TURKISH FOLKTALE translated by SENJUTI SENGUPTA

বাংলা English

লেবুকন্যা

অনেককাল আগে এক রাজা ছিল। যেমন উদার তেমনি ধনী। আর তারই বদান্যতায় বছরের একটি দিন প্রতিবার এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটত। রাজপ্রাসাদের ঠিক বাইরে যে দুটো ফোয়ারা ছিল, ওই নির্দিষ্ট দিনে প্রতি বছর সে দুটি দিয়ে ঝরে পড়ত অফুরন্ত মধু আর উৎকৃষ্ট তেলের ধারা। ফোয়ারার সংলগ্ন সমস্ত নালিগুলি সেই দিন ভরাট করে দেওয়া হত শুধু মধু আর তেল দিয়ে। ফোয়ারার ধারা তাই কখনো বন্ধই হত না। দেশের সমস্ত প্রজা তাদের কলসি, পাত্র নিয়ে আসত সেই ফোয়ারাদুটির কাছে। কানায় কানায় মধু আর তেল ভরে নিয়ে তারা ঘরে ফিরত সেদিন। এই ছিল দস্তুর।
এমনই কোনো এক বছরের কথা। মধু আর তেল ভরার জন্য প্রাসাদের আঙিনায় সেদিন লোকে লোকারণ্য। সবাই একের পর এক কলসি ভরে নিয়ে যাচ্ছে। তাদেরই মধ্যে ছিল এক বুড়ি। কিন্তু তাকে দেখেই রাজার ছেলের মাথায় খেলে গেল একটা ভয়ানক দুষ্টুবুদ্ধি। এতক্ষণ দূরে একটা জানলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ভিড়ের মধ্যে সবার কাণ্ড দেখছিল। এখন হঠাৎ কি মনে হতে, ধনুকে তীর লাগিয়ে সে তাক করল বুড়ির কলসির দিকে। বেচারা বুড়ি এসব কিছুই টের পায়নি। তার পালা আসতে সে তার দুটি কলসির একটায় মধু আর অন্যটায় তেল ভরে নিয়ে ফিরতি পথ ধরেছিল সবে। এমন সময়ে শাঁ করে রাজকুমারের ছোঁড়া তীর এসে লেগে একটা ছ্যাঁদা করে দিল তার মধুর কলসির গায়ে। গলগল করে সমস্ত মধু পড়ে ভাসিয়ে দিল চতুর্দিক।
বেচারা বুড়ি। এমন দিনে এরকম বিশ্রী একটা ঘটনা ঘটবে সে কি আর ভেবেছিল! নাটের গুরুটিকে দেখে সে তো তাই রেগেই আগুন। প্রচণ্ড ক্ষোভে, দুঃখে বুড়ি তখন চিৎকার করে রাজকুমারকে বলল-

“ যা খুশি তাই করা যায় বল হলে রাজার ছেলে
লেবুকন্যা বউ হবে তোর, গুমোর ভাঙল বলে।“

এই বলে বুড়ি তার অন্য তেলভর্তি কলসিটা তুলে নিয়ে প্রাসাদ থেকে চলে গেল। রাজকুমার চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুড়ির সব কথা শুনল বটে, কিন্তু জানতেও পারল না এই একটা ছোট্ট ঘটনা তার গোটা জীবনটাই এবার রাতারাতি পাল্টে দেবে।
সত্যি সত্যিই বুড়ির অভিশাপ ফলতে বেশিদিন সময় নিল না। সেই ঘটনার কিছুদিন পর থেকেই রাজকুমারের ক্ষিধে, ঘুম সব কেমন যেন উধাও হয়ে গেল। দিনে দিনে ক্রমশ দুর্বল, ফ্যাকাশে হয়ে যেতে থাকল। এদিকে ছেলের এমন হাল দেখে রাজা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। বারবার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন- “বাবা, তোর কি কষ্ট হচ্ছে ?” উত্তরে ক্ষীণস্বরে ছেলে শুধু একটাই কথা বলে- “আমি এক লেবুকন্যার প্রেমে পড়েছি, বাবা। সেই লেবুকন্যা যেই হোক, যেখানেই থাকুক, তাকে আমায় খুঁজে পেতেই হবে। তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না, সুস্থও হব না। তাকে আমায় খুঁজে পেতেই হবে।”
আর ঘরে বসে অপেক্ষা করতে পারল না রাজকুমার। শীঘ্রই রাজা আর রাণীকে বিদায় জানিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে সে বেরিয়ে পড়ল সেই লেবুকন্যার সন্ধানে। কিন্তু কোথায় গেলে পাওয়া যাবে সেই কন্যাকে ? কেউ তার কোন খবর দিতে পারে না। কেউ কোনদিন তার কথাই শোনেনি কখনো। এদিকে রাজকুমারও হাল ছাড়ার পাত্র নয়। লেবুকন্যাকে যে তাকে খুঁজে পেতেই হবে!
চলতে চলতে একদিন রাজকুমারের সঙ্গে দেখা হল এক ফকিরের। তাকে অমন হন্যে হয়ে ঘুরতে দেখে সেই ফকির পরম স্নেহে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করল- “বৎস, কোথায় যাচ্ছ ? তোমাকে দেখে তো বিশেষ সুস্থ বোধ হচ্ছে না।”
“ঈশ্বরের আশীর্বাদে আপনার জীবনে সদা শান্তি বিরাজ করুক, ফকিরবাবা। বাবা, আমি এক লেবুকন্যার সন্ধানে ঘুরছি। তার প্রেমে আমি বড়ই কাতর।”
ফকিরবাবা কিছুক্ষণ একমনে কিছু চিন্তা করলেন। তারপর বললেন- “এ হল বিধাতার লিখন, পুত্র। আমি অবশ্যই তোমাকে বলে দেব কীভাবে তুমি লেবুকন্যার সন্ধান পাবে। আমার কথা খুব মন দিয়ে শোনো আর ভালো করে মনে রেখে দাও, তবেই তুমি খুঁজে পাবে সেই কন্যাকে। শোনো, ঐ দূরে যে পাহাড়গুলো দেখছ, তার পেছন দিয়ে গেলে তুমি প্রথমেই একটা গুলাব বাগিচা দেখতে পাবে। সেখান থেকে একটা গোলাপ তুলে নেবে আর তারপর যত পারো জোরে প্রাণ খুলে চেঁচিয়ে বলবে- “কি অপূর্ব সুন্দর এ গুলাব বাগিচা!” আর এ কথা বলার সময়ে গোলাপের কাঁটাগুলোর বিন্দুমাত্র পরোয়া কোরো না। তারপর আবার হাঁটতে থাকো। এবার একটা ছোট্ট নদীর কিনারায় এসে পৌঁছবে। তা থেকে আগে এক গণ্ডূষ জল তুলে পান করবে, তারপর আবার সেই নদীর উদ্দেশ্যেও একইভাবে চিৎকার করে বলবে- “কি স্বচ্ছ এ নদীর জল!” তারপর একটা কুকুর আর একটা ঘোড়াকে দেখতে পাবে। দেখবে, কুকুরটার সামনে রাখা আছে খড় আর ঘোড়াটার সামনে খানিকটা মাংস। সেগুলো বদলাবদলি করে কুকুরটার সামনে মাংস আর ঘোড়াটার সামনে খড় এনে রাখবে। এরপর আরও কিছুটা গেলে দুটো দরজা দেখতে পাবে, একটা খোলা আর আরেকটা বন্ধ। যে দরজাটা খোলা সেটা বন্ধ করে দেবে আর যেটা বন্ধ সেই দরজাটা খুলে দেবে। এবার এই খোলা দরজাটা দিয়েই তুমি ভিতরে প্রবেশ করবে। দেখবে তোমার সামনে রয়েছে একটা সুবিশাল, অতি মনোহর বাগান। কিন্তু সেখানে থাকে এক বিরাটাকৃতি দৈত্য। সেখানেই তুমি খুঁজে পাবে একটা লেবুগাছ। সেই গাছে দেখবে কেবল তিনটে লেবু ঝুলছে। চটপট সেই তিনটে লেবু পেড়ে নিয়ে সেখান থেকে ছুটে পালাবে। নদীর কাছাকাছি পৌঁছে তুমি সেই লেবু তিনটে কাটতে পারো। প্রতিটি লেবু কাটতেই একটি করে পরমাসুন্দরী কন্যা তোমার সামনে আবির্ভূত হবে আর চিৎকার করে জল চাইবে তোমার কাছে। মনে রেখো, সঙ্গে সঙ্গে তুমি যদি তাদের জল দিতে না পারো, তৎক্ষণাৎ তাদের মৃত্যু ঘটবে। এবার সামনে এগিয়ে যাও বৎস। আল্লাহ্ তোমার সহায় হোন।”
রাজকুমার ফকিরবাবার সবকটি নির্দেশ ভালো করে মুখস্থ করে নিল। তারপর তাঁর হাতে চুম্বন করে আবার হাঁটতে শুরু করল। এখন সে অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী। ফকিরবাবার কথামত প্রথমেই সে গেল পাহাড়ের দিকে। তার পিছন দিকেই আছে সেই গুলাব বাগিচা। গোলাপের তীক্ষ্ণ কাঁটাগুলোর এতটুকু পরোয়া না করেই সে একটা বড়সড় লাল গোলাপ তুলে নিল বাগিচা থেকে, নাকের কাছে এনে প্রাণ ভরে তার ঘ্রাণ নিল। তারপর গলা খুলে চিৎকার করে বলে উঠল- “কি অপূর্ব সুন্দর এ গুলাব বাগিচা!” তারপর এল নদীর ধারে। সেখান থেকে একটু জল তুলে পান করল আর বলল- “কি নির্মল এই নদীর জল!” তারপর সে দেখতে পেল সেই কুকুর আর ঘোড়াটিকে। তাদের সামনে রাখা খাবারগুলো অদল বদল করে সে যার যা খাবার তার সামনে সেটাই এনে দিল- কুকুরের সামনে এনে দিল মাংস আর ঘোড়ার সামনে এনে দিল খড়। আরও কিছুটা পথ হাঁটার পর তার চোখে পড়ল দুটো দরজা। ফকিরবাবার নির্দেশ মত তখন সে খোলা দরজাটা দিল বন্ধ করে আর বন্ধ দরজাটা দিল খুলে। তারপর এই খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই সে দেখতে পেল একটা বিশাল বাগান। এইবার ফকিরবাবার শেষ নির্দেশের পালা। সে চটজলদি লেবুগাছ থেকে তিনটে লেবু পেড়ে নিয়েই সেই বাগান থেকে দিল ছুট। কিন্তু দুর্ভাগ্য! লেবুগুলো পেড়ে পালানোর সময়ে বাগানের সেই দৈত্যটা ঠিক তাকে দেখতে পেয়ে গেল।
দূর থেকে রাজকুমারকে পালাতে দেখেই সে তাকে জোরসে তাড়া করল। রাজকুমার ততক্ষণে সেই বেরনোর দরজার কাছে পৌঁছে গেছে। এমন সময়ে দৈত্যটা চিৎকার করে প্রথম দরজাকে আদেশ দিল- “ওই মানুষটাকে ধরে নিয়ে আয়! ধর ওকে, দরজা!”
প্রথম দরজা কিন্তু এতটুকু নড়ল না। উত্তরে দৈত্যকে শুধু বলল- “হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেছে, আমি এমন খোলাই পড়ে থেকেছি। কেউ আমাকে বন্ধ করেনি। আজ প্রথমবার এই মানুষটাই আমাকে বন্ধ করেছে, বিশ্রাম দিয়েছে আমাকে। তাই তোমার জন্য আমি ওকে ধরতে পারব না।”
একইভাবে দ্বিতীয় দরজাও দৈত্যকে বলল- “যুগ যুগ ধরে আমি বন্ধ অবস্থায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছি। তুমি কথা দিয়েছিলে, একদিন আমার পাল্লাদুটো খুলে দেবে, কিন্তু তুমি দাওনি। এই মানুষটা দিয়েছে। আমি আরাম পেয়েছি। তাই আমিও তোমার কথায় ওকে কিছুতেই ধরব না।”
দৈত্য তখন কুকুর আর ঘোড়াকে চিৎকার করে বলল- “ধর ওকে। পালিয়ে যাওয়ার আগেই ওই মানুষটাকে ধরে নিয়ে আয়।”
প্রত্যুত্তরে কুকুর তাকে বলল- “এই কুমার বড্ড দয়ালু। ও আমাকে মাংস খাইয়েছে। আমি ওকে ধরব না।”
ঘোড়াও একইভাবে রাজকুমারকে ধরতে অস্বীকার করল। সেও বলল- “ও বড় ভালো মানুষ। আমাকে খড় খাইয়েছে। তোমার জন্য আমি ওকে কক্ষণো ধরতে পারব না।”
এদিকে রাজকুমার তো দৈত্যের হাত থেকে বাঁচতে প্রাণপণে যত পারে জোরে ছুটছিল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর জোরে ছোটা দৈত্যর পক্ষে সম্ভব নয়। সে তাই একটা শেষ চেষ্টা করল। গুলাব বাগিচাকে নির্দেশ দিল রাজকুমারকে গ্রেপ্তার করে আনার জন্য।
কিন্তু অন্যদের মতই গুলাব বাগিচাও তাকে কোন সাহায্য করল না। দৈত্যের কোন কথার তোয়াক্কা না করে সে রাজকুমারকে চলে যেতে দিল। উল্টে দৈত্যকে বলল- “তুমি একটা কুৎসিত দানব বৈ কিস্যু নও। তোমার কখনো আমার বাগিচা থেকে একটা ফুল তুলে তার মিষ্টি গন্ধটুকু শোঁকার পর্যন্ত সময় হয়নি। এই মানুষটি তা করেছে। শুধু তাই নয়, মন প্রাণ ভরে আমার প্রশংসাও করেছে। তাই তোমার খপ্পরে আমি ওকে কিছুতেই পড়তে দেব না।”
দৈত্য তাও এত সহজে রাজকুমারের পিছু ছাড়ল না। তাড়া করতে করতে সে নদীর কাছে পৌঁছে গেল। কিন্তু নদীও রাজকুমারের করা প্রশংসার কথা মনে করে তাকে নিশ্চিন্তে তার জল পেরিয়ে যেতে দিল। বরং দৈত্য যখন নদী পেরোতে গেল, সে তার পথেই নানা বিঘ্ন সৃষ্টি করতে লাগল। দৈত্যের মনে পড়ল, এই নদীর জলকেই সে এককালে কত নোংরা, ঘোলা বলে অপমান করেছে, কখনো সে এই জল মুখেও দেয়নি। আজ তারই ফল ভুগতে হল তাকে।দৈত্য জলে পড়ে রীতিমত হাবুডুবু খেতে লাগল। বাঁচার জন্য যত হাত পা ছুঁড়তে লাগল ততই আরও ডুবে যেতে থাকল। দেখতে দেখতে একসময়ে সেই নদী দৈত্য বেচারাকে পুরোপুরি ডুবিয়ে তবে ছাড়ল। এতক্ষণে রাজকুমারও একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। প্রাণের দায়ে ছুটতে ছুটতে সে অনেকটা দূর চলে এসেছে। কিন্তু আর একটু ক্ষণ সে আর অপেক্ষা করতে পারল না। লেবুগুলোর ভিতরে কি আছে সেটা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল তার মন।
তড়িঘড়ি একটা লেবু সে কেটেই ফেলল। অবাক কাণ্ড! লেবুটা কাটতেই অমনি তার চোখের সামনে একটি কন্যা কোথা থেকে জানি উদয় হল। আর উদয় হতেই সে “জল, জল!” বলে চেঁচাতে থাকল। কিন্তু সেই মুহূর্তে রাজকুমারের আশপাশে কোথাও এতটুকু জল ছিল না। বেচারা সেই লেবুকন্যা! জল তেষ্টায় কাতর হয়ে সে দেখতে দেখতে নেতিয়ে পড়ল এবং তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু ঘটল।
রাজকুমার আরও খানিকটা পথ হাঁটল। কিন্তু আবারও প্রচণ্ড কৌতুহল চেপে বসতেই সে দ্বিতীয় আরেকটা লেবুও কেটে ফেলল। তার কেমন জানি সন্দেহ হল, “সত্যি সত্যিই অন্য লেবুদুটোর মধ্যেও দুটি কন্যা আছে তো আদৌ ?” কিন্তু এই লেবুটা থেকেও সত্যিই আরেকটি কন্যার আবির্ভাব হল এবং যথারীতি জল না পেয়ে প্রচণ্ড তেষ্টায় গলা শুকিয়ে মরে গেল।
এইবার রাজকুমারের ভারি দুঃখ হল। তার অতিরিক্ত কৌতুহলের জন্যই তো পরপর দুটি মেয়েকে এইভাবে প্রাণ হারাতে হল। তাই এবার সে নদীর তীরে পৌঁছনো পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করল। তারপর আল্লাহ্-র নাম নিয়ে তৃতীয় লেবুটা কেটে ফেলল। এবার আর কোন ভুল হল না। লেবু থেকে কন্যার আবির্ভাব ঘটতেই সে তাকে ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দিল যাতে তার পুরো শরীর একেবারে জলে চুবে যায়।
দেখতে দেখতে সেই লেবুকন্যা পূর্ণ রূপে বিকশিত হল। নদীর জল নিয়ে খেলতে খেলতে সে প্রথমে স্নান করল। তারপর নিজের সমস্ত তেষ্টা মিটিয়ে প্রাণ ভরে জল খেল। লেবুকন্যা যখন জল থেকে উঠে এল, তাকে দেখতে লাগছিল সাক্ষাৎ বেহেস্তের পরীর মত। রাজকুমার আনন্দে তাকে দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরল। খুশির আর সীমা রইল না তার। এতকিছু করে শেষ পর্যন্ত রাজকুমার যে তার লেবুকন্যাকে খুঁজে পেয়েছে!
অনেক্ষণ ধরে তারা দুজনে বসে বসে গল্প করল, একে অপরের অনেক কথা ভাগ করে নিল। তারপর একসময়ে রাজকুমার তাকে বলল যে সে চট করে একবার প্রাসাদ থেকে ঘুরে এক্ষুণি আসছে। “রাজা আর রাণীকে এই সুখবরটা আমায় দিতেই হবে। তোমাকে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার সমস্ত বন্দোবস্ত তারাই করে দেবেন। দেখবে, ঢাক-বাদ্যি, সৈন্য-সামন্ত নিয়ে তোমার জন্য কেমন জমজমাট একটা প্রাসাদ যাত্রার আয়োজন করেন তারা!”
লেবুকন্যা তখন রাজকুমারকে বিদায় জানাল। যাবার আগে শুধু রাজকুমারকে সাবধান করে দিল- “ভুলেও যেন তুমি প্রাসাদে পৌঁছনোর পর তোমার বাবা-মা তোমার কপালে চুমো না খান। তা হলে কিন্তু তুমি আমাকে ভুলে যাবে। তাই খুব সাবধান, আল্লাহ্ তোমার সহায় হোন।”
রাজকুমার তাকে প্রতিজ্ঞা করল যে তার সমস্ত কথা সে মনে রাখবে আর খুব শিগগিরই এসে তাকে প্রাসাদে নিয়ে যাবে। তারপর লেবুকন্যাকে বিদায় জানিয়ে বহুকাল পর সে তার রাজধানীতে ফিরে গেল। দেশের সমস্ত লোক তাকে ফুল মালা দিয়ে স্বাগত জানাল। রাজপ্রাসাদে তো তাকে আরও সাড়ম্বরে অভ্যর্থনা জানাল সবাই। এই প্রবল আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্যে লেবুকন্যার সতর্কবাণীটা রাজকুমার বেমালুম গেল ভুলে। যথারীতি প্রথামত রাজা এবং রাণী ছেলের গালে আর কপালে চুম্বন করলেন। আর এক নিমেষে রাজকুমার তার লেবুকন্যার কথা একেবারে ভুলে গেল।
এদিকে লেবুকন্যা তো আর এসব কিছুই জানতে পারেনি। সে রাজকুমারের কথামত নদীর ধারে বসে বসে সারাদিন অপেক্ষা করতে লাগল কখন রাজকুমার ফিরবে। সেখানে ছিল একটা লম্বা ঝাউ গাছ। ক্লান্ত লেবুকন্যা সেই গাছটাকে বলল একটু ঝুঁকে তার দিকে নেমে আসতে।
গাছটা তার কথা শুনল। সে তখন সহজেই চড়ে বসল সেই গাছের উপর। তখন তার দুধের মত সাদা মুখ আর তাতে এলিয়ে পড়া সোনালি চুলের গোছার ছায়া পড়ল নদীর জলে। আরবদেশীয় এক দাসী রোজ সেই সময়ে নদীতে জল তুলতে আসত। আজও জল তুলতে এসে সে যখন জলে সেই লেবুকন্যার ছায়া দেখল, তার মনে হল ওটা বোধ হয় তার নিজেরই প্রতিচ্ছবি। তার চোখমুখ চকচক করে উঠল। সে কি উল্লাস তখন তার! সে বলল- “আমি এত সুন্দরী তবুও রোজ কিনা এই লোকের বাড়ি বেগার খেটে আর জল টেনে তুলে মরছি! আমার তো আরও অনেক ভালো কিছু পাওনা আছে।”
সে একটা পাথরে আছাড় মেরে জল ভরার কলসিটা ভেঙে ফেলল আর সটান সেখান থেকে বাড়ি ফিরে গেল। সেখানে গিয়ে বাড়ির কর্ত্রীকে ডেকে বলল- “গিন্নিমা, আমি এতদিনে জলের ছায়ায় নিজের আসল রূপ দেখতে পেয়েছি। আমি জানি, আমাকে ভীষণ সুন্দর দেখতে। তাই পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, কাল থেকে আমি আর এইসব জল টল তুলতে যেতে পারব না।”
গৃহকর্ত্রীটি কিন্তু ঝাউগাছের ওপরে লেবুকন্যাকে ঠিক দেখতে পেয়ে গিয়েছিল। তাই ওই দাসীর দেমাক দেখে তার তখন ভারি রঙ্গ হল। সে বলল- “মূর্খ দাসী কোথাকার, যা গিয়ে দেখ নদীর ধারে। আর এবার একটু জলের দিকে কেবল হাঁ করে না তাকিয়ে থেকে ওই গাছটার ওপরের দিকেও ঘাড় তুলে তাকাস।”
এতক্ষণে সে ঝাউগাছের ডালগুলোর দিকে ভালো করে তাকিয়ে লেবুকন্যাকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত ঘোর কেটে গেল। শূন্য থেকে যেন সোজা আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়ল সে। নিজের মাথাটা একটু ঠিক করে নিয়েই সে গেল লেবুকন্যার কাছে। গিয়ে বলল- “এই যে সুন্দরী, অত ওপরে কীকরে চড়লে তুমি? আচ্ছা, আমি তোমার কাছে গিয়ে একটু বসতে পারি?”
লেবুকন্যা ততক্ষণে এমনিতেই তার হৃদয়ের রাজপুত্রটির জন্য অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই সেই মেয়েটিকে দেখে সে ভাবল, বেশ তো, নিজের বয়েসি কারুর সঙ্গে দু-দণ্ড দুটো কথা বলা যাবে এখন।
সে আবার ঝাউগাছটাকে নীচের দিকে ঝুঁকতে নির্দেশ দিল। কাণ্ড দেখে আরবি মেয়েটির তো আশ্চর্যের সীমা রাইল না। গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালটায় দুজনে মুখোমুখি চড়ে বসে প্রাণ খুলে গল্প করতে লাগল। লেবুকন্যা প্রথম থেকে তার সমস্ত ঘটনা বলল। আরবকন্যাও তাকে বলল কীভাবে সেই সুদূর আরব থেকে তার মালিক তাকে এই তুর্কিদেশে নিয়ে এসেছে এবং কীভাবে সে সারাদিন তার দাসীগিরি করে আর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দিনরাত বাড়ির সমস্ত কাজ করে।
এতকিছু বললেও আরবি মেয়েটি কিন্তু ছিল বেশ ফন্দিবাজ। সে তাই মিষ্টি মিষ্টি কথার ছলে লেবুকন্যাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আমার মিষ্টি লেবুকুমারী, আচ্ছা একটা কথা বলো, এই যে তুমি এত রূপসী, তোমার কোন সৌভাগ্যকবচ নেই?”
সরল লেবুকন্যা তার চালাকি ধরতে না পেরে ফস করে তার বলে ফেলল, “এই যে আমার চুলের কাঁটাটা দেখছ, এটাই আমার কবচ। এটা আমার চুল থেকে বার করে নিলেই আমি সঙ্গে সঙ্গে একটা পাখি হয়ে যাব।”
ফন্দি এখনো বাকি ছিল! আরবকন্যা তাই এবার লেবুকন্যাকে বলল- “দেখো, আমি তো তোমার মত এত সুন্দরী নই, আমি কালো আর কুচ্ছিত। আমার তাই একবারটি নিজেকে তোমার পোশাক আর গয়নায় সেজে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে।”
লেবুকন্যার যথারীতি এবারও কোন সন্দেহ হল না। সে নিশ্চিন্ত মনে নিজের পশমের পোশাক, রেশমি ফিতে খুলে তাকে পরিয়ে দিল, এমনকি নিজের বহুমূল্য হিরে জহরত খচিত অলংকারগুলিও। তারপর তারা আবার গল্প করতে লাগল। করতে করতে আরবকন্যাটি হঠাৎ তাকে বলল- “এসো, মাথাটা একটু সামনে ঝোঁকাও দেখি। আমি তোমার সোনালি চুলগুলো বরং যত্ন করে একটু আঁচড়ে দিই।”
লেবুকন্যা তার কথামত মাথাটা একটু সামনে ঝোঁকাল আর সেই মেয়েটি তখন তার চুল আঁচড়ে দেবার ছলে লেবুকন্যার চুলের সেই সৌভাগ্য কাঁটাটা পট্ করে খুলে নিল। তাজ্জব ব্যাপার! চোখের পলকে লেবুকন্যা একটা পাখি হয়ে গেল—একটা সাদা পায়রা হয়ে সে উড়ে চলে গেল। ধূর্ত আরবি কন্যা তখন সেই তামাম দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ফিতে আর অলংকারে সেজে ঝাউগাছের ওপর একা চুপচাপ বসে রইল।
এদিকে উৎসব অনুষ্ঠান শেষ হলে পর দিন কয়েক বাদে রাজকুমারের আবার লেবুকন্যার কথা মনে পড়ে গেল। তার সঙ্গে বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় রাজকুমারের তখন প্রায় পাগল পাগল দশা আর কি। তড়িঘড়ি রাজার অনুমতি নিয়ে সৈন্য-সামন্ত, গায়ক-বাদক সব্বাইকে সঙ্গে করে সে লেবুকন্যার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
নদীতীর ঢাক-ঢোল সানাইয়ের শব্দে রমরমিয়ে উঠল। আরবি মেয়েটি তখনও সেই গাছের উপরেই বসে ছিল। এই সমস্ত শব্দ শুনে তার মনটা নেচে উঠল। নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় দিন আসন্ন ভেবে একটা চাপা উত্তেজনায় সে ভিতরে ভিতরে ফেটে পড়ল। নিজেকে বলল- “নির্ঘাৎ ওরা সক্কলে আমার জন্যই এসেছে! অ্যাদ্দিনে আমার ভাগ্য এবার ফিরল বলে!”
রাজকুমার এসে দেখল সেই আরবি মেয়েটি লেবুকন্যার সমস্ত পোশাক-আশাক পরে বসে আছে। সে তখন ভাবল তার প্রিয়তমার সেই দুধে-আলতা গায়ের রংখানাই বদলে গিয়ে হয়ত এমন শ্যামলা হয়ে গেছে। এমন পরিবর্তন দেখে তার তো চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে তাকে জিজ্ঞেস করল- “কি হয়েছিল তোমার, লেবুকন্যে? এমন করে বদলে গেলে কীসে?”
আরবি কন্যার মাথায় বেশ উপস্থিত বুদ্ধি ছিল। চটপট একটা ফন্দি এঁটে সে রাজকুমারকে মিষ্টি করে জবাব দিল, “প্রিয় কুমার, তোমার জন্য আকুল হয়ে পথ চেয়ে আমি এই এত উঁচুতে বসেছিলাম এতদিন। তাই সূর্যের তাপে আমার চামড়া পুড়ে কালি হয়ে গেছে আর এই দুরন্ত হাওয়ায় আমার চুলের সমস্ত সোনালি রং উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে মলিন করে দিয়েছে। আমার খুব ভয় করছিল। আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি বোধ হয় আমাকে ভুলেই গেছ। সারাদিন আমি তাই কাঁদতাম। এই তাকিয়ে দেখো, আমার চোখদুটোর কি হাল হয়েছে! বারবার জল মুছতে মুছতে তাদের সমস্ত আভা নষ্ট হয়ে গেছে…”
তার সেই বানানো গল্পই বিশ্বাস করল রাজকুমার। তাই মাঝপথেই তখন তার কথা থামিয়ে সে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। সে লেবুকন্যার প্রতি এতটাই নিবেদিত প্রাণ ছিল যে এই ভুয়ো মেয়েটাকেই তার লেবুকন্যা ভেবে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। সমস্ত সৈন্য-সামন্ত, গায়ন-বাদনরা বিরাট শোভাযাত্রা করে তাদের প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে দিল।
আরবকন্যাকে যখন সকলে দেখল তখন রাজা, রাজপিতা এমনকি রাজমাতা পর্যন্ত কেউ নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সবাই ঠাট্টা করে রাজকুমারকে জিজ্ঞেস করতে লাগল, “এই তাহলে কিনা তোর লেবুকন্যে?”
রাজকুমার তাদেরকে আরবকন্যার বলা মিথ্যে গল্পটাই বলল, তাদেরকে বুঝিয়ে বলল যে কীভাবে সে এরকম বদলে গেছে। রাজকুমারের ইচ্ছের কথা মাথায় রেখে তাই সেই আরবকন্যার সঙ্গেই তার বিয়ের সমস্ত আয়োজন করে ফেলা হল। আর লেবুকন্যার ছদ্মবেশধারী সেই নগণ্য আরবি দাসীই শেষ পর্যন্ত রাজকুমারের বউ হয়ে গেল।
কিন্তু এত সবকিছুর মধ্যে লেবুকন্যা কোথায় ছিল তখন? সাদা পায়রা হয়ে রোজ সে একবার করে প্রাসাদের বাগিচায় এসে বসত। মালির কাছে গিয়ে তারপর বলত- “রাজকুমার যখন ঘুমোবে, তখন তাকে খুব সুন্দর সমস্ত স্বপ্ন দেখিয়ো। মধু, তেল এবং আরও নানারকম বস্তুসামগ্রীর সমৃদ্ধির স্বপ্ন যেন সে দেখতে পায়। আর ওই আরবি মেয়েটা যেন যত রাজ্যের ভয়ংকর, বিধ্বংসী জিনিসের স্বপ্ন দেখতে পায়। ও যেন দেখে ও নিজেই একটা ভয়ানক প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। আর যে ডালটায় আমি বসলাম, আমি চলে যেতেই সেটা যেন শুকিয়ে সাদা হয়ে যায়।”
যতবার সেই সাদা পায়রাটা আসে, এই একই কথা বলে। আর প্রতিবার যে গাছের ডালে বসে, সে উড়ে যেতেই সেই ডালটা শুকিয়ে মরে যায়।
এইভাবে দিনের পর দিন একটার পর একটা গাছের ডাল শুকিয়ে যেতে লাগল। একদিন বাগিচায় বেড়াতে এসে হঠাৎ সেই শুকনো ডালগুলোর দিকে চোখ পড়তে রাজকুমার মালিকে ডেকে জিজ্ঞেস করল- “এই ডালগুলো এভাবে শুকিয়ে সাদা হয়ে গেল কীকরে? গাছগুলোর ঠিক করে যত্ন নাও না তুমি?”
মালি তখন হাতজোড় করে কাঁদো কাঁদো হয়ে রাজকুমারকে সমস্ত ঘটনা বলল। রাজকুমার তখন তাকে আদেশ দিল- “গাছের প্রতিটি ডালে ভালো করে আঠা লাগাও। কাল আমরা ওই পায়রাটাকে ধরব।”
যেমন কথা তেমন কাজ। মালি সবকটা ডালে ভালো করে আঠা লাগিয়ে রাখল। পরদিন সকালে যথাসময়ে সেই সাদা পায়রা এসে একটা ডালে বসে তার সমস্ত প্রার্থনা জানাল, শেষমেশ এও বলল- “আজ যে ডালটায় আমি বসলাম, আমি চলে যেতেই সেটা যেন শুকিয়ে সাদা হয়ে যায়।”
কিন্তু তারপর যেই সে উড়ে পালানোর চেষ্টা করল, সে ফাঁদে ধরা পড়ে গেল। মালিও খুশিমনে তাকে রাজকুমারের কাছে নিয়ে চলল। রাজারও পায়রাটাকে দেখে খুব পছন্দ হল। তিনি তার জন্য তখন একটা সোনার খাঁচা বানিয়ে দিলেন।
রাজপুত্রের শোবার ঘরে টাঙানো হল সেই খাঁচা। পায়রাটি সেই খাঁচায় বসে বসে গলা খুলে গান গাইত আর রাজকুমারের মনটা আনন্দে ভরে উঠত। আরবকন্যা কিন্তু এসব কিছুই পারেনি কোনদিন। তবে পায়রাটিকে দেখে সে প্রথম দিনই লেবুকন্যাকে চিনে ফেলেছিল। সে তাই রাজকুমারকে একদিন বলল, সে ওই পায়রার মাংস খেতে চায়। রাজকুমার তাকে কথা দিল যে শহরের হাট থেকে ভালো পায়রার মাংস এনে খাওয়াবে। কিন্তু সে কোন কথাই শুনল না। তার এই পায়রাটার মাংসই চাই।
অগত্যা রাজকুমার হাজার টালবাহানার পরেও শেষ পর্যন্ত পায়রাটিকে কেটে তার মাংস নিজের স্ত্রীকে খাওয়াতে বাধ্য হল। কিন্তু যেখানে পায়রাটিকে কাটা হল, সেখানে তার রক্তের ফোঁটাগুলো থেকে আশ্চর্যজনকভাবে একটা সাইপ্রাস গাছ গজিয়ে উঠল। কয়েকদিনের মধ্যেই সে বাড়তে বাড়তে ডালপালা মেলে একটা বড়সড় বৃক্ষে পরিণত হল।
এদিকে রোজ রাতের সেই ভয়ানক দুঃস্বপ্নগুলো আরব্যকন্যাকে একেই দিনরাত অস্থির করে রাখত। তার ওপর এখন এই সাইপ্রাস গাছটিকে এভাবে গজিয়ে উঠতে দেখে সে এবার ভিতরে ভিতরে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেল। রাজকুমারের কাছে গিয়ে সে এবার বায়না জুড়ল, “ওই গাছটার গুঁড়ি দিয়ে আমাদের বাচ্চাটার জন্য একটা দোলনা বানিয়ে দিতে হবে।” রাজকুমার করুণ সুরে তাকে বলল- “এই গাছটাই কেন? আরও তো কত সাইপ্রাস গাছ আছে। আমরা তো সেগুলোর কাঠ দিয়েও দোলনা বানাতে পারি।”
কিন্তু আরবকন্যা জেদ ধরল, “না, না, এই গাছটার গুঁড়ি দিয়ে বানানো দোলনাই আমার চাই।” অগত্যা বানানো হল দোলনা। সেই বিশাল বৃক্ষ নিমেষে ভূপতিত হল। আর তার কিছুক্ষণ পরেই এক বুড়ি রাজকুমারের কাছে এসে বলল- “রাজন, ওই ডালপালাগুলো আমাকে দেবেন? আমি ওগুলো দিয়ে উনুন জ্বালাতে পারব তা’লে।”
রাজকুমার তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল। বুড়ি তখন সেই সমস্ত ভাঙাচোরা ডালপালা, শুকনো লতাপাতা নিয়ে বাড়ি চলে গেল। সেগুলো কুটিরে রেখে সে আবার বেরোল হাট থেকে খাবার কিছু কিনে আনতে।
কিন্তু বুড়ি যখন বাইরে গেল, ঠিক সেই সময়ে একটা আজব ঘটনা ঘটে গেল তার ঘরের মধ্যে। সেই ডালপালার স্তুপ থেকে লেবুকন্যা আবার তার আগের সুন্দর চেহারা নিয়ে বেরিয়ে এল। তারপর ঘরদোরের চারদিকের হাল দেখে সে প্রথমে সেই ছোট্ট কুটিরটাকে ভালো করে ঝাঁট দিতে লাগল। ঘরের সবকিছু ধুলো ঝেড়ে, পরিষ্কার করে সে তারপর গেল রান্না করতে। তার হাতের ছোঁয়ায় চারদিকের ভোলটাই পাল্টে গেল একেবারে।
বুড়ি তো বাড়ি ফিরে আর নিজের কুটিরটাকে চিনতেই পারে না। সে একবার ঘরে ঢোকে, আরেকবার বাইরে আসে, তবু যেন বিশ্বাস হয় না এটা তারই কুটির। সে বুঝতে পারল, এইসব কিছুর পিছনে কারুর একটা হাত তো অবশ্যই আছে। সে চিৎকার করে তার উদ্দেশ্যে বলল- “কে তুমি? মানুষ নাকি‌ কোন পরী? বেরিয়ে এসো বলছি, আমার সামনে এসো, আল্লাহ্-র দিব্যি।”
এবার লেবুকন্যা আড়াল থেকে বেরিয়ে এল, তাকে এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর লাগছিল দেখতে। সে প্রথা অনুযায়ী প্রথমে বুড়ির হাতে চুম্বন করল, তারপর তাকে সমস্ত কথা খুলে বলল। তারপর সে বুড়ির কাছে কাকুতি মিনতি করে বলল- “মা, আল্লাহ্-র নামে আমাকে ক’টা দিন তোমার মেয়ে হয়ে থাকতে দেবে গো?”
এমন ফুটফুটে সুন্দর একটা মেয়ে পেয়ে বুড়ি তো মনে মনে খুশিই হল। তারপর তারা দুজনে মিলে হেঁশেলে গেল আর লেবুকন্যা নিজের হাতে জিভে জল আনা সমস্ত খাবার রান্না করল।
মা-মেয়ে তারপর একসঙ্গে সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে লাগল।
দিন যায়, মাস যায়, দেখতে দেখতে একটা গোটা বছর কেটে গেল। একদিন হঠাৎ রাজকুমারের খুব অসুখ হল। তাবড় তাবড় সব রাজবৈদ্যরা এসে রাজকুমারকে বিভিন্ন ধরনের সূপ খাওয়ানোর বিধান দিয়ে গেল। রাজ্য জুড়ে ঘোষণা হয়ে গেল। যারা যারা কুমারকে ভালোবাসত, তারা প্রত্যেকে একের পর এক নিজেদের মত সূপ প্রস্তুত করে প্রাসাদে আনতে লাগল। কিন্তু রাজকুমার সেগুলো কয়েক চুমুক কি এক চামচ মুখে দেয়, ব্যস্। আর খায় না। তার সুস্থ হবার কোন লক্ষণই নেই। রাজা, রাণী সহ দেশসুদ্ধ লোকের চিন্তায় দিন কাটতে লাগল।
চারিদিকে লোকের মুখে মুখে রাজকুমারের অসুখের কথা ছড়িয়ে পড়ল। সবারই চিন্তার মূলে শুধু রাজকুমারের অসুখ। একদিন হাটে গিয়ে খবরটা লেবুকন্যার কানে এল। বাড়ি ফিরে সে বুড়িকে বলল- “মা, আমরাও তাহলে কিছু সূপ বানিয়ে রাজকুমারের কাছে নিয়ে যাব।” বুড়িও তার কথায় রাজি হল।
নিজের সবটুকু দিয়ে লেবুকন্যা বানিয়ে ফেলল সেই বিশেষ সূপ। তারপর সূপটুকু একটা বাটিতে ঢেলে তার মধ্যে একটা আংটি ফেলে দিল—এই সেই আংটি যেটা নদীতীরের সেই ঝাউগাছে চড়ার আগে রাজকুমার তাকে দিয়েছিল। এবার সেই বাটিটা সে বুড়িকে দিয়ে বলল প্রাসাদে পৌঁছে দিয়ে আসতে।
প্রাসাদে ঢোকার মুখে বুড়িকে দেখেই প্রহরী তার পথ আগলে দাঁড়াল। কিন্তু সেকথা রাজকুমারের কানে যেতেই সে বুড়িকে ভেতরে আসতে দেবার আদেশ দিল। ভয়ে ভয়ে বুড়ি রাজকক্ষে ঢুকল আর সেই সূপের বাটিটা রাজকুমারের সামনে নামিয়ে রাখল।
রাজকুমার প্রথমে এক চামচ সূপ নিয়ে মুখে দিল। বেশ সুস্বাদু খেতে, রাজকুমার একবার তার ঠোঁট চাটল। তারপর আবার আর এক চামচ মুখে দিল, আরও বেশি যেন ভালো লাগল খেতে। তারপর আরও কয়েক চামচ খাবার পর রাজকুমারের চোখে পড়ল সেই আংটিটা। দেখামাত্র তার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। সে বুড়িকে তখন জিজ্ঞেস করল, “বুড়িমা, তোমার কি একটি কন্যা আছে?”
“হ্যাঁ, রাজন।” -বুড়ি জবাব দিল। “আমার একটি ফুটফুটে মেয়ে আছে বটে। কিন্তু আপনার কি কোন বিশেষ প্রার্থনা আছে? তাহলে বলুন, আপনার প্রার্থনা আমার কাছে শিরোধার্য।”
বুড়িকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাজকুমার বলল- “কাল সন্ধেবেলা তাকে এই জানলার নীচে নিয়ে এসো। আমি একটা মোহর ভর্তি ঝুড়ি নামিয়ে দেব। মোহরগুলো বার করে তোমার মেয়েকে ওই ঝুড়িতে ভরে দিও। তারপর সেই ঝুড়িটা টেনে আমি ওপরে তুলে নেব। মেয়ের বদলে ওই মোহরগুলো তুমি নিজের কাছে রেখে দিতে পারো।” নতজানু হয়ে রাজকুমারকে সেলাম জানিয়ে বুড়ি তারপর প্রাসাদ থেকে বিদায় নিল।
পরদিন সন্ধেবেলা বুড়ি তার মেয়েকে নিয়ে ঠিক প্রাসাদে এল আর সেই জানলার নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। একসময়ে সেই সোনার মোহরভর্তি ঝুড়ি নেমে এল জানলা দিয়ে। বুড়ি সেগুলি বার করে নিয়ে নিজের মেয়েকে তার মধ্যে বসিয়ে দিল।
রাজকুমারের নিযুক্ত করা বিশ্বস্ত কয়েকজন চাকর তারপর ঝুড়িটা অতি কষ্টে টেনে ওপরে তুলল। ওপরে আনার পর লেবুকন্যা ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে এল। নদীর তীরে তাদের শেষ দেখার সময়ের থেকেও তাকে এখন যেন আরও অনেক বেশি সুন্দর দেখতে লাগছে। এতদিন পর লেবুকন্যাকে দেখে রাজকুমার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আনন্দে লেবুকন্যার চোখে জল এল।
লেবুকন্যার তৈরি করা সূপ খেয়ে রাজকুমার তো ইতিমধ্যে সুস্থ হয়েই গিয়েছিল। এখন রাজা আর রাণী যখন লেবুকন্যাকে দেখল, তারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আর একটুও দেরি না করে তারা তৎক্ষণাৎ তাদের দুজনের বিয়ের সমস্ত আয়োজন করে ফেলল।
পাজি আরব্যকন্যার ছলচাতুরি বুঝতে তখন আর কারুর বাকি রইল না। চল্লিশটা ঘোড়ার লেজে বেঁধে তাকে এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের ওপরে চড়ানো হল। সারা গা কেটে ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেল তার।
চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত ধরে চলল রাজকুমার আর লেবুকন্যার বিয়ের উৎসব। তারপর চিরকাল তারা সুখে-শান্তিতে জীবন কাটাতে লাগল।

Senjuti SenGupta
সেঁজুতি সেনগুপ্ত
বাড়ি কলকাতা। পড়াশুনো বাংলা নিয়ে। সম্প্রতি স্নাতকোত্তর হয়েছেন। ভালোবাসেন বই পড়তে, ছবি তুলতে আর পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে।

©All Rights Reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *