এক না-রাষ্ট্রের দিবাস্বপ্ন – আখর বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা English

এক না-রাষ্ট্রের দিবাস্বপ্ন

আখর বন্দ্যোপাধ্যায়

“How you cling to your purity, young man! How afraid you are to soil your hands! All right, stay pure! What good will it do? Why did you join us? Purity is an idea for a yogi or a monk. You intellectuals and bourgeois anarchists use it as a pretext for doing nothing. To do nothing, to remain motionless, arms at your sides, wearing kid gloves. Well, I have dirty hands. Right up to the elbows. I’ve plunged them in filth and blood. But what do you hope? Do you think you can govern innocently?”


Dirty Hands, Act V

Jean Paul Sartre

২০২২ সাল। শহর কলকাতা।

রাস্তায় বেরিয়েছিলাম একটু। ভেবেছিলাম গঙ্গার হাওয়া খেয়ে আসি। দম আটকে আসছিলো এই ৩০০ বছরের কংক্রিট আর পিচ-বিটুমেনের জঙ্গলে। হাঁটতে হাঁটতে সিগারেটটা অতিকষ্টে জ্বালিয়ে একবার ধোঁয়া ছাড়লাম। লক্ষ্য করলাম, আশপাশের দেওয়ালে লেখাঃ অমুক চিহ্নে ভোট দিন, তমুক নেতা/নেত্রীকে বিপুল ভোটে জয়ী করুন, কারণ তিনি শ্রমিকের প্রতীক, সততার প্রতীক, উন্নয়নের প্রতীক, কর্মসংস্থানের প্রতীক। দেওয়াল-লিখনের এলোমেলো রঙগুলো- লাল, সবুজ, গেরুয়া— সব যেন মিলে গেল চোখের সামনেই।

এই লেখাগুলো দেখতে দেখতে মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগলোঃ আচ্ছা, এসব পার্টিগুলোর রাজনৈতিক দর্শন ঠিক কি? এরা যা মুখে বলে, সেগুলো কাজে ফলাতে পারে কতটা? এদের অর্থনৈতিক কাজকারবার কি একই ছাঁচের নাকি আলাদা?  

বিরক্ত লাগলো। ভাবলাম, এসব নিয়ে ছাইপাশ মাথা না ঘামিয়ে বরং গঙ্গার ধারেই গিয়ে একটু শান্ত হয়ে বসি, আর বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিই। এই দ্রুততার পুঁজিবাদের যুগে দরকার হয়তো এমনই ক্ষণিকের মানসিক স্থৈর্য।

কিন্তু শান্তি কোথা আছে? গঙ্গার ধারে ক্লান্ত শ্রমিক, পরিশ্রান্ত মাঝিদের ভিড়ে শুনলাম কিছু কথাবার্তা। ওঁরা সামান্য রুটি-তরকারী চিবোতে চিবোতে নিজেদের মধ্যেই কথা বলছেন। কথাগুলো অনেকটা এইরকমঃ

“শালা, এই মালটাকেও তো ভোটে জিতিয়ে কোনো লাভ হলোনা। এও তো ওই এক কাজগুলোই করছে– যে যায় লংকায় সেই হয় রাবণ!”

“গাঁয়ে এর চেয়ে সুখ ছিলো। নিজেরা ফলাতাম, নিজেরা খেতাম। এই শহরে কাজ খুঁজতে এসেই যতো বিপদ ঘটলো…”

“এই বোকাচোদা সরকারগুলো সব এক। ভাল্লাগেনা বাঁড়া।”

“এই উন্নয়ন ব্যাপারটাই একটা বালের কথা। ওদের উন্নয়ন আমাদের ভোগে পাঠাবে।”

শুনে নতুন কিছু লাগলোনা। নিয়মিত অটো-ট্রেন-বাস-মেট্রোতে একই কথাগুলোকে নিয়ে বয়ে চলেছে আমার এই শহর, যার চেহারাটা ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। একমাত্র রেস কোর্সের অঞ্চলটাকে বাদ দিলে, কোথায় আর সবুজের দেখা মেলে? কৃত্রিম, অ-নান্দনিক “পার্ক”গুলোকে বাদ দিয়েই বলছি—- অকলুষিত নিসর্গের পরিসর আর কই?

আর বসলাম না। ঘাটের সিঁড়ি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ির পথের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। একটা বাইক প্রচন্ড হর্ণ দিয়ে আমার পাশ দিয়ে প্রায় হাওয়ার গতিবেগে শোঁ করে বেরিয়ে গেলো। আজ খুব গুমোট। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের ওয়ার্ডের ম্যুনিসিপাল কাউন্সিলরের অফিসটা পেরোলাম। দেখলাম সেখানে চা-চপ-মুড়ি সহযোগে দিব্বি আড্ডা জমে উঠেছে। কি বিষয়ে আড্ডা হচ্ছে তা বুঝলাম না। কোন পার্টির লোক যেন এরা? মনে থাকেনা— তার অন্যতম কারণ হলো যে গত এক দশক জুড়ে আমাদের পাড়ায় যতো বেআইনী ফ্ল্যাট হয়ে জায়গাটার শ্বাসরোধ করেছে, সে সবকটা তৈরি করবার অনুমতি দেওয়ার জন্য প্রত্যেক কাউন্সিলর ভোটে জিতে একইভাবে টাকা নিয়েছেন। সেই টাকা খাওয়ার ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। তাই… খেয়াল নেই আমার কিছুই- কোন পার্টি…। অবশ্য আজ হয়তো এই লোকটা এই বিশেষ পার্টির হয়ে গলা ফাটাচ্ছে, কাল একটা কোনো স্ক্যামে ফেঁসে দল বদল করে নেবে চোখের পলকেই। সাধারণ লোকে খালি হাঁ করে চেয়ে থাকবে। বলতে পারবো না আমরা কিছুই। নির্বাক। নিস্তব্ধ। ভাবনাহীন। গা বাঁচানো। দুধের পুকুর। “অরাজনৈতিক” (?)-এর “ইহা আমি বুঝি না”-মার্কা জগাখিচুড়ি।   

“The worst illiterate is the political illiterate…”

বাড়িতে তালা দিয়ে বেরিয়েছিলাম। তালাটা খুলে ঘরে ঢুকে কাঁধের ঝোলাটা নামিয়ে রেখে ধপ করে বসে পড়লাম বিছানায়। সব ঘেঁটে যাচ্ছে। ভারতবর্ষে আত্মহত্যার হার যেন কতো? সরকার কেন মানুষের অধিকার নিয়ে চিন্তিত নয়? পরিবেশের অবস্থা কি? সে নিয়ে কি কোনো সরকার আদৌ ভাবিত?

পাশের নির্ণীয়মান ফ্ল্যাটটিতে দেখলাম এক মিস্ত্রীভাই ভিডিও কলে তার সন্তানের সঙ্গে কথা বলছেন। কলের ওপাশ থেকে করুণ বালকের কন্ঠে “আব্বা, তুমি আসবা কবে?” কথাটা শুনতে পেলাম।

কিই বা এই শ্রমিকের সুরক্ষা? কিই বা এনার ভবিষ্যৎ?

এসব ভাবতে ভাবতেই কখন জানি ঘুমিয়ে পড়লাম এক ফাঁকে।

ঘুমের মধ্যেই দেখলাম এক ভীষণ স্বপ্ন। দেখলাম কোথাও একটা ভোট চলছে। একদল গুন্ডা মিলে একটা পোলিং বুথ দখল করেছে। পোলিং বুথটার আকৃতি ঠিক বুঝলাম না– কেমন যেন মাল্টি-ডিমেনশনাল, ভেতর-বাইরে ঠাওর করা দুষ্কর। বুথে দাঁড়িয়ে থাকা গুন্ডাদের সবার একরকমের পোষাক– লাল-সবুজ-গেরুয়া রঙের। তাদের হাতে উদ্যত পিস্তল, পেটো। তারা পোলিং অফিসারদের থ্রেট দিচ্ছে। বুথের বাইরে হঠাৎ একটা কানফাটানো বিষ্ফোরণের শব্দ। চারিদিকে কোলাহল। হইহই। আতঙ্ক। ভোটাররা কোথায়? দেখলাম বুথের বাইরে একসারি মানুষের দল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখ বাঁধা। মুখে স্টিকিং প্লাস্টার। হাতে দোমড়ানো কাগজ আর ভোটার কার্ড-গোঁজা। একটা অবর্ণনীয় কানে তালা লাগা “চিঁ” শব্দ ছেয়ে গেলো চারিদিকে। চাদ্দিকটা ধোঁয়ার আবরণে ঢেকে গেলো। দূর থেকে সিআরপিএফ কিংবা মিলিটারি বুটের আওয়াজ শুনলাম যেন। আওয়াজটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে।

ঘুমটা ভেঙে গেল। ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে জানলা দিয়ে দেখি মেঘাচ্ছন্ন আকাশে সূর্যের রঙ লেগেছে। ভোর হচ্ছে। ভোরের পাখিগুলো সঙ্গতহীন ভাবে ডাক দিচ্ছে এদিক-সেদিকে। নাহ, পাখিরা আজ ডাকে না আর—গাছ নেই…পাখিদের আশ্রয় কোথায়? 

কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আমার স্টাডি টেবিলের উপরে দেখি একটা ভিসা অ্যাপ্লিকেশন রাখা রয়েছে। কোথায় যেন যাওয়ার কথা? এ দেশ ছেড়ে? এ দেশের কলুষিত পরিবেশ, বর্বরতা ছেড়ে?

“নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস…”

যাই হোক… কোনমতে উঠে বসে হাতে লাইটারটা নিয়ে আনমনে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। চোখের সামনে বারংবার স্বপ্নে দেখা দৃশ্যগুলো ভাসতে থাকলো। মোবাইলটাও দেখলাম অফ করতে ভুলে গেছি। মোবাইল ডেটাও অন। ফোনটা আনলক করতেই একটা গুগল নোটিফিকেশন এলোঃ

। বিলকিস বানুর ধর্ষকরা ছাড়া পেলো।

।। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তাঁদের গলায় মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানালো।।

কি যেন ঘটেছিলো? আমরা কেমন সব ভুলে ভুলে যাই, তাই না? বিস্মৃতির আবহাওয়া তো আজকাল। কেই বা দলবল নিয়ে গিয়ে মসজিদ গুঁড়িয়েছিল, কেই বা আখের খেতের মধ্যেই আগুন লাগিয়েছিলো ধর্ষিতা বালিকার নগ্ন দেহে, কারা যেন ছাদের কার্নিস থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিলো একটা আস্ত মানুষকে, কার বুদ্ধিতে এক যুবককে রেল লাইনে দৌড় করিয়ে মারা হয়েছিলো, নাকি পুলিশের বেধড়ক মারধোরে? হারিয়ে গেছে এক ভিখারি। কারা যেন গাড়ি চালিয়ে দিয়েছিলো প্রতিরোধী কৃষকদের শরীরের ওপর দিয়ে? সিরিয়া থেকে ভারত—পাশাপাশি ন্যারেটিভগুলো মিলেমিশে যায়… ক্ষমতার ভাষাগুলো সব এক ধাঁচ, সব এক রঙ… ‘অনন্য’ মিলছেনা আর!

“রাজা আসে যায়

আসে আর যায়

শুধু পোষাকের রং বদলায়

শুধু মুখোশের ঢং বদলায়…”

দমবন্ধ লাগছে খুব। কেউ নেই বাড়িতে। ছিলো একসময় অনেকেই। আজ আমি বিলকুল একা। বা হয়তো ওরা সবাই আছে, কেবল আমি দেখতে পাই না আর।

“একা”! নিজেরই মূদ্রাদোষে? হয়তো তাই!

এক কাপ কফি বানালাম। বেশ শীত-শীত লাগছে। দূর থেকে ফজরের আজানের সুর ভেসে আসছে। কফি মাগটাকে হাতে করে নিয়ে বসলাম স্টাডি টেবিলে। ল্যাপটপটা অন করলাম। তারপর খুললাম মাইক্রোসফট ওয়ার্ড। এক সেকেন্ড চোখ বুজে কিসব যেন ভাবলাম ছাইপাশ— তারপর আপনাআপনিই হাত চলতে শুরু করলো কিবোর্ডের উপর— খট, খট, খট শব্দে অসংলগ্ন ভাবনার দল রূপ পেলো বাক্যরাশিতেঃ

দেশ ভারতবর্ষ। দেশ নাকি নেশন—নাকি আদতে এটা দেশের ছদ্মবেশে একটা গোটা মহাদেশ (The Economist তাই বলেছিলো তাদের ২০১৫-র একটি প্রতিবেদনে)? কিজানি বাপু! অনেকে একে ইন্ডিয়া বা হিন্দুস্থান বলে চিহ্নিত করে থাকেন। একসময়ে একে জম্বুদ্বীপ কিংবা আর্যাবর্ত বলেও হয়তো চিনতেন। তবে এখনকার ভারত-ভূমির যে ধারণা, তা নিতান্তই ঔপনিবেশিক একটা ব্যাপার। এই কল্পিত ভৌগোলিক-রাজনৈতিক সীমারেখার মধ্যে বেঁচে আছে, থুড়ি টিঁকে আছে বহু বহু মানুষ। আমরা নাকি বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল দেশ (যা প্রথম স্থান অধিকার করার দিকেও নাকি ক্রমশ অগ্রসর!)। এই সমস্ত “জন”— তাদের কতোই না ভাষা, কতোই না পোষাক, খাওয়া-দাওয়া, ধর্মভাবনা, সমাজভাবনা। সবাই একরকম নয়। হতেও চায়না সবাই একরকমের, এক ছাঁচের, এক মাপের। বরং সকলে মিলেই এই ভিন্নতার চারণভূমিতে ঘটছে বহুত্বের উদ্ভাস—চলছে সংলাপ, চলছে পরস্পর আদানপ্রদান!

এহেঃ– ধুর! একটু বিরক্ত হলাম। বড্ড সেকেলে ঢঙের লেখা হচ্চে। লোকে আবার জ্ঞান দিচ্ছি ভাববে। হ্যাঁ, “জ্ঞান” শব্দটাও নঞার্থক বটে, যেমন “আঁতেল” কথাটাও। অ-সংসদীয় কি? সম্প্রতি কিসব যেন ‘অ্যান্টি-ন্যাশানাল’ শব্দকে দেশের সংসদ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে? এমনতর সেন্সরশিপই তো চলছে! অবশ্য এ লেখা কি ছাপা হবে কোনো কাগজ কলের দূষিত আবর্তে নির্মিত কাগজের আধারে? তবে ওসব ভেবে কাজ কি। লেখাটাকে আরেকটু কন্টেম্পোরারি করতেই হবে। নইলে কোনোমতেই বাজারে বিকোবে না। একমাত্র এই বাজারই তো ঠিক করে দেবে আমাদের ভাবনার ধাঁচ, সকল চাহিদার প্রকারবর্গ ইত্যাদি ইত্যাদি। 

আবার লেখা শুরু করলাম…

আমাদের সংবিধান অনুযায়ী দেশটা একটা sovereign socialist secular democratic republic (এটা কি বর্ণনামূলক নাকি আদর্শমূলক বচন? যা ‘হয়েছি’ বর্তমান, নাকি যা ‘হতে চাই’ ভবিষ্যৎ? প্রশ্নটা আপাতত তুলে রাখলাম) ।

এতো অব্দি লিখে বড্ডো হাসি পেলো। গরম কফিতে একবার চুমুক দিয়ে, হাসি সামলে আবার লিখতে থাকলাম…

এই আদর্শেই থিতু হতে হয়তো বা চেয়েছিলো বৃটিশ-পরবর্তী ভারত। কিন্তু কিছু হলো কই? ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ৩৯(সি) (“…that the operation of the economic system does not result in the concentration of wealth and means of production to the common detriment.”), পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ব্যাঙ্কের জাতীয়করণকে ভোগে পাঠিয়ে আজ শুধুই এন্তার বেসরকারীকরণের ধুম লেগেছে। নয়া-উদারবাদের মোরগ (মো-রোগ?! আমারেও ধরিল কি ও রোগে? কেনা-কেনা বাতিক? “আরো-চাই আরো-চাই”-এর আর্থ-সামাজিক রিচ্যুয়ালাইজেশন? পণ্য-রতিক্রিয়া?) এসে ধাওয়া করছে সবার পিছনেই—এই র‍্যাট-রেসের গোলকধাঁধাঁয়। 

পৃথিবীর নানান জায়গা থেকে প্রকাশিত এরকম বেশ কিছু প্রতিবেদন চোখে পড়েছে গত কয়েক মাস যাবত। খারাপ লাগে বড়োই, দেশের এমনতর নিন্দে-বান্দায় বিষণ্ণ হয় মন। কিন্তু কোনো রিপোর্টই তো আর ভিত্তিহীন নয় একেবারেই। যেমন, সুইডিশ সংস্থা ভি-ডেমের রিপোর্ট বা ফ্রিডম প্রেসের পরপর দুটি রিপোর্ট যখন পড়ি, তখন দেখি ভারত এখন অংশত স্বাধীন (“পার্টলি ফ্রি!”), ভারতবর্ষ নাকি চলেছে এক monolithic একনায়কতন্ত্রের দিকে, মৌলিক মানবাধিকারগুলো যেখানে সবটাই প্রশ্নের মুখে— Sedition Act, UAPA, TADA-POTA, বা AFSPA-র মতোন কালা আইনের চক্করে; পুলিশ স্টেট, অরোয়েলিয়ান ডিস্টোপিয়া—এরকম কিছু? Data Protection Bill/Data Privacy Bill-এর মতোন বিল আইন হবার আগেই লাগু হয়ে যায় গোপনে-গোপনে (?) আর আমাদের দেহ-মন তথা সত্তা চলে যায় রাষ্ট্র-সওদাগরের হাতের মুঠোয়। এমনকি, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমও আজ শাসকদল (সে যে দলই হোক না কেন) নিয়ন্ত্রিত এবং রীতিমতো সদাগর-পোষিত। কাজেই তাদের হিসেব-নিকেশ, তাদের কথামতোনই কেবল খবর “তৈরি” করে এইসব মাধ্যমগুলো। আর আমরা নাগরিকেরা সেসব খবর অনায়াসে গিলি বোকাবাক্স কিংবা মুঠোফোনের মাধ্যমে। এই খবর গিলে হজম হয়ে গিয়ে সেগুলোই আবার আমাদের ধারণা-ভাবনা-রাজনৈতিক চোখকে সৃজিত করে, রচিত করে। নিজের মতোন যুক্তিনিষ্ঠভাবে, সমালোচনামূলক দৃষ্টি দিয়ে চিন্তা-ভাবনা-বিচার করার কথা বলতো সেই হিঁদু কালেজের ইয়াং বেঙ্গল ব্রিগেড। সেসব আর কই? হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা তাই এক কথাতেই নেমে পড়তে পারেন দাঙ্গা (নাকি একপাক্ষিক দাঙ্গা, যাকে ইংরিজিতে বলে ‘Pogrom’?!) করতে— তাদের হিসেবে একমাত্র একটি “ধর্ম প্রতিষ্ঠার” খেলায়।  

এই অস্তিত্বের সংকটের অবস্থায় আমি ভারতবর্ষের সুপ্রচুর রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকাই। কতগুলো প্রশ্ন স্বভাবতই মনের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করে। ইচ্ছে করে, প্রত্যেক পার্টির কাছে এইসব প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়ে যাই এখুনিঃ

  • আপনাদের অর্থনৈতিক ভাবনাগুলো ঠিক কি? অর্থনীতি বলতে আমি কিন্তু ফিস্কাল অডিটিং বোঝাচ্ছি না। “রবি ঠাকুরের উপন্যাসে বিধবাদের শাড়ির রঙ” কিংবা তাঁর গান-কবিতায় “আমি” শব্দের স্ট্যাটিস্টিক্যাল এনুমারেশন মার্কা শুকনো হিসেব-নিকেশ চাই না আমার। আমি শুনতে চাই উৎপাদন-বন্টন ব্যবস্থা সম্পর্কিত ভাবনা-চিন্তা। আচ্ছা, আপনারা প্রত্যেকেই তো সরকারে এসে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন আর ইন্টার্ন্যাশ্যানাল মানিটারি ফান্ডের মতোন সংস্থার থেকে ধার নেন। আচ্ছা, সেই ধার দেওয়ার পিছনে কোনো শর্ত কাজ করে না? করে তো নিশ্চয়ই। কি সেই শর্ত? সমবায়-ভিত্তিক সংলাপী গণতান্ত্রিক পরিসর রচনার আবেদন নিশ্চয়ই নয়। তবে কি? একনায়ক/নায়িকা-পাপেট বসিয়ে শাসনতান্ত্রিকতা (governmentality) বজায় রাখা? যতো ইচ্ছে দাঙ্গা-যুদ্ধ বাঁধিয়ে গরীব-গুর্ব দেশগুলোকে আরো ঋণগ্রস্ত করানো এবং আরো আরো করে এই তিনটি ঋণদানকারী সংস্থার নয়া-সাম্রাজ্যবাদী নির্দেশ মোতাবেক চালানো?

কিছুক্ষণের জন্য লেখা থামিয়ে গুগল ক্রোমে একটা ট্যাব ওপেন করলাম। একটা খবর। তাতে লেখাঃ গত ১০ বছরে ৬২৭% সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে বিজেপি নামক পার্টিটির—যা ৮৯৩ কোটিরও বেশী। বহুজন সমাজ পার্টি (৬৯৮ কোটি), তৃণমূল (২৪৭ কোটি), সিপিএম (৫৬৯ কোটি), কংগ্রেস (৭৫৮ কোটি)-রাও কম যায় না। Association for Democratic Reforms (ADR) এবং National Election Watch তথ্যসমৃদ্ধ দস্তাবেজ পেশ করেছে এ বিষয়ে। কিন্তু বলুন দেখি, এইসব দলগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকা নেই— সহর্ষ স্বশ্রমে কোনো উৎপাদন করেনা এরা। তবে কিভাবে এতো লাভ করে চলেছে এরা? এতো টাকা আসছে কোথা থেকে? কেনোই বা আসছে? কিভাবে সৃষ্ট হচ্ছে এত্তো অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল পরিমাণের সম্পত্তি?

রাজনৈতিক পার্টিগুলোকে স্রেফ “সীমাবদ্ধ” বা লিমিটেড কোম্পানি ছাড়া কিচ্ছুটি মনে হয় না আর। এখানে কর্পোরেটদের মতোনই ব্যক্তি নেতা-নেত্রীরা পার্টির সমগ্র সম্পত্তি এবং তারই সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির পিছনেই কেবল ছুটে চলেন। ১৫ লাখ দেওয়ার মতোন হাজারো মিথ্যে প্রতিশ্রুতির বেড়াজালে হাঁফিয়ে উঠি আমরা— সাধারণ মানুষ। অবিশ্যি এই সাধারণ মানুষ কোনো সমসত্ব বর্গ নয়…

এই লাফ দিয়ে দিয়ে সম্পত্তি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনবরত বিভিন্ন PSB-তে লাল বাতি জ্বলে যাওয়ার একরকমের পজিটিভ কোরিলেশন বা অনুষঙ্গ লক্ষ্য করা যায় না কি? যায় তো বটেই। সে বিমান-রেল-ব্যাঙ্ক-বীমা কোম্পানি— সব ক্ষেত্রেই চোখে পড়ে। গত দশ বছরে যতো ব্যাঙ্করাপ্সি হয়েছে এ ভারতবর্ষে—তা রীতিমতোন ভয় লাগিয়ে দেয়। টাকা রাখবো কোথায় তবে? মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখাই কি তবে শ্রেয় পদ্ধতি হয়ে দাঁড়াবে শেষমেষ? ৫০জন অতিধনী স্বেচ্ছায় ধার শোধ না দিয়ে লোন ডিফল্ট করে দিব্বি বিলেতের হাওয়া খেয়ে বেড়ান- তাদের ধার অনায়াসেই ওয়েভ বা রাইট অফ করে দেয় রিজার্ভ ব্যাংক… আর জনগণ কোথায় যায়? ডি-এইচ-এফ-এলের মতোন এ-এ-এ- রেটেড কোম্পানিকে পূর্বনির্ধারিতভাবে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করে লাটে তুলে দেওয়া হয়…!

ওপরে বর্ণিত গোটা পরিস্থিতিটির পিছনে কাজ করে চলেছে একটা নেক্সাস বা আঁতাতঃ যেখানে কর্পোরেট মিলেছে পার্টি/রাষ্ট্রের সঙ্গে, যে পার্টি আবার তথাকথিত অন্ধকার জগতের ডনদের সঙ্গে যুক্ত (পিগুর ভাষায় ‘ছায়া অর্থনীতি’), একইসঙ্গে আবার সেই পার্টি জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় গুরু/ধর্ম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে—যাদের সম্পত্তির পরিমাণ বা ক্রিমিনাল রেকর্ড আমাদের চমকিয়ে দেয়! এ এক আলো-আঁধারের অদ্ভুত কল্যুশন…

“মানুষ বড়ো কাঁদছে…” 

অবশ্য এসব নিয়ে পার্টিগুলোকে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলে কোনোদিনই কোনো উত্তর মিলবে না। কারণ, তাদের কথামতোন তারা নাকি ‘পাব্লিক অথরিটি’ নয়, তাই আরটিআই-এর আওতায় তাঁরা পড়েন না। না জানা যাবে এই দলগুলোর মেম্বারদের অন্ধকার অতীত (যদিও ADR নেতা-মন্ত্রীদের ক্রিমিনাল রেকর্ডও প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে যে অন্তত ৩৬৩ জন বর্তমান এম-এল-এ এবং এম-পির নামে রীতিমতন ক্রিমিনাল কেস রয়েছে, বিজেপির মধ্যেই নাকি এরকম ৮৩ জন বাঘা-বাঘা চোরছ্যাঁচড় রয়েছে। কোথায় গেলো তবে কোড অফ কন্ডাক্ট?), না উদ্ধার করা যাবে “অজানা উৎস” থেকে আসা এতো-এতো ধনরাশির রহস্য-জট! সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছেই সর্বসম্মতিক্রমে আর-টি-আই হলো এক জুজু-ভূত সমান—“কোনো প্রশ্ন নয়, কোনো প্রশ্ন নয়…”! 

পার্টি নামক সীমাবদ্ধটিকে চালাতে গেলে প্রচুর টাকা থাকা দরকার। স্বেচ্ছা (?) লেভি আসে বটে, কিন্তু পি-এম কেয়ার ফান্ড অথবা ইলেকটোরাল বন্ড কেলেংকারির বিন্দু বিসর্গও জানতে পারেনা সাধারণ মানুষ, আরটিআই করে এসব ব্যাপার সম্পর্কেও কিচ্ছুটি জানা যায়না। বুঝতে পারিনা যে অশোকস্তম্ভ-মার্ক দেওয়া পিএম কেয়ার ফান্ড কিভাবে ট্রাস্ট হিসেবে কোনোরকমের হিসেব-নিকেশ দেওয়ার জন্য দায়বদ্ধ নয় কারোর কাছেই। কোথায় যাচ্ছে এই টাকাগুলো?

“All that is solid melts into the air…”

নিজের ছন্দেই লেখা চলতে থাকলো আবার… 

ব্যাপার হলো, ভারতীয় অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা সদাগর-রাষ্ট্র সমঝোতার দ্বারাই চালিত হয়। এই অবস্থাকে বলতে পারি ক্রোনি ক্যাপিটালিজম—যেখানে কিছু হাতে গোনা সদাগর নির্ধারিত করে শাসন-ত্রাসন পদ্ধতি ইত্যাদি। আবার এই ক্রোনি অবস্থা ক্রমশ্যই এগিয়ে চলেছে একধরণের একচেটিয়া পুঁজিতন্ত্রের দিকে…যেখানে শাসকদল/পার্টি/রাষ্ট্র দু-একজন বিশেষ অতিধনীদের পরিপোষণের দায়িত্বভার গ্রহণ  করেন। বর্তমানে এ পোড়া দেশে এই পছন্দের ব্যক্তিরা হলেন যথাক্রমে আদানি,  আম্বানি এবং কখনো-সখনো তাঁদের পরিবার-পরিজনরাও (হাম দো, হামারে দোঃ মোদি-মোটাভাই এবং আদানি-আম্বানি?!)। যদিও এই কয়েক মাস যাবৎ আদানির হাতেই সমস্ত দেশের সমস্ত পরিষেবা (NDTV-র মতোন একটি জনপ্রিয় সরকার-বিরোধী মিডিয়া হাউজকে পর্যন্ত!) তুলে দেওয়ার প্রয়াস চালাচ্ছে আমাদের এন-ডি-এ সরকার। আম্বানির গুরুত্ব আগের থেকে বেশ খানিকটা হ্রাস পেয়েছে। ওদিকে গভীর পরিবেশ-সচেতনতার দরুণ আদানির বিরুদ্ধে প্রবল অসহযোগ আন্দোলন তৈরি হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়, যারা আওয়াজ তুলছেঃ #Stop_Adani!

“You will not be able to donate to political parties then get knighted and a seat in the House of Lords

Mega corporations will not exploit planning laws you cannot comprehend

To build apartment blocks of unfathomable ugliness across your once beautiful city

To provide accommodation for people who never even go there

Actors with Hollywood salaries, succulent voices and silk scarves will not march on Downing Street

To demand more subsidy for the arts

There’s enough wank in the theatre as it is.

Get your heads out of your anuses

Crony capitalism will not be tolerated!”

হ্যাঁ, এই এমএনসি নিয়ন্ত্রিত সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটাই আমাদের সকলের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের রক্তজল করা টাকাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে নয়াউদারবাদের দাপুটে হাওয়ার প্রবল ঝাপটায়…

ডিমনেটাইজেশনের শর্তপূরণের কি হবে? কালাধন লোপ পেলো কই? বন্ধ হলো কি  সন্ত্রাসবাদ? রাষ্ট্র নিজেই তো সন্ত্রাস চালিয়ে যায়— কখনো কাশ্মীরে, কখনো বা মনিপুরে— কখনো বা কানে আসে বস্তারের জঙ্গলে গুলি-বোমার শব্দ…

উত্তর মেলে না, উত্তর মেলে না…  

এককালে কংগ্রেস তার অর্থনীতি-ভাবনা ব্যক্ত করেছিলো ফেবিয়ান সমাজতন্ত্রের রিফর্মিস্ট আদর্শে। মহালানবিশ মডেল (দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা), ফেয়ার প্রাইস শপের প্রাধাণ্য, নেমন্তন্ন করে হাজারো লোক খাওয়ানোতে বেশ কিছু বিধি-নিষেধ ইত্যাদি… তারপর সবই তালগোল পাকিয়ে এলপিজি (লিবারালাইজেশন-প্রাইভেটাইজেশন-গ্লোবালাইজেশন)-র ভিসিয়াস আবর্তে ঢুকে গেলো দেশ।  তথাকথিত বামপন্থীরাও বিদেশী পুঁজির বিনিয়োগের ডাক দিলো—উর্বর জমি ধ্বংস করে তারা কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে বানাতে চাইলো SEZ। “এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে” বলে নীল-সাদা দলও ডাকতে থাকলো বণিকদের— সদাগর-দ্বারা চালিত রাষ্ট্র কোনো মুক্তাঞ্চল বরদাস্ত করে না, করবে না।

  • কিন্তু এই ট্রেন্ডে গা ভাসাতে গিয়ে গোল্লায় গেলো পরিবেশ-ভাবনা, ভুলিয়ে দেওয়া হলো নিসর্গের সত্বাধিকার (ecological entitlement)। পরিবেশের যাবতীয় সামগ্রীকে “মাগনা” ভেবে নিয়ে তার উপরে যথেচ্ছাচার চললো। বাঁধ-দেওয়া, চিমনির ধোঁয়ায় ঢাকা সভ্যতাই হয়ে দাঁড়ালো এই নতুন ভারতের মন্দির-মসজিদ-গির্জা। পোড়া ডিজেলের গন্ধে ফুসফুস বিধ্বস্ত। বিগড়োলো  প্রাকৃতিক ভারসাম্য। খাবার-দাবারে জিএম বীজ, এইচওয়াইভি রাজত্বভার  নিলো, কিডনি-লিভার-হার্টের অবস্থা হয়ে উঠলো সোচনীয়। ভারতের বিস্তীর্ণ সমুদ্র-তীরবর্তী অঞ্চল জুড়ে ভীড় জমালেন/জমাচ্ছেন পরিবেশ উদ্বাস্তুর দল, মুম্বাই-আসাম জলে ভেসে যাচ্ছে… ওদিকে ব্যাঙ্গালোরে তীব্র পানীয় জলাভাব অথচ সে শহরও আজ ডুবতে বসেছে!

“…water, water everywhere and not a drop to drink!”

আচ্ছা, কোনো রাজনৈতিক দল কি এসব নিয়ে ভাবে? এরা প্রত্যেকেই কি শিল্প (ইন্ডাস্ট্রি)-ফেটিশকে বাড়িয়ে চলে না? মনে পড়ে— ২০১৮র কিসান লং মার্চের সময় কিছু বামপন্থী দল সওয়াল করেছিলো এম এস স্বামীনাথনের এই আত্ম-বিধ্বংসী প্রকল্পের পক্ষে? বুলেট ট্রেন নির্মাণ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের একটুও কিছু যায় আসে না বিস্তীর্ণ অরণ্যাঞ্চল স্রেফ কেটে উড়িয়ে দিতে; কেরালার কে-রেল প্রকল্পও অবশ্য একইভাবে, প্রকৃতি-বিমুখ উপায়ে বাস্তবায়িত করা হচ্ছে। ক্লাইমেট ইমার্জেন্সির আবহে নরওয়েতে ক্লাইমেট ইলেকশন হয় বটে, সবুজ পুঁজিবাদের চেষ্টায় গ্রীন ব্যাঙ্কিং কিংবা সাস্টেনেবল  এনার্জিতে ব্যাপক বিনিয়োগ ঘটে শুধুমাত্র ব্যাবসায়িক মুনাফার কারণে– তবে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলো ভারতের ভবিষ্যৎ প্রজন্মদের হালহকিকত নিয়ে একেবারেই ভাবিত নয়। “ওসব অনেক দেরি আছে”-র বয়েলিং ফ্রগ সিন্ড্রোমের পাল্লায় পড়েছে সমস্ত ভারতীয় রাজনৈতিক দল। এটা কি একধরণের চরম প্রমুখবন্ধন (foreclosure) বা সাইকোসিস নয়?   

“পারবো না দিতে

ঘাসফুল আর ধানের গন্ধ

স্নিগ্ধ যা কিছু দুহাত ভরে আজ

ফুসফুস খোঁজে পোড়া ডিজেলের

আজন্ম আশ্বাস…”

নাসার ওয়েবসাইট খুললাম। পুরো গোলকের থ্রিডি মডেল চলে এলো চোখের সামনে। নর্থ পোলের দিকে কার্সরটা ঘুরিয়ে দিলাম। মাইলের পর মাইল বরফ আজ পরিণত হয়েছে সুবিশাল হ্রদে।

“সব পুড়ছে।

ব্রহ্মান্ড পুড়ছে।

আমি পুড়ছি।”

  • এবার বৈদেশিক নীতির প্রসঙ্গে যদি আসা যায়— তবে কি তফাৎ চোখে পড়ে দলগুলোর মধ্যে? কংগ্রেস বলতো বটে নন-অ্যালাইন্মেন্টের কথা, বৌদ্ধ দর্শন-প্রভাবিত পঞ্চশীলের পাঠ শেখাতো এককালে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ইন্দিরা সরকারের সোভিয়েতঘেঁষা প্রবণতার ফলে মার্কিন ইন্টালিজেন্স নিযুক্ত করলো  কিছু এজেন্টকে—যারা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে মার্কিনী ধাঁচায়। এই এজেন্টরা আবার হিন্দু মহাসভা, সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে মিলে ইন্দিরা-বিরুদ্ধ জোট/ঘটবন্ধন তৈরীর চেষ্টা চালালো। আদতে হয়তো এইসব “এজেন্ট”রা বুঝতেও পারেননি যে তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে মার্কিনী মডেলের প্রসার ঘটানোর প্রক্রিয়ায়। কারণ এঁদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু আমাদের এই লেখার শেষভাগে বিকল্প ভাবনার খোরাকি জোগাবেন! ঘটনাটা হলো, মার্কিন সরকার রীতিমতোন চিন্তায় পড়ে গেসলো যখন তারা দেখেছিলো যে ইন্দিরা স্বয়ং চিলির সাল্ভাদোর আয়েন্দের হত্যার বিপক্ষে সওয়াল করছেন রাষ্ট্রপুঞ্জের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই।

ওদিকে বিজেপির প্রচারিত এফ-ডি-আই জাতীয়তাবাদকে কোথায় রাখবো? আর-এস-এস-এর স্বদেশী পণ্য-প্রচারের অ্যাজেন্ডার সাথে তা কতোটা মেলে? মুখ আর মুখোশের ফারাক করবো কেমনে? আচ্ছা, সিপিয়াই-সিপিএম ’৬৪-তে ভাগ হয় এই বৈদেশিক নীতির প্রসঙ্গেই— তৎকালীন রাশিয়া-চায়না সম্পর্কের বিষয়-বিতর্কেই, তাই না?

লেখা থামালাম। বৈদেশিক নীতি সম্পর্কিত আলোচনার জন্য আলাদা লেখা লিখব নাহয়। এখন আপাতত মূল কথাগুলোকেই তুলে ধরি।

শুনতে পেলাম ময়লাওয়ালা এসে বারবার বাঁশি বাজাচ্ছে আমাদের কানা-গলিতে। ডাস্টবিনটা পুরোটাই প্রায় ভরে গেছে কোকা-কোলার তোবড়ানো ক্যান, বাডওয়াইজারের শিশি আর সিগারেটের ছাইয়ে— এছাড়া প্রথম বিশ্ব থেকে আমদানী করা ফাস্ট ফুডের একগাদা ফাঁকা প্যাকেট তো রয়েছেই।

নেমে গেলাম ডাস্টবিন সঙ্গে করে। পুরোটা উপুড় করে দিলাম ময়লাওয়ালার গাড়ির মধ্যে। সে শুধু বললো— “দাদা, পুজো আসছে— বোঝেনই তো! জিনিস-পত্রের যা দাম— একটু দেখবেন!”

আমি কোনো উত্তর না দিয়ে একবার ভদ্রলোকের জীর্ণ চেহারার দিকে তাকিয়ে তারপর ফাঁকা ডাস্টবিন সঙ্গে করে ফিরে এলাম বাড়িতে। হাত ধুয়ে একটা স্যান্ডউইচ তৈরি করলাম নিজের জন্য। ফ্রোজেন চিকেনের স্লাইস ছিলো, তাই দিয়েই।

স্যান্ডউইচ সহযোগে ল্যাপ্টপটাকে স্লিপ মোড থেকে তুলে শুরু করলাম লেখা আবার…

  • এবার যে প্রসঙ্গটা খুব বাস্তবিক কারণেই মাথায় আসে—তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। এই একটি বিষয় ভারতীয় রাজনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আজকাল। তাই, দেখা জরুরী যে কোন দল কিভাবে ধর্ম-বিষয়ে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করেছে বা করছে।

একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই দেখা যাবে যে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলই এই একই ধর্মীয় কার্ডে খেলছে। বাজারী মৌলবাদের পরিকল্পনাকে চাপা দিয়ে ধর্মীয় মৌলবাদকে নরমরূপে অথবা গরম-আকারে প্রমুখিত করছে। ধর্মের এই রাজনৈতিক ব্যবহার, বলা বাহুল্য, ভোট ব্যাংকের স্বার্থে তো বটেই। এখানে আদর্শকে গুলি মেরে কাজ করে চলে কেবল ক্ষমতাদখলের চুড়ান্ত এষণা (will to power বা বিজিগীষা)। নেহরুর কংগ্রেস সেক্যুলার আদর্শে থিতু হতে চাইলেও সাম্প্রতিক কংগ্রেস বিজেপির দেখাদেখি শিবমন্দিরে পুজো দিতে কিংবা ভষ্ম মেখে নিজেদের ভক্তির প্রদর্শন করতে পিছপা হচ্ছেনা। বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতি তো ওদের মূল শিরদাঁড়া। হিংসা, ঘেন্না এবং অসহিষ্ণুতার আবোল-তাবোল দিয়ে কেবলই তারা ভোট বাগানোর চেষ্টায় মগ্ন প্রথম থেকেই। তৃণমূল কি করে? এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুধুই যে নামাজ পড়েন, গুরুদ্বারে পেন্নাম ঠোকেন, চার্চে গিয়ে পাস্টরের আশীর্বাদ নেন, শিবলিঙ্গে জল ঢালেন তা নয়— সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বেশ কয়েকটি বৃহৎ আকারের মন্দির বানানোর পরিকল্পনা হয়েছে করদাতাদের টাকায়, দুর্গাপুজোকে মার্কেটেবল পণ্য হিসেবে মোচ্ছব বানিয়ে পেশ করার বাড়াবাড়িও শুরু হয়েছে ২০২২ থেকেই। তার উপর উল্টোডাঙায় হনুমানের মূর্তি বসানোর কথা তো সকলেই জানেন। আম আদমি পার্টি তো তাদের গোবিন্দাচার্যর দর্শানো রীতি-নীতি মোতাবেক হনুমান ভক্ত হয়েই পুজো-আচার করে থাকেন ভোটের সময়ে। সিপিএম-কে যদি নাস্তিক দল হিসেবে ভাবেন, তাহলেও ভুল করবেন। তাঁদের পলিট-বুড়োরতথাকথিত ‘উচ্চ’ নেতৃত্বের আদেশ অনুযায়ী টেম্পল ফেস্টিভাল করবার দায়িত্ব নিয়েছে এই লাল পার্টিই। কমঃ (?) সুভাষ চক্রবর্তীর তারাপীঠ দর্শন, কালীঘাটে জ্যোতি-নন্দন চন্দন বসুর সোনার খাঁড়া, কমঃ (?) তন্ময় ভটচাযের রথযাত্রার প্রোমোশন, কমঃ (?) দীপ্সিতা ধরের পুজোআচ্চা, কমঃ (?) ঐশী ঘোষের হাতের তাগা— এসব তো আছেই! কাজেই— ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পরে ক্রমাগত ধর্মীয় কার্ড খেলবার ব্যাপারটা ভারতীয় পার্টিগুলোর স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে বহুকাল ধরেই। এ কেমন দ্বিমুখী নাটক? ভাবাদর্শগত অবস্থান হারিয়েছে সব দলই। একসময়ে ভেবেছিলাম যে তামিল নাড়ুর ডি-এম-কে হয়তো ঈশ্বর-ধর্ম ইত্যাদি ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না— কিন্তু খবর পেলাম যে সে দলের তথাকথিত “নিরীশ্বর” নেতা এম কে স্তালিনও শ্রীরঙ্গম মন্দিরে পুজো দিতে ভোলেন না!

প্রবল দর্শনের দীনতায় ভুগছে সমস্ত রাজনৈতিক দল… কোনরকমের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্ববীক্ষার অভাব বড়ো কষ্ট দিচ্ছে। 

“রাজনীতি থেকে আদর্শবাদ বোকারাই শুধু খোঁজে…”

এই বিপুল ভোট ইন্ডাস্ট্রিতে সাময়িক কর্মসংস্থান হয় বটে, তবে ওদিকে করদাতাদের টাকা ভেসে যায় বানের জলে। শেষ অব্দি চোখ কচলিয়ে দেখা যায়, সব পার্টিই যেন এক পাকে তৈরি। এমতাবস্থায়, আমি কাকে ভোট দেবো? রাজা-রাণী যদি গণতন্ত্রের সমস্ত স্তম্ভকে নিয়ন্ত্রণ করে, এবং সদাগরের কাছ থেকে নানান অছিলায় টাকা নেয় (সে লাইসেন্স রাজ, তোলাবাজি, গুন্ডাট্যাক্স—যা কিছুর মাধ্যমেই হোক না কেন!), তাহলে আমজনতার পক্ষে কী করার আছে? উপায় কি? অপশন কোথায়? 

আরেকটা মুশকিল হচ্ছে, ভারতের সবকটি রাজনৈতিক দলই একইরকমভাবে এ দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় (federal) ‘ইউনিয়ন অফ স্টেটস’ (সংবিধান অনুযায়ী)-এর কাঠামোটিকে একটি সমসত্ব কেন্দ্র-সর্বস্ব শক্তিতে পরিণত করবার চেষ্টায় মগ্ন (যদিও কংগ্রেস বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংসদে এই রাজনৈতিক বহুত্বের ওপরে জোর দিয়েছে) । বিজেপি তো বিশেষ করে একরকমের রাষ্ট্রপতি-দ্বারা চালিত রাষ্ট্র চাইছে—এক ভাষা, এক ধর্ম, এক পার্টি-র আদর্শে থিতু থেকে। এই ভূখন্ডের সুপ্রচুর ভিন্নতাকে একসঙ্গে এভাবে বুলডোজার চালিয়ে একরকমের করতে গেলে তো সমূহ বিপদ।

  • এবার যে ব্যাপারটা ভীষণভাবেই নজরে আসে—তা হলো এই গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়াটা! বলুন তো—বর্তমান ভারতের নির্বাচনের গণনার উপরেও কি আস্থা রাখা যায়? যে ইভিএম দিয়ে এ দেশে ভোট হয়, সেই ইভিএম কোনো প্রযুক্তি উন্নত দেশ ব্যবহার করে না। এই যন্ত্রের মধ্যে অবস্থিত সফটয়্যার হ্যাক করে ইচ্ছেমতোন নিয়ন্ত্রণ করা কোনো ব্যাপারই না। তবে ভারতরাষ্ট্রে ব্যালট পদ্ধতিও যে খুব বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম, তা তো নয়— কারণ সে ক্ষেত্রেও তো মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ভোটারকে বাধ্য করা হয় কোনো একটি চিহ্নে ছাপ দিতে। এসবই আমাদের জানা বিষয়। 

গুজরাটের ট্রাকবোঝাই এভিএমগুলোও হঠাৎই কোনো একদিন ডুবে যায় পুকুরের নোনা জলে, পাওয়া যায় না হিসেব নিকেশ। হঠাৎ ঘটানো লোডশেডিং-এও বদলে যায় ভোটের ফলাফল।

তারওপর আরো একটা ব্যাপার স্বভাবতই নজরে আসে। ভারতের প্লুরালিটি সিস্টেম/ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট সিস্টেম-এর ভোটিং-এ কোনো দল মাত্র ৪৩% বা ৩৬% ভোট পেয়েই নিজেকে রাজা-রাণীর আসনে বসিয়ে অনায়াসেই বলে দিতে পারেঃ “আমরাই তো সব। ‘সব’ জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে।” দর্শনের ছাত্র হিসেবে এককালে ফ্রেগে-রাসেল-হোয়াইহেড প্রবর্তিত প্রেডিকেট লজিকের অন্তর্গত কোয়ান্টিফিকেশনে পড়েছিলাম “ইউনিভার্সাল কোয়ান্টিফায়ার”-এর কথা, ঠাওর করেছিলাম সামান্যলক্ষণ প্রত্যাসত্তির সমস্যার কথা—অথবা যাকে বলি আরোহ যুক্তির সমস্যা- ‘এক’ থেকে ‘সব’-এ লাফ দেওয়ার (inductive leap) মুশকিল! তবে আমাদের শাসকগণের অন্তঃসারশূন্য twaddle-এর মধ্যে লজিক খুঁজতে যাওয়ার চেষ্টাটাই পন্ডশ্রম। অনেকে এই সমস্যার উত্তরে পেশ করেন প্রোপোরশানাল রিপ্রিজেন্টেশনের কথা—যেরকমটা আমেরিকাতে বা আমাদের রাজ্যসভার ভোটে হয় আরকি। এই ব্যবস্থা মানলে সব দলই কোনো না কোনোভাবে জন-পরিসরে বা রাজনৈতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করবার সুযোগটুকু পায়—সংখ্যালঘুর দৌরাত্বকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত বলে চালানোর দুঃসাহস রোধ করা যায়, ‘অন্যস্বর’ একটু জায়গা পায়। বিরোধীশূন্য গণতন্ত্র তত্ত্বগতভাবে সমস্যাজনক ভাবনা। গণতন্ত্রে বিরোধী স্বর রাজনৈতিক প্রেসার কুকারটাকে জিইয়ে রাখতে সাহায্য করে—সংলাপ, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। আমাদের সংসদে সংলাপ কই, কোথায়ই বা নেহরু-আজাদ-আম্বেদকর-সোমনাথ লাহিড়ী-ইন্দ্রজিৎ গুপ্তদের আমলের ইন্টেলেকচুয়াল সংস্কৃতি? এই প্রশ্ন তুলেছেন খোদ আমাদের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধাণ বিচারপতি রমানা। 

কিন্তু বিষয় হল, আমাদের ভারতদেশের মতোন আদ্যন্ত দূর্নীতিগ্রস্ত (২০২২-এর হিসেব-মোতাবেক Global Corruption Index-এ ১৮০টি দেশের মধ্যে ৮৫ নম্বরে!) একটি দেশে এমন ব্যবস্থা (প্রোপোরশানাল রিপ্রেজেন্টেশন) চালানোর বিপদ আছে হয়তো। আর যখন সমস্ত দলই নীতিগতভাবে একইরকমভাবে কাজ করে থাকে—তখন এসব ভেবেই বা কি উপায়? তবু— ভাবতে দোষ কোথায়! সময়মতোন ভাবা প্র্যাক্টিস করতে তো ভুলেই গেছি!

এখানে চলে আসে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ— রাইট টু রিকল, অর্থাৎ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে প্রয়োজন মোতাবেক তার প্রদত্ত আসন থেকে নামিয়ে ফেলবার অধিকার। আমার মনে হয়, ভারতরাষ্ট্রের পরিচালনায় এমন অধিকার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গণ-তন্ত্র আক্ষরিক অর্থে তবেই তো প্রস্ফুটিত হবে! হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের (যা পরবর্তীতে ভগৎ সিং হিন্দুস্থান সোসালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনে পরিণত করেন।) প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যাল কিন্তু এমন কথাই ভাবতেন, কারণ “otherwise, the democracy shall become a mockery…”!

দীর্ঘদিন আন্দোলনের ফলে “নন অফ দি অ্যাভব” (নোটা) নামক একটি বোতাম ইভিএম-এ আনা গেছে। এই বোতাম টিপে নাগরিক বাইনারির বাইরে বেরিয়ে প্রত্যেকটি দলের প্রতি তার দৃঢ় অবিশ্বাস প্রকাশ করতে পারে, একরকমের চাপ দেওয়া গোষ্ঠী (প্রেশার গ্রুপ) হিসেবে কাজে লাগতে পারে। দুই-তৃতীয়াংশ নোটা সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনোভাবে এভিএমের মাধ্যমে প্রকাশ করা গেলেই বিপদে পড়ে যাবে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল। একমাত্র সেই পরিস্থিতিতেই প্রস্তাবিত করা যাবে উলঙ্গ রাজা-রাণীদের সরাসরি চিহ্নিত করবার অধিকার— রাইট টু রিকলের দাবী।

কিন্তু “স্পেকটাকেল”-এর ভানের জগতে মেতে জনগণ ডুবে আছে যখন মোচ্ছবের সাময়িক ফুর্তিতে, তখন কি এই জন-মানসিকতাকে আদৌ প্রমুখিত করা সম্ভব? মগজে কার্ফিউ-এর আবহে গোদি মিডিয়ার কাছে মাথা বন্ধক রেখেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার পাল।

“জোট সরকারে আস্থা নেই

তাই ভোট শূন্য ব্যালটেই

গণতন্ত্রে তুমি থেকো আমি যাই…”

লেখা থামাই আবার। চালিয়ে দিই নোম চমস্কিকে নিয়ে নির্মিত “ম্যানুফাকচারিং কন্সেন্ট” ডক্যুটি। সেখানে বারংবার দৃশ্যপটে ভেসে উঠছিলো একটি ব্যাপার—এক নাগরিকের হাত। সামনে ব্যালট পেপার—তাতে আমেরিকার ডেমোক্র্যাট, রিপাব্লিকান নেতা-নেত্রীদের নাম-ধাম লেখা রয়েছে। নাগরিকের হাতে একটি পেন্সিল, কোনো একজনকে বেছে নিতে হবে। পেন্সিলটা ডানদিক-বাঁদিক ঘোরাতে ঘোরাতে শেষমেশ সে নাগরিক এই দ্বনুক-নির্ভর চয়ন না করতে পেরে পেন্সিলটিকেই ফটাস করে ভেঙে ফেলেন! আমাদেরও তো ঠিক এমনই হাল- তাই নয় কি?

আমার লেখাতে এবার একটা নতুন অধ্যায় যোগ করি—নাম দিইঃ

। এক হট্টমালার দেশঃ না-পার্টির প্রস্তাবনা ।

লন্ডনের এক শীতের সকাল। ফার্স্ট ইন্টারন্যাশানালের সমাবেশ। দুই বন্ধুর হঠাৎ দেখা, একজনের নাম কার্ল, আরেকজন মিখাইল। কিছু ব্যক্তিগত কথাবার্তার পর হঠাৎই কার্ল একটি প্রশ্ন করেনঃ

“আচ্ছা, তুমি কি পার্টির বিলুপ্তি চাও? এবং তার সঙ্গে রাষ্ট্রের?”

মিখাইল এরকম আকস্মিক প্রশ্নে খানিকটা চমকেই গেলেন। তারপর বললেনঃ

“তা চাই বই কি, নাহলে বিকল্প সমাজভাবনা একেবারে নিম্নস্তর থেকে দানা বাঁধতে পারবে কিভাবে?”

কার্লঃ কিন্তু তাহলে সংগঠন-ভিত্তিক কাজ কিভাবে চলবে? একরকমের থাকবন্ধী সংগঠন ছাড়া সুষ্ঠভাবে সমাজ পরিচালনা করা অসম্ভব! প্রথমে রাষ্ট্র থাকবে, তারপর তাকে ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারতে হবে। একরাতের মধ্যে রাষ্ট্রের বিলুপ্তি মূর্খের ভাবনা। রাষ্ট্রযন্ত্রকে পার্টির স্বার্থে কাজে লাগিয়েই সমাজন্তন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা সম্ভব। এই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রদর্শনের মধ্যে দিয়েই তো সবহারার দল তাদের একনায়কতন্ত্র বজায় রাখবে শত্রুদের দমিয়ে রেখে।

মিখাইলঃ তা কেন হবে। এক ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে সেই আদলেই আরেক ক্ষমতার কাঠামো দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপিত করার মানেটা কি? এতে আমূল পরিবর্তন একেবারেই ঘটবে না। আর তাছাড়া রাতারাতি রাষ্ট্র-বিলুপ্তির মতোন আজগুবি কথা কস্মিনকালেও আমি বলিনি। মানুষ আনুভূমিক পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে সমবায়-ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে একসঙ্গে মিলেই। তার জন্য ওরকম উঁচু-নিচু বিভাজনকারী সংগঠনের বা রাষ্ট্র-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই। কিছু বিশেষ নাকউঁচু মানুষ কিভাবে সমস্ত সমাজের সমস্তরকমের মানুষের ভাবনা-চিন্তা-চাহিদা বোঝবার দায়িত্বভার নিতে পারে? এরকম সংগঠন শেষমেশ একটি পার্টির অথবা একজন ব্যক্তি-নায়কের একনায়কতান্ত্রিক শাসনপ্রণালী তথা যথেচ্ছাচারে উপনিত হয়, যেখানে সমস্ত নির্দেশ আসে উপরমহল থেকে– যা কেবল কিছু গোপন সভায় কিছু হাতেগোনা মানুষের নেওয়া সিদ্ধান্তমাত্র। সেক্ষেত্রে All animals are equal, but some animals are more equal than others.

(এ যেন অনেকটা সিপিএমের তথাকথিত উচ্চনেতৃত্বের চিনেমাটির কাপে চা খাওয়া এবং নিচের মহলের কর্মীদের ভাঁড়ে চা খাওয়ার কিসসা! এরেই কয় সবজান্তা ভালগার ভ্যানগার্ডিজম!)

কার্লঃ এ তুমি কেমন কথা বলছো? একটি আলোকপ্রাপ্ত পার্টি যদি না মাথার উপরে বসে সিদ্ধান্তগ্রহণ করে, যদি মেহনতী মানুষের চিন্তার ভার নিজের কাঁধে তুলে না নেয় — তবে তো বিস্তর গোলযোগ বাঁধবে, সমাজ পুরোপুরি গোল্লায় যাবে। সবহারার দলের ভালো-মন্দ তো আমাদের বৈজ্ঞানিক শ্রেণী-দৃষ্টিই নির্ধারিত করে দেবে। আমাদেরকে প্রয়োজনমোতাবেক নির্বাচন কিংবা সংসদের মতোন মঞ্চকেও ব্যবহার করতে হতে পারে আমাদের দাবিদাওয়াগুলোকে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

মিখাইলঃ প্রথম কথা- তোমাদের এই দায়িত্বভার বা কর্তব্যভার নিতে কে বলেছে? তোমরা, এই পার্টির নেতারা কি মেহনতী মানুষজনদের অজ্ঞ বলে মনে করো? এতো অহংকার, এতো আত্বম্ভরিতা, ঔদ্ধত্য কিসের? তোমরা কিভাবে জানছো যে তোমাদের স্থির করা সিদ্ধান্ত সবসময় ওই নিম্নবর্গের মত-পথের সঙ্গে মিলে যাবে? তাদের জীবনে চলার সংগ্রামী পাঠক্রম কি’করে আরামকেদারায় বসে নির্ধারণ করে ফেলবার দুঃসাহস আমরা দেখাতে পারি? তাদের জায়গায় নেমে ভেবে দেখবার প্রয়োজন নেই কি? তার থেকেও বড়ো কথা, ওই অতিধণীদের দ্বারা চালিত সংসদ বা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো আস্থা আমার নেই।

কার্লঃ এর থেকেই প্রমাণ হয় তোমার কোনো তাত্ত্বিক ধ্যান-ধারণা গজায় নি। এখনো আধিবিদ্যক কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলতে পারোনি। তোমার মধ্যে জাতীয়তাবাদের বীজও রয়েছে, যা সবহারাদের আন্তর্জাতিকতাবাদের সঙ্গে মেলেনা। আগে দর্শন এবং অর্থনীতি সম্বন্ধে সম্যক বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরি করো, তারপর আমার সঙ্গে বা ফ্রেডরিকের সঙ্গে তক্কো জুড়তে এসো।

মিখাইলঃ তুমি ব্যক্তিগত আক্রমণে কেন যাচ্ছো? তোমাদের ঐ দর্শনের ভাষায় এটা কি “argumentum ad hominem”-এর হেত্বাভাস নয়? আমার মোদ্দা কথা হচ্ছে যে কিছু মানুষের তৈরি কোনো দশ-বিশজনের সংগঠন গোটা সমাজের সমস্ত মানুষের দায়িত্ব কিভাবে নেবে? তাতে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত জোর করিয়ে গেলানো হবে সকলকে। এমন সমাজ কি আদৌ প্রার্থিত? এতো একধরণের মারাত্মক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা! এখানে ব্যক্তি-স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, রক্ত-মাংসের মানুষের অধিকার যাবে কোথায়? সমস্ত মানুষের সামগ্রিক চিত্ত-কায়ার উন্নতিসাধন এভাবে আদৌ ঘটতে পারে না। তুমি আমাকে জাতীয়তাবাদী বলছো বটে, কিন্তু এখানে একটা কথা তোমাকে মনে করিয়ে দিই। পারী কমিউনের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। সেই সময়ে আমি একটি কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম যে রাষ্ট্রের কাল্পনিক গন্ডি পেরিয়ে মানুষে-মানুষে আন্তর্জাতিক সংহতির পথ প্রশস্ত করেছিলো এই কমিউনের দৃষ্টান্ত। তোমার দেখছি এসব কিছুই মনে নেই।

কার্ল এই সময়ে ভীষন রেগে যান। রেগে গিয়ে পাইপ ধরিয়ে একবার ধোঁয়া ছেড়ে গর্জে ওঠেনঃ

“তোমার নিশ্চয়ই জানা আছে যে আমি যথেষ্ট ভালো ফেন্সিং জানি। ডুএলের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলে তুমি পালানোর পথ পাবেনা। কাজেই, বুঝে-শুনে কথা বলো।”

  • “একি কার্ল! তুমি তো কর্তাবাজী করছো! এভাবে হিংসাত্মক হুমকি না দিয়ে অহিংসক, প্রজ্ঞা-নির্ভর সংলাপে আসা যাক।”

এরপরে কার্ল আর কথা এগোন না। কদিন বাদেই ফার্স্ট ইন্টার্ন্যাশানালের সদস্যদের মধ্যে একটা কথা চালাচালি শুরু হয়ঃ মিখাইলের বিরুদ্ধে কার্ল উচ্চনেতৃত্বের কাছে নানান অভিযোগ এনেছে। মিখাইল নাকি কিছু উগ্রপন্থীদের এজেন্ট বা গুপ্তচর এবং এ কাজ করবার জন্য সে নাকি যথেষ্ট টাকা নিয়ে ফার্স্ট ইন্টার্ন্যাশানালের সমস্ত কাজ পন্ড করবার চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়াও শোনা যায় যে মিখাইল নাকি সংগঠনের টাকা তছরুপ করেছে।

এই হয়… পার্টির তরিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললে দুটি অভিযোগ সবসময় উঠে আসতে দেখা যায়— চারিত্রিক “দোষ” অথবা টাকা-পয়সা নয়-ছয়ের অভিযোগ!

মিখাইল এসব শুনে হতবাক। তার কাছে পুরোটাই অপ্রত্যাশিত।

“চেনা রাগ চেনা ক্রোধ                             
চেনা চেনা প্রতিশোধ
চেনা ছুরি চেনা আক্রোশ
চেনা ঘৃণা বিদ্বেষ
চেনা লজ্জা এই দেশ
চেনা ভয় অচেনা আপোষ…”

এবার চলে আসা যাক স্বভূমির প্রেক্ষাপটে। সময়টা বৃটিশ-পরবর্তী “স্বাধীন” ভারত। মোহনদাস একদিন ডেকে পাঠালেন জহর, মৌলানাদের। বললেনঃ “রাজনৈতিক স্বাধীনতা এসে গেছে যখন, তখন আর কংগ্রেসের প্রয়োজন কিসের? কংগ্রেসকে ভেঙে দাও! তোমরা সকলে এবার গ্রামে-গ্রামে ঘুরে ঘুরে মাঠে নেমে মানুষজনের কাজ করো, স্বশ্রমে জীবনযাপনের উপায় নির্ধারণ করো! ইংরেজ চলে গেছে বলেই ভেবোনা যে সব কাজ মিটে গেছে— তোমরা দেশকে কক্ষনো আংলিশস্থান রয়ে যেতে দিওনা, কারণ যা একবার গেঁড়ে বসে যায়, তাকে সমূলে উপড়ে ফেলা কঠিন। আমি তো সেই ১৯১৫-তেই সাবধান করেছিলুম—গণতান্ত্রিক সংসদ প্রতিষ্ঠানটি আদতে বন্ধ্যা ও বেশ্যা! কথাগুলো একটু মনে রেখো।”

বড্ড একা হয়ে গিয়েছিলেন মোহনদাস তখন। গদির লড়াইয়ে মত্ত হয়ে কেউ তাঁর কথা কানেও তোলেনি। এর কিছুদিন পরেই মোহনদাসকে গুলি করে মেরে ফেলে একজন হিঁদুত্ববাদী সন্ত্রাসী। তাঁর দেখা স্বপ্নগুলো স্বপ্নই রয়ে যায়। তিনি নিজেও যে চেষ্টা করেননি তা নয়—টলস্টয় ফার্ম এবং সবরমতী আশ্রম, দু’ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর সমাজভাবনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন।

এই ভুলে যাওয়া মোহনদাসকে স্মরণ করি আজ এই অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কালে। ফের মনে আসে তাঁর গ্রাম স্বরাজ বা village republic-এর ভাবনা, যেখানে প্রত্যেকটি ছোটো ছোটো বিকেন্দ্রিকৃত কৌম স্ব-নির্ভরভাবে (এটা বিজেপি-প্রচারিত আদ্যন্ত কর্পোরেট-নির্ভর, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়ানো “আত্মনির্ভরতা”র তানাশাহী জুমলা নয়) নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে ক্ষুদ্র শিল্পে নির্ভর করে, অহিংসকভাবে স্বশ্রমে (বা সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রমে) উৎপাদন করে— সমাজ এবং বিশ্বপ্রকৃতির এক যৌথ মেলবন্ধনে। এই প্রত্যেকটি কৌম যুক্ত থাকবে বাকি কৌমদের সঙ্গে পরস্পর নির্ভরতা ও নিবিড় ঐচ্ছিক সহযোগীতার বন্ধনে। এখানে না থাকবে দমনকারী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ক্ষমতার কোনো প্রয়োজন (কারণ power corrupts and absolute power corrupts absolutely!), না থাকবে টাকা-চিহ্নের ওপর নির্ভরতা। প্রত্যেক ব্যক্তি কাজ করবে তার ক্ষমতা অনুযায়ী, এবং সমাজ-শরীর তাকে তার প্রাপ্যটুকু ফিরিয়ে দেবে তার মৌলিক প্রয়োজন (basic need) অনুযায়ী। সর্বোদয়ের (সর্ব+উদয়— ‘সবার উদয়’, অর্থাৎ “বহুজন সুখায়, বহুজন হিতায় চ”। বৌদ্ধ দর্শনের উত্তরাধিকার লক্ষণীয়।) তত্ত্ব এমনটাই শেখায়— সকলের সার্বিক মানসিক-কায়িক-আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব পরজীবী সামাজিক জোঁক না হয়েই, থাকবন্ধী ব্যবস্থার প্রচার-প্রসার না ঘটিয়েই!

মোহনদাস-অনুগামী বিনোবা ভাবে এই সর্বোদয়ের তত্ত্বকে প্রায়গিক কর্মে ভিন্নভাবে রুপান্তরিত করলেন। তাঁর কল্পনার রাষ্ট্রহীন-শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থার আদর্শে স্থিত থেকে তিনি সমস্ত রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এক তত্ত্বগত জিহাদ ঘোষণা করেন, বলেন যে সবকটি দলই ক্ষমতাদখলের হাতিয়ার মাত্র, এক-একটি চরম হিপোক্রিসির আখড়া। পার্টি মানেই জাল-জোচ্চুরি, চুরি-চামারি, বিশ্বাসঘাতকতা থাকবেই, কোনো নৈতিক মানদন্ডকে জায়গা দেওয়া হবে না সেখানে। তাছাড়া এই এতো-সতো পার্টি এবং তার হাজারো খন্ডাখন্ড ভাগ-বাটোয়ারা (Factionalism) মানুষকে নিজেদের মধ্যে আলাদা-আলাদা করে দেয়, সামগ্রিক সমাজের প্রাণশক্তির প্রকাশকে ব্যহত করে। আদর্শের কোনো জায়গা সেখানে নেই, আছে কেবলই সাংগঠনিক কড়াকড়ি, বিধি-নিষেধ-নিয়ম-শৃঙ্খলের বাড়াবাড়ি এবং ক্ষমতা-কেন্দ্রিক ঝুঠা প্রোপাগান্ডা করবার উপায়-মাধ্যম। রাজনৈতিক দলগুলোতে “…power dominates while ideas become more convenient trademarks used to power political rivalry.”

প্রতিনিধিমূলক গণতান্ত্রিক সংসদেও বিশ্বাস রাখেননি ভাবে। তাঁর মতে সংসদ কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটায়, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সেখানে যায় হারিয়ে।

ভাবে তাই তাঁর দলহীনতার তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটান ভূদান, গ্রামদান এবং সম্পত্তিদানের মতোন সর্বোদয় আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। কেন্দ্রহীন ক্ষুদ্র গোষ্ঠী দ্বারা সংগঠিত স্বয়ং-চালিত সমাজটাই এই আন্দোলনগুলির লক্ষ্য।

জয়প্রকাশ নারায়ণও ছিলেন এই একই পথের পথিক। প্রথম দিকে মার্ক্সবাদ, কংগ্রেস-প্রচারিত সমাজতন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত হলেও পরবর্তীতে তিনি দলহীনতার তত্ত্ব পাড়লেন গান্ধীজি এবং ভাবের দর্শানো সর্বোদয়ের মার্গেই। তাঁর “Parting of the ways” চিঠিতে সাম্যবাদীদের বাৎলানো বৃহৎ শিল্পের প্রসার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে ধুয়ে দেন এক্কেবারে। জেপির মতে এই গোটা কম্যুনিস্ট প্রক্রিয়াটি একটি top-down আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার পত্তন করে এবং কিছু মানুষের স্বৈরাচারকেই শক্তি জোগায়। সাম্যবাদীদের সমাজতান্ত্রিক ভাবনা একরকমের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ (state capitalism) মাত্র (টনি ক্লিফ-রচিত রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বিষয়ক গ্রন্থ দ্রষ্টব্য), যেখানে রাষ্ট্রই হয়ে দাঁড়ায় পরম নিয়ন্ত্রা, সমস্তকিছুর পরিচালক, সমাজ-শরীরের নতুন প্রভু। মানুষের সরাসরি রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে (চমস্কি যাকে বলে থাকেন “public participation in the decision-making process”) এই ব্যবস্থায় কোনো গুরুত্ব দেওয়াই হয়না। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র কোনো বিকল্প দেখাতে পারেনা, কারণ তা রাষ্ট্র এবং আইনের দ্বারাই চাপানো হয়। কেন্দ্রশূন্য ছোটো ছোটো গ্রাম-কৌমের স্ব-শাসনের আদর্শকেই একমাত্র একচেটিয়া পুঁজিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের বিকল্প হিসেবে পেষ করা যেতে পারে। এমন ভাবনাই প্রকৃত সমতা-নির্ভর পরস্পর আদানপ্রদানের ভিত্তিপ্রস্তর রচনা করতে পারে। জেপির চোখে এই সমাজে থাকবে বিভিন্ন ছোট-ছোট ‘ভোটারস অ্যাসোসিয়েশন’ ইউনিট, যেখানে নাগরিকেরা নিজেরাই সময়ে-সময়ে বসবেন রাজনৈতিক নীতি-তত্ত্ব-আদর্শ-আইডিয়া-সমস্যা-পরিকল্পনা বিষয়ক যৌথ আলাপ-আলোচনা-সংলাপে, এবং এর মাধ্যমেই নেওয়া হবে সমাজ-বিষয়ক যাবতীয় সিদ্ধান্ত। এইসমস্ত বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক তৈরি হবে জন-আলোচনার মাধ্যমেই (হাবেরমাসের “dialogue without manipulation”-এর উল্লেখ এক্ষেত্রে জরুরী)। মুখোমুখি চলতে থাকা এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সঞ্চারিত হবে এক কৌম থেকে আরেক কৌমে, যেখানে প্রত্যেকের মতামতই পাবে সমান স্থান। এতে কাজে লাগবে লোকজ্ঞান বা লোকবিদ্যা—যা সামাজিকভাবে বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে আহৃত দেশজ জ্ঞান (এখানে মনে রাখা দরকার যে জ্ঞান-জ্ঞানী লোকজ এবং অলোকজ জ্ঞানের মধ্যে কোনো একটিকে আপেক্ষিক গুরুত্ব না দিয়ে বা প্রিভিলেজ না দিয়ে চিন্তন-মননের উদ্ভাসকেই এই স-তর্কে আমরা বজায় রাখবো)। থাকবে পঞ্চায়েতি রাজ। তৈরি হবে যৌথখামার। কৃষিজমি থাকবে কৃষকের হাতেই।

জেপির এই সর্বোদয়-ভাবনা এসে পৌঁছয় তাঁর “সম্পূর্ণ বিপ্লব”-এর তত্ত্বদর্শনে। এই বিপ্লব কোনো বিশেষ একটি ক্ষেত্রে আবদ্ধ না থেকে মানববিশ্বের প্রত্যেকটি দিকঃ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আধ্ম্যাতিক, আদর্শগত, শিক্ষাগত দিকগুলিতে সম্পূর্ণ পরিবর্তন আনতে চায়।

[এ ক্ষেত্রেই অম্লান দত্ত প্রশ্ন তোলেনঃ এই ছোটো ছোটো পোলিস বা বি-কেন্দ্রে যদি কোনো নেতা গুন্ডাবাজীতে তন্দুরস্ত হয়ে ওঠেন, তবে কি করবো? দ্বিতীয়ত, ভিন্ন মতের প্রতি সহিষ্ণুতার আদর্শরই বা কি হবে? ধরা যাক, চরম হিঁদুত্ববাদী মোল্লা বা পাদ্রী যদি আজেবাজে বকতে শুরু করেন, তাহলে কি আমরা সেটাকে সহ্য করবো? যদি সহ্য করি, তাহলে সেই অসহিষ্ণু মানুষটি কর্তার ভূত হয়ে আমাদের ঘাড়েই চেপে বসবে। এখানে আমরা মনে রাখবো, কার্ল পপারের “প্যারাডক্স অফ টলারেন্স” তত্ত্বকে।]   

ভুলে যাওয়া মানবেন্দ্রনাথ রায় -এর কথা মনে করাই এবার। প্রথমে কম্যুনিস্ট পার্টি তৈরি করেন মেহিকোতে এবং পরে ১৯২০ সালে তাসখন্তে নির্মাণ করেন কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া। লেনিনের সঙ্গে দেখা করেন, কমিন্টার্নের সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট হৃদ্যতা ছিলো। আমেরিকা, এশিয়া এবং ইয়োরোপে ঘটে চলা বিভিন্ন বিপ্লব-সংগঠনে সক্রীয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন এককালে। পরে দেশে ফিরে এসে ১৯৪৬ নাগাদ তিনি তাঁর র‍্যাডিকাল মানবতাবাদের কথা হাজির করেন। এর মাধ্যমে গান্ধীজির পথ থেকে স্বাধীন অথচ তত্ত্বগতভাবে সমধর্মী এক নয়া-বিশ্ববীক্ষার কথা বলেই ফেলেন তিনি। বলা যায় যে দলহীন গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ ভারতীয় ক্ষেত্রে প্রথম তিনিই প্রস্তাব করেন একটা নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে।

সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক এক্সপেরিমেন্ট তখন এক সর্বগ্রাসী দানবের দৌরাত্মে পরিণত হয়েছে। কমান্ড ক্যাপিটালিস্ট রাশিয়ার অত্যধিক রাজনৈতিক ক্ষমতার বাড়বাড়ন্ত এবং বেড়ে চলা অর্থনৈতিক বৈষম্য মানব রায়ের মত-পথ-চিন্তা বদলিয়ে ফেলে সম্পূর্ণতই। এসব দেখে-শুনে তিনি ভালগার মার্ক্সবাদের চেনা পথ থেকে একেবারে সরে আসেন। চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন বাজার-চলতি মার্ক্সবাদে দর্শানো ঐতিহাসিক তথা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ (“ইতিহাসের অমোঘ, আবশ্যিক নিয়ম”-জাতীয় Historicist আবোল-তাবোল) এবং একপেশে প্রলেতারীয় রাজনৈতিক বিপ্লবের ধারণার বিরুদ্ধে। মানব রায় খুব ভালোভাবেই ধরতে পারেন যে রেজিমেন্টেড-আমলাতান্ত্রিক সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনোভাবেই নাগরিক অধিকারের জায়গা নেই, জায়গা নেই কোনোরকমের নৈতিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের কিংবা মানবেচ্ছার বাঁধনহীন প্রকাশের সুযোগের।

সংসদীয় গণতন্ত্রও কোনো বিকল্প পথ দেখাতে পারেনা কারণ সেখানেও এই অধিকারসকল এবং মূল্যবোধগুলো হয়ে দাঁড়ায় কথার-কথা মাত্র! সংসদীয় গণতন্ত্রের অর্থনৈতিক ছায়াসঙ্গী laissez-faire মুক্ত বাজার সহযোগীতার বদলে প্রধাণ ভূমিকা প্রদান করে নিরন্তর অসম প্রতিযোগীতার সম্পর্ককে।

তাহলে রাস্তা কি? র‍্যাডিকাল গণতন্ত্রের নয়া-মানবতাবাদী দলহীনতার আদর্শে জায়গা করে নেয় স্থানীয় গণতন্ত্রের (local democracy) ভাবনা—যেখানে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত পিরামিড-কাঠামোর কোনো স্থান নেই। সাধারণ ব্যক্তি-মানুষ এই নয়া ব্যবস্থায় তলা থেকেই ‘পিপলস কমিটি’র মাধ্যমে নিজেদের মতোন চালাতে পারবেন তাঁদের ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র গণরাজ্য বা “পিপলস রিপাব্লিক”গুলোকে—এ একরকমের ‘সরাসরি গণতন্ত্র’ (Direct Democracy) আরকি। এই সমাজ-গণতন্ত্রে থাকবে রাইট টু রিকল এবং রেফারেন্ডাম গঠন করবার মাধ্যমে সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। তবে এসবের আগে প্রয়োজন এক সাংস্কৃতিক, দার্শনিক বা জ্ঞানীয় বিপ্লব তথা নবজাগরণের (cultural, philosophical or intellectual revolution or renaissance)—যা মানুষের মননে সম্পূর্ণ বদল ঘটাতে পারবে। তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি এবং অবৈধ কতৃপক্ষের জোরজবরদস্তি থেকে মুক্ত হওয়ার এটাই একমাত্র উপায়। রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটিয়ে লাভ নেই যদি তা একই রাষ্ট্রনৈতিক এবং ধর্মনৈতিক শাসনতান্ত্রিক মননকে এগিয়ে নিয়ে চলে।

“মনের মধ্যে নিরবধি শিকল গড়ার কারখানা।

একটা বাঁধন কাটে যদি বেড়ে ওঠে চারখানা।।

কেমন ক’রে নামবে বোঝা, তোমার আপদ নয় যে সোজা–

অন্তরেতে আছে যখন ভয়ের ভীষণ ভারখানা।।”

মননে পরিবর্তন অথবা মননে স্বরাজের কথাটা লিখে কিছুক্ষণের জন্য লেখা থামাই। চুপ করে বসে থেকে ভাবিঃ মিশেল ফুকোর একটা লেখায় একবার পড়েছিলাম, আমাদের মগজের মধ্যে যে ফ্যাসিবাদ অনবরত কাজ করে চলে, আমাদের প্রতিদিনের কর্মে-কথায় যে স্বৈরাচার সময়ে-সময়ে প্রকাশ পেয়ে যায়, তার থেকে মুক্তি কোথায়?

মোবাইলে চটপট একটা সার্চ করিঃ the Kibbutz system in Israel. ইজরায়েলে বিশ শতকের প্রথম দিকেই একধরণের কৌম সৃষ্ট হয়েছিলো যা এতোক্ষণের আলোচনায় বর্ণিত সরাসরি গণতন্ত্রের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। সমস্ত সম্পদের ওপর সেখানে ছিলো সকলেরই যৌথ মালিকানা, কোনো ব্যক্তিবিশেষ সেখানে মুনাফা সরিয়ে নিয়ে ভেগে যেতে পারতো না। “Being in common” (agrarian commune-এ যেমনটা হয়)-এর বাস্তব দৃষ্টান্ত আরকি! চমস্কি তাঁর রুডলফ রকার-অনুপ্রাণিত Anarcho-Syndicalism আলোচনা করতে গিয়ে এইধরণের কৌম-গণতন্ত্রের কথা বারংবার উল্লেখ করে থাকেন। চমস্কি আরো মনে করেন যে বিভিন্ন মুক্ত অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে একধরণের রাষ্ট্রহীন ফেডারাল কাঠামো-দ্বারা চালিত হবে সমাজ-শরীর। থাকবে না কোনো ব্যক্তি নেতা বা সংগঠনমূলক নেতৃত্বের প্রয়োজন।  

এমত ব্যবস্থার প্রয়োগ ঘটলে শুধু যে আমরা এই ভয়ানক অর্থনৈতিক বিপর্যয় (মূদ্রাস্ফিতী, বেসরকারীকরণ, বেকার-সমস্যা ইত্যাদি)-এর হাত থেকে রক্ষা পাবো তাই নয়, পূর্বে উল্লিখিত প্রাকৃতিক সংকট সমাধানের একটা উপায়ও হয়তো পাওয়া যাবে। এই বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থায় প্রকৃতির সঙ্গে মৈত্রীবন্ধন স্থাপন করেই জীবন সার্বিকরূপে গড়ে উঠবে, কোনোরকম বৃহৎ শিল্প থাকবেনা, কাজ চলবে স্থানীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়েই, জীবাশ্ম না পুড়িয়েই। এর ফলে কমবে শহর-কেন্দ্রিকতা, বাড়বে আরণ্যকের পরিসর। তবে শহরকে এক্কেরে বিলুপ্ত করার কথা বলছিনা, বলছি agro-city নির্মানের প্রয়াস (যেমনটা সোভিয়েত সাম্রাজ্য-পতনের পর দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ক্যুবাতে Organopónicos বা শহুরে কৃষিব্যবস্থা চালু করা হয়)। কাজেই, কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিগড়োনোর ব্যাপার-স্যাপার থাকবেনা আর।

“কোন্‌ পুরাতন প্রাণের টানে

ছুটেছে মন মাটির পানে…”

এইসব ভাবতে ভাবতে আবার তামাক ধরাই। লেখা চলতে থাকে…

ওপরে বর্ণিত পথপ্রদর্শকরা ছাড়াও আমাদের স্বভূমিতেই রজনি কোঠারি, পান্নালাল দাসগুপ্ত, ভিথল তার্কুন্ডে, অম্লান দত্তদের মতোন আরো বিভিন্ন ভাবুক, বিচারক, রাজনৈতিক কর্মীরা মিলে প্রায় এই একই কথা বলেছেন, দেখিয়েছেন না-রাষ্ট্র, না-পার্টির বি-কল্প-নার রাস্তা। তাঁদের লেখাপত্তর আবার পড়ে দেখা জরুরী। বিশেষত কোঠারি বলেছিলেন এই “পার্টি সিস্টেম”-এর মূলগত বিপদের কথা, অর্থাৎ যে চেনা ধাঁচায় সব রাজনৈতিক দলগুলো কাজ করে চলে।

সাম্প্রতিককালে “India Against Corruption” আন্দোলনের উদ্গাতা আন্না হাজারে উত্থাপন করেছিলেন এই দলহীন গণতন্ত্রের কথা ২০১৯ সালে। তিনি বলেন যে সংবিধান-অনুযায়ী একমাত্র ব্যক্তির অধিকার আছে নির্বাচনে লড়বার, কিন্তু কোনো বিশেষ সংগঠন বা পার্টির দরকার নেই। সাধারণ ব্যক্তি-নাগরিক নিজেই নির্বাচন লড়ুক। প্রত্যেক ব্যক্তি সংবিধান-অনুযায়ী স্বয়ং-শাসিত।

কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রের সার্কাসে আন্না হাজারে যেন আজ কোথায় উধাও। কিছুদিন আগেই অবশ্য অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ক্ষমতা-এষণার চুড়ান্ত সমালোচনা করেছেন তিনি একটি চিঠির মাধ্যমে; তবে দৈনন্দিনের মূর্ত, বাস্তব ভারতদেশে এই দলহীনতার আদর্শ নিয়ে ছোটো-বড়ো কোনো আন্দোলনই চোখে পড়েনা। “Party-politics or no politics at all”-জাতীয় “All or nothing” যুক্তিটাই আজ একমেবাদ্বিতীয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। More, Less, Lesser Evil-দের উদ্ভট আঁক কষতে বসেছে তাই বহু বহু সাধারণ জনগণ।

তবে হ্যাঁ, গত এক দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে যেভাবে অসহযোগ আন্দোলন জায়গা করে নিচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমকে (গণতন্ত্রের পঞ্চম স্তম্ভ) অসামান্যভাবে কাজে লাগিয়েই— তা অনেকটা আশা জোগায়। সে আমেরিকার শেয়ার-মার্কেট বিরোধী Occupy Wall Street, অথবা মধ্য-প্রাচ্যের Arab Spring Uprisings, কিংবা ২০১১য় মিশরের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ইন্টার্নেট বিপ্লবই হোক না কেন! এছাড়াও আরো বেশ কিছু ছোটো-ছোটো আন্দোলনঃ Green Socialist Movement, Black Lives Matter, Iranian Green Movement ইত্যাদি আমাদের এই নিরাশা-মানেহীনতার পরিবেশে অনেকটা সাহস দেয়। এই বিচ্ছিন্ন আন্দোলনগুলোকে যদি কোনোভাবে একটা জালে (network) সংযুক্ত করা যেতো—তবে কেমন হতো! হেনরি ডেভিড থরোর কথা মনে পড়ে। আইন-অমান্যকারী আন্দোলনগুলো (গান্ধীজি থেকে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র) পৃথিবী জুড়ে গজিয়ে ওঠবার অনুপ্রেরণা (এই শব্দটা ব্যবহার করতেও আজকাল ভীষণ কুন্ঠাবোধ করি!) দিয়েছে এই থরোর লেখা “On the Duty of Civil Disobedience”। “এস্ট্যাবলিশমেন্ট”র ক্ষমতা-কাঠামোকে প্রশ্নায়িত না করতে পারলে, সমস্যায়িত না করতে পারলে এদ্দিন কিই বা শিখলাম রাজনৈতিক দর্শন…! 

শেষ নাহি যে…।।

মাথা যন্ত্রণা করছে খুব। আর লিখতে পারছিনা। কখন যে বেলা বারোটা বেজে গেছে লিখতে লিখতে, খেয়ালও করিনি। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমেছে। ওয়ার্ড ফাইলটায় Ctrl+S টিপে মাথাটাকে বালিশের ওপর হেলিয়ে দিলাম। মাথায় আর কিচ্ছু কাজ করছে না। এই যে এতো কিছু লিখলাম, তাতে অনেকেই হয়তো আমাকে “ইউটোপিয়ান”, “ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী”, “নৈরাজ্যবাদী”, “রিভিশনিস্ট”, “রিফর্মিস্ট”, “রিগ্রেসিভ”, “পাতি বুর্জোয়া” ইত্যাদি বলে গাল পাড়বেন… অনেকেই বলবেন যে এইসব দলহীন ভাবনা-টাবনা সব আজেবাজে কল্পনামাত্র, বাস্তবে যেমন চলছে, ঠিক তেমনটাই চলবে। কিন্তু কি করবো বলুন, স্বভাব যায় না মলে… “আমার কিন্তু স্বপ্ন দেখতে আজও ভালো লাগে!” তাই হালটা ছেড়ে দিইনি। মরে বেঁচে থাকা এই বদ্ধ purgatory-র “বাইরে”টাকে খুঁজে বের করতেই হবে। “মুক্তধারা”য় অভিজিৎ যেভাবে বাঁধের একটিমাত্র ছিদ্রকে চিহ্নিত করে যন্ত্ররাজের গোটা সভ্যতাকে এক নিমেষে ধসিয়ে দিতে পেরেছিলো, তেমনভাবেই আমাদের প্রত্যেক্কে একরকমের দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে আমাদের নিজেদের ভাবনার সংগ্রামে, নিজেদের যাপনের চর্যার মধ্যেই। এই “Philosophy of Praxis” আমাদের ধণঞ্জয় বৈরাগী হয়ে বলতে শেখাবেঃ

“রইল বলে রাখলে কারে?

হুকুম তোমার ফলবে কবে?

টানাটানি টিকবে না, ভাই,

রবার যেটা সেটাই রবে।

রাজা, টেনে কিছুই রাখতে পারবে না। সহজে রাখবার শক্তি যদি থাকে তবেই রাখা চলবে।

(…)

যিনি সব দেন তিনিই সব রাখেন। লোভ করে যা রাখতে চাইবে সে হল চোরাই মাল, সে টিঁকবে না।

যা-খুশি তাই করতে পার,

গায়ের জোরে রাখ মার,

যাঁর গায়ে তার ব্যথা বাজে

তিনিই যা সন সেটাই সবে।

রাজা, ভুল করছ এই, যে, ভাবছ জগৎটাকে কেড়ে নিলেই জগৎ তোমার হল। ছেড়ে রাখলেই যাকে পাও, মুঠোর মধ্যে চাপতে গেলেই দেখবে সে ফসকে গেছে।

                                  ভাবছ, হবে তুমি যা চাও,                                 

জগৎটাকে তুমিই নাচাও,

দেখবে হঠাৎ নয়ন মেলে

হয় না যেটা সেটাও হবে।”

এই “হয় না যেটা সেটাও হবে”-র তত্ত্বকথাই (যা একইসঙ্গে বাস্তব কর্মযোগের সাধনীয়র সঙ্গে সম্পৃক্ত) পেশ করতে চাইলাম এতক্ষণ আমার ওই লেখার মাধ্যমে। কেউ পড়লে পড়বে, না পড়লে হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু ইতিহাস এইটুকু মনে রাখবে যে কেউ অন্তত এই কথাগুলো সর্বসমক্ষে সোচ্চারে বলেছিলো!

“Condemn me. It is of no importance. History will absolve me.”

কিন্তু আমার মতোন তুচ্ছ একজনের কথা কেউ শুনবে কেন? কোনো সওদাগর তো আমার পিছনে বিস্তর টাকা ঢালেনি! উল্টে সবকটা পার্টিকেই এন্তার খিস্তি দিয়েছি—কারুক্কেই ছেড়ে দেওয়ার পাত্র আমি নই। তবে?

ফোনটা বেজে উঠলো। রিংটোনে “Les Misérables”-এর চলচ্চিত্র রুপান্তরের অন্তর্গত “Do you hear the people sing”-এর ফিঙ্গারস্টাইল গিটার কভার। এক বন্ধুর ফোন। ফোন ধরলাম, ওপাশ থেকে ও বলে উঠলোঃ

— “কিরে, আজকে ফাঁকা আছিস? এখন তাহলে একবার নন্দন চত্তরে চলে আয়। কথা আছে। জাস্ট একটু জল খেতে চাওয়ায় রাজস্থানে একটা দলিত বাচ্ছাকে বেধরোক পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে ক’দিন আগেই। হিন্দু রাষ্ট্র তৈরি হতে চলেছে ২০২৪-এর মধ্যেই। কেউ আটকাতে পারবো না। বুঝলি?”

আমি শুধু বলতে পারলামঃ “সেকি, খবরটা পাইনি তো! তবে এটা কি এদের থেকে প্রত্যাশিত নয়? আকলাখ বা পেহলু খানদের ঘটনাগুলো মনে নেই তোর? গুজরাট ফাইলগুলো সর্বসমক্ষে এলে আরো কান্ডকারখানা জানা যাবে। বিভীষিকাময়! যাই হোক, আমি ঘন্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি। দেখা হচ্ছে!”

ফোনটা রেখে দিলাম। তৈরি হয়ে নেবো এবার। বেরোতে হবে।

জামা-কাপড় গলাতে গলাতে ব্লুটুথ স্পিকারে একটা গান চালিয়ে দিলাম, গানটার নিম্নোল্লেখিত লাইনগুলো বিশেষ করে আমার কানে-মনে-মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকলোঃ

“পারিনি সহজে তোকে বুঝিয়ে দিতে কাদের দেশ ছিল আমেরিকা

পারিনি সহজ করে জানিয়ে দিতে কেন ভাঙা হল বার্লিনের দেওয়ালটা…

শুধু পারি খুব সহজে তোর মনে গেঁথে দিতে

বেশী টাকা মানেই ভাল থাকা!

পারিনি বোঝাতে কেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে মনের ভেতর গান্ধীজি

পারিনি চেনাতে তোকে সে তোর বন্ধু নাকি সে তোর বাড়ির ঝি…

তাই পারছিনা বোঝাতে কেন গলায় দড়ি দিল

চোদ্দো বছরের টুকটুকি!

পারিনি আমি পারিনি পারিনি পারিনি পারিনি…

বোঝাতে পারিনি পারিনি পারিনি পারিনি পারিনি…!”

এবার তিনটে চলচ্ছবি দেখুনঃ

  1. ভোটং দেহি (Begging Votes) এখানে দেখুনhttps://vimeo.com/326016916
  2. THE END OF DIALOGUE (সংলাপ খতম) এখানে দেখুন
আখর বন্দ্যোপাধ্যায়
আখর বন্দ্যোপাধ্যায় (২০০১)
 
বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্রের ছাত্র। প্রাথমিকভাবে ইস্কুলী পঠন-পাঠন করেছেন Deschooling Society-র আদর্শে। দর্শনের ছাত্র হয়েও আখরের ভালোবাসা সমাজতত্ত্ব, সাহিত্য থেকে থিয়েটার (যুক্ত ছিলেন থিয়েটার ওয়ার্কশপ, স্বপ্নসংলাপ, বিডন স্ট্রিট শুভম, নির্বাক অভিনয় অ্যাকাডেমির সঙ্গে) অব্দি বিস্তৃত। নিজেকে দলহীন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। জ্ঞানতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের বিষয়ে আপাতত বৈজ্ঞানিক সন্দেহবাদের অনুগামী। ইতোমধ্যেই স্পিনোজা, ডিরোজিও এবং ভগৎ সিংকে নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন, বক্তব্য রেখেছেন দিল্লী স্টেট আর্কাইভের নিমন্ত্রনে, পেয়েছেন ICPR-কতৃক প্রদত্ত পুরষ্কার। তাঁর কিছু প্রবন্ধের তর্জমা হয়েছে পর্তুগিজ, উর্দু এবং গ্রিক ভাষায়। তাঁর বেশ কয়েকটি লেখাপত্র ছাপা হয়েছে ইন্টার্যা্কশন, অন্যপত্র, শ্রয়ণ, সোস্যালিস্ট ফাইট, এশিয়ান মার্ক্সিস্ট রিভিউ, Frente Comunista dos Trabalhadores-এর মতোন পত্র-পত্রিকায়। 


©All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.