Indonesian Folktale Translated by Taniya Das

বাংলা English

প্রত্যেকেরই নিজস্ব বোঝা আছে কিন্তু সবচেয়ে ভারী বোঝা ছোট এবং নীচুদের জন্যই

        

একদা একটি আম গাছ ছিলো। তার লম্বা লম্বা ডালগুলো শীতল ছায়া দিত, গাছ ভর্তি সুস্বাদু আম হতো। সকলে ওই গাছটির নীচ দিয়ে যাতায়াত করার সময় তাকিয়ে তাকিয়ে ফলগুলো দেখত আর মনে মনে ভাবতো ‘ঈশ! যদি আমি এই গাছটার মালিক হতাম কি ভালোই না হতো।’

         একদিন গাছের একদম নীচের প্রান্ত থেকে একটা অভিযোগ পূর্ণ গলা শোনা গেলো।
“হায় রে! পোড়া কপাল।  কি বোঝাই না বইতে হয় আমাকে। কত ভারী জিনিস আমি রোজ বয়ে চলেছি; এই এত্ত ভারী একটা কান্ড, একগাদা বড়ো বড়ো ডালপালা, গাদাখানেক পাতা আর গাছ ভর্তি ফল। এত ভারী এরা যে এদের বইতে গিয়ে আমি জ্যান্ত অবস্থায় মাটির নীচে চাপা পড়ে গেছি। এই যে প্রকৃতির এই সুন্দর সৃষ্টি পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে তার কিছুই আমি দেখতে পাইনা। না কখনো হাওয়া বাতাস পাই,  না জীবনে কখনো চাঁদ – সূর্য দেখেছি। আবার কপালের ভোগ দেখো মানুষেরা আমাকেই টেনে- হিঁচড়ে বার করে আনে অন্য কোথাও পুঁতবে বলে। বলে বোঝাতে পারবো না  কি অত্যাচারটাই না সহ্য করতে হয় আমাকে।সে শুধু ভগবানই জানে। এইদিকে কান্ডটাকে দেখো মহাআনন্দে দিন কাটাচ্ছে।”

         হঠাৎ  এই কথার বিস্ফোরণ শুনে কান্ড বললো :
“এই যে ভাই, শোনো এইভাবে কথা বলো না। তোমার সত্যিই মনে হয় যে আমি মহা আনন্দে জীবন কাটাই? তুমি জানো? এই বিশাল বিশাল ডালপালা,  গাদা গুচ্ছের পাতা আর ওই একগাদা ফলের বোঝা আমাকেও বইতে হয়! আমি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি এই না ভয়ঙ্কর ঝোড়ো হাওয়া এসে আমায় নাড়িয়ে দেয়। ওই হাওয়া আমার গোটা শরীরটা ঘুড়িয়ে মুচড়িয়ে দেয়। তুমি তো আর জানো না এতে কতখানি কষ্ট হয়। আমারতো কপাল ভালো যে এখানো দুটুকরো হয়ে যাই নি। যদি আমি ভেঙে পড়ি না!  তাহলেই সব শেষ। “

“শুধু কি এই! আরও আছে। দিনের পর দিন মানুষ কাঠ নিয়ে হাটে যায়, ওই ভারী কাঠগুলো আমার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে। কুঠার দিয়ে আমাকে আঘাত  করে, অত্যাচার করে আমার ওপর। ঘন্টার পর ঘন্টা আমার শরীর থেকে রক্ত ঝড়ে । তারপর আবার ওই লোক গুলোই আমার গায়ে হেলান দিয়ে বসে বিশ্রাম নেয়। আমার বলে বোঝানোর দরকারই নেই যে আমাকে তোমাদের জন্য কি কি বোঝা টানতে হয়। কি ভাবছো এতো কিছুর পরও ওরা আমার কাছে কৃতজ্ঞ? মোটেই না। মানুষেরা মাথার ওপরের ওই পাতাগুলোকেই শুধু হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে কারণ ওরা ছায়া দেয়। এই পাতাগুলোর কাজটা কি? সারাদিন একটু হালকা হাওয়া দিলো কি দিলো না তাদের নাচানাচি শুরু।  একমাত্র ওদেরই শান্তির জীবন।”

         কান্ডের এই বিরক্তিসূচক গুঞ্জন পাতারা শুনতে পেল। নিজেদের ব্যাপারে এই সমস্ত ঈর্ষামূলক কথাবার্তা শুনে তারাও বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল:
“কি খারাপটাই না লাগছে তোমাদের এই ধরনের কথাগুলো শুনে।  কি মারাত্মক অকৃতজ্ঞ তোমরা। আমরা ছাড়া সূর্যের এই তপ্ত আলো থেকে কে বাঁচাতো তোমাদের? আর বর্ষাকালেই বা কি হতো তোমাদের? আমরা সবসময় কঠোর ঝড় থেকে তোমাদের রক্ষা করি। ওই তীক্ষ্ণ বৃষ্টির ফোঁটায় নিজেরা ভিজে তোমাদের বাঁচাই। আর ঝোড়ো হাওয়ার সাথে যদি আমরা মোকাবিলা না করতাম তাহলে সে কবেই তোমাকে উপড়ে ফেলে দিত। তোমারা জানো না ভয়ঙ্কর হাওয়া দিলে আমাদের কি ভোগান্তিটাই না হয়। হাওয়ার চাবুকে আমরা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠি। আবার কখনো কখনো গাছ থেকে ঝড়ে পড়ি আর তারপর এদিক ওদিক আবর্জনার মতো উড়ে বেরাই। আমরা নিজেদের ক্ষমতাতেই ডালের সঙ্গে লেগে থাকি যাতে ডালের আঘাত না লাগে। আমরা যখন মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে থাকি মানুষেরা এসে আমাদের জড়ো করে তুলে নিয়ে যায়। হ্যাঁ তখন আমরা আবার একত্রিত হতে পেরে আনন্দিত হই বটে কিন্তু এই সুখ বেশিক্ষণ থাকে না। ওরা আমাদের আগুনে জ্বালিয়ে দেয় আর আমরা জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাই। কি করে তোমরা বলতে পারো যে আমাদের জীবনটা সুখের?

         যদি বলতেই হয় তো ফলকে বলো। ওদের মহা আনন্দে দিন কাটে। সারাদিন ধরে দুলছে। আর সবার কাছে তো একমাত্র ওরই মূল্য আছে।”এদের সবার কথা শুনে ফল ভীষণ দুঃখিত হলো। তারা তাদের রসালো গলায় বলে উঠলো :
“আমার প্রিয় ভাই-বোনেরা,  তোমাদের কথা শুনে আমরা খুবই দুঃখ পেলাম। তোমরা যা বলছো বিষয়টা একেবারেই সত্যি নয়। তোমরা কি আমাদের অনুভূতিটা জানো? জানো আমরা প্রতি মুহূর্তে কিসের মধ্যে দিয়ে যাই? তোমাদের প্রত্যেকের আমাদের ওপর করুণা হওয়া উচিত।”
“আমরা সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকি। আমাদের সবসময় নিজেদের সুনাম ধরে রাখতে হয়, নিজেদের জনপ্রিয় করে তুলতে হয়। আমরা যদি সুস্বাদু না হই, দেখতে সুন্দর না হই তাহলে লোকে আমাদের কিনবে না।  তারা আমাদের সবাইকে কেটে ফেলবে আর তখন তোমারা শুধুমাত্র আগুন জ্বালানোর কাঠে পরিণত হবে। তোমাদের কোনো গুরুত্বই থাকবেনা।”

   “এছাড়াও আমাদের কতো অত্যাচার সহ্য করতে হয় জানো? আমরা যখন নিজেদের যত্ন নিয়ে পরিপক্ক এবং সুস্বাদু হয়ে উঠি তখনই শিশুরা আমাদের ওপর পাথর ছোড়ে।  আবার মানুষেরা যখন আমাদের খায় তখনও কি আমাদের কম কষ্ট হয়! আমরা কিন্তু একবারও নালিশ করিনা। মানুষ চায় আমরা ভালোভাবে বেড়ে উঠি কারণ আমরা সুস্বাদু।  আর সেই জন্যই তারা আমাদের সম্মান করে। আমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি ভালো তাদের বীজ বাছাই করে আবার পোঁতা হয়। আমাদের বংশধরদের দেখে আমাদের গর্ব হয়। আমাদের বীজের বীজ।”

         “থামো! থামো তোমরা!” গাছের নীচ থেকে মূল আবার চিৎকার করে উঠলো। “কোনো কথা বলার দরকার নেই আর। তোমরা প্রত্যেকে আমার ভরসাতেই বাঁচো। আমি যদি না থাকি তোমাদেরও কোনো অস্ত্বিত্ব থাকবে না। আমি অসুস্থ হলে না থাকবে কান্ড, না থাকবে ডালপালা আর না থাকবে ফল, পাতা। তোমাদের জন্য আমাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। সারাদিন আমি তোমাদের জন্য খাবার খুঁজি। তোমাদের কি খাবারের প্রয়োজন নেই? একবারও ভাবো যে কে তোমাদের সব কিছুর যোগান দেয়। সবসময় নিজেদের কথা ভাবলেই হবে?”

         ….. বাতকেরা বলল এই একই ঘটনা মানুষদের মধ্যেও হয়। সবসময় কোনো কাজ করার আগে অন্যদের কথা ভাবো। মূল, কান্ড, ডাল, পাতা, ফল সবাই একত্রিত হলে তবেই গাছের পক্ষে বাঁচা সম্ভব। তবেই সত্যিকারের ভারসাম্য রক্ষা হবে।

তানিয়া দাস
তানিয়া দাস। বেথুন কলেজের বাংলা বিভাগের ছাত্রী। বর্তমানে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠরতা।  লেখার প্রথম প্রকাশ তর্কিত তর্জনী পত্রিকায়।

© All rights reserved by Torkito Tarjoni

Leave a Reply

Your email address will not be published.