তিমির- নাহার মনিকা

বাংলা English

আমার চোখ তিমিরের দিকে পড়লো, না কি তিমিরের চোখ আমার দিকে সে তর্কে কি ফল? আমরা দু’জন দু’জনকে দেখেছি, আর আমাদের দু’জনকে দেখে চারপাশ গুটিশুটি মেরে ছোট হয়ে এসেছে। এত ছোট যে সেখানে কেবল দু’জন মানুষই আঁটে। ফলে রিয়াজ সঙ্গে থেকেও থাকা যাচ্ছিল না।  

অথচ ওকে বাইরে রাখাও অসম্ভব ছিল।

এ অবস্থা কিছুদিন আগের। এই কিছুদিন কিন্তু অনির্দিষ্ট কালের মত দীর্ঘ। নিজেকে নিয়ে এমন অস্থিরতা তৈরী হয়েছিল যে মনে হতো হাতের তালুতে কেউ পেরেক মেরে দিয়েছে। অতিন্দ্রীয় পেরেকের এফোঁড় ওফোঁড় করা ব্যথা অথচ রক্তপাত নেই। তারপর যেদিন ওই অদৃশ্য ক্ষরণ দৃশ্যমান হতে শুরু করলো আমরা বদলে গেলাম। 

শহর ভাসিয়ে মূষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।

আজকে যেন বহুকাল বাদে জলপতনের শব্দ শুনছি। যেন বিশালাকার কোন প্রপাতের সামনে দাঁড়িয়ে তিমিরের ঝাঁপিয়ে পড়া দেখছি। সুখী মুখ, উদ্বেল দুই বাহু ছড়িয়ে আমাকেই যেন ডাক পেড়ে যাচ্ছে।

জল প্রপাত নিয়ে এমন একটা স্বপ্নের কথা বলতো তিমির।

পানির শব্দের কি দু’রকম অর্থ হয়! কিন্তু এই মুহূর্তে হচ্ছে।

রিয়াজ শাওয়ার নিচ্ছে। শোবার ঘরের লাগোয়া বাথরুম, এই বাসায় সূচ পতনের শব্দও শোনা যায়, শাওয়ার থেকে পানি পড়া তো সে তুলনায় সহস্রগুণ। শুনতে পাচ্ছি একটা সুখ সুখ রিনিঝিনি আওয়াজ, আর বাইরে বৃষ্টি একটানা অশ্রুবর্ষণ।  

রিয়াজ গোসল করতে ঢুকেছে ঝাড়া বিশ মিনিট। আমি একবার সুখের শব্দ পাই তো আরেকবার একঘেয়ে মন খারাপের সুর। বাথরুমে শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকার মানুষ সে না, ঝটপট সাবান মেখে, ঝপাঝপ পানি ঢেলে টাওয়েলে মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসে। আজকে সময় লাগছে। না কি ইচ্ছে করে লাগাচ্ছে?

বাথরুম কি রিয়াজেরও নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার জায়গা? হতে পারে। সব বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরই নিজের মুখোমুখি হওয়ার জন্য বিশেষ সময় এবং স্থান থাকে বলে শুনেছি।

তিমিরের নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার জায়গাটা নাকি আমি। একথা বললেই আমি তক্কে তক্কে থাকার মত করে জানতে চাইতাম- ‘যখন আমি ছিলাম না, তখন?’

-‘তখন বোঝাপড়ার দরকার হতো না’- দু’হাতের মধ্যে বাতাস ধরার মত ভঙ্গী করে সে বলতো।

টবে চন্দ্রমল্লিকা লাগিয়েছিলাম, ঝেঁপে ফুটেছে। বারান্দার গ্রীলে একটা পাখি এসে বসলো, ডানা ভেজা। চড়ুই কিন্তু আরো ছোট। এটা কি বসন্ত বাউড়ি? চড়ুইদের মধ্যে কি বামন পাখি থাকে! পাখিটা টুইট টুইট করে ডাকছে। নয় তলায় এত ওপরে উড়ে আসতে হয়েছে! পাখিটাকে খাবার দিতে ইচ্ছে করছে। কি দেই, মুড়ি ছুঁড়ে মারবো ভেতর থেকে, বিস্কুট? ঠোঁট এগিয়ে ধরতে পারবে? কাছে গেলে তো উড়ে যাবে। কাছে গেলে উড়ে যাওয়া নিয়ম! আমি কি রিয়াজের জন্য পাখি গোত্রীয়? তিমিরের জন্য না। আমি তবে উভয়চর প্রানী গোত্রের। আমি তাহলে উদবিড়াল, ব্যাঙ অথবা কচ্ছপ!

ঘরের লাগোয়া বারান্দার দিকে মুখ করে বসে আছি, রকিং চেয়ারে। কিন্তু আমি দুলছি না। মনোযোগ দিয়ে পশু পাখির কথা ভাবছি, অথচ আমার ভাবা উচিত অন্যকিছু। যেমন, রিয়াজ যখন বেরিয়ে আসবে, তখন ওকে কিভাবে বলবো যে আমিও ওর সঙ্গে যেতে চাই। অথবা, অপেক্ষা করা যে ও আমাকে সঙ্গে যেতে বলবে। আগে থেকে তৈরী হয়ে নেবো? বুঝতে পারছি না। অতি আগ্রহ, না কি অনাগ্রহ কোনটা দেখানো শোভন হবে!  শোভন-অশোভন ভাবছি, কিংবা ভাবতে পারছি, এতে নিজেকে বোতলের বাইরের পানীয় বলে মনে হচ্ছে। বাস্তচ্যুত, ভেসে বেড়ানো তরল।

বিকেল মরে আসছে। আমাদের এপার্টমেন্ট পশ্চিমমুখী, সূর্যের আলো অল্প অবশিষ্ট আছে। ছায়া ছায়া অন্ধকার সে আলো গায়ে মেখে নিচ্ছে। আমি জানি, রিয়াজ বেরিয়ে পাঞ্জাবী পরে নেবে। শাদা। কোলাপুরি স্যান্ডেল খুঁজবে জুতোর তাকে। এ সব সময়ে এ দস্তুরেই পোশাক বাছতে হয়।

ইদানিং তেমন শাড়ি পরা হয় না, বলে অধিকাংশ শাড়ি স্যুটকেসে ভরে রেখে দেই। স্যুটকেস খুলে শাড়িটা বের করে আনলাম। সেই সেদিন পরার পর থেকে শাড়িটা ধুইনি। ভাঁজ খুলতেই সর্বগ্রাসী নিজস্বতা নিয়ে ওই দিনটা আমার ওপরে ঝাপিয়ে পড়লো। সেদিনের রং আর স্পর্শ চোখ বন্ধ করলেই শুষে নিতে পারি, যেন আমি দিব্যি একটা ব্লটিং পেপার। আরো সব দিনের হাজার হাজার মুহূর্ত বানভাসির মত আমাকে তলিয়ে ফেলে। খাটের পাশে মেঝেতে বসে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখি। চারপাশের জ্যান্ত বাস্তব থেকে যদি কিছুটা নিস্তার মেলে।

দরজা খোলার শব্দ হয়, আমি ঝটিতি শাড়িটা খাটের নিচে চালান করে দেই। তারপর খুব কেজো ভাব নিয়ে আলমারি খুলে একটা কালো শাল বেছে রাখি। অল্প শীত পড়ছে। শাড়ি না পরলেও চলে, শাদা কুর্তা চলতো। কিন্তু শাদা জামদানীর ওপরে নীল বুটি তোলা শাড়ি ছাড়া কি করে হয়! তিমির তো আমাকে দেখতে পাবেই। যে যত যাই বলুক না কেন, আমি বিশ্বাস করি না যে ও দেখবে না।

আচ্ছা, রিয়াজ আমাকে ওর সঙ্গে যেতে বলবে তো! যদি না বলে?

আমাদের দেখা হওয়ার দিন এ শাড়িটা পরেছিলাম।

বিয়ের কথাবার্তা পাকা হলে দুই বাড়ি থেকে দেখা সাক্ষাৎ, বাইরে বেরুনো নিয়ে নিষেধাজ্ঞা নেই। রিয়াজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে এটাই দস্তুর। বলেছে- আমি যেন বিয়ের আগেই ওর বন্ধুদের দেখি। তাতে করে ওকে আরো বেশী করে বুঝতে পারবো। ভালো যুক্তি।

আমার নানু বলতো-সঙ্গদোষে লোহা ভাসে। রিয়াজ কাদের সঙ্গে নিজের অবসর সময় ভাগ করে জানা থাকা দরকার। সাতাশ বৎসর বয়সে পৌঁছে আমি তো আর আবেগ দিয়ে চলতে পারি না! সম্মন্ধ করা বিয়েতে সব যাচাই করে নেওয়া ভালো। কিছু কিছু দ্বিধা ততদিনে আমি কাটিয়ে উঠেছি। রিয়াজের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহ ছিল।

তিমিরকে দেখতে আমার নাকি এত দেরী হওয়ার কথা না। ওকে ছাড়া রিয়াজের না কি আমার সঙ্গে দেখা করারই কথা না। শুধু তার কুট্টিকালের বন্ধুটি ছ’মাসের ট্রেনিং এ দেশের বাইরে থাকায় দেখা মেলেনি। এখন সে সদ্য ম্যানিলা ফেরত। আমাদের দেখা হবে শুক্রবার বিকেল পাঁচটায়। স্থান- জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের চত্তর। ওদের বন্ধু ঐ জায়গা নির্বাচন করেছে। হবু স্ত্রী’কে নিয়ে এমন একটা ভীড়ের জায়গা বেছে নেওয়ায় আমি যে অবাক হচ্ছি, রিয়াজ বুঝতে পেরে বলে- ‘তিমির এই জায়গা সিলেক্ট করলো, বললো- ভীড়ভাট্টা দিয়ে শুরু হোক, ফুটপাতে সস্তার চা খেয়ে পরে আড়ং এর ক্যাফেতে চটপটি, তারপর র‍্যাডিসনে বসে কফি খাবো’।

হুম, আইডিয়া মন্দ না। কিন্তু তিমির লোকটাকে কিপটা মার্কা লোক মনে হচ্ছে। এসব কথা রিয়াজকে বলার প্রশ্ন ওঠে না। একমনে অনামিকার আংটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখি, সোনালী রিংএর ওপরে চৌকো হীরে। আংটিটা আমার সঙ্গে রিয়াজের সম্পর্কের সেতু।

রিয়াজ তাদের বন্ধুত্বের কীর্তিকান্ড বলে চলে। কি করে ক্লাস লেকচার নোট করে সেই নোট মেয়ে বন্ধুদের দিয়ে তাদেরকে পটানোর চেষ্টা শুরু করতো, তিমির সেখানে সব সময় উদাসীন, অথচ মেয়েরা তার সঙ্গেই কথা বলার জন্য উজিয়ে থাকতো।

কি সে সম্মোহন যা তিমির নিজের চারপাশে ছড়িয়ে রাখতো? কে জানে, উদাসীনতাই হয়তো। রিয়াজ নিজেই উত্তর দেয়।

শুধু, আমার কাছে এসেই না কি নিজের উদাসীন ভাব ধরে রাখা দুস্কর হয়েছে। তিমির স্বীকার করেছিল।

তাতে আমার ভেতরে ফুলের ঝাড়ের মত একটা গাছ বিরাট হয়েছে।  তার নাম অহংকার বলবো না, তবে  কাছাকাছি কিছু তো নিশ্চয়ই।

সেদিন অল্প সেজেছিলাম। নীল কল্কার সাদা জামদানী, রূপার চুড়, লিপষ্টিক।

রিয়াজ অস্থির হচ্ছিল। তিমির দেরী করছে। সন্ধ্যা আগে আগে সবুজ ঘাসের মাঠ কোমল ফুলকো হয়ে ফুটে আছে। রিয়াজ আমার চোখে চোখ রাখার বদলে ফোন করছে, এক কানে হেডফোনের বোতাম গোজা। আমার তখন কিছু মনে হয়নি। চোখে চোখ রাখার কথা মনে আসেনি। চোখে চোখ রাখার জন্য সারাজীবন পরে আছে। কোন অভিমান বোধ হয়নি, সদ্য বিয়ে ঠিক হওয়া লোকের ওপরে এসব অনুভব আসে না।

আশপাশ দিয়ে লোকজন কলকল করে কথা বলে চলে যাচ্ছে। তাদের পাশ কাটিয়ে লাফিয়ে রিক্সা থেকে নামতেই একজনকে দেখে রিয়াজ উঠে দাঁড়িয়ে গেল। আমি বসে থাকবো, নাকি ওর মত দাঁড়িয়ে যাব বুঝতে পারছিলাম না। ছেলেরা সম্মান দেখিয়ে দাঁড়ায়, মেয়েদের কি দাঁড়াতে হয়?

তিমির সামনে এসে একটু ঝুঁকে দাঁড়ালো। ওর কাঁধের দুপাশে উঁচু হয়ে থাকা ভঙ্গীটা বলে দেয়, সে দৌড়বিদ। ইন করা শার্টের মধ্যে বেহিসেবী একটা মন গুজে চলে ফিরে বেড়ায়। আমার চট করে মনে হলো- এই লোকের ওপরে অভিমান করে না খেয়ে থাকা যায়।  

আমি বসে থেকেই হাসিমুখ বানাই। নিজের মুখটাকে উর্ধ্বমুখী করতে করতে টের পাই যে আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। মানে যতটা দেখানো দরকার তার থেকেও বেশী।  

তিমিরের তীর্যক চোখ আমার মুখের দিকে এসে মুহূর্তে দিকবদল করে ফেললো। তারপর রিয়াজের সঙ্গে কি সব হাবিজাবি বলতে শুরু করলো। ওর হড়বড় করা কথার তোড়ে রিয়াজ সুযোগই পাচ্ছে না আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার, অথবা আমার পাশে আবারো বসে পড়ার। 

তারপর হঠাৎ কথা থামিয়ে তিমির হাঁটু গেড়ে আমার পাশে বসে পড়ে। সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলে -,‘মেয়েদের পরনে সাদা শাড়ি দেখলে আমার কতকিছু এক সঙ্গে মনে পড়ে!’

হবু বন্ধুপত্নীর সঙ্গে প্রথম দেখায় এ কি ধরণের কথা! প্রতিউত্তরে আমার কি বলা উচিত- ‘কি কি মনে পড়ে?’ তখন যদি উল্টোপাল্টা কিছু শুনতে হয়! কিন্তু চুপ করে থাকাও তো ভালো দেখায় না।

আমি একটা হাসি দিয়ে বুঝি চেহারায় বোকা ভাব চলে আসছে। রিয়াজের ওপরে ওপরে রাগ হয়। দাঁড়িয়েই আছে কেন। দাঁড়িয়ে আছে হয়তো প্রায় মিনিটখানেকও না, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে দীর্ঘ সময়। কেন বসছে না আমার পাশে, তাহলে তিমিরের এই ভেতর হননকারী চাউনি থেকে নিস্তার পেতে পারি।

মূহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যে মনে হলো, না রিয়াজ দাড়িয়েই থাকুক। তিমিরের দৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিতে ভালো লাগছে। সর্বাঙ্গে মেখে নিতে ইচ্ছে করছে ওর মুগ্ধ চোখ। আমি মুখরা নই, তবে গুটিয়ে থাকাও নই।   

বলি-‘আমার শাড়িতে নীল নীল বুটি আছে। এটা শরতকালের আকাশের রং। আর শুধু সাদা শাড়ি দেখলে মেয়েদের ওপর অত্যাচারের কথা মনে পড়ে? প্রাচীনকালের অত্যাচার তো এখনো শেষ হয়নি, সাদা শাড়ির বাইরে রঙ্গিন শাড়িতেও চলছে’।

কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে যায় তিমিরের ঠোঁট। তারপর মাথা উঁচু করে। -বাব্বাহ! রিয়াজ দোস্ত, তোর কপালে সুখ আছে। বুদ্ধিমতী’।

আমার দিকে ফিরে স্বর নিচু করে বলে-‘ সত্যি বলতে, আজকে এখন এই মুহূর্তে টের পেলাম যে শাদা শাড়ি যারপরনাই প্রিয়। দেখলে মাথা ঠিক থাকে না। মাথাকে যথাস্থানে রাখার জন্য এই এসব কথা বলছিলাম’।

রিয়াজ হাঁটুমুড়ে বসে এবার। চোখে তৃপ্তি। বন্ধুকে হবু বউ দেখিয়ে সন্তষ্ট। যেন তিমির অনুমতি না দিলে বিয়েটা হবে না।

দুপুরবেলার ছায়া ছায়া শান্ত পুকুরের মত গভীর তিমিরের চোখ সটান আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আবার দাঁড়িয়ে রিয়াজের সঙ্গে কথা বলে।

আমি পুকুরে তলিয়ে যাচ্ছি। আমার চোখেও বিশেষ চাউনি তৈরী হচ্ছে, নিজেকে না দেখেই টের পাই।

আমাদের বিয়ের দিন তিমিরের দাপানো জ্বর। রিয়াজের বরযাত্রী আসতে অনেক দেরী করলো। 

…………

কোনমতে ঠেলেঠুলে দিন পার করি। সোমবার সকাল হলে অফিস যাই, গিয়ে বিকেলের অপেক্ষা, বিকেল হলে বাসায় ফিরে রাতের অপেক্ষা, রাতে জেগে থেকে ভোরের অপেক্ষা। এই করে করে সপ্তা গেলে মাস চলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকি। মাসও চলে যায়। কোন কোন ছুটির দিনে রিয়াজ বলে- চলো তিমিরকে দেখে আসি।

আমি ঝটপট তৈরী হই।

-কি নিয়ে যাওয়া যায় বলতো স্বাতী?

রিয়াজের সহমর্মীতা না বোঝার ভান করে তাকিয়ে থাকি।

-মানে ও কি খেতে পারছে জানি না তো!

আমার মুখে কথা জোগায় না। কিন্তু রিয়াজ এভাবে না বললে আমি নানা রকম খাবার পথ্য গুছিয়ে নেওয়ার অস্বস্তি কাটাতে পারবো না।  

আমার আর তিমিরের, মাত্র দু’জনের আঁটসাঁট জায়গাটায় রিয়াজ ঢুকে পড়ছে। এখন বরং বেশ ফাঁকা লাগে সে জায়গাটা। রিয়াজ হেঁটে চলে বেড়ায়, ছোটবেলার মত একপায়ে নুড়িয়ে পাথর কিক মেরে উড়িয়ে অন্য পা দিয়ে ছোট ছোট লাফ দেয়।

আমার কিছু করার থাকে না। বুকের ভেতরে বড় হওয়া ফুলের ঝাড়টা কে যেন প্রতিদিন ছেঁটে ছোট করে দিচ্ছে। 

বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য নির্ধারিত সময় পার করছি আমরা। সময়টা পার হলে আমি তিমিরকে বিয়ে করবো। এক্সিডেন্টটা না হলে এতদিনে সবকিছু কত অন্যরকম হতো।

রিয়াজকে সব খুলে বলতে হয়নি। আঁচ করতে না পারার কথা না। যে কোন বোধবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কাছে আমি ধরা পড়ে যাচ্ছিলাম। তিমিরের সামনে গেলে আমার তলপেটে প্রজাপতি দাপাদাপি শুরু করতো। চোখে ঘোর লাগতো। মাথাঘুরে যে পড়ে যেতাম না সেটাই সৌভাগ্য।

একবার রিয়াজ তিমির দু’জনে গরমে ঘেমে বাড়ি ফিরলো। আমি দৌড়ে গিয়ে তোয়ালে ভিজিয়ে এনে আগে তিমিরের হাতে দিলাম। ওটা না হয় এই বলে কাটানো গেল যে, তিমির অতিথি, অতিথিকে আগে যত্ন করতে হয়। কিন্তু তারপর এক ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে যে শরবত বানালাম, তাতে রিয়াজের গ্লাসে চিনি দিতে ভুলে গেলাম। এসব তো তুচ্ছ বিষয়। রিয়াজ একেবারে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল সেদিন, যেদিন ঘুমোতে এসে আমার গায়ে হাত রাখলে আমি তিমিরের নাম ধরে ডেকে উঠেছিলাম।

আমার তখন বেসামাল দশা। কে টের পেলো আর কে পেলো না, মাথায় আসতো না। আর আমি তো জানাতেই চাই। তিমিরও তাই। কোন রাখ ঢাক নেই। ছুটির দিনে যখন তখন বাসায় বেল বাজাতো। রিয়াজ হয়তো তখন ওর ছাদ বাগানে পেয়ারা গাছের যত্ন নিচ্ছে। আগে হলে তিমির হৈ হৈ করে ছাদে উঠে যেতো, কিন্তু সেসব দিনে বন্ধুর খোঁজ হতো দীর্ঘ সময় পর। রিয়াজ পরে গেটের সিকিউরিটি থেকে ঠিকই জেনে নিতো যে তিমির ঠিক ক’টায় বাসায় ঢুকেছে।

রিয়াজ সুদর্শন, রিয়াজের ভালো চাকরী, নিজস্ব ফ্ল্যাট, রিয়াজ ভালো না কি খারাপ সেসব নিয়ে ভাবার ফুরসত কই? আমি তিমিরে ডুব দিয়ে অরূপ রতনের সন্ধান করি।

আর তিমির? ও বলে যে ওর স্বভাবের বহুমূখী অস্থিরতা একমুখী যে উন্মাদনায় রূপ নিয়েছে- তার নাম স্বাতী।

একদিন রিয়াজ বাইরে থেকে এসে দরজায় থমকে গেল, আমরা দু’জন টের পাইনি। তিমির আট বছর আগে কবিতা পড়ে শোনাচ্ছিল, আর খুলে রাখলে যদি অন্ধ হয়ে পড়ি, সে ভয়ে তিমিরের কন্ঠস্বর শুনলে চোখ বন্ধ করে রাখি। “জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে করেনি কি মাখামাখি, থুরথুরে অন্ধ পেঁচা এসে বলেনি কিঃ বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে” শুনতে শুনতে বিশ্বাস করতে থাকি, এ মুহূর্তের বাইরে আর কোন সত্য নেই। আমার আঙ্গুল তিমিরের হাত ছুঁয়েছিল।

বন্ধুর জন্য নিজের খাঁটি ভালোবাসায় ভেজাল মেশায়নি রিয়াজ। আর আমি তিমিরের দিকে সে পাল্লা ভারী করেছি, সে চুপ হয়ে গিয়েছিল।

আমাদের সামনে পথ খোলা আছে কি নেই ভাবার দরকার দেখিনি।

রিয়াজকে ঠকানো হচ্ছে, কিংবা ওর সঙ্গে প্রতারণা হচ্ছে- তা ক্ষতিয়ে দেখার অবকাশ পাইনি।

তিমির আর আমি শুধু নদীর মত বয়ে চলছিলাম। কখনো অন্তসলিলা, কখনো খরস্রোতা, আর বেশীর ভাগ সময় দু’কূল ভাসানো, উপচানো।

তিমির যেদিন স্কলারশীপের কনফার্মেশন ইমেইল আমাকে ফরোয়ার্ড করলো, তখন দুপুরবেলা।

ঘরের মেঝেতে ছায়া ছায়া আলো। আমি আমার আইনজীবির কাছ থেকে ফিরেছি। রিয়াজের কাছ থেকে বিচ্ছেদ পেতে আইনি প্রক্রিয়াটা সেরে ফেলতে হবে। দ্রুত। রিয়াজ অফিস থেকে ফিরলে এই নিয়ে কথা হবে। আজকে ওর জন্য ভালো করে চা বানাবো।

অবশেষে পশ্চিমমুখী বারান্দায় সূর্য অস্ত গেল। রিয়াজ ফিরছিল না।

মধ্যরাতে যখন ফিরলো, তখন আমার মনে হলো রিয়াজের কথায় ভেজাল মিশে গেছে।

তিমিরের তো এক্সিডেন্ট করার কথা না। কোন গাড়ী বা ট্রাক এসে চাপা দিয়ে যাবে এমন দূর্বল তিমিরকে কখনো মনে হয়নি। তবু এই অবিশ্বাস্য দূর্ঘটনা ঘটেছে। এবং তিমিরের সঙ্গেই ঘটেছে।

আরো অভাবনীয় বিষয় হচ্ছে রিয়াজ, যে কি না দিনের পর দিন হাসপাতালে তিমিরকে দেখভাল করছে। পরিবারে কাছের বলতে ওর প্রবাসী বোন। ফ্লোরিডা থেকে তার পক্ষে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে দেশে এসে ভাইয়ের সেবাযত্ন করা সম্ভব না।

রিয়াজ অফিস থেকে সোজা হাসপাতালে চলে যায়।

যখন বাসায় ফেরে তখনো তিমিরের কি কি লাগবে, সেসবের তালিকা লিখে আমার কাছে দেয়, যেন পরের দিন সব যোগাড় করে রাখি।

তিমিরের প্রতি ওর যত্নে আমি কোন ফাঁক বের করতে পারি না যেখান দিয়ে নিজে ঢুকে পরতে পারি।

বাগড়া দিচ্ছে তিমিরের শারিরীক অবস্থা। ওর মাথার আঘাত গুরুতর। শুরু থেকেই জ্ঞান ছিল না। টানা সতেরদিন যুদ্ধ করলো। আঠারোদিনের দিন লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার প্রস্তাব দিলো ডাক্তার।

রিয়াজই ওর বোনকে ফোন করলো। অনুমতি দরকার। টাকারও দরকার।

আমার টাইটানিক ডুবে গেল। আমি জ্যাককে আটলান্টিকের অতলে তলিয়ে যেতে দেখলাম। ওপরে নিঃসীম আকাশ।

………

আজকে তিমিরের স্মরণ অনুষ্ঠান। ফ্লোরিডা থেকে ওর বোন এসেছে। রিয়াজই সব যোগাড়যন্ত্র করেছে।

আমি শাড়িটা বের করে বসে আছি। রিয়াজ কি আমাকে যেতে বলবে?

আমার পার্সের ভেতর আইনজীবির পাঠানো বিচ্ছেদের লিগ্যাল নোটিশ।

বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে। বারান্দায় পাখিটা উড়ে গিয়েছিল। আবার ফিরে এলো।

বাথরুম থেকেও আর শাওয়ারের শব্দ আসছে না। রিয়াজ হয়তো এখনি বের হবে।

সমস্ত মনোযোগ সেদিকে রেখে পাখিটাকে দেখতে দেখতে আমি অন্যমনস্ক হওয়ার ভান করি।

Nahar Monica
 পরিচিতিঃ 
 নাহার মনিকা লিখছেন দীর্ঘদিন ধরে। 
 কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে নাহার মনিকা’র প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে-
 ‘দখলের দৌড়’ (গল্পগ্রন্থ-২০১৯ পুঁথিনিলয়), ‘মন্থকূপ’ (উপন্যাস-২০১৯ বৈভব)। ‘বিসর্গ তান’ (উপন্যাস-২০১৬ বেঙ্গল পাবলিকেশন্স)।‘জাঁকড়’(গল্পগ্রন্থ-২০১৪ দিব্যপ্রকাশ)। ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের’ (গল্পগ্রন্থ-২০১১ দিব্যপ্রকাশ)। ‘চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(কাব্যগ্রন্থ, ২০০৭, বাংলামাটি প্রকাশন)।
  
 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক এ সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন। 
   

©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.