স্বপ্ন কি রোজ দেখি ? – ডা. গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা English

সেদিন প্রায় ভোরবেলাতেই অমিতাভ ছুটতে ছুটতে এসে দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা খুলে দেখি হাঁপাচ্ছে আর ঘেমে গেছে, চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। – কী হল? এত সকালে তোর কী হল?  -ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয় এটা কি ঠিক?  -ব্যাপারটা বুঝলাম না কিছু, আয় ঘরে এসে বোস্। – না, না, বলনা, সবাই তো বলে ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। ঘুম ভেঙে গেল। ঘরে থাকতে পারলাম না, ছুটে এলাম তোর কছে। তোদেরই তো সাবজেক্ট।

 অমিতাভকে বসালাম, চা দিলাম। চা খেতে খেতে বললাম এটা একেবারেই ভুল কথা। আমাদের বই-এর কোথাও কোনও দিন পড়ি নি। কিন্তু লোকে যে বলে? – তোর মতো লোকেরা বলে। জেনে রাখ পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখে। যাঃ! কই আজকের দিনটা বাদে আমি গত একমাসের মধ্যে কোনও স্বপ্ন  দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। এটাও তোর একটা মস্ত ভুল। তুই রোজই স্বপ্ন দেখেছিস্।  আমি স্বপ্ন দেখলে জানব না? – না জানবি না। খুব কম স্বপ্নই মনে থাকে, তাও ঘুম থেকে ওঠার ঠিক পরে। তারপরই সদ্য আঁকা জলরঙে জল ঢেলে দিলে যেমন ছবিটা ধুয়ে যায় তেমনি স্বপ্নেরাও মুছে যায়। তাহলে বলি শোন স্বপ্ন ব্যাপারটা ঠিক কী।

 আমরা জেগে থাকি যখন, মস্তিষ্কে উত্তেজনার বা জাগরণের অঞ্চল থাকে প্রধান। নিস্তেজনা বা ঘুমের অঞ্চল ছড়িয়ে থাকে এখানে ওখানে। ঘুম শুরু হলে নিস্তেজনার অঞ্চল বাড়তে থাকে। ঘুম যত গভীর, মস্তিষ্কে নিস্তেজনা ততই ব্যাপক হয়ে উঠতে থাকে। সবচেয়ে গভীর ঘুমে নিস্তেজনার অঞ্চল সর্বাধিক হলেও বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে থাকে কিছু উত্তেজনা বা জাগরণের অঞ্চল। তাই গভীর ঘুমেও মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ ঘুমোয় না। আর সেই ছড়ানো ছিটানো জাগরণগুলোই আমাদের স্বপ্ন দেখায়।

 ঘুমের মোটামুটি পাঁচটা স্টেজ পাওয়া যায়। ঘুম আসার মুখে আমরা সামান্য সময়ের জন্য তন্দ্রাচ্ছন্ন  অবস্থায় থাকি। এটাই স্টেজ-১।  ঘুম শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে এই স্টেজে টুকরো টুকরো বিচ্ছিন্ন অসংগঠিত আবছা স্বপ্ন শুরু হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে বাইরের ঘটনাতেও তন্দ্রার অবস্থা থেকে সাড়া দিয়ে থাকি। তন্দ্রা ভেঙে গেলে স্বপ্ন। না, সত্যি বুঝতে অসুবিধা হয়। স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের সীমারেখাটা যেন অস্পষ্ট। কয়েক সেকেণ্ড থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুম বা নিস্তেজনা অঞ্চল আরও ছড়িয়ে পড়ে স্টেজ-২–এর মধ্যে ঘুমে চলে যায়। নিস্তেজনা অঞ্চল বেড়ে যাওয়ায় স্বপ্ন কমে যায়। কারণ স্বপ্ন হল উত্তেজনার অঞ্চল।

 ঘুম আরও গভীর হয়ে স্টেজ-৩ তারপর স্টেজ-৪-এ চলে যায়। এই দুই স্টেজকে আমরা বলি গভীর ঘুমের স্তর। এখানে স্বপ্ন আরও কমে আসে। এসময় ঘুম থেকে ডেকে তোলা আরও কঠিন হয়। তাহলে দেখতে পাচ্ছিস্ ঘুম যত গভীর, স্বপ্ন তত কম। এই চারটে স্তরে যে স্বপ্ন দেখি তা খাপছাড়া, টুকরো টুকরো, এলোমেলো, বিশেষ কোনও গল্প গড়ে ওঠে না, মনেও থাকে না বেশি। স্টেজ-৩ বা ৪-এ ঘুম ভেঙে গেলে শরীর খারাপ লাগে। মাথা ভারি লাগে, মনে হয় ঘুম লেগে আছে চোখে আর ঘোর কেটে বাস্তবে আসতে অনেকটা সময় লেগে যায়।

 স্টেজ-৪ থেকে যে পঞ্চম স্তরে চলে যায়, সেটা একটা অদ্ভুত স্তর। সেটা না গভীর, না অগভীর। স্টেজ-১-এর মতো তার EFG চরিত্র, হালকা ঘুমের EFG । বাইরে থেকে মনে হবে তন্দ্রাচ্ছন্ন। হাত পা নড়ে, কখনও পাশ ফেরে। অথচ আশ্চর্য ডেকে তোলা এই স্টেজে সবচেয়ে কঠিন। খেয়াল করবি কখনও কেউ ঘুমিয়ে থাকলে বাইরে থেকে দেখা যায়  চোখের পাতার নীচে আই বলটা এপাশ ওপাশ ঘুরছে। – হ্যাঁ, হ্যাঁ, এরকম অনেক সময় দেখেছি। হ্যাঁ, ওটাকেই বলে REM(Rapid Eye Movement) স্টেজ। একে Dream স্টেজও বলে। কারণ এই স্তর স্বপ্নের জন্য বিখ্যাত। এই স্তরের স্বপ্ন অনেক সুসংহত, সুগঠিত গল্পের আকার নেয়। আমাদের অঞ্চল তৈরি রাখে, সে সেই আবেগের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেখানেও উত্তজনা ছড়িয়ে দেয়। একটার সঙ্গে আরেকটা আনুষঙ্গিক অঞ্চলকে উত্তেজনায় নিয়ে আসে।  এইভাবে সেই আবেগ নানা প্রাসঙ্গিক বিষয়কে অবলম্বন করে স্বপ্ন গড়তে গড়তে এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন ভাবে চলতে থাকে। গতকালের টাটকা স্মৃতির বিষয়ও এই আবেগের সঙ্গে বাঁধা পড়ে উদ্ভট স্বপ্নের জন্ম দেয়।

 ফ্রয়েডের মতে স্বপ্ন হল ইচ্ছা পূরণে ফিরে যাওয়া। ঘুমের মধ্যে আমাদের মনের পাহারাদার Ego নিজেও কিছুটা ঘুমের প্রভাবে ঝিমিয়ে পড়ে। তখন বাস্তবের সম্ভাব্যতা অসাম্ভব্যতা ভুলে শৈশবের অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণে মেতে ওঠে। সেখানে শুধু ফ্রয়েডের ভাষায় Pleasure Principle কাজ করে। বাস্তব নয়, আনন্দ পেতে হবে। আর তার সবটাই শৈশবের অপূর্ণ যৌন ইচ্ছা। ফ্রয়েডের এই সূত্র সম্পূর্ণ সত্য হতে পারে না। আমরা যে ভয়ের স্বপ্ন দেখি তাতে আমাদের ইচ্ছা পূরণ কী করে হয়? ভয় তো ইচ্ছে হতে পারে না? ঘুমের মধ্যে আবেগের বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে  যাওয়ায় হাত থাকে না। রোজকার স্মৃতি, দূরের গভীর স্মৃতিকে অবলম্বন করে সে পা ফেলে। মন উদ্বিগ্ন থাকলে অনেকে পরীক্ষার স্বপ্ন দেখে। সব প্রশ্ন আনকমন্। একটাও সে লিখতে পারছে না, ঘামছে। তারপরই ঘুম ভেঙে গেল। আবিস্কার করল সে ছাত্রজীবন কবেই শেষ করে এসেছে। অমিতাভ চেঁচিয়ে উঠল – আরে আমি তো এই মাঝবয়সেও পরীক্ষার স্বপ্ন দেখি, কী ব্যাপার বলতো?  – তোর মনে যে কোনও কারণেই উদ্বেগ থাকছে। সেই আবেগটা ঘুমের মধ্যে বিষয় খোঁজে। উদ্বেগের বিষয় খুঁজতে খুঁজতে পরীক্ষাকে পেয়ে যায়, কারণ পরীক্ষাটা তোর কাছে ভয়ের ছিল।

 স্বপ্নের কোনও গভীর অর্থ থাকবেই এমন নয়। তবু অনেক সময়ই গভীর অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন আমি একবার স্বপ্ন দেখেছিলাম এক বিকেল বেলায় কার্ল মার্কস বেড়াতে বেড়াতে চলে এল বাবার কাছে বারান্দায় বসে গল্প করতে। যেন রোজকার বন্ধু। পে কমিশনে মাইনে বাড়ল কিনা, ডি. এ. বাড়ছে কিনা এইসব গল্প। আমি ছুটে ঘরে গিয়ে বললাম – মা মার্কস কাকু এসেছে, চা বসাও। আবার ভাবলাম এরকম একজন বিখ্যাত লোককে কাকু বলাটা কি ঠিক হবে? বিখ্যাত মানুষকে নিজের ঘরে পাবার মধ্যে নিজের বিখ্যাত হবার সুপ্ত ইচ্ছাই হয়ত পূরণ হয়। নিয়মিত যে ফুটবল খেলে দারুণ একখানা গোল দিতে পারার অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করে স্বপ্নে। বলে লাথি মেরে গোল বলে চেঁচিয়ে উঠেই জেগে দেখে ভাইয়ের পেটে লাথি মেরে বসেছে। সুপ্ত সেই ইচ্ছার আবেগ স্মৃতির ভেতর প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো , যেমন ফুটবল, মাঠ, গোলপোস্ট, ইত্যাদির অঞ্চলে উত্তেজনা বা জাগরণের আলো জ্বালাতে জ্বালাতে চলে আর স্বপ্নের গল্প তৈরি করে। তেমনি ভাবেই মন যদি উদ্বিগ্ন থাকে তাহলে মস্তিষ্কে সেই ভয়ের সাধারণীকরণ হয়। আবার যে বিষয়গুলো উদ্বেগের তারাই স্বপ্নে আসতে থাকে, তবে কিছুটা উদ্ভট ভাবে।

 -আচ্ছা, ফ্রয়েড নাকি বলেছেন নির্দিষ্ট স্বপ্নের বিশেষ নির্দিষ্ট অর্থ আছে?  – কিছু কিছু জিনিসের সাধারণ অর্থ হতে পারে। কিন্তু সব কিছুর অর্থ সবার কাছে সমান হওয়া সম্ভব কী করে? এক একটা জিনিস অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন অর্থ বহন করে। ফ্রয়েডের মতে স্বপ্ন হল নির্জ্ঞান মনের ইচ্ছে পূরণ। জাগ্রত অবস্থায় যে ইচ্ছে অবদমিত থাকে ঘুমে সেই অবদমন আলগা হয়ে যায়, ইগোর পাহারা ঢিলা হয়ে যায়। তখন শৈশবের অবদমিত ইচ্ছা ছাড়া পেয়ে যায়। কিন্তু ইগো সম্পূর্ণ ঘুমোয় না বলে ইচ্ছাগুলো নানা প্রতীকের ছদ্মবেশে ইগোকে ফাঁকি দিয়ে পূরণ হতে চায়। ফ্রয়েডের মতে অবদমিত ইচ্ছা সবই মুলত যৌন ইচ্ছা। তাই তাঁর মতে স্বপ্নে দেখা প্রতীকগুলো যৌনাঙ্গ বা যৌন কার্যের প্রতীক। লাঠি, পেন্সিল, কলম বা সব লম্বা জিনিস পুরুষাঙ্গের প্রতীক। বন্দুক, পিস্তল, ধারালো অস্ত্রও পুরুষ। ষাঁড় পুরুষ যৌনতার  প্রতীক। শিশি, বোতল, খানাখন্দ, অলিগলি, গুহা সব স্ত্রী যৌনাঙ্গের প্রতীক। বাড়ি পুংলিঙ্গ, অথচ বারান্দা স্ত্রীলিঙ্গ। নির্দিষ্ট কোনও বস্তুর অভিজ্ঞতা প্রত্যেকের কাছে নিজস্ব উপলব্ধি। তাই স্বপ্নের প্রতীককে এরকম কোনও সাধারণ সূত্রে বাঁধা অনেকেই গ্রহণ করেন না।

 -আচ্ছা, তাহলে নিশির ডাকটা কী? ‘নিশি’ বলে সত্যি কি ডেকে নিয়ে যায়? আমাদের সেই বিমলদা জানিস তো মাঝরাত্রে নাকি ঘুমের মধ্যেই দরজা খুলে বেড়িয়ে যেত। কোনও দিন ঘরে ফিরে আসত, আবার কোনও দিন রাস্তায় বা বারান্দাতেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। সকালে সবাই তাকে আবিস্কার করত। কিন্তু বিমলদা কীভাবে কখন বাইরে এল কিছু বলতে পারত না। – না, না, ‘নিশি’ বলে কেউ ডাকে না। এটা আসলে স্টেজ-৪-এর একটা সমস্যা, একে বলে Somnambulism বা Sleep walking। ছয় থেকে বারো বছরের শিশুদের মধ্যে এটা বেশি দেখা যায়। কারো কারো বংশে জিনগত প্রবণতা থাকে। এরা গভীর ঘুমের অধিকারী হয়। উদ্বেগে এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। স্টেজ-৪-এর  স্বপ্নের মধ্যে এই ঘটনা ঘটে। দরজা খুলে বাইরে বেরোলেও সমস্ত চলন এলোমেলো ধরণের হয়। পড়েও যেতে পারে। আসলে মস্তিষ্কের বিশেষ অঞ্চলের জাগরণ তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় অঞ্চলগুলো যেমন দরজা খোলা, বাইরে আসার জন্য  মস্তিষ্কের অঞ্চলগুলো পরপর চেন সিস্টেমে জেগে উঠতে থাকে। এর বাইরের সব কিছুই থাকে ঘুমের মধ্যে। যেন ঘুমের মধ্যে দিয়ে জাগরণের সরু এক টানেলের মধ্যে দিয়ে সে চলে। তাই চারপাশের বিষয় চেতনায় থাকে না। সেই টানেল ধরেই ঘরে ফিরে আসতে পারে, আবার জাগরণের পরম্পরা কেটে গিয়ে বাইরেই কোথাও ঘুমিয়ে পড়তে পারে আর তারপর ঘুমের পরের স্টেজে চলে যায়। স্টেজ-৪-এর স্বপ্ন যেহেতু সাধারণত মনে থাকে না তাই Sleep Walker-ররাও সকালে জেগে উঠে কিছুই মনে করতে পারে না। আর আমরা ভয় পেয়ে যাই তাহলে অদৃশ্য সে কে, যে ডেকে নিয়ে গেল?

 স্টেজ-৪-এর ঘুমে আরও দু-একটি ঘটনা ঘটে। Night Terror-এ ভয়ঙ্কর কিছু স্বপ্ন দেখে আমরা চিৎকার করে জেগে উঠি। এখানে ভয়ের গল্প নয়, টুকরো বিচ্ছিন্ন ভয়ের স্বপ্ন ঘটে। ঘুম ভেঙেও ভয় যায় না, শরীর ঘেমে ওঠে। কিন্তু সামান্য কিছু ছাড়া বিশেষ মনে পড়ে না। অন্য দিকে REM স্টেজের Nightmare-এ ভয়ের স্বপ্ন সুগঠিত গল্পের আকার নেয়। ভয়ে জেগে উঠি কিন্তু ভয়ে ঘেমে ওঠা, নাড়ির গতি বেড়ে যাওয়া এমন হয় না। স্বপ্ন পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে থাকে।

 অবসাদে ঘুম যদি বেড়ে যায় তাহলে REM দীর্ঘতর হয়। তখন অবসাদের রোগী এত স্বপ্ন দেখে যে ঘুমিয়েও বলে ঘুমোইনি। অবসাদে যদি ঘুম কমে যায় তাহলে আবার REM ছোট হয়ে আসে। অ্যান্টি ডিপ্রেসান্ট ওষুধেও REM স্টেজ কমে যায়। সিজোফ্রেনিয়া ও অ্যালকোহলে REM স্টেজ বেড়ে যায়। সিজোফ্রেনিয়ার রোগী REM স্টেজে সাধারণত দুঃস্বপ্নই বেশি দেখে।

 -আচ্ছা তাহলে স্বপ্নে দৈববাণীর ব্যাপারটা কী রে? – এখানে যে দৈববাণী পায় তার কোনও অসহায়তা থেকে দেবতার আনুকূল্য পাবার একটা ইচ্ছা মনের মধ্যে সুপ্ত থাকে। মনের সেই সুপ্ত ইচ্ছার আবেগ  মস্তিষ্কের ভেতরে আনুষঙ্গিক বিষয়ের অঞ্চলে জাগরণ বিস্তার করে দৈববাণীর স্বপ্ন গড়ে তোলে। দেবতা তাকে বাণী পাঠিয়েছে, মনের ভেতরে অবলম্বন খুঁজে পায়। আরেকটা প্রয়োজনে স্বপ্নে দৈববাণী পেতে দেখা যায়। আনন্দ ছিল বেকার ছেলে। চাকরি পায় নি। কোনও দিকেই যখন কিছু করে উঠতে পারল না, তখন স্বপ্নে দৈববাণী পেল – আনন্দ, তুই আমার জন্য একটা মন্দির কর, তুই সেখানে পুরোহিত হবি। পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ল আনন্দের স্বপ্নের কথা। চাঁদা তুলে সবাই মন্দির গড়ল। আনন্দ হল মন্দিরের সারাক্ষণের পুরোহিত।  আনন্দকে জীবন ধারণের জন্য আর পেছন ফিরে তাকাতে হল না। কারণ স্বপ্নে পাওয়া দেবতা বলে ভক্তের ভিড় ভেঙে পড়ল। আনন্দ সবাইকে বলে তার ঠাকুর নাকি খুব জাগ্রত। তাহলে দেখো, আনন্দের কাজ পাবার যে তাগিদ আর আকুলতা, সেটাই স্বপ্নে দৈববাণী তৈরি করাল।

 অমিতাভ খোশমেজাজে আরেক কাপ চা খেয়ে চলে গেল। লেখা শেষ করার আগে আমি তাহলে ইতিহাসের বিখ্যাত মানুষেরা স্বপ্ন নিয়ে কী বলেছেন সেটা একবার জানিয়ে দিই!

 সক্রেটিস বলতেন স্বপ্ন মাধ্যমে ঈশ্বর ভবিষ্যতের নির্দেশ পাঠান। স্বপ্ন দৈববাণীরই সমতুল্য। প্লেটো ভাবতেন স্বপ্নের মাধ্যমে ঘটে আত্মার রহস্য উন্মোচন। ডেমোক্রিটাস বস্তুবাদী দার্শনিক, তাই মনে করতেন স্বপ্ন মস্তিষ্কের কর্ম তৎপরতারই অভিব্যক্তি। অ্যারিস্টটল বলেছেন – স্বপ্ন হল মানুষের শৈশবের অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণে শৈশবের কাছে ফিরে যাওয়া। পাভলভ বললেন স্বপ্ন হল মস্তিষ্কে ঘুমের মাঝে মাঝে জেগে থাকা উত্তেজনার অঞ্চল। আর আগেকার মানুষ ভাবত ঘুমিয়ে থেকে স্বপ্ন মানে হল আত্মার অস্তিত্বের প্রমাণ। আমরা তাহলে কী ভাবব নিজেরা ঠিক করে নেব না হয়!

Gautam Bandyopadhyay
ডা. গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় মনোচিকিৎসক, প্যাভলভ ইন্সটিটিউট কোলকাতা। সম্পাদক - নিরন্তর পত্রিকা

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *