ্রহ প্রকাশ করেনি। হয়তো ততদিনে সে ছিল ক্লান্ত। সুতরাং ইরা ইহিতার জন্যও সে অস্থির হয়ে ওঠেনি। সত্যি এটাই যে, দীর্ঘ সময়ের দূরত্ব প্রাণকে প্রাণের বন্ধন থেকে ছিন্ন করে। এবং বিশেষ উল্লেখ করতে হলে বলা যায়, এতদক্ষেত্রে স্মৃতিটুকুই কেবল জীবিত থাকে, যা দীর্ঘ সময় পর একটি দীর্ঘশ্বাসেরর সাথে অহেতুক মনে পড়তে পারে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মানুষেরা স্মৃতির মানুষটির জন্য ততটা অস্থির হয়ে ওঠে না, যতটা তীব্র মনে হয় একটি দীর্ঘশ্বাস।

সুতরাং যোদ্ধা দ্রাবিড় শম্ভূর হৃদয়ে সেই সুবিন্যস্ত নিতম্বের ইরা ইহিতা নতুন করে আর অস্থিরতার হৃদ্দিক ঝড় তুলতে পারেনি। বরং জায়গাটি দখল করে নিয়েছিল লাস্যময়ী এ্যালেইনা ডায়াজ। মেয়েটির চোখ ছিল তীর্যক। এবং আটসাট মাংসে পরিপূর্ণ ছিল যার ত্রিকোণমিতিক চোয়াল। এবং দ্রাবিড় শম্ভূ এ্যালেইনা ডায়াজের বুকের নরম মাংসে যে শান্তি পেয়েছিলেন তা তিনি অকারণে হাতছাড়া করতে চাননি। বরং তিনি সঙ্গমে, মমতায় এ্যালেইনা ডায়াজকে পরিপূর্ণ করে তুলেছিলেন। এবং এ্যালেইনা ডায়াজও দ্রাবিড় শম্ভূকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল নিজের হৃদয় ও শরীরের জন্য। অথচ এত কিছুর পরও শম্ভূ ছিল উড়ন্ত পাখির মতোই। এবং এ্যালেইনা ডায়াজ তা পরিচ্ছন্নভাবেই জানতো। আপনাদেরকে একটি কথা না বললেই নয়, যুদ্ধ ও উত্তাল সমুদ্রে দ্রাবিড় শম্ভূর ভয় ছিল না। দ্রাবিড় শম্ভূর ভয় ছিল ঈশ্বর ও সংসারে। তার ধারণামতে এই দুটো জিনিস তাকে বিপক্ষের প্রতি আগ্রাসী করে তুলতে পারে এবং গৃহ ও নিয়মের মধ্যে আকরে ধরতে পারে। সুতরাং চিন্তায় ও কাজে দ্রাবিড় শম্ভূ থাকতে ভালোবাসতেন মুক্ত। এবং তার সমস্ত যুদ্ধ ছিল অগনিত জনতাকে চিন্তার ক্ষেত্রে মুক্ত করতেই। যাতে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোন প্রকার জড়তা ও বন্ধন ছাড়া। এবং যাতে মানুষেরা অন্যকে ভালোবাসতে পারে কোন প্রকার স্বার্থ ও পার্থিব চাহিদা ছাড়া। এবং যাতে সম্পর্কগুলোর মধ্যে তিক্ততা স্থান না পায়। এবং বিরক্তিকর হয়ে উঠলেই যাতে মানুষদের স্বাধীনতা থাকে বিকল্প পথ বেছে নেয়ার। এবং নিঃসন্দেহে সেটিই মানুষের জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক। শক্তি প্রয়োগে ও স্নায়ুবিক যুদ্ধের এ-সমস্ত যুক্তি হয়তো চলমান সভ্যতার লোকদের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে মানুষ নিজেদের সুবিধার কথাই ভাবতে ভালোবাসে। এবং মানুষ সমস্ত জটিলতা ছিন্ন করে দ্রুতই ধাবিত হবে আত্মমুক্তির সন্নিকটে।

পনের.

সুতরাং কোন প্রকার সাংসারিক গোলযোগের মধ্যে প্রবেশ না করেই এ্যালেইনা ডায়াজের ভালোবাসাকে দ্রাবিড় শম্ভূ পূর্ণরূপে গ্রহণ করেছিলেন। আগেই বলেছিলাম, একজন শক্তিমান যোদ্ধা একজন মহান প্রেমিকও। সুতরাং যুদ্ধের জন্য শম্ভূ ছিল করিৎকর্মা ও সবচেয়ে সচেতন। এবং যুদ্ধের মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রে এ্যালেইনা ডায়াজও তাকে সম্মক সহযোগিতা করেছিল। অথচ দ্রাবিড় শম্ভূর নিকট প্রেমিকা এ্যালেইনার কোন কিছুই চাওয়ার ছিল না একটি চমৎকার সম্পর্ক ছাড়া। এবং এমন একটি সম্পর্ক, যে সম্পর্কটি কোন বিনিময় ছাড়াই দিতে পারে অপার্থিব আনন্দ ও সুখমুগ্ধতা।

অতঃপর দ্রাবিড় শম্ভূ ভালোবাসায় থিতু হয়েছিল এ্যালেইনা ডায়াজের ভালোবাসার সেই মুক্ত দ্বীপটিতে। যেহেতু তার কাছে কোন পঙ্খিরাজ ঘোড়া অথবা বায়ুবাহিত জাহাজ ছিল না সেহেতু সমুদ্র পাড়ি দেয়ার আর কোন চেষ্টা তিনি করেননি। বরং তার স্বচ্ছ মস্তিষ্ক তখনকার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পৃথিবীব্যাপী ধারণাগুলোকে ছড়িয়ে দেবার। এবং সমস্ত যোদ্ধাদেরকে তিনি বলেছিলেন সমস্ত তীর ও ধনুক পাথর অথবা বালির নিচে জমিয়ে রাখতে এবং প্রিয়জনদের বুকের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকা ফোটাতে যতক্ষণ না উভয়ে ক্লান্ত হয়ে একে অপরের বুকে ঘুমিয়ে পড়ে। এবং যতক্ষণ না পৃথিবীতে আসে তাদের সুস্থ সন্তানেরা এবং যারা যুগ যুগ ধরে কেবলমাত্র মুক্তদৃষ্টি, সত্য ও সুন্দরকে অন্যদের নিকট পৌঁছে দিতে ভালোবাসবে।

সুতরাং দ্রাবিড় শম্ভূ তখনকার মতো আবিস্কার করলেন একটি কলম, যা দিয়ে মনোবিপ্লবকে ছড়িয়ে দেয়া সহজতর হয়। এবং পূর্বাঞ্চলীয় শম্ভূ নিজের মধ্যে আবিস্কার করলেন যুদ্ধের চেয়েও ধারালো এক মহা বিপ্লবের। এবং তিনি তা যত দ্রুত সম্ভব বাইসনের চামড়ায় লিখতে লাগলেন। এবং এই নবতর বিপ্লব তাকে যুদ্ধের ভয়াবহ শরীরিয় কসরত থেকে মুক্তি দিল এবং মুক্তি দিয়েছিল ভুল আকাঙ্ক্ষাগুলো থেকে। সত্যি বলতে খুন ও হত্যা প্রায়শই মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে তোলে। এবং প্রতিপক্ষকে খুন মোহাবিষ্ট সময়ের জন্য একটি অনিয়ন্ত্রিত ও চমৎকার আত্মতৃপ্তি, যা প্রায়শই মানুষকে নিজেদের সময়ে সবচেয়ে পৈশাচিক তৃপ্তি প্রদান করে। এবং তখন মানুষ হয়ে ওঠে শিকারি হায়েনার মতো রক্তপিপাসু।

সুতরাং দীর্ঘকালীন যুদ্ধ অভিজ্ঞ দ্রাবিড় শম্ভূ নিজের শক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। অথচ তিনি তার চেতনাকে কখনওই দোষারোপ করেননি। কারণ তিনি ছিলেন একজন স্ববোদ্ধা। যেহেতু তাকে কেউ ধনুক ও যুদ্ধের ভয়াবহতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়নি সুতরাং তিনি নিজেকে অপরাধী বলে মনে করার কথা কল্পনায় অথবা বাস্তবে স্থান দেননি। বরং নিজের ভেতরে যুদ্ধ ও কলমের বিষয়ে জন্ম নেয়া চেতনার আনন্দে নিজেকে বারংবার ধন্যবাদ দিয়েছিল। এবং পৃথিবীতে যত উপলব্ধি তার হয়েছিল, যুদ্ধনীতির পরিবর্তিত গতিপথ তার মধ্য অন্যতম বলে তিনি মনে করেন। এবং তিনি মনে করেন, চিন্তাশক্তিই মানবমুক্তির সবচেয়ে বৃহত্তর সুড়ঙ্গপথ, যা সর্বসাধারণের নজরের বাইরে থাকে। অথচ সর্বসাধারণের বন্দি নজরকে স্ববমূলে মুক্ত করে।

শেষ

আহমেদ ফারুক মীর
জন্ম- ভোলা, বাংলাদেশ  প্রকাশিত বই - ঈশ্বরী (গল্প),সবুজ টিপ কাঁচের চুড়ি (কাব্য),জোয়ার বাঁশি ও খুফুর মূর্তি (কিশোর গল্প), নীল নক্ষত্র (উপন্যাস), হিপোক্রেটিক (উপন্যাস), অবিন্যস্ত আলোকরেখা (কাব্য), টুকটুকি (ছড়া)। লেখার বিষয়- বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি। যা মানুষকে ভাবায়। যা পরিবর্তন হওয়া উচিৎ বলে মনে হয়। সুতরাং এসব অসংগতি নিয়ে ভবিষ্যতে নানামূখী কাজ করার আগ্রহও রয়েছে। খুব ছোট বয়সে "পথের পাঁচালী" উপন্যাস এবং তাঁর লেখকের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। বর্তমানে লেখার মূল বিষয় ছোটগল্প এবং কবিতা।    ahmed86farukmir@gmail.com    

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.