An Interview by Portuguese Author RUI ZINK translated by RITA RAY

বাংলা English

রুই জ়িঙ্ক: “সাহিত্যের জগৎটা জানে না সে শিল্পকলা না শিল্পদ্যোগ”

ত্রৈমাসিক পত্রিকা উ জেরাদর-এর ১৭ই ডিসেম্বার, ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত রুই জ়িঙ্কের সাক্ষাৎকার; উ জেরাদর-এর তরফে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে সুফিয়া ক্রাভাইরু। 
RUI ZINK
    Portuguese writer Rui Zink was born on June 16, 1961. "Writes books, gives lectures, i magines  things." - Rui Zink in his own description. He continues to write one story after another, novels, plays, graphic novel and much more. His language has become beyond its own boundaries. The structure of his written text also goes beyond conventional grammar. A different world came to life in subjective language. 'Torkito Tarjoni' has been  published on the occasion of his upcoming  60th birthday on June 16. Presently a lecturer by profession. His first novel was ‘Hotel Lusitano’(1986). Zink is the author of ‘A Arte Superma’(2007), the first Portuguese Graphic Novel. Also his ‘Os Surfistas’ was the first interactive e-novel of Portugal. He is the author of more than 45 published books all over.   Zink achieved prestigious ‘Pen Club’ award on 2005 for his novel ‘Dádiva Divina’. His several books has been translated in Bengali like ‘O Livro Sargrado da Factologia’(‘ঘটনাতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থ, 2017), ‘A Instalação do Medo’(‘ভয়, 2012), ‘O Destino Turístico’(‘বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা', 2008), 'Oso'('নয়ন') etc.     

তাঁর এমন সব লেখা আছে যেগুলো ভবিষ্যতের আগাম আঁচ দেয়, কিন্তু তিনি বলেন যে তাঁর একমাত্র আগ্রহ অতীতকে জানা। “তিরিশটিরও বেশী বইয়ের” লেখক রুই জ়িঙ্ক সর্বদা নিজের প্রতি বিশ্বস্ত এবং কখনই একটিমাত্র সাহিত্যের জঁরের প্রতি তাঁর সেই বিশ্বস্ততা নেই। তাঁর বক্তব্য – “আমি কোন শৈলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নই, কিন্তু সেটা অন্যদের সমস্যা”।

লেখক ও উনিভির্সিদাদ নভা দ্য লিশবোয়ার ফাকুলদাদ দ্য সিয়েন্সিয়াশ সুসিয়াইশ ই উমানাশে অধ্যাপক, রুই জ়িঙ্ক নাটকের দল “ফিলিজ়েশ দা ফে” আর আসুসিয়াসাঁও দ্য সিদাদাঁওশ আউতু-মুবিলিজ়াদুশের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য। উপন্যাস থেকে কমিক্স, সবকিছুই একটু একটু করে লিখেছেন, প্রবন্ধ বা শিশুসাহিত্যও বাদ যায়নি। দেশেবিদেশের বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন, যেমন ২০০৪ সালে দাদিভা দিভিনা উপন্যাসের জন্যে পোর্তুগালের পেন ক্লাবের পুরস্কার, কিংবা ২০১৭ সালে ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ বিদেশী উপন্যাসের জন্যে প্রী ইউতোপিয়ালেস, আ ইন্সতালাসাঁও দু মেদু-র ফরাসী অনুবাদের জন্যে। এই উপন্যাসটি নাট্যরূপও হয়েছে, যেটি এ বছর ফ্রান্সের ফেস্তিভাল দ’আভিন্যিওঁতে মঞ্চায়িত হয়েছে।         

এই ২০২১ সালে, যখন তিনি তাঁর কর্মজীবনের পঁয়ত্রিশ বছর এবং জীবনের ষাট বছর পূর্ণ করছেন, তখন আ ইন্সতালাসাঁও দু মেদু-র পুনর্মুদ্রণ বেরিয়েছে, তাঁর যে উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এই বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি ওল্টানর অর্থ গত এক দশকের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ফিরে দেখা। এই অজুহাতে এক বিকেলে আমরা ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক আর অন্যান্য মহামারী নিয়ে কথা বলছিলাম। প্রসঙ্গের ব্যাপারে মনোযোগী রুই জ়িঙ্কের যে কোন লেবেলেই আপত্তি, কিন্তু সাহিত্যজগতের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করতে তাঁর কোনরকম ভয় নেই। “যত লেখকের প্রতি অন্যায়-অবিচার করা হয়েছে, আমি তাদের সবার হয়েই কথা বলি, তাদের সঙ্গে আমার একটাই তফাত, আমার মাইক অবধি পৌঁছনর ক্ষমতা আছে”, তিনি জোরের সঙ্গে বলেন।  

সু ক্রা – “ভয় হল অ্যানেস্থেসিয়ার মত। ভয় সিনেস্থেসিয়ার মত। ভয় রোগ সারায়। ভয় পোড়ায়। ভয় আরাম দেয়। ভয় মেটায়।[1] এটাকে তো মনে হয় কোন বদভ্যাস, কোন নেশার বর্ণনা। আপনার কি মনে হয় আমরা ভয়ে আসক্ত একটা সমাজ?   

রু জ়ি – আমার মনে হয় না যে আমরা একটা আসক্ত সমাজ, কিন্তু আমরা এমন একটা সমাজ যেটা এই মুহূর্তে নেশাসক্ত তো পরমুহূর্তেই সে নেশা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছি। এখন আমরা খোঁয়ারি কাটানর পর্বে রয়েছি। আমার মতে সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয় যে ভাল আর মন্দের মধ্যে একটা লড়াই চলেছে।    

সু ক্রা – সেটা কি চিরস্থায়ী?

রু জ়ি – চিরস্থায়ী, ওয়াল্ট ডিজ়নির মত। আর, যেটা হয়ে থাকে, সেটা হল ভাল আর মন্দ এমন সব জিনিশের সহজ সরল নাম যেগুলোর ঝোঁক এই সদর্থক তো এই নঞর্থক। অর্থাৎ, কিছুটা পেন্ডুলামের মত আর এই লড়াইটা বরাবরই আছে। যেটা ঘটনা তা হল মন্দ ভালর চেয়ে অনেক বেশী বিরল, জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে। এটা ভাল খবর। এই বিরল হওয়াটা।    

সু ক্রা এটা কি একটা পরীক্ষিত সত্য, আপনার মতে?

রু জ়ি – এটা পরীক্ষিত সত্য। যতগুলো খুনোখুনি হওয়া উচিত ছিল ততগুলো কিন্তু হয় না। প্যানডেমিকটা কিন্তু যতটা মনে হয়েছিল অতটাও তীব্র নয়। রোজ কোন একটা ট্র্যাজেডির কারণে যতজন বাবামা কাঁদে, তার থেকে অনেক বেশী জন বাবামা কিন্তু তাদের বাচ্চাদের বাড়ি নিয়ে ফেরে, একটা আনন্দময় দিনের শেষে। আর আমাদের জীবনে আমরা মরার চেয়ে অনেক বেশী বার বেঁচেছি। এভাবে বললে ব্যাপারটা খুব বোকাবোকা শোনাবে, কিন্তু এটাই সত্যি। যদি কেউ হিসেব করে, তো দেখবে যে মৃত্যুর চেয়ে জীবনের দিন অনেক বেশী, কিন্তু মৃত্যু হল অনেক বেশী দৃষ্টি-আকর্ষক। যেটা হয়ে থাকে সেটা হল, মন্দটা যেন একটা খয়েরি রঙের বোর্ডের ওপরে একটা হলুদ রঙের ফোঁটা। চোখে পড়ে। আর যদিও তার গুলির সংখ্যা অনেক কম, কিন্তু যখন সেগুলোকে সে ব্যবহার করে সেগুলো অনেক বেশী চোখে পড়ে আর চূড়ান্তও হয়।      

সু ক্রা – সুতরাং লক্ষণীয়।  

রু জ়ি – ব্যাপারটা সহজ: যেমন, আমি রোজ গাড়ি চালিয়ে যাই আর কাউকে চাপা দিই না। কিন্তু কার্লুশ [য] আর্মেনিউর [কাব্রিতা][2] – এটা ওর নাম, কার্লুশ [য] আর্মেনিউ – ড্রাইভারের সঙ্গে যেটা ঘটেছে, সেটা যেদিন আমার সঙ্গেও [ঘটে] – সেটা চূড়ান্ত। সেটা সবার জন্যেই চূড়ান্ত: যে চাপা পড়েছে, তার জন্যে, আর অন্যদের জন্যেও। তাদের ওপরে একটা দাগ রেখে যায় আর সেটা বরাবরের জন্যে। যেমন, একটা লোক অপরাধ করে, অন্য একজন মরে কিন্তু সে-ই জেলে বন্দী থাকে বেশ কিছু সময় ধরে। সুতরাং এটা একটা নির্ধারক। আমরা সবসময়েই এই দুই মেরুর মধ্যে থাকি।   

সু ক্রা – এই বইটা আসলে লেখা হয়েছিল ২০১২ সালে, ত্রইকার[3] সময়ে, [আর্থিক] সঙ্কটের সময়ে। এতটাই যে, প্রথমেই যে জিনিশগুলো চোখে পড়ে তার একটা হল “কাঠামোগত সংস্কার” আর সবই হল “কাঠামোগত সংস্কার”… বইটাকে আবার প্যান্ডেমিকের পর্বে পুনর্মুদ্রিত করাতে সেটার নতুন একটা প্রাসঙ্গিকতা তৈরি হয়েছে। এটা ইচ্ছাকৃত, তাই না?    

রু জ়ি – না। সব বইয়েরই একটা উদ্দেশ্য থাকা দরকার আর একটা কারণ থাকা দরকার। একজন যখন, হঠাৎ, এমন একটা জিনিশ লিখতে বসে যেটা, কবিতার মত, এক নিমেষে লেখা যায় না, তখন তার একটা জোরাল কারণ থাকা প্রয়োজন, কিন্তু, তারপরে, বইটা যদি কেবল তা-ই হয় যেটা সে সৃষ্টি করেছে বলে মনে করে, তবে সেটা মাঝারি মানের হয়ে পড়ে। এটা তো অনস্বীকার্য আর আমিই তো প্রথম এ কথাটা বলছি না: একটা টেক্সটে দুটো মুভমেন্টকে কাজ করতে হয়। প্রথমে একটা দিক আর একটা হেতু, আর তারপরে, বইটা যদি কেবল ওই দিকেই আর ওই হেতুটা ধরেই বসে থাকে তো সেটা মাঝারি মানের হয়ে যায়।  

সু ক্রা – অর্থাৎ: বিভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যেই তার শক্তিটা থাকে?

রু জ়ি – কেবল শক্তি নয়… বইটা গড়াবে কিনা কখন কখন সেটা লেখকের ওপরে নির্ভর করে না। এই সংস্করণটায় একমাত্র যেটা নতুন সেটা হল পরিশিষ্টটা, যেটার জন্যে আমায় প্রচুর খাটতে হয়েছে, কারণ আমি সেটার জন্যে ঠিক সেভাবেই খেটেছি যেভাবে বাকি বইটার জন্যে খেটেছি।   

সু ক্রা – কিন্তু আপনি কয়েকটা জায়গায় সম্পাদনা করার কথা বলেছেন।  

রু জ়ি – হ্যাঁ, কিন্তু সেগুলো খুবই সামান্য। আমার কাছে সম্পাদনার মানে কেটে বাদ দেওয়া, আরও সহজ করা।

সু ক্রা – যোগ করা নয়?

রু জ়ি – যোগ করা নয়। আমরা কেবল আধখানা পাতা যোগ করেছি, কারণ ন্যারেটিভে একটা ফাঁক রয়ে গিয়েছিল।

সু ক্রা – আচ্ছা। যেমন, প্যানডেমিকের যে বর্ণনাটা আছে, সেটাকে [বর্তমানের ওপর ভিত্তি করে] বদলান হয়নি…

রু জ়ি – কিচ্ছু বদলান হয়নি। মানে, পরিস্থিতির কারণে কিছুই বদলান হয়নি, যদিও তাতে আমার বেশ মজা লেগেছে।

সু ক্রা – কারণ যা ঘটেছে তার প্রতি ওই বর্ণনাটাকে খুব বিশ্বস্ত বলে মনে হয়…   

রু জ়ি – হ্যাঁ, কারণ প্যানডেমিক তো আগেও হয়েছে [হাসি]। এমন অনেক লেখক আছেন যাঁরা খুশি  হন যখন কেউ বলে: “কি করে এমন একটা বাচ্চাকে ঢোকানর কথা আপনার মাথায় এল যে ঈশ্বর আর একজন কুমারীর সন্তান? আপনি তো জিনিয়াস!”। আবার এমন লেখকও আছেন যাঁরা চুপ করে থাকেন। আর আমি হলাম সেই লেখক যে ফোঁস করে ওঠে। আর সঙ্গেসঙ্গে বলে উঠি: “আরে ভাই, বাইবেল দেখ [হাসি], ওখানেই তো আছে।” সুতরাং, আমি জীবনে বেশ কিছু প্যানডেমিক দেখেছি। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপটা, সত্যিকারের, ছিল এইডসের, যেটা লক্ষ লক্ষ মানুষ মেরেছে আর অন্যটা, যেটা অনেক বেশী কল্পিত ছিল – দুটো ছিল কল্পিত, মানে সেগুলোকে যতটা গুরুতর বলে মনে করা হয়েছিল, সেগুলো অতটাও হয়নি – সেটা হল ইবোলা ভাইরাসের, নব্বইয়ের দশকে – এমনকি ডাস্টিন হফম্যানের একটা সিনেমাও আছে [এই নিয়ে]। আমি একটা বই পড়েছিলাম, বাড়িতে আছে সেটা, যেটাতে বিভীষিকার একটা বর্ণনা আছে: ইবোলা হয়েছে এমন একটা লোকের, ছ’ঘণ্টা পরে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো তরল হতে শুরু করে। আমার এটা মনে আছে। ২০০১ বা ওইরকম সময় নাগাদ, বার্ডফ্লু হয়েছিল, যেটার জন্যে সেই সময়কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী দশ-বিশ লক্ষ ভ্যাক্সিন কিনেছিলেন। প্যানডেমিকটা হয়নি বলে প্রচুর লোকজন বলেছিল: “মানে রাষ্ট্র ফালতু টাকা নষ্ট করে বেড়িয়েছে!” আর এটা আমি খানিকটা বুঝিও। অর্থাৎ, প্যানডেমিকটা বাস্তবিক হওয়ার আর বার্ডফ্লু সত্যিসত্যিই এ দেশে এসে পড়ার চেয়ে টাকার অপচয়টা ভাল। যাদের সিদ্ধান্তটা নিতে হয়, এটা হল তাদের পক্ষে উভয়সঙ্কট। আমার মনে আছে আমি জাপানে গিয়েছিলাম আর আমাদের টেম্পারেচার নেওয়ার জন্যে একটা মেশিন ছিল।

সু ক্রা – ওই সময়ে।

রু জ়ি – ওই সময়ে। সুতরাং, কারুর যদি স্মৃতিশক্তি থাকে তো সে ভবিষ্যৎটা আগে থেকে আঁচ করতে পারে [হাসি]। প্যারাডক্স বলে মনে হয়, কিন্তু… এবারে ওই প্রশ্নটায় ফিরে যাই: আমার কাছে বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট হল [ফ্রানৎস] কাফকার মেটামরফোসিস, যেটা ১৯১৪ সালে লেখা হয়েছিল, বেরিয়েছিল ১৯১৫ সালে। ওঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র লেখা।  

সু ক্রা – আপনি ওই যে বলছিলেন, ভাল আর মন্দ বিবর্তিত হয়ে চলেছে, সেটা থাকার ফলেই কি ওটা  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ…?   
 

রু জ়ি – এটা এমন একটা লেখা, যেটা এমন একটা সময়ে লেখা হওয়ার ফলে সেইটাকে – যেটা দ্বিতীয় প্রশ্নটার বিষয় – পূরণ করে যেটা হল: পাঠকেরা আর পরিস্থিতিগুলোই ওটার তাৎপর্য বাড়িয়ে তোলে। ১৯১৪ সালে, কাফকা মেটামরফোসিস বলে একটা বই লেখেন। একটা গল্প, একটা বড় গল্প বা ছোট উপন্যাসিকা, যেটাতে একটা লোক স্বপ্ন ভেঙে উঠে দেখে সে একটা আরশোলা হয়ে গেছে। আর ওর সমস্যাটা এটা নয় যে কি করে এটা হল [বুঝতে না পারা], ওর সমস্যা হল [এটা জানা] “আমি কি করে এবার স্বাভাবিক কাজকর্ম করব?”। “আমাকে কাজে যেতে হবে”, “আমাকে উৎপাদনশীল হতে হবে” – এটা যখনকার কথা তখনও পঁয়ত্রিশ ঘণ্টার আইনটা ছিল না। আর, তার পরিবারের জন্যেও, সমস্যাটা হল [এটা বোঝা যে] সে কি করে কাজ করতে যাবে। “আমাদের বাড়িভাড়াটা দিতে হবে”। যখন তারা দেখে যে সে ওখান থেকে আর বেরবে না, তখন তারা আশা করে যে সে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব মরে যাবে।      

সু ক্রা – মেটামরফোসিসটা শেষ পর্যন্ত তার পরিবার আর সেটার প্রতি তাদের মনোভাবেরও হয়।    

রু জ়ি – হ্যাঁ। বিভিন্ন মেটামরফোসিস আছে। লেখাটা ১৯১৪ সালের। যে বছর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যে যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ অল্পবয়েসী ছেলে মারা পড়েছিল। সেটা, বলতে গেলে, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে পুরোন ধাঁচের যুদ্ধ হয়েছিল। ওটা এমন একটা যুদ্ধ ছিল যার জেনারেলরা ছিল নিরক্ষর – তারা ওটার জন্যে তৈরি ছিল না, তারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে ট্রেঞ্চে বোকার মত মরতে পাঠিয়েছিল – যুদ্ধটা কিন্তু আধুনিক ছিল, ধ্বংস করার কল সমেত। একই সঙ্গে যুদ্ধটা পুরোন ধাঁচেরও ছিল কারণ ওটাই ছিল শেষ যুদ্ধ যেটা কেবল সৈন্যদেরই মারে আর, সেইসব সৈন্যদের পুরুষ হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। পরের যুদ্ধগুলো অনেক বেশী ইকুয়াল অপরচুনিটি-র হবে। সুতরাং, পরের যুদ্ধগুলো, লিঙ্গ-ভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, অনেক বেশী প্রগতিশীল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরুষদের মেরেছে, নারীদের মেরেছে, এমনকি সৈন্যদের চেয়ে বেশী সাধারণ মানুষদের মেরেছে, যেটা বিশ শতকের বাকিটা জুড়ে একটা মাপকাঠি হয়ে থাকবে। অনেক যুদ্ধে আমাদের থাকার পক্ষে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, যেখানে আমাদের জীবনের ঝুঁকি অনেক কম, হল সেনাবাহিনীতে, বা কোন গ্যাঙে, থাকা।        

সু ক্রা – গোষ্ঠীতে থাকা?
 

রু জ়ি – গোষ্ঠীতে থাকা। এটা যুগোস্লাভিয়ায় ঘটেছে, এটা লেবাননে ঘটেছে, এটা সিরিয়ায় ঘটেছে, এটা কমবেশী সারা দুনিয়াতেই হয়ে থাকে। সুতরাং, যদি আমরা কোন সামরিক বাহিনীতে সশস্ত্র অবস্থায় থাকি তো আমরা অরক্ষিত সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে বেশী নিরাপদ থাকব।  

তার চেয়ে বড় কথা: কাফকা ছিলেন ইহুদি। উনি এমন একজন লোকের গল্প বলছেন যে আরশোলায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে, যেটার সঙ্গে একজন মানুষের কিনা সব থেকে বেশী বৈপরীত্য। তার মনুষ্যত্ব চলে গেছে, সেটা এমন ভাবে তার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে যার ফলে তাকে পোকার মত মেরে ফেলা হচ্ছে। ১৯১৪ সালে, তাঁর পরিবার আর ইউরোপকে নিয়ে – অর্থাৎ তিনি যার অংশ সেরকম একটা বিশেষ জাতিগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় গোষ্ঠী – কি করা হবে সেটা আঁচ করা… সেটা তো অসাধারণ একটা ক্ষমতা! খুব সহজ ভাবে তিনি একটা নিখুঁত বল তৈরি করেছিলেন।          

যে লেখে তার স্বপ্ন হল একটা নুড়িপাথরকে ধরে ঠিক সেইটা করা, যেটা সময় জল বা স্রোতের মধ্যে তাকে নিয়ে করে: কোমল একটা শক্তির দিয়ে, যেটা সময়ের থেকে কেবল জলেরই বেশী, নুড়িটাকে গোল করা হতে থাকে। আর একটা গোল জিনিশ গড়িয়ে চলে। অর্থাৎ, সময়কে পার হয়ে চলে আর তারপর…

এই বইটার সামান্য যেটুকু সফর হয়েছে – কিছুটা তো হয়েইছে – তা পোর্তুগালের বাইরে, কিন্তু স্বদেশের কোন দাক্ষিণ্য ওর কপালে জোটেনি…

সু ক্রা – মানে আপনি বলছেন যে এই বইটা পোর্তুগালে উপযুক্ত সম্মান পায়নি?
 

রু জ়ি – না, পায়নি।

সু ক্রা – কারণ বিদেশে এটা বিভিন্ন পুরস্কার আর সম্মান পেয়েছে…  
 

রু জ়ি – হ্যাঁ, কিন্তু তার জন্যে সময় লেগেছে আর আরও বেশী পেতে পারত। মানে আমি এই মুহুর্তে বড়লোক হয়ে যেতে পারতাম যদি বইটা, ধরুন ২০১৪ বা ২০১৫ সালে, ইংরিজিতে[4] অনূদিত হত, কারণ অ্যামেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে, ২০১৬ আর ২০২০ সালের মধ্যে “ভয়” ছিল খুব জরুরি একটা শব্দ। ফিয়ার, ভয় ফিরে এসেছিল। একটা বই আছে যার নামই ফিয়ার। মানে… ভয়টা অর্থনৈতিক।        

আমি এমন সব ভাষায় যাই যেখানে এমন কোন পাগল থাকে যার আমার লেখা ভাল লাগে। একজনই ঢের। এই পাগলের যত বেশী ক্ষমতা থাকে, তত বেশী ব্যাপারটা ভাল চলে। যেদিন সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে এরকম একজন পাগল থাকবে যার আমার কাজ ভাল লাগে, আমার নোবেল পাওয়ার অর্ধেক কাজ সেদিনই মিটে যাবে [হাসি], আমার একটা খুঁটি থাকবে। এখন, আমার পাগলগুলো, দুঃখের বিষয়, কেবল এমন সব ভাষায় যাদের কোন জোর নেই। যেটা ঘটনা সেটা হল: আমার একটা পাগলি আছে, ঋতা রায়, ভারতে, সে এর মধ্যেই সাতটা[5] বই বাংলায় অনুবাদ করে ফেলেছে, কিন্তু ভাষাটা যে কমজোরি। আমার আরেকটা পাগলি আছে যে আমায় সার্বিয়ান আর ক্রোয়াশিয়ানে অনুবাদ করেছে, কিন্তু সেগুলোও কমজোরি ভাষা, ক্ষমতার নিরিখে বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোর থেকে অনেক দূরে। যেটা সত্যি তা হল ২০১৩ বা ১৪ সালে এই বইটা বেশ কিছু ভাষায় পৌঁছতে পারত, পারা উচিত ছিল, সেই যোগ্যতাও বইটার ছিল।    

সু ক্রা – কিন্তু এই সময়ে এর পুনর্মুদ্রণটা কি নতুন করে এর প্রাসঙ্গিকতার ফলে?
 

রু জ়ি – না, নতুন করে ছাপার কারণ প্রকাশক মনে করেছেন যে এর বাণিজ্যিক মূল্য আছে [হাসি]।

সু ক্রা – কারণ বর্ণনায় যা যা উল্লিখিত হয়েছে তার মধ্যে একটা হল যে এটা হল গত দশ বছরের অবিকল একটা ছবি আর, অনেকভাবেই, কথাটা সত্যি, যে মুহূর্তগুলোর কথা এখানে বলা হয়েছে তার কারণে।
 

রু জ়ি – হার আমি খুব একটা ভালভাবে মেনে নিই না, আর মেনে নিই না কারণ আমার মনে হয় যে যারা হারটা ভালভাবে মেনে নেয় তারা স্বর্গলাভ করে। গরীবদের সবচেয়ে খারাপ যে মিথ্যেটা বলা হয় সেটা হল: গরীব হওয়াটা মেনে নাও, কারণ স্বর্গটা একদিন তোমার হবে। আমাকে সবচেয়ে খারাপ যে মিথ্যেটা বলা হয় [সেটা হল] “চিন্তা করো না, এটা এমন কিছু ব্যাপার নয়, মরার পর দেখবে”। এমন কিছু ব্যাপার নয় মানে, হারামজাদারা? মানে বুকার প্রাইজ়ের জন্যে মনোনীত হওয়াটা কোন ব্যাপার নয়? টাকাপয়সা কামানটা কোন ব্যাপার নয়? বাইরে পরিচিত হলে যে ক্ষমতাটা হাতে আসে – এমনকি দেশের ভেতরেও – সেটা কোন ব্যাপার নয়? ব্যাপারটা হল, বইটা অনেক ঘুরতে পারত। আর পঁয়ত্রিশ বছর ধরে আমার কর্মজীবনের ইতিহাসে যেমনটা ঘটে এসেছে, পোর্তুগালই বইটাকে পিছিয়ে দিয়েছে। আর এখন আপনি বলছেন: “কিন্তু এটা আপনি কেন ভাবছেন?” ২০১২ সালে, এই বইটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। পেএসদেতে[6] রুই রিউর যত সমর্থক আছে এই দেশে তার চেয়ে বেশী সাহিত্যের পুরস্কার আছে, আর তাসত্ত্বেও [আমার] একটাও [জুটল] না? একটাও না? আমি জানি ব্যাপারটা কিভাবে চলে…

সু ক্রা – কারণ আপনি যে বাইরে [পুরস্কার] পেয়েওছেন…  
 

রু জ়ি  হ্যাঁ… তারপর আমার বইগুলো অনেক সময়ে বাদ পড়ে যায় কারণ [কেউ একটা ভাবে যে] “এটা ঠিক উপন্যাস নয়”, কিন্তু যখন বইটা যখন অন্য কারুর হয়, তখন আর তাতে কিছু আসেযায় না।  

সু ক্রা – এই সুযোগে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনি তো অনেক কিছু লিখেছেন…
 

রু জ়ি  তিরিশটার বেশী বই লিখেছি।

সু ক্রা – হ্যাঁ, কিন্তু আমি বলতে চাই স্টাইলের দিক থেকে। সবই বেশ অন্যরকম জিনিশ। আপনার কি মনে হয় যে আপনি একটু বহুরূপীর মত বলে…
 

রু জ়ি  না, কারণ ডেভিড বাউয়ি আমার চেয়ে বেশী বহুরূপী আর ওর জীবনটা আমার চেয়ে অনেক ভাল!

 
সু ক্রা – ছিল।
 

রু জ়ি  সেই… যদিও সে মারা গেছে [হাসি]। কিন্তু ও মরে গিয়ে থাকলেও ওকে আমার হিংসে হয়। [এটা] একটা ব্যাখ্যা হতে পারে বটে।   

সু ক্রা – অর্থাৎ, কোন নির্দিষ্ট স্টাইলের সঙ্গে সংযুক্ত না হয়ে তার বদলে বিভিন্ন ধরণের রকমারি কাজ করাটা…
 

রু জ়ি  কোন নির্দিষ্ট স্টইল দিয়ে আমাকে দাগান যায় না, কিন্তু সেই সমস্যাটা অন্যদের। এক কথায়, এই দেশটা ভিক্টিমকে দোষী মনে করে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল গাড়িচাপা-পড়া দুর্ভাগা শ্রমিকটিকে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করাটা। ভিক্টিমকে যে শুধু দোষী বলা হচ্ছে তা-ই নয়, প্রায়োরিটিটাও ভুলে যাওয়া হচ্ছে। সুতরাং, যেটা আমার কাছে, লেখক হিসেবে, [মন্ত্রী] এদুয়ার্দু [কাব্রিতা]-কে – বা এদুয়ার্দু আর্মেনিউকে – হেয় প্রতিপন্ন করে, সেটা হল পদত্যাগ করার সময়ে তিনি তাঁর ভাষণে বলেন যে, “ওই শ্রমিকের মৃত্যুতে আমার চেয়ে বেশী কেউ কষ্ট পায়নি”। আমি তো মনে করি তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা একটু বেশিই কষ্ট পাচ্ছে! বাচনভঙ্গী জানা সত্ত্বেও যে লোকটা এটা বলে, সে একটা… আমার কাছে এর কোন শব্দ নেই। কোন শব্দ হয় না। এটা লাইফ ইজ় বিউটিফুল ফিল্মটায় রোব্যার্তো বেন্যিইনির চরিত্রটার কথা মনে করিয়ে দেয় যখন তার পুরোন বন্ধু, একজন জার্মান ডাক্তারের সঙ্গে, তার দেখা হয়, যে এখন নাৎসি ডাক্তার আর সে বলে:

– কি ভাল, আমরা বন্ধু ছিলাম।

– হ্যাঁ, আমরা তো বন্ধু।

– তাহলে তুমি আমায় সাহায্য করবে? আমাকে আর আমার ছেলেকে?

– দাঁড়াও, দাঁড়াও, আমার আরও জরুরি একটা কাজ আছে। আরে ভাই, কদিন ধরে আমি এই ধাঁধাটা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি… আমাকে এটার সমাধান করতে সাহায্য করবে? আমি যে ঘুমোতেও পারছি না।

…আর এটা হল ফিল্মটার একমাত্র গম্ভীর মুহূর্ত, যখন রোব্যার্তো বেন্যিইনির মুখটা লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে কি বলবে বুঝতে না পেরে।

যেমন এই সেদিন, পোর্তুগালের সবচেয়ে পঠিত লেখক [এরকম কিছু একটা] লিখেছেন “যদি পশুদের আবেগ-অনুভূতি থেকে থাকে তাহলে আমরা পশুদের সঙ্গে যা করে থাকি সেটা হল আউশউইৎসে নাৎসিরা যা করেছিল ঠিক তা-ই”। আমি বুঝি যে তিনি দুটো বইকে প্রোমোট করছেন, টু-ইন-ওয়ান…

সু ক্রা – আপনি কি জুজ়ে রুদরিগশ দুশ সান্তুশের কথা বলছেন?
 

রু জ়ি  হ্যাঁ… কিন্তু এর কোন জবাব দিতে নেই, কারণ জবাব দিলেই আমরা বিজ্ঞাপনের যন্ত্রে ঢুকে পড়ব। ঠিক যেরকম আমরা শেগা[7] [পার্টি]-কে নিয়ে যদি কথা বলি। আমরা একটা বিজ্ঞাপনের যন্ত্রে ঢুকে পড়ব। একদিকে, আমরা কথা বলতে চাই না, কারণ কথা বললে আমরা একটা বিজ্ঞাপনী খেলায় ঢুকে পড়ব, কিন্তু আসলে…

ব্যাপারটা এরকম: আমি কিছু ভাল বই লিখেছি আর সেগুলো বিভিন্ন জঁরের কি না তাই নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। কুড়ি বছর আগে উশ সুর্ফিশ্তাশ লিখেছিলাম, ওটা ছিল পোর্তুগালের প্রথম অনলাইন ইন্টারঅ্যাক্টিভ বই আর এবছর তার জন্যে কোনোরকম সেলিব্রেশানও হল না। আমি করেছি, বাড়িতে [হাসি]। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে পর্দাগুলোতে আগুন ধরাচ্ছিলাম[8]। কিন্তু আমি অবাক হয়ে যাই। এমনকি বইটার প্রকাশকেরাও অন্য একটা পার্টিতে গিয়েছিল। সুতরাং, একটা মানুষ এখানে নিজেকে একলা একলা দৌড়তে দেখে (আর আমি একলাই দৌড়তে পেরেছি)। সবরকম ঝামেলা সত্ত্বেও ভালভাবে শেষ করা। কুড়ি বছর! ইন্টারনেট তো কেবল ২০১২/১৩ সাল থেকেই দ্রুতগতি হতে শুরু করেছে। ওইসময়ে ওটা ছিল একটা গর্ভযন্ত্রণা। ওই বইটা…

সু ক্রা – …যেটা কিনা ছিল প্রথম ই-বই…  
 

রু জ়ি  …পোর্তুগিজ়। আবার ইন্টারঅ্যাক্টিভ হওয়ার ফলে তার সঙ্গে আরও একটা বিশেষত্ব যোগ হয়েছিল। কারণ, পরে, ওই বিভ্রান্তিটা হয়েছিল: ই-বুকটা আবার কি? সেটা কি কাময়েঁশের একটা কবিতাকে নিয়ে পিডিএফ করলেই হয়ে যায়? তার মানে কি বলা যায় যে কাময়েঁশ একটা ই-বুক লিখেছিলেন? না। মিলান কুন্দেরা যেমন বলেন “কেবল সেই উপন্যাসটাই নৈতিক যেটা কেবল সেটাই বলে যেটা উপন্যাসই কেবল বলতে পারে”। আর, এক্ষেত্রে, একটা ইস্থেটিক দিকই নৈতিক, যেটা এমন একটা কিছুর সাহায্য নেয় যেটা অন্য কোন কিছুতে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আমি যেটা করেছিলাম, কুড়ি বছর আগে, তার এই সুবিধাটা ছিল। এই ক’বছরে আবার আনিবালেইতর[9] লিখেছি, যেটা হয়ত পোর্তুগালের গত পঞ্চাশ বছরের পড়া নিয়ে “সবচেয়ে সুন্দর” বই – একমত না হলে আপনাদের ডাস্টবিনটা আমায় দেখিয়ে দেবেন। তার জন্যেও কোন চিঠি পাইনি।     

সু ক্রা – কিন্তু আপনার কি মনে হয় এই স্বীকৃতির অভাবটা ব্যক্তিগত? নাকি এটা পোর্তুগালের সাহিত্যজগতেরই ব্যাপার?  
 

রু জ়ি  ব্যাপারটা পোর্তুগালের সাহিত্যজগতের, তবে শুধু তা-ই নয়। ব্যাপারটা এমন একটা বিষয় নিয়ে যেখানে ভালবাসাটাকে পছন্দের থেকে আলাদা করাটা মুশকিল আর, যখন কেউ ক্ষমতাশালী হয়ে পড়ে, সে তখন তার পছন্দ আর গুণগত মান গুলিয়ে ফেলে। যেসব লোকেদের হাতে ক্ষমতা আছে তাদের অহমিকা থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায়, যে তাদের পছন্দটাই ভালর সঙ্গে মিলে যায়।  

সু ক্রা – যেসব লোকেদের সমালোচনা ব্যাপারে প্রভাবশালী?
 

রু জ়ি  সমালোচনার ব্যাপারে অতটাও নয়, কারণ সমালোচনার ক্ষমতা সীমিত। যদিও আজকাল একটা “পেদ্রু-মেশিয়াকরণ[10]” চালু হয়েছে। মানে পেদ্রু মেশিয়া এক ধরণের একটা…  

সমস্যাটা হল সাহিত্যজগতের কোনদিন কোন ধারণাই ছিল না সেটা বাণিজ্যিক না অন্য কিছু, আর এখন সে ব্যাপারে আরও কম জানে। আর, যেহেতু জানা নেই যে সেটা শিল্পকলা না শিল্প, নাকি বাণিজ্য, না সংস্কৃতি, আমরা সর্বদাই একটা জ়িগজ়্যাগের মধ্যে আছি। অন্য অনেকের চেয়ে আমার অভিযোগের বেশী কারণ নেই। কেবল অনেকেই আমার চেয়ে বেশী কষ্টে আছে বলে আমার গজগজ করার অধিকারটা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমি অবশ্য “অবিচারের শিকার রুই” আমার এই নামের হয়ে কিছু বলছি না। বলা যেতে পারে যে আমি অবিচারের শিকার সব লেখকদের হয়েই বলছি, কেবল আমার হাতের গোড়ায় একটা মাইক্রোফোন আছে।

সু ক্রা – এমন অনেক লেখক কি আছেন যাঁরা অবিচারের শিকার কিন্তু তাঁদের কোন স্বর নেই? নাকি এমন সব লেখকও আছেন যাঁদের কণ্ঠস্বর থাকা সত্ত্বেও তাঁরা সেটার ব্যবহার করেন না?
 

রু জ়ি  আছেন। এমনকি মৃতদেরও এবছরের “সারামাগুকরণের” বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণ আছে। সারামাগুকে নিয়ে উদযাপন যে এক বছর আগেই শুরু হয়ে গেছে, এত জাঁকজমক করে, এই শতবার্ষিকী ও না জানি আর কত কি করা হচ্ছে, এর ফলে পরিষ্কারভাবে – অন্য অনেক কিছুর মধ্যে – সমানভাবে যোগ্য অন্য লেখকদের স্মৃতিকে খাটো[11] করা হচ্ছে।   

সু ক্রা – যেমন?
 

রু জ়ি  যেমন? কার্লুশ দ্য অলিভাইরা[12], আন্তনিউ আরাগাঁও[13], মারিয়া জুদিত [দ্য] কারভাল্যিউ[14]… আরও শুনতে চান? এঁদের সবারই এ বছর শতবার্ষিকী ছিল (মৃত বনাম মৃত নিয়েই যদি কথা বলা হয়)। অবশ্য সারামাগুর ব্যাপারটা বেশ মজার কারণ, এই মুহূর্তে, ছাত্রদের সিলেবাসের সর্বত্র উনি বিদ্যমান, আর এইসবই একদল মাতাল সুইডিশের দৈবাৎ নেওয়া একটা সিদ্ধান্তের কারণে।  

সু ক্রা – [অর্থাৎ] উনি যদি নোবেল না পেতেন তাহলে কখনই এত প্রচার পেতেন না?  

রু জ়ি  না। এখন যে প্রচারটা পাচ্ছেন সেটা পেতেন না, ওঁর সমতুল্য এক ঝাঁক লেখককে ক্যানন থেকে বাইরে বের করে দিতে পারতেন না। এটার সঙ্গে আগুশ্তিনার[15] [বেসা-লুইশ] ব্যাপারটা তুলনা করে দেখুন – আমার আর খেয়ালও নেই ওঁর শতবার্ষিকী এ বছর না আগামী বছর; আমার কাছে যিনি সারামাগুর সমমানের কিন্তু নোবেল পাননি, সেই জুজ়ে কার্দজ়ু পিরেশের[16] কথা ভাবুন। এরব্যার্তু[17] [এলদ্যার], সুফিয়া[18] [দ্য মেলো ব্রায়নার], জুজ়ে গোমশ ফেরাইরা[19], আকিলিনু রিবাইরু[20]… তারপর ব্রেজ়িলে যাই চলুন: গিমারাঁয়েশ রজ়া[21], ক্লারিস লিসপেক্টর[22]…. অর্থাৎ, এঁদের কেবল… ওই আর কি… কোন করিৎকর্মা বিধবা নেই [হাসি]।

অর্থাৎ, সারামাগু যে নোবেল পেয়েছেন তাতে আমি খুশি। আমি ওখানে ছিলাম, ব্যাপারটা খুবই ভাল হয়েছে আর আমি, অন্য অনেক পোর্তুগিজ় লেখকের মত ওঁর নোবেল পাওয়ার সুবিধেটা ভোগ করেছি। পরের বছরগুলোতে পোর্তুগিজ় লেখকদের লেখা জার্মানে অনূদিত হওয়ার সংখ্যাটা দশগুণ বেড়ে গিয়েছিল। এটা তো একটা আশ্চর্যজনক ব্যাপার।   

 
সু ক্রা – আমাদের সাহিত্যের কি কদর বেড়ে গিয়েছিল?

রু জ়ি  গিয়েছিল। সারামাগু তরুণ লেখকদের প্রতি খুব উদারতা দেখিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা করেছিলেন জোড়া আইরনি আর খানিকটা শয়তানি নিয়ে। প্রথমটা হল: লেখকদের মধ্যে উনি সবচেয়ে বেশী বয়েসে[23], সবচেয়ে দেরীতে লিখতে শুরু করেন (ষাট বছর বয়েসে সাফল্য পেতে শুরু করেন) আর তিনিই কিনা এমন একটা পুরস্কার চালু করেন যেটা পঁয়ত্রিশের বেশী কেউ পাবে না [হাসি]। পুরস্কার ঘোষণার সময়ে আমি সেখানে ছিলাম, ইনেশ পেদ্রোজ়া[24] আর ফ্রান্সিশকু জুজ়ে ভিয়েগাশের[25] সঙ্গে, আর উনি বললেন “আমি এই পুরস্কারটা তোমাদের, ছোটদের, জন্যে চালু করেছি” আর আমি সেই মুহূর্তে ওঁকে মাথা দিয়ে একটা গুঁতো[26] মেরেছিলাম – এই গল্পটা খুব কম লোকে জানে। ওঁকে মাথা দিয়ে একটা গুঁতো মেরেছিলাম (সেইজন্যেই তো উনি ভাঙা নাক নিয়ে ঘুরতেন [হাসি])। উনি পুলিশে চলেই গিয়েছিলেন প্রায়, আরও অনেক ব্যাপার। তারপর, উনি যখন মাটিতে পড়ে গেলেন তখন ওঁকে গোটা কয়েক লাথি মেরে বলতে লাগলাম “হারামি! খানকির বাচ্চা! আমার সাঁইত্রিশ বছর বয়েস!” [হাসি]। আর তখন, ইনেশ পেদ্রোজ়া আর ফ্রান্সিশকু জুজ়ে ভিয়েগাশের আমাকে “আমার সাঁইত্রিশ বছর বয়েস!” বলতে শুনে ব্যাপারটা নিজেদের হাতে নিয়ে ওরাও পা লাগিয়ে ফেলল। এটা ঘটনা। এটা পোর্তুগিজ় সাহিত্যের চেপে দেওয়া গল্পগুলোর একটা, কারণ পরে পিলারও[27] [দেল রীও] অভিযোগ জানাতে চায়নি কারণ পুলিশের কাছে গেলে তো বদনাম হত আর উনি তো পুরস্কারটা পেয়ে সত্যিই খুশি হয়েছিলেন।       

দ্বিতীয় কারণটা হল উনি এমন একটা পুরস্কার চালু করলেন যেটা তাঁর কোন প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে যাবে না (লোবু আন্তুনেশের[28] দফা গয়া হয়ে গেল [হাসি])। কিন্তু এটা বাদে, এই দুটো শয়তানি বাদ দিলে, পুরস্কারটা একটা প্রজন্মকে সুযোগসুবিধা দিয়েছিল। এমন একটা প্রজন্ম যেটা এখনও সর্বদা [লুক্স] ফ্রাজিলে[29] ঢোকার জন্যে বুকে “সারামাগু পুরস্কার” লেখা একটা ব্যাজের মত লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সারামাগু পেয়েছে হয়ত কুড়ি বছর আগে কিন্তু এখনও ব্যাজটা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর যখন এই ছেলেপুলেরা – তাদের অনেকেই ভাল লেখে, দ্যাটস নট দ্য পয়েন্ট – অন্যদের লেখা পাঠায়, কোন বিদেশী প্রকাশককে বা ওইরকম কাউকে, তখন লেখা থাকে “তিনি সারামাগু পুরস্কার পেয়েছেন, এছাড়া গত বছর আপ[30]-এর পুরস্কারও পেয়েছেন, অমুক পুরস্কার পেয়েছেন… আর ওঁকে নিয়ে জতাএল[31]-এর প্রচ্ছদ হয়েছে। ঘটনা হল: এটা দম্ভ। “কিন্তু তুমি কি অমুক পত্রিকা বা তমুক কাগজের প্রচ্ছদ হতে চাও?” [আমাকে প্রশ্ন করা হতে পারে]। না, কিন্তু এটা কাজের একটা উপকরণ।   

 
সু ক্রা – স্বীকৃতি না পেলে পেশায় এগোন যায় না।   

রু জ়ি  [দেশের] বাইরের মানুষগুলো তো আর হাত গুণতে জানে না। বইয়েরা যে কোন পুরস্কার না পেয়েও ঘুরে বেড়াতে পারে তার প্রমাণ হল ফির্ণান্দু পেসোয়ার অবিশ্বাস্য সাফল্য।

 
সু ক্রা – মারা যাবার পরে।

রু জ়ি  মারা যাবার পরে… আর ক্লারিস লিস্পেক্টর যাঁর লেখা এখন অ্যামেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে বের হয় “হর্হে লুইস বর্হেসের চেয়ে ভাল” লেখা একটা ব্লার্ব সমেত [হাসি]। সুতরাং এটাই প্রমাণ যে শিল্প ও সাহিত্যে যা-ই ভাল তা-ই কিন্তু সাফল্য পায়, তা আগে হোক বা পরে। কিন্তু আগে হলেই বেশী ভাল হত [হাসি]।     

গুণ যে সফর করে তার প্রমাণ হল আমার বইগুলো পৌঁছয়, সবকিছু সত্ত্বেও, কিছু কিছু আকর্ষণীয় ভাষায় আর আকর্ষণীয় দেশে, কিন্তু সেটা সর্বদাই কারণ কোন একজন পাগল থাকে যার সেগুলোকে ভাল লাগে। যখন কিনা একজন তরুণ অ্যামেরিকান লেখককে – এটা কিন্তু সত্যি, আমি নিজে দেখেছি – কোন রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে থাকাকালীনই এজেন্টরা প্রকাশক ধরে দেবার চেষ্টা করে। তারা কোন বাচ্চা ছেলে বা মেয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কি করছ এখন?” [আর সে উত্তরে বলে] “আমি আমার প্রথম উপন্যাসটা লেখার চেষ্টা করছি।” “আরে বস, তুমি কি আমাকে তোমার এজেন্ট হিসেবে রাখতে চাও? আমি একসঙ্গে দশটা দেশে তোমার বইটা বের করে দিতে পারব!” আর সেটা সে পারেও। স্রেফ দুটো জাদু শব্দ দিয়ে। একটা হল বইটা ভগবানের ভাষা, ইংরিজিতে লেখা। অন্যটা হল [বলা] যে একজন চমৎকার লেখক আছে যে কিনা আবার শস্তাও। “তিন হাজার ডলারে কপিরাইট দিয়ে দেবে”, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। আর প্রকাশক ভাবে “ইংরিজি থেকে অনুবাদ করাটা সহজ”। হাঙ্গেরিয়ান থেকে হলে তো অনেক কঠিন হত। গল্পটা অ্যামেরিকার, [সুতরাং] পড়ার হয়ত লোক আছে। গল্পটা হাঙ্গেরির… তাহলে হয়ত সেটা পড়ার অত লোকও নেই।           

 
সু ক্রা – সুতরাং এটা একটা নির্ভরযোগ্য জিনিশ।  

রু জ়ি  …তার সঙ্গে গুণমানের কোন সম্পর্ক নেই। বাজারের কারণে জগতের একটা প্রবণতা আছে, ওটাকে গ্রহণ করার। আর আরেকটা জাদু শব্দ হল “হলিউড মনে হয় সিনেমার জন্যে এরমধ্যেই কপিরাইটটা কিনে নিচ্ছে”। সত্যি হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে, কিন্তু এটা শুনতে অনেক বেশী বিশ্বাসযোগ্য লাগে এখানে, পোর্তুগালে, এটা বলার চেয়ে: “দেখ আ ইন্সতালাসাঁও দু মেদু-রকিন্তু অ্যাডাপ্টেশান হচ্ছে… মনে হয় নেটফ্লিক্স আগ্রহ দেখিয়েছে!” এর সম্ভাবনা আরও কম আর যদি বা হয়, খুব সম্ভবত মানিহাইস্ট-এর মত হবে না, বরং ওইগুলোর মত হবে, যেগুলো সঙ্গেসঙ্গেই মুখ থুবড়ে পড়ে। প্লফ!

সু ক্রা – বাজারের কথা বলাটা মজার আর আমি এই সুযোগে আপনার বইতে ফিরে যাব। যে জিনিশগুলোর কথা ওখানে একেবারে গোড়াতেই বলা হয়েছে তার মধ্যে একটা হল “যে, জগতে সব কিছুরই একটা নাম আছে, কিন্তু বাজার হল নিখুঁত একটা নামহীন সংগঠন[32][33] আপনি এক্ষুণি যেটা বলছিলেন তার সঙ্গে কিন্তু এটা এক্কেবারে মিলে যায়।

রু জ়ি  হ্যাঁ। আমি যখন বইটা লিখেছিলাম, তখন আমার বিরক্তির ইঞ্জিনটা ছিল “দোষটা আমাদের” এই ব্যাপারটা, আর আমি যখন লিখছিলাম এটা তখন একটা ফ্যাক্টর ছিল। আমি, পাঠক হবারও আগে, একজন খুব মনোযোগী মানুষ, আমি নাক দিয়ে লিখি আর, যেটা হয় সেটা হল, আমি যে এটা আগেই লিখেছি সেটা বুঝে ফেলা। এখন অনেকেই এটা [নিয়ে] লিখছে, কিন্তু, যে সময়ে আমি লিখেছিলাম, অন্তত, তখন [এটা বলাটা] খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না যে একুশ শতকের সমস্যাগুলো হবে দল পাকান, অমানবিকীকরণ আর বিস্মরণ [আলজ়াইমার]। আমি এই তিনটে বিষয়ের ওপরেই বই লিখেছি    […]

সুতরাং, বই জন্মায় বাজারের মানবিকীকরণ আর মানুষের অমানবিকীকরণের মত একটা বাস্তব, রাজনৈতিক বিরক্তি থেকে। এই গতিটাকে থামান সম্ভব নয়। আর আরও অনেকে এটা বলছে। গোন্সালু এম তাভারেশ একজন পোর্তুগিজ় লেখক যিনিও এই কথা বলেছেন – যেটা আমাদের নয়, আমারও নয় ওঁরও নয়, আমার এখন মনে পড়ছে না কে এই কথাটা প্রথম বলেছিল –, যেটা মানুষে করতে পারে সেটার জন্যে একটা কৃত্রিম বিকল্প খোঁজাটার মধ্যে এক ধরণের একটা অনৈতিকতা আছে। একুশ শতকে এর পরের পথটা হবে আমাদের কাছ থেকে আমাদের রুজিরুটি কেড়ে নেওয়া। আর তোমরা [নবীনেরা] এর ফল ভুগবে। এটা হয়ত অর্থনীতির পক্ষে ভাল হবে কিন্তু যেসব মানুষ দিয়ে এই অর্থনীতি তৈরি তাদের পক্ষে ভাল হবে না।     

কেউ যদি নিঃসঙ্গ হয় আর তার যদি কোন ইরটিক সঙ্গী না থাকে তো তার একটা রাবারের পুতুল থাকাটা আমি ভাল মনে করি। মেয়ে পুতুল, ছেলে পুতুল… এসব তো ঠিকই আছে বলে আমি মনে করি কিন্তু হঠাৎ যদি এই বিকল্পগুলো মানুষদের বেকার করে দেয়, এমন কিছু করতে শুরু করে দেয় যাতে মানুষে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলা, যোগাযোগ করা ছেড়ে দেয়, তাহলে সেটা খুব খারাপ বিকল্প।

এমন সব অ্যান্ড্রয়েডদের খোঁজা যারা আমাদের হাতে জিনিশপত্র তুলে দিতে পারবে, আমাদের কাজ করে দিতে পারবে, স্নেহশীল সঙ্গী হতে পারবে, দোকানে আমাদের সাহায্য করতে পারবে, রোবোদের খোঁজা, তাদের তৈরি করা… এমন একটা হাত তো আছেই, যেটা অনেকগুলো জিনিশ ধরতে পারে, তাকে বলে মানুষের হাত [হাসি]। এমন একটা অ্যান্ড্রয়েড তো আছে যেটা বলে: “সুপ্রভাত, কেমন আছেন? আজ কি খেতে চান? এটা খুব যত্ন করে আপনার জন্যে বানিয়েছি।” সে হল টেবিলে যে মানুষটা আমাদের পরিবেশন করছে। অমানবিকীকরণের এই খোঁজটা ভীষণ রকম বিপজ্জনক কারণ যখন, হঠাৎ, এলিট আর বাকি লোকদের মধ্যে সাঁকোটা ভেঙে পড়বে, তখন সেটাকে আবার তৈরি করাটা খুব কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ আমরা হয়ত এখনই অনেক দূরে, আর বুলডোজ়ার আর ক্রেনগুলো সব কেবল এক ধারেই রয়েছে।    

 
সু ক্রা – নাগরিকদের প্রতি কি দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদদের একটা অমানবিকীকরণ আছে? এটাই কি বলতে চান?  

রু জ়ি  ব্যাপারটা সম্মিলিত।

 
সু ক্রা – গোটা সমাজটাই কি এটা এক হয়ে করে থাকে?   

রু জ়ি  একটা সিস্টেমের কথা ভাবাটা অনেক বেশী ইন্টারেস্টিং। এবার, এই সিস্টেমটা তো মানুষ দিয়ে তৈরি। কিছু কিছু সময়ে সিস্টেমটা স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করে। যে লোকেরা ওতে আছে, তারা ওটাকে বলতে গেলে বদলায়ই না। মানে, আচমকা আমাদের মধ্যে কেউ যদি একটা নিয়ন্ত্রণহীন মেশিনের স্টিয়ারিঙে বসে যার কোন ব্রেক নেই, আর আমি যদি হঠাৎ “সরো তো, আমি চেষ্টা করে দেখি” বলে ব্রেকটায় চাপ দিই আর সেটা কাজ না করে, তাহলে আমি তো মেশিনটাকে থামাতে পারব না। সিস্টেমটাকে বদলানর ক্ষমতা, একজন মানুষের পক্ষে, খুবই কম। এটার মানে এই নয় যে একজন মানুষ “আরে, আমার [এটার সঙ্গে] কি সম্পর্ক, আমি তো কেবল একজন সওয়ারি” বলে পার পেয়ে যাবে। এটা যত না সামন্ততন্ত্রীকরণ তার চেয়ে বেশী সম্মিলিত একটা কাজ আর, এখানে, জগৎটার বদল ঘটছে।      

বিভিন্ন মুভমেন্টের কারণে বিশ শতকটা ছিল চমৎকার। এমন একটা মুভমেন্ট, যেটা প্রথমে অ্যামেরিকান, তারপর ইউরোপিয়ান মুভমেন্ট, আর তারপর সোভিয়েট মুভমেন্ট আর চাইনিজ় মুভমেন্ট। এই শক্তিগুলো সিস্টেম হিসেবে একে অন্যের মুখোমুখি হয়েছিল।    

 
সু ক্রা – সিস্টেম বলতে আপনি কি বলতে চান, জীবনযাপনের ধরণ?

রু জ়ি  যন্ত্র… যন্ত্রগুলো… বলতে গেলে নিপীড়নের।

 
সু ক্রা – বিভিন্ন ধরণের নিপীড়ন।

রু জ়ি  বিভিন্ন ধরণের নিপীড়ন। মানে, বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি। যৌথমালিকানাবাদ, কেন্দ্রীকরণবাদ, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এসবের ফলাফল খুব খারাপ হয়েছিল কারণ পুঁজিবাদের মত [ওগুলোর] ক্রীতদাস ছিল না। পুঁজিবাদ বেঁচে থাকার বড় কারণ তার ক্রীতদাস আছে বলে আর এই ক্রীতদাসেরা হল তৃতীয় বিশ্বের। অর্থাৎ, বিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের অনেকটাই মধ্য ও ল্যাটিন অ্যামেরিকার দেশগুলোতে বানানা ডিক্টেটারশিপে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার জন্যে আর যুদ্ধ-অপরাধ সংঘটিত করার জন্যে।     […]

দুবাই – ওই খুব চমৎকার জিনিশটা যেখানে একটা ফুটবল খেলে হবে – তার ভিত্তিগুলোর দিকে তাকালে ভাল হয়, কারণ আমার দেখায় অ্যাথেনীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশী সাদৃশ্য আছে দুবাইয়ের।   

 
সু ক্রা – কি অর্থে?

রু জ়ি  এই অর্থে যে অ্যাথেনীয় গণতন্ত্র কেবল নাগরিকদের জন্যে ছিল, যারা সংখ্যায় ছিল খুবই অল্প। যারা নাগরিক ছিল তারা সংখ্যায় খুবই অল্প ছিল, তারপর ছিল ক্রীতদাসেরা। দুবাই আর মধ্যপ্রাচ্যের স্বর্গোদ্যানগুলো ঠিক এইরকমই। নাগরিকেরা মনে হয় খুব ভালভাবেই বাঁচে, কেবল, তার নীচে হাড়ের বাহিনী আছে – পিরামিডগুলোতে যেমন – বাংলাদেশীদের, ভারতীয়দের, পাকিস্তানীদের… এই এখন যেমন আলগার্ভে… অর্থাৎ, যেটা বোঝা গেছে সেটা হল সোভিয়েত ইউনিয়নেরও, দুর্ভাগ্যবশত, শ্রমিকদের ভাল আর জগতের সুখ চাওয়ার জন্যে নিজেদের ক্রীতদাস ছিল

 
সু ক্রা – আর নিজেদের নাগরিক…

রু জ়ি  … আর তাদের ক্রীতদাসেরা যারা, নীচে গর্তের মধ্যে হাড়ের স্তূপে যেত না, কিন্তু গুলাগে যেত, সেটা আমার মনে হয় খুব ভাল কিছু নয়।    

এই সব সিস্টেমগুলোরই খুঁত ছিল আর সবগুলোর মধ্যে সোভিয়েতটাকেই আমরা সবচেয়ে ত্রুটিযুক্ত বলে ধরে নেব, আর এটা তো সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ীও ছিল। সেটার তো জন্মই হয়েছিল শত্রুদের নিয়ে, বেড়ে ওঠার সময়েও [সেটার] সঙ্কট ছিল, একদল জোচ্চোর-জালিয়াৎ সেটাকে কবজা করেছিল, মানে ওই সিস্টেমের সামনের দিকে, ট্রটস্কি আর লেনিন ছিলেন স্ট্যালিনের চেয়ে একটু কম খারাপ। ক্রুশ্চেভ ছিলেন স্ট্যালিনের চেয়ে একটু কম খারাপ কিন্তু ব্রেজনেভ ছিলেন ক্রুশ্চেভের চেয়ে একটু বেশী খারাপ। সুতরাং: সামনে যে লোকটা থাকে তার প্রভাব থাকে। যারা শাসন করে তাদের প্রভাব থাকে, লোকেদের ব্যক্তিত্বের প্রভাব থাকে।   

এইখানে একটা কথা বলি: গত ছ’বছরের পোর্তুগিজ় রাজনীতিতে, মার্সেলু[34] [রিবেলু দ্য সোজ়া] আর [আন্তনিউ] কশ্তার[35] অমায়িক, মানবিক, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব আর রাজনীতিতে আনন্দ পাওয়াটা গত কয়েক বছরের সাফল্যটার জন্যে অনেকাংশে দায়ী। সুতরাং, ব্যক্তি অনেকটাই সাহায্য করে।  

 
সু ক্রা – সাফল্য বলতে কি আপনি অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা বলছেন?

রু জ়ি  আমার মনে হয় [আমি] রাজনৈতিক সাফল্যের কথা [বলছি]। আমরা কিছুদিনের জন্যে একটু শান্তি পেয়েছিলাম, অবশ্য…

 
সু ক্রা – ক্রাইসিসটাকে কাটিয়ে সামলে ওঠা? কিন্তু সেটাও কি স্বাভাবিক সংযোগ নয়, যদি এটা মাথায় রাখা হয় যে…

রু জ়ি  হ্যাঁ, কিন্তু ভেবে দেখুন যে এই ক্রাইসিসের পরবর্তী সময়টা কাটিয়ে সামলে উঠতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তনিউ জুজ়ে সেগুরু[36] বা কার্লুশ [য] আর্মেনিউ কাব্রিতাকে নিয়ে, বা কাভাক সিলভা[37] বা সালাজ়া্রের[38] নকল করা পেদ্রু পাসুস কুয়্যাল্যিউকে[39] নিয়ে – ইস্থেটিক্সে, ওই বেঁকে পড়া ভাবটা নিয়ে। পাসুস কুয়্যাল্যিউ দেখতে খুব সুন্দর ছিল, আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে সবচেয়ে সুন্দর ছেলেগুলোর মধ্যে একজন আর, হঠাৎ, পাসুস কুয়্যাল্যিউ, যে কিনা আমার থেকে দুবছরের ছোট, চশমা পরে (ও কক্ষণ চশমা পরত না) কুঁজো হয়ে হাঁটতে শুরু করে দিল। আর যেটা অদ্ভুত ব্যাপার সেটা হল: আমি এখানে নিজেকে কচি দেখানর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি আর ওই মালটা ওখানে নিজেকে বুড়ো আর দায়িত্বের ভারে কুঁজো দেখানর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

সুতরাং, ব্যক্তির প্রভাব তো একটা থাকেই।

 
সু ক্রা –আপনার মতে, ওই মানুষগুলো ওই সময়ের জন্যে একেবারে সঠিক ছিল?

রু জ়ি  একেবারে সঠিক ছিল। সেটা অবশ্যই ভাগ্যের কথা, কারণ ওরা সঠিক লোক ছিল আর [সেটার] একটা প্রভাব ছিল। আধ্যাত্মিক গুরুদের মতই, পোপের মত, যাঁদের একটা বড় প্রভাব আছে।

[পোপ হিসেবে] ষোড়শ বেনেডিক্টকে পাওয়ার মধ্যে একটা বড় তফাত আছে, তিনি তো ষোল বছর বয়েসে হিটলারের যুববাহিনীতে ছিলেন… তিনি যদি স্ট্যালিনের যুববাহিনীতে থাকতেন তাহলে হয়ত তিনি পোপ হতে পারতেন না। কিংবা, হিটলারের যুববাহিনীতে থাকলেও – অনেক ভাল ভাল লোকের ক্ষেত্রেও তো এটা ঘটে থাকে – উনি যদি মহিলা হতেন, তাহলে তো আর উনি পোপ হতে পারতেন না, যার মানে মহিলা হওয়াটা পোপ হওয়ার পথে অনেক বেশী বড় বাধা…  

 
সু ক্রা – … হিটলারের যুববাহিনীতে থাকার চেয়ে।

রু জ়ি  এখানে যেটা ঘটছে সেটা হল ক্যাথলিক ধর্মে নেতার ব্যক্তিত্বটা চোখে পড়ে, কিন্তু সেটা সিস্টেমটাকে বদলে দেয় না।  

 
সু ক্রা – আপনি আমায় যেটা বলছেন আমি আবার সেটার সুযোগ নেব… কারণ একটা সময়ে আপনি বইটাতে বলেন যে ঈশ্বরকে ভয় পাওয়াটা “সেকেলে” হয়ে গেছে। ঈশ্বর আর আমাদের ভয় দেখাতে পারেন না, তাই তো? ওঁকে আমরা আর এতটাও ভয় পাই না যেটা আমাদের বিচলিত করতে পারে, আমাদের ওপরে কতৃত্ব ফলাতে পারে বা আমাদের প্রভাবিত করতে পারে?

রু জ়ি  নতুন সিস্টেমের তথাকথিত প্রভুদের নয়। মানে: ঈশ্বরে ভয়টা পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই আছে, কিন্তু নতুন শাসকগোষ্ঠীর কাছে ঈশ্বরে ভয়টা তার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। নতুন অলিগার্করাই ঈশ্বর। মানে আমি বিশ্বাস করি না যে এলোন মাস্ক, বিল গেটস বা রিচার্ড ব্র্যানসনের খুব একটা ঈশ্বরভীতির প্রয়োজন আছে। আর কিছু না হোক, ওরা নিজেদের আয়নায় দেখে “আমিই ঈশ্বর”, “ঈশ্বর সে মোয়া[40]” বলতে ভালবাসে। ব্যাপারটা কিছুটা এইরকম। ঈশ্বরভীতি, কাজ সারবার উপাদান হিসেবে, রয়েই গিয়েছিল। রয়েই গিয়েছিল, মানে… সরলীকৃত হয়ে, ধর্ম তো দর্শনের একটা লাইট, ইজ়ি লিসনিং ভার্শান। একটা ছাঁচ তৈরি করে দেয় যাতে, লিখতে পড়তে না পারলেও আমরা কিছু প্রাথমিক নিয়ম তৈরি বুঝতে পারি আর এই প্রাথমিক নিয়মগুলো বেশির ভাগ ধর্মে একই: যেটা নোংরা করেছ সেটা পরিষ্কার কর…

 
সু ক্রা – কিন্তু এটা কি মৃত্যুভয়ের সঙ্গে জড়িত না পুনর্জন্মে বিশ্বাসের সঙ্গে?

রু জ়ি  ২০০৩ সালে আমি একটা বই লিখেছিলাম যাতে, সত্যিসত্যি, যিশু জীবিত ছিলেন। ওটা একটা কল্পবিজ্ঞানের আইডিয়া ছিল যেটা এখন খুব মামুলি হয়ে যাচ্ছে, সেটা হল: একটা ফার্মাসিউটিকাল সংস্থা যিশুর খোঁজ করে বেড়াচ্ছে তার রক্ত থেকে ডিএনএ বার করে নেবে বলে – জুরাসিক পার্ক-এর মত – অমরত্বের জিনটাকে ক্লোন করবে বলে।

ঈশ্বরভীতি, জানি না সেটা মৃত্যুভয় কিনা, মানুষের চেয়ে উচ্চতর মাত্রার একটা নীতি আর এই মাত্রাটা আমি মনে করি জীবিত আছে।  

এখানে, এই ভ্যাম্পায়ারগুলো, এই বইটার, তারা যেটার প্রতিভূ সেটা হল একটা ভয়… অর্থাৎ, ধর্মীয় প্রগতির ঈশ্বর, তিনি সাধুতা আর সংহতির ঈশ্বরের চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেশির ভাগ ধর্মে যেটা আছে – যতদূর আমি জানি, আমি সব ধর্ম সম্বন্ধে জানি না তবে কিছু কিছু ধর্ম সম্বন্ধে জানি – সেটা হল সমবেদনার নীতি, সেটা যদি ভণ্ডামিও হয়। পাশের জনকে ভালবাস, পাশের জনকে সম্মান কর। যখন তুমি কোন প্রাণ কেড়ে নাও, তখন তুমি সব প্রাণই কেড়ে নাও। এই ধর্মীয় নীতিগুলো, নতুন প্রভুদের নিজেদের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয়, যাতে তাদের ছেলেপুলেরা ওখানে পড়ে না থাকে। ওই নীতিগুলোকে সত্যি বলে যাতে না মানে।        


[1]ভয়, মনফকিরা, কলকাতা, ২০১৮, পৃঃ ৫১। (অনুবাদক)   

[2]Eduardo Arménio do Nascimento Cabrita (১৯৬১) একজন পোর্তুগিজ় আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ। ২০১৭ থেকে ২০২১ অবধি পোর্তুগালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ২০২১ সালের আঠেরোই জুন গভীর রাতে উচ্চগতিতে A6 হাইওয়ে দিয়ে যাওয়ার সময়ে মন্ত্রীর গাড়ির ড্রাইভার রাস্তা সারাই করতে থাকা তেতাল্লিশ বছরের এক শ্রমিককে চাপা দিয়ে মেরে ফেলেন। কাব্রিতা প্রথমে পদত্যাগ করতে অস্বীকার করলেও অবশেষে গত বছরের ডিসেম্বারের গোড়ায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। (অনুবাদক)  

[3]২০১১ সালে পোর্তুগাল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। সেইসময়ে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক, ইউরোপিয়ান কমিশান আর আন্তর্জাতিক মুদ্রাভাণ্ডার থেকে একজন করে সদস্য নিয়ে তিনজনের একটি টিম পোর্তুগালের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করত, তারই নাম ত্রইকা। (অনুবাদক)     

[4]২০১৭ সালে রুইয়ের অনুরোধে আমি ফিয়ার নাম দিয়ে মেদু-কে ইংরেজিতে অনুবাদ করি। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, না এদেশে না বিদেশে কোন প্রকাশকই সেটাকে, এখন অবধি, ছাপতে রাজি হননি। বছর দুই আগে আমাদের দেশের একজন এজেন্ট আমাকে পরিষ্কার বলেই দিয়েছেন যে এদেশের কোন প্রকাশক এই উপন্যাসটিকে ছাপার দুঃসাহস দেখাবেন না। অবশ্য বাংলা অনুবাদটা (যেটা ইংরেজির পরে করেছিলাম) ২০১৮ সালেই বেরিয়ে গেছে, হিন্দি অনুবাদটাও বছর দুয়েক ধরে তৈরি হয়ে পড়ে আছে। (অনুবাদক)   

[5]হিসেবটা ভুল – ভাল ফ্যাসিস্ট হবার সহজ উপায় আট নম্বর। (অনুবাদক)    

[6]Partido Social Democrata বা PSD পোর্তুগালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির একটি। ১৯৭৬ থেকে মধ্য-দক্ষিণপন্থী এই দলটি এখন অবধি দশবার সরকার গঠন করেছে। ত্রইকার সময়ে বা ভয় রচনার সময়ে এই দলই ক্ষমতায় ছিল। ২০১৯ এবং গত তিরিশে জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে রুই রিউর নেতৃত্বে এই দল দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে। (অনুবাদক)    

[7]Chega ২০১৯ সালে গঠিত, পোর্তুগালের অতিদক্ষিণপন্থী একটি রাজনৈতিক দল। ২০১৯ সালের সংসদ নির্বাচনে এই দল একটি মাত্র আসন পেয়েছিল কিন্তু গত তিরিশে জানুয়ারির নির্বাচনে এটি বারোটি আসন পেয়েছে। (অনুবাদক)  

[8]স্রেফ বাজে কথা, ওর বাড়িতে কোন পর্দা নেই। (অনুবাদক)  

[9]এক সমুদ্দুর বই, মনফকিরা, কলকাতা, ২০১৫। (অনুবাদক)

[10]Pedro Mexia (১৯৭২) একজন পোর্তুগিজ় কবি ও সমালোচক। পোর্তুগালের শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা সবকিছুতে উনি সর্বঘটে কাঁঠালিকলার মত বিরাজ করেন। (অনুবাদক)    

[11]এখানে রুই “eucaliptar” শব্দটা ব্যবহার করেছেন, অর্থাৎ ইউক্যালিপ্টাস যেমন মাটি থেকে সব জল শুষে নিয়ে বাকি গাছেদের জন্যে আর কিছু ফেলে রাখে না তেমনি, এক্ষেত্রে, সব মনোযোগ সারামাগুই টেনে নেওয়ার ফলে বাকি লেখকরা তাঁদের যোগ্য সম্মানটুকুও পাচ্ছেন না। সারামাগু নিঃসন্দেহে শক্তিশালী লেখক কিন্তু তাঁর প্রজন্মের, বা তাঁর সময়ের, একমাত্র শক্তিশালী লেখক নন। নোবেল পাওয়ার উপযুক্ত, এবং যোগ্যতরও, আরও লেখক সেই সময়ে পোর্তুগালেছিলেন এবং এখনও আছেন। (অনুবাদক)     

[12]Carlos de Oliveira (১৯২১-১৯৮১) – পোর্তুগিজ় কবি ও ঔপন্যাসিক। (অনুবাদক)      

[13]António Aragão (১৯২১-২০০৮) – পোর্তুগিজ় কবি, চিত্রকর ও ঐতিহাসিক। (অনুবাদক)        

[14]Maria Judite de Carvalho (১৯২১-১৯৯৮) – পোর্তুগিজ় লেখিকা। (অনুবাদক)           

[15]Agustina Bessa-Luís (১৯২২-২০১৯) – পোর্তুগিজ় ঔপন্যাসিক। (অনুবাদক)     

[16]José Cardoso Pires (১৯২৫-১৯৮) – পোর্তুগিজ় লেখক। (অনুবাদক)

[17]Herberto Helder (১৯৩০-২০১৫) – এঁকে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শ্রেষ্ঠ পোর্তুগিজ় কবি বলে মনে করা হয়। পুয়েজ়িয়া এইশপিরিমেন্তাল পুর্তুগেজ়ার একজন প্রধান প্রবক্তা। (অনুবাদক)      

[18]Sophia de Mello Breyner Andresen (১৯১৯-২০০৪) – বিশ শতকের একজন গুরুত্বপূর্ণ পোর্তুগিজ় কবি। প্রথম মহিলা যিনি, ১৯৯৯ সালে, কামঁয়েশ পুরস্কার পান। (অনুবাদক)      

[19]José Gomes Ferreira (১৯০০-১৯৮৫) – পোর্তুগিজ় লেখক। (অনুবাদক)               

[20]Aquilino Ribeiro (১৮৮৫-১৯৬৩) – পোর্তুগিজ় লেখক। (অনুবাদক)                 

[21]João Guimarães Rosa (১৯০৮-১৯৬৭) – এঁকে ব্রেজ়িলের বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ লেখক বলে মনে করা হয়। (অনুবাদক)      

[22]Clarice Lispector (১৯২০-১৯৭৭) – ব্রেজ়িলের বিশ শতকের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখিকা ও সাংবাদিক। জন্মসূত্রে ইউক্রেনীয় এই লেখিকাকে কাফকার পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি গদ্যকার বলে মনে করা হয়। (অনুবাদক)       

[23]সারামাগুর প্রথম উপন্যাস ত্যারা দু পিকাদু প্রকাশিত হয় তাঁর পঁচিশ বছর বয়েসে, দ্বিতীয় উপন্যাস ক্লারাবইয়া কোন প্রকাশক ছাপতে রাজি হননি, তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর, ২০১১ সালে, সেটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৫ অবধি তাঁর তিনটি কবিতা সঙ্কলন আর সাংবাদিক জীবনের লেখা নিয়ে আরও তিনটি বই বেরলেও তাঁর উপন্যাস আবার বেরয় ১৯৭৭ সালে। এই পর্যায়ে প্রকাশিত তৃতীয় উপন্যাস মেমোরিয়াল দু কনভেন্তু ১৯৮২ সালে বেরিয়ে তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। তাঁর বয়েস তখন ষাট। (অনুবাদক)        

[24]Inês Pedrosa (১৯৬২) – রুই জ়িঙ্কের প্রজন্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী লেখিকা। তিনি নিজেদের প্রজন্মকে “জেরাসাঁও ইশকেসিদা” অর্থাৎ বিস্মৃত প্রজন্ম অ্যাখ্যা দিয়েছেন। আর রুই নিজেদের নাম দিয়েছেন “জেরাসাঁও সান্দুইশাদা” মানে স্যান্ডুইচ বা চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া প্রজন্ম। (অনুবাদক)        

[25]Francisco José Viegas (১৯৬২) – রুইয়ের প্রজন্মের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী লেখক। (অনুবাদক)      

[26]এটা উনি ওঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে, বানিয়ে বলছেন। কারণ এই নিয়ে বহুবার আমার সঙ্গে কথা হয়েছে কিন্তু উনি কখনই এই গুঁতো মারার বা লাথি মারার কথা আমায় বলেননি। বরং বলেছেন যে সারামাগুর ওই কথাটা শুনে উনি “রাস্কেল” স্বগতোক্তি করেছেন। (অনুবাদক)          

[27]Pilar Del Río (১৯৫০) – সারামাগুর দ্বিতীয় স্ত্রী। (অনুবাদক)   

[28]António Lobo Antunes (১৯৪২) – এই মুহূর্তে পোর্তুগালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী লেখক। সারামাগুর চেয়ে বয়েসে কুড়ি বছরের ছোট হয়েও সারামাগুর আগে সাফল্যলাভ করেন। ১৯৭৯ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস মেমরিয়া দ্য ইলেফান্ত প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে বহুল প্রশংসিত হয়। অনেকের মতে সারামাগুর বদলে লোবু আন্তুনেশেরই নোবেল পাওয়া উচিত ছিল। এখনও প্রতি বছর নোবেল ঘোষণার সময়ে তাঁর বহু পাঠক আশা করে থাকেন যে তিনি নিশ্চয়ই সেবারের নোবেলটি পাবেন। (অনুবাদক)     

[29]আশি-নব্বইয়ের দশকে লিসবনের একটি বিখ্যাত বার যেখানে নামকরা লেখক-শিল্পী-অভিনেতা-রাজনীতিবিদেরা আড্ডা দিতেন। (অনুবাদক)   

[30]APE – Associação Portuguesa de Escritores – পোর্তুগিজ় লেখক সমিতি। (অনুবাদক)   

[31]JL – Jornal de Letras, Artes e Ideias – পোর্তুগালের শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক একটি অত্যন্ত সম্মানীয় পাক্ষিক পত্রিকা। (অনুবাদক)  

[32]পোর্তুগালে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির নামের পেছনে ‘S.A.’ বসে, যার অর্থ Sociedade Anónima অথবা নামহীন সংগঠন। (অনুবাদক)

[33]ভয়, মনফকিরা, কলকাতা, ২০১৮, পৃঃ ৪৫। (অনুবাদক)    

[34]Marcelo Rebelo de Sousa (১৯৪৮) – আইনের প্রাক্তন অধ্যাপক, সাংবাদিক, মধ্যদক্ষিণপন্থী পার্তিদু সুসিয়াল-দিমুক্রাতার প্রাক্তন সভাপতি ও ২০১৬ থেকে পোর্তুগালের রাষ্ট্রপতি। (অনুবাদক)

[35]António Costa (১৯৬১) – ভারতীয় বংশোদ্ভূত পোর্তুগিজ় আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ। ২০১৪ থেকে মধ্যবামপন্থী পার্তিদু সুসিয়ালিশ্তার মহাসচিব ও ২০১৫ থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী। (অনুবাদক)   

[36]António José Seguro (১৯৬২) – পার্তিদু সুসিয়ালিশ্তার প্রাক্তন মহাসচিব। (অনুবাদক)

[37]Aníbal Cavaco Silva (১৯৩৯) – মধ্যদক্ষিণপন্থী পার্তিদু সুসিয়াল-দিমুক্রাতার প্রাক্তন সভাপতি, পোর্তুগালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী (১৯৮৫-১৯৯৫) ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি (২০০৬-২০১৬)। এখনও অবধি পোর্তুগালের সবচেয়ে সমালোচিত ও কম জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি। (অনুবাদক)

[38]António de Oliveira Salazar (১৮৮৯-১৯৭০) – বিশ্বের দীর্ঘতম (১৯২৮-১৯৭৪) স্বৈরততন্ত্রের প্রবর্তক। (অনুবাদক)

[39]Pedro Passos Coelho (১৯৬৪) – মধ্যদক্ষিণপন্থী পার্তিদু সুসিয়াল-দিমুক্রাতার প্রাক্তন সভাপতি, পোর্তুগালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী (২০১১-২০১৫)। (অনুবাদক)

[40]c’est moi – আমিই সে; ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই নাকি বলেছিলেন “L’état, c’est moi”, অর্থাৎ আমিই রাষ্ট্র; আর আজকাল বিল গেটসরা বলে থাকেন “আমিই ঈশ্বর”। (অনুবাদক)   

Rita Ray
    ঋতা রায় (১৯৬৫) ইংরেজিতে স্নাতকত্তোর করার পর পর্তুগিজ কবি ফির্ণান্দু পেসোয়ার ওপর গবেষণা করেন। পঁচিশ বছর দিল্লি আর কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পড়ানোর পর গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলা, ইংরেজি ও পর্তুগিজে অনুবাদ করে চলেছেন।   

© All Rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *