A STORY BY AHMED FARUK MIR

বাংলা English

মহামারীকাল ও একজন স্বশিক্ষিত সংশয়বাদী

এক.

একজন স্বশিক্ষিত সংশয়বাদীর কন্ঠনিঃসৃত কিছু গল্প আমিও শুনেছিলাম গত বর্ষাজুড়ে। গত বর্ষার সমস্ত মাস আমার কর্মশালায় কোন দায়-দায়িত্ব ছিল না, কারণ তখন ছিল ভয়ানক এক মহামারীকাল। লন্ডনের স্কার্লেট প্লেগ এবং আমেরিকার রেড ডেথ এর পর দুই হাজার বিশ বর্ষ ছিল মানব ইতিহাসের চুড়ান্ত বিপর্যয়ের সবচেয়ে নিকটতম সম্ভাবনাকাল। পুরোটা বর্ষাজুড়ে আমার কোন কাজ ছিল না। কারণ গভর্নমেন্ট ঘোষণা করেছিলেন সকল উৎপাদন বন্ধ এবং শ্রমিকরা শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল যার যার শিশুকালের আস্তানার দিকে। এবং আমিও শহর ছেড়ে যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। আমি তখন নামমাত্র জমির আলপাশে বসে ভাবতাম কী করে বাবা ফসল ফলাতেন যখন আমার বয়স ছিল মাত্র চার-পাঁচ।

তখন ধানের চারা থেকে মাত্র দুই মাসের মধ্যেই গর্ভবতী হয়ে উঠতো সবুজ ধানগাছ। ধানের চারাগুলোর দুই সেন্টিমিটারের পুরু পেট এক সপ্তাহের মধ্যেই চার সেন্টিমিটারের জরাছুতে পরিণত হতো। তারপর বের হয়ে আসতো ফিনফিনে রেণুসমেত মিহি সবুজ ধান। ওগুলোর বাইরে ছড়িয়ে থাকতো বরফের কুচির মতো ঘন রেণু।

পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যেই সমস্ত রেণুগুলো মৌমাছিরা ছড়িয়ে দিত পুরুষ হতে স্ত্রী ধানের শরীর জুড়ে। ঐশ্বরিক সঙ্গমে মিলিত হতো অসংখ্য যৌবনবতী ধানফুলের রেণু। এটি পরাগায়নের এক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়া। সৃষ্টিজগতের এক অসাধারণ নন্দনতত্ব এটি। তখন মাঠজুড়ে মাতাল করা ঘ্রাণ। মৌমাছিদের আনন্দকাল! এই সময়টিতে বাবা গামছা মাথায় বেঁধে খেয়ে না খেয়ে রাত-দিন খেতের চারপাশে হেঁটে বেড়াতেন। যেন খেতের ধার থেকে আসতে কিছুতেই মন সায় দিত না তার। বাবার কাছে এটি ছিল এক ভয়ানক নেশার মতো। যেমন থাকে প্রথম কিশোর বয়সের কিশোরী সান্নিধ্যের নেশা।

তারপর ধীরে ধীরে সবুজ ধানের ভেতরে আসতো সাদা দুধ। যেন নারীত্বের পরিপূর্ণতার আভাস। যেমন বিশেষ সময়ে নারী স্তনের বোঁটা হাত স্পর্শ করলেই বেরিয়ে আসে সাদা দুধ, যা শিশুরা পান করে এবং বেঁচে থাকে, বড় হয়, তেমনি ধানের গা স্পর্শ করলেই মিহি দুধে আঙুল ভিজে যেতো। তারপর ধীরে ধীরে হলুদাভ ধান পরিপূর্ণ রঙে পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে। বাবা ধান কেটে বাড়ি নিয়ে আসেন। বাবার হাতে  লেগে থাকে স্নেহের মিষ্টি গন্ধ।

দুই.

বাবার মৃত্যুর দীর্ঘকাল পরে আমি বসে বসে ভাবতাম। মনে করতে চেষ্টা করতাম বাবার ফসল ফলানোর কৌশলগুলো। অবশেষে আমিও কয়েকটি ধানের চারা নরম মাটিতে গেঁথে রাখলাম গত বর্ষায়। মাত্র কয়েকদিন পরই আমার জমিটুকু ধানের কালচে সবুজ পাতায় থইথই করে উঠলো। আমি প্রায়ই খেতের আলপাশে গিয়ে বসে থাকতাম। তুমুল বর্ষাকালটা প্রায়ই ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে কাটতো আমার।

আমি কখনোই ভাবিনি বাবার মৃত্যুর পর শহর থেকে আবার জমিতে ফিরে আসবো। আমাকে আসতে হয়েছিল। কেবলমাত্র গ্রামেই নয়, সোজা ধানক্ষেতে।

শহরকেই যারা জীবিকার জন্য বেছে নিয়েছিল প্রকৃতি তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছিল। প্রকৃতি চেয়েছিল নির্মল বেঁচে থাকাটা আরও যেন বহুদিন দীর্ঘায়িত হয়। নিজ অস্তিত্ব রক্ষায় প্রকৃতি মানুষকে ফিরিয়ে দিলো। থামিয়ে দিলো প্রকৃতিকে অতিক্রম করার দুর্বার অগ্রগতি। প্রকৃতি মানুষকে ফিরিয়ে দিলো তার হৃৎপিন্ড এবং ফুসফুসের নিকট থেকে, যখন কারখানার ধোঁয়ায়, নিকোটিনের বুদ্বুদে প্রকৃতির হৃৎপিন্ডের গায়ে কালো কালো দাগ করে দিতে চেয়েছিল মানুষ। নিখুঁতভাবে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে গেলে আমিও ছিলাম তাদের মধ্যে একজন, যারা এহেন দৈন্যের সাথে জড়িয়ে ছিল। কারণ আমি ছিলাম একটি ধাতু কারখানার শক্ত শ্রমিক। অতঃপর আমার ফিরে আসা ছিল এক রকম বাধ্যতামূলক। কারণ শহর তখন মৃত্যুর পরিক্রমার মধ্যে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল।

আমি ফিরে এসেছিলাম আমার অজস্ত্র সম্ভাবনাকে পেছনে ফেলে। আমি যে সম্ভাবনাগুলোর কথা কয়েক বছর ধরে ভাবতাম। অতঃপর আমি মনে করলাম সবকিছু ভুলে যাওয়াই মঙ্গল এবং বাবার ফসলী কৌশলগুলো বর্ষাজুড়ে দ্রুত রপ্ত করে ফেললাম। নিজেকে মনে হলো ছয় হাজার বছর পূর্বেকার কৃষিবিপ্লবকালীন একজন স্বাপ্নিক।

আমি ক্ষেতের আলে বসে কাজ করার পরবর্তী বাকি সময়গুলো অলসতায় কাটিয়ে দিতাম। তখন প্রায়ই গল্প হতো। গল্পের পর গল্প। মৃত বাবার গল্প, তার বাবার গল্প, তার বাবার গল্প…।

তারপর আর কেউ মনে করতে পারতো না, কে ছিলেন তার এবং কে ছিলেন তার পূর্ববর্তী পুরুষ। অথচ তাদের একটা আবছা ছায়া সকলের চোখেই ভাসতে থাকত। কেউ ব্যাখ্যা করতে পারতো না সেই ছায়াগুলোকে।

        কেবলমাত্র জেলেদের অথবা কাদামাটির কৃষক অথবা তুমুল বর্ষায় অলস বসে থাকা একটি দুটি পূর্বকালীন অবয়বহীন মুখ ক্ষণিকের জন্য উঁকি দিয়ে যেতো…। আমরা তখন অন্য গল্পে ডুবে যেতাম।

তিন.

দীর্ঘকাল শহরে বসবাস করার সুবাদে অনেকেই গাড়ি-ঘোড়ার গল্প বলতো। কেউ কেউ বলতো তার কেরানি জীবনের গল্প। কেউ কেউ বলতো একটি লাল গাড়ি এবং একজন মেমসাহেবের গল্প। কেউ কেউ সাহস করে বলে ফেলতো বেশ্যালয়ে যাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতার কথাগুলো।

আমরা সবাই মন দিয়ে যার যার গল্প শুনতাম। গল্প শুনতে শুনতে বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়ে গেলে কেউ কেউ স্ত্রীর কথা মনে করতো এবং ফিরে যেতো সামান্যতম ওমের আকাক্সক্ষায়। তখনও গল্প চলতে থাকতো। কারণ শহরে একদিনের জন্যও আমরা কোন গল্প শোনার সুযোগ পাইনি। আমরা তাই অলসতার সময়গুলো এভাবেই কাটিয়ে দিতে পছন্দ করতাম।

আমরা শহরের অধিকাংশ সময়ই কাটিয়েছিলাম সিনেমা হল এবং পাশা খেলার ভেতর দিয়ে। এছাড়া আমরা অন্য একটি কাজও করতাম খুব উৎফুল্লভাব নিয়ে। যেন জগতে এরচেয়ে আনন্দের আর কোন কিছুই নেই। আমরা বিড়ি ফুঁকতাম এবং বিড়ির ধোঁয়া দিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে গার্মেন্টস ফেরত নারী কর্মীদের মুখে ছুড়ে দিতাম। আমাদের এসব গল্প শুনে শুনে মজমার একমাত্র স্বশিক্ষিত সংশয়বাদীর কান পঁচে গিয়েছিল এবং তিনি আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন এসব গল্প যাতে আমরা পুনরায় না বলি। আমরা যেন আমাদের স্ত্রী এবং কন্যা সন্তানদের দিকে ফিরে দেখি। আমরা যেন সে সমস্ত গার্মেন্টস কর্মীদের চেহারার সাথে নিজেদের কন্যাদের মিলিয়ে নেই।

আমাদের মধ্যে একজন, দুঃখিত; একজন নয়, দুই থেকে তিন জন হবে। হ্যাঁ, তিন জন ভয়ানক রেগে গিয়েছিল এবং স্বশিক্ষিত সংশয়বাদীর নাকের কাছে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত নিয়ে গিয়েছিল। আমরা সকলে মিলে তাদেরকে থামিয়ে দিলাম এবং সংশয়বাদীকে শাসিয়ে দিলাম।

আমাদের মধ্যে প্রায়ই এমন হতো এবং আমরা যার যার বাড়ি ফিরে যেতাম। আমরা আবার ভাবতে শুরু করতাম মহামারীর তীব্রতার কথা, আমরা প্রায় প্রতিদিন যা শুনতাম।

একান্তভাবে আমি এসব আর ভাবতে চাইতাম না। কারণ আমি জানতাম, ঈশ্বর আমাদের প্রতি রুষ্ট এবং তিনি আমাদেরকে পরীক্ষা করে নিবেন। আমি খুব ছোটবেলায় বাবার ডায়েরীতে জমিয়ে রাখা ছবিগুলো লুকিয়ে দেখতাম। দারুণ সব ছবি সংগ্রহ ছিল বাবার শখ। বাবার ডায়েরীতে ছিল হেলেন ইভান মারচুকের হেমন্ত এবং শরতকালীন নিসর্গের চিত্রগুলো, চীনা চিত্রগ্রাহক ডন হং এর ইয়েলো মাউন্টেইন, গুস্তাব কাইলেবট এর রেইন ফল, কাওসে হাসুই এর নাইট রেইন এবং ভ্যান গগ এর সূর্যাস্তের ছবিগুলো।

        আরও অনেক ছবি নিয়ে আমি অনেক্ষণ বসে থাকতাম। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছবিগুলো বারবার দেখতাম। আমি প্রায়ই ভাবি, এসব ছবি কে কে আঁকেন। আমার ইচ্ছে করে নির্যাসের ছবিগুলো আমিই যেন আঁকি। গত বর্ষায় সমস্ত দিন আমি এসব ছবিগুলোর কথা ভাবতাম। আসলে আমার কোন কাজ ছিল না। আমি সকাল হলেই বাবার কথা মনে করতাম এবং ছুটে যেতাম যেখানে ধানের বীজ আবারও রোপন করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম।

আমি ধানের ক্ষেতে গিয়ে বসে থাকতাম। আমার আঁকতে ইচ্ছে করত গুস্তাভ অথবা কাওসে হাসুই এর মতো বর্ষাচিত্র। ধানগুলোর বেড়ে ওঠার চিত্র আমার হৃদয়ে জমা হয়ে থাকতো, অথচ আমার কাছে কোন ক্যানভাস অথবা রঙ-কালি না থাকায় হৃদয়েই গেঁথে রাখতে হতো ছবিগুলো।

মহামারীর দিনগুলোর মৃত্যুর ছবি অনেকেই হয়ত এঁকে রেখেছেন, কিন্তু বিতর্কের ছবিগুলোর রূপ কেউ ধারণ করতে পারেননি। বিশেষ করে আমরা যা নিয়ে পড়ে থাকতাম!

চার.

আমরা ক্ষেত থেকে ফিরে আসার পর পরই অলস সময়গুলো আমাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতো এবং বসতাম গল্প শুনতে। আদতে ওখানে প্রকৃত গল্প বলার মতো একজনই লোক ছিল, যিনি একমাত্র স্বশিক্ষিত সংশয়বাদী, যিনি আমাদেরকে বারণ করতে চেয়েছিলেন গ্রামের পুকুরের নিকটবর্তী দূরত্বে ঘাপটি মেরে বসে থাকার জন্য। কারণ ওখানে আমাদের প্রতিবেশিনীরা অন্তর্বাস খুলে ফেলতো এবং পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করতে নামতো।

        কিন্তু আমরা তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে যেসব স্তন এবং নাভিগুলো দেখতে পেতাম, তা আমাদের মাঝে এক ধরণের মাদকতা তৈরী করতে সক্ষম ছিল। এবং আমরা রাতে বিছানায় এসে আমাদের স্ত্রীদের স্তন এবং গাত্রবর্ণ ওদের সাথে মিলিয়ে নিতাম এবং স্ত্রীদেরকে মারধর করতাম।

সেই স্বশিক্ষিত ব্যক্তি আমাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, এসব দেখার সময় যেন আমরা আমাদের কন্যা এবং স্ত্রীদের কথা ভাবি, যেন অন্য কেউ আমাদের মতোই লুকিয়ে তাদেরকে দেখছে, এমন। ঠিক সেই সময় আমাদের মাথায় খুন চেপে যেতো। আমরা সেই স্বশিক্ষিত ব্যক্তিকে আর একটাও শব্দ উচ্চারণ করতে দিতাম না। তৎক্ষণাৎ আমরা মজমা ভেঙে বের হয়ে যেতাম এবং আমাদের স্ত্রীদেরকে সতর্ক করে দিতাম যাচ্ছেতাই চলাফেরার জন্য। পরদিন আমরা ঐ বিষয় আর তুলতাম না। আমাদের মধ্যে অনেকেই মহামারীর নতুন সংবাদ শুনে আসতো এবং বর্ণনা করতো। আমরা বলতাম আমাদের ঈশ্বর আমাদেরকে অনুগ্রহ করবেন, কারণ আমাদের ধর্মকাজকে তিনি অধিকতর পছন্দ করেন।

কেউ কেউ বলতো, আসলে ঈশ্বর বিজাতীয় ধর্মের মানুষদেরকে সাবধান করতে অথবা শোধ নিতে মহামারী পাঠিয়েছেন। আমরাও এর সর্বোচ্চ উত্থান চাই এবং চাই বিজাতীয় ধর্মের মানুষদের ধ্বংস। এবং আমরা তাদের মৃত্যুতে খুশি হই, আস্ফালন করি। অতঃপর আমাদের মজমার সংখ্যালঘু ব্যক্তিটি নিজের মুখকে অপরাধীর মতো করে রাখে। সে হতাশ হয়। সে কিছু বলার সাহস পায় না। অথচ সেও আমাদের সম্পর্কে একই কথা ভাবতে থাকে। কারণ, তার চোখে আমরাই ছিলাম শ্রেষ্ঠ বিজাতীয়।

আমরা আমাদের এসব আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে তার দিকে তাকাই। অতঃপর অন্য কেউ মহামারীর অন্য রকম অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করে। মজমা ভাঙে আবার মজমা বসে। আমাদের সংখ্যালঘু ব্যক্তিটিও আসে। কিন্তু তার মুখে আর হাসি ফোটে না। সে অপেক্ষায় থাকে…!

পাঁচ.

বৃষ্টি কিছুটা কমে এলে আমি ছুটে যেতাম এবং মাঠের বিশালতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতাম। ক্ষণকালের জন্য ভুলে যেতাম আমাদের ওইসব বাগাড়ম্বর আলাপ আলোচনা।

আমাদের গল্পগুলো মহামারী থেকে খুব দ্রæতই অন্য দিকে রূপ নিতো। এবং যার যার ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলতাম “আমার ঈশ্বর’ই শ্রেষ্ঠ,” সুতরাং কিছুতেই মহামারী আমাকে স্পর্শ করতে পারে না।

এভাবে যখন আমরা সকল জাতি’ই মহত্ত্বের ব্যাপারে দখলদারী হয়ে উঠতে আপ্রাণ চেষ্টা করতাম, তখন সেই স্বশিক্ষিত সংশয়বাদী কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে চাইতো। আমরা তার দিকে শূল দৃষ্টি নিক্ষেপ করতাম এবং থামিয়ে দিতাম। সেদিন যার যার মতো আমরা ঘুমুতে যেতাম।

বর্ষার আকাশ থেকে প্রায়ই ঝুম বৃষ্টি নেমে আসতো। আমি তখন ঘরের তক্তপোষে বসে কিছু বই পুস্তক নেড়েচেড়ে দেখতাম। স্মৃতিরা ফিরে আসতো ঝিঁঝিঁ পোকার মতো। সেই চার পাঁচ বছরের কথা মনে পড়তো। মনে পড়তো আউষের ক্ষেতে বাবার আসা যাওয়া এবং বাবার চুল থেকে ঝড়ে পড়া টপটপ জলগুলো। এরই মাঝে মহামারীর নতুন খবর নিয়ে আসতো কেউ একজন। বিদেশ ফেরত কারো মৃত্যুর খবরে চঞ্চল হয়ে উঠেছে সমস্ত গ্রাম। কেউ কেউ বলছে-

“পুরো পরিবারকে ঝেঁটিয়ে গ্রাম থেকে বিদায় করা দরকার।”

কেউ বলছে-

“লোকগুলো যাবে কোথায়।”

কেউ বলছে-

“লোকটি আরও কিছুদিন বিদেশে অপেক্ষা করলো না কেন।”

কেউ কেউ কিছুই বলছে না।

আমাদের মধ্যে অনেকেই চীন দেশের মানুষের মৃত্যুতে ছিল খুশি, কারণ তারা আমাদের ধর্মগ্রন্থকে অবজ্ঞা করেছিল। একজন বলেছেন-

“ঠিক এই জন্যই ওদের ধ্বংস অনিবার্য।”

বিকেলের দিকে বৃষ্টি আরও দমে আসলে একজন খবর নিয়ে দৌড়ে এলো, সে বললো-

“একজন জানলেওয়ালা মুমিন বান্দা বলেছেন- ‘মহামারী এবং ছোঁয়াচে বলতে কিছু নেই। এবং সবই বিজাতীয়দের ভাওতাবাজী। এবং ওদের কোন কৌশলই আমাদেরকে থামাতে পারবে না।”

আমরা সবাই মিলে হাসলাম। ব্যক্তি এমন কথাও শুনে এসেছে যে, একজন পয়গম্বর সদৃশ ব্যক্তি ঈশ্বরে কসম করে বলেছেন, মহামারী আমাদের স্পর্শ করবে না, যদি করে তবে আসমানী গ্রন্থ মিথ্যা হয়ে যাবে। নিজেদের প্রমাণিত শ্রেষ্ঠত্বের খুশিতে আমরা সমস্বরে হেসে উঠলাম এবং আমরা পরিপূর্ণ নিশ্চিন্ত হলাম। এসব গল্পই ইদানিং আমাদের মধ্যে হচ্ছিল বেশি। আমরা খুশি ছিলাম বেশ কিছুদিন। তারপরই বিদেশী ব্যক্তিটির গ্রামে আগমন এবং  স্বজাতীয় মানুষের মৃত্যু। আমাদের পয়গম্বর সদৃশ বাগাড়ম্বর ব্যক্তিগণ তাদের নছিহত থামিয়ে দিলেন এবং যার যার মতো গা ঢাকা দিলেন।

পরদিন সকালে দৌড়ে আসলো গ্রামেরই এক ব্যক্তি। তার হাতে ছিল থানকুনির নরম কয়েকটি পাতা। পাতাগুলো আমার মুখের মধ্যে পুরে দিয়ে তিনি বললেন, এই হলো স্বপ্নে পাওয়া দাওয়াই। কোন এক মাওলানা সাহেব ঈশ্বর হতে স্বপ্নে পেয়েছেন। “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ” আমি খুশি হলাম এবং আমার স্ত্রী পুত্রকেও খেতে দিলাম। তৃতীয়বারের মতো আমাদের সমস্ত আশা বেঁচে উঠলো।

ছয়.

মহাশূন্য থেকে পৃথিবীতে যে হাতিগুলোর দেখা মেলে, ওরা মিলিত হয় জাঙ্গা বাই নামক এক ফাঁকা স্থানে। শত শত মাইল দূরের জঙ্গল থেকে ওরা আসে। বিনা যুদ্ধে ওরা গ্রহণ করে খনিজ লবন এবং পটাশিয়াম এবং ক্যালশিয়াম। অথবা ধরুন, কেল্প ফরেস্টের কথা। এক মহা অরণ্য। সমুদ্রতলের ওসব অরণ্যে বসবাস করে ভিন্ন প্রজাতির অসাম্প্রদায়িক মাছেরা।

        অথচ আমরা নিজ নিজ যথার্থতা প্রমাণ করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

থানকুনির দাওয়াইয়ের পর আমরা মহতী আমেজ এবং ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। আমরা তাচ্ছিল্যের সাথে তাদের কথা ভাবতে লাগলাম, যারা অসংখ্য রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছিল একটি মহামারী নিরাময় ভ্যাকসিনের প্রয়োজনে। ওদের নাক এবং মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল। অথচ অভ্যাসবসত আমাদের ফাঁকা বুলিগুলোই ছিল ভ্যাকসিনের চেয়ে শক্তিমান।

আমাদের গল্প এখন আরও তুমুল গতিতে চলতে লাগল। কারণ আমরা আপাতত বেঁচে থাকার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত এবং বর্ষার গতি দিনে দিনে আরও তীব্র হয়ে উঠছিল। আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। শুধু মাঝে মাঝে শহরের কথা মনে পড়তো। ওরা অনেকে আফসোস করেছিল বেশ্যালয়গুলোতে যেতে না পারার কারণে। কেউ কেউ বেশ্যালয় বন্ধ হবার কারণে ঈশ্বরের কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করলো। অথচ আমার মাথায় এসেছিল রতিকুশলীদের রুটি-রুজির বিষয়টি। আমার মনে হলো আমি কিছুটা হলেও বিগরে যাচ্ছি। তারপর হঠাতই আরও কিছু মানুষের মৃত্যু হলো এবং মহামারী ধীরে ধীরে আমাদের আরও নিকটবর্তী হতে লাগলো। ধীরে ধীরে আমার কাছে সকল স্বপ্ন এবং পয়গম্বরবিদ্যা প্রশ্নবিদ্ধ হলো। কারণ মৃত্যুপতনের মধ্যে কতকজন ছিল ইশ^রীয় বিশ^াসে পরিপূর্ণ বলিয়ান।

অতঃপর আমরা আশাহত হয়ে থাকলাম। আমরা তীব্র বর্ষায় শুধুমাত্র গল্পের মধ্যে ডুবে থাকার চেষ্টা করলাম। আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতো মহামারী এবং অগণিত মৃত্যু। আমি বাঁচার জন্য ছুটতাম ধানের ক্ষেতের আলপথে। আমি বিগরে যাওয়ার বদলে শান্তি পেতে চাইতাম। আমি ভালোবাসতাম একটি সবুজ পৃথিবী এবং আমার বাবাকে। সেই শিক্ষিত সংশয়বাদী আগমনকৃত মহামারী সম্পর্কেও আরও অনেক কিছুই বলতে চেয়েছিলেন। অথচ আমরা তাকে কিছুতেই মুখ খুলতে দেইনি। অতঃপর মহামারীকাল দ্রুত ঘনিয়ে আসলো আমাদের পালিয়ে আসা গ্রামের অভিমুখে।

মানুষ ঘর-বাড়ি রেখে দ্রæত পালিয়ে যাচ্ছিল অন্যত্র। তারা সেইসব গ্রামেও নিয়ে গেল মহামারীর সক্রিয় বীজ এবং মৃত্যু। তারা ছড়িয়ে দিলো। তারা ছড়িয়ে দিলো সমস্ত গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ঈশ্বরভক্ত, চাষা, বেশ্যা এবং দিনমজুর, কারো কাছেই মহামারী কোনো বিকল্প বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হয়নি। আমি জানি, আমি বিগরে যাচ্ছিলাম এবং আমি হয়ে উঠলাম গ্রামের দ্বিতীয় সংশয়বাদী। আমার কাছে মহামারী ধরা দিল অন্য এক রূপে। যেমন শুনেছিলাম স্বশিক্ষিত সংশয়বাদীর কাছে। আমি হঠাত ভাবতে লাগলাম, “মহামারী জগতের জন্য শ্রেষ্ঠ আশির্বাদ…”

আমরা অনায়াসে সেদিকই ধাবিত হচ্ছিলাম, ঠিক ১৬৬৫ সালে লন্ডনে যা ঘটেছিল। যখন বেঁচে থাকার জন্য অসংখ্য মানুষ আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল এবং যাদেরকে কবর দেয়ার মতো কেউ অবশিষ্ট ছিল না। তারা ঈশ্বরের কাছে নিজেদের শেষ অশ্রæবিন্দু দিয়ে নিবেদন করেছিল। একজন চোর, একজন পাদ্রী এবং একজন নগরপিতা থেকে শুরু করে প্রতিজন মানুষ ঈশ্বরের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল। অথচ ঐ নগরী সীমা লঙ্ঘনের পাপে জর্জরিত ছিল না। ওরা সকলেই নিজেদেরকে মনে করতো যিশুর একনিষ্ঠ আশ্রিত এবং ওরা ইঞ্জিলে উল্লেখিত লঙ্ঘন ও পাপকে ভয় করতো। “ঈশ্বর ফিরে তাকাননি!”

সাত.

মূলত ঈশ্বরের কাছে আশরাফুল মাখলুকাত বলে কিছু নেই। তার কাছে সমস্ত প্রাণির’ই ভাষা আছে। সমস্ত প্রাণির’ই সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তিনি যেমন হরিণশাবকের গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঘাসফুলের ফরিয়াদকে কর্তপাত করেন না, তেমনি চিতার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হরিণশাবকের ফরিয়াদকেও কর্তপাত করেন না। চিতার কোন ফরিয়াদ তখন ঈশ্বরের নিকট পৌঁছায় না যখন শিকারি জিম করবেট বন্দুকের ব্যাক সাইট ইউ এবং ফ্রন্ট সাইট টি’র সাথে শিশ মিলিয়ে নির্ভুল নিশানায় তাক করেন হরিণ সাবকের হৃৎপিন্ডের দিকে। এবং মহা ব্যকটেরিয়ায় আক্রান্ত জিম করবেট এমন কি পয়গম্বর বিদ্যা প্রদর্শনকারীদের ক্ষেত্রেও ঈশ্বরকে একই রকম নির্লিপ্ত থাকতে দেখা যায়।

একটি এ্যামিবা এবং একটি নীল তিমির প্রাণের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই কেবল দেহাবয়ব ছাড়া। সুতরাং ঈশ্বরের কাছে কারো আবেদনের আলাদাভাবে কোন গুরুত্ব ছিল না। তার প্রয়োজন ছিল বাস্তুসংস্থানকে টিকিয়ে রাখা, তিনি  যত দিন চান। অথবা এটি নিতান্তই ভ্রান্ত। অতঃপর আমাদের খামখেয়ালিপনা এবং অসচতেনতার জন্য দীর্ঘ শতাব্দী পর আগত মহামারী আমাদেরকে পর্যবসিত করলো। আবার মহাপৃথিবীর অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হলো। আমরা অনেকেই তখন গাছের বাকলে সেঁধিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। অথবা ভাবছিলাম, যদি আমি কিছুদিনের জন্য ধানগাছের সুন্দর রেণু অথবা নিকৃষ্ট জোঁক হতে পারতাম!

আমরা দল বেঁধে পালিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন কি যদি পারি সেই স্বশিক্ষিত সংশয়বাদীকেও সঙ্গে নিয়ে। অথচ তিনি গ্রাম থেকে নড়লেন না। কারণ তিনি মহামারী পরবর্তী বেঁচে থাকা মানুষদেরকে সংশয় ও সত্যের ইতিবৃত্ত বোঝানোর জন্য অপেক্ষমান ছিলেন । তিনি শহর থেকে শিখে এসেছিলেন বেঁচে থাকার অভিনব কৌশল এবং মহামারীকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করলেন।

কারণ তিনি জানতেন মহামারীর মৃত্যুকবলিত অঞ্চল থেকে পালিয়ে গিয়ে কখনো কেউ বেঁচে থাকতে পারেনি। তিনি প্রকৃত জ্ঞান ও সচেতনতা নিয়ে অপেক্ষা করলেন, আমাদের যা একেবারেই ছিল না।

আমি তাকে শেষবারের মতো মিনতি করেছিলাম পালিয়ে যেতে। তিনি আমার গ্রীবায় হাত বুলিয়ে দিলেন। একটি কলম এবং কয়েক টুকরো কাগজ উপহার দিলেন, যাতে আমি মৃত্যুর আগে সংশয়ের আরও কিছু গল্প লিখে শেষ করতে পারি। তিনি চেয়েছিলেন মহামরী শেষে বেঁচে যাওয়া গুটিকয় মানুষ তার গল্পগুলো জানুক এবং তারা যেন তাদের গর্ভ এবং ঔরসজাত সন্তানদের শিখিয়ে যেতে পারে বেঁচে থাকার কৌশল এবং স্বার্থকতা। অতঃপর আমি কলমটি কোমরের সাথে ঝুলিয়ে নিলাম, যেন একটি তলোয়ার। এবং কাগজগুলো নিলাম জামার ভেতরে বুকের সাথে আলপিন দিয়ে গেঁথে। এবং দ্বিতীয়বারের মতো আমি পালিয়ে গেলাম…।

তিনি অধীর ভালোবাসা এবং আস্থা নিয়ে অপেক্ষা করেছিলেন সারা গিলবার্ট এর জন্য। তিনি ভালোবাসতেন সেজুতি শাহাকেও এবং ঘৃণা করতেন অসংখ্য অজ্ঞানতা এবং অন্ধত্বকে…।

……শেষ……

আহমেদ ফারুক মীর
জন্ম- ভোলা, বাংলাদেশ  প্রকাশিত বই - ঈশ্বরী (গল্প),সবুজ টিপ কাঁচের চুড়ি (কাব্য),জোয়ার বাঁশি ও খুফুর মূর্তি (কিশোর গল্প), নীল নক্ষত্র (উপন্যাস), হিপোক্রেটিক (উপন্যাস), অবিন্যস্ত আলোকরেখা (কাব্য), টুকটুকি (ছড়া)। লেখার বিষয়- বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি। যা মানুষকে ভাবায়। যা পরিবর্তন হওয়া উচিৎ বলে মনে হয়। সুতরাং এসব অসংগতি নিয়ে ভবিষ্যতে নানামূখী কাজ করার আগ্রহও রয়েছে। খুব ছোট বয়সে "পথের পাঁচালী" উপন্যাস এবং তাঁর লেখকের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। বর্তমানে লেখার মূল বিষয় ছোটগল্প এবং কবিতা।    ahmed86farukmir@gmail.com    

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.