ভাল ফ্যাসিস্ট হবার সহজ উপায় (পর্ব ৭)

বাংলা English
Rui Zink
Rui Zink
Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures,  imagines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16.Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over. 
 Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়’, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.

Manual Do Bom Fascista
Manual Do Bom Fascista

পাঠ ৩৭

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট মনে করে যে আমাদের কঠোর হতে হবে

পুলিশবাবু যে চোখটা বন্ধ করেননি সেটার জন্যে তার খুব রাগ হয়। সত্যি বলতে কি “স্রেফ এক সেকেন্ডই” তো লেগেছিল। আর বলাই তো হয় যে আমরা সবাই একে অপরের জন্যে।

     ওর মাথায় রক্ত চড়ে যায় যখন সে ফুটপাথের ওপর গাড়িটা রেখেছে বলে একটা বুড়ি ন্যাকা সাজে:

     জানতে পারি কি গাড়িটা কোথায় রাখব বলে আপনি চান? দেখুন ম্যাডাম, আমি যে সভ্য

          ভদ্র একজন মানুষ আপনার চোদ্দ পুরুষের ভাগ্য, নইলে আপনাকে চুলোদ্বোরে পাঠাতাম!”

     আর সেই মেয়েমানুষটার কথা তো ছেড়েই দিলাম যে তাকে গালাগাল দিতে দিতে তেড়ে গিয়েছিল কারণ সে ঠিক জ়েব্রা ক্রসিঙের ওপর গিয়ে ব্রেকটা মেরেছিল। সঙ্গে আবার একটা বাচ্চা ছেলে ছিল তাই আর সে বেশি কিছু বলেনি:

     মামণি, তোমার ভাগ্য ভাল যে তুমি ব্যাটাছেলে নও, নইলে  তোমার থোবড়া বিলা করে দিতাম

     এতেও ওর মাথায় রক্ত চড়ে গেছে যে জেএনএর[1]-এর শালা দালালগুলো লুকিয়েচুরিয়ে অপারেশান স্টপ[2] চালিয়েছে – রাডারগুলো ঠিক কোথায় লাগান আছে সেটা আগেভাগে না জানিয়ে না বলেকয়ে যাতে মানুষ বুঝতে পারে ধরা না পড়ার জন্যে কোথায় স্পিডটা কমাতে হবে। এটা সত্যি যে সে সীমার চেয়ে একটু বেশি জোরেই চালাচ্ছিল, কিন্তু ওরাও তো চোখটা বন্ধ করে থাকতে পারত, ইশারা করতে পারত, কারণ সত্যি বলতে কি, আমরা তো একে অপরের জন্যেই, তাই না?

     আর, তারপর, তাদের হাতে দশ ইউরো ধরাতে গেলে তারা গাড়ি থেকে নামতে বলবে?! আসলে হয়ত ওদের চাহিদাটা ওর বেশিই ছিল, ঘুষখোরের ঠাকুরদা সব!  

[অনুশীলিনী: গাড়িটাকে ফুটপাথের ওপর রাখুন। কেউ যদি আপনাকে বিরক্ত করে তো তাদের বলবেন যাতে ইলেকট্রিক স্কুটারগুলো বুড়োমানুষদের স্বচ্ছন্দে যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি না করতে পারে তাই আপনি গাড়িটাকে ওখানে রেখেছেন।]  

দুর্বলতার মন্ত্রণালয়

এবার আমরা এই বইয়ের স্টিফেন কিং মুহূর্তে পৌঁছে গেছি। অন্য সব পাঠ্যবই, যেগুলো এতটা বিশ্বাসযোগ্য আর বিজ্ঞানসম্মত নয়, সেগুলো তাদের স্টিফেন কিং মুহূর্ত বাদ দিতে পারে। এবার সব পাঠ্যবইতেই যদি  একটা করে স্টিফেন কিং অধ্যায় থাকা দরকার হয়, তাহলে এই বইটারও সেই দরকারটা আছে। আমরা বলতে গেলে স্টিফেন কিংএর যে কোন বই থেকেই উদ্ধৃতি দিতে পারি কিন্তু শাইনিং (১৯৭৭) এই বিষয়ে বিশেষ গবেষণা হিসেবে যথেষ্ট পরিমাণে শিক্ষণীয়, কারণ যারা এই বইটা পড়েননি পর্যন্ত তাঁরাও বইটা বেরনোর তিন বছর পর তার থেকে স্ট্যানলি কুব্রিকের তৈরি ছবিটা দেখেছেন।  

     আর কি কারণে আমরা যে কোন বই ব্যবহার করতে পারি? কারণ স্টিফেন প্রায় সর্বদা একই ফর্মুলার আশ্রয় নেন। বা, আরো ভাল করে বলতে গেলে, ফর্মুলাটা বারবার ব্যবহার করার চেয়েও মনে হয় যেন এটাই ওঁর বিশ্বাস, ওঁর ছোট্ট একটা উদ্ভাবন, ওঁর ছোট্ট আবিষ্কার যা তিনি অন্য কোথাও খুঁজে পেয়েছেন কিন্তু যেটাকে তিনি এতটাই মনোযোগ ও প্রায় স্নেহার্দ্র আবিষ্টতা দিয়ে যত্ন করেছেন যে সেটাকে তাঁর নিজের বলে আপন করে নিয়েছেন। ব্যাপারটা একটা দুই মাথাওয়ালা প্রতিপাদ্য:

     – শয়তান আছে,

     – কিন্তু সে দুর্বল, আর সত্যিকারের ক্ষতি করার জন্যে তাকে ঠিক ওরই মত দুর্বল রক্তমাংসের  মানুষদের দূষিত করতে হয়, বা তাদের দিয়ে খানিকটা দক্ষ ভাবে মন্দ কাজ করাবার জন্যে (বা শয়তান বানাবার জন্যে) তাদের একটা দুর্বল মুহূর্তে ধরে ফেলতে হয়। 

     এখানে শয়তান আরেকটা বাধার মুখে পড়ে: যে মানুষগুলোকে ও বিপথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়, শুরু থেকেই তারা সবচেয়ে ভাল গুণমানের যে হয় না শুধু তাই নয় (সঠিকভাবে বলতে গেলে, যথেষ্ট পরিমাণে “দুর্বল”), তার ওপর আবার অপেশাদারও বটে। আর অপেশাদারেরা তো প্রচুর বোকামি করে, যে কারণে তাদের সাধারণত একবারই ব্যবহার করা যায়, তারপরেই তারা নষ্ট হয়ে যায়।

     ওঃ, একই ছাঁচে পড়ে না এমন ঘটনাও আছে বটে, এমন সব মুহূর্ত যখন শয়তান তার যোগ্য সম্মান নিয়ে বিশাল ব্যাপ্তি পায়, বা হয়ত অন্য আরেকজন প্রভু পায়। নাৎসিজ়ম হল এর সবচেয়ে দৃষ্টি-আকর্ষক নমুনা; টিকে থাকার জন্যে সবকিছু করতে তৈরি যে কোন স্বৈরতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা মাত্রায় এর থেকে অপেক্ষাকৃত ভাবে কম (তাসত্ত্বেও এরা মনের ওপর গভীর ছাপ ফেলে)। দুর্ভাগ্যবশত এইসব চূড়ান্ত ক্ষেত্রেও কিছু দিন পর থেকেই জিনিশটার গুণমান কমতে শুরু করে। যেসব দুর্বল লোকেদের ঘাড়ে শয়তান চেপেছিল, তারা শেষ পর্যন্ত বুদ্ধু বনে গিয়ে ধরা পড়ে যায়, আর সেই পাগল-করা ফুর্তির মুহূর্তটা পার হয়ে গেলেই – যখন নড়তে চড়তে থাকা সবকিছুকেই তারা গুলি করেছিল, সেটা ইটৎসেইয়াতেই[3] হোক বা লাস ভেগাসে[4] বা  পিটসবার্গে[5] বা নীসে[6] বা বাতাক্লঁতে[7] – তারা ধরা পড়ে যায়। অতি সম্প্রতি ক্রাইস্টচার্চের বেচারা অস্ট্রেলিয়ানটার[8] ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে, হাতকড়া পরে তাকে কি করুণই না দেখতে লাগছিল। তাসত্ত্বেও আমাদের মানতেই হবে যে পুরোপুরি কৌশলগত দিক থেকে দেখতে গেলে তাদের শয়তানকে মনোরমভাবে মূর্ত করার অল্পসময়ের এই জীবিকাতে আক্ষরিক অর্থে এই বেচারা শয়তানগুলো কিছুটা হলেও দক্ষতা দেখিয়েছিল।  

*

     সিনেমা/বইটার সংক্ষিপ্তসার: কয়েক মাসের জন্যে একটা পরিবার পাহাড়ে একটা বড় হোটেলের দেখভাল করবে। তারা খুব খুশি, বাচ্চা ছেলেটা খেলে বেড়াবার জায়গা পাবে, স্ত্রী অনেক কিছু করতে পারবে আর স্বামী বহু বছর ধরে যে উপন্যাসটা লিখে চলেছে অবশেষে সেটা শেষ করার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণে শান্তি পাবে আর বাজিটা অর্ধেক করে দিলে এই উপন্যাসটা তাকে বড়লোক আর বিখ্যাত করে তুলবে আর তারা চিরদিনের জন্যে সুখী হবে। তাছাড়া মাইনেটাও ভাল। একটাই সমস্যা: হোটেলটা একটা গভীর রহস্য লুকিয়ে রেখেছে – সে একটা জীবন্ত ও বিদ্বেষপরায়ণ প্রাণী আর কয়েকটা ঘর ও সুইটে কয়েক দশক ধরে ভয়ানক সব অপরাধ সঙ্ঘটিত হয়েছে। অবশ্য এই মুহূর্তে সে কোমায় আছে কারণ অনেকদিন ধরে সে রক্ত বা খারাপ  কোন স্পন্দন খায়নি। বেশ কিছু বছর ধরে সুখী লোকেরা, যাদের জীবনের সঙ্গে কোন বিবাদ-বিসম্বাদ নেই, তারাই কেবল এখানে আসে আর এটা হোটেলটাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। সে মৃতপ্রায়, বোধশক্তিহীন: যদিও সে এখনও আছে, মন্দের কেবল একটা রশ্মিই তার মধ্যে অবশিষ্ট, সামান্য একটা তলানি বৈ আর কিছু নয়, ঠিক যেমন অ্যাম্বারে সংরক্ষিত একটা মশার মধ্যে ডাইনোসরের ডিএনএ। আর এইজন্যেই হোটেলটা শীতঘুম দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার শক্তির কণামাত্র যে নিদর্শন বাকি আছে সেটাকে নিরাপদে রক্ষা করার এটাই একমাত্র উপায় হিসেবে সে খুঁজে পেয়েছিল। জ্যাক এসে পৌঁছন মাত্র সে এই হবু লেখকের মধ্যে এমন কিছু সুপ্ত দেখতে পায় যা জ্যাক নিজেই জানে না, আর যেটা হোটেলটা মহিলা বা বাচ্চাটার মধ্যে খুঁজে পায় না: একটা ভঙ্গুরতা, একটা মন্দের প্রতি প্রবণতা, যেটাকে ঠিকমত যত্নআত্তি করলে হয়ত আকার নিতে থাকবে, ফুলেফেঁপে উঠে, গঠন, স্বাদগন্ধ আয়ত্ত করতে করতে আস্তে আস্তে রান্নাটা ঠিকঠাক হয়ে পাতে দেওয়ার উপযুক্ত হয়ে উঠবে।  

     হোটেলটা হাসে।

     শেষকালে, যারা সিনেমাটা দেখেননি বা বইটা পড়েননি তাদের মজাটা মাটি করে দেবার জন্যে ক্ষমা চাইছি, জ্যাক নিকলসান আর থাকবে না। রয়ে যাবে কেবল হোটেলটা, আবার জাগ্রত, চাঙ্গা, সুস্থ, চনমনে  খিদে নিয়ে রক্তের পাগল-করা একটা ফুর্তির জন্যে তৈরি। আয়াম ব্যাক, বেবি!

     এই বইটা/সিনেমাটা একটা লোকের ভাল ফ্যাসিস্টে পরিণত হওয়ার গল্প ছাড়া আর কিছু নয়।

*

     বাস্তব জগতে, কোন ভূতে-পাওয়া হোটেলের দরকার নেই। সত্যি বলতে গেলে রাস্তায়, ক্যাফেতে, অন্য কোন জায়গায় এই কথাটা আমরা কতবার শুনি না বলুন তো:

     যদি তোমরা মনে করে থাক যে এটা এইরকমই থাকবে তো ভুল করেছ আমার সঙ্গে ইয়ার্কি

          চলবে না একদিন আমার মাথাটা গরম হয়ে যাবে আর…”  

     কখন কখন এই গলাটা আমাদের কানে আসে পাশের টেবিলটা থেকে, নিজের মনেই চ্যাঁচামেচি করছে এমন কারুর মুখ থেকে। কখনওবা কথাটা মোবাইলে বলতে শোনা যায়, যেটা একটু কম ভয়ানক।

     কেবল অন্যান্য সময়ে আমাদের মাথার ভেতরেই কতগুলো গলা এই কথাটা বলে চলে, জ্যাকের মত। একদিন আমার মাথাটা গরম হয়ে যাবে আর…” । আমাকে হাত তুলতে বলবেন না, কিন্তু ঘটনাটা আমার সঙ্গেও ঘটেছে:

     আচ্ছা, তোমরা ভাবছ যে এটা এরকমই হবেআমার সঙ্গে ছেলেখেলা কর না ভাবছ যে আমার

          সঙ্গে তোমরা মজা করতে পার? আমার সঙ্গে মজা করা চলবে না একদিন আমার মাথাটা গরম        হয়ে যাবে আর যা করে বসব তার জন্যে আমি দায়ী থাকব না” 

     ইত্যাদি। 

     ঝামেলাটা তখনই হয় যখন আমাদের বোধবুদ্ধির গলাটা চাপা পড়ে যায় সম্মিলিত কতগুলো গলার আওয়াজে, তার কিছু বাইরে থেকে আসে আর কিছু ভেতর থেকে; তারপর এক সময়ে ভয়ঙ্কর রকম সুরে সুর মিলিয়ে একটা কোরাস ঐকতানে সেই পুরনো মন্ত্রটা বারবার বলতে শুরু করে:

     একদিন তোমরা দেখবে, একদিন তোমরা দেখবে দেখবে, দেখবে ওরা দেখবে, ওরা     দেখবে এটা এরকম থাকবে না একদিন তোমরা দেখবে আমার সঙ্গে ইয়ার্কি চলবে না শুয়ার    ভাবছ যে এটা এরকমই থাকবে? এরকম থাকবে না আমিই ঠিক করব গল্পটা কখন শেষ হবে,   ওই মাগীটা নয় ওই খচ্চরটা নয় ওই শুয়ারগুলোও নয় খানকির বাচ্চা সব একদিন তোমরা     দেখবে কিছু হলে আমি দায়ী নই কিন্তু এটা এরকম থাকবে না আমি ধরা পড়লেও তোমাদের       মুখে হাসি থাকবে না তোমরা আমাকে খুন করতে চাও কিন্তু আগে কটাকে মেরে তবেই মরব           আমাকে নিয়ে ছেলেখেলা চলবে না এটা এরকম থাকবে না দেখবে তোমরা আমি শেষ অবধি         দেখব দেখবে তোমরা এটা এরকম থাকবে না”     

     ইচ্ছেমত বিস্ময়বোধক চিহ্ন বসিয়ে নিন।

*

     আমরা পাঠ ১৩টা একটু মনে করে দেখি: একজন ভাল ফ্যাসিস্ট সর্বদাই হল সত্যিকারের শিকার।  মাতাল হয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে একটা বাচ্চাকে চাপা দিলেও দোষটা সর্বদাই অন্যের হয়: সামনে চলে আসা বাচ্চাটার; তাকে বিরক্ত করা উচিত ছিল না যে মহিলাটির; একখনও ঠিকঠাক পোর্তুগিজ় বলতে না জানা মুদির; ভিজে-থাকা রাস্তাটার; কিংবা সেই রাস্তাটার যেটা ভিজে না-থাকার ফলে গাড়ির গতিটা বাড়ান নিরাপদ বলে তাকে বুঝিয়েছিল; তার লিভার যে আর আগের মত অত ভালভাবে ব্রান্ডি সহ্য করতে পারবে না এ কথা তাকে জানায়নি যে সেই ডাক্তারের; এই সবকিছু শেষ করে দেওয়া রাজনীতিকদের; যেটা না হলে আমরা খুব ভাল থাকতাম সেই পঁচিশে এপ্রিলের[9]; ভুল নম্বর বের করা লটারির। হা ভগবান! কি এমন ক্ষতি হত যদি একবার, অন্তত একবার, ও লটারিটা জিতত, অন্য সবাইয়ের বদলে, সর্বদাই অন্যরা, অন্যরা, অন্যরা?  

পাঠ ৩৮

একজন ভাল ফ্যাসিস্টের সালাজ়ারের জন্যে মন কেমন করে না

তার দরকারও নেই। কেন দরকার হবে যদি সালাজ়ার আমাদের হৃদয়, যকৃৎ, মুখ আর মাথার মধ্যে বেঁচে থাকেন?

     তথ্য তো তথ্যই। অর্ধ শতক পার হয়ে গেলেও ওই ভাল মানুষটি আমাদের কল্পনাকে এখনও পরাগিত করে চলেছেন; যেভাবে হিটলারের নাৎসিবাহিনী ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড দখল করেছিল, ঠিক সেইভাবেই সালাজ়ার আজও আমাদের হৃদয়-মন দখল করে বসে আছেন, সেই ত্রাণকর্তা অগ্নির[10] আর কোন প্রয়োজন নেই।  

     কি প্রয়োজন লাদাইরা দু পিন্যিয়াইরুর সাধ্বী্র[11], সালাজ়ার এখনও আমাদের পাপগুলোকে শুনে চলেছেন আর সেগুলোকে নোতুন করে ব্যবহারযোগ্য করে চলেছেন।

     কি প্রয়োজন আর “হোস্টেল ডে”-র “স্পেশাল মিল”-এর মত দঁ সেবাস্তিয়াঁওকে[12], তাঁর আর কোন  কুয়াশা-ভরা রাতে ফেরার দরকার নেই – কারণ তিনি তো নিজেই কুয়াশা।

     একজন ভাল ফ্যাসিস্ট জানে যে সালাজ়ার সর্বদাই দেশের জন্যে সবচেয়ে ভালোটাই চেয়েছেন। আর সে স্বীকার করে যে (ঠিক আছে, আর ঘ্যানঘ্যান করতে হবে না) তিনি এখানে ওখানে একটু আধটু স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন আর পিদ[13] কিছু কিছু উল্টোপাল্টা কাজকর্ম করে থাকতে পারে, যেগুলোর বিষয়ে তিনি কিছু জানতেনই না, কারণ ওঁকে সবকিছু বলা হত না। কিন্তু সালাজ়ার কি ফ্যাসিস্ট? কক্ষণ না।

     তাহলে তিনি কি ছিলেন? বলা যেতে পারে যে তিনি খানিকটা স্বেচ্ছাচারী ছিলেন।

     সত্যিটা এই যে জার্মানদের উলফ্র্যাম বিক্রি করে আর অ্যামেরিকানদের লাজেসের বিমানঘাঁটি ধার দিয়ে সালাজ়ার আমাদের যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। আর সেটা উনি করেছিলেন সেই একই গ্রাম্য চতুরতা দিয়ে যার সাহায্যে তিনি মিত্রশক্তির গুপ্তচরদের অতেল ভিতরিয়ায় (ভাগ্যের কি পরিহাস! আজ সেটা পোর্তুগিজ কমিউনিস্ট পার্টির সদর দপ্তর) আর অতেল তিভোলিতে (ভাগ্যের কি পরিহাস! আজও সেটা একটা ভাল হোটেল) নাৎসি গুপ্তচরদের রাখতেন।  

     আর সালাজ়ার সর্বদাই বিনয়ী আর বিচক্ষণ ছিলেন। সত্যি বটে যে চল্লিশটা বছর তিনি একটা প্রাসাদে কাটিয়েছেন – কিন্তু সেটা কি কোনমতে ওঁর বলা চলে? তাহলে? সেটাই দেখছিলাম। আর, তিনি ছিলেন বিনয়ী ও নম্র, কোনদিন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেননি। ক্ষমতাই তাঁর হাত আঁকড়ে ধরেছিল, ঠিক যেমন কোন বিরক্তিকর সেলোটেপ আঙুলে আটকে যায়। কিন্তু কারুর আঙুলে যদি সেলোটেপ আটকে যায় সেটা কি তার দোষ?

     নাঃ, একজন ভাল ফ্যাসিস্টের সালাজ়ারের জন্যে মন কেমন করে না। তার শুধু এইটাই মনে হয় যে পোর্তুগালের দরকার আরেকজন সালাজ়ারের। এমন কেউ যে এইসব গণ্ডগোল সামলে দেবে।

পাঠ ৩৯

একজন ভাল ফ্যাসিস্ট শুধুমাত্র দেশমাতৃকার একজন সন্তান

     আর তার সেইসময়ের জন্যে মনকেমন করে যখন পোর্তুগাল “বিশাল ছিল”। যখন সারা পৃথিবীর জন্যে আমরা ছিলাম আলো, একটা দেশ-জগত, যখন জগত ছিলাম আমরা, জগতকে আমরা যে জগতটা দিয়েছিলাম, আমাদের বিখ্যাত দাদুদের জগত। এমন একটা সময়ের পোর্তুগাল যখন আমরা সবার জন্যে দেশ-মাতা ছিলাম – আর আমরা সবাই, কেউ বাদ পড়ত না, ছিলাম সার্টিফিকেটে রাজকীয় শিলমোহর লাগান দেশমাতৃকার সন্তান।

     (যদিও দেশমাতৃকার কেউ কেউ বেশিই প্রিয় ছিল, যেটা খুবই স্বাভাবিক, স্বীকার করতে না চাইলেও একজন মা কয়েকজনকে একটু বেশি পছন্দ করেন।)

     আর আমরা কি বিশালই না ছিলাম! হ্যাঁ, তাতে অ্যাঙ্গোলার (পোর্তুগালের চেয়ে চোদ্দ গুণ বড়) হাত ছিল বটে কিন্তু সে তো আমাদেরই ছিল। আর ইউরোপীয় মহাদেশের মূল ভূখণ্ডে পোর্তুগালের অংশের চেয়ে সাত গুণ বড় মোজ়াম্বিকও সাহায্য করেছিল। স্কুলে-শেখা কত জিনিশই না মানুষের মনে থাকে। আরো কত অদরকারি জিনিশপত্র[14], কিছু মনে করবেন না, সত্যিসত্যিই (বিশ্বের মাপকাঠিতে) ছোট ছিল আর পোর্তুগালের বিশালত্বে সেগুলোর কোন অবদানই ছিল না, কারণ আমাদের চেয়েও তাদের এলাকা আর জনসংখ্যা কম ছিল, যদিও তাদের অবস্থান বরাবরই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

     ব্রেজ়িল যদি আজও পোর্তুগালের হত তাহলে আজ আর আমাদের বানান নিয়ে চুক্তি[15] করার দরকার পড়ত না। আমরা একটা বড় দেশ হতাম, একটা বিশাল দেশ হতাম, একটা প্রকাণ্ড দেশ হতাম, ঠিক যেমন… ঠিক যেমন… ঠিক যেমন ব্রে…  

     সেই।


[1]GNR – গুয়ার্দা নাসিওনাল রেপুবলিকানা, পোর্তুগালের মিলিটারির ধাঁচে একটা বাহিনী যাদের হাতে সারা দেশের সুরক্ষার ভার আছে।     

[2]Operação STOP – রাস্তায় যাত্রী ও চালকদের সুরক্ষা ও দুর্ঘটনা এড়াবার জন্যে পুলীসিয়া দ্য সেগুরান্সা পূবলিকার (জনসাধারণের সুরক্ষায় নিয়োজিত পুলিশবাহিনী) একটি বিশেষ কার্যক্রম।     

[3]২০১১ সালের বাইশে জুলাই নরওয়ের ইটৎসেইয়া (Utøya) দ্বীপে Anders Behring Breivik  গুলি করে ৬৯ জনকে মেরে ফেলে ও ১১০ জনকে আহত করে। 

[4]২০১৭ সালের পয়লা অক্টোবর রাত্রে স্টিফেন প্যাডক লাস ভেগাসের একতা হোটেলের বত্রিশ তলা থেকে একটা গানের অনুষ্ঠানের ওপর গুলি চালিয়ে ৬০ জনকে মেরে ফেলে, আহত হয় আরও ৮৬৭ জন।    

[5]২০১৮ সালের সাতাশে অক্টোবর সকালে রবার্ট গ্রেগরি বাওয়ারস পিটসবার্গের একটা সিনাগগে প্রার্থনা চলার সময়ে গুলি চালিয়ে এগারো জনকে মেরে ফেলে ও ছ’জনকে আহত করে। অ্যামেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ইহুদি গোষ্ঠীর ওপর এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আক্রমণ।

[6]২০১৬ সালের চোদ্দই জুলাই সন্ধেবেলায় একজন তুনিশীয় ট্রাক ড্রাইভার নীসের সমুদ্রতীরে প্রমনাদ দে অঁঙলেতে বাস্তিই দিবস উপলক্ষে উৎসবে মেতে থাকা ভীড়ের মধ্যে দিয়ে ট্রাক চালিয়ে নিয়ে গিয়ে ৮৬ জনকে মেরে ফেলে, আহত করে আরো ৪৫৮ জনকে। 

[7]২০১৫ সালের তেরোই নভেম্বর রাত্রে প্যারিস ও তার উত্তর শহরতলী স্যাঁ দনিতে আত্মঘাতী বোমারুরা ১৩০ জনকে মেরে ফেলে, তার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী বাতাক্লঁ (Bataclan) থিয়েটারেই ৯০ জন মারা যান।   

[8]২০১৯ সালের পনেরোই মার্চ নিউজ়িল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে জুম্মার নামাজ চলার সময়ে ব্রেন্টান হ্যারিসান ট্যারান্ট পরপর দুটো মসজিদে গুলি চালিয়ে ৫১ জনকে মেরে ফেলে ও ৪০ জনকে আহত করে।

[9]১৯৭৪ সালের পঁচিশে এপ্রিল এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চল্লিশ বছরেরও বেশিই সময় ধরে চলা পোর্তুগালের স্বৈরতন্ত্রী সরকারে পতন ঘটে।   

[10]ইনকুইজ়িশানে খৃস্টধর্মীরা “অবিশ্বাসী” ইহুদি আর ডাইনিদের জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারত যাতে তারা পাপমুক্ত হয়ে উদ্ধার পায়। সালাজ়ারের সদাশয় স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাও ঠিক এমনই পাশবিক ছিল, যদি কেউ “বিপথে” চালিত হত তো তাকে মেরেধরে কিংবা জেলে বন্দি করে শোধরানার চেষ্টা চলত।       

[11]১৯৬৭ সালে লিসবন থেকে ১১৫ কিলোমিটার দূরে তরেশ নভায় লিউকেমিয়ায় অসুস্থ ৩৯ বছরের মারিয়া দা কনসেইসাঁও মেন্দেশ অর্তা নামের এক মহিলা বেশ কয়েকবার সিন্যিয়র দুশ পাসুশের (সিন্যিয়র বোঁ জেজ়ুশ) মূর্তিকে কয়েকবার নড়াচড়া করতে দেখে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর তাঁকে ঘিরে একটা কাল্ট তৈরি হয়। তিনি সান্তা দা লাদাইরা দু পিন্যিয়াইরু নামেই পরিচিত হন। প্রতি মাসের প্রথম রবিবার তাঁর তৈরি গির্জায় যে জমায়েত হত তাতে সুদূর মেক্সিকো আর ক্যানাডা থেকেও তীর্থযাত্রীরা আসতেন।  

[12]Dom Sebastião (১৫৫৭-১৫৭৮), পোর্তুগালের দ্বিতীয় রাজবংশ আভিশের শেষ রাজা। অ্যাফ্রিকার আলকাসের-কিবিরে “অবিশ্বাসী”-দের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। যেহেতু তাঁর দেহ পাওয়া যায়নি তাই আজও অনেক পোর্তুগিজ বিশ্বাস করেণ যে তিনি এখনো বেঁচে আছেন আর পোর্তুগালের ঘোর দুর্দিন এলে তিনি কুয়াশার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দেশকে উদ্ধার করবেন।    

[13]PIDE – সালাজ়ারের  শাসনব্যবস্থার গুপ্ত পুলিশ, নাৎসি গেস্টাপোর মত।  

[14]এখানে পোর্তুগালের বাকি উপনিবেশগুলিকে বোঝান হচ্ছে, যেমন ভারতের গোয়া-দামান-দিউ, চিনের মাকাউ আর অ্যাফ্রিকার কাবু (কেপ) ভের্দ, গিনে-বিসাউ ও সাঁও তোমে ই প্রীন্সিপ। 

[15]Acordo ortográfico 1990 – ব্রিটেনের আর অ্যামেরিকার ইংরেজির বানানে যে প্রভেদ আছে সেই ধরণের প্রভেদ  ব্রেজ়িল আর বাকি পোর্তুগিজ়ভাষী অঞ্চলের (পোর্তুগাল ও অ্যাফ্রিকায় তার পাঁচটি ভূতপূর্ব উপনিবেশ) মধ্যেও আছে। একটা সমতা আনার জন্যে ১৯৯০ সালে সব কটি দেশের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। সরকারি নথিপত্রে এই চুক্তি মেনে বানান লেখাটা বাধ্যতামূলক। 

ক্রমশ…

Rita Ray
ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *