ভাঙা ভাঙা ছবি কিংবা, বাতিল মানুষের স্বপ্ন – শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

বাংলা English

১) অশ্ব-মেয়ে

এখন যে—

মেয়েটির কথা বলব, তার স্বপ্নে কোনদিন মানুষের ছবি ভাসেনি। সে গন্ধ পায়। শব্দ শোনে। বুঝতে পারে স্পর্শ। ঘুমের ভিতর স্পষ্ট বুঝতে পারে কে তার শরীরের কোন অংশ ছুঁয়ে থাকে। কিন্তু দেখতে পায় না। যেমন করে চোখে দেখা লোকেরা দেখতে পায়, স্বপ্নের সিরিয়াল, ঘুমঘুম বিছানায় শুয়ে। কেননা মেয়েটির দুটো চোখই নেই। সম্পূর্ণ অন্ধ সে, সেই জনমইস্তক। তবু তার চোখ-না-থাকা চোখের-গর্তের-অন্ধকারে ঘুম আসে। আশ্চর্য স্বপ্নও!

 একদিন সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে, মৃত্যুর স্বপ্ন দেখছিল। নিজের নয়। পাশের বেডে, শুয়ে থাকা এক বৃদ্ধের। লোকটা খুব নীচু স্বরে, ভাঙা গলায়—একে ওকে তাকে–ডেকেছিল, কিছুক্ষণ। বাতাস নিয়েছিল খুব জোরে জোরে শব্দ করে, কিছুক্ষণ। তারপর সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার আগে যে শব্দটা করেছিল সেটা বলে বোঝানো যাবে না। বর্ণনাতীত।

পরেরদিন মেয়েটি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জেনেছিল, পাশের বেডের সেই লোকটা মরে গেছে, গতরাত্রে। তবে কি সে স্বপ্ন দেখেনি। সত্যিই ঘটনাটা ঘটছিল তখন। আর মেয়েটা শুয়ে শুয়ে শুনতে পাচ্ছিল লোকটার স্বর-শব্দ-আদাড়ি-পিদাড়ী। কে জানে! এই রহস্যের সমাধান হয়নি আজও।

আমরা শুধু জানি, অশ্ব মেয়ের— স্বপ্নের স্মৃতিতে ঐ বুড়ো লোকটি আজও মৃত্যুর ভূমিকা পালন করে। আর সেদিন ঠিক এই স্বপ্নটার কোনো কোনো ভাঙা-ভাঙা-ছবি, মেয়েটি দেখে—ও বিশ্বাস করে, আজও করে—ওর জগতের কাছে-দূরে কেউ না কেউ মারা যায় তখন।

..

২) ফুটের কিশোরী

মা, কাগজকুড়ুনী। কিশোরী মেয়ে ইন্ডিয়ার অনাথ আশ্রমে থাকে। মা, পারাপার করেন। ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশে। দুইপাড়েই তার আপন-জনেরা রয়েছে। রয়েছে ঘর-সংসার-সন্তানেরা। বহুদিন বহুরাত, মায়ের হাত ধরে মেয়েও হেঁটেছে— বর্ডার টপকেছে। দেখেছে সেসব নরকের লোকেদের। দেখেছে চোরা-গোপ্তা সেসব লুকোনো পথের কারবারীদের। পুলিশদের। মস্তানদের। একরত্তি মেয়ে কথা কয়নি কোনদিন পথে প্রান্তরে। চুপ করে থেকে থেকে শুধু দেখেছে। আর মায়ের হাতের আঙুল ধরে রেখেছে শক্ত করে।

এখনো চোখ বুজলে সেই সমস্ত শৈশবের নরকের পথঘাট এক এক দিন তুমুল-ঢেউয়ের মত উচ্ছ্বাসে জেগে ওঠে—শান্ত মশারির-সমুদ্রে। এই দেশহারা ছিন্নমূল মেয়েটি দেখেছিল—স্বপ্নে একদিন, বর্ডারের পুলিশেরা তার মাকে উলঙ্গ করে সার্চ  করছে আর বলছে—

‘বাংলাদেশের লোক হলে, গাও দেখি— ‘আমার সোনার বাংলা’। মা পারছে না মনে করতে গানের লাইন। লোকেরা দাঁড়িয়ে দেখছে, বুড়ী উলঙ্গ মাকে! মনে পড়ছে না— মনে পড়ছে না মায়ের গানের কথাটা কিছুতেই। হঠাৎ গেয়েউঠল সেদিনের সেই মায়ের আঙুল ধরে থাকা বালিকা নাকি কিশোরী— চিৎকার করে প্রতিবাদের মত,  কাঁদতে কাঁদতে—

“মরি হায়, হায় রে…

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস,

আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি

আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি—“

তারপর থেকে সারাজীবন ধরেই মাঝেমধ্যে মধ্যরাত্রে ঘুমের ঘোরে আজও মেয়েটির চিৎকার করে ওঠে , গা,– ‘মা’ –গা!—

‘মরি হায়, হায় রে…’!

..

৩)  ফেল-করা ছেলে

ঘুমের ঘোরে কথা বলে অনেকেই। স্বপ্নেদেখা কথোপকথন কখনও কখনও স্বপ্নের মধ্যেও শব্দ ছাপিয়ে বাইরে চলে আসে এতদূর যে স্পষ্ট শোনা যায় যেন, কার সাথে কি কথা হচ্ছে। এসব জানা অনেকেরই। কিন্তু আমি একজন ফেল করা বাতিল ছেলের কথা জানি যে অসময় স্বপ্ন-সংগ্রহ করত রাত জেগে জেগে। তখন টেপরেকর্ডারের যুগ। আর ওদের বাড়ির প্রায় বড়রা অনেকেই ঘুমের ঘোরে চলাফেরা করেন, হাঁটেন, কথা তো বলেনই। তো সেই ছেলেকে যে সমস্ত বড়রা বকাবকি করত— ও তাদের স্বপ্ন দেখার সময় কথাবার্তাগুলোকে চান্স পেলেই– টেপ রেকর্ডারে ধরে রাখত।

এমনি করে বেশকিছু মাসের পরিশ্রমে, তার হাতে জমা পড়ল বড়দের অনেকের গোপন-অপরাধের জগতের কথা যেমন— বাবা বলেছেন স্বপ্নে, ‘আজ তিনি বিকেলেই ঘুষ নেবেন, সন্ধ্যে হলে চলবে না। দাদা– জানিয়েছে বন্ধুকে, ‘কলেজ পালিয়ে সে সিনেমা দেখতে যাবে’, দিদি পল্টুদার সাথে দুষ্টুমি করে। মা, বাবার পকেট থেকে টাকা তুলে নেয় ইত্যাদি প্রভৃতি ইত্যাদি অনেকের অনেক অপ্রকাশিত আত্মার কথা, সেই ফেলকরা ছেলের সংগ্রহে এসেছিল।

একদিন ফাঁস হয়ে যায় সেসব কথা। প্রথমে বড়রা গুরুত্ব দেয়নি। পরে রেগেছেন। মারধর করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন এমন মারতে মারতে যে সেই বাতিল ফেল করা ছেলেটি সেই ঘটনার কিছুদিন পর, বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় নিরুদ্দেশে। ক্লাস এইটের ছেলের স্বপ্ন খোঁজা শেষ হয় এভাবেই।

..

৪) কানের-পা

হা-ঘরেরাই ঘরের স্বপ্ন দেখে ফুটপাথের ছেলেমেয়েরাই সবচেয়ে বেশি আঁকে ঘরের-ছবি। সুন্দর বাড়ি।সুন্দর বাগান। সুন্দর টিপটপ দালান। কিন্তু তাই বলে, যে ছেলের পা-নেই! হাঁটুর নীচের থেকে পোলিওর কারণে— শুরু হতে হতে অসীম-শূন্য-একটা পাটকাঠির মতো হয়ে রয়েছে জীবনভর— সেও কি স্বপ্ন দেখে নতুন পায়ের! বিজন দেখেছিল সে পুরস্কার পাচ্ছে—একটা নতুন পা। এক পায়ে ফুটবল খেলে, সে চমকে দিয়েছে সকলকে। তাই আরেকটা পা উপহার দিচ্ছে তাকে, উদ্যোক্তারা। তারপর বিজন সেই নতুন কাঠের পা টাকে লাগিয়ে নিয়ে দৌড়চ্ছে। সকলে হাততালি দিচ্ছে। হাততালির শব্দে শব্দে, বিজন স্পষ্ট বুঝতে পারছে, ‘কাঠের পা’ টায় রক্তমাংস লেগে জ্যান্তমানুষের পায়ের মত হয়ে যাচ্ছে। বিজন দৌড় থামিয়ে দেয়। এদিক ওদিক তাকায়— তারপর একটা চিমটি কাটে নতুন পায়ে। ‘উফ্ফ্! জ্বালাতন’। চিৎকার করে ওঠে বিজনের নতুন বউ। বিজনের ঘুম ভেঙে যায়। বাতিল অসহায় অপরাধীর মত বিজন বসে থাকে, ঘুম থেকে উঠে।

নতুন বউ জিজ্ঞাসা করে—‘কি হল? বলো কি হল? আমায় চিমটি কাটছ কেন এত রাতে?

বিজনের সরু লিকলিকে পা-টা ভয়ে কাঁপতে থাকে, কাঁপে ভিতরের অন্ধকারে, একা একা।

..

৫) বাতিল-বুড়ো

আজকাল,

বন্ধুদের সাথে দেখা হয় তার—স্বপ্নে। এমনিতেই লকডাউন।বিশ্বজুড়ে। স্বপ্ন নাকাল। বাইরের জগতে, প্রবেশ নিষেধ। তাছাড়া বয়সটাও মরমর সীমানার কাছাকাছি বলে, বাড়ির লোকেরাও চোখে চোখে রাখেন লোকটাকে। রিটায়ার করে যাবেন আর কয়েকমাস পরেই বোধহয়। তাই সরে থাকতে থাকতে, একা থাকতে– মোবাইলে, হোয়াটসঅ্যাপে, ফেসবুকে নিজের সঙ্গে আর নিজেকে নিয়ে খেলা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন যখন–ঠিক সেই সময়ে ঘুম আসে ওঁর।

দিন নেই রাত নেই, সময় নেই অসময় নেই— জ্যোতির্ময় ঘুমায়। ঘুমাতে সে ভালোবাসে। কেননা ঘুমের মধ্যে থাকলে অনেকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। এমনকি যে সমস্ত বন্ধু-বান্ধবীরা মারা গেছেন ছেড়ে গেছেন বহুদিন কোনো যোগাযোগ নেই—ইচ্ছে করলেই জ্যোতির্ময় সেই স্বপ্নের ভুবনে সকলকে পেয়ে যান বলে স্বপ্ন দেখার নেশায়, তিনি কেবলই ঘুমের ভিতর ঘুমিয়ে পড়তে চান।

এমনিতে সে দরিদ্র। অসফল। ব্যর্থ বলা চলে। জীবনের খেলায় সকলের থেকে সে পিছিয়ে পড়েছে কখন কেমন করে তা সে নিজেও বুঝতে পারে না ভালো। তবু তার মজা লাগে– ভালো লাগে গর্বও হয় যখন সে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের লোকেদের বলে—‘জানো! আজ স্বপ্নে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে দেখা হল।‘ কিংবা শঙ্খ  ঘোষ এসেছিলেন আমার ঘরে, আজ স্বপ্নে দেখেছি তাকে। কত কথা বললেন। এমনি করে ধরলে জ্যোতির্ময়ের স্বপ্নের খাতায় এ পর্যন্ত বহু সফল নামীদামী মানুষেরাই এসেছেন। তাদের মধ্যে কে নেই! শিল্প  সাহিত্য শিক্ষা ক্রীড়া রাজনীতি বিনোদনের জগতের অনেকেই রয়েছেন। ভাবলে আশ্চর্য লাগে— এই হতদরিদ্র জ্যোতির্ময়ের স্বপ্ন দেখার অসুখের মধ্যে এত সব মানুষ নিত্য আসে যায় কি করে! তবে কি জ্যোতির্ময় সত্যি অসফল নয়!

..

৬) এরোপ্লেন-ঠাকুমা

বৃদ্ধাশ্রমের একা একা আশালতা দেবীর স্বপ্নে প্রায়ই একটা এরোপ্লেন আসে। আর সেই প্লেনটা দেখামাত্রই, তিনি বিছানায় ধড়মড় করে উঠে বসেন। বসেই থাকেন। ঘুম আসে না কিছুতেই। ঘটনাটা হল— আশালতা দেবীর ছেলে একবার এয়ারপোর্টে  মা’কে বসিয়ে রেখে, উড়ে গেছে বিদেশে। যাবার আগে মায়ের সেবার  শেষ সম্বল যা ছিল যেটুকু  ছিল নিয়ে গেছে, এমনকি ভিটেমাটিও বেচে দিয়ে গেছে। মাকে নিজের কাছে নিয়ে যাবে তাই ওসব রেখে কি লাভ। মা ছেলের কথা বিশ্বাস করেছিলেন শেষমেশ কলকাতা পুলিশের সহায়তায় এই বৃদ্ধাশ্রমের আরো অনেক বৃদ্ধার সাথে কিংবা বাতিল মায়েদের সাথে, তার  জায়গা হয় এক প্রকার মাথা গোঁজার। সেও অনেকদিন হল। এখন দিব্যি আছেন এখানে। সকলের সাথে। শুধু— বিকেলবেলা ঘরের জানলা দিয়ে বাচ্চাদের খেলা করতে দেখলে পাশের মাঠে, উনি নাকি দেখতে পান, অনেকগুলো এরোপ্লেন মেঘের মত উঠছে নামছে পাক খাচ্ছে… গা গুলিয়ে ওঠে ওর… উনি সরে চলে যান। স্বপ্ন-বাস্তব গুলিয়ে যায়। আশ্রমের লোকেরা তাকে এরোপ্লেন-ঠাকুমা বলত। বাতিল ঠাকুমাদের স্বপ্নে— নাকি সন্তান সন্ততিতের কথা থাকবেই। কিংবা স্বদেশ। অর্থাৎ দেশ-গাঁয়ের কথা। সত্যি নাকি! কে জানে! ঠাকুমারা তেমনই বলেন শুনেছি।

..

৭) শ্রমিক নাথুরাম

নাথুরামের স্বপ্ন ছিল খুনের। না, গান্ধীকে নয়। এই নাথুরাম জুটমিলের শ্রমিক। সে চেয়েছিল মালিকপক্ষের একটা লোককে খুন করতে। যে লোকটা তাকে নেশা ধরিয়েছে। যে লোকটা তার বউকে  নিয়েছে। যে লোকটা মিলের ছাঁটাই খাতায় নাথুরামের নাম তুলে দিয়েছে। যে লোকটা ধর্মের দোহাই দিয়ে নাথুরামকে এ দেশছাড়া করতে চেয়েছে বহুবার। যে লোকটা একটু একটু করে শুষে নিয়েছে লেবার নাথুরামকে শুধু আদাব এর মুখে সুদে-ঋণ দিতে দিতে। যে লোকটা নাথুরামের লিডার ছিল। যে লোকটাকে নাথুরাম দেখেছে একদা লালপতাকার নীচে বক্তৃতা দিতে। তেরঙ্গার নীচে বক্তৃতা দিতে। তারপর গেরুয়া পতাকার নীচে— তারপর—। নাথুরাম স্বপ্ন দেখে প্রতিদিন নিয়ম করে। খুনের স্বপ্ন। ওই লোকটার সাথে দেখা হয়। নাথুরাম তাকে গুলি করে। লোকটা মরে যায়। রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন স্তব্ধ হয়ে দেখে দূরে দাঁড়িয়ে। নাথু চলে যেতে যেতে সময়টা  পিছন ফিরে দেখে। লোকটা নেই। রক্ত নেই। লোকজন নেই। নাথু ভয় পায়। মৃত্যুভয়। ঘুম ভেঙে যায়। নেশার–ঘুম। নাথু বাংলা মদের ঠেক থেকে উঠে চলে আসে— বন্ধ পার্টি অফিসের সামনে।

কেউ নেই। কেউ থাকে না। তবু নাথু একবার দূর থেকে আড়াল থেকে দেখে—লোকটা আছে কিনা! তারপর টলতে টলতে টলতে টলতে রাস্তার পাশের নর্দমার রাজনীতি বাঁচিয়ে চুপচাপ নিজস্ব ডেরায় ঢুকে যায়। স্বপ্নটাকে ভালো করে পাবে বলে। আরও একবার।

..

Subhasish Gangopadhyay
শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায় থিয়েটারের সর্বক্ষণের কর্মী। নাটককার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক। দৃষ্টিহীনদের দিয়ে নাটকের কাজ করাচ্ছেন অনেকদিন। ছোটোদের সঙ্গে থিয়েটারের কাজে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। “অন্যদেশ’ নাট্যদলের নির্দেশক। উল্লেখযোগ্য কাজ গুলি হল রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী, রাজা, মনসামঙ্গল, অর্কেস্ট্রা, যখন অন্ধ প্রকৃতি চণ্ডালিকা, যখন ডাকঘর আছে অমল নেই। শুভাশিস কাব্য নাটক লিখেছেন অনেকগুলি। প্রকাশিত বই এর সংখ্যাও বেশ কয়েকটি। বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *