‘স্বপ্নচারী দেশ’:MIA COUTO TRANSLATED BY RITA RAY

বাংলা English
MIA COUTO
  “স্বপ্ন হল সেইসব চিঠি যা আমরা আমাদের বাকি অন্য জীবনগুলোকে পাঠিয়ে থাকি” এ কথা লিখেছেন  মোজ়াম্বিক বা মুসাম্বিকের লেখক মিয়া কোতু, তাঁর প্রথম উপন্যাস স্বপ্নচারী দেশ-এ। মিয়া কোতু (Mia Couto) আন্তনিউ এমীলিউ লাইত কোতুর ছদ্মনাম। জন্ম ১৯৫৫ সালে মধ্য মুসাম্বিকের সুফালা প্রদেশের রাজধানী বাইরায়। ছদ্মনামের হেতু মার্জার-প্রীতি। তিনি ও দেশের ভূমিপুত্র নন, তাঁর পরিবার বাইরায় বসতি স্থাপন-করা শ্বেতাঙ্গ পোর্তুগীজ়। তবে স্বাধীনতার পরেও যে অল্প-সংখ্যক পোর্তুগীজ় মুসাম্বিকে থেকে  যায় মিয়া কোতু ও তাঁর পরিবার তাদের দলে পড়েন। আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ভারত মহাসাগরের তীর বরাবর মোজ়াম্বিক, বা পর্তুগিজ উচ্চারণে মুসাম্বিক, ১৯৭৫ অবধি পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল; স্বাধীন হয় ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন। ক্ষমতায় আসে মার্ক্সবাদী ফ্রেলিমো (ফ্রেন্তে দ্য লিবেরতাসাঁও দ্য মুসাম্বিক)। এদের বিরোধিতা করে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের মদতপুষ্ট রেনামো (রেজ়িশ্তেন্সিয়া নাসিউনাল মুসাম্বিকানা)। এই দুই দলের মধ্যে চলে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, যা শেষ হয় ১৯৯২ সালের অক্টোবরে। এরই পটভূমিকায় রচিত মিয়া কোতুর প্রথম উপন্যাস ত্যারা সুনাম্বুলা(Terra sonâmbula, ইংরেজি অনুবাদের নাম: স্লীপওয়াকিং ল্যাণ্ড)। প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে, পোর্তুগালে। এটিকে এখনও পর্যন্ত তাঁর শ্রেষ্ঠ লেখা বলে মনে করা হয়। 

“স্বপ্নচারী দেশ”

এই উপন্যাসে সমান্তরাল দুটি কাহিনী চলতে থাকে; প্রথমটির মুখ্য কুশীলব দুজন – বৃদ্ধ তুয়াহির আর কিশোর মুইদিঙ্গা। দুজনের মধ্যে কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। তুয়াহির মুইদিঙ্গাকে পায় একটি শরণার্থী শিবিরে, বা লেখকের ভাষায়, “বাস্তুচ্যুত লোকেদের” শিবিরে। দেশে তখন গৃহযুদ্ধ চলছে। একদিন দুজনে ওই শিবির ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, মুইদিঙ্গা নিজের বাবামাকে খুঁজে পেতে চায়। চলতে চলতে পথে পড়ে একটা পুড়ে যাওয়া “মাশীঁম্বম্বু” (বাস); তার ভেতরে সিটে-বসা লোকগুলো পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে। এই বাসের ভেতরেই তারা আশ্রয় নেওয়া স্থির করে। মুইদিঙ্গার উপরোধে বুড়ো তুয়াহির রাজি হয় মড়াগুলোকে গোর দিতে। একটা বড় গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যেই সব কটা দেহকে চাপা দিয়ে ফেরার পথে তারা দেখতে পায় আরেকটা মৃতদেহ – একে গুলি করে মারা হয়েছে আর সেটা খুব বেশীক্ষণ আগে নয় – ও তার পাশে পড়ে-থাকা একটা স্যুটকেস। মৃতদেহটাকে ওই আগের গর্তটাতেই চালান করার পর দুজনে স্যুটকেসটা নিয়ে বাসে ফেরে। তার ভেতর থেকে ইকড়িমিকড়ি লেখাতে ভর্তি অনেকগুলো বাচ্ছাদের স্কুলের খাতা পাওয়া যায়। তুয়াহির চায় খাতাগুলো রাতে আগুন জ্বালানর কাজে ব্যবহার করতে কিন্তু মুইদিঙ্গা চায় সেগুলো পড়ার জন্য বাঁচিয়ে রাখতে। এটিই হল প্রথম পরিচ্ছেদ। এরপরে যে পরিচ্ছেদটি আসে তা হল মুইদিঙ্গার পড়া একটি খাতা। এইভাবে একটি করে পরিচ্ছেদ তুয়াহির আর মুইদিঙ্গার কাহিনী বর্ণনা করে আর তারপরে আসে একটি করে খাতার লেখা। সর্বমোট এগারোটি পরিচ্ছেদ আর এগারোটি খাতা। এগারো নম্বর খাতা দিয়েই উপন্যাসটি শেষ হয়। কাহিনী যত এগোয় ততই নিরক্ষর তুয়াহিরের খাতাগুলি শোনার আগ্রহ বাড়তে থাকে। একাদশ পরিচ্ছেদে গিয়ে আমরা দেখি মুমূর্ষু তুয়াহির মুইদিঙ্গার মুখে এগারো নম্বর খাতার কাহিনী শুনতে শুনতে একটা ভেলায় করে সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে  যায়। খাতার কাহিনী লিখেছে কিন্দজ়ু (খুব সম্ভবত গুলিতে মৃত লোকটি); কাহিনীর শুরু দেশ যখন স্বাধীন হল, আর শেষ গৃহযুদ্ধ যখন শেষের দিকে। প্রথম খাতায় বর্ণিত ঘটনা যখন শুরু হয় তখন কিন্দজ়ু বেশ ছোট, তার বাবা তাঈমু পেশায় জেলে কিন্তু সারাদিন “সুরা”[1] খেয়ে পড়ে থাকে আর রাতে স্বপ্নে “ভোগে” (যেমন লোকে রোগে ভোগে); স্বপ্ন দেখতে দেখতে নিশিতে পাওয়ার মত করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, পরদিন ছেলেরা তাকে খুঁজে আনে  আর তখন সে তাদের স্বপ্নের গল্প বলে। তার পূর্বপুরুষেরা নাকি স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে তাকে ভবিষ্যতের খবর পাঠায়। এই উপন্যাসে দুটি জিনিশ লক্ষণীয় – প্রথমত পুরো উপন্যাস জুড়েই একটা খোঁজ জারী আছে; সবাই কিছু না কিছু খুঁজছে – যেমন মুইদিঙ্গা খুঁজছে তার বাবামাকে আর কিন্দজ়ু খুঁজছে জাদুকরদের আশীর্বাদধন্য নাপারামার নামের প্রাচীন যোদ্ধাদের, তারা নাকি যুদ্ধ যারা বাধায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আর এই করেই নাকি তারা দেশের উত্তরাঞ্চলে শান্তি নিয়ে এসেছে। তাঈমু মারা যাওয়ার কিছুদিন পর কিন্দজ়ু নৌকো করে এদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে এবং পথে তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কাহিনী নিয়েই বাকি দশটা খাতা। এই উপন্যাসে বর্ণিত আরেকটা আশ্চর্য বিষয় হল কিন্দজ়ু আর মুইদিঙ্গা বাসে আশ্রয় নেবার পর কিন্তু আর কোথাও যায় না, বরং তাদের আশপাশের প্রকৃতিই হেঁটেচলে বেড়ায়। এই রাস্তাই একদিন চলতে চলতে এই দুই অসমবয়সী সহযাত্রীকে সমুদ্রতীরে এনে ফেলে, যেখান থেকে তুয়াহির তার শেষযাত্রা শুরু করে। মুইদিঙ্গার কথায় – “আমি রাত্রে একটা করে কিন্দজ়ুর খাতা পড়ি আর পরদিন সকালে উঠে দেখি আশেপাশের সবকিছু  বদলে গেছে; রাস্তার দুপাশের মাঠঘাট গাছপালা সাভানা সব বদলে বদলে যায়।” তুয়াহির বলে, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না।… দেশটাই এখানে সার দিয়ে চলেছে, স্বপ্নভ্রাম্যমাণ।” এখান থেকেই উপন্যাসের নাম “স্বপ্নচারী দেশ”। স্বপ্নের খোঁজে আমরা এবার পড়ব কিন্দজ়ুর দ্বিতীয় খাতার কিছু অংশ, যেখানে সে তার গ্রাম ছেড়ে একটা গাছ কেটে বানান ডোঙাতে চড়ে সমুদ্রে ভেসে পড়েছে নাপারামারদের খোঁজে। আর এই সমুদ্রযাত্রার মাঝেই সে তার বাবাকে স্বপ্নে দেখে…     

[1]Sura – তালগাছের অঙ্কুর থেকে তৈরি ব্র্যান্ডি।   

পৃথিবীর ছাদে একটা গর্ত

ঢেউগুলো শান্ত হয়ে গেল, তাদের গর্জন থেমে গেল। পৃথিবীর জন্মের আগে যেরকম চারিদিক শান্ত হয়ে  যায় সেইরকম শান্ত হয়ে গেল। তখন হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে গভীর অতল থেকে ডুবে-যাওয়া মানুষেরা বেরিয়ে এল। তারা ওপরে উঠে এলো, আনন্দে টগবগ করতে করতে। তাদের মধ্যে আমার বাবাও ছিল, বুড়ো, যেন তাকে আমরা ফেলে আসিনি। সে আমায় ডাকল, কোনরকম স্নেহ-ভালবাসা ছাড়াই আমাকে অভ্যর্থনা জানাল।   

– আমাকে কবর না দিয়ে তোমরা ভালই করেছ। এই মাটিটা মড়াতে এক্কেবারে গিজগিজ করছে।

আমি বাবার কাছ থেকে একটু স্নেহ আশা করেছিলাম, তা সে পাকেচক্রে পাওয়া হলেও চলত। কিন্তু এখনও ফিরে এসে সে একজন বাবার মত কোনরকম হাবভাব দেখাল না। কেবল যেখানে গেছে সেখানকার কথাই বলে চলল। পরপার নিয়ে সে খুশি নয়। ওখানেও সে কোনরকম শান্তি খুঁজে পায়নি: সর্বক্ষণ হাড়গোড়গুলো তাদের পুরনো শরীরগুলোতে জায়গা নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি করে। এইসব গণ্ডগোলের মধ্যে তারা সব গুলিয়ে ফেলে ভুলভাল জায়গায় বসে পড়েছে, একটা শরীরের হাড় অন্য একটা শরীরে ঢুকে পড়েছে। এর ফলে অদ্ভুত সব দৈত্যদানবের জন্ম হচ্ছে।      

– আর তুমি, বাছা, এই জলাজঙ্গলে কি করছ ? তুমি কি জানো না যে এইসব পথ থেকে  শিকুয়েম্বুদের[1] পরিষ্কার করে সরান হয়নি?  নাকি তুমি ভাল দুর্ভাগ্য ডেকে আনতে চাও?

যখন আমি জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলাম, বর্ম-পরা যোদ্ধাদের কাছে আমার আত্মনিবেদনের ব্যাপারে তাকে বলতে চাইলাম, আমার বাবা তার আগেই আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। মরার পরেও, কেবলমাত্র আমার স্বপ্নে এসে সে আমাকে অগ্রাহ্য করছে। আমি তাকে ডাকলাম আর, গলা তুলে, নিজেকে ব্যাখ্যা করলাম: আমাকে আমার ইচ্ছে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই ইচ্ছে তো সে-ই আমায় শিখিয়েছিল। সত্যি বলতে কি, আমি তো তারই নিঃশব্দ আদেশ পালন করছি। কিন্তু আমার বাবা, বুড়ো গোঁয়ার তাঈমু,        এগুলো যে তারই আদেশ সেটা অস্বীকার করল। সে আমাকে মরা মানুষদের সঙ্গে তুলনা করল। তারা অন্য লোকের হাড় শরীরে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়; আর আমি অন্য লোকের আত্মা বয়ে বেড়াই। 

– তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার: এগুলো আমার আদেশ নয়। ওপারে আমি খালি তোমার পায়ের আওয়াজই শুনতে পাই। তোমার আসলে চাইটা কি?

– এই যুদ্ধটা শেষ করতে সাহায্য করব। আমার কথাটা বিশ্বাস কর, বাবা।

সে অবজ্ঞার হাসি হাসল। আমি যদি নিজেকে চালাক ভাবতাম তাহলে কি হাজারটা হাবিজাবি জিনিশের পেছনে ছোটাটাকেই জীবনের পরমার্থ বলে আবিষ্কার করতাম? ওইসবই ওর, আমার বৈধ বাপের, পছন্দ করে পাঠান শাস্তি। আমার প্রথা মেনে না চলাই হল আমার যত বাধা, যত বিপত্তির মূল। এখন দেবতাদের দেওয়া, আমাদের পূর্বপুরুষদের দেওয়া শাস্তি ভোগ করছি। সে নিজের ক্লান্তিকর মরণ নিয়ে বিলাপ করতে লাগল:

– আমি এমন এক মরা মানুষ যার কোন সান্ত্বনা নেই। কেউ আমাকে সম্মান দেয় না। কেউ আমার জন্যে মুরগি কাটে না, আমাকে না কোন ভাল খাবার দেয়, না দেয় জামাকাপড়, না মদ। আমি কি করে তোমায় সাহায্য করব, তোমার সব ময়লা পরিষ্কার করব? তুমি ঘরদোর ছেড়ে এসেছ, পবিত্র গাছ ত্যাগ করেছ। আমার প্রতি প্রার্থনা না করেই চলে এসেছ। এখন সেসবের ফল ভোগ করছ। এখন আমিই তোমার বোধবুদ্ধি চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছি।    

– কিন্তু, বাবা, আমি তো রোজ তোমার জন্যে খাবার নিয়ে যেতাম…

– প্রথম প্রথম কয়েকদিন তা নিয়ে গিয়েছিলে বটে। কিন্তু তারপর আর কক্ষণো কোনো খাবার দেখতে পাইনি। কেবল খালি ডেকচি, আর কিচ্ছু নয়।

– কেউ একটা খেয়ে নিত…

– মরা লোকের থালা কেউ ছোঁয় না।  

বুড়ো তাঈমু বুঝিয়ে বলল: আমি যা কিছুর স্বপ্ন দেখেছি তার কিছুই হাসিল করতে পারব না যতক্ষণ অবধি তার ছায়া আমার ওপর চেপে বসে আছে। আমাদের দেশের সঙ্গে সেটার পূর্বপুরুষদের সম্পর্ক আর না থাকার ফলে সেটারও ওই একই অবস্থা। আমি আর আমাদের দেশ একই শাস্তি ভোগ করছি। তারপর হুমকি দিল: যেহেতু আমি মনেপ্রাণে এই যাত্রা করতে চেয়েছিলাম, কোন একদিন সন্ধে নামার সময়ে, আমার সামনে মাম্পফানা[2] এসে দেখা দেবে। ডানাদুটো ছড়িয়ে একটা বিশাল গাছের ওপর এসে বসবে, বাবা বলল।      

– না, বাবা, এটা করো না। 

বাবা আমার ভয় দেখে হাসল। কাঁধ দুটো উঁচু করল, সেগুলো এতই রোগা যে ওপরে ওঠার সময়ে সারা শরীরটাকেই হিঁচড়ে ওপরে টেনে তুলল। আবার চলে যাচ্ছিল কিন্তু মাঝপথে থেমে গিয়ে যোগ করল:

– তাহলে মাম্পফানাটাকে দেখতে পেলে আমায় ডেকো। সেই মুহূর্তে আমি হয়ত তোমার ডাকটা শুনতে পাব। কিন্তু ভাল সুরা আনতে ভুলো না যেন। ওটা ছাড়া আমি কোন কাজই করব না।  

আগামীর ভয়-সংশয়ে আমি বিষয়টা বদলে দিলাম। আমি চাইনি যে বাড়ির খবর জানার আগেই স্বপ্নটা ভেঙে যাক। বাবাকে আমি মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলাম, জানতে চাইলাম ভাগ্য তাকে কতটা অসুখী করেছে। বাবা আমাকে আশ্বস্ত করল। আর আমাকে এও জানাল যে প্রথম প্রথম যখন সে মরা মানুষ হতে শিখছিল তখন ওই বুড়িকে দেখে মনে হত যে সে অনেকদিন ধরেই বৈধব্য কি তা জানত। বাবা, যে কিনা জীবনে সবসময়েই অন্য মহিলাদের পেছনে ছুটত, মায়ের প্রতি তখন বিশ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। বাবা মায়ের মৃত স্বামী হয়েই ছিল, যার ফলে একটা তৈরি গেরস্তালির সুযোগ-সুবিধে, রান্না-করা খাবার, সবই পেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য আমাদের মা আরেকজনের জন্যে বাবাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল: একজন জ্যান্ত মানুষকে বিয়ে করেছিল।      

– এটা সত্যি নয়। মা বিয়ে করেনি।

– হ্যাঁ, করেছে, তুমি চলে আসার পর। এখন আমি একলা, বিপত্নীক-অকৃতদার।

প্রতারণাটা তাকে আঘাত দেয়নি। কষ্টটা তার সঙ্গী ছাড়া মরা মানুষ হয়ে থাকায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কেন সে আরেকজন মহিলাকে বেছে নিচ্ছে না। উত্তরে বলল যে সে ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। নিয়ামুসোরু (নিয়ামুসঙ্গে  – জাদুকর) এরমধ্যেই এমন মহিলাদের মধ্যে একজনকে তার আর্জি জানিয়েছে যারা জীবনের দিকে থাকে।   

– তাহলে তোমার একজন জ্যান্ত স্ত্রী আছে?

– হ্যাঁ, আছে। ও এরমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে, প্রথার বিধান অনুসারে। ওর পরিবার ওর দিকে নজর রাখছে। এখনই ও আমার, ও আর অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে শুতে পারে না – সে জ্যান্তই হোক বা মরা। তুমি কিন্তু আমার এই নোতুন স্ত্রীকে ঠিকমত চালিয়ে আমার উপকার করতে পার।    

– এই মহিলাটি কে? সে কি আমাদের গ্রামের কেউ?

– এই মহিলা… সে… ছেড়ে দাও, আমি নিজেই ব্যাপারটা দেখে নেব।

– কিন্তু, বাবা, আমাকে তোমায় সাহায্য করতে দাও, আমি তোমাকে খুব সাহায্য করতে চাই।

– তুমি জানটাই বা কি? কেবল স্বপ্ন দেখতে জান, আর কিচ্ছু না।

– আমাকে তোমার এই স্ত্রীর নামটা বল। বল না আমায়, বাবা।

এবার সে মুখটা নীচু করল, যেন লজ্জার ভারে। তার মধ্যে একটা গোলমেলে মানসিক কষ্ট পাক খাচ্ছিল। অবশেষ সে ফিসফিসিয়ে বলল:

-কথাটা মিথ্যে, বাবা। এরকম কোন মহিলা নেই।

এই প্রথম আমার বাবার জন্যে কষ্ট হল। আমার ইচ্ছে হল তাকে এই দুঃখের জন্যে সান্ত্বনা দিই, হাতটা তুলে আদর করার ভাব দেখাই। কিন্তু সমুদ্র হঠাৎ আবার নড়াচড়া শুরু করে দিল, মনে হল যেন একটা বিশাল কাপুলানা[3] হাওয়ায় ফুলে ফেঁপে উঠছে। আমার ছোট্ট নৌকোটা, সহায়হীনভাবে একটা অজানা অচেনা তীরে গিয়ে আছড়ে পড়ল। জলের ঘুম ভাঙতে চলেছিল। আমার বাবা ভয়ে চমকে উঠল: আমায় ফিরতে হবে!      

– বাবা, আর একটুখানি থাক।

যতক্ষণ সম্ভব আমি ওর খেয়াল রাখতে, ছেলে হিসেবে অভিভূত হতে চাইছিলাম। সে আর অল্পক্ষণ থাকতে রাজি হয়ে গেল। তীরের চকমকে বালির ওপর আমরা বসলাম। আমার ইচ্ছে ছিল সে যেন আমায় কোনদিন স্পষ্ট করে না-বলা গল্পগুলো বলে। কিন্তু সে বরাবর যেমন চাপা স্বভাবের সেইভাবেই চুপ করে বসে রইল। নিস্তব্ধতাটাকে হাল্কা করার জন্যে আমি একটা ছোট কাঠের টুকরো হাতে নিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটতে লাগলাম। মাটিতে কাঁকড়াদের বাসার ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে তারা মুখ বাড়িয়ে উঁকি মারছিল, তাদের টেলিসফেরিক চোখগুলো দিয়ে নজর রাখতে রাখতে।     

কিন্তু স্বপ্নটার জন্যে আমার আরো ঘুম পাচ্ছিল। এত গভীর ঘুম খালি শৈশবই দিতে পারে।  

– তুমি তো ভালই আছ, তাই না, বাবা?

– তা আছি। মরাটা আমার পক্ষে ভালই হয়েছে।

ওর কোলে ঠেস দেওয়ার জন্যে অনুমতি চাইলাম, ঠিক যেমন আমি আগে সবসময়ে আকুল হতাম। সে কোন উত্তর দিল না। মনে হল সময়ের যে স্মৃতি আমার আছে তার তুলনায় অনেক বয়েসের ভারে সে যেন জরাজীর্ণ। তার রাজি হওয়ার অপেক্ষা করতে করতে আমার গলা একটা বাচ্চার মত বলে উঠল:    

– বাবা, মাটি তো বুড়ো হয় না। কেন বল না?  

কারণ সে শুয়ে শুয়ে কাজ করে। যখন ক্লন্ত হয়ে পড়ে তখন তো সে তার মাদুরেই শুয়ে, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়েছে। মাটির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তোমারও তা-ই করা উচিত।

এইসব কথাবার্তা একেবারে জোলো, যাতে বলার মত কোন বিষয় নেই। আমার ইচ্ছে শুধু এইরকম শান্তভাবে আরেকটু সময় কাটান, বাবাকে তার তাড়াটা ভুলিয়ে দেওয়া। আমি বোঝার ওপর আরেকটা শাকের আঁটি চড়ালাম:  

– বল না, বাবা, তুমি যখন ছাগলছানাদের সুরা খেতে দিতে…

সে হোহো করে হেসে উঠল, তার মনে পড়ে গেল মা কিরকম রাগারাগি করত জন্তুজানোয়াওদের মদ খেতে দিলে। কেন যে সে এরকম করত কেউ বুঝতে পারত না।

– কেন ওটা করতে?

যাতে জন্তুগুলো ঘাসের অভাব বুঝতে না পারে। বেচারারা একেবারে হাড় জিরজিরে হয়ে গিয়েছিল, এমনকি ওদের শিংগুলো অবধি রোগা হয়ে গিয়েছিল। ওরা মাতাল হলে দুটো সুবিধে ছিল: প্রথমত, ওরা কষ্ট পেত না; দ্বিতীয়ত, আগে থেকেই রান্নার জন্যে মদে ডুবে তৈরি হয়ে থাকত।  

– এখন ওই মদে চুর হয়ে থাকা ছাগলগুলোর জন্যে হিংসে হয়।  

দুজনেই হাসলাম, ছাগলগুলোর টলমল করে চলা মনে করে, মনে হত যেন ওদের চারটে পা-ও কম পড়েছে। ওই হাসি যেন আমায় হাতে চাঁদ এনে দিল। তাহলে কি বাবা আমার ভয় কাটানর খেলাটা মেনে নিল? বুড়ো তাঈমু কি শেষমেশ আমার সঙ্গে সন্ধি করল? আমারই ভুল। কারণ হঠাৎই আমার স্বপ্নটা দুঃস্বপ্ন হয়ে গেল। বাবা মুখ থেকে হাসিটা মুছে ফেলল আর তার কথাগুলো তেঁতো শোনাল:    

– তুমি তোমার মিথ্যের স্বপ্নে আমাকে বানিয়ে তুলেছ। এর জন্যে তোমার শাস্তি পাওয়া দরকার: এরপর আর কখনই তুমি স্বপ্ন দেখতে পারবে না যদি না আমি তোমার জন্যে কোন স্বপ্ন চালিয়ে দিই।  

এরপর তাঈমু মিলিয়ে গেল। যা যা দেখছিলাম তা সব হারিয়ে গেল আর আমি জেগে গেলাম, ক্লান্ত – কে বলতে পারে – হয়ত মরে না যাওয়ার ফলে।    


[1]Xicuembo – পূর্বপুরুষদের আত্মা।  

[2]Mampfana – অ্যাফ্রিকার এক ধরণের শিকারি পাখি; এদের পা দুটো লম্বা, মাথায় ঝুঁটি আর ল্যাজে লম্বা পালক থাকে। এদের খাদ্য প্রধানত সাপ। এদের সেক্রেটারি পাখি বলেও ডাকা হয়ে থাকে।    

[3]Capulana – নানা রঙের ছাপা সুতি বা সিল্কের কাপড়ের টুকরো, যা সাধারণত মোজ়াম্বিকের মহিলারা উৎসবের দিনে শরীরের নিম্নাঙ্গে পরে থাকে।

RITA RAY
ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংক্স্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *